Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

বাঙলা নাট্যের অপূর্ব সমাবেশ

Written by কামালউদ্দিন কবির.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

বাাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত ‘লোকনাট্য সপ্তাহ ২০০৭’ এবং ‘পক্ষকালব্যাপী লোকনাট্য বিষয়ক কর্মশালা’ ইত্যাদি নাট্যকর্মযজ্ঞের ওপর রচিত এই লেখাটির শিরোনাম নিয়ে কোনোরূপ প্রশ্ন বা প্রতিক্রিয়ার উদ্রেক হলে, বড়জোর নাট্যের আগে ‘দেশজ’ বা ‘নিজস্ব’ শব্দটি বসানো যেতে পারে। যদিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে দীর্ঘকালের পঠন ও চর্চার যে অভ্যাসের মধ্যে আমরা রয়েছি তাতে কোনো বাছ-বিছার ছাড়া, অনেকটা নির্বিকারভাবে (বলা যায়, নির্দোষভাবে) সাহেবদের দৃষ্টিভঙ্গিজাত ‘লোকনাট্য’ বলছি। ‘লোকনাট্য’ বলাতে হয়তো তেমন সমস্য্যা হতো না; সমস্যা হয় তখনই যখন ওই বলার পেছনে ক্রিয়াশীল থাকে উপনিবেশী ধ্যান-ধারণা তথা দৃষ্টিভঙ্গি!

ইতিহাসের অনিবার্যতায় আমরা উপনিবেশিক শাসনের মধ্যে ছিলাম এবং তার ফলে উপনিবেশী শক্তির নানা প্রভাব-প্রতাপ আমাদের যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা ও কর্মকাণ্ডে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকছে। তা এই উপনিবেশ-উত্তরকালেও নতুন নতুন ভাষায়, ভঙ্গিতে, উপাদানে, উদ্যোগে বিরাজ করছে। উপনিবেশিক আমলের বেশিরভাগ নাট্যগবেষক পাশ্চাত্য নাট্যইতিহাসকে আদর্শ মেনে নিজেদের নাট্যইতিহাস রচনা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে সিংহভাগ বাঙালির নাট্যশিল্পের বিচিত্র বিষয় ও আঙ্গিককে অবলীলায়  উপেক্ষা করা হয়েছে। গুটিকতক নকল নবীন নাগরিক নাট্যজনের পাশ্চাত্য নাট্যের অনুকৃতি সম্পন্ন নাট্যকর্মকেই বাঙলা ও বাঙলির নাট্য বলে চালানো হলো। আশ্চর্যের বিষয়, পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকৃতিসহ ‘পরের তেলে বেগুন ভাজা’র মত সৃষ্ট নাগরিক নাট্যকে মূল নাট্য (মেইন স্ট্রিম থিয়েটার) আর বাংলার জল-মাটি আলো-বাতাস ও জনমানসে প্রবাহিত হওয়া নিজস্ব নাট্যধারাকে অভিহিত করা হলো ‘লোকনাট্য’ নামে। এই ‘লোকনাট্য’ নিয়ে কোনো কোনো নাগরিক নাট্য-গবেষক এমন সব কর্মকাণ্ড করে থাকেন, তাকে এক কথায় তামাশা বলা যেতে পারে। যেমন, দেশজ নাট্যের গায়েন বা পালাকার তাদের পালার নামকরণ দু’এক শব্দে সহজ সরলভাবে করে থাকেন, সেখানে নাগরিক গবেষক লেখকের হস্তক্ষেপে সেই পালায় যদি নাগরিক-কাব্যিক ব্যঞ্জনাধর্মী নাম আরোপ করা হয়ে থাকে, তবে তাকে তামাশাই বলা সঙ্গত। এছাড়া কোনো নাগরিক লেখক তার বিচিত্র লোভের বশবর্তী হয়ে পালা পাণ্ডুলিপি রচনা করে যদি দেশজ নাট্যের পালাকার বা গায়েনকে দিয়ে তা ‘মৌলিক লোকনাট্য’ অনুষ্ঠানে পরিবেশন করানোর চেষ্টা করেন, তবে তাকে নাগরিক গবেষক-লেখকের অযাচিত খায়েশ বলেই চিহ্নিত করা যেতে পারে।

তবু আশার কথা, এই সময়ে আমরা অনেকাংশেই অন্ধ পাশ্চাত্য অনুবর্তিতা থেকে মুক্ত হতে পেরেছি। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে আমরা এখন হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রান্তরে লালিত আশ্রিত নাট্য বৈচিত্র্যকে দেশজ নাট্য বা নিজস্ব নাট্য বলে মান্য করতে পারছি। নাগরিক নাট্যাঙ্গনে এখন বেশ উদ্যম সহকারেই দেশজ নাট্যের নানা আয়োজন ও কথাবার্তায় আবহ তৈরি হয়েছে। যদিও এই সকল আয়োজন ও কথাবার্তায় সেই দীর্ঘকালের অভ্যাসে অবচেতনে আটকে যাওয়া উপনিবেশী ধ্যান-ধারণার প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। কয়েকটি উপদাহরণ:

১.    রাজশাহী জেলার নবাবগঞ্জ থেকে সংগৃহীত ‘কাঠুরিয়ার আলকাপ’, রংপুরের সুন্দরগঞ্জ থানার কিসমৎ সদর গ্রাম থেকে যাত্রাপালা ‘মোনাই তোনাই’ এবং কিশোরগঞ্জের নগুয়া গ্রাম থেকে সংগৃহীত পালা নাট্য ‘বাইদ্যানীর গান’ প্রভৃতির সংকলন মোহাম্মদ সাইদুরের সম্পাদনায় বাংলা একাডেমী (১৯৮৫) প্রকাশ করেছে ‘লোকসাহিত্য সংকলন-৪১ লোকনাট্য’ শিরোনামে। ১৯৯৩-এ বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলা একাডেমী ফোকলোর সংকলন ৬১ লোকনাট্য-২’। এই গ্রন্থে মোহাম্মদ সাইদুরের সম্পাদনায় সংকলিত হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তপন-মদনের আলকাপ, খুলনার মানিক যাত্রা, ফরিদপুরের গাজীর পালা, কিশোরগঞ্জের মলুয়া সুন্দরীর পালা, লালবানু-শাহজামাল প্রভৃতি পালা বা দেশজ নাট্যের নানা উদাহরণ।

২.    অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতি গবেষণা পরিষদ শ্রীসনৎকুমার মিত্রের সম্পাদনায় আলকাপ, বিষহরা, গম্ভীরা, লেটো, ভাঁড়যাত্রা, ডোমনি, খন, কুশান, বোলান ইত্যাদি আলোচনা এবং সংগ্রহ হিসেবে প্রকাশ করেছে ‘বাঙলা গ্রামীণ লোকনাটক’ (২০০০)। এখানে উক্ত দেশজ নাট্যের নানান আঙ্গিককে ‘গ্রামীণ লোকনাটক’ বলার পেছনে সম্পাদক তাঁর পূর্ববর্তী গবেষক আশুতোষ ভট্টাচার্য, অজিতকুমার ঘোষ প্রমুখের দোহাই-যুক্তি দিয়েছেন। লক্ষ্য করি, ‘বাঙলা গ্রামীণ লোকনাটক’ গ্রন্থের বিষয়াবলী নিয়ে চার বছর আগে (১৯৯৬) সম্পাদক সনৎকুমার মিত্র প্রকাশ করে ছিলেন ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘লোকসংস্কৃতি গবেষণা’। সেখানে বিষয় শিরোনাম ছিল ‘গ্রামীণ নাটক: আলোচনা ও সংগ্রহ’।

অর্থাৎ সব মিলিয়ে ‘লোকনাট্য’ ‘গ্রামীণ লোক নাটক’ ‘গ্রামীণ নাটক’- ইত্যাদি একটা অদ্ভুত গোলমালের মধ্যে রয়ে গেছে। মজার বিষয় এই গোলমাল ব্যাপারটি প্রায় সর্বাংশে নাগরিক গবেষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। অপরদিকে, মাঝে মধ্যে নাগরিক গবেষকের নিয়ন্ত্রণের স্বীকার হলেও দেশজ নাট্যের গায়েন-কথক-পালাকারবৃন্দ সাধারণত পরম্পরাসূত্রে প্রাপ্ত সহজ-সাবলীল ভাষা-ভঙ্গিতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সহযোগে তাদের নাট্য পরিবেশন করে চলেছেন। আশার কথা, সম্প্রতি দেশজ শিক্ষা-সংস্কৃতির বহুমাত্রিক অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণের ফলে দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক বাকবদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের কথা। নাট্যকলা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান অন্যতম উদ্দেশ্য থাকলেও এই বিভাগের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিহিত রয়েছে দেশজ বা নিজস্ব নাট্য বিষয়ে অধ্যয়ন ও চর্চার ক্ষেত্রে। এই বিভাগের অধ্যাপক সেলিম আল দীন তাঁর গবেষণা ও সৃজনশীল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবেই বাঙলা নাট্যের রূপরেখাটি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাঙলা নাটক ও নাট্যের রূপরেখাটি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাঙলা নাটক ও নাট্যের প্রকৃত ইতিহাস রচনার লক্ষ্যে বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধসহ তিনি প্রণয়ন করেছেন ‘মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য’ (১৯৯৬) এবং বাঙলা নাট্যকোষ (১৯৯৮)। এছাড়া নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিষয়ে পাঠ্যসূচিতে দেশজ নাট্যের পাঠ ও প্রয়োগ পরিকল্পনা এমনভাবে রয়েছে, যাতে নাট্য শিক্ষার্থী গভীর মনোনিবেশে অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেশজ বা নিজস্ব নাট্যের শিল্পবুদ্ধি ও শিল্প কৌশলের স্বাতন্ত্র্য ও বিশিষ্টতা অনুধাবন করতে পারেন। এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ রচনা করলেন দেশজ নাট্যের প্রামাণ্য-গবেষণা অভিসন্দর্ভ- ‘অচিন পাখি ইনফিনিটি ইনডিজেনাস থিয়েটার অব বাংলাদেশ’ (২০০০)।

দেশজনাট্য বিষয়ে উক্ত উদ্যোগ ও গ্রন্থসমূহ বাঙলা নাট্যের স্বরূপ ও তাৎপর্য অনুধাবনে তথা পূর্বোক্ত ‘গোলমাল’ থেকে আমাদেরকে মুক্ত করতে পেরেছে বলে মনে করি। আমরা লক্ষ্য করি, বিষয়টি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন ও গবেষণা পর্যায়ে সীমিত না থেকে নাট্যাঙ্গনের বিবিধ কার্যক্রমেও তা যুক্ত হয়েছে। যেমন-২০০২-এ অনুষ্ঠিত নাট্যদল নাট্যকেন্দ্র-এর একযুগ পূর্তি নাট্যোৎসবে নিজেদের দু‘টি নাগরিক প্রযোজনার পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়-আঙ্গিকের পাঁচটি দেশজ নাট্য গাজীর গান, পালাগান, রামায়ণ গান, আলকাপ, রাসলীলা প্রভৃতি পরিবেশিত হয়েছিল। যদিও দুঃখের বিষয়, কেবল মঞ্চ সীমাবদ্ধতার কারণে ওই দেশজ নাট্যসমূহ উপস্থাাপন করা হয়েছিল গাইড হাউস মিলনায়তনের পাশ্চাত্য প্রসেনিয়াম মঞ্চে। আবার অন্যদিকে, ‘জাতীয় ঐতিহ্য অনুসন্ধান ও গবেষণার গরজে’ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর নাট্যকলা বিভাগ ‘লোকনাট্য অনুষ্ঠানের’ নিয়মিত আয়োজন করে থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও সেই উপনিবেশিক প্রভাবের নানা গোলমাল লক্ষ্য করা যায়। যেমন গত বছর (২০০৬) একাডেমী চত্বরে একটি প্রসেনিয়াম মঞ্চ তৈরি করে ‘লোকনাট্য সপ্তাহ’ আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে নাট্য পরিবেশনের সময়ে মঞ্চের পশ্চাদপটে (সাইক্লোরামা) লটকানো ছিল বিশাল আকৃতির ব্যানার এবং লোকনাট্যে’র গুরুত্ব সূচক নানা বাণী সম্বলিত একাধিক ফেস্টুন। আরোপিত এই পঞ্চায়ন পদ্ধতির কারণে দেশজ নাট্যের সরল-সাধারণ প্রয়োগশৈলীর বদলে উইংস ব্যবহারসহ নানা রকম স্থূল পরিবেশনা লক্ষ্য করা গেছে। বলা বাহুল্য, দেশের জাতীয় প্রতিষ্ঠানের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আয়োজনের ব্যাপারে আমাদের নাট্যাঙ্গন থেকে কোনো বাদ-প্রতিবাদ কিংবা প্রতিক্রিয়া আসে নি। এমনকি দেশের বহুল প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে ওই প্রসঙ্গে উল্লেখমাত্রও করে নি।

শিল্পকলা একাডেমীর এবারকার লোকনাট্য সপ্তাহ ও পক্ষকালব্যাপী কর্মশালার আয়োজন সবিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে। এক্ষেত্রেও উপনিবেশিক বিকার-বিকৃতির আছর সত্ত্বেও, বোধ করি এই প্রথমবারের মত শিল্পকলা একাডেমী বাঙলা দেশজ নাট্যের যথাযথ প্রদর্শনী এবং তা নিয়ে নবীন নাট্যশিক্ষার্থী ও কর্মীদের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়নের সুযোগ করে দিয়েছে। অর্থাৎ উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে একাডেমীর দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ দেশজ নাট্যের সঙ্গে নাগরিক নাট্য পরিমণ্ডলকে সম্পৃক্ত করতে আন্তরিকতার প্রমাণ দিয়েছেন।

একাডেমী কর্তৃপক্ষ এবারে দেশজ নাট্যসমূহ নির্বাচনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যশিক্ষক এবং গবেষক সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচকমণ্ডলীর সহায়তা নিয়েছেন। সে অনুযায়ী এখানে প্রদর্শিত হলো ঝিনাইদহের শৈলকূপা থানার মাহমুদপুর গ্রাম থেকে আসা পান্না বিশ্বাস ও তাঁর দলের গাজীর গান; টাঙ্গাইলের কালিহাতি থানার বেতডুবা গ্রামের নিপেন পাল ও তাঁর দলের সঙযাত্রা; কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানার নোয়াবাদ গ্রামের ইসলাম উদ্দিন ও তাঁর দল পরিবেশন করলেন কিস্সাগান; কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার বালিশিশা-শেরপুর গ্রামের জহুরুল ইসলাম ও তাঁর দলের মানিক পীরের গান; চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট থানার কাশ্মীরপাড়া গ্রামের শফিকুল সরকার ও তাঁর দলের আলকাপ; বরিশালের উজিরপুর থানার বাহেরহাট গ্রামের নিমাই দেউরী, সুভাসিনী বিক্রম ও তাদের দলের রয়ানী গান; এবং কুড়িগ্রামের রাজারহাট থানার চতুরা গ্রামের কৃপাসিন্ধু রায় ও তাঁর দলের পরিবেশনায় কুশান গান।

শিল্পকলা একাডেমীর এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে চতুর্দিকে দর্শক আসন সহযোগে দেশজ এই নাট্যসমূহের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পালা পরিবেশনের ক্ষেত্রে প্রায় প্রত্যেকটি দলেই একটি সাধারণ সমস্যা পরিলক্ষিত হচ্ছিল। পালা পরিবেশনের সময়সীমা সংক্রান্ত এই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে প্রত্যেক মূলগায়েন ও দোহারবৃন্দ তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পালা কাহিনী কাঠামোর সম্পাদনা করেছেন। সাধারণত আড়াই থেকে তিন ঘন্টার মধ্যে প্রত্যেকটি পালা তাদের সম্পন্ন করতে হয়েছে। এর ফলে পালা শিল্পী এবং নাগরিক দর্শক উভয় ক্ষেত্রেই নাট্য বিষয়ের সঙ্গে সহজ সংযোগের বিষয়টি অনেকটা ব্যাহত হয়েছে। যদিও পালাসমূহের আঙ্গিক ও পরিবেশন রীতির চমকপ্রদ বৈচিত্র্য নাগরিক নাট্যামোদী দর্শককে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে রেখেছিল। স্থান ও সময় অনুযায়ী পারফরমেন্স তৈরি করা দেশজ নাট্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলেই হয়তো এবারকার পালা-প্রযোজনাগুলোর ভাষা, ভাঙ্গাভঙ্গি, দর্শকের সঙ্গে সংযোগ প্রক্রিয়া ইত্যাদি সবকিছুই হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। দেশজ নাট্যের অভিনয়শিল্পী যখন মঞ্চভূমিতে পদার্পণ করেন তখন তার চোখে-মুখে-শরীরে-অভিব্যক্তিতে যে বিশ্বাস-ভক্তি ও আবেগের ছাপ থাকে - তা আমাদের নাগরিক নাট্যকর্মীদের নিকট অনেক শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে। এই অভিনয়শিল্পীরা দর্শকের চোখে চোখ রেখে বিনীত অথচ দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে যে সংযোগ স্থাপন করেন কিংবা কথা সঙ্গীত ও শরীরের যে নানা মূর্ত-বিমূর্ত ভাষা যেভাবে তৈরি করতে থাকেন এবং তা শ্রদ্ধাভাজন দর্শক যেভাবে মুগ্ধতার সঙ্গে গ্রহণ করেন- এ সবই নাট্যশিল্পের যথার্থতা প্রকাশ করে। স্থান (মঞ্চ), অভিনয়শিল্পী এবং দর্শক এই তিনে মিলে যে সম্পূর্ণ হয় নাট্য, তা এই দেশজনাট্য পর্যবেক্ষণেই বোধ করি সর্বাংশে উপলব্ধি করা যায়। নিবিড় হয়ে থাকা দর্শকমণ্ডলীর মধ্যখানে শূন্য আয়তনে খুবই সীমিত দ্রব্যসম্ভার (প্রপস) সহযোগে গায়েন, ছোকরা, জোকার সবাই মিলে যে নাট্যমুহূর্ত নির্মাণ করে চলেন এবং তা যেভাবে দর্শকের কল্পনা-অনুভূতিতে সঞ্চারিত হয়ে পড়ে- তা এক অনন্য শিক্ষা হয়ে থাকবে আধুনিক নাট্য নির্মাণে ব্রতী এই আমাদের নাগরিক নাট্যজনদের। প্রায় সবগুলো পালা থেকেই এই অনন্য অভিজ্ঞতা হয়েছে বলে মনে করি। কেবল কুষ্টিয়া থেকে আগত মানিক পীরের গান পারফরমেন্স থেকে তেমন অভিজ্ঞতা হয় নি। তবু এই মানিক পীরের গান পরিবেশনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ না করলেই নয়। একমাত্র এই দলটির পুরো প্রযোজনাতে গায়েন-দোহারের কথা-গান, অভিনয় ক্ষেত্রে তাদের মুভমেন্ট, এমনকি পারফরমেন্সকালীন অভিনয়শিল্পীদের নিজেদের মধ্যে কথোপকথন ও আচরণ-সবকিছুতেই চূড়ান্ত সারল্যের প্রকাশ ঘটছিল। তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবেশন রীতিটি হঠাৎ করে রাজধানীর আধুনিক ঝলোমলো মিলনায়তনে যেন খুলে খুলে যাচ্ছিল। তাদের মনোজগতে বেশ কিছু জটিলতা এসে ভর করছিল তা তাদের অভিব্যক্তিতে বোঝা যাচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে কথা বলে জানা গেল এই ঢাকা শহরে গান গাইবেন বলে তারা নিজেরাই বাড়তি কিছু আয়োজন করে ফেলছিল। যেমন, সাধারণত মানিক পীরের গান-এ ‘ছোকরা’ বা ‘ছকরি’র ব্যবহার না থাকলেও শিক্ষিত নাগরিক দর্শকের কথা মনে রেখে তারা একজন ছোকরা এনেছিলেন এবং তিনি অনবরত খেমটা নাচের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। সবচে’ বড় কথা- এই পারফরমেন্সে তেমন কোনো পোশাক পরিকল্পনা না থাকলেও কেবল নাগরিকদের কথা ভেবে বাহারি পোশাক তৈরি করে এনেছিলেন। খুবই সহজ-সরলভাবে এই প্রসঙ্গটির জবাবও দিয়েছিলেন মূল গায়েন জহুরুর ইসলাম এইভাবে: ‘কোথাও বেড়াতে গেলে কি য্যান-ত্যান পোশাকে যাওয়া যায়?’ এও এক দেশজ শিক্ষা বটে। বলা বাহুল্য, এই গানের দলের প্রায় প্রত্যেক সদস্যই পেশাগতভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত।

দেশজ নাট্যের এই আয়োজনে সব দলেরই ছিল গুরু পরম্পরার ভিত্তিতে অর্জিত পালা পরিবেশন। কেবল কিস্সাগান-এর ক্ষেত্রে অনাহুতভাবে গোল তৈরি হয়েছিল। জনৈক নাগরিক, গবেষক-লেখকের কিস্সাপালা রচনার বাসনা শেষপর্যন্ত গন্ডগোলে গড়িয়েছিল। তিনি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ইসলাম উদ্দিন পালাকারের আত্মজীবনীমূলক উপাখ্যান রচনা করেছেন (‘কিচ্ছাদার’ নামে পত্রিকায় প্রকাশও করেছেন)। সেখানে তখন সঙ্গত প্রশ্ন ওঠে নাগরিক লেখকের কোনো টেক্সট কোনো গায়েন বা গাতক স্বীয় ভাষা-ভঙ্গিতে উপস্থাপন করলে তা ‘লোকনাট্য’ হবে কী না? ভালো যে- একাডেমী কর্তৃপক্ষের সুবিবেচনাপ্রসূত পদক্ষেপের কারণে ওই নাগরিক আইডিয়ার কিচ্ছাদার পালা বাতিল করা হয় এবং শিল্পী ইসলাম উদ্দিন অরবুলা সুন্দরী কিস্সা পরিবেশন করেন।

শিল্পকলা একাডেমীর এই আয়োজনে দেশজ নাট্য প্রদর্শনী ছাড়া খুবই গুরুত্বপূর্ব পর্ব ছিল-দেশজ নাট্য নিয়ে তরুণ নাট্য শিক্ষার্থী-কর্মীর সঙ্গে কর্মশালা। কর্মশালার কর্মসূচিও তৈরি হয়েছিল বেশ গুরুত্ব ও মনোযোগ সহকারে। যেমন, নাট্য প্রদর্শনীর আগে ও পরে তিন দিন ব্যাপী চলেছে বিভিন্ন গবেষক-শিক্ষকের ক্লাস। ওই ক্লাসসমূহে আলোচিত হয়েছে- ১. দেশজ রীতি: বিষয় ও পদ্ধতি (নাগরিক নাট্যজনের বোঝাপড়া) ২. লোক নাট্যরীতি ও বাংলা নাট্যরীতি, ৩. অভিনয় রীতি (পাশ্চাত্য নাটকের সঙ্গে তুলনীয় দিক), ৪. বাংলাদেশের লোকনাট্য: আঙ্গিক ও বিষয় বৈচিত্র্য এবং ৫. যাত্রা এবং লোকনাট্য।

তিন দিনের ওই ক্লাস শেষে, প্রতিটি পালা পরিবেশনের পরদিন সকালে ছিল শিল্পীবৃন্দের সঙ্গে কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের আলাপচারিতা বা মত বিনিময়। এই পর্বেও ‘সমন্বয়কারী শিক্ষক’-এর দায়িত্বে ছিলেন এক একজন শিক্ষক-গবেষক-নাট্যজন। পর্যবেক্ষণে দেখা গেল, অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই বিনিময় পর্বটিতে সরাসরি শিল্পীদের নিকট থেকে প্রামাণ্য তথ্য উপাত্ত পাওয়ার বদলে সমন্বয়কারী শিক্ষক স্বীয় প্রাতিষ্ঠানিক ধারণাসমূহের বিনিময় করতে চেষ্টা করেছেন। অথচ আলকাপ কী, আদি আলকাপ কী, রয়ানি কী- ইত্যাদি সব প্রশ্নের উত্তর কোনো একাডেমিক মুখস্ত বিদ্যা থেকে না নিয়ে সরাসরি ওই শিল্পীদের কাছ থেকে পেলে অংশগ্রহণকারীরা অনেক লাভবান হতেন বলে মনে করি। কেউ তো আবার এই বিনিময় সেশনটি পুরো সময় জুড়ে নির্দিষ্ট দেশজ শিল্পশৈলীর খন্ডাংশ অনুকৃতির মাধ্যমে তা আয়ত্ত করানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন। অথচ, এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন থেকে নাট্য শিক্ষার্থী কর্মীবৃন্দ অনায়াসে পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়ন করতে পারতেন দেশজ নাট্যের নাটলিপি বা কাহিনী কাঠামোর গঠন কৌশল, প্রযোজনা কৌশল, অভিনয় তত্ত্ব, রসতত্ত্ব ও আঙ্গিক-বাচিক-আহার্য অভিনয়তত্ত্বের প্রায়োগিক দিকসমূহ। অর্থাৎ এখানেও সেই উপনিবেশিক ‘গোলমাল’-ই সামনে এসে পড়ে। বিষয়টি আমাদের প্রিয় বাঙালি লালন-এর কথা দিয়েই প্রকাশ পেতে পারে: ‘ভাবলি নে মন কোথা সে ধন/ ভাজলি বেগুন পরের তেলে,/ গুণে পড়ে সারলি দফা/ করলি রফা গোলেমালে’।

যাহোক সর্বোপরি শিল্পকলা একাডেমীর কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে নাট্যকলা বিভাগের পরিচালক ও উপপরিচালক মহোদয়কে কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাতেই হয়, কেননা বাঙলা নাট্যের স্বার্থে, আধুনিক নাট্য নির্মাণের স্বার্থে দেশজ নাট্যের যাবতীয় শিল্প প্রকরণ ও শিল্পবুদ্ধির সঙ্গে প্রাণবন্ত সম্পৃক্ত থাকা জরুরি- একাডেমীর কল্যাণে অন্তত এই উপলব্ধিটুকু করতে পারছি। শুধু এইটুকু আশা- ভবিষ্যতে উপনিবেশিক গোলমাল যতদূর সম্ভব পরিহার করে দেশজ নাট্যের নানা আয়োজন করা হবে।

কামালউদ্দিন কবির : নাট্যজন, নাট্যশিক্ষক। সদস্য- জন্মসূত্র