Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

ভিন্ননাট্য : যাত্রাপথ

Written by গোলাম শফিক.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

International Theatre Institute, বাংলাদেশ কেন্দ্র ২০০৪ সালের ১২-১৮ মার্চ আয়োজন করে ত্রিদেশীয় আঞ্চলিক নাট্য কর্মশালা। অংশগ্রহণকারী নেপালের ৫জন, ভারতের ৫জন, স্বাগতিক বাংলাদেশের ১৫জন তরুণ নাট্যজীবী। এটি ছিলো ৩ মেরুর একত্রীকরণ প্রচেষ্টা। ইউনেস্কোর আর্থিক সহায়তায় অনুষ্ঠিত কর্মশালায় সবিশেষ গুরুত্ব পায় স্পেস-এর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে নাট্য নির্মাণে দক্ষতা অর্জন।

সম্পূর্ণ কর্মশালাটি অনুুষ্ঠিত হয় জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউট, নিমকোয়। প্রধান প্রশিক্ষক ভারতের প্রবীর গুহ, আরো আছেন নেপালের সুনীল পোখরেল ও ভারতের অশোক মুখোপাধ্যায়। এরই মধ্যে প্রবীর গুহ’র সাথে সাক্ষাৎ হলে নিমকোয় কর্মশালা পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানান। তথায় এক বিকেলে গিয়ে হাজির হই। পেয়ে যাই ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও দেবপ্রসাদ দেবনাথকে। এ দিন কর্মশালাজাত একটা কিছু প্রদর্শনের আয়োজন ও প্রস্তুতি চলছে। জানানো হলো দর্শক অভিনেতার মিথষ্ক্রিয়ায় কিংবা দর্শকদের চরিত্রে রূপান্তর করে এ নাট্যায়োজন। প্রবীর গুহ এর নাম দিয়েছেন যাত্রাপথ। যাত্রাপথ-এ যাত্রার আয়োজনে পশ্চিমবঙ্গের Alternative Living Theatre-এর ৪জন কর্মী ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা ব্যতিব্যস্ত। সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো একটি ভিন্ন কক্ষে। বলা হলো আমরা এখন যাত্রারম্ভ করবো। কোনো চিন্তার কারণ নেই, নাট্যকর্মীদের আপনারা বিশ্বাস করতে পারেন। প্রিয় দর্শক, কেবল আপনারা আমাদের instruction ফলো  করবেন। চোখ বন্ধ করে আমাদের এ সম্মিলিত যাত্রা। মাঝে মধ্যেই একটি অস্ফূট ঘন্টা বেজে উঠবে আর বলা হবে ‘চোখ খুলুন’, কেবল তখনই চোখ খুলবেন, তা’ ছাড়া নয়। একটি কাতারে কাঁধে হাত দিয়ে শুরু হলো আমাদের যাত্রা। প্রারম্ভিক আবহ সংগীত, মৃদুমন্দ। তারপর ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’। পাশের কক্ষে অকস্মাৎ বুটের শব্দ, অট্টহাসি, গুলির আওয়াজ ও চিৎকার-গোঙানিতে আবহ সংগীত মিলিয়ে যায়। এ অবস্থার মধ্যেই আমরা দর্শক এগিয়ে চলি। চোখ যেহেতু বন্ধ, শ্রবণযন্ত্রই ভরসা। সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে নিচে নেমে আসি, এতে সাহায্য করে নাট্যকর্মীরা। এক সময় হামাগুড়ি দিয়ে চলি। শুরু হয় শিয়ালের ডাক, কুকুরের ঘেউ ঘেউ। চিন্তা করতে অসুবিধা হয় নি যে, আমরা সত্যিই একাত্তরে আছি। এরই নাম ‘মনো সংযোগ’ যা আদায়েরও বিষয়। ঘন্টাটি বেজে ওঠে, নির্দেশ আসে ‘চোখ খুলুন’। চোখ খুলেই দেখি প্রশস্ত বারান্দার সর্বশেষ কোণায় আধো আলো অন্ধকারে এক ধর্ষিতা ঝুলে আছে। জীবিত, কি মৃত বোঝা মুস্কিল। খানিক বাদে নির্দেশ আসে ‘চোখ বন্ধ করুন’। চোখ বন্ধ করতেই আবার কানে আসে শিয়ালের ডাক, গোঙানির শব্দ। এরই মধ্যে আমাদের দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। বুঝলাম সেটি অনুভবের তীব্রতা বৃদ্ধির জন্য। ভয়ে গা’ ছমছম করার মতোই অবস্থা। এক মুহূর্ত চিন্তা করি অন্যের কথা, এখানে কি দুর্বল চিত্তের কেউ নেই? থাকলেই কি, তিনিও নিশ্চয় শুনেছেন, “নাট্যকর্মীদের আপনারা বিশ্বাস করতে পারেন।”

যাত্রাপথ-র যাত্রীগণ নিমকোর দীর্ঘ করিডোর মাড়িয়ে সামনে আগাই ধীর পদক্ষেপে। ডানে মোড় নিয়ে আর একটু আগাতেই মনে হয় একটি লাশ পড়ে আছে। পায়ে লাশটি ঠেকলে তা’ ডিঙ্গিয়ে পুনঃ পা’ ফেলতেই আরো একটি লাশ। তারপর আরো ... আরো। তখন গোঙানি, চিৎকার ও হাহাকার ধ্বনি চরমে পৌঁছে। এ অবস্থায় চোখ খোলার নির্দেশ আসে। তাকিয়ে দেখি পায়ের নিচে অগণন লাশ। শৌচাগারের পাশের বেসিনে রক্তমাখা হাত ধোয় পাঞ্জাবী কমান্ডার, আলতো করে প্যান্টের খোলা জিপার লাগায়। মেঝে ও দেয়ালে রক্তের ছোপ। তার সাথে অট্টহাসি ও উল্লাসে ফেটে পড়ে অন্যান্য সহকর্মী। এটা ‘একাত্তর’ নয় তো কী? পুনঃ অক্ষি মুদনের নির্দেশ পেয়ে সিঁড়ির গোড়ায় পা’ রাখি। রেলিং থাকায় ধরে উঠতে অসুবিধে হয় না। দর্শকের দলটি লাইন ধরে আবার উপরের ব্যালকনিতে উঠে আসি। সবাইকে রেলিং ধরে দাঁড় করানো হয় পাশাপাশি। এবার আগে-পিছে নয়। পুনরায় ঘন্টাটি বেজে উঠলে চোখ খুলে দৃষ্টি প্রসারিত করি সামনে। দেখা যায় নিচের ফোয়ারার শুকনো চৌবাচ্চায় ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বিভিন্ন ভঙ্গিতে কয়েকটি লাশ পড়ে আছে। ফিরে যাই ৩৪ বছর আগে, স্মৃতি মলিন হলেও মনে পড়ে ঠিক এভাবেই বহু লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে দেখেছিলাম যুদ্ধের দিনগুলোতে। অনুরূপভাবে কোনো মঞ্চ নাটক, মিডিয়া-নাট্য বা চলচ্চিত্রে দেখি নি কখনো। ভেবেছিলাম দর্শক হিসেবে বন্দীদশা থেকে এখানেই মুক্তি পাবো, আগে থেকেই ভেতরে একটা ছটফটানি তৈরি হচ্ছিলো। মুক্তির আকাক্সক্ষা অনুভবের এতো গভীরে গিয়ে সত্তা কিংবা চৈতন্য থেকে বিচ্ছিন্নাবস্থা হবে ভাবি নি। মনে হলো শেষবারের মতো হুকুম জারী হয়েছে। মানে সেই মৃদু ঘন্টাধ্বনি। দলটি আবার চোখ বন্ধ করে প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে পা’ বাড়াই। একদল নাট্যকর্মী সমবেত কন্ঠে গেয়ে উঠে ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্তলাল, রক্তলাল, রক্তলাল ....।’ গান শুনে শুনে আবার ফিরে আসা হয় পূর্বের সেই কটিতে যেখান থেকে শুরু হয়েছিলো আমাদের যাত্রাপথ। ধরে ধরে বৃত্তাকারে দাঁড় করানো  হয় দর্শকদের। ঘন্টাটি বেজে ওঠে। আমরা চোখ খুলি। গোল হয়ে বসলে পর একজন নাট্যকর্মী সবাইকে জল পান করায়।

একটি মুক্ত আলোচনায় যা’ বের হয়ে আসে তা’ হচ্ছে কোনো বিষয়, ঘটনা, শব্দকল্প, দৃশ্যকে অনুভব করানোর যে কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে তা’ খুবই effective. চোখ বন্ধ করলেই concentration বা মনোসংযোগ ঘটে। একাত্তরের ঘটনা লোক মুখে শুনে বা বই-পুস্তক পড়ে যতোটুকু মনোকষ্ট হয়, এ পদ্ধতির মাধ্যমে তার চেয়ে বেশি হয়েছে। এরূপ নাট্য প্রক্রিয়ায় concentration ব্রেক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যাত্রাপথ থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোনো পথ ছিলো না। অডিয়েন্সকে নিয়েও যে কোনো একটি লক্ষ্যের দিকে মার্চ করা যায় এটি তার প্রকৃষ্ট নমুনা। এ নাট্য প্রক্রিয়া আমাদের অভিজ্ঞতা ও অভ্যেসগুলো বদলে দেয়। এটি শরীর-মন যুগপৎ যাত্রা যা’ একটি প্রতিক্রিয়া ঘটাবেই। এতে বহুমাত্রিক সূত্র আবিষ্কার হয়।

বড় নাট্যাভিযানটির পর পরই আর একটি ছোট্ট নাট্য প্রক্রিয়ার ভেতর দর্শক-শ্রোতাদের প্রবেশ করানো হয়। উদগাতা এর নাম দিয়েছেন ‘গল্পনাট্য অনুভবে’। এটিকে স্পর্শনাট্যও বলা যেতে পারে। আমরা বৃত্তাকারে বসেই আছি। আবারও চোখ বন্ধের খেলা। ‘টিয়া’ নামের একটি চঞ্চলা চপলা মেয়ের জীবন কাহিনীতে দর্শক প্রবেশ করি। টিয়া এখন কলতলায়। আমরা জল পতনের শব্দ পাই। টিয়া হাত মুখ ধুচ্ছে। আমাদের চোখে-মুখে সত্যি সত্যিই জলের ছিটা। টিয়া গোলাপ ভালোবাসে কিংবা গোলাপ ফুলের মতোই সুন্দর তার জীবন। আমরা গোলাপের গন্ধ পাই, কে যেন নাকের কাছে গোলাপ ধরেছেন। গন্ধনাট্য। টিয়ার মা মেয়েকে ভালোবেসে চুমু দেন আমাদের গালে। টিয়া আচার খায়- এক চামচ আচার আমাদের মুখে পুরে দেয়া হয়। টিয়ার জীবন কাহিনী এগিয়ে চলে। কোন অভিমানে টিয়া গলায় ফাঁসি দেয়, যথারীতি আমাদের গলায় দড়ির স্পর্শ।

এক/দু’ দিন পর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আবার আয়োজন হয় যাত্রাপথ-এর। তবে ভিন্ন কন্টেন্টে। এ সময় অনেকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মফিদুল হক, আনিসুল হক, ইমদাদুল হক মিলন ও সস্ত্রীক আমিনুর রহমান মুকুল। তবে প্রথমজন নাট্য প্রক্রিয়ায় অংশ নেন নি। নিজেও নাট্যনির্মাণ কৌশলটি স্বচোক্ষে প্রত্যক্ষ করার মানসে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকি। পূর্ববৎ সবাইকে চোখ বন্ধ করে লাইন ধরে ঘোরানো হচ্ছে জাদুঘরের চত্বর। আবহ সংগীতের মধ্যে কিছুটা পথ অতিক্রমের পর আঁখি উন্মোচন করে দেখানো হয় বাংলাদেশের হত-দরিদ্র অবস্থা। ডাস্টবিনের নোংরা খাবার কুড়িয়ে খায় ভুখানাঙ্গা মানুষ। আর এক কোণায় দাঁড়িয়ে উগ্র পোশাক ও প্রসাধন মেখে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি ছড়িয়ে দেয় জনা কয় বারবণিতা। স্বাধীন দেশে গতর বিক্রি। এ-ই স্বাধীনতার অর্জন। দর্শকের চোখ বন্ধ করে নিয়ে যাওয়া হয় একটি কক্ষে। স্বাধীনতার কোনো অর্জন তো নেই-ই, উপরন্তু দেশ এখন জন্মশত্র“ উগ্র মৌলবাদের কবলে। হুমায়ুন আজাদের হত্যাকাণ্ডের কিঞ্চিৎ বর্ণনার পরেই দর্শকগণ প্রবেশ করেন শ্র“তিনাট্যে। কাপড় ছেঁড়ার শব্দ, চাপাতির আওয়াজ এবং কোপ দেয়ার অবিকল শব্দ পান তারা। এরই মধ্যে বোমা ফোটে। দর্শকরা আক্রান্ত লেখকের ফিনকি দিয়ে ওঠা রক্তের স্পর্শ পান। তাদের চোখ বন্ধ অবস্থায়ই এ প্রকোষ্ট থেকে বের করা হয় মুক্ত বায়ুতে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বহির্পোর্সানে পা’ রাখেন দর্শকগণ। তারা এগিয়ে যান আর চোখ খুলেই দেখেন স্তরে স্তরে পড়ে আছে লাশ। বহিঃশত্র“র আঘাতে এ লাশ মৃত্তিকা-সংলগ্ন হয় নি। আমাদেরই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফলজাত। গণতন্ত্র হত্যা, সামাজিক অবক্ষয়, অন্তর্দ্বন্দ্ব, কলহ এ সব। দর্শকরা ভবনের উর্ধাংশ ঘুরে চোখ বন্ধ অবস্থায় নিচে নেমে দরোজার কাছে আসতেই চোখোন্মোচনের সংকেত পান। দেখেন সামনে একটি আয়না ঝুলছে। তার সামনে শক্ত-সামর্থ ফাঁসির দড়ি। দড়ির ভেতর দিয়েই আয়নায় দর্শক আবিষ্কার করেন গলায় প্যাঁচানো নিজকে। যাত্রাপথের এখানেই সমাপ্তি। সবাইকে পান করানো হয় পানি। দর্শকরা নাটক দেখে বের হয়ে মঞ্চের সম্মুখস্ত চেয়ারগুলোতে আসন নেন। তথায় অবকাশ যাপন করতে করতে উপভোগ করেন মুক্তিযুদ্ধের মিনি নাটক। হয়তো যুদ্ধ ঘোষণার মাস বলেই এ বাড়তি আয়োজন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বলে কথা। তবে এটি ইমেজ-নাট্য। বিভিন্ন ইমেজের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো সূত্রবদ্ধ করে প্রদর্শনের চেষ্টা চলে যা’ যাত্রাপথ-এর একেবারেই বাইরে। তবে যাত্রাপথ-র content-এর সাথে এ নাট্যাংশকে একীভূত করলে এটিকে ফ্ল্যাশব্যাক বলা যেতে পারে।

এরই মধ্যে ঘটে যায় গুজরাটের ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। প্রতিবাদী প্রবীর গুহ তথা তাঁর দল ALT নির্মাণ করে ‘গুজরাট’ Story Theatre. এ গল্প থিয়েটার বা নাট্যে দর্শকরা একটি story line পেয়ে যান। মুসলিম পরিপার্শ্ব বোঝাতে আজান দিয়েই গল্প থিয়েটারের শুরু। ক্ষুদে বালক রহিম মাদ্রাসায় পড়ে। সুন্দর তার জীবন। গুরুজনের মুখে ভধনষব, রূপকথার গল্প শুনে শুনে সে ঘুমিয়ে পড়ে। বর্ণনার মাধ্যমে রহিমের জীবন-নাট্য এগিয়ে চলে। দর্শকের চোখ নিমীলিত, সে রহিমকে অনুভব করে, (দর্শক) বিস্কিট খায়। মায়ের-বাবার স্নেহাদরে সে বেড়ে উঠে। হঠাৎ কোথায় বাজ পড়ে। একদল উগ্র ধর্মাবলম্বী রহিমদের বাড়ি এসে তৈজষপত্র ছুঁড়তে থাকে। দর্শক শ্র“তিনাট্যে প্রবেশ করে। এখানে কেবলই শব্দ। অনুভবের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। মুসলমান ঘরে ভাঙনের শব্দ। রহিমের সামনেই তার বাবাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর চিৎকার ধ্বনি, মরণ যন্ত্রণায় কাতরায় রহিমের বাবা। রহিমকে মায়ের কোল থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয়। বর্ণনায় বুঝে নেয় রহিমের মাকে ধর্ষণ করছে একদল পশু। পাগলিনী রহিমের মা কোনোমতে উঠে বসে। তার ঘরে আগুন জ্বলে ওঠে দাউ দাউ। দর্শক পায় অনল স্পর্শ। একযোগে কয়েকটি জ্বলন্ত মশাল প্রতিটি দর্শকের চারদিকে ঘূর্ণায়মান হয়। আগুন জ্বললে যে শব্দ হয় অবিকল সে শব্দই দর্শকের কানে বাজে। সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে পাড়া পড়শী দৌড়ে এসে জানতে পারে রহিমের মা পুড়ে ভস্ম হয়েছে। দর্শক চোখ খুলতেই দেখে নির্দোষ রহিম মাঝখানে বসে মা-বাবার জন্য কাঁদছে। এভাবেই তথাকথিত গল্প না বলে, গতানুগতিক নাটক না দেখিয়ে ভিন্ন ফর্মে, আঙ্গিকে প্রকৃত বিষয়টি গভীরভাবে অনুভব করানোর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে গুজরাট গল্পনাট্যের সমাপ্তি হয়। বর্ধমানের এগারো মাইলে প্রথম নির্মিত এ নাট্যে অনেকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বভারতীর নাট্য অধ্যাপক তারক সেন গুপ্ত।   

এই যে চোখ বন্ধ করে নাট্য সংশ্লিষ্টতার প্রয়াস তার বাইরেও একটি উদ্যোগ আছে। অর্থাৎ চোখ খোলা রেখে। তবে এরও নাম যাত্রাপথ। এটি তিনি নির্মাণ করেছেন ভারতে। Experimental এ নাট্য প্রয়াসের মূল উপজীব্য দর্শকই। তারা একটি হল (hall) বা প্রেক্ষাগৃহে জমায়েত হলে বলা হয় আমাদের যাত্রা করতে হবে। এ ঘোষণা দিয়েই তাদের ঘর থেকে বের করে যাত্রারম্ভ হয়। তারা দেখেন রাস্তার দু’পাশে দড়ি। দড়িতে তাদের পেঁচিয়ে বাঁধা হয়। রাস্তায় আঁকা আছে নৌকো, মাছ, ঘুড়ি ও অন্যান্য ফোক মটিফ (folk-motif). সুখের, সোনার বাংলাদেশের চিত্রকল্প।  

খানিক পথ অতিক্রম করে দর্শক দেখতে পায় একটি লোহার গেট। এখান থেকেই মূল যাত্রার শুরু। গেটের সামনে মাটিতে লেখা ‘১৯৪৭’। সম্মুখে ফাঁকা রাস্তা। এতে একজনের পর একজন ছেলেমেয়ে শুয়ে পড়ছে। যেন লাশ। কোনো না কোনো প্রকারে মৃত। একজন বিভিন্ন ভঙ্গির লাশগুলোর চতুর্পার্শ্বে চক দিয়ে দাগ কেটে outline তৈরি করছে। দাগকাটা শেষ হলেই শুয়ে পড়া নাট্যকর্মীটি উঠে পড়ছে, অন্যজন মৃতদেহের outline-এর মধ্যে লাল রঙ ছিটিয়ে দিচ্ছে। ওরা আবার শুয়ে পড়ছে, একজন দাগ কাটছে, সে উঠে যাচ্ছে, অন্যজন লাল রঙ ছিটিয়ে দিচ্ছে। এভাবে একের পর এক ৩০টি লাশের ছবি বা রঙের ইমেজ তৈরি হয়। তারপর গেটটি খোলা হলে দর্শক হেঁটে যায় রক্ত বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে। উন্মুক্ত মূল নাট্যাঙ্গনে এলে দর্শক পায় একজন প্রায় উলঙ্গ মানুষ। চারপাশ খুবই নোংরা। কাগজের মধ্যে কিছু শুকনো ভাত, একটি মদের বোতল, পুরনো চকচকে শাড়ি, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ ও এক গামলা জল। লোকটি ভাঙা আয়না ধরে ঠোঁটে লিপস্টিক মাখছে। কখনো দু’টো  ভাত খায়, শাড়িকে আদর করে। মদ্য পান করে, গায়ে সিরিঞ্জ ফোটায়। গামলার পানিতে নিজের মুখ নিজেই চোবায়। একটি অসহনীয় অবস্থা অতিক্রম করে পানি থেকে মাথা তোলে হাঁফাতে থাকে। হঠাৎ চলমান হয়ে চারদিকে তাকায়। সারাক্ষণ তো আবহ চলছেই। বিশেষ করে সংবাদ, গল্পের ছলে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার লাইন পড়ে শোনায় কেউ একজন। বাইরে থেকে দু’ একটি জুতো ছুঁড়ে মারা হয়। লোকটি ডানের জুতো বা পায়ে, বায়ের জুতো ডান পায়ে পরে নেয়। সে চলতে থাকে অসমভাবে। উল্টো জুতোর জন্য সরলরেখায় চলতে পারে না। ফেরার পথে এক স্থানে থামে। কয়েকটি মুখোশ রাস্তায় ছড়ানো  ছিটানো। একটি পছন্দ করে মুখে সেঁটে নেয়। আবার চলে। পায় একটি তলোয়ার ও বন্দুক। অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধের অভিনয় শেষে পুনঃ তার চলা শুরু। খানিক পথ গিয়ে পায় এক গুচ্ছ রঙিন ম্যাগাজিন। মেয়েদের ছবি পেলে ম্যাগাজিনের পাতা ছিঁড়ে চাটে, মুখে ঘষে। আবার চলে। অনেকগুলো রঙিন বস্ত্র পেলে লাল রঙের একটি বেছে নেয়। সেটি বুকে বেঁধে চলতে শুরু করে। দেখে একটি ঢোল পড়ে আছে। সেটি পিটাতে থাকে, কিন্তু প্রথমে তাল পায় না, পরে পায়। তাল উচ্চগ্রামে তুলে এক বিকট চিৎকারে দৌড়ে হলের মধ্যে ঢুকে যায়।  

দর্শক ফেরার পথে দেখে ছবিগুলো নেই। প্রাচুর্যহীন বাংলা। ইতোপূর্বেকার ছবির স্থান দখল করে ভাঙাচোরা নোংরা দ্রব্যাদি, ভিক্ষুক, শায়িতা অর্ধ-উলঙ্গ নারী। এ সব পেরিয়েই লোকজন আসছে, প্রেক্ষাগৃহে ঢুকছে। এবার মিলনায়তনের আয়োজন ভিন্ন রকম। চেয়ারগুলো একপাশ চেপে গোল করে সাজানো। অন্যপাশে উপর থেকে ত্রিভুজের মতো করে ৩টি বস্ত্র ঝুলিয়ে একটি সুন্দর মহলের মতো তৈরি করা। মাঝখানে একটি স্টিলের সিঁড়ি স্থাপিত। প্রতিটি ধাপে দু’টো করে মুখোশ বিশৃঙ্খলভাবে। সিঁড়ির উর্ধমাথা থেকে একটি লাল বস্ত্র নিচ অবধি ঝুলছে। সোপানটির মাথায় একটি বড় লাল বেলুন। দর্শক দেখে সাজানো কেদারার মাঝখানে ছোট্ট সাদা আলোর বৃত্তে লোকটি গুঁটিশুটি বসা। সিঁড়ির উপরে মায়াবী নীল আলো। লোকটি ধীরে মুখ তুলে সবার দিকে তাকায়। দর্শকের কাছে হাত পেতে কিছু চাইতে থাকে। কেউ একজন দু’ টাকার নোট দেয়। লোকটি দেখে, শুকে, চাটে। টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে। আবার হাত পাতে। এবার দর্শক বুঝতে পারে না কি করবে। একজন  এসে ওর হাত ধরে। বুকের মধ্যে চেপে ধরে কেঁদে ফেলে। একজন এগিয়ে এসে একটি সাদা রঙের প্যান্ট দেয়, একজন সাদা শার্ট। লোকটি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। একজন প্যান্টশার্ট পরিয়ে দিয়ে উপরের বেলুনটি দেখায়। লোকটি তাকিয়ে বেলুন অভিমুখে আগাতে থাকে। সিঁড়ির গোড়ায় বইয়ের তাকে (যেখানে Das CapitalI রাখা আছে) পা’ রেখে সে উপরে উঠছে। গ্রন্থস্তরে পুঁজি থাকার কারণ কি রাজ্যটি এখনও বাম শাসিত, তাই? সে যা-ই হোক, লোকটি এক ধাপ উপরে ওঠে আর একটি করে মুখোশ নিয়ে নিচে ছুঁড়ে ফেলে। সে টপে উঠলে ইতোমধ্যেই সবগুলো মুখোশ মেঝেতে লুটায়। মুখোশের ¯তূপ। টপে একটিও মুখোশ নেই। সে বেলুনটি মাথার উপর নিয়ে বিজয়ীর ভঙ্গিতে দাঁড়ায়। বেলুনটি নিয়ে খেলতেও থাকে। এক পর্যায়ে তা’ সশব্দে ফেটে যায়। সোনালী অভ্রের গুড়োতে তার সারা গা একাকার। এগুলো ঘামের সঙ্গে লেপ্টেও থাকে। এ অবস্থায় গর্বিত ভঙ্গিতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে সবাইকে তার সোনালী দেহ প্রদর্শন করে। যে সব অভ্রের গুড়ো মাটিতে পড়ে থাকে সেগুলোও তুলে গায়ে মাখতে থাকে। এক ফাঁকে কৌশলে কালো ভুসো রঙটি মাখতে আরম্ভ করে। ক্রমান্বয়ে সারা শরীর তা কৃষ্ণবর্ণ হয়ে পড়ে। একটি স্বপ্ন ভঙ্গের ইঙ্গিত। নিজকে দেখে অবাক হয়ে সে ভয় পেয়ে যায়। অভিনেতারূপী তপন দাস দর্শকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকে। আলো কমতে কমতে নিভে আসে।     

২৯ সেপ্টেম্বর (২০০৫) নির্মাতা প্রবীর গুহ’র সাথে আলাপচারিতায় মিলিত হই। তাতে এ নির্মাণ কৌশলের অনেক খুঁটিনাটি বের হয়ে আসে। এর দেড় বছর আগে প্রথম প্রদর্শনীর অব্যবহিত পর প্রবীর নিজ সম্পর্কে কিঞ্চিত মুখ খুলেছিলেন। রাজনীতি থেকে তাঁর থিয়েটারে আসা। তাই নাটকে মানুষের কথা বলতে চান। তাঁর নাটকে body language-movement-এর গুরুত্ব অত্যধিক। এ জন্যেই বলা চলে কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের গরুর মতো খাটিয়েছি। তারাও সময়ানুবর্তী ছিলেন, নিজেও শিখেছি তাদের থেকে। এ দেয়া-নেয়ার পালায় কেবল দিয়ে দিয়েই নিঃস্ব হয়ে গেলাম, কিছুই পাই নি- এ অনুতূতি আমার নয়, অন্যের থাকতে পারে। আমি থিয়েটারের চাকর-বাকর। ডাকলেই পাওয়া যাবে। আমি মনে করি workshop কখনো শেষ হয় না। ITI-এর এ কর্মশালার একটি chapter বা  অধ্যায় কেবল শেষ হয়েছে।

শেষ আলাপনের যা নির্যাস তা হলো  এ ধরনের নাট্য নির্মাণ প্রচেষ্টা সরলতায় পূর্ণ। বিনে পয়সায় যেখানে সেখানে প্রস্তুত করা সম্ভব। দর্শকের সাথে শক্তিশালী যোগাযোগের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়াটি এগিয়ে চলে। এর চলমানতা  বা mobality গতানুগতিক নাটকের চেয়ে অনেক বেশি। দর্শকের সংশ্লিষ্টতা এখানে প্রত্যক্ষ। আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে এটি নেয়া, অর্থাৎ কোনো বিদেশীর কাছে হাত পেতে শিখতে হয় নি। শেষ কথার অর্থ হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতিতে যা ঘটে সেগুলোই নতুন করে ঘটিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে প্রদর্শন করা হয়।

ভিন্ন ধারার নাট্য নির্মাণের উদ্যোগ এ উপমহাদেশে বা বিশ্বের কোথায় কীভাবে ইতোপূর্বে নেয়া হয়েছে? শিল্প নির্মাণ প্রচেষ্টায় বিকল্প ধারার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি অগাস্তো বোয়াল (Augusto Boal). তাঁর সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোকপাত করে উপমহাদেশে ঘটে যাওয়া প্রথম প্রচেষ্টাটির সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য খোঁজা যেতে পারে।

অগাস্তো বোয়াল এ যাবৎ থিয়েটারে যেসব ধারণার জন্মদাতা সেগুলো হচ্ছেছ: Ôcommunity theater’, `forum theater’, `invisible theater’, `legislative theater’, `theater of the oppressedÕ ইত্যাদি। Community theater সম্পর্কে তিনি বলেছেন, কোনো একটি সম্প্রদায়, বিশেষ পেশাজীবী গোষ্ঠী, আঞ্চলিকজন সমাজের নিজস্ব বক্তব্য তুলে ধরে তাদের সুখ-দুঃখের পরিস্ফূটন এ থিয়েটারের উদ্দেশ্য নয়। তাদেরকে থিয়েটার নির্মাণে সক্ষম করাই community theater-এর প্রধান লক্ষ্য (They don't have theatre at all and then what they make is not creative theatre but to help them to make theatre, wherever, in any place, but not in a special place. That is our task.... I say okay the access is the minimum condition for any kind of popular work to be done, so you have to have access.... Everyone has the right to propose the text and scenes of the play then when we produce with the actors everyone is entitled to get a role in that play. Of course by consensus they say who should play what, but the authorship of the play for instance belongs to everyone and the ownership the same). দেখা যায় ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে নাট্য নির্মাণে সম্পৃক্ত করে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি পূর্বক নাট্য-সংস্কৃতিতে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করার বোয়াল-এর যে প্রচেষ্টা তার সাথে পশ্চিমবঙ্গের ALT'-চিন্তা-চেতনার সাযুজ্য রয়েছে। তবে পাশ্চাতের এ প্রচেষ্টা বাহ্যিক, বরং প্রাচ্যের ভারত উপমহাদেশে যে নাট্যাবিষ্কার তা অন্তস্থলের। কেবল মনোযোগ/মনোসংযোগ বৃদ্ধির জন্য এবং নাটকের বিষয়টি যথা সম্ভব হৃদয়ঙ্গম করে ঘটনার প্রকৃত সময় ও পরিবেশকে অনুধাবন করার প্রয়াসে গতানুগতিক নাট্যক্রিয়ার বাইরে এক অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ। অগাস্তো বোয়াল-এর ফোরাম থিয়েটার, অদৃশ্য থিয়েটার, নিপীড়িতের থিয়েটার ইত্যাদিতে Ôsocio-cultural animation’  লক্ষ্যযোগ্য। তিনি থিয়েটার বানিয়েছেন Ôtheater as the art of looking ourselvesÕ  হিসেবে। তাঁর মতে সকলেই যুগপৎ অভিনেতা (actor) ও দর্শক (spectator). পদবাচ্যদ্বয়কে তিনি এক করে বলেছেন `Spect-Actor’. এটি `spector’ হলে উচ্চারণ আরো সহজসাধ্য হতো। বিষয়গুলোকে বোয়াল আরো জীবন ঘনিষ্ট করে অনুধাবন করেছেন এভাবে: "Actors talk, move, dress to suit the setting, express ideas, reveal passions - just as we do in our everyday lives. The only difference is that actors are conscious that they are using the language of theatre, and are thus better able to turn it to their advantage, whereas the woman and man in the street do not know that they are speaking theatre".

প্রবীর গুহ যেহেতু এক সময় সরাসরি রাজনীতি, বিশেষত প্রোলেটারিয়ান রাজনীতির বরপুত্র ছিলেন, তাই তাঁর নির্মাণ কর্মে নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠীর প্রতি একটি পক্ষপাতিত্ব আছেই। সে বিবেচনায় তিনি অনিরপেক্ষ। আজ কে নির্মাণ না করতে চায় Ôtheater of oppressedÕ? এ কলংকের দায়ভার স্বেচ্ছায় কে তুলে নেবে নিজের স্কন্ধে? Conventional নাট্য প্রক্রিয়া হাজার পরিহার করলেও বিয়ববস্তু নিয়ে সবাই শংকিত থাকে, তাই। ফর্ম ও কনটেন্ট যা-ই বলি না কেন, কোনো একটি উদ্যোগ/কর্ম প্রক্রিয়ায় বাহ্যিক পদ্ধতিগত পরিবর্তনের প্রয়াস তেমন গুরুত্ব বহন করে না। এ কথা ঠিক নাটকে অভিনেতা-অভিনেত্রীর মনোসংযোগ বাড়ানোর জন্য কেউ কেউ বহু আগেই প্রথাগত meditation বা ধ্যান-ক্রিয়ার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। কিন্তু সেটি তো কেবল পাত্র-পাত্রীদের জন্য। দর্শকের জন্য কে কি করেছেন? তারও তো নাট্য উপভোগের জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজন? অন্যেরা যেখানে কুশীলবদের নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন, প্রবীর গুহ সেখানে দর্শকদের নিয়ে মেতে উঠেছেন। তাও এক অভিনব কায়দায়, অভূতপূর্ব প্রক্রিয়ায়। এটিই অন্যান্য নির্মাতার সাথে প্রবীর গুহ’র সুস্পষ্ট পার্থক্যরেখা। আর এটিই তাঁর বেঁচে থাকার ইঙ্গিত।

গোলাম শফিক : নাট্যকার, নাটক বিষয়ক প্রবন্ধ লেখক। সদস্য- পালাকার