Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

দৈনন্দিন থিয়েটার নিয়ে

Written by বের্টল্ট ব্রেখট.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..


তোমরা শিল্পীর দল, যারা থিয়েটার বানাও
বিশাল রঙ্গমঞ্চে, নকল ফ্লাড লাইটের সূর্যাবর্তের নিচে
আর নিশ্চুপ জনগোষ্ঠীর সামনে, এক-একবার কখনো-সখনো
পথঘাটে ঘটতে-থাকা থিয়েটারে গিয়েই দ্যাখো না!
দৈনন্দিন, সহস্রঝোরা, নাম-করা নয়-
তবু কী-যে জীবন্ত, রীতিমতো পার্থিব, জনতার যৌথ জীবনের
উৎস-থেকে উঠে-আসা তরতাজা সেই থিয়েটার
রাস্তার মধ্যে যা অভিনীত হয়ে চলেছে।
সেইখানে, পড়োশিনী বাড়িওলাকে নকল ক’রে পস্টাপস্টি দেখিয়ে দিচ্ছে
হুবহু নকল করে দ্যাখাচ্ছে কথার তোড়ে
ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে সোজা কথাটা থেকে কেমন তিনি ঘাপটি মেরে সরে যান
আর বেমালুম চেপে যান বাড়ির জলের পাইপটা যে ফেটে গিয়েছে আসল
                          সেই কথাটা-ই।
পার্কে পার্কে মস্তানেরা সন্ধেবেলায় খলখলানো মেয়েদের শিখিয়ে দেয়
কী-করে নিজেদের ইজ্জত বাঁচাবার মুহূর্তেও
ফন্দিফিকির করে বক্ষোদেশ দ্যাখানো যায়। আর সেই পাঁড় মাতাল
কী-নিপুণভাবেই না পাদরিসাহেবের বক্তৃতার প্যারডি করে দ্যাখায়
যেখানে তিনি সর্বহারাদের সমৃদ্ধ স্বর্গোদ্যানের অলীক প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন।
কী-রকম জরুরি-ই না এই থিয়েটার, আর কত
আন্তরিক, মজাদার, আর মর্যাদায় ভরা!
তোতাপাখি আর বাঁদরের মতো
শুধু নকল করবার জন্যেই ওদের নকল করা নয়,
এমনতর নিস্পৃহ নয় যে
যা নকল করছে সেটা শুধু
ওরা কত ভালো অনুকরণ করতে পারে সেটার প্রমাণ দেয়ার জন্য।
পক্ষান্তরে, তাদের চোখের উপর থাকে একটা লক্ষ্যমাত্রা।
তোমরা অবিশ্যি অভিজাত শিল্পী, অনুকরণের ব্যাপারে চৌখস ওস্তাদ,
ওদের মাঝখানে থাকতে-টাকতে তোমাদের ভালো লাগে না তেমন।
তবু, তোমাদের শিল্পকে যতই বিশুদ্ধ কর-না কেন,
প্রতিদিনের রাস্তায়-ঘাটে ঘটতে থাকা থিয়েটার থেকে
নিজেদের খুব একটা দূরে সরিয়ে রেখ না।
দ্যাখোই না স্ট্রীট কর্নারের ঐ লোকটাকে, দেখাচ্ছে
অ্যাকসিডেন্টটা কী করে ঘটল। এই মাত্তর
জনতার আদালতের হাতে সে সঁপে দিল ড্রাইভারটিকে!
কী করে স্টীয়ারিঙের পেছনে বসেছিল ড্রাইভার, আর
যে লোকটাকে সে চাপা দিয়ে বসেছে- বোধহয় বুড়ো একটা লোক-
এখন তাকেই নকল করে দ্যাখাচ্ছে।
যে চাপা দিয়েছে আর যে-লোকটা চাপা পড়েছে
দু’পক্ষেরই সে ততটুকু বর্ণনা দিচ্ছে যাতে করে
দুর্ঘটনাটা বুঝতে পারা যায়, আর তোমাদের চোখের ওপর
ফুটে ওঠে। উভয়পক্ষকে সে এখন এমন আলোয় দেখাচ্ছে না যে দুর্ঘটনাটা
                  এড়িয়ে যেতে পারত। অ্যাকসিডেন্টটা
যেমন বোঝা যাবে, ঠিক তেমনিই পুরোপুরি ঠাহর করা যাবে না,
কারণ দু’পক্ষই আরেকটু অন্যভাবে চলতে বা চালাতে পারত,
এখন ও দ্যাখাচ্ছে
কী-ভাবে ওদের ‘ম্যুভ’ করা উচিত ছিল, যাতে
অ্যাকসিডেন্টটা আদৌ ঘটত না। ঐ প্রত্যক্ষদর্শীর মন
কুসংস্কারগ্রস্ত নয়,
নশ্বর মানুষের নিয়তি-টিয়তিকে সে দায়ী করছে না,
দেখিয়ে দিচ্ছে তাদের গলদটা কোথায় ছিল।

তোমরা আরো লক্ষ করো
ওর সততা আর ওর অনুকরণের নিষ্ঠা। লোকটা ভালো করেই জানে
ওর বর্ণনার যাথার্থ্যরে ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে, যেমন
নির্দোষ মানুষটা
বেকসুর খালাস পাবে কিনা, কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষটাকে
ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কিনা। দ্যাখো দ্যাখো
যা একবার করে দেখিয়েছে, আবারও ক’রে দ্যাখাচ্ছে ও।
দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে এক-একবার
সঠিক কী ঘটেছিল মনে করবার চেষ্টা করছে। ঠিক মতো
পুনরাবৃত্তি করতে পারছে কিনা, সেটা বুঝে উঠতে না পেরে
আর কাউকে ডেকে বলছে, সে যদি দুর্ঘটনার
এই জায়গাটা কিংবা ঐ জায়গাটার বর্ণনা দিতে পারে।
এই ব্যাপারটাকে তোমরা সম্ভ্রম নিয়ে দ্যাখো।
আর অবাক হয়ে
এই জিনিসটা লক্ষ করতে পার, যে লোকটা অনুকরণ করে দ্যাখাচ্ছে
সে কখনোই যাকে অনুকরণ করছে তার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে না।
যে গোটা ব্যাপারটার প্রতিরূপ সে দ্যাখাচ্ছে
তার মধ্যে সে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে না। সমস্ত সময়
সে দেখিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু একবারও জড়িয়ে পড়ছে না
তার অনুভত অথবা দৃষ্টিভঙ্গির
অংশ নিচ্ছে না। তার বিষয়ে
জানে সে অল্পই। তার অনুকৃতির মধ্যে
জন্ম নিচ্ছে না তৃতীয় জন, যা এর এবং ওর
মধ্য থেকে সঞ্চারিত, যার মধ্যে রয়ে যাচ্ছে
একটি হৃদয় কম্পমান
অথবা চিন্তাশীল একটি মগজ।
তার ইন্দ্রিয়গুলিকে সংহত করে
সে দেখিয়ে চলেছে দেখাচ্ছে
অচেনা পড়শিদের।

মায়াবী এক রূপান্তর
যা তোমাদের থিয়েটারে আপাতদৃষ্টিতে ঘটে
সাজঘর আর মঞ্চের মাঝখানে : একজন অভিনেতা
সাজঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে, কোনো এক সম্রাট
প্রবেশ করেন মঞ্চে, সেই ছলনাময় ইন্দ্রজাল
যা নিয়ে বীয়ার-বোতল হাতে মঞ্চের কারিগরদের
আমি কতবার হাসি-মস্করা করতে দেখেছি, সেসব ব্যাপার নেই এখানে।
আমাদের স্ট্রীট কর্নারের প্রদর্শক
নয় কোনো ঘুমের ঘোরে স্বপ্নচারী।
নয় কোনো
ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন পুরোহিত মহাশয়। যে-কোনো সময়
তাকে তোমরা এটা-ওটা জিগগেস করতে পার : সে ভেবে-চিন্তে
উত্তর দেবে,
তোমাদের সঙ্গে কথাবর্তার পর আবার শুরু করে দেবে তার অভিনয়।
তোমরা যেন ভুলেও বোলো না : লোকটা
আদৌ কোনো শিল্পীই নয়। ঐভাবে তোমাদের
আর গোটা দুনিয়ার মধ্যে কৃত্রিম প্রাচীর তুলে দিলে
জগৎটা থেকে তোমরা বরবাদ হয়ে যাবে। তোমরা যদি ওকে
শিল্পী আখ্যা না দাও, সে হয়তো বলে বসতে পারে
তোমরা কোনো মানুষই নও- আর তা যদি বলে বসে
সেটা হবে গুরুতর একটা অভিযোগ। তার চেয়ে বরং বল :
ও হল শিল্পী, যেহেতু ও মানুষ। আমরা
ওদের কাজটাকে সম্পূর্ণ আকার দিই আর
সেজন্যই শ্রদ্ধার যোগ্য হয়ে উঠি, আর আমরা যা করে থাকি
সেটা সর্বজনীন আর মানবিক। প্রহরে প্রহরে
রাস্তার টলোমলো আলোড়নের মধ্যে যার মহড়া চলছে, যেটা
খাওয়া-পরা বা মানুষের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই সবার প্রিয়।

তোমাদের থিয়েটার রচনা
এইভাবেই বাস্তবের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হোক। বলে ওঠ : আমাদের
                          মুখোশগুলো
এমন কিছু বিশেষ ব্যাপার নয়, যদি সেগুলো নিতান্ত মুখোশ থেকে যায় :
ঐখানে লোকটাকে দ্যাখো যে বিক্রি করছে স্কার্ফ
পরে নিচ্ছে মনোহরণ আঁটো টুপি
একটা লাঠি আঙঠার মতো হাতের আগায় ঝুলিয়ে আর নাকের নিচে
গোঁফ জোড়া এঁটে নিয়ে পা দুলিয়ে
চলল তার কীঅসকের দিকে, এইভাবে
স্কার্ফ আর গোঁফ জোড়া আর টুপির ব্যবহারে
সুবিধামতন মানুষজনের ভোলটা কেমন পালটে দেয়া যায়
সেটাই দেখিয়ে দিল। তোমরা ওদের বল :
আমাদের মতো কবিতা তোমাদের আছে হকার যেমন
খবরের হেডলাইনগুলো কবিতার ছন্দে ঘোষণা করে,
এইভাবে যাকে বলে এফেক্ট বাড়িয়ে দেয় আর পুনরাবৃত্তি
সহজ করে তোলে। আমরা-ই শুধু
অন্যদের রচনা থেকে মুখস্ত শোনাই না, প্রেমিক প্রেমিকা
আর ফেরিঅলারাও অন্যদের রচনা শিখে নেয়। কতবারই না
প্রবচন উদ্ধৃত কর তোমরা! এইভাবে
মুখোশ, কবিতা আর আবৃত্তি হয়ে ওঠে স্বাভাবিক,
কিন্তু মস্ত চোখ ধাঁধানো মুখোশ, সুচারু উচ্চারিত কবিতা
আর চতুর উদ্ধৃতির ছলাকলাটাই অস্বাভাবিক।
কিন্তু আমাদের মধ্যে যেন ভুল-বোঝাবুঝি না হয়, সে জন্য একটা কথা জরুরি
এমন-কি তোমরা যদিও স্ট্রীট কর্নারের ঐ লোকটির
শিল্পকলার উপর আরো পালিশ ফলাতে জান, তবু
তার তুলনায় তোমাদের কারিগরির দাম ঢের কমে যাবে
যদি তোমাদের থিয়েটারের তাৎপর্য থাকে কম
যদি তোমাদের থিয়েটারের মহত্তর কোনো উদ্দেশ্য বা উপলক্ষ না থাকে,
যদি তার মধ্যে না থাকে দর্শকদের জীবনের উষ্ণ শরিকানা
আর তাহলে সেটা তেমন কোনো কাজেই লাগবে না।

[কবিতাটি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত অনুবাদিত ব্রেশটের কবিতা ও গান গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রিত]

বের্টল্ট ব্রেশ্ট : কবি, নাট্যকার