Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

টি.ভি. প্যাকেজ ও স্যাটেলাইট মিডিয়ার বর্তমান প্রেক্ষিতে মঞ্চনাটক

Written by অনন্ত হিরা.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

কিছু লোক থিয়েটার করবে ‘সত্যিকারের নিষ্ঠা নিয়েই’- অগ্রজ শ্রদ্ধেয় মামুনুর রশীদ ‘থিয়েটারওয়ালা’-র প্রথম সংখ্যায় ‘অদ্ভুত আঁধার’- শিরোনামে একটি মূল্যবান প্রবন্ধে এমন একটি তীব্র বাস্তব সত্য জানিয়েছেন। আমি তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার কাছে শিশুতোষ জেনেই ‘সত্যিকারের নিষ্ঠা’ কথাটি নিয়ে আমার সামান্য অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা প্রকাশের স্পর্ধা করলাম।

ফেরা যাক একটু পেছনে। এ কথাতো অনেক আগে থেকেই বিতর্কের ঊর্ধে একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, স্বাধীনতার পর আমাদের শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফলবান বৃক্ষটি হচ্ছে মঞ্চনাটক। যেসব দল এবং ব্যক্তিবিশেষের শ্রম আর মেধায় ঐ ফলবান বৃক্ষের পরিচর্যা, এবং যার সার্থক পরিণতিতে আমাদের মঞ্চনাটক আশির দশকের শুরুর দিকটা পর্যন্ত একটা মহীরূহে পর্যবসিত, তাঁদের অনেককেই বিভিন্ন আলোচনা, সেমিনার, প্রবন্ধ রচনা, এমনকি ব্যক্তিগত আলোচনায়ও বলতে শুনেছি যে, তাঁরা একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন। কিন্তু শিক্ষা বা অভিজ্ঞতায় শূন্য থেকে শুরু করলেও ‘সত্যিকারের নিষ্ঠায়’ যে তাঁরা পরিপূর্ণ ছিলেন, সে কথা পুরো সত্তুর দশক জুড়ে তাঁদের কাজই প্রমাণ করে। কী সেই প্রমাণ? হতে পারে নিম্নরূপ-

১.
এই সময়ে দর্শনীর বিনিময়ে দর্শক নাটক দেখতে অভ্যস্ত হয়েছে।
২.
‘নাটক মঞ্চায়ন’ কথাটির পরিবর্তে ‘নাট্যচর্চা’ (যা একটি নিয়মিত অনুশীলনের বিষয়) বিষয়টিকে উপলব্ধি করে তা একটি দলগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর দাঁড় করানো।
৩.
এ সময় বেশ কিছু ভালো নাটক লেখা হয়েছে। যার সার্থক মঞ্চায়ন দেখেছি আমরা মঞ্চে। যেখানে নাট্যকার, প্রয়োগকর্তা (পরিচালক) মঞ্চপরিকল্পনা ও আলোক পরিকল্পনার সুচিন্তিত আধুনিক ব্যবহার, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দক্ষতা সব কিছুই চমৎকৃত করেছে দর্শককে, ফলে দর্শক সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে উত্তরোত্তর।
৪.
প্রথম দিকে সপ্তাহে একদিন তারপর দুই, তিন এই প্রক্রিয়ায় মাসে ত্রিশদিন এক থেকে একাধিক মঞ্চে নাটক মঞ্চায়ন একটা নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
৫.
নিয়মিত নাট্যচর্চার বিষয়টি ঢাকা থেকে বিভিন্ন বিভাগ, জেলা শহর পেরিয়ে থানা বা উপজেলা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
৬.
দেশী নাট্যকারদের ভালো নাটকের সফল মঞ্চায়নের পাশাপাশি আমরা বিশ্ববিখ্যাত ক’জন নাট্যকারদের বেশ কিছু নাটকেরও সফল মঞ্চায়ন দেখেছি।
৭.
আই.টি.আই.বাংলাদেশ কেন্দ্র এবং অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের ভারতবর্ষসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করে মঞ্চে আধুনিকতম অভিনয় ও প্রয়োগ চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটেছে। আবার বিভিন্ন সময় বিদেশী অভিজ্ঞ নাট্যদল, নাট্যনির্দেশক ঢাকায় এসেছেন এবং তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ ঘটেছে নাট্যজনদের। বিগত সাতাশবছর ধরে এই প্রক্রিয়াটিও সমৃদ্ধ ও অভিজ্ঞ করেছে আমাদের নাট্যজনদের ।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে যাঁরা ‘সত্যিকারের নিষ্ঠা’ নিয়ে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে শূন্য হাতে শুরু করেছিলেন, তাঁদেরই হাতে, তাঁদেরই মেধা, শিক্ষা, সৃজনশীলতা, শ্রম ও ‘সত্যিকারের নিষ্ঠায়’ মঞ্চনাটক আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফলদায়ক বৃক্ষতে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার পর গত সাতাশবছর ধরে আমাদের মঞ্চে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলেছে বা চলছে সেখানে সুদূর মফস্বলের একজন নাট্যকর্মী থেকে শুরু করে ঢাকার কোনো একটি শীর্ষস্থানীয় নাট্যদলের কর্ণধার- সকলের অবদান সম্মানের সাথেই স্বীকার্য। তবুও মাধ্যমটি যেহেতু সৃজনশীলতার, তাই বিগত সাতাশবছরের কর্মপ্রক্রিয়ায় কয়েকজন পরিচালক, কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রী, কয়েকটি নাট্যদল নিজস্ব সৃজনশীলতায় স্বতন্ত্র অবস্থানের দাবীদার। এ প্রসঙ্গটির এ কারণেই অবতারণা, স্বাধীনতার পর মঞ্চনাটকের সাফল্যের যে বিভিন্ন দিক এ আলোচনায় পূর্বেই উল্লেখ করেছি, ঐ সাফল্যের ভিত্তি বা মূল স্তম্ভ হিসেবে যদি আমরা কিছু মঞ্চ সফল নাটককে ধরি, তাহলে দেখবো, ঘুরেফিরে পাঁচ-ছয়টি দল, চার-পাঁচজন নাট্যকার (বাংলাদেশের) এবং আট-দশজন নাট্যপরিচালকের হাতেই ঐ কর্মটি সাধিত হয়েছে। যেহেতু স্বাধীনতার পর আমাদের নাট্যদলগুলোই সকল কাজের কেন্দ্র, তাই লক্ষ্য করা গেছে, উল্লিখিত পাঁচ-ছয়টি দলের আট-দশজন নাট্যপরিচালকের হাতেই সৈয়দ শামসুল হক, সেলিম আল দীন, মামুনুর রশীদ, আবদুল্লাহ আল-মামুন থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপীয়র, ব্রেশট, মলিঁয়ের, বেকেট, ইবসেন সার্থকভাবে মঞ্চায়িত হয়েছে আমাদের মঞ্চে। একদা যাঁরা শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার শূন্য হাতে শুরু করেছিলেন, আশির দশকের শুরু পর্যন্ত মঞ্চনাটকের বিরাট সফলতা তাঁদের ‘সত্যিকারের নিষ্ঠাকে’ই প্রমাণ করে। যদিও পরবর্তী সময়ে উল্লেখ করার মত ভালো নাটক সংখ্যায় কম হলেও মঞ্চায়িত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তবু আশির দশকের শেষে যে গুঞ্জনটি মৃদুভাবে শুরু হয়েছিলো যে, মঞ্চনাটকের মান নিম্নগামী, দর্শককে নতুন কিছু দেয়া যাচ্ছে না, মঞ্চ নাটকের দর্শক কমে যাচ্ছে, সেটা নব্বুই দশকের শেষে ১৯৯৮ সালে এসে প্রকাশ্য সরব আলোচনা (মৌখিক এবং পত্র-পত্রিকাসহ) ও সেমিনারের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

বিগত ১৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সেমিনার কক্ষে কালচারাল রিপোটার্স ফোরাম ‘মঞ্চনাটকে দর্শক কেন কমে যাচ্ছে?’ শীর্ষক একটি গোল টেবিল বৈঠক আয়োজন করে। এর কয়েকদিন পূর্বে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান আয়োজিত গ্রুপ থিয়েটার দিবসেও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়। কালচারাল রিপোটার্স ফোরাম আয়োজিত বৈঠকে সমস্যাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে বিভিন্ন ধরনের মত এসেছে। রামেন্দু মজুমদার বলেছেন ‘বেইলী রোডের গাইড হাউস বা মহিলা সমিতিতে প্রতিমাসে যে ৩০টি করে নাটক হচ্ছে তার ১৫টি দেখার অযোগ্য’। মামুনুর রশীদ দীর্ঘ সাতাশবছরে ঢাকায় একটি মঞ্চ না হবার জন্য আক্ষেপ করেছেন। যদিও গত দুই দশক ধরে এই আক্ষেপ শুনতে শুনতে নাট্যকর্মীরা ক্লান্ত। হ্যাঁ, কোনো সরকারই মঞ্চ করে দেয় নি এটা যেমন সত্য, এর চেয়ে বড় সত্য কোনো সরকারই মঞ্চ করে দেবে না। কারণ, মঞ্চে সত্য উচ্চারিত হয়, সেটা কোনো সরকারের জন্যই স্বস্তিকর নয়। একথা আমাদের শ্রদ্ধেয় নাট্যজনেরা উপলব্ধি করেন না এমনটা বলার স্পর্ধা আমার নেই। কোনো সরকার মঞ্চ করে দেয়নি এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য কোনো সরকারের কাছ থেকে মঞ্চ আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে মঞ্চকর্মীরা। আবার এক সময় ‘নিজেদের মঞ্চ নিজেরাই গড়বো’ স্লোগান দিলেও বাস্তবে তা সম্ভব হয় নি। এখানে অগ্রজ নাট্যজনদের সদিচ্ছা, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের অভাবও সমগুরুত্বে আলোচনার দাবী করে পরবর্তী প্রজন্ম। মঞ্চ হয় নি কিন্তু মঞ্চের অনেকেরই অনেক কিছু হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন পরিচালক ভারতের রতন থিয়াম ঢাকায় নাটক করতে এসে মঞ্চের করুণতম অবস্থা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। ঢাকায় যাঁরা নাটক করেন তাঁদের অধিকাংশেরই দামী গাড়ি, হাতে সেলুলার ফোন। দর্শকের অভাব নেই। দর্শকরা দামী গাড়িতে করে নাটক দেখতে আসে অথচ এদের মঞ্চ নেই কেন? রতন থিয়ামের বিস্ময়ের কারণটি ভেবে দেখবার মত। বাংলাদেশে বর্তমানে একটি নির্বাচিত দল রাষ্ট্রক্ষতায়। বিরোধীদলে থাকা অবস্থায় ঐ দলের প্রধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বিভিন্ন সময় নাট্যকর্মীদের মঞ্চের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। লক্ষণীয়, বর্তমান সরকার প্রধান ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের সঙ্গে অনেক অগ্রজ নাট্যজনেরই সুসম্পর্ক রয়েছে। তাঁরা অনেকেই (আলাদা আলাদাভাবে) ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক কারণে সরকার প্রধান ও মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু মঞ্চ প্রতিশ্রুতির কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে একত্রিত হয়ে গত তিনবছরে অগ্রজ নাট্যজনরা সরকার প্রধানের কাছে যাবার সময় করতে পেরেছেন এমনটা শোনা যায় নি।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অর্থে শিল্পকলা একাডেমিতে একটি আধুনিক মঞ্চ গড়া হচ্ছে। যদিও ৩ বার ধসে পড়ার পর বর্তমানে কাজ আবার বন্ধ। এটাকে নিয়ে অনেক নাট্যজন ও নাট্যকর্মীকে বেশ আনন্দিত হতে দেখা যাচ্ছে। আমার ধারণা শিল্পকলা একডেমি চত্ত্বরের মঞ্চটি তৈরি হলেও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ, সরকার নির্ধারিত ভাড়া, সব মিলিয়ে ঐ মঞ্চ থেকে যাবে মঞ্চকর্মীদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে- যেমনটি ছিলো শিল্পকলা একাডেমির আগের মঞ্চ। এবং যে কারণে গত সাতাশবছরেও নাট্যকর্মীরা শিল্পকলা একাডেমীকে আপন বা বন্ধু প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করতে পারে নি। শিল্পকলা একাডেমি মঞ্চে নাটক করতে গেলে একাডেমির স্টেজকর্মীদের হাতে টাকা না দিলে যে স্টোর থেকে লাইট বের হয় না বা মঞ্চের  কাজেও সহযোগিতা পাওয়া যায় না একথা অন্তত ঢাকার নাট্যকর্মী-মাত্রই জানেন। এ সকল নানাবিধ অব্যবস্থা ও দুর্নীতির কারণে বিগত কয়েক বছরে বেশ ক’বারই শিল্পকলা একাডেমি কর্মচারীদের সাথে নাট্যকর্মীদের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে যা কখনো কখনো হাতাহাতি থেকে মারামারির পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকের একটি মঞ্চ হচ্ছে ভেবে যাঁরা আহলাদিত হচ্ছেন তারা যে কল্পনারাজ্যে বিচরণ করছেন এ কথ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান নামে একটি সংগঠন আছে যার জন্ম ২৯ নভেম্বর ১৯৮১ সাল। প্রতি দু’বছর পরপর একটি সম্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং সেটাকে কেন্দ্র করে দু’মাস ধরে কে আগামী নেতৃত্বে যাবে তার জন্য গ্রুপিং, লবিং, প্রতিবছর বিশ্বনাট্য দিবসে দায়সারা গোছের একটি র‌্যালি, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিবৃতি প্রদান ইত্যাদি ছাড়া মঞ্চনাটকের সৃজনশীল মান উন্নয়নের জন্য গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান কী করেছেন এ প্রশ্ন বাংলাদেশের হাজারো নাট্যকর্মীর। লক্ষণীয় যে, উক্ত ফেডারেশনের নেতৃত্বে ক্রমশ সৃজনশীল নাট্যজনদের উপস্থিতি কমে তা একটা নামমাত্র ফোরামে পরিণত হচ্ছে। ঢাকার মঞ্চকর্মীদের নিয়মিত নাটক মঞ্চায়নের দু’টি স্থান-বেইলী রোডের দু’টি মাত্র হল। যেখানে কোনো বড় দলও মাসে এক বা দুই দিনের অধিক বুকিং পায় না নাটক মঞ্চায়নের জন্য। সেখানে প্রতি মাসে ১৫টি সন্ধ্যায় এমন নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে যেগুলো অগ্রজ নাট্যজন রামেন্দু মজুমদারের মতে দেখার অযোগ্য। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে বর্তমান এই ভয়াবহ মঞ্চ ও বুকিং সংকটেরকালে ঐ নাটকগুলো মঞ্চস্থ হচ্ছে কেন? প্রতিমাসে ১৫ দিন ঐ দেখার অযোগ্য নাটকগুলো দেখে দর্শক যদি মঞ্চনাটক থেকে মুখ ফেরায়, তাহলে সে দায়িত্ব কে নেবে? বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান কি পারে না এ প্রক্রিয়াটি বদলে কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে কিংবা প্রতিমাসে দেখার অযোগ্য যে ১৫টি দলকে হল বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে সেটা বন্ধ করে, যে সব দল ভালো নাটক করছে, যে সব নাটক দেখে দর্শক মঞ্চ থেকে মুখ ফেরাবে না, তাদের নাটকগুলো বেশি মঞ্চায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে? যাঁরা মান সম্পন্ন নাটক দর্শককে দিতে পারছে না তাদের নাট্যচর্চাকে বন্ধ করে দিতে হবে এমন কথা আমি মোটেই বলছি না। বরং ফেডারেশন ঐ দলগুলো যাতে ভালো নাটক করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমিকা নিতে পারে।

সাম্প্রকিতকালে মঞ্চনাটকের দর্শক কমে যাওয়া, মান সম্পন্ন ভালো নাটক মঞ্চস্থ না হওয়ার জন্য অনেকেই টি.ভি. প্যাকেজ নাটক ও স্যাটেলাইটের ডিস কালচারকে দায়ী করছেন। যেমন, জামালউদ্দিন হোসেন সম্প্রতি কালচারাল রিপোর্টাস ফোরাম আয়োজিত মত বিনিময় সভায় অভিযোগ করেছেন, তরুণ নাট্যকর্মীদের কোনো কমিটমেন্ট নেই। প্রয়োজনীয় পড়াশুনার অভাব, সকলেই প্যাকেজের পেছনে ছুটছে। জামালউদ্দিন হোসেনের মত করে এই অভিযোগটি আমাদের অগ্রজ অনেক নাট্যজনই করে থাকেন। একজন তরুণ নাটকর্মী হিসেবে এই অভিযোগের সকল দায় স্বীকার করেই বলছি টি.ভি. বা প্যাকেজ নাটকে কাজ কি শুধু তরুণরাই করছে? আমাদের অগ্রজরা কি এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত নন। জামালউদ্দিন হোসেন নিজেও কি একজন অভিনেতা এবং নির্মাতা হিসেবে ঐ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় নন? টি.ভি. এবং প্যাকেজে একজন পরিচালক বা নির্মাতা হিসেবে তিনি যখন ঐ মাধ্যমে কাজ করছেন, তখন কি তার তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দরকার হচ্ছে না? তিনি কি তরুণদের নিয়ে কাজ করছেন না? তাহলে একতরফা কেন তরুণরা প্যাকেজে ছুটছে এমন অভিযোগ? বাংলাদেশে প্যাকেজ নাটক নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে মাত্র চারবছর, টি.ভি. নাটক যদিও অনেক আগে থেকেই ছিলো। বাংলাদেশের মঞ্চনাটকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভালো কাজ হয়েছে পুরো সত্তুর দশক জুড়ে এবং আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। টি. ভি. নাটক তখনও ছিলো। সুতরাং টি.ভি. নাটক বা প্যাকেজ নাটক এসেই মঞ্চের সর্বনাশ করেছে, তরুণরা সব প্যাকেজে ছুটছে- মঞ্চনাটকের দুরাবস্থার জন্য এগুলো বোধহয় কোনো বড় মূল কারণ নয়। প্রসঙ্গত দু’জন অগ্রজ নাট্যজনের কথা উল্লেখ করা যায়, যাঁরা মূলত মঞ্চের লোক হয়েও বিগত সাতাশবছর টেলিভিশন মিডিয়াতে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন। এখনও করছেন। তাঁরা হলেন জনাব মামুনুর রশীদ ও আবদুল্লাহ আল-মামুন। জরিপ করলে হয়তো দেখা যাবে যে, ঐ দু’জন ব্যক্তিই গত সাতাশবছরে মিডিয়াতে সবচেয়ে বেশি কাজ করেও ঢাকার অন্যতম দু’টি নাটকের দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, দলের জন্য নাটক লিখেছেন এবং পরিচালনাও করেছেন। এবং মঞ্চের জন্য তাদের ‘সত্যিকারের নিষ্ঠা’ ছিলো বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। ঢাকার একটি অন্যতম প্রধান নাট্যদলের কর্ণধার নাসির উদ্দিন ইউসুফ এক সময় একজন দক্ষ টি.ভি প্রযোজক ছিলেন। তাতে করে তাঁর মঞ্চ নাটকে ‘সত্যিকারের নিষ্ঠায়’ কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই টি.ভি প্যাকেজ বা স্যাটেলাইট বড় সমস্যা নয়, বড় সমস্যা আমাদের অগ্রজরা যে ‘সত্যিকারের নিষ্ঠা’ নিয়ে মঞ্চনাটক শুরু করেছিলেন সেখানে একটা ক্ষয়ের শুরু হয়েছে সেই আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে। কারণ, স্বাধীনতার পর প্রথম পনের বছর মঞ্চনাটকে যে সাফল্য, তার মূল অংশীদার যে ছয়টি নাট্যদল, চারজন নাট্যকার বা আটজন পরিচালক, তাঁদের মধ্যে দু’একজন ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো দল, কোনো নাট্যকার বা পরিচালকই সৃজনশীলতায় নিজ নিজ কাজকে ছাড়িয়ে যেতে পারে নি। প্রসঙ্গত সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সম্পাদক গোলাম কুদ্দুসের একটা কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। কালচারাল রিপোর্টাস ফোরামের সভায় তিনি বলেছেন, ‘আমরা, মঞ্চকর্মীরা ঠিক আগের জায়গায় আছি কিনা ভাবা দরকার, স্বাধীনতার পর যে বিশ্বাস নিয়ে মঞ্চ নাটক শুরু হয়েছিলো আজ তা নেই। এক সময় যাঁরা মঞ্চ কাঁপিয়েছেন তাঁরা এখন অন্য কাজে ব্যস্ত’। গোলাম কুদ্দুসের ‘অন্য কাজ’ কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ এখানে। এজন্য যে, স্বাধীনতার পর আমাদের যে সব অগ্রজ নাট্যজন ‘সত্যিকারের নিষ্ঠা’ নিয়ে নাট্যচর্চা শুরু করেছিলেন, সত্তুর দশক জুড়ে এবং আশির দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আমাদের মঞ্চনাটকের যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান অর্জন যাঁদের হাতে হয়েছে তাঁরাই এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দলে নীতিনির্ধারণী কর্তৃত্ব থেকে শুরু করে দলের সকল কর্মকা-ে কমবেশি যুক্ত আছেন। উল্লিখিত দলগুলোতে নতুন বা তরুণ প্রজন্মের নাট্যকর্মীরা এখনো নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় আসতে পারে নি। আমাদের অগ্রজরা কাজের মধ্য দিয়েই নিজেদের তৈরি করেছেন, শিক্ষা আর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছেন। সেই কাজ করার সুযোগটা নতুনদের জন্য তৈরি হয় নি। তথাপি যে ক’জন পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে, তাদের মধ্যে খালেদ খান নিজ দলে এবং দলের বাইরে রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’, ইবসেনের ‘পুতুল খেলা’ এবং ‘ভৃত্যরাজকতন্ত্র’ পরিচালনার মধ্য দিয়ে পরিচালক হিসেবে তাঁর সৃজনশীলতা প্রমাণ করেছেন। এছাড়াও শামসুল আলম বকুল, ফয়েজ জহির, আলী মাহমুদ, আশীষ খন্দকার, ইশরাত নিশাত, আজাদ আবুল কালাম, তৌকীর আহমেদ, গাজী রাকায়েত তাদের কাজে সৃজনশীলতার প্রমাণ রাখছেন। তাই তরুণরা শুধুই প্যাকেজের প্রতি ছুটছে, তরুণদের কমিটমেন্ট নেই, পড়াশুনা নেই, এ-জাতীয় ঢালাও মন্তব্য না করে বরং অগ্রজদের অভিজ্ঞতার ছায়ায় তরুণদের অধিক কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি প্রয়োজন।

‘সত্যিকারের নিষ্ঠা’ নিয়ে এক সময় যারা নাট্যচর্চা শুরু করেছিলো, কম-বেশি অনেকেই সেখান থেকে দূরে অবস্থান করছে। অনেক অগ্রজ নাট্যজনকে গত একদশকে রাজনৈতিক মঞ্চ, রাজনৈতিক কলাম রচনা, ব্যক্তিগত ব্যবসা, রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদে বিভিন্ন কমিটি উপকমিটিতে নিজেদের অবস্থান সংহত করার কাজে বেশি ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। এবং এসব কারণে মঞ্চ বঞ্চিত হয়েছে তাঁদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ থেকে? সুতরাং সমস্যার মূলে না গিয়ে কেবল টি.ভি আর ডিশ কালচারের উপর দোষ চাপানো মোটেই সুস্থ বুদ্ধির পরিচয় দেয় না। এ প্রসঙ্গে অগ্রজ নাট্যজন নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর একটি উক্তি স্মরণযোগ্য। কালচারাল রিপোটার্স ফোরামের আলোচনায় তিনি বলেন, ‘মঞ্চ নাটকের দর্শক কমে গেছে একথা ঠিক। তবে নাটক শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে মঞ্চেই। বহু বছর পূর্বের কথা ভাবুন, যাদু এসেছে, সার্কাস এসেছে, সিনেমা এসেছে। ভাবা হয়েছিলো এই বুঝি থিয়েটার টিকলো না। কিন্তু থিয়েটার টিকে গেছে। ইদানিং কেউ কেউ বলেন ডিশ মঞ্চ নাটকের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। আমি একথার সাথে একমত নই। থিয়েটারের জায়গা কেউ দখল করতে পারবে না। কারণ একসময় ফিল্মের দর্শক টি.ভি তে এসেছে। অচিরেই টিভির দর্শক মঞ্চে ফিরে আসবে। তবে এ জন্য আমাদের আরও আন্তরিক হতে হবে। যারা বলেন তারকা ছাড়া নাটক জমে না, আমি তাদের সাথেও একমত নই। আমি তারকা পরিচয়বিহীন নাট্যকর্মীদের নিয়ে নাটক করে প্রমাণ করেছি দর্শক ভালো কাহিনীর পাশাপাশি ভালো অভিনয় দেখতে চায়’। আমি মনে করি অগ্রজ নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর উপলব্ধিতে সেই ‘সত্যিকারের নিষ্ঠার’ কথাই পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। স্বাধীনতার পর যে ‘সত্যিকারের নিষ্ঠা’ নিয়ে নাট্যচর্চা শুরু হয়েছিলো, আবারও ‘সত্যিকারের নিষ্ঠা’ নিয়ে শুরু করতে পারলেই সম্ভব মঞ্চনাটকের বর্তমান অন্ধকারকে জয় করা।

সবশেষে একজন তরুণ নাট্যকর্মী হিসেবে ‘তরুণদের পড়াশুনা নেই, কমিটমেন্ট নেই, সবাই প্যাকেজের প্রতি ছুটছে’ এ ধরনের ঢালাও মন্তব্যের প্রেক্ষিতে একটু কৈফিয়ত দেবার দায় অনুভব করছি। তরুণরা যে প্যাকেজের প্রতি ছুটছে এ প্রবণতাকে আমি অস্বীকার করছি না। টেলিভিশন একটি ভিন্ন জনপ্রিয় মাধ্যম, সেখানে কোনো অভিনেতা বা অভিনেত্রী একটি নাটকে কাজ করলে ন্যূনতম তিনকোটি দর্শক ঐ অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে দেখে এবং চেনে। মহিলা সমিতি হাউজফুল হলে সর্বাধিক তিনশ’ দর্শক উপস্থিত হয়। আমাদের অগ্রজরা আজ ‘তরুণরা প্যাকেজের প্রতি ছুটছে’ বলে অভিযোগ তুলছেন, তাঁরা যখন তরুণ ছিলেন এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে যখন সাপ্তাহিক ও ধারাবাহিক নাটক শুরু হয় তখন তাঁরাও কি টেলিভিশনে নাটক করতে ছোটেন নি? তাঁরাও কি টেলিভিশন মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় হয়ে সে পরিচয়কে ব্যক্তিগত প্রয়োজন, ব্যবসা ইত্যাদিতে ব্যবহার করেন নি? প্রত্যেক অভিনেতা-অভিনেত্রীই চায় অধিক সংখ্যক দর্শকের সঙ্গে পরিচিত হতে। এটাতো একটা স্বাভাবিক প্রবণতা? এ বাস্তবতাও তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে মঞ্চকর্মীটি জীবনের অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে মঞ্চনাটকে টিকে আছে। ভালো অভিনয় করে হয়তো দশ বা পনেরবছর ধরে মঞ্চে কাজ করছে। বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সকলেই জানে অমুক নাটক করে। এ অভিজ্ঞতা আমার মতো হয়তো হাজারও নাট্যকর্মীর ‘কিরে কত বছর নাটক করিস, টি.ভিতে ক্যান দেখি না? কি নাটক করিস?’ জাতীয় প্রশ্ন কি আহত করে না একজন সিরিয়াস মঞ্চকর্মীকেও? ধরা যাক অমুক দলের ‘ক’ মঞ্চে একজন নিবেদিত নাট্যকর্মী এবং খুব ভালো অভিনয় করে কিন্তু টেলিভিশনে কখনো কাজ করে নি কিন্তু ‘খ’ মঞ্চে নিবেদিত নয়, অভিনয়ও ভালো করে না। কিন্তু নানা উপায়ে সে টেলিভিশনে কয়েকটি নাটকে অভিনয় করে পরিচিত ও জনপ্রিয়, দু’জন একই দলে কাজ করে। ঢাকায় বা ঢাকার বাইরে দলের একটি মঞ্চায়নে দু’জন এক সঙ্গে গেলে দেখা যায়, দশজন তরুণ-তরুণী এসে ‘ক’ কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল ‘খ’ এর অটোগ্রাফ নিতে বা ছবি তুলতে। এই যখন বাস্তব অবস্থা তখন মঞ্চের মহামানব যাঁরা, তাঁদের হয়তো মিডিয়াতে কাজ করার মোহ না থাকতে পারে কিন্তু যাদের মোহ আছে, তাদেরকে দোষ দেয়া অন্যায় নয়কি? একথাও তো সত্যি যে গত সাতাশবছর ধরে টেলিভিশন মাধ্যমে যাঁরা অভিনেতা-অভিনেত্রী হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁদের নব্বুই শতাংশই হচ্ছে মঞ্চের লোক। তারকা কিন্তু গত সাতাশবছরে হাজারে হাজারে এসেছে এবং হারিয়েও গেছে।

টি.ভি অথবা প্যাকেজে কাজ করার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে আর একটি কারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা অর্থনৈতিক। অগ্রজ মামুনুর রশীদের একটি উক্তি আবারও স্মরণ করতে হয়। কালচারাল রিপোটার্স ফোরাম আয়োজিত সভায় তিনি বলেছেন ‘দীর্ঘ সাতাশবছরে, ঢাকায় একটি মঞ্চ হলো না অথচ পাড়ায় পাড়ায় স্টেডিয়াম হচ্ছে। এই বাস্তবতায় আমরা যে মঞ্চনাটক টিকিয়ে রেখেছি এটাই বড় কথা। মঞ্চেরকর্মীরা নিজেদের পকেট থেকে পয়সা দিয়ে নাটক করে। একজন নাট্যকর্মী প্রতিমাসে যাতায়াত বাবদ অন্তত দুই হাজার টাকা খরচ করে, প্রতিটি দল বছবের অন্তত ৫০ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা ভর্তুকি দেয়’। এর বিপরীর চিত্রটি হচ্ছে টি.ভি বা প্যাকেজে। এখন পর্যন্ত নব্বুই শতাংশই মঞ্চের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কাজ করছেন এবং টি.ভি ও প্যাকেজে কাজ করে মঞ্চে সকলেই হয়তো নন কিন্ত অনেকেই বেশ বড় অংকের টাকা পাচ্ছেন। অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের হাতছানিকে বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। সময়ের এই সংকট শুধু ঢাকাতেই নয় কোলকাতাতেও সমানভাবে বিরাজমান। যে কারণে বহুরূপীর দেবেশ রায়চৌধুরীর মত নিবেদিত মঞ্চকর্মীকেও ডি.ডি মেট্টোর টি.ভি সিরিয়ালে ব্যস্ত থাকতে হয়। এ সঙ্কট ঐ বঙ্গেও প্রায় সকল মঞ্চকর্মীর। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা নিয়ে দেবেশ রায়চৌধুরীকে প্রশ্ন করেছিলাম। উত্তর একটাই- ‘দাদা বাঁচতেতো হবে’। তারপরও দেবেশ রায়চৌধুরী মঞ্চে কাজ করছেন। আমাদের এখানেও মঞ্চনাটক হচ্ছে।

তরুণ প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে আমার ধারণা বিপাশা হায়াত এবং তৌকীর আহমেদ জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি টি.ভি এবং প্যাকেজে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও বিপাশা এখনো মঞ্চনাটককে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তৌকীর আহমেদও নাট্যকেন্দ্রের কোনো কাজ থাকলে সেটাকেই গুরুত্ব দেন। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের মহড়ায় বিপাশা হায়াতকে আমি শ্যুটিং ফ্লোর থেকে মেকআপ নেয়া অবস্থায় উপস্থিত হতে দেখেছি। মহড়া শেষ করে তিনি আবার ফিরে গেছেন শ্যুটিং ফ্লোরে। খালেদ খানকে সব সময়ই দলের মহড়া ও মঞ্চায়ন, এগুলোকে টি.ভি-প্যাকেজের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিতে দেখেছি। এই ‘সত্যিকারের নিষ্ঠা’ ছোট করে দেখাবার কোনো কারণ নেই। কেউ কেউ আছেন যারা সব সময় টি.ভি প্যাকেজকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আমার ধারণা এই প্রভেদ কম-বেশি সব দলেই বিদ্যমান। তাই কোনো মিডিয়াকে দোষারোপ নয়, প্রত্যেক মঞ্চকর্মীর ‘সত্যিকারের নিষ্ঠা’ই পারে মঞ্চনাটককে তার সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে। ঢাকায় বর্তমনে প্রথম শ্রেণীর নাট্যদলগুলোও প্রতিমাসে বেইলী রোডের গাইড হাউসে ও মহিলা সমিতিতে দু’টির বেশি বুকিং পায় না। এ অবস্থায় একজন নিবেদিত প্রাণ নাট্যকর্মীরও মাসে দু’টো শোতে অভিনয় করা, দু’টো মহড়াতে সন্ধ্যায় দু’ঘন্টার জন্য উপস্থিত হওয়ার চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকার সুযোগ নেই। এ ছাড়া বছরে বা দু’বছরে দল একটি নুতন নাটক ধরলে হয়তো দু’তিন মাস সান্ধ্যকালীন ব্যস্ত থাকা সম্ভব হয়। তারপরও কথা থাকে বড় দলগুলোতে সব প্রযোজনায় সবার কাজ করার সুযোগ থাকে না। এ অবস্থায় মঞ্চের একজন নিবেদিত কর্মী তাঁর কাজের ক্ষুধা মেটাতে যদি তার বাড়তি বা অবশিষ্ট সময়টুকু বেইলী রোডের চায়ের আড্ডায় নষ্ট না করে টি.ভি বা প্যাকেজ নাটক করাতে ব্যয় করে, সেটা বোধ হয় অযৌক্তিক বা অন্যায় কিছু নয়। মঞ্চের প্রতি ‘সত্যিকারের নিষ্ঠা’ থাকলে মিডিয়াতে কাজ করেও যে মঞ্চে কাজ করা যায় সেটা অগ্রজ অনেকেই প্রমাণ করেছেন, বর্তমানে অনেক তরুণও তা প্রমাণ করছেন।

অনন্ত হিরা : সদস্য, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় ও নির্বাহী সম্পাদক- ‘মঞ্চপত্র’