Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

রাশ প্রিন্ট: সঞ্জীব চৌধুরী

Written by আজাদ আবুল কালাম.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

This is one of the, I would say, difficult experience of our time- we do not know if we know what we should know.- Gaston Robege

 প্রধান চরিত্র সঞ্জীব চৌধুরী (জন্ম- ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬২, মৃত্যু- ১৯ নভেম্বর ২০০৭)।

ভিলেন বা প্রতিপক্ষ- স্বৈরাচার অথবা রাষ্ট্রের নিপিড়ন।

এই সেই আশির দশকে উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। প্রথমে গণিত তারপর ‘ভাল্ লাগে না, ভাল্ লাগে না, মনের অসুখ ...’ এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে দেহ-মন স্থানান্তরিত; মিশুক বন্ধুবৎসল ছাত্র, কিঞ্চিৎ লেখে, কিঞ্চিৎ গায়, এই এদ্দুর (!) রাজনীতি সচেতন মাত্র। বেশ একটা প্রেমিক প্রেমিক ভাব- আর প্রেমিক হতে হলে যা যা লাগে- ঐতো ঝাঁকড়া চুল, অবিন্যস্ত গোঁফ, জামাটা ঝুলে থাকে ঢিলেঢালা জিন্সের গা ঘেঁষে। হেঁটে চলে সঞ্জীব দা’। ... ট্রলি ব্যাক।

হেঁটে হেঁটে এসে থামে- প্রিয় টি.এস.সি’র লাল বারান্দায়- আরো কেউ কেউ বসে আছে আদরের চকচকে মেঝেতে, তারাও একেকজন ঐরকম নানান ভাবের, তবে সবার কমন ভাব আছে একটা- দ্রোহ। ঐ লাল বারান্দায় কয়েক যুগ ধরে এমনি অনেকে বসে- আর বুক পকেটে ভাঁজ করা প্রেমপত্র লাজুক খুলে দেখায়- আমরা দেখি সঞ্জীব দা’ নতুন একটা গান লিখেছেন- গান মুখস্ত, সুর ইতোমধ্যে ঠোটস্ত। তখন গান আর গান ছিল না- একেকটা লিফলেট, একেকটা টানটান ম্যানুফেস্টো। তখনও এ শহরে সুমন, অঞ্জন, নচিকেতারা আসে নি- তবে মুকুন্দ, হেমাঙ্গ, লাকিরা ছিল। হ্যাপি তো ঐ বারান্দার আরেক হারানো সাথী।- সঞ্জীব দা’র এ সব লিরিকস তখনও যন্ত্রবন্দী হওয়ার আগেই মুখে মুখে ঘোরে। তখন দুপুর হবে হবে- একটা মলটফ ককটেল ফাঁটে হাকিম চত্বরে। পরপর আরো দুটো। আর দেখা যায় খাঁকি ভর্তি একটি ট্রাক আর ‘দেশ-প্রেমে বলিয়ান’ সৈনিকদের একটা লরি টি.এস.সি’র কাছে এসে থামে এবং নিরস্ত্র সঞ্জীব দা’দের দিকে অতি উৎসাহী স্বৈরাচারের লাঠিয়াল কনটিনজেন্টের দুই সারমেয় বাহিনী এগিয়ে আসে- দে ছুট দে ছুট- দৌড়ে চলে সঞ্জীব দা’। ... লং শট।

দৌড়ে দৌড়ে দেয়াল টপকে, লাফ-ঝাপ দিয়ে এসে থামে- প্রিয় শাহবাগ, প্রিয় সিনোরিটা, প্রিয় কোহিনূর, প্রিয় মৌলিতে। সেখানে তখন দিশু, ড্যানি, মোঃ খসরুরা আতংকে- প্রিয় স্বদেশের বুকে ব্যাভিচারের নিন্দা জানাচ্ছে খিস্তিতে গালিতে। (এখানে বলে রাখা ভালো, ঢাকাবাসী এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেশি খিস্তি উপহার দিয়েছিল স্বৈরাচারী লে. জে. হো. মো. এরশাদকে)- আর তখন বেশ চোখ জ্বালা করে সবার- কেউ কেউ কাগজে আগুন জ্বালিয়ে টিয়ার গ্যাসের জ্বালা পোড়ায়। তখন তীব্র সাইরেনে দেশ প্রেমিক সৈনিকরা দক্ষিণ দিক থেকে এদিকেই আসছে এমন গুজব ছড়ায়। গুজবটি সত্য কি না তা নিয়ে মা-বাপ ১৪ গুষ্ঠী তুলে আলাপ (!) চলছিল। তখন দেখা যায় পূব দিকে সন্ধ্যার সাথে পুলিশ কন্ট্রোলরুম থেকে হায়নারা এগিয়ে আসছে আর কী আশ্চর্য, পশ্চিম দিক থেকে আমাদের সীমান্তরক্ষীরা সীমান্ত ছেড়ে এদিকে আসছে। তখন এই এলাকাটি একটি ২৫ মার্চ ১৯৭১ এর রাতের ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট চলচ্চিত্র জন্ম দিতে উন্মুখ- অতএব বাকি আছে উত্তর মুখ। আবার দৌড়- দৌড় আর পিছন থেকে মুহূর্মুহূ টিয়ারগ্যাস, বিদেশ থেকে (সম্ভবত ইন্দোনেশিয়া অথবা বার্মা) আনা বেত ফার্নিচারের অংশ না হয়ে, সঞ্জীবদাদের পিঠে, হাঁটুতে, ঘাড়ে, মাথায় আঘাত করে। মাথা, হাঁটু ফাটে- এবং অদ্ভুত আমদানী করা বেতও ভেঙে টুকরো টুকরো হয়। এরশাদের সোডিয়ামবাতি জ্বলে জরুরী অবস্থায় এবং রাস্তা সুনসান। - এ অংশ ৪০০ এ.এস.এ’র কোডাকে শুট করতে হবে এ্যাপারচার কী হবে সেটা ক্যামেরাম্যানের দক্ষতার উপর নির্ভরশীল। ছবিটা হবে এরকম- হলুদ আলোর রাস্তার ইট-পাটকেল, ছেঁড়া জুতা-স্যান্ডেল, ভাঙা বেত, একটু দূরে টায়ারের গায়ে তখন অল্প আগুন, দু-একটা কুকুর লেন্সের বা দিক থেকে ঢুকে পারসপেক্টিভে মিলাবে- যদি কুকুরটা পোষা হয়। তা না হলে সে যেভাবে যেতে চায় যাবে। ব্যাক গ্রাউন্ডে ক্ষীণ কণ্ঠে শোনা যাবে- ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’। ... ফিক্সট শট।

এক-রকম স্বৈরাচার নিপাত যায়। সঞ্জীব দা’ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন- ‘দৈনিক আজকের কাগজ’ থেকে ‘ভোরের কাগজ’। ভোরের কাগজে এসে অনেক শিষ্য-সামন্ত জড়ো হয়- তার ঘর আর পত্রিকার অফিস থাকে না, হয়ে যায় ছোটখাট ক্লাসরুম। সেই ক্লাসের ছাত্ররা এখনো নানা জায়গায় করে খাচ্ছে। বিনোদন পাতা বলতে যা বোঝাতো সেই চিত্রালীর মতো নোংরা থাকে না- দৈনিকে নতুন যুগের সূচনা হয় তার হাতে, কী লেখায়, কী বিষয় নির্বাচনে, কী রুচিতে। তখন নিজেই ঐ পাতায় এবং সাহিত্য পাতায় নিয়মিত কিছু না কিছু লিখতেন। সেলিব্রেটিরা নাকি গোপনে পত্রিকায় যায় অথবা অগোচরে ফোনে ফোনে যোগাযোগ রাখে। আবার সেখানে নাকি পারস্পরিক বোঝাপড়া, লেনদেন ইত্যাদিও থাকে অথচ সঞ্জীব দা’র ‘মেলা’য় যেতে বাধ্য করেন সবাইকে তার ব্যক্তিত্বের আপন যাদুতে। তখন আর গোপন কোনো বোঝাপড়া না, সবার জন্য আরেক আড্ডা যেন। সেই আড্ডা থেকে লেখা, আরো কিছু গান লেখা- নেয়া, গান থেকে, গানের দল ‘দলছুট’। এগুলো একের পর এক ডিসলভ্। হয়। তারপর দুটি স্থির চিত্র ‘বৌ- শিল্পী আর ‘কন্যা- কিংবদন্তী’।

কিংবদন্তী সে হতে থাকে আর নানান অস্থিরতা, অনিয়ম করোটির ভিতর হাজারো লিরিক, লিমেরিক পদ্যের হৈ-চৈ। হৈ-চৈ কনসার্টের- নতুন নতুন এ্যালবামের। যতবার দেখা হয়েছে ততবারই বড় অস্থির। অস্থির সময় নিয়ে, রাজনীতি-সমাজ নিয়ে। আর তারই চারপাশের মানুষের রাক্ষস হওয়া নিয়ে। এতসব রাক্ষসের রাজত্বে কে স্বস্তি পায়? আর এতসব অস্বস্তির মধ্যে এই বাজার দুনিয়ায় টিকে থাকার যুদ্ধ কীভাবে জয় করবে সঞ্জীব দা’ বুকের ভেতর এতসব নস্টালজিক বায়োস্কপ নিয়ে। বিগ ক্লোজ-আপে ধরা সঞ্জীব দা। মুখে বলিরেখা। মুখের ওপর ভয়েস ওভার হিসেবে তার কিছু গদ্যের কথা গানের কথা যেতে পারে। ... জুম ইন।

গদ্যের কথা? গানের কথা?

কী আশ্চর্য পিছনে ফিরে দেখি কৈ অত গান লিখেছিলেন, কৈ অত গদ্য তার কলমে এসেছে, কৈ অনেক লোকের সাথে অনেক মিশেছিলেন তিনি- খুব কি সবার বেশি করে দেখা? কিছু গান আর খান-দুয়েক গল্প। গ্রন্থ সম্ভবত ছাপার অক্ষরে মাত্রই একটা। আর এ-ও লক্ষ্য করি, এমনই তো হবার কথা- যতই তাকে আজ যেখানে উঁচিয়ে সবাই ধরি না কেন, সে তো অতি নিরীহ- সাধাসিধে, সাধারণ, আমাদের কাছের একজন মানুষ ছিলেন মাত্র- একটু অগোছারো শুধু। তার তো অনেক কিছু থাকার কথা না। আজ যে উঁচুতে তা-তো মাত্র সেদিনের ঘটনা। নিগৃহিত হতেও তো দেখেছি। সেই নিগ্রহ প্রচণ্ড হুঁংকারে ফিরিয়ে দিতেও দেখি নি। অবশ্য এ-ও এক খেলা একদিন যে সব হটকারীরা তাকে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের জীবন-যাপনের কারণে নিগৃহিত করেছিল- তাদেরই কেউ কেউ আবার সেই টি.এস.সিতেই তার কফিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি-যজ্ঞে পৌরহিত্য করে। সে যাক- মোদ্দা কথা সব কিছুই তো তার অল্প ছিল। এত অল্প তাহলে তার জায়গাটা কোথায়- কিছু মানুষের মনের মণি-কোঠায়? পরে ভেবে দেখি-‘অল্পের’ ভিতর ‘বিরাট’ কিছু ছিল। তাই তো মাত্র এ-ক’টা গল্প লিখে বাংলা একাডেমীর আশির দশকের গল্প সংকলনে জায়গা করে নিয়েছেন। আর অল্প-সল্প গান নিয়ে বাংলা গানে এক বিশিষ্ট মুকুট পড়ে বসে আছেন। এই মুকুট পড়া ছবিটা ... মিড লং-এ ধরা।

এ বড় ভাবনার কথা, মৃত্যু কি মানুষের জন্য পূর্ব-নির্ধারিত- নাকি কেউ কেউ মৃত্যুকে আহ্বান করে- নাকি মৃত্যু কারো দিকে বারবার ধেয়ে আসে জীবন থেকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য- আর সে যদি হয় শিল্পী, সে কোথায় খেলো, কোথায় কোন করিডোরে, কার ঘরে ঘুমিয়ে পড়লো- আগোছালো। শিল্পীর এই অযাচিত মৃত্যু এত অহরহ এত দৈনন্দিন কেন আমরা প্রত্যক্ষ করি আমাদের কালে এবং পূর্বের হাজারো ক্যালেন্ডারের পাতায় পাতায়। তাহলে সঞ্জীব দা’ কি মৃত্যুকে আহ্বান করেছিলেন- নাকি মৃত্যু তার দিকে ধেয়ে এসেছে? একবার তো অল্পের জন্য বেঁচেও গিয়েছিলেন, তা কি পরবর্তী বড় সর্বনাশের শুধুই ইংগিত ছিল? এত সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। আর এ-ও তো প্রাসঙ্গিক আমরা কি আমাদের নিকট মানুষকে সত্যিকারের দেখার ফুসরত বের করতে পারি- জানতে পারি কি ঘটে যাচ্ছে। এই তথাকথিত গণযোগাযোগের দূর্বার গতির কালে- আহা! ইন্টারনেট! মানে মনে চাইলে সন্দেশটাও এসে যায়- অথচ আমরা কেউ জানতেই পারি নি- উনি ধুকছিলেন, কেন ধুকছিলেন, ভেতরে কোন দহন ছিল, কোন অপরিনামদর্শিতা ছিল? ছিল কোন দারুণ ক্ষোভ? এত না সব জানাজানির কাল- আমরা জানলামই না, আমরা তো ভুলে গেছি কী জানার দরকার ছিল, কী সব আসলে গোচরে থাকতে হয়। অন্যের ভাষা অন্যের কথা বুঝতেই ভুলে গেছি- কিছু বাইসন বেবুন দেখানো যেতে
পারে। ... স্টক শট।

কেউ কেউ খুবই অপ্রাসঙ্গিক কথা তুলেছেন- এই মৃত্যু মদ্যপানের বিষক্রিয়া, তা-ও আবার নকল মদ। ধারণাটি শুধুই অমুলক। তারপরও এমন যদি হয়- তাহলে এ কোন অসভ্যতার ভেতর আমাদের জীবন-যাপন, যেখানে সঞ্জীব দা’র মত শিল্পী অগোচরে অন্ধকার গলি থেকে বোতল ভরে মৃত্যুদূত নিয়ে আসবে ঘরে? কেনো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মদটিতে তার অবারিত অধিকার থাকবে না?

খুব বড় নায়ক নায়ক প্রতিবাদী হতে তাকে কখনো দেখি নি- প্রতিবাদ ছিল ভিতরে দুমরে মুচরে যাওয়া- তবে একবার বড় প্রতিবাদী হয়েছিলেন, তা-ও ঐ টি.এ.সি’র সামনে ‘কনসার্ট ফর ফাইটার্সে। সদ্য মা মারা গিয়েছেন- ফিরেই কনসার্ট। মঞ্চে গান নয়- কথা তুলেছিলেন- তখনও বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায়- জিয়া থেকে ইলিয়াস আলী সবার বংশ উদ্ধার করেছিলেন- অথচ তখন মঞ্চের সামনেই ছাত্রদলের সব নেতারা বসে ছিল- টু-শব্দটি করার সাহস হয় নি কারো। সম্মিলিত ছাত্রদের মুখ দিয়ে সমস্বরে বলিয়ে ছেড়ে ছিলেন কর্নেল তাহেরের হত্যাকারী জিয়া, জিয়া, জিয়া। এরপর আরেকবার মৃত্যু এক বড় প্রতিবাদ হয়ে যায় সঞ্জীব দা’র জন্য। পরিপার্শের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ- সময়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ- যে প্রতিবাদের ভাষা তার গানে আছে- লেখায় আছে, আলাপচারিতায় আছে। মস্তিষ্ক ঠাসা আবেগের ভিতর আছে। আর তার ধারাবাহিক প্রতিবাদ আরেকটি মাত্রা পায় শবযাত্রায়। টি.এস.সি থেকে আহাজারী ভরা মিছিলটি কি এ সময়ের জরুরী অবস্থা ভঙ্গ করেছিল? মিছিলটি মিলিয়ে যেতে থাকে টি.এস.সি ছেড়ে দূরে- অবশেষে বিন্দুতে মেলায়। এন্ড টাইটেল পর্দায় ভেসে উঠবে। সমাপ্ত। পর্দায় অন্ধকার।

পুনশ্চ: ভয়েস ওভার
তাহলে কী দাঁড়ালো? সব কিছু তার অর্ধেক কিংবা নিছক শুরু মাত্র। সব সম্ভাবনা মগজের ভেতর জড়ো করে, নিজেই জড় হয়ে শুয়ে ছিলেন এ্যাপোলোর শীতল আ.সি.ইউ-তে। উনি নিজেই কি কোনো একদিন জেনেছিলেন তার জীবনের ফাইনাল প্রিন্ট কখনোই হবে না? সব তার রাশ প্রিন্ট।

সবাই প্রেক্ষাগৃহ ত্যাগ করে।

আজাদ আবুল কালাম : নাট্যকার, অভিনেতা, নির্দেশক। সদস্য- প্রাচ্যনাট