Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

‘নাগরিক’ প্রযোজনা ‘স্বপ্নবাজ’: ঢাকার মঞ্চে নবীন বাচন

Written by বিপ্লব বালা.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

‘শরদ্বিন্দু তুমি আত্মহত্যা করেছ কেন’?

‘তুমি আত্মহত্যা করোনি কেন’?

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীয় বিনিময়ে প্রদর্শিত নাটক। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রযোজিত, বাদল সরকার রচিত ‘বাকি ইতিহাস’-এ ছিল উপর্যুক্ত সংলাপ। দেশ ও বিশ্বের ভয়াবহ সব নৈতিক মানবিক স্খলন বিচ্যুতির প্রতিক্রিয়ায় এক অধ্যাপকের আত্মহত্যা নিয়ে ছিল এই নাট্য। তার মানে এই নয় নাগরিক চিরকাল নৈতিক মনস্তাত্ত্বিক সংকটক্রান্তির নাটক করেছে। ২৬ বছরে তারা কত যে বিচিত্র বিষয়/রীতি সম্বলিত নাটক করেছে তার হিসাব করা মুশকিল। নাট্যে আতীব্র দেশ-জনগণ প্রণোদিত সেই কালে নাগরিকের ছিল যেন বড়ই সৌখিন উচ্চারণ: ভালো করে ভালো নাটক করতে চাই। যেমন ছিল তাদের আরেক সাধারণ আহ্বান: দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাটক দেখুন। আমরা জানি, নিরীহ এই ঘোষণা কী ঘটনা- দেশজুড়ে নগরে নগরে নাট্যচর্চার বাণ ডাকে। মৃদু এই উচ্চারণ ঠিক যেন বাঙালি মধ্যবিত্তসুলভ নয়। একেই বলে বুঝি নাগরিক-শীলিত বাচন, মেলোড্রামাটিক উচ্চকণ্ঠ স্লোগানের বিপরীতে। এর ভিতরে নিপুণ কোনো ফাঁদ বা ফাঁকি নেই তা হয়তো বলা যাবে না, তাতে কী, সেই বিপদ তো মুখবিপ্লবীপনার মধ্যে আরো কতোই আছে। যদিও অর্জন সেখানেও কম নয়। সত্য শেষ পর্যন্ত বুঝি অনেকান্তই। একটি কোনো নির্দিষ্ট একমেবাদ্বিতীয়ম পন্থা নেই। এক সময় সেটা ভেবেই আমরা অকারণ পণ্ডশ্রম করেছি। এতদিনে ক্রমে আমরা যেন ক্রমসৃজ্যমান সত্যের নাগাল পেতে শুরু করেছি। যাক এসব।

নাসরিন জাহান বাংলাদেশের গল্প-উপন্যাসের নবীন এক মানস-ভাষ্যকার। মানবমনের বিচিত্রতর কল্পনা, অনুভূতি, আকাক্সক্ষা আর সংকটাশ্লেষ বিশিষ্ট ভাষায় ভাষ্যে রূপায়ণ করেন- খুঁড়ে তোলেন মনের আর সম্পর্কের অতল নানা চোরা, লুকানো কোণ-বিবর-গহ্বর। পরতের পর পরতে পাকানো জটিল জট খুলে খুলে দেখতে চান সত্যের মিথ্যার বিচিত্র নিপুণ শিল্পমালা- যা কিনা বিকীর্ণ আঁধারে বিমূর্ত। উপন্যাসের পক্ষে উপযুক্ত এই মনন-মানসক্রিয়া মঞ্চনাট্যে কী করে রূপায়িত হবে?- ‘মূলত ঝাঁঝালো মিথ্যা এবং শত শত স্বপ্নের মাঝখান থেকে কীভাবে খুব সূক্ষ্ম দাগে মাথা তোলে সত্য- ‘স্বপ্নবাজ’ নাটকে আমি এটাই দেখাতে চেয়েছি’- এমত ‘বিমূর্ত বিষয়’ কীভাবে মূর্ত হবে, মঞ্চে- এরকম সব ভাবনা- কৌতূহল জাগছিল’- যদিও জানি, নাগরিক ‘বাকি ইতিহাস’, ‘অচলায়তন’, গোডোর প্রতীক্ষায়’, ‘ঈর্ষা’র মতো বিচিত্র নাট্যে বাচনের নানা অভিজ্ঞতায় ধনী, তবুও একটা অন্যরকম টেনশন কাজ করছিল।

মিলনায়তনে ঢুকে পরিপাটি নাগরিকসুলভ শোভন মঞ্চসজ্জা দেখা গেল। পেছনে নানা কৌণিক- বিস্তারিত সংহত স্থাপত্য-সংযত এক্সপ্রেসনিস্ট ধরনের। কাটআউটের মাঝামাঝি অর্ধবৃত্তাকার জ্যা-এর পাশে কৌণিক রেলিং, বাঁয়ে খোলা আকাশের ঢাকনা খুলে দিয়েছে। অর্ধবৃত্তটির জ্যাবদ্ধ ধনুকের ছিলো যেন ঊর্ধ্বে স্থির নিবদ্ধ। রেলিঙের মাঝখান দিয়ে বাঁয়ে হেলানো দ-ে একটি মুখোশ-ছাঁচ আরেক দ-ে কৌণিক সংলগ্নতায় দ-ায়মান। দেয়ালে একটি তলোয়ার গাঁথা। তার বাঁয়ে এক টুকরো লম্বাটে ছোটো ত্রিভূজাকৃতি বিপরীত ভারসাম্যে ওপরে তোলা। পাশে দরজার ফ্রেম। ডান দিকেও একটা। স্থাপত্যের রং অফ হোয়াইট। সব মিলে দৃষ্টিনন্দন ও ভাবন-প্রণোদক। শুরুতেই নাট্যের একটা দৃশ্যায়ণ- আবহ তৈরি হয়। মঞ্চের বাঁদিক থেকে পেছনে মধ্যমঞ্চ বরাবর দেয়াল সমান্তরাল উঁচু তলে। ডানদিকে ডিভান মতো, ছোট টেবিল। কাঠের বসবার টুল। বাঁয়ে দরজার ফ্রেমের সামনে দুটো বেতের সোফা। তারও সামনে পুরনো মডেলের কালো টেলিফোন। বাড়ির স্থাপত্য-বিন্যাস, তার রং এবং গৃহের সজ্জার পাশে বোঝা যায় টেলিফোনটির বিশেষ ব্যবহার আছে। গৃহের স্থাপত্যের সঙ্গে আসবাবের দূরত্ব এবং টেলিফোনটির বৈসাদৃশ্য একটা টেনশন তৈরি করে অর্থঘন হয়ে ওঠে। আলো নিভে গিয়ে জ্বললে পরে একটি মেয়ে খুশিতে ছটফট করে রেলিংয়ের সামনে ঝুঁকে আকাশ দেখে, মেঘের সাথে কথা বলে। ঘুরে সামনে এসে নেচে হাত-পা নেড়ে ভানুসিংহের পদাবলী সুরে উচ্ছ্বসিত আবৃত্তি করে। ‘নিশি’ বলে ডেকে বন্ধুর এহেন পুলকের কারণ জানতে চায় আর একটি মেয়ে। সায়রা বলে- কেরানিকে ভাগ দাও খুশির। নিশি জানায়, চাকরি ছেড়ে দিয়েছে তাই নির্ভার, হালকা, মুক্ত এখন- অপবাদ মাথায় নিয়ে জঘন্য আপোষ করতে হচ্ছিল এতদিন তার। চাকুরিদস্যু থেকে মুক্তির এই ঘোষণা আমাদের বেশ আগ্রহী করে তোলে- মনে হয়, দৈনন্দিন এই আমাদের ভয়াল বাস্তবতা-সকল তাহলে উঠে আসবে একে একে। অথচ কেরানি মেয়েটি কেবল মজা পায় চাকরি ছাড়ার কথায়। ‘আজব মেয়ে’ বলে চলে যায়- বিশেষ কোনো উৎসাহ বা দুর্ভাবনা জাগে না তার। মনে হয় ঐ মেয়েটিও তাহলে তেমন ‘কেরানি’ নয়। বন্ধুর সাথে সমান তালে ভেসে বেড়াতে পারে।

বিকট শব্দে ফোন বাজে- ‘হ্যাঁ বলছি’- তীব্র উৎকণ্ঠাকীর্ণ বাজনার আলো নেভে। মনে হয় ফ্ল্যাশ ব্যাকে যাচ্ছে যেন নাটক। বাজনাটি অসাধারণ ব্যঞ্জনা তৈরি করে দেয় মনে- বুঝি শুরু হয়ে গেল নাটক। নাট্যের ধ্বনিগত আবহের একটা মেজাজ তৈরি হলো।

পরের দৃশ্যের শুরুতেই বারবার ফোন বাজে- নিশি ধরে, কেটে যায়। বিরক্তি উৎকণ্ঠায় শ্রান্ত দেখায় তাকে। ইফতেখার আসে। ফোন ধরতে গেলে নিশি বাধা দেয়। আবার ফোন এলে ইফতি ধমকে দেয়। বেশ রহস্য ঘনায় এই ফোন আসা নিয়ে। নিশি সোনাতে চায় তার স্বপ্ন। ইফতি বিরক্ত হলে- নিশি অবাক হয়- স্বপ্নের মধ্যে সুন্দর কিছু খুঁজে পাও না? ইফতিকে তখন তার কৈশোরের গল্প করে- কুৎসিতের মধ্যেও সুন্দর দেখতো সে। সবাই ভাবতো মেয়েলিপনা। আর এই স্বপ্নকেই এখন বিকার বলছে ইফতি। কেন? কীভাবে তা হলো বোঝা যায় না। অথচ নিশির কাছে- স্বপ্ন দিয়ে মানুষ চেনা যায়। তাহলে সম্পর্কটা হলো কী করে তাদের? স্বপ্ন সম্পর্কে এতই বিপরীত ধারণা যেখানে?

নিশি কষ্ট পেয়েছে বলে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয় ইফতি। স্বপ্নে কী দেখেছে শুনতে চায়। তাকে সহানুভূতিশীল লাগে কেবল।

নিশি তার স্বপ্ন বলে। ঝড়ের মধ্যে কন্যা শ্রাবণীর শরীর দুমড়ানোর দৃশ্য স্মরণ করে আছাড়িবিছাড়ি করে সে। স্বপ্ন বর্ণনার শুরুতে ঝড়ের কড়কড় শব্দ একটু কম লাগছিল, আরো জোরে হওয়া দরকার ছিল। বর্ণনাটা কেমন যেন একটু যান্ত্রিক লাগে। বানানো মনে হয়। ইফতি বিশ্বাস করে না। জানতে চায় কে ফোন করেছিল। ইফতি তার ওপর নির্ভর করে তাকাতে বলে- নিশির ভয় কমে; আবার তুমি বুঝতে পারছো, মনে হচ্ছিল বদলে যাচ্ছো তুমি- মোহ কেটে মায়া জাগছে কেবল। মায়া শেকল, অভ্যাস বাধ্যতা! আর মোহ দুর্লভ, স্ফুলিঙ্গ- তাই সুন্দর।- নিশির আকাঙ্খার একটা আভাস বুঝি মেলে। অথচ ইফতির কাছে মুহূর্তের এই মোহ তুচ্ছ, এক ধরনের অন্ধতা। নিশি তার কথায় স্বামীসুলভ হিসাব দেখে। আবার ফোন বাজে। নিশির বিচ্ছিন্ন স্বামী তার সঙ্গে আইনত বিচ্ছেদ চাইতে আর কন্যা শ্রাবণীকে চাইছে। ইফতি ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে বলে। স্বামীর প্রতি কটুক্তিতে নিশি ক্ষিপ্ত হয়। রাশেদ দৈত্য নয় ভিলেন নয়, ওর মধ্যে মানবিক গুণও আছে। ইফতি সন্দেহ করে নিশি সুস্থ কিনা। স্বামীর মার সে ভুলে গেছে? নিশি বলে, মোটা দাগের গল্পই কেবল দাম্পত্য জীবন নয়। অর্থহীন ক্রোধে জ্ঞান হারিয়ে নেশার ঘোরে মারত তাকে তার স্বামী। তখন তার মধ্যে একটা পশু ভর করত। ইফতি বিরক্তি হয়- নিকৃষ্ট কাজের যুক্তি খুঁজছে নিশি। রাশেদ যে তাকে ভালোওবাসত সে গল্প করেনি নিশি। ইফতি বিয়ে করতে চায় নিশিকে। নিশি অরাজি- ইফতি তার কাছে অসীম এক স্বপ্ন। বিয়ে দিয়ে তাকে বাঁধতে চায় না। সংকটে ব্যবহার করতে চায় না। পরে গ্লানি এলে স্বপ্ন বাঁচবে না। ইফতি বিরক্ত- পরে কী হবে এই ভাবনায় নিশির বর্তমানকে এড়ানোর জন্য। নিশি-ইফতির মানস-ভিন্নতা এ বিষয়েও স্পষ্ট হয়। পরের দৃশ্য। নিশি স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নমানুষ আর তার দল আসে। সাদা পোশাকের ওপর লাল উত্তরীয়- কেমন ভীতিপ্রদ লাগে। স্বপ্নমানুষ পেছনের রেলিংয়ের সামনে। দলবদল সামনে দু’পাশে দু’দল হয়ে দাঁড়ায়। ‘স্বপ্নে ফোটাই ফুল, তুমি যেথায় পালিয়ে যাও, আমি সেথায় ছায়া’- জানায় স্বপ্নপুরুষ। নিশি বলে, স্বপ্ন শেষ হলে রূঢ় বাস্তব। পুরুষটি জানায়, বাস্তবে যাকে খুঁজে পাওনা আমিও সে। বাস্তব মানুষকে নিষ্ঠুর বন্দীত্বে অসাড় বা স্বপ্নচারী করে। স্বপ্নপুরুষ অচেনার মুখোশ পড়েছে। নিশির কাছে হাজার রঙের বাস্তবের মধ্যে বিস্তারিত স্বপ্নে অসহ্য ঠেকে। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটকে রাজার সংলাপের রেশ লাগে। রানীকে দেখা দেয় না রাজা কঠিন সত্য দেখার যোগ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত। নিশির আশঙ্কা, মুখোশে চেহারা ঢেকে দিতে পারে। এটা কি স্বপ্নে বানানো মুখোশ? নিশি সত্যকেই দেখতে চাইছে? যা তার স্বপ্নের আরাধ্য? স্বপ্নপুরুষ এবার মিথ্যার মধ্যে তৈরি ঐতিহ্য-ধারক এক ভোজালির কথা তোলে। বলে, শিকড়ে হাত দিলে কঠিন সত্য বেরুবে- কত পালাবে? তোমার মুখেও মুখোশ, মিথ্যে ছায়ার জাল বুনে স্বপ্নে ঢেউ তুলছে। নিশি বলে, কখনো মুখোশ, কখনো স্বপ্ন, মধ্যে এক ফোঁটা বাস্তব। স্বপ্নপুরুষ স্বপ্নে না লুকিয়ে বাস্তবে দাঁড়াতে বলে। নিশি বলে, এমন টান দিন যাতে দুঃসহ স্বপ্নের ঘোর কাটে। স্বপ্নপুরুষ বলে, তুমি নিজেই নিজেকে তুলে ধরো।

কল্পনায় মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় যে স্বপ্ন এ তাহলে সে স্বপ্ন নয়? এটা তাহলে দুঃস্বপ্ন? যার থেকে পালিয়ে বেড়াই, যে সত্য থেকে? নিশির বর্তমান মনের দশায় পূর্বপুরুষের ভোজালি নিয়ে মিথ্যা ঐতিহ্য কাহিনী তো তত মুখ্য হওয়ার কথা নয়। তবে কি সে দুঃস্বপ্ন দেখেছে, যাতে কঠিন সত্য প্রকাশ হতে চাইছে? তাই কি সত্যপুরুষ দলের উত্তরীয়ে লালের তীব্রতা- কেমন ভীতিপ্রদ? আলো যেন তেমন সাহায্য করে না এই স্বপ্ন কী দুঃস্বপ্ন দৃশ্য রচনায়। স্বপ্নদলের চলন বলনেও কোনো চরিত্র আসে না, বিচ্ছিন্ন কোরিওগ্রাফি মাত্রই লাগে। কথাগুলোর তেমন কোনো অভিঘাত লাগে না। ঠিক বুঝতে পারাও যেন যায় না বলছে বা কী।

পরের দৃশ্যে নিশি-সায়রা। নিশি জানায়, জীবনভর অপমানের ভয়ে পালাতে পালাতে কত মিথ্যা, কত ভান, কত কৌশল যে শিখতে হয়েছে। এত কম জোর নিয়ে কী করে নিশি একা চলবে- দুর্ভাবনা করে সায়রা। নিশির স্বামী রাশেদ আসে। আমরা আগেই তো তার পুরুষসুলভ কর্তৃত্ব আধিপত্য আর সরল এক স্বভাবের কথা জেনেছি। সে নতুন বিয়ে করেছে। বউ টাকা আর ভোগের পিছনে ছুটিয়ে মারছে তাকে এক বছর ধরে। নিশি বলে এরও দরকার ছিল। নিশিকে অন্যে দেখছে, ঘাটছে ভাবলে রাশেদের রক্ত চড়ে- ইহার নাম স্বামী!- মেয়ে ফেরত চায় সে।

এতদিন কোথায় ছিল টান? -কেন সে তো টাকা পাঠিয়েছে! নিশি হিসাবের কথা নয়, টানের কথা তোলে। সম্পর্কের নৈতিক অধিকারের, স্নেহের মায়ার প্রশ্ন তোলে। মেয়েরা দ্বিতীয় পুরুষের স্পর্শে ছেনাল হয়, কোমলতা নষ্ট হয়- অবলীলায় রাশেদ বলে। পুরুষের বিকৃত মনটি তাতে উলঙ্গ হয়।

নিশি দুস্মৃতিচারণ করে: কীভাবে তাকে ছিঁড়ে এনে স্বামী-সংসার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নিজের মা-বাবার জায়গায় নতুন মা-বাবা বসানো হয়েছিল। নিশি চেয়েছিল তৃতীয় জায়গায় সংসার যেখানে কেউ অধিকারের জোরে কারো ওপর নিজের ইচ্ছা চাপাবে না। জানা যায় রাশেদের ঘৃণাও তখন থেকে। বিয়ের রাতেই নিশি তাকে আলাদা হতে বলেছিল বলে। অথচ বিচ্ছেদাতুর নিশির মনের ওপর ঠেসে দিয়েছিল নতুন সংসারের বোঝা। বিবাহ-ব্যবস্থাপনার একটি প্রথা সম্পর্কে সঙ্গত প্রশ্নই তোলা হয় এভাবে। জড়ভাবে তোয়াজ করা যেখানে স্ত্রীর কর্তব্য-নিয়তি।

শ্রাবণীকে মৃত্যুর বিনিময়েও দেবে না- জানায় নিশি। রাশেদ পুনর্বিবাহের প্রস্তাব দেয়। নিশি রাজি হয় না- আমার না হয় বিষ গিলেও হেসে ওঠার অভ্যেস আছে- তুমি ইফতির সঙ্গে আমার সম্পর্কটি ভুলতে পারবে না। মেয়ের জন্য কম্পিউটার গেম দিয়ে চলে যায় রাশেদ।

রাশেদের চরিত্রটি, আতাউর রহমান, চরিত্র থেকে একটা দূরত্ব রেখেই অভিনয় করেন। তাতে রাশেদের সারল্য ও কর্তৃত্বপরায়ণতায় একটা মজাই পান যেন অভিনেতা- এমন মনে হয়। এক্ষেত্রে চরিত্রানুগ, চরিত্র-হয়ে ওঠা অভিনয় হলে ভালো হতো মনে হয়। চরিত্র-বিচ্ছিন্ন পদ্ধতিতে রাশেদের জান্তবতা একটু তরল হয়ে গেছে যেন। পরের দৃশ্যে নিশি জানায় সায়রাকে, তার পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য কাহিনীতে মিথ্যার যে ক্রমপর্যায়। সায়রা বলে, মুখোশ পরে কতক্ষণ বাঁচব? নিশি রাশেদকে জানায়, ইফতিখাতের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্বরূপ; ওর প্রতি অদ্ভুত অনুভব তোমার সংসারে থাকতে সাহায্য করেছিল। বাঁচার অর্থ পেয়েছিলাম। ইফতিকেও খুলে বলে; তার স্বপ্নকল্পনা শৈশব-কৈশোরে যেন তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল, সে ছিল নিশির স্বপ্নপুরুষ। আগের দৃশ্যের স্বপ্নপুরুষ নিশ্চয় ভিন্ন সত্ত্বা- যা সত্যকে তুলে ধরতে উদগ্রীব। ইফতি ভয় পায় ‘তুমি বাস্তব আমাকে স্বপ্নে নিয়ে ফেলো- কোনদিন না স্বপ্নমানুষটার সামনে আমি স্বয়ং অর্থহীন হই। তোমার ভেতরেই আমার ভেতরের স্বপ্নবাজকে দেখি- অভিন্ন সত্ত্বা মনে হয়। তোমাকে  দেখে নিঃসঙ্গতা ঘোচে- মনে হয় তো সেই আমার সিনডারেলা’।

এখানে খুশির যে বাজনা বাজে নাচের সঙ্গে সেটা তত ব্যঞ্জনাময় হয় না। প্রথাগত লাগে। অন্যান্য বাজনা যেমন সৃজনচরিত্র্য পেয়ে গেছে তেমন হয় না। ইফতিখারের অভিনয়ে গুণী নট খালেদ খানকে কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত লাগে। চরিত্রটা যেন ধরা যাচ্ছে না। মনে হয়, এতে নাট্যকারেরও হাত আছে। ইফতির সত্তাস্বরূপ ঠিক যেন স্পষ্টতা পায়নি, নিশির পাশে তার মানসস্বভাব ঠিক যেন এলোমেলো খাপছাড়া লাগে। কৈশোরকালে তার যে স্বভাব বর্ণনা হয় তা যেন এখন নেই মনে হয়। বরং বেশ বিবর্ণ সহানুভূতিশীল বন্ধুমাত্র লাগে তাকে। নিশির স্বপ্নপুরুষ বা তার প্রেমিক বলে মনে হয় না। যদিও নিশি বলে, তুমি বদলে গেছো। অথচ তার কার্যকরণ বা সম্পর্কের পারস্পরিকতাও ঠিক বোঝা যায় না। এর ফলে অভিনেতা যেন এক অনির্দিষ্টতা হাতড়ে ফেরেন- ওপরে ওপরে ঘুরে চলেন- চরিত্রটির সত্তার ঠিক রূপ পায় না। তাতে খালেদের অভিনয় প্রতিভা চরিত্র-নির্ভর হয়ে স্ফূর্তি পায় না।

মেয়ের জন্য ইফতি উকিলের সাহায্য নিতে বলে। নিশি বলে- কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ? ইফতি থই পায় না- নিজেকে মূল্যহীন ক্লাউন লাগে তার। নিশিকে স্বার্থপর ভাবে। নিজেরে ছাড়া যে কিছু জানে না- যার আছে কেবল বিচ্ছিন্ন স্বপ্নগুলো। অথচ এই স্বপ্নের জন্যই একদা অপার্থিব মনে হতো তাকে- বলে নিশি। মেয়ের জন্য সব করবে সে, প্রয়োজনে রাশেদের ঘর করবে। ইফতি হাল ছেড়ে চলে যেতে চায়। নিশি রূঢ়-ভাষ্যে কথা বলে। পরে জানায়: তুমি যদি না বোঝ কোথায় দাঁড়াব। ইফতি জানায়, পাশের বাড়ি থেকে নিশিকে প্রহৃত হতে দেখে মমতা বাড়ল তার প্রতি, শ্রদ্ধা কমলো- এমন মানুষের সঙ্গে কী করে আপোষ করে ঘর করে সে। নিশি তার স্বামীকে সরল অহংকারী বলেছিল। মানসিক অত্যাচার তার চেয়ে ভয়াবহ। সব শুনে ইফতি নিশির মধ্যে আলোকিত এক নারীকে দেখেছিল সেদিন। সায়রা একদিন ইফতিখারের সামনে উন্মুক্ত হয়-‘মনে হয় সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়েছি। সব সেখানে খুলে দেয়া যায়’। বলে ফেলে তার বিড়ম্বিত সত্য: এক বুড়ো চাকুরি দেয়ার নাম করে প্রাপ্য আদায় করে, আর তাকে আপোশ করতে হয় দু’মুঠো ভাতের জন্য। ইফতি সমবেদনা জানালে অনির্দেশ্য অভিমানে ফুঁসে ওঠে সায়রা- ‘এইভাবে বলবেন না। নিজেকে আমার ভয় করে। আপনাকে ভয় হয়-  নিশিকে আমি ঈর্ষা করি’। কাজী রুমার অভিনয়ে সায়রার আর্ত এই অভিমান বিরক্তি ক্রোধে পর্যবসিত হয়। বেদনাটি ঠিক বাচন পায় না। অভিনয়ের সহজ স্বাভাবিক জায়গায় বরং তিনি স্বচ্ছন্দ।

সায়রা ভোজালি হাতে আত্মহত্যা করতে চায়, নিশি ধরে ফেলে। তলোয়ার আকৃতির ভোজালিটি অতিনাটকীয় চেহারা নেয়।

আজব এক লোক আসে নিশির কাছে। পাগলপারা। সে নিশির পূর্বপুরুষদের বংশানুক্রমিক প্রজা। তার বাবা অবৈধ সন্তান ছিল জমিদার বাড়ির। নিশি গিয়েছিল তাদের গ্রাম ধারাগঞ্জে পূর্বপুরুষের সত্য জানতে। লোকটি তাই আসে মিথ্যে ভাঙতে। জানায় ভোজালির সত্য বিবরণ। নারীলোভী নিশির এক পূর্বপুরুষ একদিন নৌকা ভেড়ায় ঘাটে। ভিতরে গিয়ে নারীর ঘোমটা খুলে দেখে তার মা বসে আছে। তখন সে ভোজালি দিয়ে আত্মহত্যা করে।- এই সেই ভোজালি। স্বপ্নপুরুষ বলে: সত্য প্রকাশ করো। নিশি বলে, কোনো পাপপুণ্য বুঝি না, আমি আমার যোগ্যতায় আমার সন্তানের অধিকার চাই। ‘আগে নিজের সত্য খুঁজে বের করো- নিজের মূল্য বুঝলে পথ পাবে’।- নিশি বলে- পথ বলে যান। স্বপ্নপুরুষের গায়ে এবার লাল উত্তরীয় নেই। কেন? নিশিকে সত্যের শুভ্র মুখ দেখাবে বলে?

জমিদার পূর্বপুরুষের পাপ-অনাচারের পটভূমি নিশির ব্যক্তিগত সত্তা-সংকটের সঙ্গে কোনো সামাজিক সংলগ্নতা ঠিক পায় না। ব্যক্তিগতই থেকে যায় সে কাহিনী। নারীবাদী নাটকের বিশেষ বৃত্তে যদিও বন্দী হয় না। বিশেষ এক নারীর মনঃসমীক্ষণজনিত কেস স্টাডি প্রতীকের ব্যাপ্তি অবশ্য পায়। আত্মরক্ষার মরিয়া রোখে মিথ্যার নিপুণ শিল্পের বিকীর্ণ আঁধার তাকে পাকে পাকে জড়ায়। সত্য প্রকাশে মিথ্যার আশ্রয়ই অচ্ছেদ্য বন্ধন হয়ে ওঠে। বংশের পাপের ভ্রুণ তার রক্তেও রয়ে গেছে, এহেন বিভ্রম দিয়ে সে তার তুরুপের তাস ছোড়ে। শ্রাবণী রাশেদের মেয়ে নয়, তার দিল্লী প্রবাসকালে এক ঝড়ের রাতে দেবর বাচ্চুর ঔরসে জন্ম শ্রাবণীর- একথা ইফতি ও রাশেদকে জানায়। রাশেদ এবার জান্তব পৌরুষে উন্মক্ত হয়ে পালায়। ইফতির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। নিজের মেয়েকে জারজ বানাতেও বাঁধে না নিশির!- এক মিথ্যা মুছে এভাবে আরেক মিথ্যার জন্ম  দিল সে! শ্রাবণীর মধ্য দিয়ে এই মিথ্যা আবার চলবে কতকাল! রাশেদকে পিতৃত্বহীন করতেই এই ঢিল ! দু’জনকেই নিশির যে চাই- শ্রাবণী আর ইফতি। দুঃসহ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বড় এই সত্যই প্রকাশিত হল- সন্তান আর প্রেমিক দুই-ই যে চাই নিশির। আর্তস্বরে বলে একথা নিশি।

স্বপ্নমানুষ বলে: তুমি শ্রাবণীকে বাঁচিয়েছ। একটা কিছু দাঁড় করাতে আর কিছু হত্যা করতে হয়।

এই তবে নারীর নিয়তি! তার সত্তাস্বরূপ, প্রেম আর সন্তানের আশ্রয় চেয়ে? স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন কল্পনায় মিথ্যার জটিল জালে অষ্টাবক্র নারীর জীবনসত্য ‘স্বপ্নবাজ’ নাট্য।

বাস্তবের আঘাতে স্বপ্নের আশ্রয়গ্রহণ, সেখান থেকে সত্যে পৌঁছতে গিয়ে জড়াতে হয় একের পর এক মিথ্যায়। এহেন এক নারীর মানস সত্তাস্বরূপ ও তার সংকট এই নাট্যে রূপায়িত। তার যোগ্য বাচন ও শারীর মুদ্রা অনতিনবীন অভিনেত্রী নূনা আফরোজের নিকট থেকে পুরোপুরি আশা করা যায় না। ঢাকার মঞ্চে ঠিক এমত সংকটভাষ এখনও পর্যন্ত অনাবিষ্কৃতই বলতে হয়। অন্য নানা স্তর-মাত্রা সম্বলিত নাট্য যদিও যথা বাক্সময় হয়েছে। নূনা আফরোজ যদিও সাধ্যমতোই করতে চেয়েছেন। মানস-উদঘাটনের একটা পর্যায় পর্যন্ত অভিনয় তার আয়ত্তে এসেছেও। তবে নাট্যকার মানোগহণে যে টালমাটাল উড়াল দিয়েছেন, কথায় যতটা যেমত ধরতে পেরেছেন তার নাট্যবাচন রূপায়ণ করতে আরো সময় লাগবে। যদি অভিনয়ে এই প্রাণঘাতি আতিপাতি সন্ধানের মরিয়া রোখ নিরন্তর থাকে।

নির্দেশক হিসেবে খালেদ খানের সাফল্য তাঁর পূর্বকৃতিকেও ছাপিয়ে গেছে- তাঁর ক্ষমতার একটা উত্তরণ ঘটেছে।

উপর্যুক্ত এই একটি মাত্র বিবেচনা দিয়ে সমগ্র নাটক ও নাট্যকে নিশ্চয় ধরা যাবে না। দর্শকমাত্রই নিজস্ব এক ভাষ্য রচনা করেছেন- নাটককার, নির্দেশক, অভিনেতৃগণ এবং সঙ্গীত-দৃশ্য-আলোক রূপকারগণ মিলিতভাবে সেই সুযোগ দিয়েছেন যদিও দর্শকের কাছ থেকে যথা মনোযোগ ও মগজের বিনিময়ে। ঢাকার মঞ্চের এই সংক্রান্তিকালে এই নাট্য একটা বেশ স্বপ্নময় আততি রূপায়ণ করেছে। নির্দেশকের আশা অপূরণ হয়নি। যদিও ‘নাগরিক’-এর মুকুটে কোনো রঙ্গীন পালক অর্জিত হল কিনা সে প্রশ্ন থেকেই গেল।

মঞ্চ পরিকল্পক এনামুল করিম নির্ঝর এবং আবহ সঙ্গীত পরিকল্পক তাদের দৃশ্য-শ্রাব্যকলা রূপায়ণ দ্বারা ‘স্বপ্নরাজ’ নাট্যস্মৃতিকে দীর্ঘজীবী করবেন বলেই মনে করি।

বিপ্লব বালা- নাটককার, শিক্ষক, নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়