Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

পাখির চোখে দেখা

Written by আব্দুল্লাহেল মাহমুদ.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

এ লেখাটির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু অনুজপ্রতীম প্রিয় সম্পাদক যখন সেলিম আল দীনের নাটক নিয়ে লেখার জন্য অনুরোধ করলো, তখন না বলতে পারলাম না। জানি না কোথা থেকে শুরু করবো! পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তে যারাই নাটকের সাথে যুক্ত তাদের সবাইকে মনে হয় আপন মানুষ। এই বোধ ও অনুভূতি থেকে এক-ধরনের গর্ববোধ করি। সেদিক থেকে সেলিম আল দীন আমাদের খুব কাছের মানুষ, ঘরের মানুষ। দু’চারখানা নাটক লেখার যোগ্যতা ও অযোগ্যতায় নিজেকে তাঁর স্বগোত্রীয় বলে আত্মশ্লাঘাও হয় কিঞ্চিৎ। হয়তো এটাই স্বাভাবিক। তারপরও আমার মতো অর্বাচীনের পক্ষে তাঁর শিল্পসৃষ্টি নিয়ে কিছু বলা খুবই বিপদজনক কাজ। প্রতি মুহূর্তেই আশঙ্কা, তাঁকে অবমূল্যায়িত করে ফেলছি কিনা। তাঁর শিল্পের মূল্য-বিচার (Value Judgement) করা এ রচনার উদ্দেশ্য নয়। আর শিল্পের মূল্য-বিচারে আমি বিশ্বাসীও নই। আমার কাছে বরং তাঁর শিল্প যাত্রার গতিপথ আবিষ্কার করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের স্বাধীনতার সমান বয়সী নবনাট্যের নির্মাণযজ্ঞে সেলিম আল দীন এক উজ্জ্বল কারিগর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, নাট্যসংগঠক, শিল্পতাত্ত্বিক- নানা পরিচয়ে পরিচিত হলেও তাঁর প্রধান পরিচয় নাট্যকার। অন্তত এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত করবেন না বলে আমার বিশ্বাস। আমার আলোচনা তাঁর এই পরিচয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করবো।

বিষয়টি বেদনাদায়ক হলেও আমার এ লেখার জন্য এটি একটি স্বস্তির বিষয় এই যে, সেলিম আল দীন আর কোনোদিন তাঁর নতুন সৃষ্টি দিয়ে আমাদের চমকে দিবেন না। ব্র্যাকেটবন্দী হয়ে এই নিষ্ঠুর কাজটি করে গেছেন তিনি।

সেলিম আল দীনকে বুঝতে হলে খুঁজতে হবে তাঁর বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া, সেলিম আল দীন হয়ে ওঠার ঘটনা পরম্পরা। দ্বিজাতিতত্ত্বের গর্ভে জন্ম নেয়া পূর্ব পাকিস্তানের এক নয়া উপনিবেশিক পরিবেশে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। সাম্রাজ্যবাদ যখন উপনিবেশ স্থাপন করে তখন সে শুধু তার ভূগোলটাই দখল করে না, দখল করে তার স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, স্মৃতি, ভাষা আর সংস্কৃতি। ভারতীয় উপনিবেশে বৃটিশরা এক্ষেত্রে পুরোপুরি না হলেও অনেকাংশেই সফল হয়েছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে প্রথমেই স্থানীয় ইসলামিক দ্যোতকগুলোকে পাল্টানোর কাজে হাত দিতে হয়েছিল। প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে তাদের ধ্বংস করতে হয়েছিল। তা না হলে বিভেদ তৈরির কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল না। আর বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারলে উপনিবেশ সুসংহত করাও সম্ভব নয়। এর ফল যা হলো- যারা ছিল প্রান্তে, তারা চলে এলো কেন্দ্রে আর যারা ছিল কেন্দ্রে তারা চলে গেল প্রান্তে। এর ফলে বাঙালি মুসলমানরা প্রতিহত করতে পেরেছিল সাম্রাজ্যবাদী আধুনিকতাকে। যে কারণে কোলকাতা কেন্দ্রীক তথাকথিত রেনেসাঁসে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। সে ধারাবাহিকতায় বাঙালি হিন্দু মুসলমানের আধুনিকতা একটি ফাটল হিসেবেই দেখা দেয়, যার প্রকাশ বঙ্গভঙ্গের আগেই দেখা দিয়েছিল। এসবেরই ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর ভারত বিভাগ। এরকম একটি কালখণ্ডে জন্ম সেলিম আল দীনের, এক নতুন উপনিবেশে।

খণ্ডিত ভারতবর্ষে শুরু হলো নতুন করে চৈতন্যের উপনিবেশিকরণ। পাকিস্তানের নতুন রঙ্গভূমিতে নাটক ছিল রাজনৈতিক মঞ্চে, রঙ্গমঞ্চে কোনো নাটক ছিল না। কালেভদ্রে দু’চারখানা নাটক যা-ও-বা হতো তা ছিল সখের দলের অভিনয়। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া উল্লেখ করার মতো কিছু মঞ্চস্থ হয় নি পাকিস্তানী কালখণ্ডে। এর অন্যতম কারণ হলো- চৈতন্যের উপনিবেশিকরণ। মুসলমান সংখ্যা গরিষ্ঠ পূর্ব বাংলায় মুসলমানরা অভিনয়ের সাথে যুক্ত ছিল না, তারা ছিল নিষ্ক্রিয় দর্শক। যারা ছিলেন অভিনেতা, সংগঠক, ভারত বিভক্তির ফলে তারা দলে দলে দেশান্তরী হলেন। এর প্রতিক্রিয়া যা হবার তাই হলো- অর্থাৎ এদেশে কোনো নিয়মিত নাট্যচর্চা গড়ে উঠলো না। এজন্যে আমাদের অপেক্ষা করতে হলো ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত। সেলিম আল দীন-সহ আরো ক’জন নাট্যকারের অভ্যুদয় এই স্বাধীন বাংলাদেশে।

সেলিম আল দীনের কথা মানেই তাঁর নাটক নিয়ে কথা। কিন্তু নাটক নিয়ে লেখার নানান সীমাবদ্ধতা। শিল্পকলার এই মাধ্যমটি খুবই পরনির্ভরশীল। কথাটার একটা ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ধরা যাক গল্প, কবিতা কিংবা উপন্যাস- লেখক তার রচনা ছাপিয়ে দিয়েই মুক্ত। পাঠক-পাঠিকা নিজের মতো করে পড়ে নিবেন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করবেন, আস্বাদন করবেন শিল্পরস। কিন্তু নাটকের ক্ষেত্রে একথা চলে না। নাটকটি মুদ্রিত হলেও তাকে অপেক্ষা করতে হয় মঞ্চায়নের জন্য। এই মঞ্চায়ন একটি বহুমাত্রিক ও জটিল প্রক্রিয়া। নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনয়-শিল্পী, কলাকুশলী সর্বোপরি দর্শক-শ্রোতার সম্মিলিত প্রয়াসে একটি নাটক (drama) নাটক (Theatre) হয়ে ওঠে। নাট্যকার সৃষ্টি করেন, আর নির্দেশক করেন পুনর্সৃষ্টি- অভিনেতৃ, কলাকুশলী আর দর্শকদের নিয়ে। সেদিক থেকে সৌভাগ্যবান সেলিম আল দীন। তাঁর পাশে ছিলেন নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফ, ছিল সংগঠন- ঢাকা থিয়েটার। আর এই ত্রয়ীর সম্মিলনেই সম্ভব হয়েছে সেলিম আল দীনের ‘সেলিম আল দীন’ হয়ে ওঠা। শুধুমাত্র ভালো নির্দেশনা ও অভিনয়ের অভাবে একটি নাটক হারিয়ে যেতে পারে কালের গর্ভে কিংবা অপেক্ষা করতে হতে পারে দীর্ঘ সময়। শম্ভু মিত্র নির্দেশিত রক্তকরবী তার একটি বড় উদাহরণ।

আমাদের সমকালে সেলিম আল দীনের নাটক শুধু সেলিম আল দীনের নাটক নয়। সেলিম আল দীন আর নাসির উদ্দীন ইউসুফের যুগলবন্দী, পটভূমিতে ঢাকা থিয়েটার। এখন থেকে ঢের ঢের বছর পরে সেলিম আল দীনের নাট্যযাত্রাকে খুঁজে পেতে হলে দরকার নির্মোহ অনুসন্ধান, যা সত্যিই একটি দুরূহ কাজ। সেখানে একমাত্র অবলম্বন মুদ্রিত অক্ষরগুলোর সম্মিলিত প্রয়াস।

সেলিম আল দীনের সাথে প্রথম পরিচয় জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন দিয়ে। সদ্য মফস্বল থেকে এসেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। এক সহপাঠীর আমন্ত্রণে নাটক দেখতে যাওয়া। প্রথম দর্শনেই বিহ্বল। নাটক এরকম হয়! নাটক সম্পর্কে অভিজ্ঞতার সাথে প্রচণ্ড অভিঘাত। তারপর থেকে তাঁর প্রতিটি নাটকেরই নিয়মিত দর্শক। একজন দর্শক হিসেবে তাঁর নাটক দর্শনের একটা বড় অংশ জুড়েই অবস্থান করছেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। তাঁকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র সেলিম আল দীনের নাটক নিয়ে লেখা একটি প্রায় অসম্ভব কাজ।

জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন নামকরণেই চমক। শহরে জণ্ডিস আর টাউন হলে বেলুন উৎসব। মৃত্যু ক্ষুধা যুদ্ধ আর নৈরাজ্য নাটকের পটভূমি। ক্ষুব্ধ সেলিম আল দীন, বুড়ো সান্তিয়াগোর মতো স্বপ্ন দেখেন মহৎ জীবনের- ‘যখন অতিকায় মাছের জন্য প্রাণপণ সংগ্রাম করেও হাঙরের ছোবল থেকে তাকে বাঁচাতে পারলো না, তখনো সে স্বপ্ন দেখে আফ্রিকার উপকূলে- জ্বলজ্বলে চোখের সোনালী সিংহ। পাঞ্জার পাঁচটি আঙ্গুল।’ এরকম বাক্য উচ্চারণের পরই যখন শুনতে পাই- ‘বীর নই তবু যুদ্ধে যুদ্ধে বিপ্লবে বিপ্লবে বিনষ্টির চক্রবৃদ্ধি দেখে মনুষ্য ধর্মের স্তরে নিরুত্তর।’ কী অদ্ভুত বৈপরিত্য। একদিকে হেমিংওয়ে আরেকদিকে টিএস এলিয়ট। পাশ্চাত্য অভিঘাতে ক্ষত-বিক্ষত সেলিম আল দীন। নাটকটির শেষ হয় এক চরম নৈরাজ্যের ভিতর দিয়ে-

প্রথম যুবক
আমরা একজন মানুষকে ধরে আনলাম। কেন আনলাম? কারণ মানুষকে কখনো সূর্যের দিকে টেনে নেওয়া যায় না। সুতরাং কৌতুক কললাম আমরা- আমরা কি নিজের সঙ্গে। হাহ আমরা কৌতুক করলাম। আচ্ছা আবার যদি তুমুল সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি?

দ্বিতীয় যুবক
আবার।

তৃতীয় যুবক
বলিভিয়া থেকে এই শহর আবার।

প্রথম যুবক
আমি কি দেখছি?

দ্বিতীয় যুবক
না না দেখতে চাই না।

তৃতীয় যুবক
এসব কী?

প্রথম যুবক
বেলুন। ফাঁসার, ফাঁসিয়ে দেবো।

দ্বিতীয় যুবক
হোক অনন্ত। তবু তবু।

সমবেত
না।

একধরনের অস্পষ্টতা অর্থহীনতা আর সংশয়ের ভিতর দিয়ে শেষ হয় নাটক। সেলিম আল দীনের সূচনা পর্বের নাটকগুলো- এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা, সর্প বিষয়ক গল্প, জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন, করিম বাওয়ালীর শত্রু অথবা মূল মুখ দেখা, সংবাদ কার্টুন, মুনতাসীর ফ্যান্টাসী (পরবর্তী সময়ে ফ্যান্টাসী শব্দটি বাদ দেয়া হয়), চরকাঁকড়ার ডক্যুমেন্টারী, আতর আলীদের নীলাভ পাট-এ দেখি বক্তব্যের অস্পষ্টতা, উদ্দেশ্যহীনতা- সমকালের বিরূপ পরিবেশে ক্ষুব্ধ নাট্যকার। তাঁর এসময়ের নাটকগুলোতে আছে প্রচণ্ড ক্ষোভ। কিন্তু কার বিরুদ্ধে তা স্পষ্ট নয়। তাঁর এ-নাটকগুলোতে রাজনীতি আছে কিন্তু নেই কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ভাবনা। নিজের কাছে নিজেই স্পষ্ট নন। এসময়ে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ নাটক করিম বাওয়ালীর শত্রু অথবা মূল মুখ দেখা। নাটকের প্রচারপত্রে সেলিম আল দীনের ভাষ্য ছিল এরকম- ‘জীবনব্যাপী সংগ্রাম শেষে শত্রু জীবনকে তাড়িয়ে মানুষ কি পায়?’ বলা যেতে পারে শিল্পের ক্ষেত্রে এটি তাঁর অনুসন্ধান পর্ব- শিল্পের এই জগতে তিনি বিদ্রোহীও নন, সন্নাসীও নন।

অনুসন্ধান পর্বের এই নাটকগুলো প্রচলিত প্রসেনিয়ামকেন্দ্রীকই শুধু নয়, মঞ্চ নির্দেশনার ক্ষেত্রেও তিনি অনেক বেশি রক্ষণশীল- ‘শহরের একটি রাস্তা। একজন লোক প্রবেশ করে। তার হাতে টকটকে লাল একটা বেলুন। সেটা হাতের তালুতে ঘষে শব্দ উঠাচ্ছে। জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন কিংবা

ক.    মুখোশধারী একদল বাদ্যযন্ত্রী নাটকের শুরু থেকে শেষ অবধি মঞ্চে অবস্থান করবে। তারা বিভিন্ন সময়ে নাটকের মূল ভাবদ্যোতক একটি সুর বাজাবে।
খ.    চরিত্রসমূহের সাংগীতিক সংলাপগুলো অবশ্যই প্রত্যক্ষ উচ্চারণের মাধ্যমে নিষ্পন্ন হবে। সকল সুরের লোকজ ভিত্তি থাকা চাই। উইংস সমেত সমগ্র মঞ্চ বর্ণালী কার্টুনে সজ্জিত হবে। কার্টুনগুলো হচ্ছে নাট্যবস্তুর চিত্ররূপ।
গ.    বাদ্যযন্ত্রীবৃন্দ বেশ উঁচুগ্রামে সুর তোলে। কিছুক্ষণ পর পর্যাক্রমে সম্মিলিত ঐকতান মিলিয়ে যেতেই মৃদঙ্গ বেজে উঠে। সেই তালে নৃত্যপর তিনজন প্ল্যাকার্ডধারী সঙ এই কথাগুলো বহন করে নিয়ে যায়।
        ১. তুমুল শ্রমিক আন্দোলনের মুখে
           পাঁচদিন উন্নিদ্র থেকে
        ২. ক্লান্ত শিল্পপতি জনাব মুনতাসীর
           খুব ভোরে চিৎকার করে বললেন
        ৩. ইতিহাস ও হাঙরের
           দাঁতের শপথ
           আমি আজ সবকিছু খাব।- মুনতাসীর

অনুসন্ধান পর্বের পর এক ক্রান্তিকাল। সেলিম আল দীন পাল্টাচ্ছেন। সমকাল থেকে ফিরে গেছেন প্রাক-পৌরাণিক কালে। শকুন্তলা বিষয় ও প্রকরণে নতুন না হলেও নতুন করে বলার একটা প্রয়াস লক্ষণীয়। পাশ্চাত্যের অঙ্ক দৃশ্য বিভাজনের পরিবর্তে আনলেন খণ্ড বিভাগ, স্বর্গীয় ষড়যন্ত্র, শকুন্তলা খণ্ড ইত্যাদি। নাটকের শরীর নির্মাণেও একটা অস্পষ্ট ছবি ধরা পড়তে শুরু করেছে সেই সময়ে। শুরুর দিকে কাটা কাটা সংলাপের পাশে এসে যুক্ত হচ্ছে দীর্ঘ ও আলঙ্কারিক বাক্যসমৃদ্ধ সংলাপ-‘অর্ক    কার ভয়ে ঘামছে স্বর্গ? ভীতি কম্পনে খসে যাচ্ছে ঘৃতাচী ও ঊর্বশীর কনক নুপুর। দেবরাজ ইন্দ্র দ্রুত নামো। তোমার সোনালী রথে অভিনয় পটু নটীদের নিয়ে এসো। কামবৃক্ষের রসালো শিকড় চাই। তুমিতো জানো বিশ্বামিত্রের চোখে আমি সেদিন সংগোপনে ধূপকণা নিক্ষেপ করেছি। আজ তার স্বর্গীয় চিকিৎসা হবে। ... হা হা। আ-হ শুনতে পাচ্ছি হরিৎ-অশ্বের ক্ষুরধ্বনি, চাকার আবর্তন। ওইতো দেখছি রথ ছুটে আসছে- বিম্বিত সূর্যকিরণে উড়ন্ত দর্পণ। মাতলির মণি চাবুকের ক্ষীপ্র সঞ্চালনে অকাল বিদ্যুৎ সূচিত হয়েছে। আমাদের স্বর্গবাস অক্ষয় হোক, নষ্ট হোক বিশ্বামিত্র।’

শকুন্তলা থেকে সেলিম আল দীনের একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করি যা পরবর্তীকালে একটা নতুন মাত্রা লাভ করে। সেলিম আল দীনের নাট্যযাত্রায় শকুন্তলা একটি গভীর বাঁক। যে বাঁকের পর সেলিম আল দীন অনেক বেশি প্রকাশিত।

শকুন্তলা পরবর্তী কিত্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল, হাত হদাই বিষয়বস্তুর দিক থেকে না হলেও গঠনশৈলীর দিক থেকে এক গোত্রের। এই নাটক তিনটিকে নাট্যকার ট্রিলজি বা নাট্যত্রয়ী হিসেবেও অবিহিত করেছেন। কিত্তনখোলা-য় এসে প্রথমেই পাই ‘প্রস্তাবনা’ শীর্ষক আসর বন্দনা। পাশ্চাত্যের প্রসেনিয়ামের মাঝেই প্রাচ্যের খোলা উঠানের পালা গান। মাঝে মাঝে গল্প বলার ধরনটি থাকলেও তা আসলে প্রসেনিয়ামেই আবদ্ধ থাকে। তবে যে বিষয়টি এখানে লক্ষণীয় তা হলো পালাগানের কিস্সা কাহিনীর গল্পের মতো নানা বিষয়ের অবতারণা। মূল চরিত্রের হাত ধরে নানা কাহিনী ও উপকাহিনীর পল্লবিত হয়ে ওঠা।

কিত্তনখোলা থেকে কেরামতমঙ্গল হয়ে হাত হদাই পর্যন্ত তাঁর তিনটি নাটকের কাহিনীই গড়ে উঠেছে বহুবিচিত্র খণ্ড খণ্ড দৃশ্যের বন্ধনে। কোনো আদ্যন্ত কাহিনী নেই, বরং খণ্ড খণ্ড ঘটনার বিন্যাসই এ নাট্যত্রয়ীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রথাগত নাটকের সুতীব্র ঘটনাবৃত্তের পরিবর্তে খণ্ড খণ্ড ঘটনার বিন্যাসে নাটকীয় দ্বন্দ্বটি পল্লবিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো নাটকে। দানা বেঁধে তুঙ্গস্পর্শী হয় না।

পাশ্চাত্যের শিল্পতাড়না থেকে শুরু সেলিম আল দীনের যাত্রা। শকুন্তলা পরবর্তী কিত্তনখোলা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর পথের রেখা। উপনিবেশিক উত্তরাধিকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ফিরে গেলেন বাংলার মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্যের এক গীতল ও ঘটনাবহুল উপাখ্যানের জগতে। কিত্তনখোলা-তেই তার লক্ষণ সুস্পষ্ট। দ্বিতীয় সর্গের শুরুতেই বদলে যাচ্ছে তাঁর ভাষা-

সূর্য ডুবু ডুবু হতেই লউজং-এর পূর্বে চাষীবউ-এর হলুদ ছোপানো হাতের মতো চাঁদ ওঠে। ত্রয়োদশীর চাঁদ। দূরের গ্রামগুলোর বণজ পরিবেশে কুয়াশা ও অন্ধকার ক্রমশ জমতে থাকে। আর এপাশে লউজং-এর পশ্চিমে মেলা জমে ওঠে পুরোদমে। দূর থেকে মাজারের উঁচু সামিয়ানাটি দেখা যাচ্ছে। উত্তরে একটি প্রাচীণ বটগাছ। দক্ষিণে বাঁশবন ও সুন্দিবেতের ঝোঁপ।’

মনে হয় যেন কোনো গল্প বা উপন্যাসের কথা।

সেলিম আল দীন অগ্রসর সময়ের নাট্যকার। ইচ্ছে করলেই ফিরে যেতে পারেন না মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের জগতে। সমকালের ভাবনার ঘাত-প্রতিঘাতের আলোড়িত হবেই তাঁর মনন ও মেধা। অস্বীকার করতে পারবেন না তার প্রভাব। তাই তাঁর বর্ণনা উপাখ্যানের জগত থেকে ঢুকে পড়েছে আধুনিক গল্প উপন্যাসের জগতে। কেরামতমঙ্গল, হাত হদাই পেরিয়ে তা আরো বেশি সুসংহত হয়ে উঠেছে তাঁর পরবর্তীকালের রচনা চাকা, যৈবতী কন্যার মন ও হরগজ-এ। মাঝখানে ব্যতিক্রম বনপাংশুল। চাকা ও যৈবতী কন্যার মন মঞ্চে এলেও হরগজ অদ্যাবধি মঞ্চায়িত হয় নি।

এসময়ে সেলিম আল দীন তাঁর রচনার ভেতরে ভাঙচুর ঘটিয়ে এমন একটি প্রকরণের দিকে ধাবমান যাকে ঠিক পরিপূর্ণ অর্থে নাটক বলা কঠিন। এ পর্বে তাঁর রচনাগুলো হয়ে উঠেছে অনেক বেশি চিত্ররূপময়। কমে আসছে নাট্যক্রিয়া, তার পরিবর্তে পল্লবিত হচ্ছে কাহিনীর বিস্তার, যেখানে নাটকের চাইতে উপন্যাসের ছায়া বেশি।

‘একদিন বৈশাখের কোনো এক সকালে কাকেশ্বরী নামের গাঙের পাড়ে একটি গঞ্জ এলংজানি পূর্বদিকের সম্মুখে অবস্থান হেতু সূর্যালোকে স্থানে স্থানে ঝলমল করে। কোথায় কোথায় ঝলমল করে? তবে শোন ধান তিল সরিষা ও গুড়ের আড়তের চালে যেখানে যেখানে ঢেউটিনের নতুন বান* সূর্যের প্রতিফলনও এক ধরনের আলোকিত ফলন মান কিনা? আর কোথায়? হাটবারে সারে সারে চালাঘর এখন শূন্য বটে ভাঙা চালে প্লাস্টিকের ছাউনিতে। আর কোনোকিছু? না তেমন কিছু নয় কেবল ওই কাকেশ্বরীর ভাঙা তটে বটগাছটি ত্রিভঙ্গ দিয়ে মাথায় ঝরঝরে ফিকে শ্যামল আয়না পাতা। গাঙের পাড়ে পাড়ে কদ্দুর গেলে চিতাস্থল ছোট ছোট দুটি চুন-সুড়কীর তৈরি স্মৃতি মন্দির* একটির তিরশূল নেই অন্যটির বাঁকা একটির শ্লেট পাথরে খোদাই নাম ওঁ হরে কৃষ্ণ জন্ম মৃত্যুর বাংলা সন।-চাকা দ্বিতীয় তরঙ্গ।

এত বিস্তারিত আর অনুপুঙ্খ বর্ণনা অভিনেয় নয়, চিত্রময়, নাটকের সংলাপ কিংবা কথকের গল্প বলাও নয়, এ যেন উপন্যাসিকের বর্ণনা। কিত্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল বা হাত হদাই-তে গল্প বলা বা হাস্তর কথনের যে প্রকরণটি ছিল চাকা-তে এসে তা বদলে গেছে। কাহিনীও বিস্তৃত হয়েছে গল্প উপন্যাসের মতো। এসেছে নানা স্থান, নানা চরিত্র আর ঘটনা। অবশ্য এর সূচনা আমরা কিত্তনখোলা-তেই দেখতে পেয়েছি।

চাকা-র ধারাবাহিকতায় যৈবতী কন্যার মন ও হরগজ-এও আছে এরকম বহু চিত্ররূপময় বাক্যবন্ধ।
 
‘গায়েন শ্রীকরের পানসী লাগে চরচন্দ্রানীর ঘাটে। তখন বৃষ্টি-বাতাসের মাখামাখি মধ্যরাতের গাঙ। আকাশে আকাশ নেই- কালীদহে নাগী ও নাগের ঝটিকা নিঃশ্বাস। ঝোড়ো গাঙে বড়ো পানসী ক্রুদ্ধ ঢেউয়ের শীর্ষে শীর্ষে লাফায়। রজনী অন্ধকারে দোকান পাটের কাছাকাছি কোথাও সবল হাতে নোঙর ছুঁড়ে দেয়- হুশ্। শঙ্কর ও সাধন তক্তা ফেলে কূলে। একজন ডানহাতে উঁচু করে ধরে ফানস।’- যৈবতী কন্যার মন।

কিংবা ‘কোকিলকণ্ঠী ঘড়িতে শিষ দিয়ে উঠে সময়। আবিদ চোখের পক্ষ প্রায় এক করে ফেলেছিল নিদ্রাকল্প অবসন্নতায়। তাতে তার টেবিলের ঊর্ধ্বে নানান চিত্রোপম রেখা তৈরি হচ্ছিল। চিত্রোপম রেখার অসুবিধা এই যে সে রেখাগুলো আপনাতে আপনি সম্পূর্ণ হতে গিয়ে নিরাকৃতির দিকে চলে যায়। সে চিত্র কৌতুহলোদ্দীপক কিন্তু অসমাপ্ত। সম্পূর্ণতার দিকে রেখার অর্ধসমাপ্ত যাত্রা নির্বৃত সৃজন নয় তা কখনও কখনও স্বপ্ন ও দৃশ্যের বিপরীতে দাঁড়ায়- হয়ে উঠে কুহককল্প। কিংবা তা রেখায় রেখায় স্রোতের ব্যাদানকৃত মুখের নিঃশব্দ অথচ বিকট চীৎকারের দিকে চলে যায়। সুতরাং সে ভয় পেয়ে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকায়। রেখাগুলো হঠাৎ মিলায়।’- হরগজ।

এসব বাক্যবন্ধ যতটা গল্প উপন্যাসের কাছাকাছি ততটাই নাটক থেকে দূরে। এরকম বর্ণনার দৃশ্যায়ণ একটি কষ্টকর ও দুরূহ কাজ। সেলিম আল দীন একে কথানাট্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। গ্রন্থের শেষে কথাপুচ্ছ শীর্ষক অধ্যায়ে তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা উদ্ধৃতও করেছেন।
চাকা-র কথাপুচ্ছে তিনি বলেছেন- ‘বলতে বলতে নাটক, সেজন্যই কথানাট্য।’- সেলিম আল দীনের নাটকে কথাই মুখ্য, ক্রিয়া গৌণ।

সেলিম আল দীনের পরবর্তী নাটক প্রাচ্য কিংবা নিমজ্জন-ও প্রকরণগত দিক থেকে সমগোত্রীয়। সেলিম আল দীনের শেষ দিকের লেখা ঊষা উৎসব ও স্বপ্নরমণীগণ ছাড়া স্বর্ণবোয়াল, ধাবমান ও পুত্র একই ধারার ক্রমপরিণতি হলেও ঊষা উৎসব ও স্বপ্নরমণীগণ ব্যতিক্রম। একে তিনি নাট্যনৃত্যগীতি নামেই আখ্যায়িত করেছেন। স্বর্ণবোয়াল-কে তিনি বর্ণনাত্মক ধারার নাটক বলে অভিহিত করে আবার একে কাব্য বলেও উল্লেখ করেছেন। স্বর্ণবোয়াল, ধাবমান ও পুত্র এখনো মঞ্চে আসে নি। এ গ্রন্থ তিনটি পাঠে যে অনুভূতি জাগে তাতে মনে হয় এগুলো মঞ্চায়নের জন্য নয়। এগুলোর মঞ্চায়ন গ্রন্থ তিনটিকে বরং খণ্ডিত করেই উপস্থাপন করবে। এ রচনাগুলো তাঁর কথানাট্য পরিক্রমার একটি ভিন্নতর মাত্রা সংযোজন করেছে।

বিষয় ও ভাবনার দিক থেকে এগুলো বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। মাছ এবং মহিষ যে একটি বিপুল কথাবস্তু হতে পারে স্বর্ণবোয়াল এবং ধাবমান তারই উদাহরণ। তাঁর এসময়ের রচনায় গল্প বলার ধরনটি অনেক বেশি পরিণত। নাটকীয়তার পরিবর্তে গল্প বলাটাই অনেক স্পষ্ট। বলাবাহুল্য তাঁর পূর্বের রচনাগুলোর মতোই এগুলোও অনেক বেশি মিথ আক্রান্ত। সেলিম আল দীনের রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য মিথ নির্ভরতা। এই মিথের প্রয়োগে প্রাচ্য পাশ্চাত্য সর্বত্রই হানা দিয়েছেন বারবার। এমনকি আমাদের কাছে অপরিচিত আদিবাসী মান্দী, গারোদের মিথও উঠে এসেছে তাঁর কথায়। তাঁর মিথের প্রতি আসক্তি, সবসময় যে রচনাকে গতি দিয়েছে তা কিন্তু নয়। অনেক সময় তা জটিলও করে দিয়েছে, মনে হয়েছে আরোপিত। রামায়ণ, মহাভারত, মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য, পারস্যের গল্প গাথা, পাশ্চাত্যের ওভিদ নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছেন মিথ। কখনো মিথকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে গল্প, কখনো চরিত্রায়ণের জন্য প্রযুক্ত হয়েছে মিথ। কখনো সরাসরি কখনো-বা প্রচ্ছন্নভাবে এসেছে মিথ। কখনো আবার মিথকে উপস্থাপন করেছেন নতুন করে। পুরনো গল্প নতুন করে বলার চেষ্টা করেছেন। মিথ মানেই প্রতীক ও প্রতীকী ভাষার প্রয়োগ। ‘প্রতীক হলো যা অন্য কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে’ এই সরল সিদ্ধান্ত থেকে যদি আমরা এগিয়ে যাই তাহলে দেখতে পাবো সেলিম আল দীনের মিথের বহুল প্রয়োগ তাঁর কথাবস্তুকে অভিনীত হতে অনেক বেশি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। কথানাট্যই হোক বা পাশ্চাত্যের প্রচলিত নাটকই হোক তার ক্রিয়াগুলোকে অভিনয়যোগ্য (playable action) হতে হয়। কিন্তু সেলিম আল দীনের মিথের অতিব্যবহার তাঁকে বরং নিয়ে গেছে এক রহস্যময় ও অতিলৌকিক জগতে। প্রতীকী ভাষা মূল ভাব বা ভাবনার বাইরে একটি রহস্যময় আবরণের সৃষ্টি করে যা দৃশ্যগ্রাহ্য করা একটি দুরূহ কাজ। আমার ধারণা সম্ভবত একারণেই নাসির উদ্দীন ইউসুফ ছাড়া অন্য কারো হাতে তাঁর নাটক নির্দেশিত হতে দেখি না। অবশ্য আমার এ লেখা মঞ্চের সেলিম আল দীনকে নিয়ে নয়, তাঁর মুদ্রিত কথাগুলোকে নিয়ে।

পৌরাণিকতার বাতাবরণে মিথের ভিতর দিয়ে জীবন জগৎ মানুষের সংগ্রাম, হতাশা, সাফল্য, ব্যর্থতা, স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা আর স্মৃতি এসবের ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা সেলিম আল দীনের প্রতিটি নাটকেই খুব স্পষ্ট। সে ব্যাখ্যা প্রায়শই এক অস্পষ্ট ধোঁয়াশা কিংবা অলৌকিক রহস্যময়তা। তাঁর চরিত্রগুলো জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও শেষ পর্যন্ত নিজেদের গুটিয়ে নেয় অলৌকিক বাস্তবতায়। সেলিম আল দীন তাঁর প্রায় প্রতিটি নাটকেই ভূমিকা বা কথাপুচ্ছে নাটক সম্পর্কে তাঁর ভাবনার কথা বলে গেছেন। যৈবতী কন্যার মন নাটকের কথা পুচ্ছে বলেছেন- ‘আমার লেখা নাটকে বিশেষত কিত্তনখোলা থেকে হরগজ পর্যন্ত আমি সজ্ঞানে বাংলা নাটকের চিরাচরিত রুগ্নবাস্তবতার রীতি পরিহার করতে চেয়েছি। জীবন জগত ও মানবিক বোধের যে সকল নতুন স্পর্শে বাংলা গান, কবিতা, উপন্যাস দুইশত বর্ষে ব্যাপ্ত ও বিস্তার লাভ করেছে, তার তুলনায় ক্লিশে সমাজচিন্তনের অতিগুরুভার বহন করতে গিয়ে বাংলা নাটক বহুক্ষেত্রে শিল্পপথ বিচ্যুত হয়েছে।’ তাঁর এ বক্তব্যে একটি কথা স্পষ্ট যে তিনি বাস্তবের মুখোমুখি হতে চান না। কেন চান না? তা অবশ্যই গুরুত্ববহ। তাঁর উত্তরে বলেছেন ক্লিশে সমাজচিন্তনের কথা। সমাজচিন্তন ক্লিশে হয়ে যাওয়ার দায়িত্বটা কিন্তু তিনিও এড়াতে পারেন না। বিশেষ করে এই কালখণ্ডে যখন শুরু হয়েছে মনোজগতে উপনিবেশ স্থাপনের নতুন কর্মযজ্ঞ। তিনি আশ্রয় খোঁজেন এপিকে, মহাকাব্যে, ফিরে যেতে চান পেছনে। যে পেছনে যাওয়া সামনের দিকে নিয়ে যায় না আমাদের। আমরা আবর্তিত হই একই বৃত্তে। শিল্প-সৃষ্টি শুধু লেখকের মানসজাত বস্তু নয়, তা সময়েরও সন্তান। মহাকাব্য লিখে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকা বা সাহিত্যের অভিজাত ক্লাবে ঢুকে যাওয়ার স্বপ্ন লেখকের থাকতেই পারে। কিন্তু একথা সত্য যে একালে আর এপিক সৃষ্টি হবে না। সময় তা দেবে না। কারণ শিল্প একটি সামাজিক উপাদানও বটে।

‘আমার মনে হয়েছে বৌদ্ধ জাতকের গল্প, ওভিদের মেটামরফসিস পাপ ও কর্মফলের শ্রাঘ্য শিল্প-লেখা, কোরাণ, ডিভাইন কমেডিয়া ও মহাভারতের নরক কল্পনা একালের সাথে মেলানো যায়।’ সেই সাথে তিনি একথাও বলেছেন- ‘এও মনে হয়েছে বাস্তবতা আমার লক্ষ্য নয়, এমনকি বর্তমানও অবলম্বন মাত্র।’  বর্তমান ও বাস্তবতা থেকেই শিল্পের সৃষ্টি। কারণ বস্তু থেকেই ভাবনার উদ্ভব। আর তাই বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া কিংবা তাকে কোনো অতিলৌকিক প্রাক-পৌরাণিক মোড়কে আবৃত করে রহস্যময় করে তোলা আসলে এক ধরনের পলায়ন। এখানেই সেলিম আল দীনের মহত্ব ও সীমাবদ্ধতা।

হরগজ নাটকের কথাপুচ্ছে সেলিম আল দীন যখন বলছেন-
‘মনে হল- যে আকৃতির জগৎ থেকে এখানে এলাম তাকে তো আমি চিনি না। যদি-বা চিনি মানতে তো পারি না। বৃক্ষমানব প্রাণীকূল খেচর ও ভূমিচারী- নানান স্তরে জন্মে বাড়ে। তারপর ক্রুদ্ধ এক হাওয়া এসে তাকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়।’

এ নাটকে অবরুদ্ধ জগত থেকে আবিদ যেখানে এসে দাঁড়ায় তা ভাঙনের নিখিল নদীর স্রোতের কূল ইছামতি। এ কিন্তু রূপ থেকে অরূপের জগতে আসা নয়। এ হচ্ছে আকৃতির জগত থেকে নিরাকৃত বিশ্বে অভিপ্রয়াণ।’

সেলিম আল দীনের সমগ্র সৃষ্টির পেছনে শেষ বাক্য দুটির প্রভাব সীমাহীন। রূপ থেকে অরূপে কিংবা আকৃতির জগত থেকে নিরাকৃত জগতে অভিপ্রয়াণ তার ভাব ও ভাবনাকে নিয়ে গেছে এক রহস্যময় ঘূর্ণাবর্তে। একথা সত্য যে সেলিম আল দীন তাঁর সৃষ্টির নানা পর্বে বহুবিধ নীরিক্ষার ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেলেও ঘুরে বেরিয়েছেন একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের ভেতরেই। বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসেন নি। তাঁর যা কিছু ভাঙচুর, নিজেকে অতিক্রম করে যাওয়া সবই তাঁর শিল্প প্রকরণে। ভাবনার জগতে ঘুরপাক খেয়েছেন সেই একই পথে- ‘জীবনব্যাপী সংগ্রাম শেষে শত্র“জীবনকে তাড়িয়ে মানুষ কী পায়?’ এ-প্রশ্ন নিয়েই শেষ হয়েছে তাঁর যাত্রা। তাঁর এ প্রশ্নে ক্ষোভ আছে, বেদনাও আছে কিন্তু বিদ্রোহ নেই। সেলিম আল দীনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষে পথের শেষে যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি তিনি বিদ্রোহীও নন, সন্নাসীও নন। তিনি যেন এক নক্ষত্র নিয়ন্ত্রিত পর্যটক। তাঁর মুখে প্রার্থনা- মঙ্গল হোক সামাজিকগণের।

ভাবনা ছিল সেলিম আল দীনের নাট্যযাত্রার পথ পরিক্রমা করবো। দেখবো পথের নানা বাঁক, চড়াই-উৎড়াই। স্বীকার করে নিচ্ছি পায়ে দলে হেঁটে যে পরিভ্রমণ তা হলো না। যা দেখেছি তা পাখির চোখে দেখা। অনেক উপর থেকে।

আব্দুল্লাহেল মাহমুদ: নাট্যকার, সদস্য- আরণ্যক নাট্যদল