Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

দেশজ নাটক : প্রয়োগ ও অপ্রয়োগ

Written by মাসুম রেজা.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

আজকের এই সেমিনারের আলোচ্য বিষয় হলো, আমাদের নাটকে দেশজ আঙ্গিকের প্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগ। এক্ষেত্রে প্রথমেই যে প্রশ্নটি আসে, তা হলো, আমাদের নাটক কোনগুলো? আমাদের লোকজ ও ধ্রুপদী নাটকের যে ধারা সেগুলো, নাকি বর্তমান বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটারগুলো যে নাটকের চর্চা করছে সেগুলো? মূলত লোকজ নাটকের প্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগের বিষয়টি আমাদেরকে অনেক অপ্রিয় প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। আজকের সেমিনারে প্রবন্ধের এই বিষয়-নির্বাচনই প্রমাণ করে যে, আমাদের আধুনিক নাট্যচর্চা মূলত আমাদানীকৃত, পরজীবী নাট্যচর্চা। যদি এ সত্য স্বীকার করি তবেই তাতে লোকজ নাটকের প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগের বিষয়টি আলোচানার জন্য আসতে পারে।

ইতিহাসের গ্রন্থিসূত্রগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, প্রত্যেকটি দেশে প্রতিটি ভাষায়, প্রতিটি জনগোষ্ঠীতে নাট্যচর্চা গড়ে ওঠে মূলত সেই ভূখণ্ডের মানুষ, সমাজ, সময়, সম্পর্ক, ইতিহাস, ঐতিহ্য, জনরুচি, আচার-আচরণ, ধর্ম ও লৌকিক বিশ্বাস ইত্যাদি থেকে। সে নাট্যধারা মূলত লোকজ তথা দেশজ নাটকের চর্চা। বিশ্ব নাটকের উদ্ভবের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাচীন মিশরে পৃথিবীর প্রথম নাট্য সৃষ্টি হয়েছিল কৃষিদেবতা অরিসিস-এর জীবন গাথা উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে। আঠারদিনব্যাপী অরিসিস প্যাশন প্লে’র বিশাল উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তাদের ধর্ম, বিশ্বাস, জীবন-জীবিকার এক বিস্তৃত অধ্যায় দৃশ্যমান হয়ে উঠতো। গ্রিক ট্র্যাজেডিও গড়ে উঠেছিল আঙ্গুর ও শস্যের দেবতা দিওনিসাস-এর উদ্দেশে নিবেদিত স্তোত্র গাথা ডিথিরাম-এর উত্তোরত্তর নতুন মার্গ সাধনের মধ্য দিয়ে। মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে যে লিট্যারজিক্যাল প্লে’র উল্লেখ পাওয়া যায় তা-ও গীর্জাকেন্দ্রিক। এভাবেই সকল দেশে সব ভাষায় নাটক গড়ে উঠেছে ধর্ম, জীবন-জীবিকা ও কৃত্যের ধারায়। একইভাবে আধুনিক নাটকও দেশজ বা লোকজ নাটকের পরিপোষণ, আধুনিকায়ন এবং সময়ের দাবি মিটিয়ে ক্রম পরিবর্তন সাধনের মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়ে থাকে। আমাদের ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হবার কথা ছিল না। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের আধুনিক নাটকের যে ধারা তা আমাদের দেশজ নাটকের আধুনিকায়নের মাধ্যমে গড়ে ওঠেনি। এক ‘কাল্পনিক সংবদল’ (The Disguise) এর দুশ’ বছরের পরিশোষণ এবং তারই চর্চার অনিবার্য ফলাফল হিসেবেই এসেছে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক নাট্যচর্চা। আমাদের হাজার বছরের নাট্য-ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে গড়ে উঠল না এদেশের আধুনিক নাট্যচর্চা- গড়ে উঠল লিয়েবেদেভ-এর এক ক্ষুদ্র নাট্যপ্রচেষ্টাকে ভিত্তি করে। এ আমাদের আত্মশ্লাঘা নাকি আত্মপ্রবঞ্চনার কথা, তা ভেবে দেখবার কাল সমাসন্ন।

আমাদের রয়েছে লোকনাট্যের এক বিশাল অফুরন্ত ভাণ্ডার। পালা, পাট, যাত্রা, হাস্তর, কথকতা, কবিগান, কবির লড়াই, ঘাঁটি, পাঁচালি, কৃষ্ণলীলা, জারী, ভাসান, আলকাপ, ঢপ, গম্ভীরা, লাঠিখেলা, পুতুল নাচ-এর মতো অনেক লোকজ নাটকের আঙ্গিক আমাদের রয়েছে। অসীম তাদের বৈচিত্র্য, আঙ্গিক। পরিবেশনারীতিতে তারা পরস্পর ভিন্ন হলেও মূলে সেগুলো এক এবং অভিন্ন, কেননা সবগুলো আঙ্গিকের সাধারণকৃত বৈশিষ্ট্য নন্দনতাত্তি¡ক তথা দার্শনিক অভিপ্রায়সমূহ এক ও অভিন্ন। আমাদের লোকনাট্যের এই অমিত শিল্পসম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে আধুনিক নাটকের যে চর্চা তা আমাদের দেশীয় নয়, সে নাট্যরুচি আমাদের গণমানুষের নয়। সে নাট্যধারা বিদেশি আদলের, পরজীবী এবং আমদানীকৃত। ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনামলে তারা আামদের মগজে ঢুকিয়েছে ইংরেজিপনা। পড়িয়েছে শেক্সপীয়র, মার্লো, বায়রন, কিটস শেলী। অস্থি-মজ্জায় শিরায় শিরায় ছড়িয়েছে ইউরোপীয় প্রবাহ। নাট্যরচনারীতি হিসেবে এসেছে পাশ্চাত্যের ‘অঙ্কগর্ভাঙ্করীতি’। মঞ্চ হিসেবে ধরিয়ে দিয়ে গেছে আস্ত একটা ম্যাচবাক্স- ‘প্রসেনিয়াম স্টেজ’। এক ঘনঘোর প্রদোষকালে আমাদের শিল্পবোধ, শিল্পরুচি, আচার-ব্যবহার, পোশাক-আশাক, আমোদ আহ্লাদের ধরন, সর্বোপরি নন্দনতত্বের সমস্ত সংজ্ঞাসূত্র পাল্টে গেল ইংরেজি ধাঁচে। আমাদের ভাষারীতি পর্যন্ত পাল্টে গেল উইলিয়াম কেরির ইরেজি আদলের বাংলা ব্যাকরণের আদর্শে। সর্বপ্লবি পাশ্চাত্যপনার এই কালে ‘দেশজ নাটক : প্রয়োগ এবং অপপ্রোয়োগ’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য বলেই প্রতিভাত হয়। শেক্সপীয়র, মার্লোর মতো বিশ্বপ্রতিভার বিপরীতে দাঁড়ানো প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। যারা বর্তমান বাংলাদেশে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের চর্চা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশও আমার অভিপ্রায় নয়। সর্বগ্রাসী পাশ্চাত্য প্রবণতার সবটুকু দায়ভার আর সবার মতো আমিও বয়ে চলেছি সমানভাবে। কেননা, যে নাটক আমি লিখি তা কেরি সাহেবের ব্যাকরণের আদর্শেই, যে নাট্যচর্চা আমি বা আমার দল করে থাকে তা-ও প্রসেনিয়ামেই বা হলের ভেতরেই আবদ্ধ। এ বিবেচনা শুধু আমার আত্মসামালোচনার উদ্দেশে, আত্ম-উপলব্ধির নিমিত্তে।

এবারে আমরা মূল বিষয়ে ফিরে আসি। আজকের প্রবন্ধের বিষয়, ‘দেশজ নাটক : প্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগ’। আমাদের দেশজ নাটকের রয়েছে দুটি পরস্পর বিপরীত ধারা। একটি লোকজ, অন্যটি ধ্রুপদী। লোকনাট্যের পাশাপাশি আমাদের ধ্রুপদী নাটকের ধারাও অতি প্রাচীন। ভরত নাট্যশাস্ত্র আমাদের এতদঞ্চলের ধ্রুপদী নাট্যশাস্ত্র যার সংজ্ঞাসূত্রানুযায়ী অভিনীত হতো ভাস, কালিদাস, বিশূদ্রক, বিশাখদত্ত প্রমুখের নাটক। এ তথ্য বিদগ্ধজন-মহল দ্বারা স্বীকৃত। আমাদের দেশে দরবারি নাটকের যে ধারা বিদ্যমান ছিল তা-ও ধ্রæপদী আঙ্গিকের। আরাকান রাজসভার মন্ত্রী মাগন ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজকবি আলাওল তাঁর ‘পদ্মাবতী’ মহাকাব্যে যা উপস্থাপনা করেছিলেন বলে জানা যায়, সেটাও ধ্রুপদী ধারার এবং একই সঙ্গে তা দেশজ। তবে আজকের সেমিনারে অন্তর্গত প্রেরণাদৃষ্টি আমার কাছে লোকজ নাটকের প্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগের বিষয়টি আলোচিত হবে।

লোকজ নাটকের প্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগের আলোচনায় থাকার পূর্বে একটু বুঝে নেয়া যাক, লোকজ নাটক কী? সাধারণ অর্থে লোকজ নাটক বলতে বোঝায়, প্রকৃতি সংশ্লিষ্ট মানুষের জনরুচি, ধর্ম ও কৃত্যের ধারায় উদ্ভুত নাটক। বিশ্ব নাটকের ইতিহাস অন্বেষণ করলে দেখা যায় যে, সমস্ত ভূখণ্ডেই নাটক গড়ে উঠেছে ধর্মীয় নানান কৃত্য থেকে। এই কৃত্যসমূহ প্রাচীন মানুষের জীবনাচরণের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। জীবনের প্রাত্যহিক নৈমিত্তিক ইচ্ছাপূরণের উদ্দেশ্যেই প্রাচীন মানুষেরা দেবদেবী কিংবা অতিলৌকিক শক্তির কাছে প্রার্থনা জানিয়েছে। সে প্রার্থনার শরীর ছিল গীতবাদ্য-নৃত্য-স্তোত্র সহযোগে নির্মিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মনসামঙ্গলের ধারায় যে লোকনাট্যের ধারা, তা সম্পূর্ণতই লৌকিক দেবী মনসার বন্দনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ‘বেহুলা-লক্ষিন্দরেরর পালা’-তা মূলত মনসার বন্দনা হিসেবেই উপস্থাপিত হয়ে থাকে। একইভাবে ‘রাধা-কৃষ্ণ’, ‘শিব-পার্বতী’সহ বহু লৌকিক ও অলৌকিক দেবদেবীর কাহিনির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য লোকনাট্যের আঙ্গিক।

এবারে যে বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে তা হলো আধুনিককালে লোকনাটক কেন? পূর্বেই বলেছি, লোকজ নাটককে কেন্দ্র করেই যদি আমাদের আধুনিক নাটক গড়ে উঠতো, তবে আর এ প্রশ্নের উদয় এভাবে হতো না। কিন্তু তা যেহেতু হয়নি, তাই আধুনিক নাটকে লোকজ নাটকের ব্যবহারের প্রসঙ্গ এসেছে। লোকনাট্য আঙ্গিকের যেকোনো ধরনের ব্যবহারই প্রয়োগ- তবে তা সত্যিকার অর্থে প্রয়োগ নাকি অপপ্রয়োগ তা নির্ধারিত হবে কোন মাপকাঠিতে? একটিই মাপকাঠি, তা হলো শিল্পের মাপকাঠি। যদি লোকজ কোনো আঙ্গিক বা উপাদানকে আধুনিক চিন্তাচেতনায় শানিত না করা যায়, যদি তাকে কালের দাবি মিটিয়ে নতুনভাবে ব্যাখ্যায় উপস্থিত না করা যায়, যদি তা কেবলমাত্র কাহিনির প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়- তবে তা অপপ্রয়োগ বলেই বিবেচিত হবে।

যে সমস্ত উদ্দেশ্যে আধুনিক নাটকে লোকজ আঙ্গিকের ব্যবহার হয়ে থাকে, সেগুলো খুঁজে দেখার চেষ্ট করা যেতে পারে। প্রথমত, বৈচিত্র্য সৃষ্টির উদ্দেশ। গতানুগতিক কাহিনি ও ঘটনা পরম্পরার মধ্যে যে একঘেঁয়েমি, তাকে দূর করে নাটককে প্রাণবন্ত করার উদ্দেশ্যে অনেকে নাটকে লোকজ উপাদান ব্যবহার করে থাকেন। যদি সে উপাদান কোনো শিল্প সম্ভাবনার স্বাক্ষর না রেখে শুধুমাত্রই বৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্য হয়, তবে তা প্রক্ষিপ্ত বলে মনে হবে। তখনই সেই ‘প্রয়োগ’ ‘অপপ্রয়োগ’রূপে পর্যবসিত হবে। হয়তো তার পক্ষে একটা যুক্তি স্থাপন করা যায় যে, কোনো নাটকে যদি লোকজ আঙ্গিকের প্রয়োগ ঘটানো যায়, তবে তা তো লোকনাট্যেরই এক ধরনের পরিপোষণ, এক রূপে তাকে বাঁচিয়ে রাখা বা টিকিয়ে রাখা। তবে সেই মহৎ উদ্দেশ্যকে কেন আমরা সমর্থন করব না। এর উত্তরে বলা যায়, কারো কৃপাদৃষ্টির উপর নির্ভর করে, কেবল নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার ভিক্ষাকল্পে হাত বাড়িয়ে লোকজ নাটক টিকিয়ে রাখা যায় না। আর আমাদের লোকজ নাটক এত নিঃস্ব কাঙাল নয় যে, সে কেবল অন্যের কৃপাদৃষ্টি ভিক্ষা করে টিকে থাকবে। লোকজ আঙ্গিকের ব্যবহার তখনই সার্থক হবে যখন তাকে নাটকের মূল উদ্দেশ্যের সাথে একীভূত করা যাবে।

দ্বিতীয়ত, যে কারণে লোকজ উপাদানের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় তা হলো, আধুনিক জীবনের বোঝাপড়া ও টানাপোড়েনকে শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপনের জন্য। লোকজ কোনো কাহিনি, রূপকথা বা অতিলৌকিক কোনো আখ্যানের সমান্তরালরূপে আধুনিক মানুষের জীবনসঙ্কটকে প্রতিকীকরণ করা হয়ে থাকে। শিল্পমানের বিচারে এই পদ্ধতিটি ভীষণ কার্যকর এবং অর্থবহ। কেননা বর্তমান যুগে মানুষের আত্মদ্বন্দ্বকে গতানুগতিক ধারায় কাহিনি গ্রন্থনার মাধ্যমে প্রকাশ করা দুরূহ কাজ। প্রায়শই তা একঘেঁয়েমিতে পর্যবসিত হয়। কিন্তু আধুনিক মানুষের জীবন সঙ্কটকে যদি লোকজ কোনো কাহিনি বা ঘটনাসূত্রের পরম্পরায় বা অতিলৌকিক কোনো পাথের সমান্তরালরূপে তুলে আনা যায়, তবে তা অধিক হৃদয়গ্রাহী, শিল্পমানসম্মত ও অর্থবহ হয়ে উঠবে। অন্যথায় তা অপপ্রয়োগ হতে বাধ্য। তৃতীয়ত, যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে লোকজ আঙ্গিক বা উপাদানের ব্যবহার করা হয়ে থাকে তা হলো, লোকজ উপাদানের ভেতরে সমাকালীন নতুন কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে কালের দাবিকে পূর্ণ করা। এতে কাহিনি গতিপ্রাপ্ত হয় এবং অধিক প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ধরা যাক, শম্ভু মিত্রের ‘চাঁদ বনিকের পালা’। এটি আমাদের মনসামঙ্গলের অন্তর্গত বেহুলা-লক্ষিন্দর আখ্যানকে ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। বেহুলা লক্ষিন্দর পালা চিরাচরিত রূপটিই যদি এ নাটকে উপস্থাপিত হতো, তবে তা অপপ্রয়োগরূপে প্রতিভাত হতো। কিন্তু শম্ভু মিত্র এই আখ্যানকে একটি ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন দৃষ্টি ভঙ্গিতে, ভিন্ন আস্বাদে নতুনতর ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করেছেন। মূল পালার মনসা ও শিবের দ্বন্দ্বকে শম্ভু মিত্র আধুনিককালে মানুষের কুসংস্কার, অন্ধত্ব, পশ্চাৎ-মুখীনতা, জ্ঞান বিমুখতা এবং জড়তার সাথে সম্মুখ দৃষ্টি, অজানাকে জানার স্পৃহা, মুক্তচিন্তা ও আত্মার স্বাধীনতার দ্ব›দ্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এখানেই লোকজ উপাদান ব্যবহারের সার্থকতা নিহিত। বিপরীতে বিভাস চক্রবর্তীর ‘মাধব মালঞ্চি কইন্যা’ নাটকে লোকজ উপাদানের প্রয়োগ মনে ভাবনা জাগায় না। কেননা, এই প্রয়োগ কোনো নতুনতর ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে না। শুধুমাত্রই তা আদিরূপেরই অনুকরণ। উপরন্তু সেখানে বর্তমান সময়ের মানুষের রুচির পরিপন্থী বিষয়গুলো সচেতনভাবে পরিহার করা হয়েছে। এটিও লোকজ উপাদানের এক ধরনের ‘প্রয়োগ’ কিন্তু শিল্পের বৃহৎ অর্থে তা অনুর্বর, কৃত্রিম। তাই এটিও এক ধরনের ‘অপপ্রয়োগ’।

লোকজ নাটক জনপ্রিয় বিধায় অনেক নাটকে বেশি টিকেট বিক্রির প্রত্যাশায় বা দর্শক আকৃষ্ট করার বাসনার লোকজ উপাদানের ব্যবহার করা হয়। এটি নিশ্চিতভাবে শিল্পের সঙ্গে প্রবঞ্চনার শামিল। অনেক ক্ষেত্রে এমন দেখা যায় যে, লোকনাট্যের কোনো কোনো কুরুচিপূর্ণ বিষয়কেও নাটকে অঙ্গীভূত করা হচ্ছে, কেননা কিছু বিকৃত রুচির দর্শকেরা দেখতে আকর্ষণ বোধ করে। তাই সমানভাবে বিকৃত নাট্যনির্মাতারাও সেই বিষয়কে মঞ্চে নিয়ে আসেন নাটকের দর্শকসংখ্যা বাড়াতে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমাদের গ্রামেগঞ্জে যে যাত্রা পালা অভিনীত হয়, তাতে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা হেতু নারীর অংশগ্রহণের অভাবের কারণে পুরুষেরা নারী সেজে নারী চরিত্রে অভিনয় করে থাকে। কিন্তু আধুনিক নাটকে যাত্রার প্রসঙ্গ এলেই যদি পুরুষকে নারী সাজে উপস্থাপন করা হয় তবে তা একধরনের রুচিবিকৃতি। যতক্ষণ পর্যন্ত না তা নাটকের মূল উদ্দেশ্যের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠবে ততক্ষণ তা ‘অপপ্রয়োগ’। যদি এমন হয় যে, যাত্রার কোনো অভিনেতা যে সব সময় নারী সেজে অভিনয় করে থকে, তার নারীভাবের সাথে তার প্রকৃত পুরুষভাবের দ্বন্দ্বই হয় নাটকের মূল উপজীব্য এবং তাতে যদি সমকালীন মানুষের অনুভবের প্রতিরূপ দেখানো সম্ভব হয় এবং সর্বোপরি যদি তা শিল্পের চাহিদা পূর্ণ করে তবেই বিষয়টি সার্থক হবে। নচেৎ তা রুচিবিকৃতি, অপপ্রয়োগ।

এবারে যেসব নাটকে লোকজ উপদানের ব্যবহার হয়েছে সে প্রসঙ্গে আলোচনায় আসা যেতে পারে। ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে’র প্রযোজনা সৈয়দ শামসুল হক রচিত ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ নাটকের আঙ্গিকের সুপ্রয়োগ লক্ষণীয়। সৈয়দ হক তার নাটকে বাংলা পয়ার ছন্দকে ভেঙে নতুনভাবে ব্যবহার করেছেন যা একটি ভিন্ন শিল্প সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করে। আমাদের  চিরাচরিত নাটক মূলতই সঙ্গীতাত্মক; কাব্য ও গীত, বাদ্য-তাল-লয়-ছন্দ এর শরীর। গীতল ভাষার শরীরে তিনি নাট্যরচনা করেছেন বলেই তা বিষয়াতীত পেয়েছে। আর যে সমস্ত নাট্যদলের নানান প্রযোজনায় লোকনাট্যের প্রভূত প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয় তাদের মধ্যে ‘ঢাকা থিয়েটার’, ‘আরণ্যক নাট্যদল’, ‘ঢাকা পদাতিক’, ‘লোক নাট্যদল’, ‘মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়’, ‘দেশ নাটক’ অন্যতম।

লোকজ নাটকের সুপ্রয়োগ যে দলের নাটকের মূল উপজীব্য, যারা শেকড়ের সন্ধানে ব্যাপৃত থেকে লোকজ নাটকের সন্ধান করে তাকে আধুনিক নাট্যে সফলভাবে প্রয়োগের চেষ্টা করে যাচ্ছে, তারা হলো ‘ঢাকা থিয়েটার’। ঢাকা থিয়েটারের ‘চাকা’, ‘হাত হদাই’, ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’সহ প্রায় সকল নাটকেই লোকজ আঙ্গিকের সুপ্রয়োগ লক্ষণীয়। নাটকগুলোর রচয়িতা সেলিম আল দীন চান পাশ্চাত্য সংজ্ঞা সূত্রের বাইরে আমাদের মধ্যে গড়ে উঠুক বাংলার নিজস্ব নাটক। সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তিনি বাংলার নানা লোকজ আঙ্গিক ও উপাদানের অন্বেষণপূর্বক সেগুলোকে তাঁর নাটকে অঙ্গীভূত করেছে। প্রযোজনার ক্ষেত্রে নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ সেই সম্ভাবনাকে নতুনতর ব্যাখ্যায় দৃশ্যমান করে তোলেন।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নাটকে লোকজ আঙ্গিকের ব্যবহার হয়েছে নানানভাবে। প্রায়শই তা ‘অপপ্রয়োগে’ পর্যবসিত হয়েছে। যেদিন সম্পূর্ণভাবে লোকজ আঙ্গিকের আধুনিকায়নের মাধ্যমে নির্মিত হবে আমাদের নাটকের শরীর, তখনই হবে লোকজ নাটকের যথার্থ ‘প্রয়োগ’। লোকজ নাটকের সাধারণ বৈশিষ্ট্য, সংজ্ঞাসূত্র, রচনা ও পরিবেশনা রীতিকে গবেষণা ও অনুধ্যানপূর্বক বাংলা নাটকের আধুনিক এক রচনা ও পরিবেশনারীতি আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। এ লক্ষ্য নিয়ে সেলিম আল দীন দ্বৈতাদ্বৈতবাদের আশ্রয়ে নতুন এক নাট্যরচনারীতির সন্ধান দেন, যার নাম ‘কথানাট্য’, যা কথার শাসনে রচিত বর্ণনাত্মক নাটক। এ ধারায় কয়েকটি নাটকের নামোল্লেখ করা যায়, ‘চাকা’, ‘যৈবতী কন্যার মন’ এবং ‘হরগজ’। এগুলোর রচনা ও পরিবেশনাদৃষ্টে একে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য-সংশ্লিষ্ট আধুনিক নাটক বলে স্বীকার করা যায়। তাঁর সর্বশেষ দুটি রচনা ‘বনপাংশুল’ ও ‘প্রাচ্য’-তেও তিনি লোকজ আঙ্গিকের চমৎকার প্রয়োগ করেছেন। এ দুটি নাটক আমাদের জনপ্রিয় লোক আঙ্গিক পাঁচালির গঠন ও পরিবেশনারীতি অনুযায়ী আধুনিক এক অভিব্যক্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে যা পাঁচালি আঙ্গিকের হয়েও সমকালীন জীবনকে ব্যাখ্যা করে। ভবিষ্যতে বাংলা নাটকের নিজস্ব ধারা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এ দুটি প্রযোজনা উজ্জ্বল ভূমিকা রাখতে পারে। আলোচনার শেষ প্রান্তে এসে বলতে ইচ্ছে করছে, নিজের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ভুলে শুধুমাত্র পরানুকরণ আর নয়, এই বঙ্গভাণ্ডারের বিবিধ রতন অন্বেষণপূর্বক আমাদের নিজস্ব নাটক সৃষ্টি করতে হবে। সেদিনই ঘটবে লোকজ আঙ্গিকের সর্বোচ্চ সার্থক প্রয়োগ। অবশ্য সেদিন লোকজ আঙ্গিকের প্রয়োগের বিষয়টি অর্থহীন হয়ে পড়বে। সেদিন সেমিনার হবে ঠিক এর উল্টো বিষয়ে, ‘আমাদের নাটকে বিদেশি আঙ্গিকের প্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগ’। এই হোক আজকের আশাবাদ। সবাইকে ধন্যবাদ।

মাসুম রেজা ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): নাট্যকার, নির্দেশক। সদস্য, দেশনাটক।