Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

সমুদ্র মন্থন : অথবা নিছক একটি ভ্রমণ বিবরণ

Written by আসাদুজ্জামান দুলাল.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

১৯৯৪- ৭ ডিসেম্বর। কোনো নিয়মনীতি না মেনে আমাদের রিজার্ভ ফান্ড থেকে হুর-মুর করে দিনটি চলে যায়। মৌসুমের ফসল তুলতে কৃষক যেমন নাওয়া-খাওয়া ভোলে, তেমনি হুরোহুরি। কিচির-মিচির। রাত পোহালে নাট্য-উৎসব। কত বাকি-বাক্য হাসি-কাশি বিনিময়-পসরা লেটকে যাচ্ছে ঝাড়– দেওয়া দূর্বা বনের মগডালে। ছামিয়ানা উঠছে, খুঁটি পুঁতছে, দড়ি টাঙ্গিয়ে প্যান্ডেল মাপ দাও ১২/৮ ফিট। হিহি হাওয়া এড়িয়ে বিড়ির সুখটান। এক যোগে। জোরসে।

মরার সময় নেই কারো। শেষ রাতে বড়াল নদীর ঢেউয়ে চেপে সমুদ্র আসবে চাটমোহর ঘাটে। চারটেখানি কথা! আমাদের বুকের রক্ত ছলাৎ ছলাৎ পাড়ি ভাঙছে, একে অন্যকে ছাপিয়ে, দাফিয়ে। কখনো চোখ পেতে দেখা হয় নি সমুদ্র কারে কয়! ফ্রি কানে শোনা হয় নি তাঁর গুম গুম গর্জন, ব্যঞ্জণ। তাঁর একটানা লহড়া কতটা মাতন তোলে, শুনি নি নীরবে। নিভৃতে ছুঁয়ে দেখি নি ফেনিল ফেনা, রোদের মিশেলে কেমন করে সাত রঙয়ে রঙধনু সাজে। কোন প্রহরে আকাশ পাড়ি দেয়, জানি না। কাঁচা মাথায় সমুদ্রের বিশাল বাংলায় পালক খসা গাংচিল হয়ে দিনভর বেতাল উড়েছি। মিছমিথুইর থেকে পালিয়ে এসে স্বদেশ বন্ধু তালি বাজিয়েছেন। গিরিবাজ কবুতরের মতো তা-ধিন নাচিয়েছেন। সমুদ্র প্রেমে মাতিয়েছেন। জেনে রাখ বিটা, উনি নামেও যা কাব্যেও অবিকল। একচুল ফাঁক পেলে জিভ কেটে নিস তোরা। পাঁপড় বিক্রেতা সামছু ওকালতি করে, কথা সত্য, পাছার কাপুড় কষে রেখ বাপু, সমুদ্রের ঢেউ সব জঞ্জাল চুরে নিয়ে যায় দাপটে। সাবধান! আমাদের বুকের ঢিবি ভাঙন ভয়ে তির-তির কাঁপে! ফাটল ধরে। রাত নামে ঝুপ করে। আমরা গোল চক্রে বসে অমৃতের ছিপি খুলি। মহাদেবের মন্থন প্রণালী একবার স্মরণ করি। বরণ করি। স্বদেশ কাকা চুমুকে চর্বন করে। প্লাবণ হানে। খা বিটা খা, গলা সই করে গেল। পেট ভরা দ্রাক্ষ্মণ আর চোখে বিজ বিজে স্বপ্ন না ছুটলে সমুদ্রের একগাছা লোমও চেনা যাবে না। তিন কলস বীর্য ঢেলেও না। এ তো আমাদের জাতীয় গুদামের ভূষি মাল না যে, ডলা দিলেই ঝুর ঝুর করে পদ্য বিয়োবে। এ বাবা ডাহুগের ক্যারিকেচার। শ্রাবণের ঘন বরষে, গলা চিড়ে একশো একটা ডাক দিলে চোখ ফেটে একফোটা রক্ত। একটা ডিমের এমনই বৃত্তান্ত। প্রসবের নিট ইতিহাস। খেলা কথা না ...। ইতোমধ্যে রাত আমাদের চারপাশ ঘিরে ফেলে। চুপিচুপি শিষ দেয়। আমরা রত্ন’র সিঁড়িতে হাত পা ছড়িয়ে চিৎসাঁতার টাঙ্গাই। জোনাকির আলো ধরে নেরুদার গাঁ তল্লাশি করতে গিয়ে, জীবনানন্দকে ধরে ফেলি। তাঁর হাতে গড়া বন-বিজন, নদী, মৃত্তিকা ভেদ করে কালো মানুষের দেশ দেখি। লাঙ্গলের ফলার নিচে মাটির মরমর শব্দ শুনি। সুঁদা গন্ধ আমাদের দমে দমে কবিতা পাঠের প্রহর বোজায়। মনে পড়ে গত শহীদ দিবসে নিজেদের কবিতা পাঠের প্লেব্যাক। ৪০ টা কবিতা আবৃত্তি করেও হাততালি জোটে নি কারো ভাগ্যে। কারবারী কর্মী হেলাল ওস্তাদ কবি এবং কবিতা দুটোতেই গাল ফুলায়। পত-পত গা চুলকায়। নাটক তার ফেবারিট। কবিতা ছাড়া নাটক ক্যামনে হয়রে বোকচোদা? জিহ্বায় একটা উদ্ধৃতি চাপতেই স্বদেশ বন্ধুর পেটের লাল পানি ক্ষার হয়ে হরহর বেরিয়ে আসে। পাশের থানার শিফট বদলী সেন্ট্রী ঢং ঢং ২ ঘন্টা বাজায়। পৌষের রাত-ভেজা বাতাস আমাদের নাকের মাস্তুলে পাতলা চুমু খায়। শীত কাঁপায়। আমরা হৈ হৈ করে জানতে চাই সমুদ্র এখন চাটমোহর থেকে কতদূূর? ঐ তো বুড়িগঙ্গা ছেড়েছে ১০ টায়। রোগা যমুনা পাকা ৩ ঘন্টা সময় খায়। এখন নগরবাড়ি ছুঁইছুঁই ... আর মাত্র ১ ঘন্টা। বমি সাঁতলানো ফণি মনসার টব, ছিটকে পড়া ভাতের কণা, হলুদ-মরিচের ফিঁকে রঙ টক টক গন্ধ সামাল করে, মাতাল স্বদেশ টাইম ডেপ্লয় করে। তোমাদের বাপু সবতেই তাড়াহুড়ো। ধর্য্যরে ফসল ফলাও। নইলে ভর-বছর অনাহারী ঘুরতে হবে। এত সোজা না। আমরা পুনরায় সমুদ্রের ছন্দে টুং টাং টোকা মারি, পাকে পাকে তলিয়ে যেতে গভীর ডুব কাটি। মাটি ছানি।

অর্পণ সিনেমা মোড়ে বাসের ভ্যাঁ-পু বাজলে আমরা তড়াক করে মাথা তুলি। স্প্রিরীংয়ে দুলে উঠি। কবি সমুদ্র গুপ্ত এসে গেছেন ... দে ছুট ... ইয়াছিন দারোগার নারিকেল বাগানে পজিশন নিলে হেড লাইটের তীব্র স্রোত আচমকা আক্রমণ করে। আমাদের পাঁজর ভেদ করে সারা বাগান ঘিরে ফেলে। আলোর সমুদ্রে দুটো নাবালক কুকুর আমরা ভেসে যেতে দেখি। ভেউ ভেউ আর্তনাদ শুনি। ভুঁ ভুঁ পোঁ পোঁ ক্যাঁচ। গাড়ির পাদানিতে পা দিয়ে, ঘোর আঁধারে জিরাফের গলা মেলে স্বদেশ বন্ধু চিৎকার করেন। সমুদ্র দা কি ৪ নম্বর সিটে আছেন? এটা চাটমোহর, এইখানে আপনাকে নামতে হবে। সমুদ্র দা আমি স্বদেশ বলছি ... সমুদ্র শ্যামলীর ডি-৪ থেকে জলে ডোবা শিশুর মতো হাতের পাঞ্জা নাড়ে। এই তো আমি ৪ নম্বরের প্যাজেঞ্জার। জেগে আছি, বেঁচে আছি। বুক খোলা কালো কোট, চশমাহীন চোখ, নেমে এলেন কবি সমুদ্র গুপ্ত। ছিপছিপে চাঁদের আলো নাড়কেল পাতা ফুটো করে জোরসে ঢুকে পড়ে সবার আগে। বাকশা ঘাসের মতো গোঁফ ঠোঁটের দুপাড় ছাপিয়ে, শিশিরের সরষে দানা সরিয়ে অনেক নিচে ব্রীজ করা দাঁত দেখিয়ে সবাইকে বুকে টেনে নিলেন। কিছু বলতে হবে না, আমি সবাইকে চিনি, নামে নামে ঘ্রাণে ঘ্রাণে অনেক আগেই জেনে ফেলেছি হাঃ হাঃ হাঃ। পথে কোনো অসুবিধা হয় নি তো? হতো, আমি সেটা রুখে দিয়েছি। কেমন? আমার পাশের সিটে ছিলেন এক মডার্ন মৌলভী। জিজ্ঞেস করলেন কোথায় যাচ্ছি? বললাম পাবনা, চাটমোহর। ভাবলাম এরপর নানা কথা বলে কান পচিয়ে দেবে। কী করি? মৌলভী পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, কী কাজ করি। আমি ঠাশ করে বললাম- চুরি করি। উনি আর কোনো প্রশ্ন করলেন না, আমিও বেঁচে গেলাম হি হি হি। আমাদের উখে মাথার ঢেঙ্গা কবি (আমরা যাকে মুরগী মিলন ডাকি) সবাইকে লজ্জা দিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করলেন- আপনি কোন ফর্মে লিখেন, ওয়েস্টার্ন না প্রাচীন ইন্ডিয়া? কবি বললেন- উতরে ... উতরে। আমরা না বুঝে হা মুখে তাকিয়ে থাকি। জানো, সিরাজগঞ্জ রেল গুদামের পাশে পাকিস্তানী মিলেটারী আমিসহ ১৩ জনকে আটকে দিল। লাইনে দাঁড় করিয়ে সবার নুনুর ফল্ডিং মস্তক দেখে মুসলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে তবে মুক্তি দিল। সেইটা কেমনে লিখবো ভাবছি। খেতে বসে বিড়ালের সাথে তুমুল ঝগড়া বেধে গেল কবির। কাতলা মাছের একটা টুকরো হাতে নিয়ে কবি বললেন, এটা আমার। বিড়াল ডাকলো মিঁউ। না না আমার পাওনায় তুই ভাগ বসাতে কেন আসিস? ম্যাঁও ম্যাঁও ... ও ছাড়বিনে- বেশ তবে আয় ফিফটি ফিফটি। আমাদের নাটকের হোমিও ডাক্তার রবি ঠাকুরের নোট টুকে ডাইনিং জুড়ে আমসত্ব সাজায়। অর্চনা বৌদি সদ্য সিঁদুর পরে টেবিলের মাছি তাড়ায়। সন্দেশ, কলা, আমসত্ব চেটে পুটে খেলেও দুধ খেতে কবি অস্বীকার করেন। আমরা হা হা করে উঠি। আমি দুধ খেতে পারি না, এটা শিশুদের খাদ্য। আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ শিশু এক ফোঁটা দুধ থেকে বঞ্চিত। আমি ধ্যামড়া বুড়ো ঐ সাদা খাদ্য ক্যামনে খাই? খাওয়া কি উচিত বলো? আমরা কনডম মুখ পেছন ফেরাই। কিছু বলি না।

পরদিন জাহিদের সাইকেলের ক্যারিয়ারে ছোকরা বেশে প্রমথ চৌধুরীর গাঁ দেখতে হরিপুর যান। দিন শেষে কোটের পকেটে নিয়ে আসেন গুঁড়িয়ে যাওয়া চৌধুরী বাড়ির এক টুকরা পাটকেল। রেগে কাঁই কাঁই। শালার দেশ একটা। যতদূর চোখ যায় কেবল বোলেম বোলেম মসজিদ মন্দির দেখতে পাই। আর এত গুরু মানুষের স্মৃতি ধুলোয় মিশায়। সব শালা বেয়াদপ ... পকেটের ঢিল তুলে আমাদের তাক করলে আমরা মাথা নিচু করি। তাজা রক্ত এরাই। ভয় নেই, এই পবিত্র ইটের টুকরো কলুষিত করবো না। এটা ঢাকা যাবে। আমার বাসায় শো-কেসে ঘুমোবে। ঘুম ভাঙলে সারা জীবন বুকের মধ্যে গড়াবে।

বড়ালের উল্টো পিঠে নাট্যমঞ্চ। এবার সেখান থেকে কবির ডাক আসে। মুহুর্মুহু নাম ধরে ডাকে কে? নদী কি কখনো কবিকে কাছে ডাকে? অন্তরালে মনের কষ্ট খুলে কয়? বাঁচার দাবী জানায়? মাথার দিব্যি দেয়? আমি তো মাইল মাইল নদীপথ হেঁটেছি। নির্জনে। একা। দেখেছি অর্ধেক জল অর্ধেক রক্ত প্রবাহিত। আবার রক্ত জল হয়ে ছুটতে দেখেছি সমুদ্র দিকে। তাহলে ... এসব ভাবতে ভাবতে কবি চুল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় উৎসব প্যান্ডেলে। ২০০ ওয়াটের আলোয় ঝলসে ওঠে মুখ। চোখের দ্যুতি জ্বলে দাউ দাউ। দু-আঙ্গুলে গোঁফের লাগাম টেনে মাউথ পিসের উচ্চতা মাপেন তিনি। আমি এখানে কবিতা বলবো না। চাটমোহরের সমৃদ্ধ মানুষের সাথে কেবল একটি তীর ছুঁড়তে চাই। সম্পূর্ণ ইস্পাতের শানা। আলফ্রেড সরেনের মতো টান টান। যারা আমার প্রাণপ্রিয় কৃষককে হত্যা করে ফসলের অসম্মান করেছে, শ্রমিকের বুকে পা তুলে মানুষের অমর্যাদা করেছে, সোনার বাংলা লুটের রাজ্য বানিয়েছে, ’৯০-র আন্দোলন রুই মাছের ভাগা বানিয়েছে, সেই সব শুয়ারদের বুক বিদীর্ণ করতে চাই। প্যান্ডেল জুড়ে আমরা সাঁ সাঁ শব্দ শুনি। লক্ষ তীরের ফলা এলোপাথাড়ি উড়তে দেখি।

গ্রামে প্রচণ্ড রোদে পুড়ে যাচ্ছে কালো হাত
আর লাল হয়ে যাচ্ছে সব মাটির মানুষ।
টকটকে লোহার মতোন,
শ্রমিকের খুনের সাথে কারখানা জ্বলে যাচ্ছে।
জনযুদ্ধে জ্বলে যাচ্ছে শোষকের লেজুড়।
অগ্নিকাণ্ড প্রত্যেকটি রুদ্ধ বুকে আজ ...

আসুন আমরা সবগুলো টার্গেট এক করি। আমরা কবিকে কমিউনিস্ট জ্ঞান করি। উনি ঝেড়ে অস্বীকার করেন। মুখের কথা না, কমিউনিস্ট হতে স্পেশাল মেরদণ্ড লাগে হে, সেটা আমার নাই। বড় জোর কাণ্ডজ্ঞানের মানুষ আমি। কালাবাঘ নাটক শেষে কবির চোখ ঝেঁপে জল আসে। ভেতরের সমুদ্র স্লুইচ গেইট টপকে উৎসব প্যান্ডেল থৈ থৈ ভাসায়। আমাদের শিশু কবি, গাঁয়ের কবি, আপন ঘরের কবি, দু-হাতে জলকেলি করে। ফঁৎ ফঁৎ নাক টানে।

আশুতোষের বাসায় মাদুর বিছিয়ে শুরু হয় পাঠচক্র। পাবনা থেকে আব্দুল্লাহেল বাকী, সাইদ হাসান দারা ঢুক করে ঢুকে পড়েন আসরে। লোমশূন্য উদোম বুকে কবি পদ্মাসনে বসেন। আমরা কবিকে এবার লোকনাথের ফ্রেমে বাঁধাই করি। শত ভক্তের প্রণাম নিয়ে রক্ত পদ্মের পালকিতে আটলান্টিকের ঢেউয়ে ঢেউয়ে যেন বা দোলনা দোলে। পূজোর বেলপাতা, নিবেদিত ধান দূর্বা, কচি ডাব, ঘি প্রদীপ সামান্য সামনে নাচে। প্রণাম করে। পুরোহিতের ঘন্টা বাজিয়ে কবি বর দেন-

কাকে হাত ধরে তুলতে হবে, আর
কাকে মারিয়ে যেতে হবে
এ সিদ্ধান্তের ভার
রুখে উঠা মানুষের হাতে
ক্ষীণকায় ক্লিষ্টবুদ্ধি বুদ্ধিজীবীদের তাতে
কিছুই বলবার নেই

ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি নমঃ নমঃ মহাস্তবক শুনতে শুনতে আমরা নিদ্রা ঘোরে পূজোর মক্ষিত, আতপ চাল, গাব ফল চুরি করি। গোপনে ক্ষীর খাসা পায়েস ভাগ করি। চাটি। নাকের ঘড় ঘড় মিউজিকে ভোরের কাকা জেগে ওঠে কা কা। নিশাচর কবি উঠে দাঁড়ান। চলি ভাই, দেখা হবে আবার। আমরা আড়মোড়া ভেঙে বলি, তোমার ঝোলা থেকে কিছু রেখে যাও কবি। চোখে চোখ রেখে, শেকড়ে শোক মেখে, রোদ ঝলসানোা মস্ত একটি মানুষের মুণ্ডু আমাদের হাতে গুজে, সাত সমুদ্রে মিশে যান তিনি ...

হায় হায়, জিজ্ঞেস করা হয় নি মান্নান নাম তাঁর কে রেখেছিলেন? কিন্তু এখন পরম মরমে ঘুমিয়ে আছেন তিনি। চুপ! ডাকা যাবে না ...

আসাদুজ্জামান দুলাল: নাট্যকার, নির্দেশক। চাটমোহর সমন্বয় থিয়েটার, পাবনা

ত্ন