Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আড্ডায় ক’জন নাট্যজন : এস এম সোলায়মান, ফয়েজ জহির আর আজাদ আবুল কালাম

Written by অনুলিখন.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[বি. দ্র. মূল সংখ্যায় এর শিরোনাম ছিলো ‘আলাপন’। পরবর্তী সময় থেকে এ ধরনের আয়োজনকে ‘আড্ডা’ নাম দেয়া হয়েছে- সম্পাদক]

[সামগ্রিকভাবেই এক স্থবিরাবস্থা পার করছে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং অবধারিতভাবে সংস্কৃতিচর্চাও। থিয়েটারচর্চায় যে স্থবিরতা শুরু হয়েছিল এই দশকের শুরুতে, তা নিয়ে এতোদিন থিয়েটারওয়ালাদের তেমনভাবে ভাবতে শোনা যায় নি। তবে ইদানিং অনেকেই স্থবিরতার কারণ এবং করণীয়-র ব্যাপারে কম-বেশি ভাবতে শুরু করেছেন। থিয়েটারওয়ালা আয়োজিত এবারের ‘আলাপনে’- ‘আমাদের থিয়েটারচর্চায় স্থবিরতা : কারণ ও করণীয়’ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।          
 
আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা- এস এম সোলায়মান (থিয়েটার আর্ট), অভিনেতা, নির্দেশক, নাট্যকার- আজাদ আবুল কালাম (প্রাচ্যনাট) এবং নির্দেশক, মঞ্চ পরিকল্পক- ফয়েজ জহির (আরণ্যক নাট্যদল)। এই আড্ডার  সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন থিয়েটারওয়ালা সম্পাদক- হাসান শাহরিয়ার। আড্ডাটি অনুলিখন করে ছাপানো হলো]

এস এম সোলায়মান
আমার কাছে যেটা মনে হয় যে, Quality’র ব্যাপারতো আছেই ... মঞ্চনাটক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারছে কিনা, এই সময়ে এসে ... দলগুলোর অবস্থা, Inner commitment, সবকিছুতে একটা ফাঁক থেকেই যাচ্ছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য ফেডারেশন যে ভূমিকা রাখতে পারতো, আমি মনে করি যে ১০০% ফেডারেশন ব্যর্থ হয়েছে। যেমন আজকে যদি একটা ভালো Production নামে, তবে তাদের উচিত হবে তাকে Patronize করা। তা না করে যদি উল্টো কাজ করে কিংবা ফেডারেশনভুক্ত দল না হলেই যদি কোনো দল হল না পায়, তবে তো সামগ্রিকভাবেই ব্যাপারটা বুমেরাং হয়ে যাবে। প্রথম দিকে ৭০ দশকে- আমরা যখন থিয়েটার শুরু করি- যে Commitment নিয়ে শুরু করি, আজকে আমরা, এখন, সেই অবস্থানে কতটুকু আছি, সেটাও ভাবার বিষয়। নানা রকম ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি কাজে আমরা এতো বেশি Involve হয়ে যাচ্ছি যে কী বলবো ... একসময় আমরা T.S.C তে Rehearsal করতাম, তখন মনে হতো T.S.C তে না গেলে বোধহয় ভাতটাই খাওয়া হয় নি। Senior দেরতো এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই হবে যে, ৭০/৮০ দশকে যে Commitment-টা ছিল সেটা এখন আছে কিনা। থিয়েটারে কেমন যেন একটা Short cut method ঢুকে গেছে ... মনে হচ্ছে কোনো রকমে থিয়েটারটা করে ... একটা Package নাটকে ঢুকে পড়বো। Star হবো। কিন্তু সেক্ষেত্রেও এই প্রজন্ম Fail করছে। যেমন, যদি ধরি আলী যাকের ভাই, নূর ভাই, কিংবা আসাদ ভাই ... তো সে মাপের অভিনেতা Next generation-এ কোথায়? প্রতিভা নেই তা বলবো না ... মানে ... একটা Short cut method অর্থাৎ ... আমি যখন অভিনয় করি- নিজের দলের কথাই বলি, তাদের এই জিনিসটা আছে। থিয়েটারটা যে একট সার্বক্ষণিক চর্চার বিষয়, এই কথাটা আজকে নতুন প্রজন্মের অভিনেতা অভিনেত্রীরা একদম মনে করে না। ... যখন অভিনয় করি তখন যদি সহঅভিনেতাদের কাছ থেকে সে রকম কিছু না পাই ... অর্থাৎ থিয়েটারটাতো আদান প্রদানের বিষয় ... আমার থিয়েটারেও দেখা যায় যে, আজকের ’শোটা ভালো করতে হবে; মানে Real থিয়েটারের জন্য যে একাগ্রতার প্রয়োজন, যে পরিশ্রম প্রয়োজন, চর্চার প্রয়োজন, এটা একেবারেই অনুপস্থিত। তবে সামগ্রিক যে Picture, আজকে যে কথাটা আসলো ... এই ‘স্থবিরতা’ কেন আসলো ... আমি মনে করি, এর জন্য আমরা নিজেরা দায়ী। কারণ, একজন দর্শক যদি খারাপ নাটক দেখে ... এবং ভাবে যে এই নাটকই হচ্ছে, তাহলে সে আর না আসারই কথা। এছাড়া ইদানিং ... অন্যদের মুখে, পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম যে, থিয়েটার এলাকাটা কিছু বাজে লোকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে ... এটা কীভাবে দূর করা যায়। যদি So called call girl-দের Contract নাটক পাড়াতে হয়, তবে আমিতো মনে করি, যদি আমি একজন অভিনেতা না হতাম, তাহলে আমার স্ত্রী বা পরিবার নিয়ে কখনোই নাটক দেখতে আসতাম না। এই বিষয়গুলো আমরা সবাই জানি ... কিন্তু যে উদ্যোগটা নেয়া দরকার, সেই উদ্যোগটা কে নেবে? আমি না করলে ও করবে, ও না করলে অন্যজন করবে। এই যে অন্যের ঘাড়ে দায়িত্ব চাপানোটার Tendency, সে থেকেই আসলে আমরা একটা ‘স্থবির’ অবস্থায় পৌঁছে গেছি।  

আজাদ আবুল কালাম
আমার কাছে যে কথাগুলো মনে হলো ... সোলায়মান ভাই যে কথাগুলো বললেন ... আমার থেকে উনি অনেক Senior তবুও ওনার প্রত্যেক কথাই খুব যৌক্তিক মনে হয়েছে। কিন্তু একটা বিষয়ে যে কথাগুলো সোলায়মান ভাই বলতে গিয়েও বললেন না ... সেটা হলো এই প্রজন্মের অর্থাৎ ৭০/৮০ দশকের পরের প্রজন্মের অর্থাৎ আমাদের প্রজন্মের অভিনেতা অভিনেত্রীদের ‘মেধা নেই এই কথা বলবো না’ ... কিন্তু এটা মস্তবড় সত্য কথা যে, ৭০ দশকের যারা কর্মী, তারা আসলে বড় হয়েছেন ৬০ এর দশকে এবং ৬০ এর দশকে বাংলাদেশে যারা বড় হয়েছেন তারা কতগুলো জিনিস এমনিতেই পেয়ে গেছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু শিক্ষা, পারিবারিক কিছু শিক্ষা এবং ধরুন ... বাংলাদেশটা কী, দেশের ঐতিহ্য কী ... এসব জেনে গেছেন তারা, এবং সারা পৃথিবীর ভালো ভালো জিনিসগুলো ... যেহেতু কম পাওয়া যেতো ... তাই খুঁজে খুঁজে ভালো জিনিস পাওয়ার একটা প্রচ- আগ্রহ ছিলো তাদের। যারা থিয়েটার শুরু করেছিলেন ৭০ দশকে তারা সবাই থিয়েটারের লোক ছিলেন না। তাদের কেউ প্রকৌশলী, কেউ অধ্যাপনায় জড়িত ছিলেন এবং অন্যান্য ...। তাদের সবারই একটা Base ছিল। কিন্তু আমাদের Generation এর একটা ... মানে- এক অর্থে আমরা ঐ Generation এর একটা জৌলুসকে আমরা দেখতাম। জৌলুসটা দেখতাম এই অর্থে যে, আমাদের Generation এর ৫% থিয়েটার দেখতো আর ৯৫% ই দেখতো টেলিভিশন। আর টেলিভিশনে কিন্তু জৌলুসটাই দেখা যায়। সেই আলী যাকের ভাইয়ের জৌলুসই বলেন, নূর ভাইয়ের জৌলুসই বলেন বা আসাদ ভাইয়ের জৌলুসই বলেন কিংবা ফরিদী ভাইয়ের জৌলুসই বলেন। তো সেই জৌলুস দেখতে দেখতেই একদল ছেলে মেয়ে T.V তে যায়।  T.V তে গিয়ে জানতে পারে, ওনারা থিয়েটার করেন। তখন তারা থিয়েটারে আসছে, থিয়েটার করার জন্য। এবং মেধার ক্ষেত্রে এই দুই Generation এর আকাশ পাতাল তফাৎ ... আমি এই Generation represent করেই বলছি। সুতরাং মেধাহীন যারা, অর্থাৎ এত কম মেধার লোক দিয়ে থিয়েটারের মতো একটা বড় মাধ্যমে কাজ করা কঠিন। থিয়েটার কিন্তু সত্যিকারের একটা Intellectual work, এটা করার জন্য যে মানসিক Preparation, যে মেধা, যে শক্তি দরকার, সেটা সত্যিকার অর্থে আমাদের কম। ওনাদের/আপনাদের তুলনায় আকাশ পাতাল পার্থক্য। এই একটি বিষয় আছে যার জন্য থিয়েটারে Quality কাজ হচ্ছে না। কারণ, যে যতভাবেই বলুক ... সোলায়মান ভাই যদি নাটক লিখেন বা মামুনুর রশীদ ভাই নাটক লিখুন, ওনারা নির্দেশনা দিন, সবই করুন ... তারপরও কিন্তু কাজটা ওনারা একা করবেন না, Even লেখার ক্ষেত্রেও কাজটা করছে দলীয়ভাবে এবং দেখা যাবে কাজটা যাদের সাথে করছেন তারা হচ্ছে আমাদের Generation-এর, আমরা যারা ৮০ এর শেষে এসেছি, তারাই কাজটা করছি। যার ফলে ঐ মেধা বা ঐ মেধার ছাপ, চিন্তার ছাপ স্বভাবতই পড়ে না। এটা হলো একটা মেধার বিষয় যার জন্য নাটকের Quality ভালো হচ্ছে না। ... আরেকটা বিষয় আছে ৮০-র দশকের কর্মীদের। তারা ভাবে যে, দর্শকসারিতে যারা বসে আছে ওরা আমার চেয়ে কম বোঝে। এটা আমি অনেক অভিনেতা অভিনেত্রীর সাথে আলাপ করে জেনেছি যে, তারা ভাবে যারা সামনে বসে আছে তারা কম বোঝে। তো তারা কেউ বুঝতে চায় না যে, তাদের (দর্শকদের) প্রত্যেকেরই Profession আছে। প্রত্যেকের ভালো ভালো Back ground. বাংলাদেশের থিয়েটার দেখে হচ্ছে Upper middle class ... তো স্বভাবত তারা ভালো স্কুলে পড়ে, ভালো জিনিস দেখার সুযোগ পায় (অর্থনৈতিক কারণে)। তো অভিনেতা- অভিনেত্রী মনে করে, আমি যেটা করলাম সেটাই ভালো ... ও বুঝতে পারে নি এটা ওর দোষ। তো, এই যে আমরা ভাবি যে, সামনের লোকজন কিছু বোঝে না- এটা ভুল। কারণ, তারা কম Intellectual না। সুতরাং সে তার চিন্তার চেয়ে Inferior কাজ দেখতে চায় না। এটার কারণে, ঐ middle class টা, ওরা যারা AC ঘরে থাকে, AC অফিসে যায় এবং নাটকটাও দেখতে চায় AC তে ... তো এই AC হল না পেলেও তারা যদি দেখে যে তাদের চেয়ে আমরা কম বুঝি, Society সম্বন্ধে, মানুষ সম্বন্ধে ওদের চেয়ে কম ধারণা আমাদের, তখন তারা ভাববেই যে Inferior কাজ ... অর্থাৎ তাদের দেখার জন্য এটা একটা যোগ্য কাজ ভাববে না। তখন তারা চলে যাবে।

কিন্তু এই যে হাসির নাটকে লোক বেশি হচ্ছে এটার ব্যাখ্যা আমি দাঁড় করানোর চেষ্টা করবো। ব্যাখ্যাটা হলো, এই যে হাসির নাটকে খামাখা খামাখা লোক হচ্ছে। এরা Actually থিয়েটারের লোক না, থিয়েটার দেখার লোক না। এবং এরকম প্রচুর লোকের সাথে আমার পরিচয় আছে যারা তিনটা নাটক দেখেছে- ‘কঞ্জুস’, ‘খামাখা খামাখা’, ‘বিচ্ছু’। এর বাইরে তারা নাটক দেখে নি। এবং এরা হঠাৎ হঠাৎ বেইলী রোডে আসে এবং এসে দেখে যে একটা প্রচণ্ড আনন্দের ব্যাপার আছে এবং এই আনন্দটা দেখার জন্য ... অর্থাৎ ... এরা মূলত বাংলা ফিল্মের দর্শক। এবং খুব Light জিনিস দেখার দর্শক। হাসি তামাশা এগুলো দেখার দর্শক। এরা আসে এবং পরদিনই এরা পরিবার নিয়ে আসে। ... এই নাটকগুলো যখন শুরু করে, তখন পত্রিকায় বিশাল বিজ্ঞাপন দেয় যে- হাসির নাটক, দম ফাটানো হাসির নাটক- ইত্যাদি। এবং এই কর্মীদের কিন্তু সামাজিক কানেকশন আছে। যে নাটকগুলো পপুলার হচ্ছে, এখনও দর্শক পাচ্ছে, এদের দর্শক বিজ্ঞাপন দেখেই আসছে, এটা বিশ্বাস করি না। এটা নির্ভর করে সামাজিক কানেকশনের উপর। যেমন আমি একবার এক বন্ধুর কাছে, যে একটা বড় এ্যাড ফার্মে চাকরি করে, তার কাছে একটা হাসির নাটকের টিকেট দেখলাম। ঐ নাটকের শো’র ২৬ দিন পূর্বে টিকেটটা তার কাছে এসেছে। ... এটা দিল কে? ঐ দলের একজন, যিনি এসব ফার্মের কাছে অনেক কারণেই আসতে হয়। সুতরাং সে ২৬ দিন পূর্ব থেকেই এসব টিকেট বিভিন্ন জনকে দিচ্ছে। এটা ব্যবসার কারণেই করছে। ... তার মানে ব্যাপারটা হচ্ছে ... তারা প্রত্যেকটা ব্যাপারকে গুলিয়ে ফেলেছেন। থিয়েটারের সাথে ব্যবসা, ব্যবসার সাথে সামাজিকতা, এসব গুলিয়ে ফেলেছেন। আসলে আমি বলতে চাচ্ছি ... উচিত ছিল থিয়েটারের সাথে সামাজিক বিষয়টা মেলানো অর্থাৎ কালচারে রূপ দেয়া কিন্তু সেটা হয় নি বা করেন নি। তা ছাড়া নাটক জনপ্রিয় হয় কয়টা? দলগুলোর কথাই যদি ধরেন- থিয়েটার, নাগরিক, ঢাকা থিয়েটার, আরণ্যক ইত্যাদি। নাট্যকেন্দ্রেও দেখা যায় ‘বিচ্ছু’তে দর্শক হয় কিন্তু ‘তুঘলক’-এ হয় না।

ফয়েজ জহির
এটা হচ্ছে কিন্তু জনশ্রুতির কারণে। অর্থাৎ যখন একটা নাটক দেখে দর্শক অন্যকে বলে যে ঐ নাটকটায় মজা আছে, তখন তারা সেই নাটকটা দেখতে আসে।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু দেখা গেছে যে, ‘তুঘলক’-এ দর্শক না হলে ঐ দলের কর্মীরা আফসোস করেন কিন্তু ‘বিচ্ছু’ই যে `তুঘলক'কে বিতাড়িত করছে এটা বুঝতে চান না।

ফয়েজ জহির
এর জন্য তো আমরা ... মানে নাট্যকর্মীরাই দায়ী।

আজাদ আবুল কালাম
এ ক্ষেত্রে আমার একটু কথা আছে- মানে ... থিয়েটারওয়ালারাই দায়ী এটা কিন্তু আমি মনে করি না। যারা থিয়েটার দেখতে আসে, এদের একদমই দোষ নাই, এটা আমি মানি না। মানি না এ কারণে যে, এখন ... এই যে ‘স্থবির অবস্থা’ এখানে, এর জন্য কিন্তু মিডিয়ার ভূমিকা আছে। মানে ... আপনি চাইলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত T.V দেখতে পারবেন, চ্যানেল টিপলেই হলো। ২মি:, ৫মিনিট, যখন ইচ্ছা একটার পর একটা টিপতে থাকবেন। ঘরে বসে দুনিয়ার সব দেখতে পাচ্ছেন। সবচেয়ে ভালো ফিল্মটাও দেখতে পাচ্ছেন- তো এই যে এক অবস্থা, একজন ভাবছে যে ঘরে বসে ভাত খাবো আর সব দেখবো ... তবে মিডিয়ার আবার একটা Fatigue আছে, ফলে কয়েক বছর পর হয়তো তারা আবার ফিরে আসবে।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু কয়েক বছর পর মঞ্চ কি তাকে (ঐ দর্শককে) নেয়ার জন্য তৈরি হয়ে থাকবে বা থাকছে? অর্থাৎ মঞ্চে এমন কোনো কাজ হচ্ছে কিনা যে, সে কয়েক বছর পর মঞ্চেই ফিরে আসবে?

আজাদ আবুল কালাম
সেটাও একটা প্রশ্ন। আমরা সেরকম কাজ করছি কিনা।  

এস এম সোলায়মান
পাভেল (আজাদ আবুল কালাম), একটা কথা আমার মনে হয়, আমরা যারা থিয়েটার করছি, আমরা তো আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিটা প্রয়োগ করছি। ন্যাচারেলি আমরাও চাইবো দর্শক ... যে আমার নাটক দেখবে, সে বোঝার ক্ষেত্রে ... মানে- নাটকের যে কনটেন্ট, সেটা বোঝার জন্য সে-ও তার বুদ্ধি বৃত্তিটার প্রয়োগ করুক। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, নিরীক্ষাধর্মী কোনো কাজ যদি মঞ্চে করতে যাই ... সেখানে আমি খুব uneasy feel করি। কারণ হচ্ছে যে, আমার মনে হয়েছে ... মানে কয়েকটা কাজ করার পর মনে হচ্ছে ... একটু নিরীক্ষাধর্মী হলে ... ‘না না বুঝলাম না’, অথবা ‘মাথার উপর দিয়ে চলে গেল’ ... এ ধরনের বলার প্রবণতা দর্শকের মধ্যে দেখছি। অর্থাৎ যেটা এতক্ষণ বলা হলো যে, T.V-র সস্তা entertainment টা নিতে গিয়ে দর্শক আর নিজের বুদ্ধিবৃত্তিটাকে ব্যবহার করতে চাচ্ছে না। একটা নাটক বোঝার মতো পরিশ্রম সে করতে চায় না। এবং করতে চায় না বলেই কোনো experimental কাজ বা নতুন আঙ্গিকের কোনো নাটক দর্শক-গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না।

আজাদ আবুল কালাম
এটা আসলে জাতিগত বৈশিষ্ট্য। যতই বলা হোক, দর্শকের কোনো দোষ নাই তা কিন্তু না ... আমাদের বৈশিষ্ট্য হলো কোনো কিছুর উপর হামলাইয়া পড়া। এখন সবাই T.V-র উপর হামলাইয়া পড়ছে। T.V-র Model কে সবাই চেনে। তার ব্যক্তি জীবন পর্যন্ত ৮/১০ বছরের ছেলেমেয়েরা জানে। এবং ঐযে ৭০ এর দশকে থিয়েটারে কিছু লোক হামলাইয়া পড়ছিল ... খালি থিয়েটার দেখতো ... থিয়েটার ছাড়া কিছু দেখতো না ... এরা আবার Tired হয়ে গেছে।

ফয়েজ জহির
ওরা কিন্তু আছে, একদম নেই যে তা না, মানে আজকের যে দর্শক- যারা তৈরি হয়েছিল সে সময়, তারা কিন্তু আছে। তা না হলে আজকে যে কয়জন আসে, ৩০/৪০ জন ... তারা কোত্থেকে আসে? তারা কিন্তু ওরাই। এই যে বলি যে, আজকের যে হতাশা ...  হ্যাঁ, আজকে আমরা পাচ্ছি না কিন্তু অতীতে যারা কাজ করেছে তারা Positively কাজ করেছে।

হাসান শাহরিয়ার
আসলে ঐ সময়টিতে এমন কোনো কাজ হয়েছে কিনা, যাতে মনে হবে যে থিয়েটারটাকে একটা কালচারে রূপ দেয়া হয়েছে? অর্থাৎ আমি নাটক দেখি, এটাই হবে আমার Culture, এটাই আমার সংষ্কৃতি, অভ্যাস। কিন্তু অফিস করে বলবো- না ভাই সারাদিন অফিস করেছি, ক্লান্ত, এখন বাসায় যাবো ... এই যে সারাদিন অফিসের পর তার মাথা ধরে, মাথা ব্যথা করে, এটা কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবেই (সরকারিভাবে বা কর্পোরেট কালচারেই) করা হচ্ছে ... সে যেন অন্য কোনো কিছু নিয়ে না ভাবে, সুস্থ কোনো চিন্তা করতে না পারে ... সেভাবেই করা হচ্ছে। ফলে যদি তার নাটক দেখতে ইচ্ছে হয়ও ... তখন সে সস্তা ... হাসির নাটক দেখতে চায়। অর্থাৎ একটা নাট্যকর্মীর যেমন পড়াশোনার প্রয়োজন, তেমনি একজন দর্শকেরও পড়াশোনার প্রয়োজন আছে। একটা ঘটনা তার জীবনে ঘটে গেছে এমন কিছুই সে পেতে চায়। সেই ঘটনা ঘটার কারণ সে বুঝতে চায় না। কেবল হাসতে চায় ... কিন্তু তুমি অফিসে চাকরি করলে কেন Bore feel করো ... অর্থাৎ তোমাকে যে কাজ খাওয়া-পড়া দেয় সেটা করতে গিয়ে কেন তুমি আন্তরিকতা পাচ্ছো না, এর জন্য কী কী বাস্তব কারণ কাজ করছে ... এসব দ্বন্দ্ব নিয়ে যদি নাটক হয়, তবে সে দেখে না, ভাবে না। অর্থাৎ অফিসে তোমার আনন্দ পাওয়া উচিত সেটা কেন তুমি পাও না ... ওসব প্রশ্ন কিন্তু তার মাথায় আসে না। সে চায় অতি পরিচিত কোনো ব্যাপার দেখানো হোক, একটু হাস্যকরভাবে। থিয়েটার কি তার হাস্যরস উপহার দেবার জায়গা হবে?

ফয়েজ জহির
সে তার জীবন দেখতে চাইবেই। কিন্তু তারা দেখতে চায় ইউটোপিয়াকে। ইউটোপিয়া Positive অর্থে, অর্থাৎ এমন কিছু ঘটনা জড়িত আছে যেগুলো প্রতি মুহূর্তে আমাদের চিন্তার খোরাক জোগাবে। যার জন্য আজকে ... অর্থাৎ মঞ্চে এই অভাবটা দেখা যায়। তাই নয়? ...আর একটা সমস্যা হচ্ছে, সোলাায়মান ভাই বলছিলেন মেধার ব্যাপারটা ... মেধা আছে এবং সেটা হচ্ছে ... আসলে জায়গা তো তৈরি নয়, God gifted নয় ... মেধা তৈরি হওয়ার বিষয়। সেক্ষেত্রে হচ্ছে কী ... আমাদের আসলে কৌতূহলটা নাই, আমরা যারা নাটক করছি তারা কৌতূহলী নই, যারা দেখতে আসছেন তারা কৌতূহলী না। তাদেরকে তৈরি হবার জন্য যে Input-টা দেয়া উচিত, খোরাক জোগানো উচিত, সেটাও করছি না। সব দিক থেকেই কিন্তু বিষয়টা আসছে।

হাসান শাহরিয়ার
যেহেতু দর্শক আপাতত আমাদের হাতে নেই অর্থাৎ দর্শকের দোষ থাকে তা থাকুক, আমরা যদি প্রথমে আমাদের দোষগুলোকে বের করতে পারি যে, হ্যাঁ আমাদের এই এই দোষ এবং সেই দোষ শোধরাই, তাহলে দর্শককে ধরতে পারবো যে, দর্শক তুমি কেন আসো না? কারণ আমরা দেখছি যে, আমাদেরও এমন কিছু কিছু দোষ আছে যেগুলো মারাত্মক। যাদের একটা নাটক Run করছে, সে যদি মাসে একটা শো’ করে এবং যারা তিন/চারটি নাটক Run করাচ্ছে, তারাও যদি একটা শো’ করে তবে ... সেতো তার নাটকটা দর্শকের কাছে দিতেই পারছে না- মঞ্চের অভাবে। এখন দু-একটা আলোচনা শোনা যায় নাট্যপাড়ার যে, খারাপ নাটকের মঞ্চায়ন কোনোভাবে কমানো যায় কিনা, ভালো নাটকগুলো বেশি বেশি করানো যায় কিনা। এ প্রসঙ্গ উঠলে ফেডাশেন বলে যে, আমরা কী করতে পারি। ... তো আমরা যদি এখানে বের করতে পারি যে, আসলে কিছু করার আছে কিনা ... মানে, যদি খারাপ নাটক হয় তবে তো একদিন ‘জামাত’ও এসে বলবে আমরা নাটক করবো। গণতান্ত্রিক অধিকারতো সবারই আছে ... তো এ ক্ষেত্রে আসলে ফেডারেশন কোনো ভূমিকা রাখতে পারে কিনা?  

আজাদ আবুল কালাম
এ ক্ষেত্রে আমার মনে হয় ... গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এই কাজগুলো করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ... গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পালন করে দু’একটা উৎসব আর আছে মস্ত বড় একটা ইলেকশন। এই কাজগুলো করতে পারলেই তারা খুশী। যার ফলে এরা ... মানে ... এখন যে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন আছে ... ভবিষ্যতে কী হয় জানি না ... এটা দিয়ে কখনো বাংলাদেশের থিয়েটারের অপকার ছাড়া উপকার হবে না। ঐ উৎসব-ভাষণ-নির্বাচন-বিবৃতি ... এই নিয়ে তারা ভীষণ খুশী। এবং দেখেন, থিয়েটারে এখন যারা নেতা ... বাংলাদেশে ... তাদের ৮০% হচ্ছে Non practitioner. তারা থিয়েটার করে না, তারা থিয়েটারের সামনে চেয়ার নিয়ে বসে থাকে। আর ২০% হলেন active, যারা থিয়েটার করেন। আর সেই ২০% মধ্যে অনেকেই এখন থিয়েটার থেকে একধরণের retirement-এ চলে গেছেন। তাদের কাছে থিয়েটার হচ্ছে অন্যান্য কাজের মধ্যে বের করা একটা সময়। এখন তারা বাংলাদেশের থিয়েটার নিয়ে কতটুকুই ভাবতে পারবেন? তাদের দ্বারা ভাবা সম্ভব না, এটা বাস্তবতা।

হাসান শাহরিয়ার
আচ্ছা, তাদেরকে যদি সংখ্যায় আমরা ধরি যে কম কিন্তু শক্তিশালী তাহলে এটার বিকল্প ... মানে আমাদের তো এখন কিছু করতে হবে। আপনি বললেন তাদের দ্বারা হবে না। আমার কথা হলো, একটা সময় কিন্তু প্রজন্ম আমাদের দায়ী করবে যে, এই কয়েকজন লোক এই এই অকাজ করলো আর তোমরা তা মেনে নিলে? এমন প্রশ্নের মুখোমুখি ভবিষ্যতে হবো না পরবর্তী প্রজন্মের কাছে? তাই বলছি বিকল্প কিছু করা যায় কিনা।

ফয়েজ জহির
বিকল্প পথ মানে কি? ফেডারেশনকে বাদ দিয়ে?

হাসান শাহরিয়ার
না না, ফেডারেশনকে বাদ দিয়ে নয়, তাকে সুস্থভাবে গড়ে তোলা ... অর্থাৎ ফেডারেশনতো চালিত হবে creative কর্মী দ্বারা অর্থাৎ সৃজনশীল নাট্যকর্মীই ফেডারেশন চালনা করবে ...

ফয়েজ জহির
ফেডারেশনের কাজটা কী হবে? ফেডারেশন যা করছে ... এক সময় ছিল থিয়েটার আন্দোলন বা চর্চা, তখন তার ভূমিকা কী ছিল? আজকের প্রেক্ষাপটে তারা কী কাজ করবে? হল বরাদ্দ দেয়া ছাড়া আর ... পাভেল যেটা বলল ... নেতৃত্ব দেয়া ছাড়া তারতো কোনো কাজ নেই ... তাও নিজেদের হল (hall) না। ... নিজেদের হল হলে ঠিক আছে, আপনি বরাদ্দ দিন কিন্তু অন্যের হলে বরাদ্দ দিচ্ছেন ... এবং বরাদ্দের নমুনা কী তাতো দেখতেই পাচ্ছি ... ওমুকের বিয়ে, তোমুক গাড়ির হেড লাইট ... তারাই পাচ্ছে ... উৎসবে তারাই নাটক পাচ্ছে ... মানে গ্রুপ থিয়েটারের নিজেরই সম্ভব হচ্ছে কি সুস্থ থাকা? ... বরং অসুস্থ চর্চায় তারা অন্যদেরও টেনে নিয়ে আসছে। অর্থাৎ ফেডারেশনের তো যে কাজ করার দরকার ... তার বিপরীত কাজগুলোই কিন্তু সে করছে। ... যেটা আমাদের কাজের জন্য অন্তরায়।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু সেখানে তার ভূমিকা কী হওয়া উচিত, এব্যাপারে আমার মনে হয় সোলায়মান ভাই কিছু বলতে পারেন। আপনিতো কয়েক বছর সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে থেকেছেন।

এস এম সোলায়মান
আমি একটা কথা বলি। ফেডারেশনের যে conception দাঁড়িয়ে গেছে ... ফেডারেশন কে চালাচ্ছে? ... নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা ... অর্থাৎ creative জায়গাটা বাদ দিয়ে যখন নাট্যনেতা তৈরি করার tendency develop করে, সেখানে ফেডারেশনের কাছে আমাদের চাওয়ার কিছু থাকে না। একটা সময় ছিল ফেডারেশনের, যখন ... মানে আমি যতটুকু মনে করতে পারি ... কোনো একটি দলকে সদস্যপদ দেয়া হয় নি ... তার প্রথম কারণ হচ্ছে, নাটকের নাম ‘পাগলা কুত্তা’, ... তো যার নাটকের নামের মধ্যেই একটা অশ্লীল ব্যাপার থাকে, ঐ দলতো মেম্বারশীপ পেতে পারে না। ... তাহলে আজ এই যে বিজ্ঞাপনের বহর, ‘চিকন হাসির নাটক’, ‘খুবই হাসির নাটক’ ... এই যে পণ্য ... পণ্যের conception, এটা কন্ট্রোল করবে কে? করবে ফেডারেশন ... তো সেখানেতো creative লোকদের ব্যাপারে বলাই হলো ... তারাতো কিছু করছে না ... তাহলে যারা এখনো সুস্থ চিন্তা করছে তারা মিলে ... না, আমি পাল্টা কিছু করার বিপক্ষে ... ফেডারেশন থাকুক, অন্যরা যদি এক জায়গায় বসে আলোচনা করে বের করতে পারে ... কীভাবে ভালো নাটককে patronize করা যায় অথবা থিয়েটারটাকে কীভাবে আরও গতিশীল করা যায়, আমাদের creative বুদ্ধি দিয়ে, এমন একটা ফোরাম হতেই পারে।

হাসান শাহরিয়ার
আচ্ছা, বিজ্ঞাপনে একটা কথাতো লেখা যায়, নাটকের ধরনের ব্যাপারে ... Tragedy, যেমন Shakespeare-এর Tragedy. তো সেভাবেই তো ওরা আবার বলবে আমি কেন লিখবো না যে, ‘হাসির নাটক’। অর্থাৎ Comedy না লিখে আরও বিশদভাবে ‘হাসির নাটক’ লেখে ... অর্থাৎ ব্যাপারগুলো এতো sensetive যে তাদেরকে নীতিগতভাবে কিন্তু আটকানো যাচ্ছে না।

ফয়েজ জহির
আটকানোর প্রশ্ন আসছে না। কিন্তু ঐ নাটকগুলোকে patronize করা- এটা কিন্তু ঠিক না। কখনোই করতে দেবো না বা বাধা দেয়া কখনোই উচিত না ... আমরা কী করতে পারি ... আমাদের শক্ত করে দাঁড়াতে হবে।

হাসান শাহরিয়ার
বাধা দেয়া না, আমাদের যে representative আছে, ফেডারেশন, তাকে কিন্তু কিছু initiative নিতেই হবে।

আজাদ আবুল কালাম
আমার মনে হয় কি, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন নিয়ে যে আমরা আলোচনা করছি ... আমরা একটা Dead horse নিয়ে আলোচনা করছি।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু সে তো আমাদের উপর কর্তৃত্ব খাটাচ্ছে।

আজাদ আবুল কালাম
হ্যাঁ, কিন্তু আমরা যদি তাকে ঠিক করতে চাই তাহলে ... শ্রেফ Dead horse কে ঠিক করতে হবে যা অসম্ভব। কারণ, এটার কোনো কাজ নেই ... এটা কী হওয়ার কথা ছিল? হয় এটা হতে পারতো একটা collective bargaining agency যা Government এর সাথে বসে বলবে- আমাকে এটা দাও সেটা দাও বা ২০টি দলের মধ্যে একটা দল ভালো নাটক করছে তার ব্যাপারে বলবে যে, সবাই ঐ নাটকটা দেখবেন ... এই দলটার শো’ এর সংখ্যা বাড়াতে হবে ইত্যাদি। অথচ ফেডারেশনের কর্মকর্তারা নিজেদের নাটকের ব্যাপারে বেশি concern. নেতারা অন্য দলের কী নাটক হয় সেটা জানেন কিনা এটা নিয়েও সন্দেহ আছে। এক ঊর্ধ্বতন সদস্য যখন বলেন যে, তিনি নাটক দেখতে পারেন না, কারণ নাটক bore লাগছে, তখন আর কী বলবো। উনি ব্যক্তি হিসেবে বলতে পারেন কিন্তু ফেডারেশনের প্রথম কর্তাব্যক্তি হিসেবে তিনি একথা বলতে পারেন না। কারণ, সে অনেক বেশি responsible.

হাসান শাহরিয়ার
যেগুলো boring লাগছে সেগুলো উল্লেখ করা হোক, এবং এগুলোর মঞ্চায়নের জন্য তো তিনিই responsible তাই না?

ফয়েজ জহির
আসলে ঐ ব্যাপার নিয়ে কথা বলাটা আমি মনে করি কোনো output দেবে না।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা কি মঞ্চ সমস্যার কথা তুলতে পারি?

আজাদ আবুল কালাম
এই সমস্যার কথা শুনতে শুনতে তো কান ঝালাপালা হয়ে গেল ভাই।

হাসান শাহরিয়ার
আমি অন্যভাবে বলতে চাচ্ছি। বলতে চাচ্ছি ইদানিং সবাই বলছে মঞ্চ একটা বড় সমস্যা। কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের নাট্যচর্চায় এমন কতগুলো নোংরা ব্যাপার ঢুকে গেছে যার ফলে আরও দু’একটা মঞ্চ হলেও নাট্যচর্চার গতির কোনো পরিবর্তন হবে না। এটা মনে হওয়ার কারণটা আমি স্পষ্ট করতে চাই। কারণটা হলো ... আমাদের আলোচনায় এসেছে যে, খারাপ নাটকগুলো আমাদের দর্শক কমিয়ে দিচ্ছে। কয়েকদিন আগে গ্রুপ থিয়েটার দিবসে রামেন্দু’দা বললেন যে, ঢাকায় ত্রিশ দিনের মধ্যে পনের দিন এমন নাটক হয় যেগুলো দেখার অযোগ্য। তা একজন দর্শক যদি randomly নাটক দেখেন তবে তার খারাপ নাটক দেখার সম্ভাবনা ৫০%। এখন যদি আরও মঞ্চ হয় এবং সেগুলো এমন ‘গণতান্ত্রিক’ প্রক্রিয়ায় বন্টিত হয়, তবে তো সেখানেও দর্শকরা প্রতারিতই হবে। এবং দর্শক চলে যাবে ... যদিও ‘চলে যাবার’ প্রশ্নটি ‘আসার’ সাথে সম্পর্কিত .... মানে অতিরিক্ত মঞ্চ কি আমাদের সমস্যার সমাধান দিতে পারবে?

আজাদ আবুল কালাম
আমিও একমত। কারণ, ঢাকার লোক সংখ্যা প্রায় ১ কোটির মতো। কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায় ৫০০ দর্শক নাটক দেখে না।

ফয়েজ জহির
তাও আবার যদি ৩০ জন দর্শক হয়, তারমধ্যে পনেরজন নাট্যকর্মী। তার মানে দর্শকের মধ্যে যে চিন্তাটা হওয়ার কথা, ভাবনাটা হওয়ার কথা, সেটা হয় নি।

আজাদ আবুল কালাম
ঢাকায় নাটক দেখার লোকের কিন্তু অভাব নেই। আজকে ইংল্যান্ডের একটা তৃতীয় শ্রেণীর থিয়েটার আসুক, সবাই হামলাইয়া পড়বে। ... থিয়েটার কিন্তু থিয়েটারের লোকজনই দাঁড় করায় না, থিয়েটার দাঁড় করায় সামাজিকগণ। নিজের দেশের জিনিস দাঁড় করানোর initiative নিতে হয়। সেই লোকজন কি এখন আছে?

এস এম সোলায়মান
আরেকটা বিষয় বোধ হয় আমরা আলোচনার মধ্যে আনি নি, সেটা হচ্ছে ... স্বপ্নটা কোথায় আমাদের? যেমন আমি আমার দলকে বলি ... আমার যদি স্বপ্ন থাকে যে আমি স্যার লরেন্স অলিভিয়ারের মতো অভিনেতা হবো, ঐ স্বপ্নে reach করার জন্য আমাকে প্র্যাক্টিস করতে হবে। সেক্ষেত্রে আমি স্বপ্নে যদি না-ও পৌঁছাই ... পাভেলদের মতো অভিনেতা হবো at least (পাভেলের বিনয়ী হাসি)। আর আমার স্বপ্নটাই যদি হয় ছোট ... যে আমি কী হতে চাই, আমি এস এম সোলায়মানের মতো অভিনেতা হতে চাই (সবার চোখে চোখ ও মৃদু হাসি) ... তাহলে কী হবে? ... তো আমার মনে হয় আমরা আমাদের সেই স্বপ্নই এখনো target করি নি। ... তাছাড়া আমরা এখন কিন্তু একটা ... সামগ্রিকভাবেই অবক্ষয়ের সময় পার করছি। ... সেদিন আমার গ্রুপেই একটা ছেলে আসলো ... কাজ করবে ... বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ... কী কী প্রসঙ্গে যেন বলা হলো যে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা কে? ... তো সে বললো- খুব সম্ভবত কাজী নজরুল ইসলাম।

ফয়েজ জহির
আরেকটি tendency grow মৎড়ি করছে তা হলো ফ্রি টিকেট চাওয়া। নাট্যকর্মীদের মধ্যে অনেকেই বলে যে ... তোমার নাটকের একটি টিকেট দিও দেখে আসবো। ... পত্রিকার লোকজন তো বলেই।

এস এম সোলায়মান
আরেকটা ব্যাপার ... আমরা বোধ হয় আলোচনায় একদমই আনি নি। সেটা হচ্ছে আমাদের নাটক যতদূর অগ্রসর হয়েছে তার সাথে তাল মিলিয়ে নাট্য critic গড়ে ওঠে নি। পত্রিকাগুলোতে কিছু আনকোরা নাট্যসমালোচক গৎবাঁধা কিছু সমালোচনা লিখে রাখে ... আলো মানানসই ... সেট ডিজাইন আরেকটু ভালো হলে ভালো হতো ... অভিনয়ে কেউ কেউ উৎরে গেছে ইত্যাদি। তো আসলে নাটককে এগিয়ে নিতে হলে নাট্যসমালোচক গড়ে ওঠা খুবই জরুরি। আর দৈনিক পত্রিকাগুলোও কয়েকটি দলের নাটকের বাইরে অন্যদলের নাটকের প্রচারের কোনো দায়ই অনুভব করছে না। ... আমার কাছে ঐ দিন এক সাংবাদিক আসলো নাটকের উপর জানতে ... আমি জিজ্ঞেস করলাম ... তুমি কতদূর পর্যন্ত পড়াশুনা করেছ। সে বলল ... সে মাদ্রাসা থেকে পাশ করেছে। ... তো এই যে অবস্থা। মাদ্রাসা থেকে এসে সরাসরি পত্রিকার সংস্কৃতির পাতায় ঢোকা- কী বলবো- এটাও একটা বিরাট অন্তরায়।

ফয়েজ জহির
আমার মনে হয় নাটককে আমরা দর্শকদের কাছে নিয়ে যেতে পারি নি। হ্যাঁ, বেইলী রোডে দর্শক হচ্ছে না- কিন্তু আমরা কি অন্য কোনো space খুঁজেছি নাটক করার জন্য? হ্যাঁ, এক সময়ে পথনাটক হয়েছে- কিন্তু সেগুলোতো কোনো নাটক না। এখন পথনাটকতো বন্ধ। কোনো theam নেই, বক্তব্য নেই- তো আমরা কি পেরেছি- দর্শকের কাছে যেতে? মিরপুর ... বা অন্য কোথাও সবাই মিলে শো’ করা যেতো। কই আমরা কি উদ্যোগ নিয়েছি? দর্শকের কাছে গিয়ে যদি দেখতাম ওরা আসে না তখন না হয় ...

আজাদ আবুল কালাম
আরেকটা ব্যাপার মনে হয় ... এটা senior দের উপরই বর্তায় যে, ওনারা নাটকটা এ্যামেচার হিসেবে নিয়েছেলেন ... বাস্তবিক কারণেই ... কিন্তু ওনারা সব সময় ঐটাকে এ্যামেচার হিসেবেই রাখতে চেয়েছিলেন। আমরা যারা পরে এসেছি ... তাদেরকেও ওনারা শিখিয়েছেন এ্যামেচার হিসেবে থাকার জন্য। ওনারা যে profession বেছে নিয়েছিলেন সেটা অনেকটা এই নাটক সম্পর্কিত, যেমন এ্যাড ফার্ম, তারপর এই যে, সোলায়মান ভাইয়ের স্টুডিও প্রভৃতি। সুতরাং ওনাদের আয়ের কোনো ক্ষতি হয় নি অথচ নাটকটা এ্যামেচারই রয়ে গেল। কিন্ত এটা ঠিক যে, নাটক থেকে টাকা নেয়ার চিন্তা করতে হবে। থিয়েটার না দিলে সরকারকে চাপ দিতে হবে ... সব দেশেই, যেখানে থিয়েটার চর্চা উন্নত হয়েছে সেখানে এগুলো আছে। এই যে ‘যাত্রা’ ... ‘যাত্রা’র যত খারাপ অবস্থাই হোক তারা কিন্তু দাবী আদায় করে ছেড়েছে। যাত্রার season-এ ভালো টাকা আয় করে। সুতরাং সখের থিয়েটার করলে সরকারও আমাদের সাথে সখ করবে। এই জায়গায় ...  যদিও বাস্তবতার কারণেই তারা করেছে ... আগের জেনারেশনের একটা lack ছিল।

ফয়েজ জহির
ওনারা নিজেরাও যান নি, অন্যদেরও ঐসব ভাবনা থেকে দূরে রেখেছেন। ঐ struggle-এ নিজেরাও যান নি, অন্যদেরও যেতে দেন নি ... অনুপ্রাণিত করেন নি।

আজাদ আবুল কালাম
আর কিছু ব্যাপার আছে। কোনো কাজে পয়সা কম আসে, কোনো কাজে পয়সা বেশি আসে। তো যদি দোকান দেন তো পয়সা বেশি আসবে আর নাটক করলে পয়সা কম আসবে। এটা আমরা মেনে নিতে পারি নি। থিয়েটারওয়ালারা চেয়েছে নাটকের মাধ্যমে গাড়ি বাড়ি করতে। ... তো সেটা পেয়েছে ...

ফয়েজ জহির
থিয়েটারওয়ালারা পেয়েছে, থিয়েটারতো পায় নি।

হাসান শাহরিয়ার
এগুলোতো স্থবিরতার কারণ আলোচনা করা হলো। যদি এখন উত্তোরণের কথা কিছু বলা যায় ...

এস এম সোলায়মান
উত্তরণের কথা আসলে ... আসলে সমস্যাটা যেটা দাঁড়িয়ে গেছে ... আলোচনায় এসেছে যে, আমরা থিয়েটারকে profession হিসেবে নিতে পারলে আমাদের থিয়েটারে অনেক অনেক sincerity develop করতো। ব্যাপার হচ্ছে ... আমাদের দেশে যখন থিয়েটার চর্চাটা develop করতে করতে কালচারের দিকে যাচ্ছিলো ... ঠিক সেই সময়েই কিন্তু Theatre culture টা develop করতে পারে নি। মিডিয়া একটা সমস্যা কিন্তু এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয় নি, হবেও না। যদি Broad way’র কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে মিডিয়ার আখড়ার মধ্যে ওরা বেঁচে আছে। ... তার মানে থিয়েটারকে বাঁচাতে হবে তার নিজস্ব শক্তি দিয়ে। সেই শক্তির উপাদানগুলো আমরা তৈরি করতে পারি নি। যে কারণে আজকে থিয়েটারের প্রত্যেকটা স্টেপের মধ্যে নানা রকম প্রবলেম ফেইস করতে হচ্ছে। .

হাসান শাহরিয়ার
এই উপাদানগুলো কী কী হতে পারে?
 
এস এম সোলায়মান
একটা হতে পারে প্রফেশনালিজম, থিয়েটারটাকে প্রফেশন হিসেবে নেয়া। এর জন্য সমস্যা মনে হতে পারে মঞ্চ সমস্যা। কিন্তু তার চেয়ে বড় প্রশ্ন আজকে থিয়েটারকে প্রফেশন হিসেবে নেয়ার মতো সাহস আমার আছে কিনা। কে নেবে?

আজাদ আবুল কালাম
অন্য উপাদানগুলো?

এস এম সোলায়মান
আরেকটা হচ্ছে inner commitment. একজন অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক, কর্মী হিসেবে। আমার যেটা মনে হয় ৮০ এর দশকে আমার মধ্যে যে commitment-টা ছিল আজকে ৯০ এর শেষ প্রান্তে এসে সেই commitment-গুলো আমার মধ্যে নেই। আগে যে তারুণ্য ছিল, থিয়েটারের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা ছিল- ভালে থিয়েটার করতেই হবে ... এটা হতে পারে যে, চারপাশের পরিবেশ আমাকে বদলে দিচ্ছে। কারণ, যখন আমি আশপাশে দেখছি সবাই নাটক করতে হয় বলে করে, এই জাতীয় মনোভাব নিয়ে যখন আমার সাথে কাজ করতে আসবে ... একটা পর্যায়ে মানুষ ... আমিওতো মানুষ ... আমার ভেতর থেকে সেই commitment চলে যাচ্ছে ... তখন হয়তো মনে মনে বলি, ok করুক, সবাই করছে আমিও করলাম- কারণ থিয়েটার থেকে আমি পাচ্ছিটা কী?

ফয়েজ জহির
এখন কী পেতে চাই? এখন যারা really থিয়েটার করতে চাই তারা কি থিয়েটারটাকে শুধুই প্রাপ্তির দিক থেকে দেখছি? ৮০ দশকে নাট্যকর্মীরা যেভাবে এক কাপ চা ভাগ করে খেত এখনো কি এমন কর্মী নেই? আছে, এখনো আছে ... একেবারেই নেই তা কিন্তু না। ... পাভেল যেটা বললো ক্ষেত্রটা তৈরি করার ব্যাপারে যে ভূমিকা ছিল আপনাদের প্রজন্মের, সেই ভূমিকা না নেয়ায় এখন ওরা হতাশ।

হাসান শাহরিয়ার
আসলে আমার মনে হয় আপনারা (এস এম সোলায়ান) অর্থাৎ আগের প্রজন্মের কথা বলছি ... তাঁরা যেভাবে নাটক করেছেন তা দিয়ে ১০/১৫ বছরই নাটক করা যায়। নাটক এসেছে ... নতুন ব্যাপার ... দর্শক আসছে, নাটক দেখছে ... এভাবে। কিন্তু একটা সময় দর্শকও চাইবে যে তোমার আর পরিবর্তন কোথায়? সেটা যে শুধু ফর্মের পরিবর্তন তা না ... আমার মনে হয় আমরা চিন্তাও করছি আগের মতো। অর্থাৎ নাট্যসংস্কৃতি গড়ে ওঠার কোনো ভিত্তি রচিত হয় নি যা দিয়ে থিয়েটার অনেক দিন বেঁচে থাকবে অর্থাৎ সোলায়মান ভাইয়ের সেই উপাদানগুলো তৈরি হয় নি।

আজাদ আবুল কালাম
আমার কাছ আরেকটা জিনিস মনে হয় যে, সেই শুরু থেকেই নাটক করা ছাড়া থিয়েটারটাকে আমরা আর কিছু ভাবতে পারি নি। থিয়েটার যে literature-এর একটা part, এটা আমরা কেউ ভাবি নি। আমরা যারা থিয়েটার practitioner সেই practitioner-দের মধ্যে সত্যিকারের অর্থে এটাকে literature এর জায়গা থেকে দেখা ... সেই লোকের সংখ্যাও খুব কম। ব্যাপারটা হচ্ছে নাট্যসাহিত্য, বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্য ... এটা যদি পড়তে যান, আপনি কয়টা নাটক পাবেন? দেখবেন যে, যে কয়টা নাটক literature হিসেবে পড়তে চান ... সেগুলো সাহিত্যের লোকদের। সেলিম আল দীন, সৈয়দ শামসুল হক এঁদের ... কারণ, এরা সাহিত্যের back ground থেকে এসেছেন। even যারা populer নাট্যকার, তারাও নাটকের প্রায়োগিক বিষয়ে জোর দিতে দিতে থিয়েটারের সাহিত্যের দিকটা hamper করেছেন। কন্টেন্টের ব্যাপারে কিন্তু একটা বিশাল শূন্যতা রয়েই গেছে। ... এটা আমার মনে হয় সাহিত্য অনুগামী না হওয়ার কারণে। তবে আর যাই হোক সব চেয়ে বড় সমস্যা হলো দর্শক। এখন এই দর্শক কীভাবে আনা যায় এটা নিয়েই বেশি ভাবা দরকার।

এস এম সোলায়মান
এই যে মঞ্চ নাটক-টেলিভিশনে হয়- সেটা দর্শকতো দেখে। আমি তিন/চারটা নাটক দেখেছি, তো দেখার মতো ধৈর্য আমার ছিল না। যে মঞ্চনাটকগুলো টেলিভিশনে হচ্ছে, একজন দর্শক ঐ নাটক দেখলে তার কিন্তু মঞ্চে কোনোদিন আসার রুচিতে কুলোবে না। আমার মনে হয় এতে মঞ্চ নাটকের জনপ্রিয়তা কমছে।
 
আজাদ আবুল কালাম
মঞ্চ নাটকের যে আবেদন মঞ্চে থাকে তার কোনো আবেদনই টিভিতে থাকে না। টিভিতে কেন মঞ্চ নাটক দেখানো হয় আমি বুঝতেই পারি না। এটা বন্ধ করা উচিত।

ফয়েজ জহির
কিন্তু দেখানো যায়। তবে তা নতুনভাবে direction দিয়ে। আমরাতো B.B.C- র production দেখছি। টিভির জন্য তৈরি করার ব্যাপারটাইতো আলাদা। তা না করে মঞ্চের সামনে ক্যামেরা ধরে shoot করা- এগুলোর মানে হচ্ছে একজন director কিছুই জানেন না অথচ তিনি direction দিচ্ছেন- আশ্চর্য!

এস এম সোলায়মান
একটা কথা কিন্তু স্বীকার করতেই হবে থিয়েটারকে দাঁড়াতে হবে তার নিজস্ব শক্তির উপরে ... এর কোনো বিকল্প নেই। দু’টো বিষয়- একটা হচ্ছে যে, থিয়েটার দিয়ে দর্শককে আকৃষ্ট করতে হবে এবং সেখানে বিষয় নির্বাচনে বৈচিত্র্যের ব্যাপার, production টেকনিকে নতুন কিছু ... দর্শক যেন অনুধাবন করতে পারে যে, আমি নতুন কিছু দেখছি। এছাড়া বিকল্প কিছুতো দেখছি না। কারণ, ফয়েজ জহির যেটা বললো ... বিকল্প মঞ্চের কথা ... বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টার ... মিরপুর হোক ... উদ্যোগটা নিতে হবে।

ফয়েজ জহির
মঞ্চ না হোক ... খোলা জায়গাতেই করবো। স্পেস খুঁজবো। শহীদ মিনার কেন? অন্যত্রও করাবো। টাকা-পয়সা আমরা বেইলী রোডে পাই না, অন্যত্রও পাবো না। কিন্তু থিয়েটারটাকে দর্শকের কাছে নিয়ে যাওয়া গেল- বিকল্প স্পেস খুঁজতেই হবে। আসল থিয়েটার ... মানে প্রপাগাণ্ডামূলক থিয়েটার না- আঙ্গিক, বিষয় নির্বাচন সব দিক থেকে fruitful নাটক নিয়ে যাব। struggle যদি করিই তবে output এর কথা চিন্তা করবো না কেন? দর্শক যদি ওখানে কৌতূহলী হয়- কৌতূহলটা তাহলে আসবে যে, দেখি মহিলা সমিতিতে ওরা কী করে। দর্শক কী রিয়েক্ট করে সেটাও বিষয়। আমরা এখানে বসে না থেকে দর্শকের কাছে যাই। তাহলে সামাজিকীকরণের বিষয়টা ... যে কথাটা আসলো যে থিয়েটার কালচার গড়ে তোলা- সেটা সম্ভব।

আজাদ আবুল কালাম
সোলায়মান ভাই যেটা বলছিলেন, Quality Theatre-এর কথা। আমার কাছে প্রথম শর্ত এটাই মনে হয়। Quality Theatre ছাড়া দর্শক টানা যাবে না। ... অন্যত্র থিয়েটার করা ... জহির ভাই তোমার নিশ্চই মনে আছে যে, আরণ্যক একবার চিন্তা করেছিলাম ... ঢাকায় যে কয়টা কমিউনিটি সেন্টার আছে সেই কমিউনিটি সেন্টার গুলোর মোটামুটি আমরা লিস্ট নিয়েছিলাম ... সেসব জায়গায় থিয়েটার করা। একটা ভাবনা ছিল ... আলটিমেটলি কাজটা হয় নি। ইনিশিয়েটিভটা শেষমেষ নেয়া হয় নি। যাই হোক আমার মনে আছে T.S.C তে বহু আগে ... নাটক নামার আগে যে উদ্দীপনা ছিল, senior রা-ও দৌঁড়াদৌঁড়ি ... এটা আনো ... রং করো ... সেই উদ্দীপনা বা উন্মাদনা ... সেই শক্তি নিয়ে যদি আমাদের প্রজন্মের কর্মীরাও ঝাঁপিয়ে পড়ে ... Quality Theatre তো করতেই হবে পাশাপাশি দর্শক টানা ... প্রয়োজনে লিফলেট ছাপানো ... সবাইকে নিয়ে আসা ... কমিউনিটির কাছে গিয়ে বলা যে ... আমরা আপনাদের কাছে থিয়েটার করবো ... অর্থাৎ ৭০/৮০ দশকের সেই কমিটমেন্টই কিন্তু আবার লাগবে ... দর্শক তৈরির ক্ষেত্রে।

ফয়েজ জহির
উদ্দীপনার ব্যাপারে বলতে হয় ... ঐ সময়ে, ৮০ দশকে একজনের সাথে আরেকজনের দেখা হলে যে ভাবের আদান প্রদান ঘটতো ... এখন সেটা একদম হারিয়ে গেছে। কেউ কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলি না। সোলায়মান ভাই আমার সাথে চিন্তার শেয়ার করছেন না ইত্যাদি ... এই যে বেইলী রোডের আড্ডা, যেটা এখন নোংরা হয়ে গেছে ... অথচ আড্ডাটা পজেটিভ হতে পারতো ... এই আড্ডাই আমাদের চিন্তার ক্ষেত্রে, ভাবনার ক্ষেত্রে একটা নতুন জায়গায় নিয়ে যেতে পারতো ... কেন হচ্ছে না? সুতরাং ঐ নোংরা আড্ডাটার জন্য আমরাও কিন্তু কম দায়ী না।

আজাদ আবুল কালাম
আসলে Quality Theatre, নাটকের দর্শক- এসব নিয়ে আরও ভাবতে হবে এবং এগুলো আমাদের ... মানে এই জেনারেশনকেই ভাবতে হবে। কারণ, আলটিমেটলি এই দায়িত্বটা আমাদের উপরই বর্তাবে। তবে ছড়িয়ে পড়লেই ... অর্থাৎ ফয়েজ জহির ভাই যেভাবে বললেন ... সেই ছড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমি একমত কিন্তু সংশয় আছে। মানে সেন্টার অর্থাৎ বেইলী রোডভিত্তিক চর্চাকে চাঙ্গা না করে শুধু periphery-তে কিছু একটা করে ফেললাম সেটা দিয়ে খুব কাজ হবে বলে মনে হয় না। আসলে কিছু motivational work দরকার ... যে, ভাই আসেন ... প্লিজ দেখতে আসেন।

এস এম সোলায়মান
Quality দর্শক কীভাবে সৃষ্টি হবে? Quality Theatre-এর সাথে সাথে Quality দর্শকও হতে হবে।

ফয়েজ জহির
সেটার জন্য আগে Quality Theatre সৃষ্টি করতে হবে। থিয়েটারের মাধ্যমে schooling টা হবে। না দেখিয়েতো দর্শক সৃষ্টি করা যাবে না। Quality Theatre হলেই Quality দর্শক হবে।

আজাদ আবুল কালাম
আর মঞ্চ বন্টনের ক্ষেত্রে ... ফেডারেশন যেহেতু আছেই, স্বীকার না করেও উপায় নেই ... তো ওখানে যে ২০% সৃজনশীল লোক আছেন তারা শুধু এটুকু করতে পারেন যে, ভালো নাটক দেখতে পারেন এবং অন্যদেরকে বলতে পারেন যে, ঐ নাটকটা দেখেন। ফেডারেশন কিন্তু একসময় কাজ করেছে। আমার মনে আছে লাকী ভাই, সোলায়মান ভাই, রামেন্দু দা, আতাউর রহমান ভাইরা কিছু পজেটিভ কাজ করেছিলেন।

হাসান শাহরিয়ার
আসলে সেই সময়টা কিন্তু ফেডারেশনের জন্মকাল ছিল। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর যেমন মঞ্চ নাটকের জন্মকাল এবং ফলে উদ্দীপনা নিয়ে কিছু ভালো কাজ হয়েছিল ... আবার ফেডারেশনের জন্মকালেও কিন্তু কিছু ভালো কাজ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ইত্যাদি বেসিক ব্যাপারে long run চিন্তা ভাবনা বোধহয় ছিল না।

আজাদ আবুল কালাম
তা অবশ্য ঠিক।

এস এম সোলায়মান
একটা হতে পারে ... উত্তরণের ব্যাপারে ... যেটা আমার চিন্তা ... সেটা হচ্ছে ... আমরা যারা এসব চিন্তা করছি ... আমাদের থিয়েটারতো বন্ধ নেই ... আমরা যদি একটা বিকল্প থিয়েটার করতে পারি যে, ভালো থিয়েটার করবো ... সেই বিকল্প থিয়েটার যদি চার/পাঁচটি দলও করতে পারি ... তাহলে ঐটা নিয়েই আমাদের আগানোর রাস্তা থাকলো। আমি কোনো একটা ফোরামে গিয়ে যেন বলতে পারি ... ঐ নাটকটা দেখেন। কিন্তু তার আগে ভালো কাজটাতো করতে হবে। আমি মনে করি এই যে- হল-টল সমস্ত বিষয়গুলো একটা প্যারালাল ফোর্স তৈরি হতে পারে যদি আমি প্যারালাল থিয়েটার দাঁড় করাতে পারি। ওমকের বিয়ে নাটকের against-এ, চিকন হাসির নাটকের against-এ। হতে পারে প্রথম দিকে আশানুরূপ ফল পাবো না ... তারপরও যে কয়জন দর্শক আসবে সেটাই আমাদের প্রাপ্তি। আজকে ফেডারেশনের এই অশুভ তৎপরতার against-এ আমাদের শক্তি হবে আমাদের থিয়েটার-Quality Theatre.

আজাদ আবুল কালাম
এছাড়া দর্শকের ব্যাপারে যদি কিছু বলতেন...

এস এম সোলায়মান
দর্শকের ব্যাপার আমি একটু হতাশই বলতে পারো। কারণ, কোনো experimental কাজই দর্শক কেন যেন নিতে চায় না। এখন, আজকে যে কাজ আমি করবো, কালকে চাইবো আমার চিন্তা, আমার ভাবনাকে develop করতে ... আরও experiment করতে। সেক্ষেত্রে দর্শক যদি এগিয়ে না আসে ... প্রথমেই যে কথাটা বললাম ... আজকে বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে নাটক করছি ... দর্শক যদি বুদ্ধি ব্যবহার না করে ... করতে না চায় সেখানে Quality Theatre করা মুশকিল।

হাসান শাহরিয়ার
Quality Theatre দিতে হলে নাট্যকর্মীদের যে পরিমান দক্ষ হওয়া উচিত সেটা কি এখন উপস্থিত? অর্থাৎ শুধু রিহার্সেল করা, কেবলই শো’করা, এসব-ই কি নাট্যচর্চা?

এস এম সোলায়মান
এটা হলেতো একটা কথা বলতেই হয় যে, (আমরা এখানে সবাই থিয়েটার করি) আমাদের যে সিটিংগুলো হয়, সেখানে আমরা থিয়েটার নিয়ে কতক্ষণ আলোচনা করি? থিয়েটার দল যদি থিয়েটার নিয়ে আলোচনা না করে ... তাহলে আর প্রাপ্তিটা কোথায়? আজকে যদি বলা হয় ‘প্রাচীন বাংলা নাটক’- এটার উপর ডিসকাশন হবে ... কয়জন নাট্যকর্মী আসবে? ... কথা হলো কী, এই ফাঁকগুলোতো ভরাট করতেই হবে। একথা বলার সময় চলে এসেছে যে, নাটক করতেই হবে এমন দিব্যিতো কাউকে দেয়া হয় নি। নাটক করতে হলে প্রথম কথা হলো তাকে শিক্ষিত হতে হবে ... নাটকের ব্যাপারে ... না হলে নাটক করার প্রয়োজন নেই। আমাকে কেউ দিব্যি দেয় নি যে, নাটক করতেই হবে। সুতরাং যে কাজটাই করাবো পারফেক্টলি করতে হবে।

হাসান শাহরিয়ার
একজন ডাক্তার কিন্তু সমাজের জন্য অনেক কিছু করছেন ... সে যে একজন থিয়েটারকর্মীর চেয়ে ভালো কাজ করছেন, এটা কিন্তু আমরা মানি না। বলি যে, ... আরে রাখো থিয়েটারই করলো না, নাটকই করলো না ... অশৈল্পিক কী যেন করছে।

আজাদ আবুল কালাম
প্রচ- superiority complex নাটকের লোকদের মধ্যে কাজ করে। প্রচ- superiority complex, তার চেয়ে বড় কাজ কেউ করে না। হামবড়া ভাব ... এটার জন্য শিক্ষা কিছুটা দায়ী। তবে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে নাট্যশিক্ষা আছে ... আমার মনে হয় এটার একটা ভালো ফল আমরা পাবো ... এক সময়। ওরা যদি থিয়েটার করতে আসে, মানে আউল ফাউলভাবে থিয়েটার করবে না ... যদি থিয়েটার করে তারা, তাহলে একটা ভালো ফল পেতেও পারি।

হাসান শাহরিয়ার
আমার মনে হয়ে সোলায়মান ভাইয়ের ঐ বিষয়টা নিয়ে যদি আরেকটু আলাপ করা যেত ... ঐ যে প্যারালাল থিয়েটার ... মানে আমরা কয়েকজন যারা বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছি ... আসলে এটাতো ঠিক যে, একটা আড্ডা দিতেই কিন্তু এখানে আসা ... নইলে সবার ব্যস্ততা আছে ... সুতরাং আমাদের চিন্তাগুলোকে বাস্তবায়নের দায়িত্ব অন্যদের না দিয়ে আমরাই নিতে পারি কিনা ...

আজাদ আবুল কালাম
আমার কাছে মনে হয় কী আমরা যারা এখানে এসেছি ... তারা more or less কারো দাসত্ব বা অধীনস্ত থাকতে চাই না। যার জন্যই এখানে আসা। এবং আমরা আমাদের থিয়েটার নিয়েই ভাবছি। সোলায়মান ভাই যেটা বললেন ... প্যারালাল থিয়েটার, এটা প্যারালাল থিয়েটার হয়তো না মেইন স্ট্রিম থিয়েটারই হয়তো, এর মানে হচ্ছে থিয়েটার নিয়ে আমাদের আলাদা ভাবনা ... যদি সত্যিকারভাবে গঠনমূলক কাজ করতে পারি, তাহলে আমাদের থিয়েটারের জন্যই ভালো হবে। দর্শক পরের কথা। ভালো থিয়েটার হলে দর্শক একদম আসবে না, এমন মনে হয় না।

হাসান শাহরিয়ার
একই ভাবনা নিয়েই থিয়েটার দল গড়ে ওঠে আবার theatre relationship এর ব্যাপার আছে যে- কতগুলো গ্রুপ মিলে একই রকম ভাবছে ... তো সেটার কাজ কী হবে এই নিয়ে সোলায়মান ভাই যদি কিছু বলেন।

এস এম সোলায়মান
একটা হয় যে বাধ্যতামূলকভাবে যদি স্ব স্ব দলের লোকদেরকে বলা যায় যে, ঐ ঐ নাটকগুলো ভালো এবং ঐগুলো দেখতে হবে। দেখার পর থিয়েটারে বসে একসঙ্গে বিভিন্ন বিষয় ধরে ধরে আলাপ করা হবে, সমালোচনা করা হবে। প্রয়োজনে ঐ নাটকের নির্দেশক, রাইটার বা পাত্র/পাত্রীদেরও রাখা যায় ... বললাম- ঐ জায়গা এমন হলে কেমন হতো- ইত্যাদি ইত্যাদি। এ ব্যাপারটা যদি আজকে কয়েকটা দলও শুরু করে ...

হাসান শাহরিয়ার
এ ব্যাপারটা উপলব্ধি করেই থিয়েটারওয়ালা একটা পাঠচক্রের আয়োজন শীঘ্রই শুরু করছে। সেখানে বিভিন্ন দলের দশ/বারোজন সদস্য মিলিত হচ্ছি। আমরা প্রতি তিনমাস অন্তর অন্তর বসবো এবং একটা নির্দিষ্ট বই, ভালো মানের বই এবং একটি মঞ্চায়িত নাটক নিয়ে আলোচনা করবো। দেখা যাক যদি কোনো output আসে ...

ফয়েজ জহির
আজকের বড় সমস্যা কিন্তু এই যে, লিটারেচারের সাথে কোনো সম্পর্ক নাট্যকর্মীদের নেই ...

আজাদ আবুল কালাম
আসলে এটা হচ্ছে Occupation এর ব্যাপার। প্রত্যেকেই আমরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। ঐ কাজগুলো আমাদের কাছ থেকে সময় কেড়ে নিচ্ছে ... আমরা সময় দিচ্ছি ... ঐ সব বিষয় নিয়ে ভাবছি। ... তো এখন যেটা করা উচিত তা হলো এই ব্যস্ততা থিয়েটারকে ঘিরে বাড়াতে হবে। তা হলেই ভাবনাটা থিয়েটারকেন্দ্রীক হবে। আদারওয়াইজ বিভিন্ন জায়গায় ভাবনা দিতে দিতে থিয়েটারের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। সুতরাং ঐ কনসেপ্ট ডেভেলপ করতে হবে যে, তুমি অন্য বিষয়ে অকুপাই থাকো কিন্তু থিয়েটারের জন্য একটু বেশি অকুপাই থাকো ... তাহলেই ঐ যে স্টাডি সার্কেলের কথা বলেন, তা আফসে আফসে হয়ে যাবে।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা এভাবেই একটা ভাবনা প্রকাশের ইতি টানতে পারি। যারা বললেন, যেভাবে বললেন- সেটাই সঠিক, এমন ভাববার কোনো কারণ নেই। গ্রুপ থিয়েটার দিবসে কিংবা কালচারাল রিপোর্টার’স ফোরাম আয়োজিত গোল টেবিল আলোচনায়, প্রায় একই বিষয়ের উপর দেশের প্রধান নাট্যব্যক্তিত্বগণ তাঁদের মতামত রেখেছিলেন। তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এই হোক যে, বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চায় যে বন্ধ্যাবস্থা বিরাজ করছে, কম-বেশি সবাই এটা নিয়ে ভাবছেন, এবং এটা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছেন। আপনাদের সবাইকে থিয়েটারওয়ালার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।