Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

জন্মদিনের আড্ডায় মামুনুর রশীদ

Written by অনুলিখন.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[২৯ ফেব্রুয়ারি, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের জন্মদিন। স্বভাবতই প্রতি ৪ বছর অন্তর সুযোগ ঘটে তাঁর জন্মদিন পালনের। তাঁর ৫২ বছর পূর্তিতে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ ২০০০ পর্যন্ত আরণ্যক নাট্যদল আয়োজন করেছিলো এক নাট্যেৎসবের- মামুনুর রশীদের কয়েকটি নাটক নিয়ে হয়েছিলো ‘দ্রোহ দাহ স্বপ্নের নাট্য আয়োজন’। উৎসবের শেষ দিন, ৩ মার্চ মামুনুর রশীদ ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা নাট্যজনদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। পাঠকদের জন্য সেই আড্ডাচ্ছলের আলাপচারিতাটি ‘জন্মদিনের আড্ডায় মামুনুর রশীদ’ শিরোনামে ছাপানো হলো এ সংখ্যায়। আড্ডাটির সঞ্চালক ছিলেন নাট্যকার- সংগঠক-শিক্ষক মলয় ভৌমিক। এটি অনুলিখন করেছে থিয়েটারওয়ালার প্রকাশনা সহকারী তানসেন নিকলী]
 
মলয় ভৌমিক
সম্মানিত সভাপতি, নাট্যজন, সংস্কৃতিকর্মী, সুধীমণ্ডলী। আমি প্রথমেই এই ‘মুখোমুখি মামুনুর রশীদ’ অনুষ্ঠানে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে থেকে নাট্যকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী যাঁরা উপস্থিত হয়েছেন তাঁদেরকে স্বাগত জানাচ্ছি, তাঁরা এসেছেন এ জন্য তাঁদের জানাচ্ছি কৃতজ্ঞতা। একই সাথে তাঁদের মুখোমুখি নাট্যকার-অভিনেতা-নির্দেশক মামুনুর রশীদ বসেছেন, তাঁকে জানাচ্ছি অভিনন্দন। আমার মনে হয় খুবই কাছ থেকে খোলামেলা কিছু কথা আমরা বলতে চাই- যাতে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারি। আমি সরাসরি প্রসঙ্গে আসি। মাইক্রোফোন পাওয়ার সুবাদে আপনাদের পক্ষ থেকে প্রথম কিছু বলে মামুনভাইকে মাইক দেয়ার সুযোগটি গ্রহণ করতে চাই। তো আমি যেটি বলবো সেটি হচ্ছে যে... গত মাসে রাজশাহীতে-এদেশের তথা এ উপমহাদেশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হাসান আজিজুল হক- আপনারা নিশ্চয় সবাই একনামে তাঁকে চেনেন- মামুনুর রশীদ তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলেন। মাঝখানে অত্যন্ত সংকোচে আমাকে বসে থাকতে হয়েছিলো সঞ্চালক হিসেবে। তো দু’জন বিশাল ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি থেকে আমার একটি কথা মনে হয়েছে এবং তা দিয়ে মনে হয় আজকের আলোচনা শুরু করা যায় (যেটি আজকের ৩.৪.২০০০ ইং ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছে)। হাসান আজিজুল হক মামুনুর রশীদের নাট্যদর্শন, তাঁর নাটক, তাঁর নাটকের প্রয়োগকলা-কৌশল ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে একটি গল্পের অবতারণা করেছিলেন। সেটি হচ্ছে বেড়াল এবং শেয়ালের গল্প। বেড়াল এবং শেয়াল কে কোনপন্থী?... গল্পটি সংক্ষেপে এমন- এক শেয়াল, শেয়ালতো খুব চালাক... তো সে পালানোর জন্য একশটা গর্ত খুঁড়ে রেখেছিলো- যাতে বিপদে পড়লে যেকোনো গর্ত দিয়ে সে পালিয়ে যেতে পারে। এটা তার চালাকির একটা নমুনা।... আর বেড়াল, যেহেতু বুদ্ধিসুদ্ধি কম, সে একটা পথ বেছে রেখেছিলো যেন বিপদে পড়লে পালিয়ে যেতে পারে। পথটি ছিলো- সে সুট করে একটা গাছের উপরে উঠে পড়বে। তো দেখা গেল একদল কুকুর যখন শেয়াল এবং বেড়ালকে তাড়া করে এলো তখন বেড়ালটি খুব দ্রুত সুট করে গাছের উপরে উঠে গেলো। আর শেয়াল একশটি গর্তের মধ্যে কোনটি দিয়ে পালাবে, সেই পথ ঠিক করতে করতেই ধরা পড়ে গেল।... তো এই গল্পটি বলার পর হাসান আজিজুল হক মামুনভাইকে বললেন যে, দেখুন আমার মনে হয় আমি শেয়ালের মতো এতো গর্ত খুঁড়ে রাখতে পারিনি, আমি বেড়ালপন্থী। আমার কাছে, মাটি-মানুষ-দেশ- এগুলো সামনে রেখে যা মনে হয় লিখি, অত তত্ত্বও বুঝি না, অত আঙ্গিকের ব্যাপারটিও বুঝি না... এবং মামুনুর রশীদকে বললেন, আমার মনে হয় আপনি যেহেতু স্তানিস্লাভস্কিপন্থী... স্তানিস্লাভস্কি নিজেও শেয়ালপন্থী ছিলেন না অর্থাৎ তিনিও মাটি মানুষ এসবকে সামনে রেখেই...  মানে... এটি কোন তত্ত্বে দাঁড়ালো কোন আঙ্গিকে দাঁড়ালো- সেটা খুব একটা বিবেচনায় নেন না। এই ছিলো মামুনুর রশীদ সম্পর্কে হাসান আজিজুল হকের একটি বিশাল আলোচনার মর্মকথা। এই দু’টো ব্যাপার তার সমগ্র জীবনের কর্মকাণ্ডের দু’টো প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে আমার মনে হয়।... তো আমি অনেক লম্বা চওড়া কথা বলে ফেললাম। প্রথমেই মামুনভাইকে একটু বলতে চাই যে- এই যে আপনার বৈশিষ্ট্য আপনি এতদিন ধরে আসছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আপনার ব্যক্তিগত সমস্যার কারণেই হোক অথবা নিজের ব্যস্ততার কারণেই হোক, আপনি ঐ তুলনায় কি একটু গণ্ডীবদ্ধ হয়ে যাননি? আপনার কী মনে হয়? সুধীমণ্ডলী এই পর্যায়ে আমি মামুনভাইকে মাইক্রোফোন দিচ্ছি আর এখন আপনাদেরই সুযোগ, আপনারা যারা প্রশ্ন করবেন, আলোচনা করবেন, তারা প্রথমেই নিজের পরিচয় দিয়ে নিলে আমরা উপকৃত হবো। ধন্যবাদ।

মামুনুর রশীদ
আয়োজকদের ধন্যবাদ যে আমাকে এরকম একটি বিরল সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আমি মলয় ভৌমিকের উত্তর দেবার চেষ্টা করবো। তার আগে বলে নিই, এই যে ছয়দিনব্যাপী উৎসব হচ্ছে... উৎসবের কোথাও আমার কোন ভূমিকা নেই... এর পরিকল্পনার ব্যাপারেও আমার ভূমিকা নেই... আমি কিছুই জানি না। তবে এই একটি অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আমি আয়োজকদের অনুরোধ করেছিলাম যে... বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় যারা আমার নাটক মঞ্চস্থ করেছে তাদেরকে নিয়ে একটি দিন... দুই-তিন ঘন্টা হলেও আমি একটু বসতে চাই। যদি পারো এই ব্যবস্থাটা তোমরা করো। তারা সেটা করেছেন... আন্তরিকভাবে সারাদেশে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন। টাঙ্গাইল, যেখানে প্রায় দশটি দল ‘ওরা কদম আলী’ করেছে, প্রায় ততোধিক দল ‘ইবলিশ’ করেছে, ‘ওরা আছে বলেই’ করেছে- তারা আমাদের পরিচিতজন, তাদের মধ্য থেকে দু-একজন প্রতিনিধি এসেছেন... আরো অনেক জায়গা থেকে... যেমন সিরাজগঞ্জ... সিরাজগঞ্জের কথা এই কারণে বলছি যে, আমার ‘ওরা কদম আলী’র প্রথম অভিনয়টি (আরণ্যক এর বাইরে) সিরাজগঞ্জে দেখতে পেরেছিলাম এবং সেই রাতের স্মৃতি আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে... এখানে উপস্থিত আছে হারুন অর রশীদ- সেও অভিনয় করেছিলো ঐ নাটকে... এবং ‘ওরা কদম আলী’ দেখার পর রাত্রি বেলায়... রউফ এখানে উপস্থিত আছেন, তার বাড়িতে প্রচুর পরিমানে গরুর গোশত সহযোগে আমরা খেয়েছিলাম... তখন ছিলো কোরবানীর ঈদ... এক উত্তেজনাকর অভিজ্ঞতা। তো নিজের নাটক... বাইরে অভিনয় দেখা, আজকে এতবছর পরে... বিশ-একুশ বছরেরও বেশি হয়ে গেছে... এই বিশ-একুশ বছর পরে আমি চেয়েছিলাম সেই সব বন্ধুদের, যারা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে, সেই নওগাঁয় গিয়েছি... কত জায়গায় গিয়েছি... যারা ‘ইবলিশ’ করেছে ‘ওরা কদম আলী’ করেছে... বিভিন্ন নাটক করেছে... তাদের সাথে যদি কথা হতো... তাহলে সত্যিকার অর্থেই বুঝতে পারতাম... তাদের কাছ থেকে জানতে পারতাম, অনেক কিছু। আমার প্রত্যাশা কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে... অনেক জায়গা থেকেই বন্ধুরা এসেছেন... দেখতে পাচ্ছি রাজশাহীর বন্ধুকে, দেখতে পাচ্ছি সিরাজগঞ্জ-চট্টগ্রামের বন্ধুদের, রংপুর থেকে এসেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসেছেন আরো অনেক জায়গা থেকে এসেছেন। তবে আমাদের ধারণা ছিলো, গতকাল পর্যন্তও আমরা ভেবেছিলাম যে, যারা আমার নাটক করেছেন তারা যদি সবাই আসেন তাহলে তাদের জন্যই ‘ওরা কদম আলী’র একটা বিশেষ প্রদর্শনী করতে হতে পারে। আমি আনন্দিত যে এই আয়োজনটি হয়েছে। তার আগে আরো যে নাট্যকারদের রেট্রোস্পেকটিভ হয়েছে তাঁদেরকেও বলেছিলাম এরকম একটি আয়োজন করার জন্য। আরণ্যক এর আয়োজকরা এ ব্যবস্থা করেছেন- এটা একটা শুভ সূচনা হোক।

তো ফিরে আসি মলয় ভৌমিকের প্রশ্নে- মলয় ভৌমিক যে প্রশ্নটা করেছেন... গণ্ডীবদ্ধতার কথা... সংকট দু’দিকেই... একদিকে হচ্ছে ‘ওরা কদম আলী’র মতো নাটক আমরা বিশ বছর পর প্রযোজনা করতে যাচ্ছি... কিন্তু প্রযোজনা করতে গিয়ে লক্ষ্য করছি যে, মানুষের প্রচণ্ড কৌতূহল এই নাটকটিকে নিয়ে... তারা নাটকটি দেখতে চান... আমাদের টিকেট নিঃশেষিত... অনেক লোকের সাথে আজকে ভুল বোঝাবুঝি হবে। অনেকে নাটকটি দেখতে পারবেন না। এটা একরকম সংকট। আবার অনেকে বলেছেন যে- ‘জয়জয়ন্তী’ নাটকে আমার নাট্যকার হিসেবে মহত্তম মোড় নেওয়ার একটা সোপান অতিক্রম করেছে।... এখন কোন বাস্তবতাটা সত্য? ‘ওরা কদম আলী’ সত্য না ‘জয়জয়ন্তী’ সত্য? আজকের সেমিনারের (সকাল বেলা সেমিনার হয়েছিলো) বক্তৃতাগুলো শোনার পর আমার মধ্যে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, কোনটি সত্য? আবার এটিও অনেকে বলেছেন, বিশেষ করে শান্তনু কায়সার বলেছেন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার যাবার সময়ও বললেন যে, দেখুন- এই নাটকটা dated নয়... এই নাটকটা যখনই হবে, হতে থাকবে, তখনই একটা আবেদন সৃষ্টি করবে। কিন্তু আমরা ‘জয়জয়ন্তী’ যখন অভিনয় করি... দর্শকরা যখন বেরিয়ে যায়, তাদের মধ্যে যে সপ্রশংস... এমনকি বিদগ্ধ জনতাদের মধ্যেও... কলকাতায় এক ভদ্র মহিলা বলে ফেলেছিলেন যে, তার দেখা সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা নাটক...  এরকম বিশেষণও বলে ফেলে, যা আদৌ সত্যি নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মলয়কেই হয়তো আমার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হবে এবং তা আমার নিজেরই বারবার প্রশ্ন- কোনটি সত্য? ‘ওরা কদম আলী’ নাটকটির সবচেয়ে বড় এডভানটেজ হচ্ছে নাটকটিতে নারী কম, যেকোনো জায়গায় অভিনীত হতে পারে এবং যে লেভেলের অভিনয়ই হোক-না কেন একটা ন্যূনতম সাফল্য ঐ দলটি পায়। কিন্তু ‘জয়জয়ন্তী’ নাটকটির প্রযোজনা এতটাই দুরূহ যে, জয়জয়ন্তী নাটকের অভিনয়ের সংবাদ দেশের কোথাও থেকে খুব একটা পাচ্ছি না। তাহলে এই ধরনের নাটক আমাদের নাট্যকারদের কি গণবিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে? আমরা কি ব্যাপক সংখ্যক দর্শকের কাছে যেতে পারছি না? এ প্রশ্নটাও কাকে করবো... এটা আমার নিজের কাছেই একটা প্রশ্ন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে দুই হাজার সালে এসে আমি কি আবার একটা ‘ওরা কদম আলী’ লিখবো? এটা লিখলে কী হবে? আমিতো বিশ বছর পরে আরেকটি ‘ওরা কদম আলী’ লিখতে পারবো না- লেখা সংগতও হবে না, প্রযোজনা করাও সংগত হবে না। এখন তাই বলে কি আমরা মনে করবো দর্শকরা আটকে আছে ১৯৮০-৭৯ সালে, আমরাই এগিয়ে গেছি বিশ বছর? এটা সত্যি নয়- সফোক্লিসের ‘ইডিপাস’ নাটক এখনও আমরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে, অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে দেখি কেন? তাহলে আমরাও কি আড়াই হাজার বছর পিছনে পড়ে আছি? সেটাও তো সত্য নয়।... শিল্পের একটা সংকট, কঠিনতম সংকট... এই সংকট অতিক্রম করার জন্য আমরা হয়তো নিজেদেরকে প্রশ্নই করতে থাকবো কিন্তু কোনো উত্তর হয়তো পাবো না। কিন্তু আবার পাশাপাশি এটাও করতে হবে- নিজেকে সমসাময়িকতার কাছে সমর্পন করতে হবে...  কারণ নাটক এমন একটা শিল্প... উৎপল দত্ত বারবার এ কথাটি বলেছেন যে, একটি কবিতা, একটি ভাস্কর্য, একটি পেইন্টিং- এদের একশ বছর, দু’শ বছর পরে হয়তো মূল্যায়ন হয় কিন্তু নাটককে মারাত্মকভাবে সমসাময়িক হতে হয়- সেই নাটকের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সেই নাট্যকারেরও কোনো ভবিষ্যৎ নেই। অভিনেতাকেও সমসাময়িক হতে হবে... আজকে অভিনয়টা এ্যাপ্রিসিয়েশন না পেয়ে দু’শ বছর পরে পাবে, এটা কিন্তু হবে না। কাজেই আমরা এমন একটি শিল্পের সাথে যুক্ত যে, সেই শিল্পে আমাকে সমসাময়িক হতেই হচ্ছে। যা হোক, আমার মনে হয় আমি অনেক সময় নিয়ে ফেলেছি। অনেকের অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে- আপনারা প্রশ্ন করুন।

মলয় ভৌমিক
অনুগ্রহ করে আপনারা আলোচনায় অংশ গ্রহণ করুন- কে করবেন?- একটু আপনার পরিচয়টা দিয়ে নিন।

সামিনা লুৎফা
আমি সুবচন নাট্য সংসদের একজন কর্মী। সুবচন নাট্য সংসদ মামুনুর রশীদের দু’টি নাটক করেছে। একটি ‘চক্র’ এবং আরেকটি ‘রাষ্ট্র বনাম’। ‘রাষ্ট্র বনাম’ এবং ‘চক্র’ নাটকে আমরা দেখি যে রাষ্ট্রের অবস্থান খুব স্পষ্ট। কিন্তু রাষ্ট্রের এই শোষক চরিত্র কিংবা শাষক চরিত্রের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ বা যে স্লোগান নিয়ে আজকের এ আয়োজন ‘দ্রোহ দাহ স্বপ্নের নাট্য আয়োজন’ সেই দ্রোহটা ‘রাষ্ট্র বনাম’ নাটকে তেমন স্পষ্ট নয়। শোষিত জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা দেখি, আজিজালের বউ একপর্যায়ে দ্রোহ বা বিদ্রোহ করার চেষ্টা করেছে কিংবা ‘চক্র’ নাটকে ময়না করছে কিন্তু প্রতিবাদটা একটা প্রতীকী পর্যায়ে রয়ে যাচ্ছে, দ্রোহটা তত স্পষ্ট নয়। মামুনুর রশীদের কাছে আমার প্রশ্ন- এই দু’টো নাটকে দ্রোহটা তত স্পষ্ট নয় কেন?

মামুনুর রশীদ
একটি চমৎকার প্রশ্ন করার জন্য ধন্যবাদ দিচ্ছি তরুণ অভিনেত্রীকে।... আসলে এ কথাটা কিন্তু আমি ভাবিনি... এই প্রথম আমার মনে পড়লো যে কথাটা তো একঅর্থে ঠিকই... সেটা হচ্ছে- ‘রাষ্ট্র বনাম’ নাটকে... রাষ্ট্র বনাম এই কাথাটি আমার মনে হয়েছিলো সমন যে জারি করা হয় সেখানে লেখা থাকে ‘স্টেট ভার্সাস’। এই ‘স্টেট ভার্সাস’কে আমি বাংলা করেছিলাম ‘রাষ্ট্র বনাম’... এখন কোর্টেও বাংলায় বলে। ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্টে দেখবেন ‘রাষ্ট্র বনাম অমুক গং’- এভাবে কথাটি আসে... তো... ‘রাষ্ট্র বনাম’ নাটকে প্রথম থেকেই আমরা দেখাচ্ছি যে রিপ্রেশন শুধু হয়ে যায় এবং আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ... সাধারণ মানুষ বলতে আমি কিন্তু বেছে নিয়েছি একটা প্রতীকী জায়গা, রংপুর... যেখানে কার্তিক মাসে মঙ্গা হয়, যেখানে সামন্তবাদের দোর্দ- প্রতাপ এখনও রয়ে গেছে, সেরকম একটি গ্রাম... সোমজালি গ্রাম। রংপুরের নিরীহ নিপীড়িত মানুষ... তাদের কোনো শক্তি নেই এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর, প্রতিবাদ করার। কিন্তু এই রিপ্রেশড মানুষগুলোর পক্ষে আইনও দাঁড়াচ্ছে না, আইনও তাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। একজন হতভাগা, রিপ্রেশড উকিল তাদের পক্ষে দাঁড়ায়...  একজন দুর্বল কৌসুলি... কিন্তু জেলখানায় যখন তেজারত বলে যে আমি সূর্য দেখতে পাই না, চাঁদের আলো দেখতে পাই না, কখন দিন হয়, কখন রাত হয় আমি বুঝতে পারি না... এবং তার আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে... একটা ছোট্ট একতারা আমায় এনে দাও... আমি গান গাইলে জগতটাকে দেখতে পাবো... তারপর সে গান গায় এবং সেখানেই নাটকটা শেষ হচ্ছে। তুমি হয়তো খুব সহজেই বলতে পারো এটা দ্রোহের নাটক নয়, এটা দাহের নাটক, এটা স্বপ্নের নাটক। একজন নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষ কেবলমাত্র একটা মিউজিক দিয়ে... এটাও প্রতীকী অর্থেই এসেছে, একটা মিউজিক দিয়ে জাস্ট একতারার একটা শব্দ শুনতে চাচ্ছে... সে গান গাইতে চাচ্ছে... এটাই তার কাছে একটা বড় ধরনের স্বপ্ন। আজকে কি আমরা ঢাকায় বসে কল্পনা করতে পারি যে, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে একজন ভূমিহীন কৃষকের স্ত্রীর স্বপ্ন কী? আমাদের যেখানে স্বপ্নের পরিধি এতোবেশি, আমাদের চাওয়া এতোবেশি, আামদের আকাঙ্ক্ষা এতোবেশি... ওখানে তেজারতের মতো একটা চরিত্র ঐটুকু স্বপ্নইতো দেখতে পাবে... প্রাসঙ্গিকভাবে বলি... আমার এই নাটকটি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার পাঠ করা হয়েছিলো, সেখানে... আশোক মুখোপাধ্যায় এই নাটকের সঙ্গে একটা বিদেশি নাটকের উদাহরণ দিয়েছিলেন। সেটা আমার কাছে খুব ভালো লেগেছিলো। সেটা ছিলো- আমেরিকাতে এ রকম কিছু অপ্রেসড ইয়াং ছেলে, ব্ল্যাক একটা রায়টের সালে তাদের জেল হয়... যাবজ্জীবন কারাদ- হয়... কারাদ- হওয়ার পরে জেল অথরিটির কাছে তাদের দাবি... যে আমরা বাঁচতে পারছি না... আমরা ইয়াং ছেলে, সারাজীবন আমাদের জেলে থাকতে হবে... আমরা জেলের মধ্যে ব্যান্ড গড়তে চাই... আমাদেরকে দু’টো গীটার এনে দাও... কিন্তু গীটার এনে দেয়নি... তখন তারা জেলখানার শিক ভেঙে একটা যন্ত্র তৈরি করেছিলো এবং ঐ যন্ত্র দিয়ে তারা গান গাইতো। এবং গান গাইতে গাইতে তারা বলেছে যে- নাউ উই ফিল উই আর এ্যালাইভ। আমি ‘গিনিপিগ’ নাটকের ভূমিকায় বলেছিলাম- ফুড ফর ওয়ার্ক এর কথা। মানুষ শুধু খাদ্য খেয়েই বাঁচে না... তার আরো অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। যেমন একজন অভাবী দরিদ্র মানুষের কাছে ধর্ম একটা পরিপূরক... যখন তার সন্তান মারা যাচ্ছে অনাহারে, অসুখে, তখন সে বলছে আল্লাহ তুমি বাঁচাও... কিন্তু আল্লাহ তখন তাকে বাঁচাতে আসছে না। তবু সে বলছে আল্লাহ তুমি বাঁচাও... অর্থাৎ মানুষের কাছে ধর্ম ও সংস্কৃতি পরিপূরক, তার স্বপ্নটাও পরিপূরক, এবং আমাদের বন্ধু আব্দুল্লাহেল মাহমুদ একজন ল্যাটিন আমেরিকানের উদ্ধৃতি সব সময়ই দেন... এটা হয়তো মার্কেজের কথা হবে... ‘এই তৃতীয় বিশ্বের মানুষ অর্ধেক তন্দ্রা এবং অর্ধেক জাগরণের মধ্যে বেঁচে থাকে, অর্ধেক স্বপ্ন এবং অর্ধেক জীবনের মধ্যে বেঁচে থাকে।’ ‘রাষ্ট্র বনাম’ ও ‘চক্র’-এ হয়তো এই বিষয়টিই আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিলো... সেকারণেই নাটকটিতে সরাসরি বিদ্রোহটা ওভাবে না এসে এখানে দাহ এবং স্বপ্নের বিষয়টি এসেছে। ধন্যবাদ।

এস এস মনজুর রশিদ বিদ্যুৎ
আমি ঢাকা পদাতিক এ কাজ করি এবং নাটক ও নাট্যাঙ্গন নিয়ে লেখালেখির কাজ করি। মামুনভাইয়ের কাছে আমার দু’টি প্রশ্ন... একসাথেই করবো এই কারণে যে, এখানে অনেক নাট্যকর্মী আছেন, হয়তো অনেকেই প্রশ্ন করবেন। আমি দ্বিতীয়বার সুযোগ না-ও পেতে পারি। আমার প্রথম প্রশ্নটি হচ্ছে, অনেক নাট্যবোদ্ধা- যাদেরকে আমরা নাট্যগুণী মনে করে থাকি, তারা প্রায়শই বলে থাকেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন হচ্ছে মঞ্চনাটক। কিন্তু আপনার সাক্ষাৎকারে আমরা লক্ষ্য করেছি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে মঞ্চনাটককে স্বীকৃতি দেননি। কেন অন্যান্যদের মতো মঞ্চনাটককে আপনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মনে করছেন না? এই প্রশ্ন আমার রইল। দ্বিতীয়ত আরেকটি প্রশ্ন, বিগত একদশক ধরে দেখছি, একটি ভালো নাটকের জন্য এবং অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিলের জন্য... এ দু’টি বিষয়ের জন্য আপনাদের, যারা নাট্যসংগঠক, তাদের আন্দোলনগুলো সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু নতুন নাট্যকর্মীদের নাটক সম্পৃক্ত যে জ্ঞান... তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক, প্রয়োগিক জ্ঞান... সেসম্পর্কে একজন সংগঠক হিসেবে আপনিসহ অন্যান্যদের বিশেষ কোনো ভূমিকা আমরা দেখতে পাই না। যার ফলে আজকের যে তরুণ নাটকের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেক কিছুতেই এক ধরনের অস্পষ্টতা আমরা দেখতে পাই। এই অস্পষ্টতা নিরসনে আপনি মামুনুর রশীদ কতটুকু ভূমিকা রেখেছেন? যদি না রেখে থাকেন- তাহলে এদিকটাতে কেন বেশি গুরুত্ব দেননি? ধন্যবাদ।

মামুনুর রশীদ
প্রথম প্রশ্নটি খুব গুরুতর প্রশ্ন। কারণ আমরা হাজার হাজার প্রবন্ধে দেখতে পাই... আমরা নাট্যকর্মীরা তো বলিই, আমদের দেশের মন্ত্রী-মিনিস্টাররাও বলে থাকেন... কালকে যেন কে বলছিল, সুন্দর একটা শব্দ ব্যবহার করেছিল যে... বাংলাদেশে বিশটি ছায়ামঞ্চ আছে। বিশটি ছায়ামঞ্চ... অর্থাৎ যে সরকারই ক্ষমতায় আসে তারা- প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি প্রথমে ঘোষণা দেন একটি মঞ্চ করা হবে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চ পেয়ে যাই, করতালি দিই এবং পরে দেখা যায় সেই মঞ্চগুলো কতগুলো ছায়ামঞ্চ, স্বপ্নের মঞ্চ। তো আমাদের দেশে যেখানেই যাই আমলা থেকে শুরু করে সবাই বলে মুক্তিযুদ্ধের সর্বশ্রেষ্ঠ ফসল হচ্ছে নাটক। কিন্তু আমরা অন্য ক্ষেত্রগুলোকে দেখবো না? এটা কি একধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী কথা হয়ে যায় না? আমরা কি মুক্তিযুদ্ধের পর পেইন্টিং পাইনি, চিত্রকলা পাইনি? ভাস্কর্য পাইনি? কবিতা পাইনি?- এগুলোকে অস্বীকার করতে পারবো? সেগুলো কি মুক্তিযুদ্ধের ফসল নয়? মুক্তিযুদ্ধের পর আমাদের দেশে কি স্থাপত্য শিল্পে দু’চারজন ভালো আর্কিটেক্ট আসেনি? আমি ইংল্যান্ডে গিয়েছিলাম ১৯৮৯ সনে। সেখানে শুনেছি যে, বাংলাদেশে এত সংকটের পরেও মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার পর প্রতিবছর তিন থেকে চারজন হাইটেবল ফেলো যাদের বলা হয় অক্সফোর্ডে... এক্সট্রা অর্ডিনারি ফেলো হিসেবে দু’চারজন করে শিক্ষার্থী প্রতিবছর সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে।... এখন প্রশ্ন হচ্ছে... চিকিৎসা ক্ষেত্রে যে অর্জনগুলো হয়েছে সেগুলো হয়তো আমাদের অজানা থাকতে পারে... কিন্তু আমি যে মাধ্যমে কাজ করি, তার সংশ্লিষ্ট মাধ্যমগুলোর অর্জনের ব্যাপারে আমার ধারণা থাকবে না, তা কিন্তু মেনে নেয়া যায় না। মঞ্চনাটক আমাদের অন্যতম ফসল বলাই ভালো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ফসল একথা বলতে গেলে কিন্তু আরেকটি প্রশ্নের সম্মুখীন আমরা হচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধের ফসল কিন্তু আমাদের এই রাষ্ট্রটিও। এদেশে আমরা একটা জায়গায় এসে মঞ্চনাটকটাকে যে একটা অবস্থানে এনে দাঁড় করালাম- সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ফসল যে রাষ্ট্র সে আমাদের জন্য কী করলো?... আমাদের জন্য কিছুই করলো না রাষ্ট্র এবং সরকার। আমরা বলবো নাটক হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধোত্তর জনগণের আশীর্বাদপুষ্ট সর্বশ্রেষ্ঠ ফসল।... একটা দেশে মঞ্চ নেই অথচ সেই দেশের মঞ্চনাটক আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাচ্ছে। মঞ্চ ছাড়া মঞ্চনাটক- এটা কিন্তু একটা অবাক কা-... কী বলবো... এটা কিন্তু সত্যি একটা বিরাট ব্যাপার। মঞ্চনাটক দাঁড়িয়ে গেল, তার ইনফ্রাস্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে গেল, অভিনেতা-অভিনেত্রী, নির্দেশক, নাট্যকার, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং দর্শকের পৃষ্ঠপোষকতায় নাটক দাঁড়িয়ে গেল... রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া- এটা কিন্তু আমার কাছে... মানে কী বলবো... খুব বড় বড় আন্দোলন করলাম... কিন্তু যখনই মন্ত্রীরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের ভিতর ঢুকে পড়লেন, তখন আমাদেরকে আর চেনেন না।... সেটা বিএনপির ক্ষেত্রেও হয়েছে, আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও হয়েছে। যে মন্ত্রীরা আন্দোলনের সময় আমার বাসায় রাতের পর রাত টেলিফোন করতো... আজকে আমি দশবার ফোন করেও... জাতীয় প্রয়োজনে ফোন করেও... তাদের একবারও সাক্ষাৎ পাই না। এরা টেলিফোনেও কথা বলেন না আমাদের সাথে। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ ফসল বলার সময় ভাষার ব্যঞ্জনারও পরিবর্তন হওয়া দরকার। আমাদের কত স্বপ্ন ছিলো... কত ভাবনা ছিলো... কালে কালে অনেক স্বপ্নইতো আমাদের ভেঙে গেছে... আবার নতুন স্বপ্নের জন্ম হয়েছে, নতুন স্বপ্নের জন্ম না হলেতো আমরা বাঁচতে পারতাম না। এটাই হচ্ছে আমার প্রথম উত্তর।

দ্বিতীয় প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ এবং আমি তোমার সাথে সম্পূর্ণ একমত। আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব জাতি হিসেবেও আমাদের একটা সংকট আছে। আমরা নিজেরাও অনুষ্ঠান করছি। আমি নিজেকেও এর বাইরে ভাবি না। যেমন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর নাট্যোৎসব করে আসছে। আমাদের আইটিআই একটা ইন্টারন্যাশনাল সেমিনার করে... আমরা খুব পয়সা খরচ করি... বিরাট জায়গায় সেমিনার করি। গতবার আমরা ভেবেছিলাম যে, এই সেমিনার থেকে কিছু পয়সা বাঁচাই, বাঁচিয়ে মহিলা সমিতির মধ্যে একট ভালো টয়লেটের ব্যবস্থা করি... সেটাও করতে পারিনি... এবং এখান থেকে আমি যেটা বুঝতে চাই সেটা হলো... দিনের পর দিন নাটক হলো, চট্টগ্রাম থেকে, রাজশাহী থেকে দল এলো, বগুড়ার দল এলো, সব জায়গা থেকে এলো... প্রথমত দর্শক সেভাবে হয় না... দ্বিতীয়ত, যে উপকারটা হতে পারতো সেটা হলো, দু’তিনজন প্রতিনিধিও যদি সবগুলো নাটক দেখতো, তাদের সাথে ইন্টারেকশন হতো- সেটাও একটা শেখার ব্যাপার হতো। আজ পর্যন্ত... আমার নিজেরও খুব খারাপ লাগে... কালকে আমার অনুজ প্রতিম একজনের সঙ্গে কথা বলছিলাম যে, আজকে থিয়েটার নিয়ে আলোচনা করার লোক পাই না। কেউ একজন জিজ্ঞেস করে না যে ‘জয়জয়ন্তী’ নাটকে ঐ জায়গায় আপনি ঐ যে কাঠ দিয়ে একটা শব্দ করলেন- এটা কেন করলেন? লাইটটা, আলোটা ঐ জায়গায় এমনভাবে পড়লো কেন? এবং আলোটা পড়ার ফলে যে নৌকার এফেক্টটা হলো- আমরা বিশ্বাস করলাম যে নৌকা করে যাচ্ছে... এই ধরনের প্রশ্ন কেউ করে না।... কেবল বলে, খুব ভালো নাটক করেছেন, খুব ভালো নাটক হয়েছে... করতালি দিয়ে একটা সুন্দর হ্যান্ডশেক করে চলে গেল। এতে কি আমাদের তৃপ্তি মেটে?... তাহলে সংকটটা ঐ গোড়াতেই হয়েছে- যে সংকটটা তুমি ধরেছো যে, নাটকের ইন্টারেকশনের জায়গাগুলোতে এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব কাজ করছে। আমাদের সমগ্র চর্চাটা হলো দুই ঘন্টা... মহড়ার সময়টুকুই। এবং যার যার দলে। আমরা কিন্তু একেবারে দলপতি, গণপতি, গণদেবতা, অরণ্যদেব হয়ে বসে আছি... আমরা এক একজন দেবতা হয়ে বসে আছি... সেখানে আমার কথাই চূড়ান্ত... ঐ শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, স্তানিস্লাভস্কি যা-ই বলুক না কেন, আমি দলের নেতা আমার কথাই চূড়ান্তÍ... আমার উপরে কোনো কথা নেই। এবং যার ফলে কিন্তু ঘোরতর সংকটটা হচ্ছে... আমরা আমাদের কর্মীদেরও শেখাচ্ছি না অমুকের কাজটি দেখো, অমুকের নাটকটি দেখ... এভাবে কমেন্ট করো না, মন্তব্য করো না। একজন লোক ত্রিশ বছর ধরে নাটক করছে- পঁচিশ বছর ধরে নাটক করছে, তাঁর নাটকের সমালোচনা করা, তাঁর নাটক সম্পর্কে মন্তব্য করতে যাওয়ার আগে একটু ভেবে দেখ। তাঁদের ভাবনার ক্ষেত্রে কিন্তু আমরা নতুন কোনো উপাদান যুক্ত করতে পারছি না... যার জন্য থিয়েটার কালচারটা ধ্বসে যাচ্ছে- একেবারেই ধ্বসে যাচ্ছে। আমরা যখন একত্রিত হই... পরস্পর পরস্পরের প্রশংসা করি কিন্তু আড়ালে গেলেই একেবারে উল্টো কথা বলি... এটা একটা নতুন ফেনোমেনা গত পাঁচ-দশ বছর ধরে চালু হয়েছে। এবং এই ফেনোমেনার ফলে যেটা হচ্ছে যে, আমরা নাট্যকর্মীদের যথার্থ শিক্ষিত করে তুলছি না... থিয়েটার এডুকেশন... থিয়েটার এর যে প্রাইমারী এডুকেশন... সেটাই দিতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি।... তো এডুকেশন যদি না থাকে, কালচার কোথা থেকে আসবে? এবং কালচারটা যখন আসবে তখনই আমি বুঝতে শিখবো... স্তানিস্লাভস্কি কে... তিনি কী প্রক্রিয়ায় কাজ করতেন, গ্রোটোস্কি কীভাবে কাজ করতেন, আজকের ইউজিন ও বারবা কী ভাবছেন, আজকে ভারতের হাবিব তানভীর কী ভাবছেন... আজকে পশ্চিমবঙ্গের থিয়েটার এর গৌতম হালদার কী ভাবছেন... সুবল মুখোশ কী ভাবছেন। আমরা যে আজকে নতুন নাটকগুলো নামাচ্ছি সেগুলো ঘটনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না কেন? আমরা ঢাকায় বা চট্টগ্রামে বা রাজশাহীতে বা অন্য কোনো জায়গায় বছরে/দুইবছরে/তিনবছরে একটি করে ভালো নাটক করি না- তা কিন্তু নয়। কিন্তু এগুলো ঘটনা হতে পারছে না। ঘটনা হবে কোত্থেকে?... ঘটনা একটা হতে পারে দর্শকের কাছে, আরেকটা হতে পারে জনশ্রুতির মাধ্যমে... এই জনশ্রুতিটা করাবে কে? নাট্যকর্মীরাই তো?... তারাইতো নাটকগুলোকে ব্যাখ্যা করবে মানুষের কাছে... সেই ব্যাখ্যা করার জন্য যে শিক্ষা, যে কালচার গড়ে তোলা দরকার সেই কালচারটা দলীয় পর্যায় থেকে গড়ে তোলা হচ্ছে না।... দলীয়পর্যায়ে একধরনের দলবাজি চলছে... আবার অন্যদিকে এক ধরনের সাংগঠনিক শক্তি সৃজনশীলতাকে নিয়ন্ত্রণ করে অথবা রাজনৈতিক শক্তি... যেটা খুবই ডেঞ্জারাস... সাংগঠনিক শুক্ত যখন সমগ্র সৃজনশীলতাকে নিয়ন্ত্রণ করে অথবা রাজনৈতিক শক্তি... যেটা সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে হয়েছে... চীনের ক্ষেত্রে হয়েছে- তা হলে শিল্পের ক্ষেত্রে ভয়াবহ অবস্থা হবেই।... এটাতো এক ধরনের গুরুগামী বিদ্যাও বটে... শিখতে হবে... সম্মান করতে হবে... অন্যকে সম্মান করতে জানতে হবে... তা না হলেতো তার বিকাশ হবে না... সেক্ষেত্রে আশা করি বিদ্যুতের আশাহত হওয়ার কারণ নেই... কারণ আজকাল এগুলো কিন্তু আলোচানর বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়াচ্ছে... যখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে এগুলো, তখন কিন্তু এর একটা ইতিবাচক ফলাফল আসবেই। ধন্যবাদ।

জনৈক
অনুশীলন নাট্যদলের পক্ষ থেকে বলছি। মামুনভাই, আপনিতো মঞ্চ এবং ভিডিও উভয় মাধ্যমেই কাজ করে থাকেন। তো আমরা দেখতে পাই যে, নাটকে আপনি নিরন্ন সাধারণ মানুষের সংস্কৃতিটা ভালোভাবে তুলে ধরেন। আপনার একটি প্রডাকশন হাউজ আছে যেখানে আপনি পেশাগত প্রয়োজনে কাজ করেন। আমরা সম্প্রতি দেখছি যে আপনার ঐ প্রোডাকশন হাউজ প্রযোজিত কিছু নাটক মিডিয়াতে দেখা যাচ্ছে... তো সেখানে আমরা নিরন্ন মানুষের সংস্কৃতির কোনো কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না... যদিও এটা আপনার লেখা বা নির্দেশনা নয়, তবুও দেখা যায় যে এতে কিছু লঘু বিনোদনপ্রিয় দর্শক সৃষ্টি হচ্ছে... তো এই দর্শকগুলো আপনার পরবর্তী কাজের জন্য বিঘ্ন সৃষ্টি করবে কিনা বা আপনার কাজের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে কিনা? এটাই আমার প্রশ্ন।

মামুনুর রশীদ
প্রশ্নটা যদিও খুব সুন্দর তবে আমার জন্য তা বিব্রতকর। কারণ সম্প্রতি একটি টিভি সিরিয়ালে আমি অভিনয় করেছি- সেখানে লঘু বিনোদন আছে এটা সত্যি কথা এবং এটা আসলেই একটি সংকট। সংকটটা হচ্ছে জীবিকার সংকট এবং জীবিকার সংকটের কারণে... নাটক ছাড়া যেহেতু আমি অন্য কোনো মাধ্যমে কাজ করতে চাই না এবং টেলিভিশনেও আমি দীর্ঘদিন কাজ করছি... নাট্যকার হিসেবে, অভিনেতা হিসেবে, সে কারণে এই মাধ্যমটাকে অল্প বিস্তর একটু বুঝতে চেষ্টা করেছি। সেখানে আমার রচিত, প্রযোজিত নাটকগুলোতে... এপ্রোচটা অন্যরকম থাকে... তার টেকনোলজি অন্য... সব কিছুই অন্যরকম থাকে।... তবে এর একটা ভয়... যে ভয়টা তুমি করছো... সেটা কিন্তু সত্যি... আমার অগ্রপ্রতিম বন্ধু উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যবিদ উৎপল দত্ত... তাকে আমি প্রশ্ন করেছি যে... সারাজীবন তুমি বোম্বে সিনেমার বিরুদ্ধে লিখেছো অথচ তুমি এখন বোম্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম তারকা... এটার কী হবে? এটা কোন দিকে যাচ্ছে? তো উৎপল দত্ত খুব বিব্রত বোধ করতেন এই প্রশ্নের উত্তর দিতে। তারপরেও তিনি একটা কথা বলতেন ‘আমি তো অভিনেতাও, আমি অভিনয় করাবো না? খাবো কী? খুব উত্তেজিত হয়ে বলতেন। কিন্তু শেষ পর্যায়ে উৎপল দত্তের খুব সমস্যা কিন্তু হয়েছিলো। তিনি এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন শেষ জীবনে, তারপরেও তাঁর উদ্দম ছিলো, তিনি মঞ্চনাটক করে গেছেন কিন্তু তাঁর জীবনের একটা দীর্ঘ সময় কেড়ে নিয়েছে বোম্বের সিনেমা। তা না হলে হয়তো তিনি এত তাড়াতাড়ি অসুস্থ হতেন না এবং বাংলা নাটক হয়তো তাঁর কাছ থেকে আরো অনেক কিছু পেতো। এটা কিন্তু সত্যি কথা... তুমি যেটা বলেছো এটা বাস্তবতা... এবং গতকালই আমি আমার কয়েকজন সাথী অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরকে বলেছিলাম যে, ভিডিওতে অভিনয় বা ফিল্মে অভিনয় আমি এখন আর এনজয় করছি না। করছি না একারণে যে, মেকিং যখন করি তখন হয়তো তার মধ্যে ইনভলব থাকি বা যখন লিখি তখন ইনভলব থাকি কিন্তু যখন এমন হয় যে একটি পাঁচ মিনিটের সিকোয়েন্স করার জন্য হয়তো দু’টো দিন নষ্ট হয়ে গেল... এবং এই যে দু’টো দিন নষ্ট হয়ে গেল, এটা আমার এই ৫২ বছরের জীবনে খুব মূল্যবান সময় বলে মনে হয়। এবং তারপরও সেটা যদি অর্থপূর্ণ কিছু না দাঁড়ায়, শুধু কিছু লঘু বিনোদন এবং তার বিনিময়ে অনেক টাকা পেলাম এটাই দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে সেকাজ বোধহয় আমার করা সমীচীন হবে না।... কাজেই আমি নিজেও ঐ সিদ্ধান্তের দিকেই ক্রমাগত অগ্রসর হচ্ছি। ধন্যবাদ।

জনৈক
দর্শক সংকটের কারণে উৎসাহ হারিয়ে কি বর্তমানে মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে যথেষ্ট মান সম্পন্ন নাটকের চর্চা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? এ ক্ষেত্রে পূর্বের তুলনায় দক্ষ নাট্যকারের সংখ্যা বর্তমানে হাতে গোনা। একজন দক্ষ নাট্যকার হিসেবে মামুনুর রশীদ আপনার অভিমত কী?

মামুনুর রশীদ
এটা নিয়ে আমরা সবাই... যারা নাট্যকর্মী... গত কয়েক বছর ধরেই আমরা ভাবছি যে দর্শক সংকট... দর্শক কমে যাচ্ছে। দর্শকের জন্যই তো নাটক করি। এমনও দেখা গেছে যে পঁচিশজন দর্শক... দশজন দর্শক হয়েছে... অভিনেতা হিসেবে সংগঠক হিসেবে... এমনকি নাট্যকার হিসেবেও তো দুঃখ লাগে। তারপরও অভিনয় করি এবং বলি যে দর্শক নেই তো কী আসে যায়... সেটা আমাদের দেখবার বিষয় নয়... কিন্তু আসলেতো আমরা দর্শকের জন্যই নাটক করি, আমরা চাই বিপুল সংখ্যক দর্শক এই নাটকটি দেখুক। কিন্তু আবার অন্য বিষয়গুলোও ভাবতে হবে, দর্শক সংকটের ক্ষেত্রে... আমরা দর্শকতো নষ্টও করেছি। নষ্ট করেছি কীভাবে? নাটকের গুনগতমানের বাইরে অন্য বিষয়গুলোও তো এসে আমাদের ডিসটার্ব করছে। যেমন আমি সরাসরি একটা উদাহরণ দিই... আজকে ‘ওরা কদম আলী’ নাটকের জন্য বা কালকের ‘ইবলিশ’ নাটকের টিকেটের জন্য দর্শকদের এত আকুতি... আর তার আগের দুদিন আমারই রচনা, আমারই নির্দেশনায় যখন ‘রাষ্ট্র বনাম’ নাটক হচ্ছে সেখানেতো টিকেটের ক্রাইসিস ছিলো না... কারণটা এখানে কি এটাই কাজ করে না যে, আরণ্যকে গেলে কয়েকজন ‘স্টার’ দেখা যাবে? আজিজুল হাকিম অভিনয় করবে সেখানে, তমালিকা কর্মকার অভিনয় করবে, তাদেরকে দেখতে পারবো? এই যে বাড়তি জিনিসগুলো... আজকে সিরাজুল ইসলাম স্যারই বলেছেন এই প্রসঙ্গটা যে... এই যে একটার মধ্যে অন্য একটা উপাদান এসে ঢুকে গেল... সেখানে এই কোয়ালিটির যে প্রশ্নটা এসেছে... সত্যিইতে একটা ক্রাইসিস হয়ে যাচ্ছে।... শুধু কোয়ালিটি দিয়ে তো আমি দর্শকের কাছে যেতে পারছি না, মাঝখানে কতগুলো প্রতিবন্ধকতা এসে যাচ্ছে- এইগুলো অতিক্রম করবে কীভাবে? আমাদের এখানে যে নাট্যদর্শক... সত্যিকার অর্থে যে নাট্যদর্শক সৃষ্টি করেছি, সেটা অনেকটা সংবাদের (দৈনিক সংবাদ) সার্কুলেশনের মতো। সেই জন্মের সময় হতে শুনছি তিরিশ হাজার... সেই তিরিশ হাজারের বেশি আর বাড়ে না। ঘটনাটা সেরকম হচ্ছে না? দর্শক বাড়ছে না। আামদের এবং প্রত্যেকের কাউন্টারের অভিজ্ঞতা আছে... ঢাকা শহরে কাউন্টারে এসে জিজ্ঞেস করে নাটকে কে কে আছে ভাই... তাকে আমি নাটকের যথার্থই দর্শক হিসেবে বিবেচনা করবো? অর্থাৎ সে এখানে নাটক দেখতে এসেছে উইদ আউট ইনফরমেশনে... সে রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ মনে হয়েছে যে নাটক দেখবে... কিন্তু আবার এটাও ঠিক... দর্শকের তো কোনো দোষ নেই... তার মনে এসব প্রশ্নগুলো কে জাগালো যে স্টার থাকলে ভালো লাগে?... আমরাই জাগিয়েছি। নাটকের যে কালচারগুলো ঘটছে... আজকে... আমাদের নিজেদের উদাহরণই দিই... আমরা একটা নাটক করলে একই পত্রিকায় ছয়টি রিভিউ বের হচ্ছে, সাতবার ছবি ছাপা হচ্ছে... কিন্তু ঢাকার একটি নতুন নাট্যদল একটি অসাধারণ নাটক করলো অথচ অনুরোধ করে ডেকে এনেও রিভিউ করানো যায় না। আমার মনে পড়ে ‘কোর্ট মার্শাল’ নাটকটি যখন ঢাকায় হলো... এস এম সোলায়মানের নাটকটি যখন প্রথম দেখি, তখন ভাবতাম নাটকের তো রিভিউ লেখা দরকার... এরতো দর্শক হচ্ছে না।... তারপর একদিন আমি আবার নাটকটি দেখলাম, সেদিন দর্শক বোধহয় গোটা চল্লিশেক ছিলো... শেষে আমি নিজেই প্রথম রিভিউটি লিখলাম। রিভিউ লেখার পরে আরো কিছু বন্ধু বান্ধবকে অনুপ্রাণিত করলাম। তারপর দেখা গেল যে প্রতিটি প্রদর্শনী তাদের হাউজফুল হতে লাগলো। এখন প্রশ্নটা হচ্ছে, এই যে কালচারটা... তারপর আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়া তো আছেই... এ সব কিছু মিলিয়ে এখন কিন্তু... একটা সুন্দর কোয়ালিটি সম্পন্ন জিনিসকে দর্শকের কাছে নিয়ে যাওয়া ডিফিকাল্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার এ কথাও সত্যি যে নাটক... আমাদের দল... আমরা সব সময়ই এই স্লোগান দিয়ে থাকি যে ‘নাটক শুধু বিনোদন নয়, নাটক শ্রেণী সংগ্রামের সুতীক্ষ্ম হাতিয়ার’- আমরা বিশ্বাসও করি তাতে।... কিন্তু নাটককে তো ইন্টারেস্টিং-ও হতে হবে, নাটকের মধ্যে সারপ্রাইজও থাকতে হবে... নাটককে ইন্টারেস্টিং করে দর্শকের সামনে তুলে ধরলেও কিন্তু দর্শক আসে। এবং যে কারণে শম্ভু মিত্র সব সময় বলতেন- ভালো নাটক হলে দর্শক হবে, আজ হোক কাল হোক... তিরিশ বছর পরে হোক। যেমন, শম্ভু মিত্র যখন প্রথম ‘রক্তকরবী’ করেন তখন দর্শক কিন্তু হয়নি। কিন্তু সেই নাটক পনের বছর পর যখন আবার করলেন তখন কিন্তু লোকজন আগের রাতে লাইন দিয়ে টিকিট কিনেছে। এবং সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হচ্ছে উনি যখন অভিনয় ছেড়ে দিলেন তখনই সবচেয়ে বেশি দর্শক বেড়ে গেল। উনি একটা... নাট্যকর্মীরা জানেন বোধহয়... একটা ইতিহাসের গল্প বলতেন... একটা গল্প আছে যে... দুধ ফেরি করে বিক্রি করতে হয় বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে আর মদের দোকানে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এ্যাট দ্য সেইম টাইম আমি মনে করি, ভালো নাটক এবং... বিদ্যুতের প্রশ্নের এখানে হয়তো কিছুটা ইয়ে আসবে... সেটা হলো আমাদের সব নাট্যকর্মীদের, নাট্যনেতাদের, দলনেতাদের সবারই কিন্তু একটা ঐকমত্যে পৌঁছানো দরকার। রাজনৈতিক দলগুলো যেমন ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছে না যে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস বন্ধ করবে তারা... কিন্তু আমাদের এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে আমাদের একটা ঐকমত্যে পৌঁছানো দরকার যে, আমরা কোয়ালিটির সাথে কমপ্রোমাইজ করবো না... এবং এই একটি জায়গাকে আমরা সর্বান্তকরণে শিল্প দিয়ে রক্ষা করবো। আমাদের কমিটমেন্ট দিয়ে রক্ষা করবো, আমাদের অঙ্গীকার দিয়ে রক্ষা করবো... তাহলে দর্শক আসবে।

দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তর দেয়া দরকার... দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তর হচ্ছে যে নাট্যকারের যে সংকট... এটা সত্যি কথা যে, নাট্যকারতো ম্যানুফেকচার করা যাবে না, তৈরি কারা যাবে না। আমি বলতে পারি বাংলাদেশে দুই কোটি অভিনেতা আছে এবং কম করে হলেও পঞ্চাশ লক্ষ নাট্যকার আছে... আমার কাছে সিরাজগঞ্জ থেকে, টাঙ্গাইল থেকে বরিশাল থেকে অসংখ্য নাটকের পা-ুলিপি পাঠায়... মঞ্চনাটকের পা-ুলিপি... তারাও নাট্যকার বটে, তারাও নাটক লেখেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে... জীবনানন্দের ভাষায়, ‘সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি’- তো এখন ব্যাপার হচ্ছে যে, নাটক লেখা হচ্ছে না এটা ঠিক নয়... অভিনেতা তো দুই কোটি আছে প্রতিদিন কত অভিনেতা এই ঢাকা শহরে স্যাটেলাইটের বিভিন্ন চ্যানেলে অভিনয় করতে আসছে, মঞ্চে অভিনয় করতে আসেছে... প্রচুর আসছে টিকছে ক’জন? এখন দক্ষতা দিয়ে নাট্যকার হিসেবে টিকে থাকা, এটা একটা লং স্ট্রাগলের ব্যাপার। সেই স্ট্রাগলের পথে যারা থাকবেন তারা টিকবেন আর যারা থাকতে পারবেন না তারা ছিটকে পড়ে যাবেন।... এটা একটা পারসোনাল স্ট্রাগলের ব্যাপার।... তো সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় জোর করে কোনো কিছু করার উপায় নেই, সাংগঠনিক কোনো প্রক্রিয়াও নেই, যে প্রক্রিয়ায় নাট্যকার নির্মাণ করা সম্ভব। ধন্যবাদ।

আসাদ উদ্দিন
আমি সিরাজগঞ্জের তরুণ সম্প্রদায়ের নাট্যকর্মী। আমার প্রশ্ন- মামুনভাইয়ের ‘ওরা কদম আলী’, ‘ওরা আছে বলেই’, ‘ইবলিশ’ নাটকের যে বক্তব্য, সরাসরি মেহনতি মানুষের মনে যে আশার আলো, আশার সাড়া জাগিয়েছে- পাশাপাশি মামুনভাইয়ের ‘পাথর’ নাটকে যে একটা সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান এবং পাশাপাশি প্রতিবাদী যে যুবকরা, গৌতমরা, তাদের যে হতাশা... এই নাটকেও, আমি আগের যে নাটকের নাম বললাম তার সঙ্গে এই নাটকের অনেক ফারাক... তো এই নাটকে আপনি... মানে- এমন কেন করলেন? যারা আশার আলো দেখে... আমার মনে হয় এই নাটক পড়ে অনেকে হতাশ হয়েছে।... তো কেন করলেন? এটিই আমার প্রশ্ন।

মামুনুর রশীদ
প্রত্যেকটা প্রশ্নই দারুন হচ্ছে... উত্তরগুলো হয়তো সে তুলনায় ততটা ভালো হচ্ছে না। আজকেই সাজেদুল আউয়াল আমাকে বলছিল যে, আপনার নাটকে পরাজয় থাকে, আবার জেগে ওঠাও থাকে। ‘পাথর’ নাটকটি যে সময়ে লেখা সে সময়ে কিন্তু সত্যিই একটা সংকটের মধ্যে ছিলাম আমরা... বাবড়ি মসজিদ ভেঙেছে, ঢাকায় দাঙ্গা হচ্ছে... কলকাতায় কারফিউ, উত্তর প্রদেশে দাঙ্গা হচ্ছে... বিহারে রায়ট হচ্ছে- এ রকম একটা পরিস্থিতি। বইটি যদি পড় তুমি, দেখবে যে, বইটি আমি উৎসর্গ করেছি আমার এক বন্ধুকে, তার নাম ঠাকুর দাস।... মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন আমরা রণাঙ্গনে... একদিন আর্মি আমাদের এ্যাটাক করলো। তখন আমরা রিট্রিট করতে বাধ্য হলাম... ভোর বেলা এ্যাটাক করলো, সূর্য ওঠার সময়... আমরা প্রস্তুত ছিলাম না... ঘুমাচ্ছিলাম সবাই... সারারাতের ক্লান্তির পরে ঘুমাচ্ছিলাম আমরা... তো রিট্রিট করতে বাধ্য হলাম... সারাদিন যুদ্ধ চললো... যুদ্ধ শেষে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে যখন আমরা বাড়ি ফিরেছি, আমার মামা বাড়িতে... বাড়ি ফেরার পর আমি এবং আমরা হিন্দু বন্ধু ঠাকুর দাস... আমরা খুব ক্লান্ত... ভাত খেয়েছি... ডালভাত খেয়ে শুয়েছি... হঠাৎ ঠাকুর দাস বলে উঠলো ‘বন্ধু ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হইছি, এত কিছুর পরেও কি আমরা এই দেশে থাকতে পারুম?’ আমি খুব উত্তেজিত হয়ে গেলাম- ‘ব্যাটা তুই কসকি? আমরা মুক্তিযুদ্ধ করতেছি... সারাদিন যুদ্ধ করে আসলাম... আর এখন কী কইতেছিস যে আমরা কি এই দেশে থাকতে পারুম? একটা অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার জন্য যুদ্ধ করতেছি ব্যাটা, তুই এইটা কী কস?’ তখন ও বললো- ‘তারপরেও বন্ধু বুকটা কাঁপে, মনে হয় এই দেশে থাকতে পারুম না।’... বাস্তবতা হচ্ছে সেই ঠাকুর দাস কিন্তু গৃহহীন হয়েছে... সেই ঠাকুর দাস দেশান্তরী হয়েছে এবং ঠাকুর দাসের সর্বশেষ পরিণতি হচ্ছে সে বিজেপি-কে ভোট দেয় এবং শিবসেনা হয়েছে।... ৭২ সাল থেকে ২ হাজার সাল... আটাশ বছরের ব্যবধানে দেখো, এই ঠাকুর দাসের পরিণতিটা... বাস্তব পরিণতিটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো! বাস্তবতা আমরা নাটকে অস্বীকার করতে পারি না।... ‘ওরা আছে বলেই’ তে একেবারে... নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম... তারপর ‘ইবলিশে’... গ্রামে পুলিশ যায়... কয়দিন থাকবো পুলিশ... আমরা জিতেছি... ভাগো ভাগো, গান গেয়ে শেষ করে দিলাম। মানুষ বিজয়ের আনন্দ নিয়ে ফিরে গেল। কিন্তু মানুষকে তো ভাবাতেও হবে... আজকে ভারতবর্ষে বিজেপি ক্ষমতায় আসে কী করে... আজকে সিলেটে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জাহানারা ইমামের নামে একটি হল হলে রাষ্ট্র... স্বয়ং রাষ্ট্রপতি সেটা স্থগিত করার নির্দেশ দেন... জাস্টিস শাহাবুদ্দীনের মতো এই  রকম একজন ... ত্যাড়া (ভালো অর্থে), অনেস্ট রাষ্ট্রপতি কী করে স্থগিত করার কথা বলেন? একটা ঘটনা ঘটেছে সেটাকে তুমি কীভাবে অস্বীকার করতে পারো? এটাতো আমােেদর দায়িত্বও বটে যে, মানুষকে একটা... যেমন আবুল হাসিম সাহেব বলতেন যে, গাধাকে যেমন পানির সামনে নিয়ে যায় তার ছায়া দেখানোর জন্য... জাতিকে মাঝে মাঝে এরকম দপর্ণের সামনে দাঁড় করাতে হয়।... আমি জানি না... নাটক যখন লিখেছি তখন ভাবিনি... আজকে তোমার প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে হয়তো মনে পড়লো যে এই বাস্তাবতা, যেখানে একটা পাথরকে কেন্দ্র করে একটা মাজার গড়ে উঠছে। একটা ভ-, একটা অর্থহীন নিছক তুচ্ছ জিনিকে নিয়ে যে জায়গাটায় দাঁড় করানো হলো... আমার কেন যেন মনে হয়েছিলো... এখনো মনে হয়... এই যে উত্থানটা হলো, এই উত্থানতো সর্বব্যাপী... এই উত্থানকে কমানো দরকার।... এখন এটা আমার মনে হয় দর্শক যদি এটাকে অন্যভাবে ইন্টারপ্রেট করে থাকেন তাহলে সেটা আমাদের ব্যর্থতা অথবা প্রযোজনার ব্যর্থতা- যেকোনো ব্যর্থতা হতে পারে।... আর যেটা বলেছো যে... ‘ওরা আছে বলেই’, ‘ওরা কদম আলী’, ‘ইবলিশ’, সেই আশির দশকের শুরুতে... তখন আমাদের স্বপ্ন, আমাদের ভাবনা... আমরা তখন একটা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করছি... এবং আমাদের সামনে অনেক পজেটিভ ব্যাপারগুলো এসে ভীড় করেছিলো, যেখান থেকে আমরা একটা আন্দোলনের শক্তি, একটা সংগ্রামের শক্তি আহরণ করেছি। তখন মানুষকে একটা প্রতিরোধের চেতনায়, তখন মানুষকে একটা সংগ্রামের চেতায় উদ্ধুদ্ধ করার নিদারুণ প্রয়োজনও ছিলো। কিন্তু যখন আমরা... আমদের বেশ কিছু আশা ভেঙে গেল নব্বুইয়ের দশকে এসে... অনেক স্বপ্ন খান খান হয় গেল। তখন নাটকেরতো একটা মোড় নেবে, নাটকের ভাবনাগুলো চেইঞ্জ হবে... তবে সেটা যদি হতাশার দিকে যায় তাহলে খুবই দুঃখজনক। আবার ধরো আজকে... আজকেতো আমরা অনেক ধরনের সংকটে পড়ছি। এখন চিন্তা করো মৌলবাদ সাম্প্রদায়িকতা যেকোনো সরকারের জন্য লাভজনক, কারণ মানুষের যে নিত্য প্রয়োজনীয় ক্রাইসিসগুলো... সেগুলো ঢাকা যায়। এ কারণে এটাকে চালু রাখাও কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর একটা প্রধান কাজ এবং চালু থাকবে।... এখন আজকের দিনে কী নিয়ে নাটক করাবো? কোন সংকটটা আমাদের সামনে আসবে? নাটক লেখার সংকটও কিন্তু এখন অনেক বেড়ে গেছে।

মলয় ভৌমিক
সংস্কৃতিকর্মী এবং সুধীমণ্ডলী আমরা যে মুখোমুখি অনুষ্ঠানে বসেছি... অনেক প্রশ্ন আসছে এবং আমরা মনে হয় আলোচনাটা বেশ জমে উঠেছে... শুধু তাই নয় আমরা এই আলোচনা থেকে বেশ লাভবান হচ্ছি। মামুনভাই অবশ্য একটু আগে বিনয়ের সঙ্গে বলছিলেন- প্রশ্নগুলো সুন্দর হচ্ছে, উত্তরগুলো ততটা সুন্দর হচ্ছে না... আমার মনে হয় কথাটি ঠিক নয়... উত্তরগুলো আকর্ষণীয় বলেই বোধহয় প্রশ্নগুলো আসছে। তবুও আমাদের সবাইকে একটা ব্যাপার লক্ষ্য রাখতে হবে যে, আজকে এই মুখোমুখি অনুষ্ঠানের পর উৎসবের সর্বশেষ আয়োজন মামুনভাইয়ের সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাটক ‘ওরা কদম আলী’র প্রদর্শনী রয়েছে। সুতরাং আমি অনুরোধ করবো যাঁরা প্রশ্ন করবেন তারা যেন একাধিক প্রশ্ন না করেন। আমার মনে হয়, সকলের সবগুলো প্রশ্নের মধ্যেই উত্তরগুলো এসে যাবে। সঞ্চালক হিসেবে আমি মামুনভাইকে অনুরোধ করবো উত্তরও সংক্ষিপ্তাকারে দেয়ার জন্য।

মাহমুদুজ্জামান বাবু
আমি নাট্যকর্মী নই সরাসরি, আমি গান করি। কখনো কখনো মঞ্চনাটকের উপর ছোট ছোট আলোচনাগুলো লিখি পত্রিকায়- মামুনুর রশীদের নাট্য উৎসব... গত ক’দিন ধরেই পুরো আয়োজনটি দেখছি... এখানে থাকতে থাকতেই কয়েকটি প্রশ্ন আমার জমা হয়েছে।... কয়েকটি প্রশ্ন থেকে একটি প্রশ্ন আমি মামুনভাইকে করবো... সেটি হচ্ছে মলয় ভৌমিকের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে মামুনভাই বলছিলেন একটি জায়গায় যে, মঞ্চনাটকের গ-ীবদ্ধতার বিষয়ে। তারপরে বলতে বলতেই একসময় বলছিলেন নাটক এবং নাট্যকারকে সব সময় সমসাময়িক হয়ে উঠতে হয়।... আমাদের চারপাশে এই সাম্প্রতিক সময়গুলোতে যদি আমরা দেখি সমসাময়িক অনেকগুলো স্পর্শকাতর ঘটনা আছে সমাজে।... আমি চারটি ঘটনা উল্লেখ করবো... ৯৫ সালে পুলিশি নৃশংসতায় নিহত ও ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হয়েছিলো ইয়াসমিনের। ৯৭ সালে সীমা চৌধুরী নিরাপত্তা হেফাজতে... আপনারা জানেন যে সেইফ কাস্টডি বলে আমাদের একটি জায়গা আছে... নিরাপদ হেফাজত, সেই নিরাপদ হেফাজতে সীমা চৌধুরী ‘নিরাপদে’ ধর্ষিত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছিলো। ৯৫ সালের অনেক আগে মাহবুব নামের এক বেকার যুবক প্লেনের চাকার ভিতরে... প্লেনের চাকার গহ্বরে ঢুকে বিদেশ পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন, বেকারত্বের যন্ত্রণায় এবং পরবর্তী সময়ে তার লাশ ফেরত এসেছিলো বাবা মার কাছে... তারপর একই ঘটনা ঘটেছিলো জুনায়েদের বেলায়... বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে বেকারত্বের কারণেই জুনায়েদ আত্মাহুতি দিয়েছিলেন বলা যায়- সমসাময়িক এই ঘটনাগুলো আমি যতগুলো মঞ্চনাটক দেখেছি... কোনো নাটকে এই অমানবিক এবং নিরুপায় আত্মবলিদান বা আত্মাহুতির কাহিনীগুলো আসেনি।... আমার প্রশ্নটা হচ্ছে সমসাময়িক এই বিষয়গুলো নাটকের ক্ষেত্রে আসেনি কেন?

মামুনুন রশীদ
একটা বিষয়তো বোধহয়... বাবু যেহেতু সংস্কৃতিকর্মী... বোঝেন যে সাংবাদিকতা এবং মিডিয়ার ভূমিকা আর নাটকের ভূমিকা, এর মধ্যে একটা পার্থক্য আছে... একটা হচ্ছে প্রতিদিন আমাদের এই বাংলাদেশে ধর্ষণ হচ্ছে, খুন হচ্ছে, বেকারত্বের অভিশাপে মানুষ আত্মহত্যা করছে... আমার মনে হয় এটা প্রতিদিনের ঘটনা... যে কোনো ঘটনা খবরের কাগজ বা মিডিয়াতে আসে, কোনো কোনো ঘটনা আসে না... সমকালীনতা, সমসাময়িকতা এবং সময়োপযোগিতা এ সব কিছুই আমাদের জীবনকে স্পর্শ করে যায়... কিন্তু একজন লেখকের কাছে, একজন প্রযোজকের কাছে বা একজন শিল্পীর কাছে, একজন শিল্পকর্মীর কাছে কোন বিষয়টি কখন অসাধারণ হয়ে দেখা দেবে সেটা কিন্তু একটা বড় ব্যাপার, বড় প্রশ্ন... আমি এই প্রশ্নগুলোকে কোনো অবস্থাতেই... যে সংকটগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন... সেগুলোকে আমি এড়াতে চাই না... কিন্তু আমি একথাও মানতে রাজি নই যে, এ বিষয়গুলো নাটকে, আমাদের নাটকে আসেনি। সরাসরি হয়তো আসেননি কিন্তু পরোক্ষভাবে শৈল্পিক বাস্তবতার ভিত্তিতে এগুলো এসেছে বলে আমার ধারণা। যেমন আমার পাশেই তারিক আনাম বসে আছেন... তারিক আনামের ‘ক্রুসিবল’ নাটকটি যদি দেখে থাকেন... কতদিন আগের ঘটনা... নাটকটি আমি যখন দেখেছি... নাটকটিতো অনুবাদই করেছো- তাই না? (তারিক আনাম মাথা নাড়িয়ে জানায় নাটকটি অনুবাদই করেছে) কিন্তু আমার মনে হলো আমি যেন কর্নেল তাহেরকে দেখছি... আমি যেন ক্ষুদিরামকে দেখছি... কতবছরের ব্যবধান... তার পটভুমি আলাদা... এখন প্রশ্ন হলো এগুলোকে নিয়ে আবার সমসাময়িক নাটকও হতে পারতো... একদম সমকালীন বিষয় নিয়েও নাটক হতে পারতো... কিন্তু এটা একজন শিল্পীকে কী প্রক্রিয়ায়, কীভাবে আলোড়িত করে এবং তা যদি শৈল্পীক মাত্রা পায় তবে অবশ্যই সে নাটক আসবে এবং কখনো কখনো কোনো নাটকের জন্যতো অপেক্ষাও করতে হয়। আমি নিজেই তো মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পঁচিশ বছর পরে ‘জয়জয়ন্তী’ নাটক লিখেছি।... অথচ জীবন্ত মুক্তিযুদ্ধেইতো আমি উপস্থিত ছিলাম। কাজেই এই ঘটনাগুলোও হয়তো কোনো একসময় আসবে। যেমন সাম্প্রতিককালে পত্র পত্রিকায় খুব আলোড়ন সৃষ্টি করেছে যে, দুই ভাইয়ের মধ্যে বাপ একজনের লেখাপড়ার খরচ দেবে আর একজনের দিতে পাবে না। এক ভাই আত্মহত্যা করল... অত্যন্ত নাটকীয় ঘটনা... কিন্তু এটা নিয়ে এই মুহূর্তেই কেউ নাটক লিখছে না... কিন্তু আজ থেকে দশবছর পরে কোনো নাট্যকার যে এটা নিয়ে লিখবেন না এটাতো বলা চলে না... হয়তো সেদিনই এটা একটা শৈল্পিক মাত্রা পাবে।

এম. এ. সবুর
আমি নাট্যকর্মী, মাঝে মধ্যে নাটকের উপর পত্র-পত্রিকায় লিখে থাকি। আর নাটক লেখার চেষ্টা করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের যে লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিলো সেটা হচ্ছে... নাটকের মাধ্যমে সমাজ বদলের কথাগুলো মানুষের কাছে বলবো... কিন্তু আজকে সে লক্ষ্যে মনে হয় গ্রুপ থিয়েটার সেভাবে নেই, সে জায়গাতেও নেই... যে উত্তরটি আমি চাইবো- আশির দশকে আপনি মুক্তনাটকের যে চর্চাটি শুরু করেছিলেন বাংলাদেশে... আজকে গ্রাম থিয়েটার হাঁটি হাঁটি পা পা করে অনেকদূর এগিয়ে গেছে... আমার মনে হয় শুধু গ্রাম থিয়েটার কেন, মুক্তনাটকও এর পাশাপাশি এগিয়ে যেতে পারে এবং সে কাজটি কেন বন্ধ হয়ে আছে এবং কিভাবে করা দরকার, সেটা কিভাবে করা যেতে পারে, এই দু’টো প্রশ্ন আপনার কাছে সবিনয়ে...

মামুনুর রশীদ
প্রশ্নটি খুব প্রাসঙ্গিক।... সেটা হচ্ছে মুক্তনাটক বা গ্রাম থিয়েটার যেভাবে আমরা শুরু করেছিলাম সেই আশির দশকে, সেই উত্তাল অবস্থা... সেই উত্তাল অবস্থা এখন নেই কেন? এটা খুবই জরুরি একটা প্রশ্ন। মুক্তনাটক, গ্রাম থিয়েটার যেটাই আমরা করি না কেন... ওদের গ্রাম থিয়েটারের ভাবনাটি অন্যরকম... আমাদেরটা ছিলো একেবারেই আমাদের... এর মধ্যে রাজনৈতিক থিয়েটারের ভাবনাটি সরাসরি জড়িত ছিলো।... আমরা গ্রামের মানুষের শোষণ বঞ্চনা এগুলো নিয়ে নাটক করতাম গ্রামে গিয়ে এবং আমরা সেখানে গিয়ে থাকতাম দশদিন আটদিন পাঁচদিন... কিন্তু আমরা যখন ঐ এলাকা থেকে চলে আসতাম তখন দেখা যেত মুক্তনাটকে যারা অংশ নিয়েছে তাদের উপর প্রচ- নিপীড়ন হতো এবং সেই নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আমরা কোনো রাজনৈতিক শক্তির সাহায্য পাইনি... এবং সারা দেশে বিভিন্ন জায়গায় নাটক করতে গিয়ে আমরা খুঁজেছি সেখানে আমাদের মতো ভাবনা করে এরকম লোককে পাওয়া যায় কিনা... যে বা যারা এই দুঃখী মানুষগুলোর সংকটে এগিয়ে আসতে পারে... তারপরেও আমরা আমাদের নিজস্ব শক্তি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সংগঠন গড়ে তুলেছিলাম এবং তারা নিজেরাই এ সংকটগুলোকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতো... তারপরে দেখা গেল, পরবর্তীকালে, নব্বুইয়ের দশকে... আশির দশকে কিন্তু আমরা একটানা কাজ করেছি... নব্বুইয়ের দশকে আসার পর দেখা গেল যে আমাদের কর্মী সংখ্যা কমতে শুরু করেছে।... তার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে যে, আমাদের অত্যন্ত ভালো ভালো কর্মীগুলোকে উচ্চ বেতন দিয়ে, বিশেষ করে গণসাহায্য সংস্থা, প্রশিকা এবং বিভিন্ন সংগঠন কিনে নিচ্ছে। এবং সেসব কর্মীগুলোকে আমরা ধরে রাখতে পারলাম না। এবং সেসব কর্মী যাঁরা একসময় মুক্তনাটকের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন তাঁরা চলে গেলেন অনেকেই... সবাই নয়... অনেকেই চলে গেলেন এই এনজিও কার্যক্রমের সঙ্গে। এখন হয়েছে কি, এনজিওগুলো আর সেই পপুলার থিয়েটারের কনসেপ্টও নাকি বিশ্বাস করে না.... অনেকগুলো ভেঙে গেছে... এখন কিন্তু তারা বেকার। এবং বেকার হওয়ার পরে... যে অর্থনৈতিক জীবনের স্বাদ তারা পেয়েছে তারা কি আবার সেই মুক্তনাটকের কাজে আসবে? আসলে আমরা খুশি হবো। যেমন তোমাকে একটা উদাহরণ দিই... টাঙ্গাইলের অদূরে একটা গ্রাম আছে, ঐ গ্রামে অসাধারণ প্রতিভাবান সঙ... মানে সঙ এর দল ছিলো... এবং তারা ইন্সট্যান্টলি চমৎকার নাটক তৈরি করতে পারতো... হয়ত ডিসি সাহেব কীভাবে রিলিফের টাকাটা মারছেন... সঙ্গে সঙ্গে দড়ি দিয়ে টাই বানালো... পাতা দিয়ে চশমা বানালো... এরকম খুব ইন্টারেস্টিংভাবে গানের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারতো।... গণসাহায্য সংস্থা তাদেরকে পয়সা দেয়া শুরু করলো... প্রচুর পরিমানে... এখন গণসাহায্য সংস্থা নেই... এখন তারা পয়সাও পাচ্ছে না... আবার এখন পয়সা ছাড়া এ সমস্ত কাজে তারা আসতেও পারছে না... মাঝখান থেকে আমরা একটি মাধ্যমকে ধ্বংস হতে দেখলাম।... যাই হোক, তারপরেও আমাদের মুক্তনাটক দল বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এখনও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। চাটমোহর, মাগুড়া, কানসোনা, ফরিদপুর, দেওন্দি চা বাগান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে... বিভিন্ন জায়গায় এই কাজগুলো তারা করছে... কিন্তু এই কথাও আমি স্বীকার করে নিচ্ছি যে, আমাদেরও কিন্তু এক্ষেত্রে একটু অনীহা আছে- এটা অস্বীকার করলে চলবে না... তবে আমরা আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছি। ধন্যবাদ।

দেওয়ান মাকসুদ
আমি একজন সংস্কৃতিককর্মী। সভাপতির মাধ্যমে আমার প্রশ্ন মামুনভাইয়ের কাছে... সামাজিক দ্বান্দ্বিকতাকে স্বীকার করে আপনি মঞ্চে ‘ওরা কদম আলী’কে যেভাবে নিয়ে এসেছিলেন আশির দশকের প্রথম দিকে... এখন দ্বন্দ্বটা বিদ্যমান কিনা এবং তার প্রেক্ষাপটে ‘ওরা কদম আলী’র এই মুহূর্তের প্রয়োজন আছে কিনা... থাকলে কীভাবে এটাকে এই সামাজিকভাবে মৌলবাদী উত্থানের সময়ে... মঞ্চসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করবেন?

মামুনুর রশীদ
এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য আমি ভিন্নভাবে দিয়েছি... তবুও আবার দেয়ার চেষ্টা করবো... অবশ্যই আছে... ‘ওরা কদম আলী’তে যে সামাজিক দ্বন্দ্বগুলো ছিলো, আমি মনে করি এগুলো বর্তমান সমাজেও বিদ্যমান... তার সঙ্গে আপনি যে যুক্ত করলেন মৌলবাদ... আমি একটু আগে বলেছি যে... সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, এগুলো কিন্তু শাসক গোষ্ঠী তৈরি করে... এবং তৈরি করার যে সুফলটা তারা পায় সেটা হচ্ছে, এগুলো তৈরি করার ফলে সমাজে বিদ্যমান আমাদের যে বাঁচা-মরার লড়াইগুলো আছে, অন্ন-বস্ত্রের লড়াইগুলো আছে... এই সংকটগুলো কিন্তু ধামাচাপা পড়ে যায়... সেকারণেই আমি একটু আগেই বলেছি যে, এটা একটা সত্যিই সংকট যে, আমরা কি আজকের দিনে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সংকট চলছে সেই সংকটকে এড়াতে পারবো? নাকি আজকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়... বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায়, যেখানে মানুষ বাঁচা মরার জন্য লড়াই করছে, সেই লড়াইটাকেও... বা সেই লড়াইটাই আমাদের নাটকের উপজীব্য হবে... এটা কিন্তু একটা সংকট... যেমন অতি সম্প্রতি... আপনারা বোধহয় সেলিম আল দীনের ‘বনপাংশুল’ নাটকটি দেখেছেন... আমাদের একটি জনপদ অস্তিত্বহীন হয়ে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে এই নাটক। আমি মঞ্চে নয়... টেলিভিশনে সুন্দরবন লোপাট হওয়ার ব্যাপারটা... কেন লোপট হচ্ছে, কার কারণে লোপাট হচ্ছে... এটা আমি একভাবে ব্যাখ্যা করেছি। সেলিম আল দীন তার মতো করে একভাবে মঞ্চে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন... এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিষয়গুলো মুখ্য বিষয় হবে আজকের নাটকে? নাকি মৌলবাদ সাম্প্রদায়িকতার বিষয়গুলো মুখ্য বিষয় হবে? আমি মনে করি সাম্প্রদায়িকতা শাসক গোষ্ঠীর সফল ষড়যন্ত্রের অংশীদার... আমি ‘ইবলিশ’ নাটকে যে গ্রামীণ সামাজিক কাঠামোটা নিয়েছি সেটা কিন্তু একেবারে উপরি স্ট্রাকচার... একজন জোতদার- এরা মিলেই লাঠিয়াল বাহিনীকে পোষে, সেনাবাহিনীকে পোষে, সেনাবাহিনীকে কখনো লেলিয়ে দেয়, কখনো সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করে, কখনো ধর্মকে ব্যবহার করে।... এখন ধরা যাক দেশের সকল প্রগতিশীল শক্তি, দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তি যদি সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে আগামী ছয় মাস ব্যস্ত থাকে- এই ছয় মাস সরকার কিন্তু খুব স্বস্তিতে থাকবে।... এখন এগুলোর বিনাশের কারণে... আমরা তো এই ধরনের ছোট ছোট টপিক নিয়ে নাটক লিখতে পারবো না... এগুলোর বিনাশের কারণে যে সকল প্রগতিশীল মানুষ... সচেতন মানুষ, লড়াই করছে... সেই মানুষের পাশে আমাদের নাটক ছোট্ট একটা ভূমিকা পালন করতে পারে কি?- আর যদি পারে তবে কোন বিষয়টি সেখানে অগ্রাধিকার পাবে- সেটি কিন্তু শিল্পীর নিজস্ব নির্বাচনের বিষয়। কোন ঘটনাটি তার কাছে অসাধারণভাবে ধরা দেয় সেটি কিন্তু তার নিজস্ব ব্যাপার।

আহসান হাবীব নাসিম
আমি সুবচন নাট্য সংসদের সদস্য। মামুনভাই, আপনাকে আমরা চারভাবে চিনি। নাট্যকার, অভিনেতা, নির্দেশক এবং সংগঠক... এই চারটি বিষয়েই আপনি সফল হয়েছেন। তো নাটক যখন লেখেন তখন নির্দেশনা বা অভিনয়ের ভাবনাগুলো আগেই আসে কি না? আর দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে- আপনি নির্দেশক এবং অভিনেতা হিসেবে নাট্যকার মামুনুর রশীদের মুখোমুখি হন কিভাবে?

মামুনুর রশীদ
খুবই ভালো প্রশ্ন... আবারো প্রশ্ন উত্তরের চেয়ে ভালো হয়ে যাচ্ছে.. হাঃ হাঃ হাঃ...  না, যখন আমি নাটক লিখি একেবারেই অন্য বিষয়গুলো নিয়ে ভাবি না... কারণ আমি ধরে নিই যে, এ নাটকটির আর কোনো কাজ করবো না... এই লেখার কাজ দিয়েই আমার কাজ শেষ... যদি ঘটনাক্রমে সেই নাটকের  নির্দেশনা আমাকে দিতে হয়... অনেক সময়তো আমরা নির্দেশক খুঁজে বেড়াই... এই যে তারিক আনাম আছে... ওঁর কাছে গিয়েছিলাম একটা নাটক নিয়ে যে, এটার নির্দেশনা দাও... আমাদের মান্নান হীরার একটা নাটক নিয়ে গিয়েছি... বা ধরো আমরা নাসির উদ্দীন ইউসুফকে বলি যে, একটা নাটক কর না... তো যখন হয় না... নির্দেশনা আমাকেই দিতে হচ্ছে... তখন আমি নাট্যকারকে ইগনোর করতে থাকি, নাট্যকার যেটা লিখেছে এটাকে রিজেক্ট করতে থাকি।... রিজেক্ট করে আমি আমার ডিরেক্টরিয়াল স্ক্রিপ্ট... এবং সেই ডিজাইন তৈরি করার সময়ই কিন্তু আমার সাথে ডিজাইনাররা যুক্ত হয়... এবং ডিজাইনাররা যখন যুক্ত হয়, পরবর্তীকালে... একেকজন একেক প্রসেসে কাজ করে... আমিও একেক নাটকে একেক প্রক্রিয়ায় কাজ করে থকি... যদি ঘটনাক্রমে সেখানে আমাকে অভিনয় করতে হয়... যেমন ‘জয়জয়ন্তী’ তে আমি অভিনয় করিনি... আবার ‘ইবলিশ’-এ আমি অভিনয় করেছি... এরকম ঘটনা ঘটে... যখন অভিনেতা হিসেবে আমি অভিনয় করতে যাই তখন ঐ নাট্যকার যে চরিত্রটি নির্মাণ করেছে সেই চরিত্রটি এবং ডিরেক্টর যেভাবে ডিজাইন করেছে... এই দু’টোর সাথে কিন্তু আবার একটা দ্বন্দ্ব হয়... উভয় সংকটের মধ্যে পড়ে যাই... চরিত্র খুঁজে পাই না, ক্যারেক্টর তৈরি করতে পারি না... ক্যারেক্টরের ছায়াই দেখি... একভাবে দেখেছিলাম নাট্যকার হিসেবে... আরেকভাবে দেখেছিলাম নির্দেশক হিসেবে। এখন টোটাল একটা কনফিউশনের মধ্যে পড়ে যাই... এবং এই কনফিউশনের প্রক্রিয়াতে আস্তে আস্তে টোটাল জিনিসটা... এটাও একটা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া... এবং এই দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় জিনিসটা এগোতে থাকে। আবার আমাদের মতো দেশে মহাসংকট হচ্ছে সংগঠন... মানে সাংগঠনিক কাজও করতে হয় আমাদের... নাটকের জন্য টাকা জোগাড়ের কথাও ভাবতে হয় আমাদের... পরশুদিন থেকেই সেট বানানো শুরু করতে হবে... টাকা লাগবে, টাকা নেই... আমার মনে হয় কোনো নাট্যদলই সেরকম সমৃদ্ধ না যে, ব্যাংক বোঝাই টাকা... ইচ্ছে করলেই কাজ শুরু করা যায়... তো টাকা জোগাড় করা, হল ভাড়া জোগাড় করা কিন্তু আমাদের মতো দলের সংকট... আমি জানি না তারিক আনাম... পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় ওরা এখানে আছে... ওদেরও এই সংকট হয় কি না... হাঃ হাঃ হাঃ অবশ্যই ... সবারই এই সংকট হয়... কাজেই আর্থিক সংকটের কথা ভাবতে হয় এবং সেই আর্থিক সংকটের কথা ভাবতে গিয়ে কখনো যে আপোষ করি না- এ কথাও বলা যায় না। যেমন কয় ঠেলা লাগবে সেট আনা-নেয়া করতে... এক ঠেলা কমানো যায় কিনা... একটা পার্টস বাদ দাও না...এটা কাপড় দিয়ে করো, তাহলে জায়গা কম লাগবে... মানে কাঠের বদলে কাপড় দিয়ে কর... এই বিকল্পগুলো নিয়ে ভাবতে থাকি।... এবং এই সেটটা রাখবো কোথায়... সেট রাখা একটা বিরাট সংকট... এটার প্রিজারভেশন হবে কি করে, এটা মেইনটেনেন্স করা যাবে কি না- এই প্রশ্নগুলো কিন্তু নির্দেশনা দেয়ার সময় মাথার মধ্যে আসতে থাকে।... কাজেই আমাদের দেশে... আমরা যারা নাটক করি... সাংগঠনিক কাজও যাদের করতে হয়, তারা যে কত ধরনের বিচিত্র সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে... তারপরেও যদি দর্শকের কাছে সেই নাটক ভালো লাগে... আমাদের একটু আত্মসন্তুষ্টির ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

সোনিয়া জাহান
আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী। মুক্তনাটকের উপর একটা প্রবন্ধে আপনি লিখেছিলেন বাংলা নাটকের ইতিহাস অনেকদিনের পুরনো... বাংলা নাটক হাজার বছরের পুরনো... কিন্তু উনিশ শ’ পঁচানব্বুই সনে আবার দেখতে পাই... আপনি... ‘লেবেদেক’ নামে একটি নাটকের প্রদর্শনী করেছেন, সেখানে লিখেছেন বাংলা নাটকের দুশ’ বছর... এক্ষেত্রে একটা কন্ট্রাডিকশন দেখতে পাচ্ছি আমরা... একজায়গায় বলছেন বাংলা নাটকের দু’শো বছর আবার আরেকটা প্রবন্ধে লিখছেন বাংলা নাটক হাজার বছরে ইতিহাস- সেক্ষেত্রে কোনটা আমরা মেনে নেবো... একটু বিশ্লেষণটা জানতে চাচ্ছি।
 
মামুনুর রশীদ
হ্যাঁ... একটা হচ্ছে বাংলা নাটক, আর একটা বাংলা নাট্যের ইতিহাস... আমার মনে হয় যে, শব্দটা যদি আপনার মনে থাকে, বাংলা নাট্যের ইতিহাস... বাংলা নাট্য যেটাকে আমরা বলি সেটা হচ্ছে দীর্ঘদিনের ইতিহাস সমৃদ্ধ... এবং সেই নাট্যের মধ্যে... যদি লেখাটি আপনার মনে থাকে... সেখানে আমি কথক ঠাকুরের পাঁচালি, কবিগান, জারীগান বিভিন্ন নাট্য আঙ্গিককে কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত করেছি। কিন্তু বাংলা মঞ্চনাটক যেটাকে বলছি... ইউরোপীয় ধাঁচের যে মঞ্চনাটক... তার ইতিহাস আমরা দু’শো বছরের বলেছি... কারণ এটা ইতিহাস প্রমাণিত, ইতিহাস সিদ্ধ।... একটা ছোট্ট ঘটনা যদিও, সেটা হলো... গেরাসিম লেবেদেফ ১৭৯৫ সালে দু’টি অনুবাদ নাটক দিয়ে... মানে অনুবাদ নাটক দিয়ে তিনি বাংলায় মঞ্চনাটক অভিনয় করিয়েছিলেন... তার মাত্র একটি প্রদর্শীত হয়েছিলো... কিন্তু তবুও তাঁকে সকৃতজ্ঞ চিত্তে এই জন্য স্মরণ করি যে- কলকাতায় তখন ইংরেজদের থিয়েটার ছিলো- ১৭৭৫ সালে ইংরেজদের ‘ক্যালকাটা থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে... তারপরেও একজন রাশিয়ান খুব কষ্ট করে একটা ঘর ভাড়া করে মঞ্চনাটক করেছিলেন বাংলায়... এবং হিন্দুস্তানী মিউজিশিয়ান, মিউজিক ব্যবহার করে তিনি করেছিলেন... তিনি ব্যাকরণও লিখেছিলেন... সংস্কৃত ব্যাকরণের বইও লিখেছিলেন... কাজেই তাঁর কাছে আমাদের ঋণ এবং মারা যাওয়ার সময় তিনি একটা প্রেস করেছিলেন, সেই প্রেসটির নাম ছিল ‘ইন্ডিয়ান প্রেস’। তিনি ভালোবেসেছিলেন বাংলাকে এবং ভারতবর্ষকে... কাজেই সেই দিক থেকে আমার মনে হয়েছে লোকটি নাটকের একটি ইন্টারেস্টিং চরিত্রও বটে। তাঁর সাথে এই ইতিহাসটা যুক্ত হয়েছে।... কিন্তু বাংলা নাট্য... সেটা আমরা এখন বলতে শিখেছি... এই ভাবনাটাও কিন্তু আধুনিক... খুব বেশি দিনের পুরনো নয়... আমরা কিন্তু কবিতা জারীগানকে আমাদের থিয়েটার ফর্ম ভাবতাম... আমার মনে হয় গত বিশ পঁচিশ বছরে এই সাব-কন্টিনেন্টাল ভাবনার সাথে যুক্ত হয়েছে।... সেক্ষেত্রে আমরা মনে করি... আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেতো সরাসরি লিখে দিতো যে গেরাসিম লেবেদেফ দু’শ বছর আগে বাংলা নাটক করেন তারপরে ঠাকুর বাড়ির ইতিহাস, সিংদের বাড়ির ইতিহাস... এরকম লিখে দিতো... এখন কিন্তু আমরা সেভাবে বলি না... আমরা নাট্য আঙ্গিক হিসেবে... যে ফর্মগুলো আমাদের দেশে আছে সেগুলোর আমরা স্বীকৃতি দিই। ধন্যবাদ।

আলী হায়দার লিটু
আমি সুবচন নাট্যসংসদ, ঢাকার সদস্য। মামুনভাইয়ের কাছে আমর প্রশ্ন, মামুনভাই তাঁর নাটকে খুব সিরিয়াস জায়গায় তাঁর চরিত্রকে দিয়ে খুব উদ্ভট কোনো কথা বলান... কোনো কোনো নাটকে... যেমন আমাদের ‘রাষ্ট্র বনাম’ নাটকেই আছে যে... প্রামাণিক যখন খুন হয়- তখন যে মাঝি খবরটা নিয়ে আসে দোকানে.. এবং দোকানে আসার পর যখন সে বলল যে, প্রামাণিক মারা গেছে... প্রচ- শক্তিশালী একজন মানুষ প্রামাণিক... তখন সেই মাঝি পানি খেতে চায়... তো তখন একজন জিজ্ঞাসা করে দোকানীকে যে, এই পানি আছে? তখন দোকানী বলে- না পানি নেই কেরোসিন আছে। তখন লোকটি বলে- ধ্যাৎ পানি আর কেরোসিন কি এক হইলো রে? তখন দোকানী বলে যে- কাঁহো কাঁহো পানির বদলে কেরোসিনও খায়।... তো এই রকম একটা সিরিয়াস জায়গায় যখন সবাই ভীতিকর একটা অবস্থায়... এই রকম জায়গায় মামুনভাই কেন এইরকম ফান-টা তাঁর চরিত্রকে দিয়ে করালেন, এটা আমরা একটা প্রশ্ন। আরেকটা প্রশ্ন আছে আমার, সেটা হচ্ছে যে, মামুনভাই তাঁর নাটকে... আমরা মামুনভাইয়ের দু’টো নাটক করেছি ‘চক্র’ এবং ‘রাষ্ট্র বনাম’... প্রথমে নাটকটি শুরু হয় খুব স্বাভাবিকভাবে... চলতে থাকে হঠাৎ করে গুলির শব্দ হয় এবং গুলির শব্দ হওয়ার পরে টোটাল নাটকটা পরিবর্তন হয়ে যায়। নাটকটা শূন্য একটা জায়গায় চলে যায়- তো নাটকটাকে এই জায়গায় আনার জন্য মামুনভাই কেন গুলিটাকে বেছে নেন?

মামুনুর রশীদ
তোমার প্রথম প্রশ্নট হচ্ছে যে... খুব একটা সিরিয়াস জায়গায় একটা খুব হিউমারের কথা... আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়... যখন কিনা দেশে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছিলো তখন এত হিউমারের জন্ম হয়েছিলো, এত হাসির গল্পের জন্ম হয়েছিলো যে, কল্পনা করতে পারবে না... এবং বোধহয় প্রত্যেকটা জাতিরই একটা বৈশিষ্ট্য থাকে যে খুব সংকটাকালে সে একটা হিউমার করে। এরকম অনেক ঘটনা জানা আছে আমাদের... আমরা হয়তো চারিদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে গেছি... আর্মি দ্বারা হোক বা কারফিউর মধ্যে হোক... সেখানে অনর্গল এই ধরনের উইট এ্যান্ড হিউমার, এই ধরনের হাসির গল্প চলছে। অর্থাৎ একটা বাস্তবতাকে, একটা রূঢ় বাস্তবতাকে এড়াবার জন্যেও, এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে একটা ডাইভারশানের জন্যেও কিন্তু এ ধরনের হিউমারগুলো আসে।... এবং এটা আমাদের জীবনের একটা অংশ। উৎপল দত্তের একটি সিরিয়াস নাটক আছে ‘অঙ্গার’- যেখানে কয়লা খনির নিচে মানুষগুলোকে পানি দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে... আস্তে আস্তে পানি উঠছে... তারা মারা যাচ্ছে... এবং সেখানে হাসতে হাসতে মরে যেতে হয় এমন সব সংলাপ আছে। এবং লোকগুলো বুঝে ফেলেছে যে, তাদের মৃত্যু আসন্ন... তারপরেও ঘুরছে।... উৎপল দত্তের ‘কল্লোল’ নাটকে যদি দেখ... সেখানেও দেখবে যে একটা জাহাজ... বিদ্রোহ করেছে সবাই... এবং সেই বিদ্রোহের মধ্যে তাদেরকে আবার আটকে ফেলেছে চারদিক থেকে... এবং সেই বিদ্রোহের মধ্যেও কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, হঠাৎ করে ঝিলিক দিয়ে উঠছে কোনো একটা হিউমারাস সংলাপ, সবাই হো হো করে হাসছে, আবার মৃত্যু ভয়ে তারা ভীত হচ্ছে। আমার মনে হয় এটা জীবনেরই রীতি, মানুষ যদি সবসময় সিরিয়াস থাকে- মানে সবসময়ই যদি সংকট সংকট সংকট নিয়ে ভাবে তাহলে বোধহয় সে বাঁচতে পারতো না। ইতিহাসে একটা সংলাপ আছে চমৎকার ... এবং শম্ভু মিত্র বলতেনও খুব চমৎকার করে যে... ‘যে ভোলে সে বাঁচে, যে ভোলে না সে বাঁচতে পারে না’। কাজেই মানুষকে তার বাঁচার প্রয়োজনেই কিন্তু অনেক সময় ভুলতে হয়।... এবং এই ভোলার জন্যেই আমার সংলাপে মাঝে মাঝে এই ডাইভারশানগুলো চলে আসে।

আর দ্বিতীয় যেটা বললে, সেটার উত্তরে বলতে চাই, সব নাটকে একইভাবে টার্নিং আসে না। হয়তো ঘটনাক্রমে, তোমাদের এই দু’টি নাটকে ব্যাপারটা আছে... তবে খুনোখুনি ছাড়া নাটক করারটা খুবই ডিফিকাল্ট... হাঃ হাঃ (সবার হাসি)... এবং পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ খুনি হচ্ছে শেক্সপীয়র এবং যেটা শুনেছি যে... তাঁর নাটকের একেকটি দৃশ্যের পরে বালতি রেডি করে রাখা হতো... চারটা পাঁচটা পানিভর্তি বালতি... ইংল্যান্ডের ঐ মঞ্চ ধোয়ার জন্য।... কারণ এতো রক্ত জমে যেত যে, মানে খুবই ন্যাচারেলিস্টিক নাটক হতো... তখন রক্তের এমন অবস্থা হতো যে, পরবর্তী দৃশ্যের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা পা পিছলে পড়ে যেতে পারে- এ জন্য বালতি ভরে পানি রাখা হতো এবং ধোয়ার পর পরবর্তী দৃশ্য শুরু হতো।... তো শেক্সপীয়র নাকি এই প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন যে, আমি সবচয়ে কম খুনি... আমার আগের খুনিদের দেখ।

মলয় ভৌমিক
জয়নালভাই যদি প্রশ্ন করেন...

জয়নাল হাসান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
আজকে ঢাকায় এসে... এখানে আপনাদের বোর্ডে যে ডিসপ্লে করা হয়েছে সেখানে- এই উৎসব উপলক্ষে ইত্তেফাকের রিপোর্টটি আমি দেখেছি। সেখানে শিরোনামটি হচ্ছে- ‘শিল্প হয়ে উঠেছে পণ্য আর শিল্পী শোষক শ্রেণীর সেবাদাস’- এই কথাটা কতটুকু সত্যি, ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে। এই বিষয়টি যদি আমি একটু বিশ্লেষণ করি- আমি  মফস্বল থেকে এসেছি- আমি আমার মফস্বলের প্রেক্ষাপটে যদি বলি- হয়তো সময় বেশি লাগতে পারে, আমাকে ক্ষমা করবেন।... এই যে শিল্প হয়ে উঠেছে পণ্য আর শিল্পী শোষক শ্রেণীর সেবাদাস- তার প্রমাণ আমরা মফস্বলে থেকে পেয়েছি, পাচ্ছি- ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে যে শিল্পের চর্চা হয়, নাটক হয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়... আমি একটু ব্যাখ্যা করে বলতে চাচ্ছি... সেখানে আমরা দেখি যে- আমলারা প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি থাকে, মন্ত্রী-মিনিস্টার থাকে অথবা ডিসি, এসপি থাকে- সেক্ষেত্রে ডিসি, এসপি অর্থের যোগানটি দিয়ে দেন আমরা তাদের মনোরঞ্জন করে থাকি। এই ধরনের একটা ধারা... আমি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত প্রায় বিশ বছর... সেই বিশ বছর ধরেই ব্রাহ্মণবাড়ীয়াতে এটা দেখে এসেছি এবং সেই ধারাটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রেক্ষাপটেই আমি বলবো। যদিও সারাদেশের প্রেক্ষিতেই সেটি আজকে সত্য... মানে এখন পর্যন্ত সেটি বিদ্যমান রয়েছে।... আমি, আমরা ‘সাহিত্য একাডেমী’ আরণ্যক নাট্যদলের কাছে কৃতজ্ঞ এই জন্য যে, সাহিত্য একাডেমী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই আরণ্যক নাট্যদলের সদস্যদের সাথে আমাদের পরিচয় হয়েছিলো। মামুনুর রশীদের সাথে পরিচয় হয়েছিলো- আজকের সকালের অনুষ্ঠানের যিনি মূল প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন, শান্তনু কায়সার, তিনি তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থান করছিলেন... তাঁর চিন্তাভাবানায় এবং মামুনুর রশীদের চিন্তাভাবনায় পরিচালিত হয়ে আমরা শিল্প যেন পণ্য না হয়ে যায় এবং শিল্পী যেন শোষক শ্রেণীর সেবাদাসে পরিণত না হয়ে যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ করে আসছি বিগত প্রায় বিশ বছর ধরে... কিন্তু এ থেকে আমাদের উত্তরণ হচ্ছে না। এ থেকে আমাদের উত্তরণের উপায় কী, আমাদের উত্তরণের পথ কী? আমাদের দেশের যেসব বিখ্যাত শিল্পীগণ আছেন তাঁরাও কি বিভিন্নভাবে শোষক শ্রেণীর সেবাদাস হয়ে যাচ্ছেন না? কারণ আমরা যদি মনে করি রাষ্ট্র পরিচালনা করছে শোষক শ্রেণী, তাহলেতো কোনো না কোনোভাবে সেই রাষ্ট্রের পরিচালনায় বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা যারা অংশগ্রহণ করছি তারা শোষক শ্রেণীর সেবাদাস হয়ে যাচ্ছি। এ থেকে উত্তরণের পথ কী? বা আমরা কীভাবে উত্তরণ ঘটাতে পারি, মুক্ত হতে পারি? আমার পরবর্তী প্রশ্ন হলো এখানে আজকে সকালে সেমিনারের মধ্যে বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যকার যিনি সভাপতি ছিলেন জনাব আব্দুল্লাহ আল-মামুন... তিনি এবছর একুশে পদক পেয়েছেন... তাঁকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়েছে। তিনি পদক পেয়েছেন, আমরা গর্বিত। তার পাশাপাশি আমরা একথাও জানি যে, মামুনুর রশীদ যখন বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছিলেন, তখন তিনি পুরস্কারটি বর্জন করেছিলেন এবং কী জন্যে বর্জন করেছিলেন, তা তিনি তখন একটি লিফলেটের মাধ্যমে প্রকাশ করে আমাদের কাছে পাঠিয়ে ছিলেন... এর একটি ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছিলেন... প্রশ্ন হচ্ছে আজকে যদি মামুনুর রশীদ এ পুরস্কার পেতেন তাহলে তা গ্রহণ করতেন কি না। গ্রহণ করার প্রেক্ষাপট আমাদের এসেছে কি না?

মামুনুর রশীদ
প্রশ্ন দু’টি... প্রথম যেটি করেছেন আপনি যে, শিল্প পণ্য হয়ে যাচ্ছে এবং শিল্পীরা শোষক শ্রেণীর সেবাদাস হয়ে যাচ্ছে... ডিসপ্লেতে যে রিপোর্টটি দেখেছেন আপনি, সেটা ঐদিনের বক্তাদের মাঝে একজন কথাটি বলেছিলেন। শিল্প, পণ্য তো বটেই, এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, শিল্পের একটা বড় অংশ বহুকাল থেকে... একেবারে সভ্যতার আদি থেকেই বলবো, পণ্য হয়ে আছে... কারণ শিল্প কিন্তু বিনিময়ও বটে... যখন আমরা একটি বই কিনি এটা কিন্তু টাকা দিয়ে কিনি... আমরা যখন নাটক দেখতে যাই, আমি আমরা কিন্তু টিকিট কিনে ঐ নাটক দেখতে আসি। এখন... এক অর্থে তো র্শিল্প  পণ্যই... রাজনীতি পণ্য, এখনতো ধর্মও পণ্য... ধর্মকে যখন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে... দেওয়ানবাগী পীর সাহেব কি পণ্য না? আটরশির পীর পণ্য না? সবই তো পণ্য হয়ে যাচ্ছে... মার্কেট ইকোনমির এই অবাধ বাজারে সবকিছুই পণ্য হয়ে যাচ্ছে... কিন্তু আমরা যেটাকে মিন করি সেটা হচ্ছে যে, শিল্পের যে এ্যাপ্রোচ, শিল্পে আমার যে অবজেক্টিভ, শিল্পের যে উদ্দেশ্য, সে উদ্দেশ্যটা যেন আমরা একটা পণ্যের মোড়ক দিয়ে বিক্রি না করি... এই শিল্পকে যেন আমরা সম্পূর্ণরূপে পণ্য করে না তুলি... শিল্পের যে উদ্দেশ্য তা যদি সম্পূর্ণভাবে বিঘ্নিত হয়, ব্যহত হয়, পণ্যটাই প্রধান হয়ে যায়... এমনটা যেনো না হয়। সেটাকে আমরা রোধ করতে চাই। আমরা যে ক্ষুধা থেকে... সাংস্কৃতিক পিপাসা থেকে... আমাদের শিল্প মানেই হচ্ছে একেকটি আইডিয়া... একটা ভাবনাকে দেখার জন্য আমরা যে জায়গাটায় আছি সে জায়গাটায় এসে যদি দেখি যে সে ভাবনাটা পাচ্ছি না, এখানে কোনো আইডিয়া নেই, এটা একটা বিনোদন হচ্ছে, যে বিনোদনটা আর ইন্টারেস্টিং হচ্ছে না... শুধু মাত্র পণ্যের যে বিকৃত দিকটা সেটা রয়ে গেছে... আমরা এই শিল্পকে সেই পণ্যের স্তরে নিয়ে যাবো না, নিতে চাই না। এখানে প্রতিটি শিল্পীর আলাদা আলাদা এ্যাপ্রোচ আছে... পৃথিবীতে যদি পাঁচ কোটি শিল্পী থাকে, পাঁচ কোটি শিল্পীর আলাদা আলাদা এ্যাপ্রোচ... আলাদা আলাদাভাবে তারা... নিজেদের ভাবনাগুলোকে নিজেদের শিল্পকর্মে প্রকাশ করেন। এবং আমাদের একটা ভাবনা, আমাদের একটা সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকবে যে শিল্পকে আমরা শুধুমাত্র পণ্য করবো না।

দ্বিতীয় কথা যেটা হচ্ছে, শিল্পীরা শোষক শ্রেণীর সেবাদাস... এই কথাটা খুব জেনারেল টার্ম-এ বলা হয়েছে... খুবই জেনারেল টার্মে বলা হয়েছে... এমন সাধারণভাবে সবাইকে একতরফাভাবে এই উক্তিটা করা... এটাও ঠিক নয়। পৃথিবীতে অনেক শিল্পী আছেন... এখন শিল্পী বলতে আমরা যদি ‘স্টার’ বোঝাই সেটা আলাদা কথা... সেই লোকটি, যে চাটমোহরে অথবা নীলফামারীতে কীর্তন গাইছেন, তিনি শিল্পী নন? সেই শিল্পী... মুকুন্দদাস, বরিশালের ঐ গ্রামে গান গাইতেন... দেশ প্রেমের গান... তিনি কি শিল্পী নন? আজকে ঢাকা শহরে হাতে গোনা যে ক’জন ‘স্টার’- তারা ছাড়াও আমরা গ্রামাঞ্চলে গিয়ে দেখেছি, ছোট ছোট শহরগুলোতে দেখেছি, অসাধারণ শিল্পীরা সেখানে আছেন... তাদের মধ্যে সবাই কি সেবাদাস?... হয়তো সেখানেও কিছু সেবাদাস থাকতে পারেন... কিন্তু সবাইতো আর সেবাদাস নন। অনেক জনগণের শিল্পী আছে... যারা জনগণের একমুষ্ঠি করে চাল নিয়ে নিয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে... তাদের জন্য তিনি গান করেন, তাদের জন্য তিনি শিল্পের কাজ করেন... কাজেই এই দু’টো জিনিসই খুব ঢালাওভাবে দেখলে হবে না।... আরেকটা হচ্ছে যে, আমরা সত্তুরের দশকে, আশির দশকে অথবা তারও আগে একধরনের কথা, একধরনের স্লোগান আমরা দিতাম... যেগুলোকেও আবার কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন করে ভাববার অবকাশ আছে। জয়নুল এর সাথে আমরা যখন মুক্তনাটক করেছি আজ থেকে বিশ বছর আগে... আজ কিন্তু তার পরিবর্তন হয়েছে... শান্তনু কায়সার তখন যা লিখতেন... আজকে কি তিনি তাই লিখেন? লিখেন না- লেখার ক্ষেত্রেও তো তাঁর একটা ক্রমবিকাশ রয়েছে। আমরা তখন যা ভাবতাম... আজকে কি তা ভাবি? আমাদের ভাবানার ক্ষেত্রেও তো পরিবর্তন হয়েছে। কাজেই এই পরিবর্তনগুলো কিন্তু খুবই প্রগতিশীলতার লক্ষণ। কিন্তু পরিবর্তনটা যদি নেগেটিভ দিকে যায়?... যেমন এককালের চরম প্রগতিশীল আমাদের বুদ্ধিজীবীকর্মী আনোয়ার জাহিদ কম্যুনিস্ট পার্টি করতেন... একেবারে কট্টর... সে যেদিকে এখন গেছে, সেদিকে গেলে, সেটা ভয়াবহ। কিন্তু যদি আমরা সারা পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতে, আমার দেশের সাধারণ মানুষের একেবারে রিয়েল জনগণের পরিপ্রেক্ষিতটাকে ভাবতে পারি- সেটাকে আত্মস্থ করতে পারি, আমার ভাবানার কি পরিবর্তন হবে না? প্রগতিশীল চিন্তারও কি পরিবর্তন হবে না? আমার মনে হয় সেই পরিবর্তনটা খুবই স্বাভাবিক।

আর পদকের কথা যেটা বললেন... আমরা তিন বন্ধু একসাথে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছিলাম... এবং তিনজনই খুব স্বনামধন্য... আমি ছাড়া আরকি (হাসি)... বাকী দুইজন খুবই স্বনামধন্য... একজন মারা গেছেন- আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আরেকজন নির্মলেন্দু গুণ।... আমি যখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমি পুরস্কার নেব না, তখন আমি আমার এই দুই বন্ধুকে বললাম যে চলো আমরা একসাথে এটা প্রত্যাখ্যান করি... ইলিয়াস বললো যে- না, বাংলা একাডেমীর পুরস্কারের বিরুদ্ধে আমার কোনো ক্ষোভ নেই, আমি এটা নেব। নির্মলেন্দু গুণ বললো যে, আমি জানতাম একটা ভেজাল লাগাইবা তুমি... তুমি ভেজাল লাগাইবা... তুমি লাগাও... আমারটা আমি নিব। ঠিক আছে... তাদের প্রতি আমার কোনো অশ্রদ্ধা নাই, একেবারেই অশ্রদ্ধা নাই। এখন আব্দুল্লাহ আল-মামুন... এদেশে যাঁরা একুশে পদক পেয়েছেন অতীতে নাটকের ক্ষেত্রে, তাদের অনেকের চেয়ে উনি যোগ্য ব্যক্তি। ওনার অনেকদিন থেকে পাওয়ার কথা। পাচ্ছেন, পাচ্ছেন... আবার প্রতিবারই হতাশ হচ্ছেন... এইবার উনি পেয়েছেন এবং আজকে ঘটনাক্রমে উনি সভাপতি ছিলেন আমাদের আলোচনা সভার- কাজেই সেই সুযোগে আমরাও চেয়েছি তাঁকে সম্মানিত করতে।... আমি পদক পেলে নিতাম কিনা... সেটা কিন্তু এখনো আমার নিজের আছে প্রশ্ন... এই পরিপ্রেক্ষিত, সমাজ, রাষ্ট্রে আজকের দিন... এসব বিবেচনা করেই আমি সিদ্ধান্ত নেব পদক নেব কি নেব না। ধন্যবাদ।

মলয় ভৌমিক
আমাদের সময় ফুরিয়ে আসছে। অনেক দূর থেকে অনেকেই এসেছেন... আমি রংপুর ‘সারথী’ থেকে আসা সিরাজুল ইসলাম সিরাজকে অনুরোধ করছি... আপনি প্রশ্ন করুন।

সিরাজুল ইসলাম সিরাজ (সারথী নাট্যগোষ্ঠী রংপুর)
সারথীর পক্ষ থেকে সবাইকে শুভেচ্ছা জানাই। আমার প্রশ্ন, কোনটি বড়- সংগঠন নাকি নাট্যকর্ম? আমার পর্যবেক্ষণ মতে ঢাকাসহ মফস্বল শহরগুলোতে সাংগঠনিক কর্মীদের ঠেলাঠেলিতে সৃজনশীল নাট্যকর্মীরা ধরাশায়ী অবস্থা। আপনার পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য কী?

মামুনুর রশীদ
তোমার এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য আমি আগেই দিয়ে দিয়েছি যে- সাংগঠনিকতার কাছে যদি সৃজনশীলতা পরাজিত হয় পরাভূত হয় তাহলে শিল্পের ক্ষেত্রে সেটা একটা ভয়াবহ অবস্থা- সেটা আমি আগেই বলেছি... এবং এই প্রক্রিয়াটা আমাদের দেশে বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে... এবং এর ভয়াবহ দিকটা আমরাও লক্ষ্য করছি। সমস্ত বিশ্বে, যেখানে রাজনীতি সংস্কৃতির উপর সাংঘাতিক প্রভূত্ব করে সেখানে সাংস্কৃতিক বিকাশ হয় না... যেমন বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত ইউনিয়নে... যেমন বিপ্লবোত্তর চীনে... পার্টি যখন সব কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়... তখন সমস্যা হয়। আমাদের দেশেও এটা হয়েছে... এবং আমরা এ ব্যাপারে সচেতন। এবং সৃজনশীলতা... সৃজনশীল কর্মে সৃজনশীলতাই সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেয়া উচিত এটা আমি বিশ্বাস করি।

মলয় ভৌমিক
যশোর বিবর্তনের মামুন...

মামুন (বিবর্তন যশোর, যশোর)
জেলা শহর থেকে... বেঁচে থাকার তাগিদে দেখা যায় যে, অনেকেই রাজধানীতে চলে আসে... কোনো কাজকর্মে ঢুকে যায় কিংবা এনজিও-তে ঢুকে যায়... দেখা যায় যে সংগঠন অনেক দিনে একটা ভালো কর্মী তৈরি করলো... বেঁচে থাকার তাগিদে সে সংগঠন থেকে দূরে সরে চলে যাচ্ছে। সেখানে সংগঠন যেমন লস করছে এবং একই সাথে নাট্য আন্দোলনটাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই ঝরে যাওয়া কর্মীদের ঝরে যাওয়া রোধ করা যায় কীভাবে এটাই আমার প্রশ্ন।

মামুনুর রশীদ
এটা তো আমাদের দুর্ভাগ্য যে বাংলাদেশে একটাই শহর, ঢাকা শহর... আর কোনো শহরও নেই, কোথাও কোনো সুযোগও নেই, কোথাও কোনো কাজও করার পরিস্থিতি থাকে না...এবং... একটা খুব চমৎকার... এক ইকোনোমিস্টের প্রবন্ধ পড়েছিলাম ‘মেট্রোপলিটন এ্যান্ড দ্য পেরিফেরি’... সেটা হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে, দেশের মেধা প্রতিভা সব ছুটতে  থাকে শহরের দিকে- এটা একটা বাস্তবতা।... এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, নাট্যকর্মী হিসেবে আমাদের আর কতটুকু ক্ষমতা? আমরা বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না... শহরগুলোকে আরো সমৃদ্ধ করার যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এটা করার ক্ষমতাও তো আমাদের নেই... শহরগুলোকে যদি সাংস্কৃতিকভাবে আরো প্রাণবন্ত করা যেতো... যেটা ছিলো, একসময় ছিলো... কালক্রমে ভেঙে গেছে... এমনকি সত্তুরের দশকেও ছিলো... সত্তুরের দশকে... আশির দশকের গোড়ার দিকে যে বিপুল পরিমাণ নাট্যকর্মীকে আমি চিনতাম- আমরা চিনতাম... আজকে তাদের চেহারা দেখি না। তারমানে এক ধরনের অর্থনীতি তখন হয়তো ছিলো বা গ্রো করছিলো- যার ফলে ছোট শহরগুলোতে, জেলা শহরগুলোতে নাট্যকর্মীরা, সংস্কৃতিকর্মীরা হয়তো বেঁচে থাকতে পারতো। আজকে বেঁচে থাকতে পারছে না, এটা একটা সত্যিকার বাস্তব অবস্থা কিন্তু এই বাস্তব অবস্থারও কিছু রাজনৈতিক মীমাংসা আছে। এই রাজনৈতিক মীমাংসা কী? ঐ জেলা শহরগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলতে হবে। আরো বেশি সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে... এই কাজটাতো ভাই আমরা করতে পারবো না... যতই বলি.. একটা মেধাবী ছেলে ঢাকায় আসতে চাইবেই... তাকে জোর করে একটা জেলা শহরে রাখা যাবে না... এটা বাস্তবতা... কিন্তু সেই বাস্তাবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অনেকে লড়াই করছে... দিনের পর দিন হল ফাঁকা যাচ্ছে... দর্শক কম হচ্ছে... তারপরেও ঢাকার বাইরে বিশেষ করে চট্টগ্রামে মাসে প্রায় প্রতিদিন প্রদর্শনী হচ্ছে... এই চর্চাটা চলছে... এবং এটাও একধরনের অঙ্গীকারের বিষয়... ব্যক্তিগত অঙ্গীকার থেকে কেউ ত্যাগ স্বীকার করতে পারে কিন্তু সাধারণ অর্থে সবাই সুযোগমুখি... তারা ঢাকার দিকে ধাবমান হবেই।

আশরাফুল আলম
আমি এখানে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ, কারণ আমি নাটক করি না।... মামুন তাঁর একটি অভিমত ব্যক্ত করেছেন, একজনের উত্তরে... আমি তার সাথে কন্ট্রাডিক্ট করে সেই ব্যাপারটা বলছি... সেটা হচ্ছে যে, স্বাধীনতা উত্তরকালে নাটক সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন কিনা... আসলে এটি একটি সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনই আমি বলবো। কারণ, কল্যাণমিত্র, প্রসাদ বিশ্বাস, আর বিচ্ছিন্নভাবে তারাশঙ্কর এবং নীহারঞ্জন এই জাতীয় নাটক হতো পাড়ায়, অফিসে। সেখান থেকে স্বাধীনতার পরেই আমরা বেরিয়ে এসেছি এবং মূলত একটি গ্রাউন্ড তৈরি হয়েছে নাটকের। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মামুন যেটা অস্বীকার করেন, আমি মনে করি... দু’টোই সত্যি বলে ধরে নেবো না। আমারটাই সত্যি বলে ধরে নেবেন... কারণ আপনারা নাট্যকর্মী, আপনারা আপনাদের গৌরবের পক্ষেই থাকবেন।... আর নির্দেশক হিসেবে কিন্তু তেমন কোনো প্রশ্ন আসেনি... একবার এসেছিলো সেটাও তুলনামূলক আলোচনার ক্ষেত্রে... আমি নির্দেশক মামুনুর রশীদের কাছে জানতে চাই... আমি যখন নাটক দেখতে আসি... প্রসঙ্গত বলে নেয়া ভালো, আমি নাটক খুব কম দেখি... কিন্তু যখন আসি তখন দেখা যায় যারা অভিনয় করেন... আমার হয়তো টার্ম ভুল হতে পারে... ফিজিক্যাল এ্যাক্টিং বলতে যা বোঝায়... হাত নাড়া, চলাফেরা, বসা, ঘাড় ফিরে তাকানো, হাত তুলে ডাকা- সমস্ত কিছুর মধ্যে একটা উৎকট ভঙ্গি থাকে বা আর্টিফিশিয়াল ভঙ্গি থাকে বা একধরনের গ্রাম্যভাব থাকে। সহজতা থাকে না- একজন নির্দেশক হিসেবে আপনি এই ব্যাপারটাকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আপনার নাটকে... আমার মনে হয় পারেননি... কারণ আপনার নাটকেও ঐ সমস্যা ছিলো... এই ব্যাপারে আপনি খুব সচেতন কিনা? কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন কিনা- আপনার দৃষ্টিকোণটা জানতে চাই এবং আমার সঙ্গে  আপনি একমত কিনা তা জানতে চাই?

মামুনুর রশীদ
আমার তো নাটকের লোক হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন ভাবতে ভালো লাগবে... কিন্তু প্রশ্ন হলো... সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন ভাবতে ভাবতে আমরা আত্মঅহঙ্কারী হয়ে বসি... যার ফলে- তুমি পরের যে প্রশ্নটা করলে... আপনাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজই ঠিক হয়নি এখনো... তো বডি ল্যাঙ্গুয়েজই ঠিক হয় নাই অথচ সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন করে বসে আছি... এটা একটা কন্ট্রাডিক্টরি হয়ে গেল না?... বডি ল্যাঙ্গুয়েজকেই যদি কন্ট্রোল করতে না পারি তবে সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ কীভাবে করবো?... আমরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতনভাবে- আমাদের দেশে যাঁরা নির্দেশক আছেন- সবাই কাজ করেন।  কারণ বডি ল্যাঙ্গুয়েজটা আমাদের বাঙালি জাতির একটা সমস্যা- বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের। কারণ ছোটবেলা থেকে তারা একটা নাচও করে না। আমি অধিকাংশ অভিনেতাকে জানি যারা একটা ছোট ড্যান্সের মুভমেন্ট দিতে পারে না... গান গাইতে পারে না।... হিন্দুদের একটা এ্যাডভানটেজ আছে... অন্তত আরতি করতে গেলেও একটু মাসল-এর মুভমেন্ট হয়, কিন্তু মুসলমান ছেলেদের দিয়ে একটা ড্যান্সের মুভমেন্ট আমি দেয়াতে পারি না।... কাজেই সেক্ষেত্রে আামদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজের সত্যিই একটা সংকট আছে, এটা আমি অস্বীকার করবো না এবং আমি নিজে দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছি... আমাদের দলেও একসময় খুব নিয়মিতভাবে বডি ল্যাঙ্গুয়েজের উপর ওয়ার্কশপ হতো। সারাদেশের কর্মীদেরকে নিয়ে বডি ল্যাঙ্গুয়েজের ওয়ার্কশপ করেছি, এটা সম্পর্কে আমরা খুবই সচেতন যে বডি থেকে ল্যাঙ্গুয়েজ বের করতে হবে।... এর জন্যে আমাদের আরেকটা বড় ক্ষতি করেছে আমাদের টেলিভিশন... কীভাবে ক্ষতি করেছে? সেটা হচ্ছে, টেলিভিশনে একমাত্র কোয়ালিফিকেশন হচ্ছে- যার ডায়লগ মুখস্ত হয়... আমি অভিনেতাদের সব সময় বলি- পৃথিবীতে একটা শিশু যখন ভূমিষ্ট হয় তখন কিন্তু প্রথমে সে কথা বলে না। সব কিছু প্রকাশ করে সে তার দেহের ভাষায়- বডি ল্যাঙ্গয়েজের মাধ্যমে। এখন তুমি চরিত্রটি যখন পেলে, তখন প্রথমেই চরিত্রটির দেহের ভাষাটা ঠিক কর... দেহের ভাষাটা ঠিক করার পর সংলাপটা তার ভেতর আস্তে আস্তে ঢোকাও... কিন্তু এখানে উল্টো একটা ধারা তৈরি হয়েছে... সবাই ডায়লগ আগে মুখস্ত করে এবং ডায়লগ বলার জন্য মাতাল হয়ে যায়... ডায়লগটা বলে দিলেই হয়ে গেল আরকি... কিন্তু ঘটনা তো তা নয়। একটা চরিত্রের মধ্যেই তো ডায়লগটা বসে, সংলাপটা বসে।... তো সেক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই সচেতন এবং আশরাফুল আলমকে এই চমৎকার প্রশ্ন করার জন্য ধন্যবাদ।

নেহাল আহমেদ
আমি দৃশ্যপট, ঢাকার একজন সদস্য। আজকে মামুনভাইয়ের অনেক পরিচয় আমরা পেয়েছি- মামুনভাইয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছি- মামুনভাই উত্তর দিয়েছেন মঞ্চনাটকের মামুনুর রশীদ, সংগঠক মামুনুর রশীদ, নির্দেশক মামুনুর রশীদ, অভিনেতা মামুনুর রশীদ, সংস্কৃতিকর্মী মামুনুর রশীদের বিভিন্ন দিকে নিয়ে।... মুক্তনাটকের একটা দিকও কিছুটা এসেছে- তারপরেও পথনাটকের মামুনুর রশীদের সাথে বোধহয় আমরা মুখোমুখি পর্যায়ে তেমনভাবে একটা... তাঁর চিন্তা-ভাবানর সাথে পরিচিত হতে পারিনি... আমি পথনাটকের বিষয়টি এই কারণে আনলাম... একটা পর্যায়ে ছিলো... আশির দশকে, আমাদের সংস্কৃতিকর্মীরাও অনেকেই পথনাটককে উৎসাহিত করেছেন... এবং নিজেরাও করার চেষ্টা করেছেন... দল থেকে করার চেষ্টা করেছেন... এবং পথনাটক আমাদের অনেককে হয়তো-বা নেতাও বানিয়েছে কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক কারণেই হোক অথবা রাষ্ট্রীয় কারণেই হোক অনেকে পথনাটকের ব্যাপারে তেমন একটা উৎসাহ দেখান না এবং যারা পথনাটক করে তাদেরকে অনেক সময় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। এখন আমার প্রশ্ন হলো- পথনাটক সম্পর্কে এই যে ত্চ্ছু-তাচ্ছিল্য এবং পথনাটকের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার নতুন কোনো চিন্তা ভাবনা আছে কিনা?

মামুনুর রশীদ
নাটকতো পথেই শুরু হয়েছিলো। আমরা ‘ইডিপাস’ নাটকের কথা যদি ভাবি সে-ওতো পাহাড়ের পাদদেশে শুরু হয়েছিলো... তো পথনাটককে আমরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবো কেন?... কিন্তু পাথনাটকে যে ভীষণ রাজনৈতিক, উগ্র রাজনৈতিক ধারা তৈরি হয়েছিলো... সেই ধারাটাই এখনও অব্যাহত আছে... কিন্তু আমরা এখন চেষ্টা করবো... চিন্তা করছি যেটা, সেটা হচ্ছে যে, পথনাটকে আরও ভিজ্যুয়াল এলিমেন্টস, আরও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং একেবারে সরাসরি এটা যেন রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত না হয়, তার জন্যে আমাদের ইনভলবমেন্ট-টা বাড়াতে হবে। এবং আমি মনে করি যে, এখানে আমাদের অভিনেতারা আছেন... দেশের বিশিষ্ট অভিনেতারা... তাঁদের তো কোনো কুন্ঠা হওয়ার কথা নয়, আমি নিজেও এখনও পথনাটকে অভিনয় করি- এবছরেও আমি পথনাটক লিখেছি- অভিনয় করছি। তবে পথনাটকের এ্যাপ্রোচটা চেইঞ্জ করা দরকার। এটা যেন শুধুমাত্র স্লোগানধর্মী না হয়... এবং আমাদের মধ্যে এক ধরনের... যেমন মহিলা সমিতিতে নাটক করা... এটা একধরনের সো কলড আভিজাত্য চলে আসছে... যেখানে পথে আমি হাজার হাজার দর্শকের সামনেও নাটক করতে পারি... হয়তো মহিলা সমিতিতে আমার ২০ জন দর্শকও হয় না, তবুও মহিলা সমিতিতে নাটক করতে হবে... আমাদের কিছু কিছু দলের কমিটমেন্ট থাকা দরকার... তারা আসবে না মঞ্চে... এখানে নাটক করবে না। এটা রিজেক্ট করবে তারা এবং ক’রে তারা বাইরে... পথে তাদের দর্শক সৃষ্টি করবে। সে ধরনের চ্যালেঞ্জিং থিয়েটারকর্মী কিন্তু আমরা তরুণদের কাছ থেকে আশা করি... অলটানেট থিয়েটার স্পেস, অলটারনেট জায়গায় আমরা কেন যাব না? অলটারনেট জায়গায় যেতে গেলে আমাদের কিন্তু পথনাটকের কথা ভাবতে হবে এবং আমি মনে করি যে বাংলাদেশে পথনাটকের একটা অপার সম্ভাবনা আছে।

আশরাফ কবির
আমি থিয়েটার আর্ট ইউনিট, ঢাকার সদস্য। আমি একটি ব্যতিক্রমী প্রশ্ন করবো। মামুনভাইকে যদি আরণ্যক থেকে এই মুহূর্তে, এই ৫২ বছর বয়সে বহিষ্কার করে দেয় কিংবা মানুনভাই যদি দল থেকে বের হয়ে যান, তিনি আর নাটক করবেন কিনা বা নতুন দল করবেন কিনা- এই একটি প্রশ্ন। আর দল কেন ভাঙে- এই ব্যাপারটি একটু বলবেন, আর... আমার নিজের জানার সুবিধার জন্যে... যারা বাইরে থেকে পড়াশোনা করে আসেন... ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা, রবীন্দ্র ভারতী... তারা ৪ বছর বাইরে থাকার পর নিজের দলে আর ভালো কাজ করতে পারেন না। কিংবা দলের সাথে এ্যাডজাস্ট করতে পারেন না। কেন এটা হয়?

মামুনুর রশীদ
তোমার পরের দু’টি প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তিগতভাবে আমি পরে দিয়ে দেব, এখন সময় নেই... প্রথম প্রশ্নটির উত্তর দিই শুধু... আমাকে যদি আরণ্যক দল থেকে বের করে দেয়, আমি নাটকই করবো, কারণ আমি অন্য কোনো কাজ শিখি নাই।

মলয় ভৌমিক
আমার মনে হয় আরো প্রশ্ন ছিলো কিন্তু আমাদের হাতে সময় একদম কম। আমি খুব সংক্ষেপে সরাসরি প্রশ্ন করার জন্য টাঙ্গাইল এর ‘সপ্তসুর’ প্রতিনিধি আব্দুস সালামকে অনুরোধ করছি।

আব্দুস সালাম (সপ্তসুর, টাঙ্গাইল)
দীর্ঘদিন যাবৎ মামুনভাই নাটক লিখছেন, তাঁর প্রায় সব নাটকই আমি দেখেছি, পড়েছি। বাবার কাছে সব সন্তানই সমান, তবুও বাবা-মার মনে হয় দুষ্টু সন্তানদের প্রতি একটু দুর্বলতা বেশি থাকে- তাই নাট্যকার হিসেবে মামুনভাইকে প্রশ্ন করবো- আপনার দৃষ্টিতে কোন নাটকটি আপনার শ্রেষ্ঠ নাটক?

মামুনুর রশীদ
তোমার প্রশ্নটা সাংবাদিকদের মতো প্রশ্ন হয়ে গেল।... এই ব্যাপারটা হচ্ছে যে, একজন পিতার কাছে বা মা-র কাছে তার সব সন্তানই প্রিয় এবং যে সন্তানটি বিকলাঙ্গ, সে আরও বেশি প্রিয়। অর্থাৎ আমার ব্যর্থ যে নাটকটি, যে নাটকটি একটি প্রদর্শনীর পরে আর হয় নাই সেটাও আমার প্রিয় নাটক।

মলয় ভৌমিক
একটি চিরকুট দিয়েছেন ‘রাজশাহী থিয়েটার’ এর তাজুল ইসলাম। তিনি বলতে চেয়েছেন যে- একদল লোক... ধর্মকে ব্যবহার করছে... সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে... কিন্তু যারা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে ব্যবসা করছে তাদের ক্ষেত্রে কী হবে ?

তাজুল ইসলাম (রাজশাহী থিয়েটার, রাজশাহী)
আমার প্রশ্ন ওটা না... আমার প্রশ্ন হচ্ছে- যারা ধর্মকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে তাদেরকে আমরা মৌলবাদী বলি- কিন্তু যারা বাংলা সাহিত্য বা বাংলা নাটককে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে তাদের কে আমরা কী বলে আখ্যায়িত করাবো? এবং তাদের বিরুদ্ধে আমাদের কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?

মামুনুর রশীদ
এ্যাকশন, এ্যাকশন, ডাইরেক্ট এ্যাকশন হাঃ হাঃ... বিষয়টাতো একই, যেকোনো মৌলবাদই খারাপ- সেটা ধর্মীয় মৌলবাদ হোক আর সাংস্কৃতিক মৌলবাদই হোক। কারণ সংস্কৃতি তো খুব উদার... হ্যাঁ, শতফুল ফুটতে দিতে হবে... সেখানে কেউ যদি মনে করে এই পথই অভ্রান্ত পথ তাহলে সেটাও একটা মৌলবাদ- একই অপরাধ। ধন্যবাদ।

মলয় ভৌমিক
আমি এখানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করছি... কিছুটা পক্ষপাত আমার দেখাতে হচ্ছে- কেন না- যারা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন... তাদের একজন প্রশ্ন করতে চান- আমি একটু পক্ষপাত দেখাই...

শাহ আলম দুলাল
আমি আরণ্যক নাট্যদল, ঢাকার সদস্য। আমার একটি প্রশ্ন হচ্ছে যে, ১৯৯৫ সনে মামুনভাই ‘জয়জয়ন্তী’ নাটক লিখেছেন- আর আজকে হচ্ছে দুই হাজার সাল... এর মাঝখানে কোনো মঞ্চনাটক লিখেননি?

আহমেদ গিয়াস
আমি সুবচন নাট্যসংসদ, ঢাকার সদস্য। সঞ্চালকের অনুমতি নিয়ে বলছি... অনেকক্ষণ ধরে এই প্রশ্নটি আমি করবো করবো করছি কিন্তু করতে পারছিলাম না। তো একই সাথে হয়ে গেল... ধন্যবাদ।

মামুনুর রশীদ
খুবই গুরুতর প্রশ্ন, সেটা হচ্ছে যে... লিখতে পারিনি এটাতো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা... একেবারেই ব্যক্তিগত ব্যর্থতা। হয়তো লেখার জন্য অনুপ্রেরণা পাইনি... আবার এটাও হতে পারে যে বিষয় আশয়... তারপর অন্যদিকে প্যাকেজ নাটক... এগুলোর কাজ করছি।... কিন্তু তারমধ্যেও... আমি দু-তিনটি মঞ্চনাটক লিখেছি। সে নাটকগুলো হয়তো এবছর প্রযোজনা হবে... তবে এত দীর্ঘ সময়... ‘জয়জয়ন্তী’ থেকে এ পর্যন্ত কোনো মঞ্চ নাটক না করা- এটা আমি নিজেকেই মনে করি... মানে আমার নিজের কাছেই খুব অমার্জনীয় অপরাধ।

মলয় ভৌমিক
দুঃখিত, আবারো একটু পক্ষপাত করছি। খুবই কাছের... আমি যদি সুযোগ না দিই তবে হয়তো পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে... নাট্যকার মান্নান হীরা।

মান্নান হীরা
তারিক আনাম নিজেই বলেছেন প্রশ্নকর্তা তিনি হবেন, তার আগেই সুযোগটা নিতে চাই। সেটা হচ্ছে... আজকের সকালে একজন সম্মানিত বক্তা মামুনুর রশীদের উদ্দেশে বলেছেন যে, আপনি আপনার নাটক থেকে ঝাণ্ডা নামিয়ে নিয়েছেন, এজন্যে আমরা আপনাকে প্রশংসিত করি... সাধুবাদ জানাই। আমার প্রশ্ন... নাট্যকার মামুনুর রশীদ এই লাল ঝাণ্ডা নামিয়ে কতটা আনন্দিত এবং সম্মানিত বক্তার সাধুবাদে কতটা প্রীত?

মামুনুর রশীদ
হাঃ হাঃ আমি লাল ঝাণ্ডা নিয়েই সারাজীবন চলতে চাই, কারণ আমি মনে করি, এই তৃতীয় বিশ্বের দেশে লাল ঝাণ্ডা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। আর আমার বন্ধু হয়তো বুঝতে পারেননি যে আসলে লাল ঝাণ্ডাটা আমি নামাইনি। লাল ঝাণ্ডাতো নামাইনি, তবে লাল ঝাণ্ডাটি ঊর্ধ্বে তুলে ধরার কৌশলের একটু পরিবর্তন তো করতে হবেই- কারণ আমরা একুশ শতকে দাঁড়িয়েছি। ধন্যবাদ।

জনৈক (দুর্বার নাট্যগোষ্ঠী, নীলফামারী)
আমি মামুনভাইয়ের কাছে সরাসরি প্রশ্ন করছি- আমাদের গ্রামাঞ্চলে... মানে গ্রাম জেলায় বলা যায়... আমাদের নাটক মঞ্চায়নে দু’টি সমস্যা বিদ্যমান- একটা হচ্ছে আর্থিক, আরেকটা... নারী চরিত্র।... তো আমরা আর্থিক দিকটা... যেখানে দশ টাকা লাগে সেখানে আমরা পাঁচ টাকা খরচ করে ম্যানেজ করে নিতে পারি। কিন্তু যে নাটকে পাঁচটি নারী চরিত্র আছে সেখানে তো আর তিনটি দিয়ে করা সম্ভব নয়? এই ক্ষেত্রে যদি আপনারা, নাট্যকাররা, বিবেচনা করতেন যে... নারী চরিত্র কিছুটা কমিয়ে আনা যায় তাহলে আমরা... (প্রচণ্ড হাসিতে সবাই মেতে উঠে) আমাদের... মনে হয় আমরা মঞ্চনাটকের প্রতি আরো বেশি আগ্রহী হতাম... একটু ভেবে দেখবেন।

মামুনুর রশীদ
আমি অনেক বছর ধরেই এমন প্রশ্নের সম্মুখীন... অনেক বছর ধরেই। এবং সব জায়গায় যে উত্তরটা দিচ্ছি- তোমাকেও সেই উত্তরটাই দেব।... আমার পাল্টা প্রশ্ন নারীরা তোমাদের থিয়েটারে আসেছে না কেন?... আমি জানি- যে কারণগুলো তুমি বলবা সেগুলো আমি জানি... কিন্তু... আমার প্রশ্নটা হচ্ছে যে, মফস্বল শহরগুলোতে... তোমরা সেই বিশ্বস্ততা অর্জন করতে পারছো না। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারছো না। মেয়েদের বাবা মা’রা, অভিভাবকরা তোমাদের হাতে মেয়েদের তুলে দেয়... তিনদিন বাদেই দেখা গেল বিয়ে করে ফেললো... এখানে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুজন আছে... আমি নাম বলতে চাই না... যিনি এই রকম করেছেন।... হ্যাঁ... তো... এই রকম আমাদের যাঁরা বন্ধু-বান্ধব আছেন, মফস্বল শহরগুলোতে... বিশ্বাস করে অভিভাবকরা দিলো... বিয়ে হয়ে গেল... এবং নাট্যর্মীরাও মনে করলো যে আমরা একজন অভিনেত্রীকে পেলাম, আমাদের গুরুর স্ত্রী হিসেবে... কিছুদিন পর দেখা গেল, সেই গুরুর স্ত্রী অবলীলায় একজন গৃহবধুতে পরিণত হয়েছেন।... কাজেই এই সমস্যার সমাধান স্থানীয়ভাবে করতে হবে... মেয়েদেরকে থিয়েটারে আনতে হবে... এটার কোনো বিকল্প নেই।... তোমরা মেয়ে জোগাড় করতে পারো না বলে সেলিম আল দীন তোমাদের চাহিদা অনুযায়ী নাটক লিখবেন- এটাতো হতে পারে না। এখন ধরো যে, আমরা এরকম কমপ্রোমাইজ করে নাটক লিখতে লিখতে... আমরা এখানে নাটক করি, মহিলা সমিতিতে... কমপ্রোমাইজ করতে হয়... এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না... তারপর আবার নারী চরিত্রের কমপ্রোমাইজ করে নাটক লিখতে গেলে তো আসলে নাটক হবে না... কাজেই তোমাদের স্ট্রাগল করতে হবে... ঢাকাতেও তো এই সমস্যা... এটা কি শুধু মফস্বলেই নাকি? ঢাকার মঞ্চে আজকে কয়জন দক্ষ অভিনেত্রী আছেন বলো?... তারিক আনাম... কতজন হবে দশ জনের বেশি হবে? ঢাকার মঞ্চে, দশজন দক্ষ, ভালো অভিনেত্রী নেই... তুমি নীলফামারীর কথা বলছো... কাজেই সংকট যেটা নীলফামারীতে ছোট আকারে... এটার ভয়াবহ সংকট কিন্তু ঢাকা শহরেও আছে... ধন্যবাদ।

জনৈক
আমাদের দেশে বর্তমানে নাট্যকার বা নির্দেশকদের সংযোজন ঘটছে না... এ ক্ষেত্রে মামুনুর রশীদ... বর্তমানের নাট্যকর্মী ও নাট্য শিক্ষার্থীদের প্রতি নতুন কোনো দায়িত্ব কি অনুভব করছেন?

মামুনুর রশীদ
দায়িত্ব তো অনেক... প্রধান দায়িত্ব যেটা ছিলো... আমার একলার না আমাদের বয়সী সবারই... এদেশে আমরা... আমাদের মধ্যে যাদেরকে লোকে চেনে... এতো প্রতিষ্ঠা... তো আমরা এদেশে একটা মঞ্চই করতে পরলাম না... তোমাদের স্ট্রাগলের জন্যে সবচেয়ে যেটা খারাপ লাগে যে... আমরা তো একটা স্ট্রাগলের মধ্যে দিয়ে.... মানে... যাই হোক, ৫২ বছর বয়স হয়ে গেছে... কিন্তু প্রশ্ন হলো, তোমরা যারা তরুণ কর্মী তাদের জন্য আমি খুব অসহায় বোধ করি যে, এখনো মঞ্চ হলো না... কবে হবে তারও ঠিক নেই... থিয়েটার কালচারটা গ্রো করা গেল না... এখন কী হবে... এই দায়িত্বগুলো অবশ্যই উপলব্ধি করছি এবং চেষ্টাও করবো আমাদের সীমিত ক্ষমতা দিয়ে যে... এটার যদি কোনো সমাধান করতে পারি। তাহলে আমাদের জীবনটাও কিন্তু মিনিংফুল হবে।

মলয় ভৌমিক
আমি এবারে শেষ প্রশ্ন করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি অভিনেতা-নির্দেশক তারিক আনাম খানকে।

তারিক আনাম খান
আমি আসলে মুখোমুখি মামুনুর রশীদ নই... পাশাপাশি মামুনুর রশীদ (পাশে বসে আছেন, তাই)।... সুতরাং এ কথার অর্থ হচ্ছে যে, এগুলো নিজেরই জানার জন্যে বটে, যেহেতু নাট্যকর্মের সঙ্গে জড়িত... একজন নাট্যকার, অভিনেতা, নির্দেশকের পরিচয় তাঁর কর্মে... এই যে মুখোমুখি মামুনুর রশীদ, আলোচনা চক্র, মামুনুর রশীদের উপর সেমিনার- এটা মামুনুর রশীদ কীভাবে দেখেন? কীভাবে মূল্যায়ন করেন? তাঁর প্রতিক্রিয়া কী? মামুনুর রশীদের যে ব্যক্তিত্ব আছে- অভিনেতা, নির্দেশক, নাট্যকার- যদি একটি বেছে নিতে বলা হয় কোনটি বেছে নেবেন?... আজ থেকে তিরিশ বছর আগে মামুনুর রশীদ যা হতে চেয়েছিলেন তা কি হতে পেরেছেন?... এবং মামুনুর রশীদ আগামীর জন্য কী স্বপ্ন দেখেন?

মামুনুর রশীদ
চারটিই গুরুতর প্রশ্ন করেছো।... ভয়াবহ প্রশ্নও বটে। একটা হচ্ছে যে- সেমিনারের বিষয়টি এবং এই টোটাল নাট্য আয়োজনের ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত কোনো ভূমিকা নেই। এটা আমার আরণ্যকের সহকর্মীরা করেছেন এবং তারা মাঝে মাঝে এগুলো করে আমাকে খুব... এক অর্থে বিব্রতকর এবং আরেক অর্থে ভীষণ একটা বোঝা চাপিয়ে দেন।... এবারও তাই করেছেন।... আর বিকেল বেলার যে মুখোমুখিটা, এখন যেটা চলছে, এটা আমি আশা করেছিলাম... প্রথম দিকে ছিলে না... আমি ব্যাখ্যা করেছি... আমি চেয়েছিলাম যে... আজ থেকে বিশ বছর আগে যখন ‘ওরা কদম আলী’ নাটক লিখি এবং তারপরে অনেকগুলো নাটক বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিনীত হয়েছে।... যারা অভিনয় করেছিলেন, যারা নির্দেশনা দিয়েছিলেন তাদেরকে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো। তাদের সাথে... আজকে আমি কথা বলতে চেয়েছিলাম।... এবং তারা যে নাটকগুলো করতেন... এখন... আজকে যে নাটকগুলো লিখছি... সেগুলো তারা তেমনভাবে অভিনয় করেন না... তাহলে সংকটটা কোথায়? এটা বোঝার জন্যে আয়োজদেরকে এই অনুরোধটি করেছিলাম।... সেকারণেই বিকেলের এই আয়োজন।... কিন্তু এছাড়া অন্য যে আয়োজনগুলো সব আরণ্যকই করেছে... যদিও আমি মনে করি এটা না করলেও হতো।... এটা পরে করলেও হতো বা ভবিষ্যতে করলেও হতো।

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হলো, নাট্যকার-অভিনেতা-নির্দেশক, আমি তিনটি ক্ষেত্রেই খুব আনন্দ পাই কাজ করে, তবে আমি মনে করি আমার নাটক লেখাই উচিত, এটাই আমার প্রথম কাজ।

তৃতীয় প্রশ্নটার উত্তর হচ্ছে- ৩০ বছর আগে যা হতে চেয়েছিলাম, তা হতে পারিনি। তবে বৈষয়িক অর্থে যদি জিজ্ঞাসা করো যে, ৩০ বছর আগে যে জীবন যাপন আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন সেটা কি হয়েছে? সেটা একটু বেশিই হয়ে গেছে, যেটা অনাকাঙ্ক্ষিাত। কিন্তু আমি যা হতে চেয়েছিলাম, সেটা হতে পারিনি। মাঝে মাঝে খুব আক্ষেপ করে বলি- যখন দু’বেলা স্যুটিং চলে ভিডিও’র তখন বলি যে, হতে চেয়েছিলাম সত্যজিৎ রায় হয়ে গেলাম আজিজুল হাকিম (হাসি)... তো সেক্ষেত্রে একটা বিরাট ফারাক আছে।... হয়তো অনেক বড় আকাঙ্ক্ষা ছিলো জীবনে একজন ভালো নাট্যকার হবো... একজন ভালো নির্দেশক হবো... সেটা হতে পারলাম না এখনও- এটা আমার বড় ধরনের আত্মযন্ত্রণা।

আর, আগামীর স্বপ্ন হচ্ছে একটি ভালো নাটক লিখবো, একটি ভালো নাটক নির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করবো, একটি ভালো নাটকে অভিনয় করার চেষ্টা করবো।

তারিক আনাম খান
বাংলাদেশের নাটক নিয়ে স্বপ্ন কী?

মামুনুর রশীদ
বাংলাদেশের নাটক নিয়ে স্বপ্ন হচ্ছে যে- আমাদের পরের প্রজন্ম, যারা কাজ করছেন... তাদের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে চাই, তাদের ভালো কাজ দেখতে চাই। ধন্যবাদ।