Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আলাপনে সেলিম আল দীন (সংক্ষেপিত)

Written by সাক্ষাৎকার : বিপ্লব বালা, সোহেল হাসান গালিব ও হাসান শাহরিয়ার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[‘আলাপনে সেলিম আল দীন’- ছাপানো হয়েছিল থিয়েটারওয়ালা, ৮ম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যায় [সংখ্যা ২১]। নিজের লেখা নিয়ে, অন্যদের লেখা নিয়ে, বাংলাদেশের থিয়েটার নিয়ে তাঁর প্রাণবন্ত বিশ্লেষণ  জানতে পেরেছিলাম ঐ আলাপনে। গত ১৪ জানুয়ারি ২০০৮-এ হুট করেই চলে গেলেন তিনি আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে। তাঁকে নিয়ে, তাঁর কাজ নিয়ে অনেকেই লিখেছেন বর্তমান সংখ্যার বিশেষ আয়োজনে। তারপরও যাঁদের কাছে ঐ সংখ্যাটি পৌঁছয়নি বা যাঁদের সংগ্রহে সংখ্যাটি নেই, তাঁদের জন্য বক্ষমাণ সংখ্যায় সংক্ষিপ্তাকারে পুনর্মূদ্রণ করা হলো- ‘আলাপনে সেলিম আল দীন।- সম্পাদক]

বিপ্লব বালা
সেলিম ভাই, আমরা মনে হয় এভাবে শুরু করতে পারি, যেমন- প্রথমেই আমরা আপনার শৈশব-কৈশরের প্রতিবেশ আবহটা জানতে পারি, যার প্রভাব হয়তো পরবর্তী সময়ে আপনার সৃজনকর্মের  উপর পড়েছে।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, সে তো বটেই। কর্মসূত্রে আমার বাবাকে নানা জায়গায়- চিটাগাং- সিলেট- কখনো বা রংপর-কুমিল্লা-আখাউড়া এসব অঞ্চলে যেতে হয়েছে। আবার নিজের গ্রামেও থেকেছি। এগুলোর প্রভাব আমি বলবো আমার পরবর্তী জীবনের উপর পড়েছে। আমার পিতৃভূমি অর্থাৎ ফেনির সেনেরখিল কাজিরহাট বা উপকূলীয় অঞ্চলটা খুব প্রভাব ফেলেছে। তবে এ-সবই কিন্তু পরিণত বয়সের উপলব্ধির কথা।

বিপ্লব বালা
কিশোর বয়সে কোনো প্রভাব পড়ে নি?

সেলিম আল দীন
তেমনভাবে পড়ে নি। পরে পড়েছে। বাবা পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি করতেন- কাস্টমস বিভাগে। এক জায়গায় তিন বছরের বেশি থাকা হত না। আমার লেখার ভেতর যে বিভিন্ন অঞ্চল প্রসঙ্গ আসে, তার প্রধান কারণ হলো, আমি দেখেছি যে, আমার স্বজনরা যেন সেখানে আগে থেকেই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এমনকি তিন বছর পর পর যে ছেড়ে চলে এসেছি, সে সকল চিরকালের জন্য না ফেরার স্থান তাতে কখনোই মনে হয় নি যে, সেখানে আমি আর কখনো ফিরবো না। বালক মন বলতো যাচ্ছি তো কী হয়েছে, আবার তো আসবো - আসবো তো।

বিপ্লব বালা
আপনি বলছেন গ্রামের বাড়ি বলতে যা বোঝায় সেখানে আপনার তেমন একটা থাকা হয় নি?

সেলিম আল দীন
তা ঠিক কিন্তু আমি ক্লাস সেভেন থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পর্যন্ত গ্রামে ছিলাম। বাবার বদলিজনীত কারণে মা ভাবলেন পড়ালেখার ক্ষতি হবে, ছেলে-মেয়েরা মানুষ হবে না, তাই একসময় আমাদের পরিবার গ্রামেই থেকে যায়, আর বাবা বিভিন্ন জায়গায় বদলি হতেন ২/৩ বছর পর পর। তখন আমাদের গ্রামগঞ্জের স্কুলগুলো ছিল খুবই সমৃদ্ধ। মঙ্গলকান্দি স্কুলে আমার বাবা পড়েছেন, দাদা শিক্ষকতা করেছেন। পুরো থানাতে তখন একটা স্কুল ছিল।

বিপ্লব বালা
প্রথম কবে কবিতা লেখা শুরু করেন?

সেলিম আল দীন
ক্লাস থ্রিতে থাকতে। তবে সেগুলো ঠিক কবিতা হত কিনা জানি না, তবে লিখতাম। এবং তারপর থেকে সব সময়ই লিখে গেছি।

বিপ্লব বালা
নিশ্চয়ই কারো না কারো অনুপ্রেরণা থেকে বা আপ্লুত হয়ে লিখেছেন।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, প্রথম দিকে জসীম উদদীন, তারপর ক্লাস এইট নাইনে উঠে রবীন্দ্রনাথ কিছুটা বুঝতে শুরু করেছিলাম। রবীন্দ্রনাথ পড়ে শুরুতেই বুঝে ফেলেছিলাম যে, এক মহাসমুদ্রের কিনারে এসে দাঁড়ালাম। ব্যাপারটা বেশি করে বলা না, তখনই কিন্তু আমি গোরা, চার অধ্যায়, ঘরে বাইরে এবং কমপক্ষে ৫টি কাব্যগ্রন্থের ৫০টি কবিতা মুখস্ত করে ফেলেছি। সোনারতরী-র অর্ধেক কবিতা আমার মুখস্ত ছিল। আর মেঘনাদবধ কাব্য পড়ে শেষ করি অষ্টম শ্রেণীতেই।

বিপ্লব বালা
রবীন্দ্রনাথে যাওয়ার আগে একটু জেনে নিই, এই যে আপনি ম্যাট্রিক পর্যন্ত গ্রামে ছিলেন, তখন গ্রামসমাজ, মানুষের সাংস্কৃতিক নানা রীতি, মানুষজন এগুলো কতটা দেখেছেন?

সেলিম আল দীন
একটা কথা বলি, মানুষ বাল্যকালে যা দেখে শোনে তা বিবেচনা সে করে পৌঢ়তায় পৌঁছে বা জ্ঞানের একটা সীমায় পৌঁছে। এখন আমি দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের গ্রামটি যদি হিন্দু, বৈষ্ণব এবং মুসলমান অধ্যূষিত না হতো তাহলে লেখক হিসেবে আমার অসাম্প্রদায়িক হওয়া মুশকিল হয়ে পড়তো। যে সোসাইটিতে মিক্সড কালচার নাই, সেই সোসাইটি ডেভেলপ করে না। আমরা নাটক করেছি, কিন্তু কখনো ফতোয়া শুনি নি যে, এটা করা হারাম বা নাটক করা, গান গাওয়া হারাম। আমরা কখনো ভাবি নি- আমার এই বন্ধুটা হিন্দু বা এই বন্ধুটা মুসলমান।

বিপ্লব বালা
আমি বলতে চাচ্ছি, তখন এগুলো আপনাকে কেমন প্রভাবিত করেছিল?

সেলিম আল দীন
আমি বললামই যে, তখন প্রভাবিত করেছে কিনা সেটা বোঝবার সময়টা তো হলো ভবিষ্যতে আমি কী হলাম বা করলাম তার উপর। এখন যদি আমার কোনো নান্দনিক জায়গা যথার্থ্যরূপে তৈরি হয়ে থাকে, তার পেছনের ইতিহাসটা কী? নিশ্চয়ই আমার বাল্যকাল। আমি ক্লাস এইটে ডিকশনারী দেখে দেখে মেঘনাদবধ কাব্য পড়ে ফেলেছি। সেটা তো রীতিমত আলোড়িত করেছিল সবাইকে। আবার আমি রবীন্দ্রনাথ পড়ার কারণে, সেই বয়সে, আমার একটা খোলা চোখ পেয়েছি। মানে যা দেখছি বা সবাই দেখছে, তার বাইরে কিছু দেখার চোখ পেয়েছিলাম। শোনো, বুদ্ধদেব বসুর একটা লেখায় পড়েছিলাম- যা কিছু করবার-ভাববার, সেটা একজন সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীতেই পেয়ে যায়। তো আমি বলতে চাই, আজকের সেলিম আল দীনের কোডগুলো, সংকেতগুলো তখনই তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

বিপ্লব বালা
কিন্তু আপনি তো তারপর এসে ইউরোপীয় নানা কবিতা বা অন্যান্য পড়াশোনা করে ...

সেলিম আল দীন
সেটা তো বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর বুঝতে পারলাম যে, নিজের দীনতা কতটুকু। সঙ্গত কারণেই রবীন্দ্রনাথ পড়া একটা লোক চেখভ পড়ে নি, টলস্টয়, দস্তয়ভস্কি পড়ে নি বা সার্ত্র আর শেক্সপীয়র ভালোভাবে পড়ে নি, এটা কি হতে পারে? পারে না। ফলে এগুলো পড়তে হবে। এবং যখন ভাবলাম যে পড়তে হবে, তখন এক ভয়ঙ্ককর পঠনে আমি নিজেকে সীমাবদ্ধ করলাম, এবং মনে মনে কামনা করলাম যে, আমার মাথায় যেন ফার্স্টক্লাস পাওয়ার ভূত না চাপে। ফলে দেখা গেল সবাই কষ্ট করে নোট মুখস্ত করছে আর আমি হয়ত টি.এস. এলিয়ট পড়ছি। কবি বন্ধুরা হয়তো টি.এস.সি-তে আড্ডা দিচ্ছে, আমি উঠে গিয়ে পড়ছি। এমনকি আমি এমন আবেগদীপ্ত ছিলাম যে, যেগুলো পড়া হতো না সেগুলোকে ছুঁয়ে দিতাম। পরবর্তী সময়ে কিন্তু একটু বেছে বেছে পড়া শুরু করলাম। কোনো উপন্যাস হয়তো অর্ধেক পড়ার পর মনে হয়েছে আর পড়ার দরকার নাই।

বিপ্লব বালা
অনিকেত অন্বেষণ কবেকার লেখা?

সেলিম আল দীন
এটা সুলতান মাহমুদ বিন তুঘলককে নিয়ে সেই ১৯৬৯-৭০-র দিকে লেখা অনিকেত অন্বেষণ। নামকরণে সমকালীন কবি নূরুল হুদা সাহায্য করেছিল। আমি যখন লিখি তার পরে দেখেছিলাম গিরিশ কারনাড-র তুঘলক নামে একটা নাটক আছে। এটাও আমার লেখা ওয়েস্টার্ন শিল্পতাড়না-জ্ঞাত, ফর্মটাও আদ্যিকালের অর্থাৎ সংলাপভিত্তিক। আমি তখন আলবেয়ার কাম্যুর ক্যালিগুলা পড়েছিলাম। পড়ে তো ঘুমুতে পারি নি। পরে ভাবলাম, আরে এই ক্যালিগুলা - ব্যাপারটা তো তুঘলকের মধ্যেও আছে। পরে আমি ক্যামব্রিজ হিস্ট্রি অব অক্সফোর্ড ইত্যাদি ইতিহাসগ্রন্থ কষে পড়ে ওখান থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করে কাজে লাগালাম।

বিপ্লব বালা
ঐ মাছ শিকারের ঘটনাটা কীভাবে আসলো অনিকেত অন্বেষণ -এ?

সেলিম আল দীন
এটা বাস্তব ঘটনা। থাট্টা অঞ্চলে তামিল বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে বিশাল একটা সামুদ্রিক মাছ পেয়ে যান তুঘলক। ওটা খাওয়ার পর জ্বর এবং আমাশাতে মারা যান তিনি, সিন্ধু অঞ্চলে। কিন্তু আমি ওটা দেখাই নি। আমি দেখিয়েছি যে, মাছটা যেমন নিঃসঙ্গ, তুঘলকও নিঃসঙ্গ ছিলেন। প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছি। আমার মনে হয় তুঘলক ঐ শতাব্দীতে না জন্মে যদি পরে জন্মাতেন তাহলে অনেক বড় রাষ্ট্রনায়ক হতে পারতেন।

বিপ্লব বালা
বাঙলা নাটকের দুর্বলতাগুলো কী কী বলে আপনি মনে করতেন?

সেলিম আল দীন
সেগুলো হলো- অপ্রয়োজনীয় বাস্তবতাবাদ, ভাষার অগোছাল ব্যবহার, জীবনের কোনো মহৎ প্রণোদনা থেকে নাটকের সৃষ্টি না হওয়া- ইত্যাদি মুদ্রাদোষগুলো প্রায় সব নাটকেই ছিল বলে আমার ধারণা। অবশ্য সব নাটকের কথা বলছি না। মধুসূদনের কৃষ্ণকুমারী বা তাঁর প্রহসনগুলো অবশ্যই মহান লেখা, আর রবীন্দ্রনাথকে তো আদ্যোপান্ত এক বিস্ময়ই বলতে হবে এবং স্বীকার করতে হবে যে, এঁরা মূলত কবি ছিলেন বলেই এই মহান সৃষ্টিগুলো সম্ভব হয়েছিল। এছাড়া বেশিরভাগ নাট্যকারের নাটকই আমার কাছে মনে হয়েছিল পরিকল্পনাহীন লেখা। এমন কী ডি.এল.রায়ের নাটকও ইতিহাসে টিকে থাকলেও শিল্পমূল্যে তেমন দাঁড়াচ্ছে বলে মনে হয় না।

হাসান শাহরিয়ার
তখন কী আপনার রবীন্দ্রনাথের নাটক পড়া হয়ে গিয়েছিল?

সেলিম আল দীন
না, তখন আবার আমি রবীন্দ্রনাটকের বিরুদ্ধেই ছিলাম বলা যায়। এবং তারপরও অনেককাল আমি তাঁকে গভীরভাবে অনুধ্যানে অনুপ্রাণিত হই নি। অন্তত ১৯৭৬ সালে আগ পর্যন্ত বিরুদ্ধেই ছিলাম। আমার মনে হতো, নাটকে এত গান কেন? এখন বুঝি যে, নিজের ভেতরে যখন শিল্পবোধ অসম্পূর্ণ থাকে, তখন মহৎ লেখার অনেক বিষয়কেই আমরা খুব সহজেই অবজ্ঞা করতে পারি। আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, তখন আমার মনে হত গানটা বাঙলা নাটকের জন্য একটা ক্ষতিকর দিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এটা মনে হওয়ার একটা কারণ থাকতে পারে, তখনকার যে-কোনো সাধারণ মানের নাটকেও গান ব্যবহৃত হতো। এর ফলেই
হয়তো-বা আমি রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলোকেও একই কাতারে ফেলেছিলাম। পরে অবশ্য ভুল বোঝার পর মনে মনে সাতবার ক্ষমা চেয়েছি, রবীন্দ্রনাথের কাছে। কী বিশাল সৃষ্টিকে কী ব্যাপক অবজ্ঞাই না করেছিলাম! তবে এখন বুঝি তখন আমি ঔপনিবেশীয় শিল্পশর্তে বাঁধা ছিলাম।

বিপ্লব বালা
বাইরের লেখার পাশাপাশি দেশি লেখাও নিশ্চয়ই পড়তেন?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, তবে বাইরের লেখাই বেশি পড়তাম। দেশি লেখা পড়লে মনে হতো অযথা সময় নষ্ট করছি। এর চেয়ে রবীন্দ্রনাথের গান শুনলেই তো পারি।

সোহেল হাসান গালিব
আফ্রিকার কবিতাগুলোর অনুবাদ কি তখনই শুরু করেন?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, ঐ সময় একটা বড় কাজে হাত দিয়েছিলাম, পরে বিবেচনা করে দেখলাম অবশ্য কাজটা অত বড় হয়ে ওঠে নি, তবু সেটা হলো এই যে, আমিই প্রথম ব্ল্যাক লিটারেচার নিয়ে বাংলা ভাষায় ১৯৬৯ সালেই আলোচনার সূত্রপাত করি। আমার আগে কেউ তখনো আমেরিকার ব্ল্যাকদের সাহিত্য বা সঙ্গীত নিয়ে কোনো লেখা লেখে নি।

বিপ্লব বালা
আপনার এ কাজে হাত দেয়ার পেছনের কারণগুলো কী ছিল?

সেলিম আল দীন
তখন পাকিস্তানের কর্মকাণ্ড দেখে, বাঙালির উপর নির্যাতন দেখে, নিজেকে ব্ল্যাকদেরই একজন মনে হত। মনে হত আমেরিকার ভার্জিনিয়া যেমন ক্রীতদাস, আমিও একজন ক্রীতদাস। তো ওদের ফোক লিটারেচারের এবং মডার্ন পয়েট্রি এই দুটোর উপর আমার একটা বেশ বড়-সড় আলোচনা আহসান হাবীব ছেপে আমার একটা জায়গা তৈরি করে দিলেন উৎসাহের সঙ্গে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি বাঙলা নাটকের মুদ্রাদোষের কথা বলছিলেন। তো তখন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পড়ে কী মনে হয়েছিল? তাঁর সব রচনাই তো আলাদা কিছু, আপনার কী মনে হয়?

সেলিম আল দীন
ওয়ালীউল্লাহর গল্প পড়ে তো ভাবতাম এখনকার বাংলা সাহিত্যে এই মাপের লেখা হয় নাকি! আমি তো অবাক! চাঁদের অমাবস্যা আমার কাছে ততটা ভালো লাগে না, কারণ, এরকম লেখা ওয়েস্ট-এ ভুরিভুরি আছে, কিন্তু কাঁদো নদী কাঁদো-র মতো লেখা বিশ্বসাহিত্যে খুব কমই লেখা হয়েছে। আর বাঙালিদের জীবনে এমন উপন্যাস আর লেখা হবে কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

হাসান শাহরিয়ার
এগুলো তো পরের রিয়েলাইজেশন?

সেলিম আল দীন
তা তো বটেই।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু আমি বলছি আপনি যখন মুক্তিযুদ্ধের পরে নাটক লেখা শুরু করলেন তখন অনেকটা এ্যাবসার্ডধর্মী নাটকই লিখেছিলেন, এবং তখন আপনার সামনে নিশ্চয়ই ওয়ালীউল্লাহ বা সাঈদ আহমদ ছাড়া কেউ ছিলেন না। তো আপনি কি তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন, নাটকের মুদ্রাদোষগুলো দূর করার ব্যাপারে?

সেলিম আল দীন
না, তাঁরা সে-অর্থে অনুপ্রাণিত করে নি, কিন্তু একটা কথা সত্য, সাঈদ আহমদ আর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কিন্তু এধরনের নাটক রচনা করে প্রমাণ করেছিলেন যে, গৎবাঁধা কাহিনী ছাড়াও নাটক লেখা যায়। এবং আমি তো মাঝে মাঝে মনে করি রবীন্দ্রনাথের পর ওয়ালীউল্লাহর নাটক একটা উচ্চতায় পৌঁছতে পেরেছিল। আর আমার নাটক লেখার ব্যাপারে ধারণা হয়েছিল যে, কবিতার সমান উচ্চতার ভাষা এবং থিমকে নিতে হবে, এটা ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ। এটা করতে গিয়ে আমি ওয়েস্টের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। পরে রিয়েলাইজ করলাম যে, শুধু এটা দিয়ে পরিপূর্ণতাটা আসছে না। ঠিক মধুসূদনের ঘটনাটাই ঘটলো আরকি!

সোহেল হাসান গালিব
একটা ব্যাপার, আপনি কবিতা থেকে নাটকের দিকে এলেন কিন্তু আপনার নাটকের ভাষাভঙ্গি বা প্রকাশ, এগুলো তেমন কবিতাধর্মী হয়ে ওঠাটা কিন্তু অনেক পরে হয়েছে। প্রথমদিকের নাটকে এগুলো নাই।

সেলিম আল দীন
না না, শুরুতেই ছিল। যেমন, বঙ্গবন্ধু শহীদ হলেন ১৯৭৫ সালে, আর আমি ’৭৩ সালেই লিখলাম সর্প বিষয়ক গল্প। আমাদের একটা বিশাল শহর, শহরে একটা বিশাল গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী নিহত হলেন এবং আর্মিরা চলে আসলো।

বিপ্লব বালা
এই ধারণাটা আপনি কীভাবে পেলেন?

সেলিম আল দীন
আমি গেজ করলাম। আমার মনে হলো বঙ্গবন্ধু বোধহয় আর বাঁচবেন না। কারণ, ইতোমধ্যেই সুকর্ণের পরিণতি দেখে আমার ভেতরে একটা ভয় ঢুকে গিয়েছিল।

হাসান শাহরিয়ার
তাই বলে এমনভাবে মিলে যাবে? মানে অনেকটা সেই ক’দিন আগে লেখা নিমজ্জন, যেখানে আপনি ফোর-রিয়েলিজম বা সম্মুখ বাস্তবতার কথা বলছেন, আর সেই ’৭৩ সালের সর্প বিষয়ক গল্প সেখানেও তো দেখি আগে থেকেই আপনি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, অনেকটা তাই। মানে তখনকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা পরিবেশ কিন্তু এমন আভাসই দিচ্ছিল যে, একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আমার মনে হয় ঠিক এভাবে না হলেও তখনকার অনেক সচেতন মানুষই বুঝতে পারছিলেন, বঙ্গবন্ধুর পরিণতি এদিকেই যাচ্ছে।

বিপ্লব বালা
আপনি জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন, এক্সক্লুসিভ ও মূল সমস্যা, সংবাদ কার্টুন এবং তারপর মুনতাসির ফ্যান্টাসী লিখলেন, যেগুলো কিনা রিয়েলিটিকেই ধরতে চেয়েছে। কিন্তু ওগুলোর উপস্থাপন ছিল ভীষণ স্যাটেয়ারধর্মী। তখন আপনি আসলে নাট্যরচনার ক্ষেত্রে কী চেয়েছিলেন?

সেলিম আল দীন
আমার কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল যে, আমার জন্য শিল্পের প্রকৃত পথ কোনটি? যখন যা গভীরভাবে তাড়না করতো তখন তাই লিখতাম কিন্তু মনে হত এটা আসলে আমার পথ না। বাঙলা নাটককে মুক্তি দিতে হলে আমাকে অন্য পথ ধরতে হবে। এবং তারপর আমি লিখলাম শকুন্তলা। আমি কালিদাসের বিপরীতে দাঁড়ালাম এবং গ্যাটের শকুন্তলা বিষয়ক একটি কবিতাকে অগ্রাহ্য করেছি এই ভেবে যে- এটা হতে পারে না, স্বর্গ-মর্ত্য কখনো মিলন হয় না। কেউ কেউ তখন বলেছে যে- হ্যাঁ, থার্ড ওয়ার্ল্ড এবং ডেভেলপড কান্ট্রিতে কোনো মিলন হয় না। যদি হয়ও সেটা অস্থির কিছু।

হাসান শাহরিয়ার
তারপর তো কীত্তনখোলা?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, এরপরই দেখলাম আমার এপিকের ওয়ার্ল্ডটা ঘনিয়ে উঠেছে। কী পশ্চিম কী পূর্ব- আমার ভেতরে একটা গর্জনশীল সমুদ্রের শব্দ শোনলাম। গ্রীক, রোমান, সংস্কৃত পুরাণগুলো প্রচণ্ডভাবে পড়ে ফেললাম। এবং আমার কাছে মনে হতে লাগলো নাটকে অঙ্ক, দৃশ্য এসব কাল বিবেচনায় অনাবশ্যক রীতি থাকবে কেন? আমি কীত্তনখোলা রচনা করলাম। এবং যেহেতু এপিকের মর্যাদা দিতে যাচ্ছি, ফলে মহাকাব্যের সর্গ বিভাজনটাকেই নাটকে নিয়ে এলাম। এর অনুপ্রেরণা এসেছে মানুষের জীবনের মহাকাব্যিক চেতনা থেকে- কোনো বিশেষ মহাকাব্য থেকে না, মহাকাব্যিক চেতনা থেকে এবং সাধারণ মানুষের ভেতরে এই মহাকাব্য লুকিয়ে আছে।

হাসান শাহরিয়ার
সেই সময় নাট্যবোদ্ধরা এটাকে কীভাবে নিয়েছিলেন?

সেলিম আল দীন
শকুন্তলা দেখার পর রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ অনেকেই বেশ আপ্লুত হলো, কিন্তু কিত্তনখোলা দেখার পরই বললো সেলিম ভাই এটা কী করলেন আপনি! কোনো নায়ক নাই, মেইন কোনো ক্যারেক্টর নাই, কিছুই বোঝা যায় না। কেউ কেউ বললেন এটা নাটক না উপন্যাস? আমার বয়োজ্যেষ্ঠ এক নাট্যকার বললেন- সেলিম তুমি এটা আবার লেখ, একটু পরিবর্তন কর। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে- আমি যা-ই লিখে থাকি না কেন, আমি আলাদা কিছু লিখেছি। এবং এ-ও বুঝলাম নাসির উদ্দীন ইউসুফ এবং ঢাকা থিয়েটার যদি আমার পাশে থাকে আমার পথ চলায় আর কোনো বাধা আসবে না।

বিপ্লব বালা
আপনি পূর্ব-পশ্চিমের ক্ল্যাসিক মিলিয়ে নিজের একটা ভূমি পেয়ে যাচ্ছেন। এখানে লোকজীবন বা পারফরমেন্সরীতি, এগুলো কি কেবল মহাকাব্য থেকেই নিচ্ছেন?

সেলিম আল দীন
সেটা তো খুবই স্বাভাবিক যে, আমি ভূমিজ মানুষদের যখন আকাশ প্রমাণ করে দেখছি তখন অটোম্যাটিক্যালি তাদের জীবনাচরণের নানা দিকগুলো এসে পড়ে।

বিপ্লব বালা
সেই জীবনাচরণ জানার ব্যাপারটা কীভাবে হলো? কোনো নাগরিক লেখকের কাছে তো পাই না। আপনি পেলেন কীভাবে?

সেলিম আল দীন
আমার কাছে মনে হয়েছে মানুষগুলো যদি বনশ্রী বালা হয়, যদি ডালিমন হয়, যদি সোনাই হয়, তাহলে তাদের জীবন এবং পরিপার্র্শ্ব ঐখানে ঐভাবেই আসবে। এপিকের একটা প্রতিনিধি হিসেবে আসছে। সেই সাথে তারা তাদের ছিন্নতা মলিনতা নিয়েই এসেছে। এবং সেখানে এই লোকায়ত জীবনের বিকাশটা যে আলোড়ন ঘটায়, মনে হচ্ছে সোনাই আর সোনাই থাকে না, এরা হচ্ছে চিরকালের ইদিপাস, আন্তিগোনে, কৃষ্ণা বা একিলিসের সমকক্ষ। আমি আমার নাটকের রীতিকে এই পথে মুক্তি দেবার চেষ্টা করেছি। বাঙলা নাটকের মুক্তিটাকে আমি আমার পথে এভাবেই অন্বেষণের চেষ্টা করেছি, আমার দেশের মতো করেই।

বিপ্লব বালা
কিন্তু নাগরিক দর্শকের কাছে দুটোই তো অনুপস্থিত- লোকজ আর মহাকাব্য। তো সেই দর্শকের সাথে কীভাবে কমিউনিকেট করলেন? এই ভাষা, ভাবনা তো তাদের কাছে অজানা।
সেলিম আল দীন
সেটা আমার দায়িত্ব না।

বিপ্লব বালা
কেন, নাট্যকার হিসেবে দর্শক আপনার মাথায় থাকবে না?

সেলিম আল দীন
মোটেই না। আমি ভেবেছি, কীত্তনখোলা লিখেছি, ব্যস। এখন দর্শক পছন্দ করলে করবে, না করলে তো আমার কিছু করার নাই। এটা আমার রিচ্যুয়াল যে, আমি বলবো এবং পাঠক দর্শক নিজের গরজে কমিউনিকেট করে নেবে।

হাসান শাহরিয়ার
দর্শককে পছন্দ করানোটাকে এত হেয় করে ভাবছেন কেন? এটা তো একটা চ্যালেঞ্জও হতে পারে যে, আপনার ভাবনার সাথে আপনার ক্লায়েন্টের ভাবনার সমন্বয় ঘটবে।

সেলিম আল দীন
কখনো না, দর্শকের চাইতে শিল্পের বা কাজের পূর্ণতাটা আমার কাছে অধিকতর কাম্য।

হাসান শাহরিয়ার
দর্শকের পূর্ণতা বাদ দিয়ে?

সেলিম আল দীন
আমি লেখার সময় দর্শকের ব্যাপারে মাথাই ঘামাই না।

বিপ্লব বালা
তাহলে তো বর্ণনাত্মক নাটকের মূল ক্যারেক্টারটাই থাকে না। বর্ণনাত্মক নাটকের মূল কাজটা তো পারফরমেন্সের সাথে দর্শকের সম্বোধন যোগসূত্র তৈরি করা। তো এখানে তো মূল জিনিসটাকেই আপনি অস্বীকার করছেন।

সেলিম আল দীন
অস্বীকার নয়, আমি প্রকৃত দর্শনের জন্য অপেক্ষা করি। সেটা যদি তৈরি হয় তো ভালো, না হলে আমার কী করার আছে!

হাসান শাহরিয়ার
আপনি তো বলছেন যোগসূত্র তৈরি করার কথা মাথাতেই রাখেন না, তারপর যদি যোগসূত্র তৈরি হয়েই যায় সেটা তো আপনার ক্রেডিট হিসেবে আসবে না, তাই না? তা নির্দেশকের ক্রেডিট হতে পারে।

সেলিম আল দীন
আমি আসলে মনে করি, নাটকের ফর্মে লেখা হলেও সব নাটকই যে অভিনীত হতে হবে এমন কোনো কথা নাই। জীবনে ডাকঘর-এর ভালো অভিনয় দেখবো কিনা জানি না কিন্তু ডাকঘর পড়েই তৃপ্তি পাওয়া যায়।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক তো বলেছেন, এই পড়ার মজাটা আসলে তলাপাত্র, উপরি-পাত্র হচ্ছে মঞ্চে দর্শকের সামনে যেটা হয়।

সেলিম আল দীন
এটার সাথে আমি একমত না। দৃশ্য কবিতার চেয়ে কম শক্তিশালী হয় না।

হাসান শাহরিয়ার
তার পরের রচনাগুলো দেখলেই তো বোঝা যায় যে, এগুলো মঞ্চকে মাথায় রেখে লেখা না। তারপরও আপনাকে নাট্যকার সেলিম আল দীনই বলা হয়। যে-কোনো টেকস্ট নিয়ে যে কেউ কাজ করতে পারে, যেমন আপনি কাঁদো নদী কাঁদো মঞ্চে এনেছিলেন, কিন্তু কাঁদো নদী কাঁদো কে নিশ্চয়ই আপনি নাটক বলবেন না, সে-ক্ষেত্রে আপনার রচনাগুলোকে যদি কেউ নাটক না বলে আপনার তো আপত্তি থাকার কথা না?

সেলিম আল দীন
না, আমার কোনো আপত্তি নাই। আসলে নাটকহীনতার মধ্য দিয়েই আমার নাটক।

বিপ্লব বালা
নাটক বলতে কি তাহলে একটা নির্দিষ্ট ফর্মেট বা সংজ্ঞা মেনে নেয়া হচ্ছে?

সেলিম আল দীন
না, আমি আর কোনো ফর্ম মানছি না। কারণ কীত্তনখোলা থেকেই আমি মহাকাব্যের সর্গবিভাগ দিচ্ছি নাটকে। এখানে মজার ব্যাপার হলো আমি আমার চিন্তার মধ্য দিয়ে পুরো জাতিকে শেয়ার করতে চাচ্ছি। পুরো জাতির সহস্র বছরের যে জীবনযাত্রা এবং তার যে আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন, সেটা কোনদিকে যাবে, আমার লেখার মধ্য দিয়ে যেন হাজার হাজার বছরের বাঙালির চাওয়াটা একটা অর্থ দাঁড় করায়। তোমরা বিশ্বাস করো আমি এভাবেই লিখছি, দেখছি, কোনো বানিয়ে কথা বলছি না।

হাসান শাহরিয়ার
অবশ্যই স্বীকার করছি, কিন্তু এই প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে আপনি কী বেছে নিয়েছেন? নিশ্চয়ই নাটক না?

সেলিম আল দীন
সেটাকে আমি কখনো বলেছি নাটক, কখনো পাঁচালী, কখনো বলছি উপাখ্যান। মানে এমনকি এটাকে গল্প ভাবলে গল্প, কবিতা ভাবলে কবিতা। তোমাদের মনে রাখতে হবে, এই বিভাজনগুলো ওয়েস্টের। ওয়েস্ট কিন্তু বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিতে তাদের সুবিধার জন্য নানা রকম বিভাজন করেছে। যেমন- একাঙ্ক, ছোটগল্প, পঞ্চাঙ্ক, উপন্যাস, কবিতা- অনেকটা সময়ের প্রয়োজনে। ট্রেন চালু হলো তো ছোটগল্প লেখা শুরু হয়ে গেল, যেন পাঠক অল্প সময়ের মধ্যে একটা পূর্ণাঙ্গ কিছু পড়তে পারে। ২-৩ ’শ বছর  আগে তো ছোটগল্পের অস্তিত্ব ছিল না। মহাকাব্যটা তৈরি হয়েছিল গোত্রের জন্য যে, তারা সারারাত ধরে শুনবে। পরে আধুনিক জীবনে মহাকাব্য আর চললো না। ছোটগল্পের অনুকরণে একাঙ্ক এলো। খুব হৈ চৈ পড়ে গেল। ৬০-৭০-১০০ বছর টিকলো। এখন পৃথিবীর কোনো শ্রেষ্ঠ একাঙ্ক লেখকের নাম বলতে পারবে? তো ওয়েস্টের এই বিভাজন বাঙ্গালির শিল্প ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতিহীন। আমি সেই জায়গাটা ধরতে চেয়েছি।

হাসান শাহরিয়ার
একটু বিশদ ব্যাখ্যা দিলে পরিষ্কার হতে পারতাম।

সেলিম আল দীন
তাহলে বলি, পাঁচালী-র কথা যদি বলো, তাহলে দেখবে, পাঁচালী-তে একদিকে থাকছে সামাজিক রীতি-নীতি, পুরাণ, ধর্মবিশ্বাস আবার থাকছে নাচ, গান, কাব্য আর আগাগোড়া কাহিনী তো থাকছেই। শিল্পের যতগুলো শাখা- গল্প, কাহিনী, ছন্দ, নৃত্য সবই থাকছে। শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ জুলেখা-র কিছু অংশ চিত্রপটের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, যেটাকে আমরা পটনাট্য নাম দিয়েছি। তো দেখা যাচ্ছে বাঙালিরা ‘বহু’কে ‘একের’ মধ্যে দেখেছে, আর ওয়েস্ট ‘এক’কে ‘বহু’ করেছে। আমাদের বহুকে একের মধ্যে নিয়ে আসার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলেন রবীন্দ্রনাথ। একজন রবীন্দ্রনাথই কিন্তু ছবি আঁকেন, কবিতা লেখেন, গান লেখেন, ছোটগল্প লেখেন। কিন্তু কালের যে শিল্প বিবেচনা সেখান থেকে তিনি বলছেন- এটা ছোটগল্প এটা অমুক-তমুক। কিন্তু সব মাধ্যমে তিনি কথা কিন্তু একটাই বলছেন।

হাসান শাহরিয়ার
তাহলে আপনার লেখাকে আপনি নাটক বলছেন না কেন? আপনার তো ইচ্ছাই যে এগুলো দৃশ্যকাব্য হোক।

সেলিম আল দীন
নাটক একেবারে বলি নি, তা কিন্তু না। তবে আমি বলছি এই বিশেষ লেখাটার পুরোটাই গাওয়া যেতে পারে আবার কবিতা আকারেও সাজানো যেতে পারে। আমি ‘কথানাট্য’ নাম দিয়েছি, যেমন চাকা- পুরোটাই নাটক, সেটা কবিতার আকারেও সাজানো যায়- আবার তা গীত হতে পারে। কিন্তু বলতে চেয়েছি যা, তা আসলো কিনা সেটাই বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত।

বিপ্লব বালা
স্বর্ণবোয়াল- কে আপনি উপন্যাস বলছেন কেন?

সেলিম আল দীন
আমি বলি নি। উপন্যাস বলেছে পত্রিকাওয়ালারা। ওরা কী না বলে? এ্যাবসার্ড ড্রামা যেটাকে বলা হয়, সেটা কি যে লিখেছে সে বলছে? না, ঐ পত্রিকাওয়ালারা বলছে। যেমন ‘অঙ্কিয়া’ নাটক বলে যে তোমরা ইউনিভার্সিটিতে পড়াও, আসামে অঙ্কিয়া বলে কোনো নাটকই নাই। এ নিয়ে অরুণ সেনের মাধ্যমে আমার সঙ্গে আসামের বিশিষ্ট কবি হীরেন্দ্রনাথের সঙ্গে কথা হয়েছে। তো দেখ শঙ্কর দেবের নাটককে অঙ্কিয়া বলা হচ্ছে অথচ তিনি নিজেও কোথাও এটাকে অঙ্কিয়া বলেন নি। অঙ্কিয়া বলা হয়েছে শংকর দেবের মৃত্যুর ২০ বছর পর। অথচ অঙ্কিয়া কিন্তু বিশুদ্ধ বাংলা পাঁচালীÑ যেখানে সংলাপ আছে, নাচ-গান আছে। গান দিয়ে শুরু হয়ে গান দিয়ে শেষ হয়।

সোহেল হাসান গালিব
স্বর্ণবোয়াল বেশ কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়েছে। আপনার শিল্পিসত্তা বা আত্মজৈবনিকতার সাথে স্বর্ণবোয়াল-র কোনো যোগসূত্র আছে? বা সম্পর্কটা আসলে কী ধরনের?

সেলিম আল দীন
লেখকের যে-কোনো প্রিয় লেখাটা তার আত্মজৈবনিক তো বটেই। মানে, সেটা পৃথিবীর যে-কারো সম্পর্কে বলা চলে। শেক্সপীয়ার, গ্যেটে ও টলস্টয়ের বহু লেখাই বহুক্ষেত্রে আত্মজৈবনিক। লেখককে মরমে-মিশে গিয়ে বা নিজের উপলব্ধিটাকে বা নিজের জীবনটাকে নানা ধাঁচে ঢেলে নানা চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে হয়। রবীন্দ্রনাথ সেটা সঙ্গীতে প্রকাশ করেন। স্বর্ণবোয়াল’র কথা বললে তো, সেক্ষেত্রে আমার বহু লেখাই আত্মজৈবনিক। যেমন, চাকা, হরগজ, স্বর্ণবোয়াল। একটা প্রচণ্ড ট্র্যাজেডিবোধ তো আছেই আমার- সেটাই ঘুরে-ফিরে আসে হরগজ, চাকা, যৈবতী কন্যার মন কিংবা স্বর্ণবোয়াল-এ, এর মধ্যে স্বর্ণবোয়াল একটু Different, তা এই অর্থে যে, Western জয়-পরাজয়ের কনসেপ্টের যে জায়গাটা, সেখানে এ নাট্যে আমি প্রাচ্যকে প্রতিষ্ঠা করেছি। আমি মনে রেখেছি যে, মেলভিলের লেখা The White Whale-তে বিশাল মাছ শিকারের গল্প বা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো মহান লেখক বিশেষ করে তাঁর The Old Man and The Sea-এর মতো লেখা পৃথিবীতে থাকার পরও আমি কেন স্বর্ণবোয়াল লিখেছি। আমার মনে হয় যে, তাদের লেখাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই তাদের থেকে ভিন্ন মত পোষণ করি জীবনের নান্দনিক ও দার্শনিক ক্ষেত্রে। কাজেই মাছের গল্প হলেই যেমন একটা মাছ থাকে না, তেমনি স্বর্ণবোয়াল’র গল্প একটি মাছের গল্প মাত্র নয়।  

হাসান শাহরিয়ার
ওয়েস্ট থেকে কীভাবে ভিন্ন এটা যদি একটু বলতেন ...

সেলিম আল দীন
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখায় মানুষের সাকসেস এবং ফেইলিওর দুটোই এসেছে প্রচণ্ড মানবিক প্রণোদনায়। সেটা পাশ্চাত্য দর্শন সম্ভূত। আমার এখানে সাকসেসই সবকিছু নয়। আমার এখানে স্বর্ণবোয়ালটা ধরা যায় না। এর সঙ্গে ওদের জীবন-জীবিকার চিত্র তো আছেই এবং মাছের সাথে বিরল লড়াইয়ের কথাও আছে। হেমিংওয়ের গল্পে আছে কয়েকদিনের, আমার এখানে আছে একদিন একরাত্রির। কিন্তু কতটা ভিন্ন যে, বাবা মারা গেছে, বাবার শিয়রে এসে বলছে যে- বাবা তোমার বড়শিটা ঠিক আছে, সুতাও ছিঁড়ে নি, তবে বোয়াল মাছটা আমি তুলতে পারি নি। ... এটা কিন্তু মৃত বাবাকে শোনাচ্ছে। অর্থাৎ ইতিহাস এবং প্রেরণাটা ঠিকই রয়ে গেছে, কিন্তু সফলতা আসে নি। আমি মনে করি সাকসেসটা সবকিছু না।

বিপ্লব বালা
আমাদের পোষ্য বা পালিত এমন আরো অনেক কিছু নিয়েও তো আপনি লিখেছেন।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, আমি দেখলাম আমাদের সাহিত্যে পশু-পাখি নিয়ে কোনো কিছু নাই। কেরামতমঙ্গল-এ একটা ষাঁড়ের গল্প আছে, যেখানে মানুষের সাম্প্রদায়িকতার পাপের বিরুদ্ধে যেনবা একটা ষাঁড় বিদ্রোহ করে বসে। ষাঁড় তো ওখানে সত্যের সিম্বল। হাজার হাজার বছর ধরে সে মানুষের পরিশ্রমের সঙ্গী। মানুষের শ্রমকে লাঘব করার সঙ্গী, কোনো দেবদূত নয়, একটা চারপায়ী পশু, সহস্র সহস্র বছর ধরে ঘাম, রক্ত ঝরিয়েছে, হাড্ডি, শিং দিয়েছে, মাংস, দুধ দিয়েছে ... অথচ একটা গল্পও তাদেরকে নিয়ে নাই। তাই আমি ধাবমান রচনা করলাম। ওটা সোহরাব নামে এক মোষ- সেই মোষের গল্প। আমি অদ্ভুতভাবে লিখলাম, একটা জায়গায় আছে মোষের মা হামেলা পাহাড়ী গয়াল দ্বারা গর্ভবতী হয়েছে। সুতরাং গারোরা ভাবছে যে, বাঙালিদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের যে বোঝাপড়া সেটা সমাধানের জন্য সোহরাবের আগমন ঘটেছে, যাকে তারা পূজা করে। যখন মোষটাকে লিল্লাহর মোষ হিসেবে কসাইরা জবাই করতে এসেছে, তখন মোষটা বিদ্রোহ করলো। বিদ্রোহ করে পালাতে শুরু করলো, কয়েকটা মানুষ মেরে ফেললো। নদী পার হলো সীমান্ত অতিক্রম করার সাথে সাথে বি.এস.এফ গুলি করে, একটা গুলি লেগে গেছে, শেষ পর্যন্ত ব্যাক করেছে রক্ত ঝরিয়ে। মোষটা শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পন করে। আমি শেষে বৌদ্ধের বাণী দিয়ে ধাবমান শেষ করেছি। কাজেই আমি আবারো বলছি, লেখা তো লেখাই, সেটার আবার নাটকত্ব কী, কাব্যত্ব কী বা উপন্যাসত্ব কী?

সোহেল হাসান গালিব
তাহলে আপনার শেষ লেখাটায় আপনিই কি আপনার কথার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন না?

সেলিম আল দীন
কী রকম?

সোহেল হাসান গালিব
আপনি ঊষা উৎসব ও স্বপ্নরমণীগণ-এর নাম দিচ্ছেন ‘গীতিনৃত্যনাট্য’, তখন তো আপনি একটা আঙ্গিককেই হাইলাইট করছেন।

সেলিম আল দীন
সেটা করছি এজন্য যে, এই মাধ্যমটি মৃত। আমি চিন্তা করে দেখলাম, মঞ্চে কেবল নক্সী কাঁথার মাঠ বা মাছ ধরাধরির পলো নিয়ে কতগুলো লাফ-ঝাঁপ হয়। আর নৃত্যনাট্য যদি করতেই হয়, তাহলে ঐ ৪-৫টা - শ্যামা, চণ্ডালিকা, চিত্রাঙ্গদা ইত্যাদি। তাহলে আমাদের কালের, আমাদের দেশের হয়ে উঠছে না নৃত্যনাট্যটা। অথচ রবীন্দ্রনাথ অপেরা এবং ব্যালে থেকে পৃথক করে আলাদা একটা ফর্ম করলেন, নৃত্যনাট্য, সেটা হারিয়ে যাবে? আমি এই লেখাটায় নাট্যকার কবি এবং উপন্যাসিকদের চ্যালেঞ্জ করলাম যে, ইউ শুড গো, ইউ শুড ফলো দিস লাইন- এই রাস্তায় তোমাদের আসা উচিত। গান ছাড়া কি উপন্যাস হয়? যে গান জানে না, সে কি উপন্যাস লিখতে পারবে? আর লিখলেও সেটা ভালো হবে? চিত্রকলার সঙ্গে যার পরিচয় নাই সে কী করে নাটক লিখবে বা কবিতা লিখবে? তুমি কি মনে কর একজন অভিনেতা কেবল অভিনয় জানলেই অভিনেতা হতে পারে? না, তাকে চিত্রকলা জানতে হবে, কবিতা জানতে হবে। এবং এটাতো পৃথিবীর ইতিহাসেই আছে, যারা যত মহান, তাদের পড়াশোনার রেঞ্জ কত বিচিত্র! এসব কিছু মিলিয়েই আমার মনে হয়েছে, বিষয়গত দৈন্য যেখানে বাংলা সাহিত্যে আছে, সেই জায়গাগুলোয় যাওয়া উচিত।

হাসান শাহরিয়ার
সে-জন্যই একটা বিষয় আপনাকে বারবার বলছি যে, আপনার রচনা আমাদের কাছে নাটক মনে হয় না, কিন্তু তাতে কী আসে যায়? আপনার মনে পড়তে পারে, আমি নিমজ্জন পড়ে এতটাই অভিভূত হয়েছিলাম যে, আপনাকে টেলিফোনে বলেছিলাম- এটা নাটক না, নাটকোত্তর কিছু। অর্থাৎ এটা একটা উঁচুমানের সাহিত্যকর্ম হয়েছে। উপন্যাস না বলুন ক্ষতি নাই, কবিতা না বলুন ক্ষতি নাই। কিন্তু সেটাকে নাটক বলবেন সেখানে আবার আমার আপত্তি আছে। এটা একটা বড় সাহিত্য হয়েছে, সেটাই আমার কাছে মহান প্রাপ্তি বলে মনে হয়। আপনার মত কী?

সেলিম আল দীন
অবশ্যই, নাটক না বললে আমারও কিছু যায় আসে না। আমি কিন্তু নাসির উদ্দীন ইউসুফকে বলেছি এবং আরো অনেককেই বলেছি যে, শাহরিয়ার যে একজন যথার্থ সম্পাদক- পাঠক, সেটাও বোঝা গেল তার এই নিমজ্জন পাঠের প্রতিক্রিয়ায়। এবং তার শিল্পবোধও অনেক প্রগাঢ়। একজন লেখকের লেখা কী হয়ে উঠলো সেটা বিচার্য নয়, কতদূর হয়ে উঠলো সেটাই বিচার্য। এই জন্য ‘কালি ও কলম’-এ অরুণ সেন লিখলেন, সেলিমের লেখাগুলোকে আজকাল নাটক নামে সনাক্ত করা কঠিন হয়ে গেছে। তুমি যদি সোমদেবের কথাসরিৎসাগর পড় তাহলে দেখবে যে, সেটা বলার জন্য লেখা হয়েছে, ‘কথানাট্য’ বলার জন্য লেখা হয়েছে। আমিও তো বলছি, এটা পাঠ কর। কথাকবি যেভাবে আবৃত্তি করতো, মানে পুরাণ কথা আবৃত্তি করতো, একালের গল্পগুলো ঐভাবে আবৃত্তিযোগ্য করে যদি পড়, তাহলে একজন লোক দিয়েই চাকা, হরগজ করা সম্ভব। এবং আমি ভাগ্যবান যে- কথানাট্য ধারাটা মঞ্চকুসুম শিমূল ইউসুফ আর রাইসুল ইসলাম আসাদ- জামিলের নির্দেশনায় বাঙলা মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।

বিপ্লব বালা
কিন্তু বাচ্চু ভাই তো সেদিকে যাচ্ছেন না। তিনি কিন্তু একটা নির্দিষ্ট ফরমেটেই প্রেজেন্ট করছেন নাটকগুলো।

সেলিম আল দীন
না, আমার মনে হয় নাসির উদ্দীন ইউসুফ সেটা ভেঙেছে। যেমন- বনপাংশুল-এ আমরা দেখছি যে, ক্যারেক্টার বেইজড ফর্ম। আবার প্রাচ্য-এ এসে দেখছি যে, ক্যারেক্টরকে ডিএ্যাক্টারাইজড করা হয়েছে। ডিএ্যাক্টারাইজড মানে এ্যাক্টরকে ক্যারেক্টরের সঙ্গে যুক্ত করে তাকে আবার ক্যারেক্টর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। যেমন, প্রাচ্য-এ শিমূল কোন চরিত্রটি করেছে সেটা আমি বলতেই পারবো না। কারণ, ও গান গেয়েছে, কথা বলেছে, অভিনয় করেছে ইত্যাদি। ইউসুফের হাতে বাঙলা নাটকের নতুন একটা গ্রামার তৈরি হচ্ছে, সেটা হচ্ছে যে, অভিনেতার ডিএ্যাক্টারাইজড হয়ে যাওয়া। এ ধারায় একজন অভিনেতা হ্যামলেট করতে পারে আবার ওফেলিয়াও করতে পারে।

বিপ্লব বালা
সেটাতো তাহলে কথকের জায়গাতেই থাকলো।

সেলিম আল দীন
যেখানেই থাকুক কিন্তু ঘটনাটা প্রাচ্য-তে ঘটে গেছে।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু আপনি যে ডিএ্যাক্টাইজেশনের কথা বলছেন, সেটা তো নতুন না। এগুলো আমাদের নিজস্ব ফর্মগুলোর মধ্যেই আছে।  

সেলিম আল দীন
সবই আছে, কিন্তু আমি আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছি, ইউসুফ দেখেছে।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। নিমজ্জন-এ আপনি বাংলা ভাষার প্রচলিত যতি চিহ্নের মধ্যে কেবল দাড়ি (। ), হাইফেন (-) এবং কোলন (: ) ব্যবহার করেছেন। আর সব জায়গায় আপনি তারকা চিহ্ন ব্যবহার করেছেন। সেটা কেন?

সেলিম আল দীন
খুবই ভালো প্রশ্ন। আমি মনে করি বিদ্যাসাগর যে কলোনিয়াল শৃঙ্খলগুলো বাংলা গদ্যে করে গেছেন, সেগুলো বাঙালিমাত্রই উচিত এই মুহূর্তে বর্জন করা। উচিত এই জন্য যে- বাংলা ভাষার যে রীতি এবং প্রকৃতি তাতে যতি, অর্ধযতি, পূর্ণযতিই যথেষ্ট। পৃথিবীর কোনো দেশেই এরকম লঙ্কাকাণ্ড ঘটে নি- দাড়ি, কমা, সেমিকোলন, হাইফেন, ড্যাস, প্রশ্নবোধক এসব দিয়ে ভরা। আমি পড়তে গেলেই তো বুঝবো এখানে কী বলা হয়েছে, এত চিহ্নের প্রয়োজন কী? তুমি দেখ একসময় চণ্ডীমঙ্গলের পুঁথি আর কবিরাজী শাস্ত্রের আকৃতি কিন্তু একই রকম ছিল। কিন্তু মুদ্রণযন্ত্রের আগমনের ফলে এখন কবিতা হয়ে গেছে লম্বাটে। এখন লম্বা কিছু দেখলেই বুঝি এটা কবিতা। আগে পড়ে বুঝতে হত এটা কবিতা না কবিরারাজী শাস্ত্র। মানে, দেখ, যান্ত্রিকতা কীভাবে কবিতাকে ধ্বংস করেছে, কবিতার অবয়বকে ধ্বংস করেছে। বাংলা ভাষায় সেমিকোলনের ব্যবহার কেন হয়, আমি বহুবার চেষ্টা করেছি সেটা উদ্ধার করার জন্য। পারি নি। রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেও বুঝতে চেষ্টা করেছি, পারি নি। কমা (,) কেন ব্যবহার করে?

বিপ্লব বাল্
কথা বলার সময়ও তো আমরা নানা ধরনের পজ দিয়ে থাকি। এগুলোতো তাই, তাই না?

সোহেল হাসান গালিব
আপনি তো প্রশ্নবোধক চিহ্নও ব্যবহার করেন নি। কিন্তু এটার তো প্রয়োজন আছে।

সেলিম আল দীন
না, নাই। লেখাটা পড়লেই তো বোঝা যাবে এখানে প্রশ্ন করা হয়েছে কী হয় নি। সব বোধ তো আমি চিহ্ন দিয়ে সারবো না। পাঠের মাধ্যমে সারতে হবে। এখন যদি লিখি- ‘সে শান্ত হয়ে বসে রইলো’- তারপর শান্ত হওয়ার চিহ্ন কী দেব? বা ‘সে রেগে গেল’- এই রেগে যাওয়ার চিহ্ন কী দেব? ‘সে অট্টহাস্য করিল’- এই অট্টহাস্যের চিহ্ন কী দেব?

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু আপনি যা ব্যবহার করেছেন, সেগুলো কেন করেছেন?

সেলিম আল দীন
আমি কেবল দাড়ি, হাইফেন আর কোলন ব্যবহার করেছি। পূর্ণযতি হলো হাইফেন, অর্ধযতি হলো দাড়ি আর সংলাপ বোঝাবার জন্য দিয়েছি কোলন- ব্যস। আমার ওতেই হয়ে গেল।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু এই নিরীক্ষা আপনি আপনার সব কাজে করেন নি। আমার কাছে মনে হয়েছে একটা বিশেষ সাহিত্য পড়বার জন্য পাঠককে আপনি আগে থেকেই একটু প্রস্তুত করে নিয়েছেন, যেন পড়তে গিয়ে সাধারণ বাস্তবতা বা গতানুগতিক ধারা খুঁজতে না যায়।

সেলিম আল দীন
সেটা তো অবশ্যই। আমি নিমজ্জন-কে বলছি- ‘বিশ্ব শিল্পধারায় ফোররিয়ালিজমের প্রথম উদ্ভাবন’- তো সেটা পড়বার আগে পাঠককে তো তৈরি হতেই হবে।

হাসান শাহরিয়ার
তারকা চিহ্ন কেন ব্যবহার করেছেন?

সেলিম আল দীন
আমি আমার ঐতিহ্য থেকে নিয়েছি। বাঙলার মুসলমানরা তাঁদের কাব্যে, বিশেষ করে উনিশ শতকের পুঁথি সাহিত্যে সব সময় তারকা চিহ্ন ব্যবহার করতো অর্ধযতি দেবার জন্য। এটা আমার পূর্ব পুরুষরা ব্যবহার করেছেন। মহররমের পুঁথি থেকে এটা নিয়েছি- কেন নেব না?

হাসান শাহরিয়ার
আমার যদ্দুর মনে পড়ে চাকা-তেও স্টার চিহ্ন ব্যবহার করেছেন, যদিও খুব কম।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, প্রথম ব্যবহার করি চাকা-তে। আমি মৃত্যুটাকে একটা মহাজাগতিক জায়গায় নিতে চেয়েছিলাম। মানে বিশাল এক প্রান্তরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে লোকটির শব- মনে হচ্ছে একটা চিত্রকলা যাচ্ছে। আর অন্য কোথাও যে ব্যবহার করি নি, সেটা হলো, আমি বলছি না যে, স্টার চিহ্ন ব্যবহার করতেই হবে। আমি বিশেষ সময়ে বাঙালিদের দ্বারাই উদ্ভাবিত একটি চিহ্ন ব্যবহার করে তাদেরকে সম্মান জানালাম এবং ঔপনিবেশিক বল্গা বাঁধন থেকে মুক্ত হলাম।

বিপ্লব বালা
আমি শুরুর দিকের একটা প্রসঙ্গ আবার তুলতে চাই। আপনার লেখার যে বাঁক একটা সময় আপনি পেলেন, এবং আপনি বলছেন আপনি বাঙলা নাটককে মুক্তি দিতে চেয়েছেন, সেটা আমার ধারণা কেবল বই পড়ে পড়ে হয় নি। আপনার নিজস্ব নাট্য-আঙ্গিকের ধারণা বা এর প্রয়োগ, ইত্যাদি ব্যাপারে কোনো জনপদের কোনো কিছু দেখে গ্রহণ করেন নি বলতে চাচ্ছেন?

সেলিম আল দীন
না, এমনটা বলে থাকলে আমি ভুল বলেছি। মানে আমি একেবারে শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে তেমনভাবে সরাসরি কিছু পাই নি বলেছি। কিন্তু আমি যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে ঢুকলাম, এবং তখনই আমি বিয়েও করলাম, এই বিয়ের সুবাদে আমার মানিকগঞ্জ এলাকার সাথে পরিচয় হলো। এই অঞ্চলে বিচরণের ফলে আমার শিল্পভূমির এক নতুন সন্ধান যেন আমি পেলাম।

বিপ্লব বালা
এর আগে আপনি এই এলাকায় আসেন নি?

সেলিম আল দীন
না। আমি এখানে প্রাকৃতিক কিছু সৌন্দর্য আবিষ্কার করলাম। ধরো, আমি যখন ঘিওর পেরোলাম, প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার দিগন্ত জোড়া কেবল সর্ষেফুলের ক্ষেত দেখলাম। মনে হলোরঙের ঘোড়া দৌড়াচ্ছে। শীতকাল, কিছু কিছু মৌমাছি উড়ছে শর্ষে ফুলে ফুলে এবং মটর লতায়, দুপুরের আগে আগে, আমি হেঁটে চলেছি তো চলেছিই। একটা জামগাছ ছিল তার নিচে বসে বিশ্রাম নিতে গিয়ে যখন চারিদিকে তাকাতাম, দেখতাম, প্রায় ৩-৪ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বসতবাড়ি নাই, কেবল রঙ আর রঙ। আমি কোনো একদিনের ঘটনা বলছি না। সেই দিনগুলোর কথা বলছি। ... কোনোদিন হয়তো বিস্তীর্ণ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি, হঠাৎ একঝাঁক শীতচর পাখি উড়ে গেল- আর ওড়ার দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় কাঁচের ভেতর রশ্মি যেমন ঢেউ খেলে যায়, তাদের উপর রৌদ্র পড়েও তেমনি ঢেউ খেলে যাচ্ছে। আমি ওই অঞ্চলের যে বাড়িতেই যাচ্ছি, সেই বাড়িতেই হয় একটা ঢোল পাচ্ছি, না হয় বাঁশি পাচ্ছি, না হয় খোল পাচ্ছি। কেউ না কেউ গান বা শাস্ত্র পাঠ করছে। লোকায়ত যে ব্যাপারটা তার সন্ধান আমি এই প্রথম পাওয়া শুরু করলাম।

বিপ্লব বালা
আপনার নিজের বাড়িতে এগুলো কখনো পান নি?

সেলিম আল দীন
না, নোয়াখালিতে আমি কেবল গাজীর গান শুনেছি। আমি যখন দূর্গা পুজায় শশুর বাড়ি যেতাম, যে ক’টা দিন থাকতাম মনে হতো এক অপার শিল্পভুবনে দিন কাটাচ্ছি। সে গাঁয়ে কেবল গান বাজনাই না, শাশুড়ির হাতের নানা রকম পিঠা খাওয়া, নানা চালের গন্ধ পাওয়া, মাইলের পর মাইল হাঁটা, নানা রকম মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগটা এলো। নায়েব আলী বয়াতীর সাথে পরিচিত হওয়া, তারপর জামসা অঞ্চলে হাকিম আলী গায়েনের মতো মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে এই ভ্রমণের কারণে। কালীগঙ্গায় জামসা যাওয়ার আগে, মানে আফসারদের (প্রফেসর আফসার আহমেদ, নাট্যকার, নাট্য-শিক্ষক ও গবেষক) বাড়িতে যাবার কারণেই হাকিম আলী গায়েনের সাথে পরিচয় ঘটে। তাঁর কাজ দেখে আমার মনে হলো আমরা যাকে থিয়েটার বলি, সে ক্ষেত্রে এটা কেন থিয়েটার নয়? এখানে কথকতা আছে-অভিনয় আছে-নৃত্য আছে- দোহার এবং গান আছে, তারপরও এটাকে রিচ্যুয়ালের কথা বলে, আমরা এটাকে নাটক না বলে অন্য কিছু বলছি। তখন আমি এক অফুরন্ত ধারণার সন্ধান পেলাম যে, না, এটাই আমাদের থিয়েটার। আমি কেরামতমঙ্গল লেখার সময়, আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমাদের গ্রাম থিয়েটারের এক কর্মী, আর্মিতে চাকরি করতো- আর্টিলারীতে, তার নাম আমিনু রহমান মানিক। তো আর্টিলারীতে যারা কাজ করে তাদের আবার আকাশের তারার হিসাব রাখতে হয়, তো কেরামতমঙ্গল-এ আমি প্রথম থেকেই চেয়েছিলাম যে, চণ্ডীমঙ্গলে যেমন সর্গ এবং মর্তের বিভাজন থাকে, আমার নাটকেও থাকবে। যেকোনো মঙ্গলকাব্যেরই একটা পার্ট থাকে সর্গের, একটা পার্ট থাকে মর্ত্যরে। তো আমি ভাবলাম এখানে তো দেব-দেবী নাই, কিন্তু সেই ফর্মটাতো আসতে পারে। সেজন্যই আমি কেরামতের সঙ্গী হিসেবে এনেছি কালপুরুষকে। সে তার সব অভাব, অভিযোগ, অনুযোগ কালপুরুষকে জানায়। এই তারাগুলোকে চিহ্নিত করার ব্যাপারে আমি, ঐ কর্মী, আমরা সবাই রাত ২-৩ টা পর্যন্ত জেগে জেগে তারার সন্ধান করেছি।   

বিপ্লব বালা
তাহলে এই স্বর্গ-মর্ত্যরে বিভাজনটা চণ্ডীমঙ্গল থেকে পেয়েছেন?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, ‘মঙ্গল’ নামটাই তো এই জন্য দিলাম। আর যেকোনো ‘মঙ্গল’ মানেই কিন্তু পাঁচালী। মানে কোনো কিছুর সাথে যদি ‘মঙ্গল’ যুক্ত হয়, তাহলে বুঝতে হবে এটা পাঁচালী রীতির। অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে নাটক লেখার শুরুটাই আমি বলবো, এই মানিকগঞ্জের সাথে পরিচিত হওয়ার পর বি¯তৃত আকারে তৈরি হয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
চাকা নাটকটিকে নাম দিয়েছেন, ‘কথানাট্য’। এধরনের রচনা মঞ্চে উপস্থাপিত হতে পারে, এমনটা ভাবনাটা আসলো কীভাবে?

সেলিম আল দীন
চাকা-র ভাবনা আর এটার রচনাকালের মধ্যে ব্যবধান কিন্তু প্রায় ৭-৮ বছর। ’৮০-’৮১ সালে গ্রাম থিয়েটারের কাজে যাচ্ছিলাম বগুড়া থেকে পাবনা- সাথে ছিল পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। নাটোরের কাছাকাছি এসে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, দূরে বহুদূরে একটা অর্ধবৃত্তাকার রাস্তা- সেখানে অনেকগুলো গরুগাড়ি সার বেঁধে চলছে। দূর থেকে দেখে ভাবলাম এমন একটা চিত্র আমার মঞ্চে কেন আনা সম্ভব হবে না? পরে আর এটা নিয়ে ভাবি নি- কিন্তু ৭-৮ বছর পর, যখন নাটক লেখায় নিয়তই পরিবর্তন করছি ভাষা-আঙ্গিকÑ তখন লিখতে গিয়ে মনে হলো আমি আমার মতো করে লিখবো। যে যে চিত্র আমার মনে ভাসেÑ সেই চিত্র নিয়েই লিখবো। পরে এটা মঞ্চে আসবে কী আসবে না দেখা যাবে। এটা না হলে আমি আরো পরে যে লিখলাম হরগজ, সেটা কী? মানিকগঞ্জে যে টর্ণেডোটা হয়েছিল, সেখানে যখন আমি গেলাম, আমি যে ভয়াবহ চিত্র দেখেছি, সেগুলো মনে হয়েছে আমাদের মঞ্চে আনা যায়। আমি লিখলাম হরগজ। আমার কাছে সব সময় মনে হয়েছে বাংলা কবিতার চেয়ে নাটকের যে দীনতা, উপন্যাসের চেয়ে নাটকের যে সীমাবদ্ধতা সেটাকে ঘোচাতে হবে। সেটা ঘোচাতে যদি যাই তাহলে আমাকে নতুন ভূমি, নতুন মানুষ, নতুন শিল্প দর্শন আবিষ্কার করতে হবে। এই ভূমি আবিষ্কার করতে গিয়ে আমার কাছে প্রচলিত কাঠামোগুলোকে কঠোরভাবে বর্জন করতে হয়েছে। ফলে আমার লেখা পড়ে হুট করে নাটক মনে হয় না। কিন্তু এটাও তো সত্য যে, মূলত আমি নাটকই লিখতে চেয়েছি। আমার ভাষা নিয়ে কষ্ট করতে হয়েছে। আমি কিছুকেই কিন্তু অস্বীকার করি নি। আগে গ্রহণ করেছি, তারপর বর্জন করেছি, করে নিজের মতো করে ফর্ম বানিয়েছি। যে রূপে আমি পেয়েছি, সেই রূপে আমি রাখি নি। রূপ থেকে অরূপে যাওয়াটা কিন্তু প্রাচ্যেরই দর্শন। সব শিল্পীই সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে অন্য রূপ প্রদান করতে চায়। চেখভের অনেক ছোটগল্প আছে যেগুলো পড়ে আমার কাছে মহাকাব্যের স্বাদ পেয়েছি। তো তখন সেটা ছোটগল্প নাকি মহাকাব্য নাকি নাটক সেটা ভাবার সুযোগ কোথায়? এটা আমার ভেতরে যে ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে, বোধের জন্য সেটাই তো জরুরি তাই না?

হাসান শাহরিয়ার
আপনি নাটককে চেয়েছিলেন একটা উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে, এবং নিতে গিয়ে, লিখতে গিয়ে যেখানে এসে পৌঁছলেন, সেটা আপাত দৃষ্টিতে একটা ফর্মলেস জায়গায় দাঁড়ালো। মানে আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ রইলো না ...

সেলিম আল দীন
এভাবে হুট করে আমার শিল্পরীতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হলো কি? প্রশ্ন না করে তুমি বোধহয় আক্রমণ করছো।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি যেটাকে আক্রমণ বলছেন, সেটা আসলে আমার প্রশ্ন হাঃ হাঃ ... মানে আমি বলতে চাচ্ছি, এভাবে ছাড়া আপনি আপনাকে, আপনার শিল্প দর্শনকে ব্যক্ত করতে পারছিলেন না, ফলে ফর্মের চেয়ে জরুরি ছিল শিল্প দর্শনকে ব্যক্ত করার তাগিদ ...

সেলিম আল দীন
একেবারে সঠিক জায়গায় হাত দিয়েছ তুমি। প্রত্যেকেরই উচিত লেখার শুরুতে ভুলে যাওয়া যে সে গান লিখছে, নাকি কবিতা লিখছে, নাকি গল্প লিখছে এবং বিশেষ ফর্মের চূড়ান্তে ঐ ফর্মটা আর অটল থাকে না।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে পারি কিনা, মানে আপনার লেখার ভাষার ব্যাপারে বিপ্লব দা’র সাথে আলাপ হচ্ছিল যে, আপনার ব্যবহৃত ভাষাটা যখন পড়ি, তখন বেশ কষ্ট লাগে। তবুও পড়ার সময় যেখানে বোঝা যায় না, সেখানে আমি বা আমরা আবার পাতা উল্টিয়ে চলে আসতে পারি। কিন্তু এই ভাষাটা যখন সংলাপাকারে মঞ্চে শুনছি, তখন আরো দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে। কারণটা হলো তখন তো আর আমার সুযোগ নাই যে সংলাপটা আবার একটু শুনি, দ্বিতীয়ত হলো যারা এই সংলাপ প্রক্ষেপণ করছে, তাদের মধ্যে হয়তোবা কম-জনই আছেন, যারা আপনার এই নতুন ভাষা রপ্ত করতে পারঙ্গম। এখন কথা হচ্ছে, আমাদেরকে ঐতিহ্যের দিকে নিতে গিয়ে ভাষাটাকে এত জটিল করার অর্থ কী?

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, এ-প্রসঙ্গে আমার কথাটাও বলে নিতে চাই, সেটা হলো, মঙ্গলকাব্য বা গীতিকা, তার যে ভাষা, শব্দ, বর্ণনা তার থেকে আপনার ভাষা আধুনিক হওয়ার ফলেই কিনা বেশ দূরের ভাষা হিসেবে ঠেকে, মানে আমাদের সংযোগ স্থাপনে বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

সেলিম আল দীন
এটাও উপনিবেশের সৃষ্টি। ইংরেজি ভালো বুঝি- বাংলাটা কম। এই তো। প্রথমত তুমি দেখ, আঞ্চলিক ভাষাকে যখন লালনের ভাষার সুক্ষ্মতায় নিয়ে যাচ্ছে, তখন তোমার মন, কান সব কিছুই প্রাত্যহিকতার ঊর্ধে উঠে যেতে হবে। এটা মনে রাখবে বাংলার আঞ্চলিক ভাষার ভেতরে যে গীতল ব্যাপারটা আছে সেটার সাথেও তোমার একাত্মতা না ঘটতে পারে, যদি তুমি সেই ভাষাটা না জান। আমি আধুনিক লেখক হিসেবে, লক্ষ্য করলে দেখবে যে, আমার প্রবন্ধ বলো, নাটক বলো, বা কবিতা বলো যেকোনো লেখাতেই, লিখতে লিখতে হয়তো চর্যাপদ থেকে, আলাওল থেকে, মুকুন্দরাম থেকে বা ভারতচন্দ্র থেকে ভাষা শব্দ আহরণ করি, মানে আমি সমগ্র ঐতিহ্যের কাছ থেকে নিয়ে যে ভাষাটা তৈরি করতে চাচ্ছি, তাতো কখনোই দৈনন্দিন ভাষা হবে না। আমি বাস্তবতাকে যেভাবে উপস্থাপন করছি, সেটা মোটেই শাদা চোখে দেখা আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা না। তো আমার কন্টেন্টের দিক থেকে বিবেচনা করে আমি এমন একটা ভাষা তৈরি করছি, যেখানে কোনো দৈনন্দিনের ব্যবহৃত ভাষা থাকবে না। কবিতায় যেদিন থেকে দৈনন্দিন ভাষার ব্যবহার শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই কবিতার মৃত্যু হয়েছে। আমার এই ধারণা তোমাদের কাছে ভুল মনে হতে পারে কিন্তু আমি সত্য বলে মানি। আমার লেখা হবে লালনের স্তরের, রবীন্দ্রনাথের কবিতার স্তরের, সেখানে আমি ...

বিপ্লব বালা
কিন্তু লালন, রবীন্দ্রনাথ তো দৈনন্দিন ভাষায় লিখেছে এমন বলবেন না?

সেলিম আল দীন
না।

বিপ্লব বালা
তো তাঁদের ভাষা তো ভীষণ চেনা ভাষা, ভীষণ ইন্টিমেট। কিন্তু আপনার ভাষা বেশ দূরের ভাষা, অচেনা ভাষা, অপরিচিত ভাষা মনে হয়। দুর্বোধ্য মনে হয়। আর সেটা পাঠে না হয় তবুও চলে, কিন্তু যখন শোনা হয় তখন তো একেবারে বিচ্ছিন্ন ঠেকে।

সেলিম আল দীন
দেখ, রবীন্দ্রনাথের রাজা যখন লেখা হলো, ইংল্যান্ডের পত্র-পত্রিকায় এটাকে অবসকিউর বলা হলো। কিন্তু আসলেই কি সেটা দুর্বোধ্য? রাজা দুর্বোধ্য, কিন্তু আসলেই কি দুর্বোধ্য? তখন তুমি কী বলবে? রবীন্দ্রনাথ তো তারপর চিঠি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে রাজা দুর্বোধ্য না। তো তোমাদের মন হচ্ছে উপনিবেশিক ভূত-প্রেত আচ্ছন্ন, তাই যখন আমি আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বাংলা ভাষা ব্যবহার করি, তোমাদের কাছে সেটা দুর্বোধ্য মনে হয়।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, অবশ্যই, কিন্তু আপনি আমাকে হাজার বছরের বাংলা ভাষাকে চেনাতে গিয়ে তো আরো দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। আপনি আসলে আধুনিকতার যে খারাপ দিক- বিচ্ছিন্ন করে দেয়া- সেদিকেই গেছেন।

সেলিম আল দীন
আচ্ছা তুমি আমাকে বলো, যদি শব্দ ব্যবহারের কথাই ধরো, তাহলে রবীন্দ্রনাথ-লালনের ভাষা নিশ্চয়ই সহজ সরল শিল্পের ভাষা?

বিপ্লব বালা
অবশ্যই।

সেলিম আল দীন
মোটেই না। এখন আমাকে বলো তো ক’জন মানুষ রবীন্দ্রনাথের কবিতা বোঝে, লালনকে বোঝে? রবীন্দ্র সংগীত যারা গায় তাদের শতকরা কতজন গানের অর্থ বোঝে? এই না বোঝার কারণটাও আমি বলি, সেটা হলো তাঁদের লেখার মধ্যে যে মহাজাগতিক জায়গাটা ধরার প্রয়াস আছে, তুমি, আমি এই ছা-পোষা উপনিবেশিক মন-মানসিকতার মানুষজন সেই মহাজাগতিকতা কী বা কেমন করে তা অন্তরে প্রবেশ করে, তার কিছুই জানি না। ফলে শাদা-মাটা লেখা পড়তে পড়তে, যখনই মহাজাগতিকে প্রবেশ করবার মতো লেখা হাতের কাছে আসে, সেগুলোকে দুর্বোধ্য মনে হয়। তবে আমি মনে করি, আমি শুরু করেছি, আমার লেখা পাঠে অভ্যস্ত হতে সবারই সময় লাগবে। তবে এক সময়ে আমার লেখার ভেতরে যখন সে প্রবেশ করতে পারবে, আজ না হোক, কয়েক বছর পরেও, তখন বুঝতে পারবে, আমি কেমন করে ঔপনিবেশিক জাল ছিন্ন করে মানুষকে হাজার বছরের ঐতিহ্যের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছি।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছি। স্যারকে আমার একটা প্রশ্ন, আপনি এক সময় আপনার স্বপ্ন হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যতত্ত্ব বিভাগ চালু করলেন। আজ, ২০ বছর পর এসে কী মনে হয়, আপনার স্বপ্নটার বর্তমান অবস্থা কী?

সেলিম আল দীন
আমি আমার শিল্প-অভিজ্ঞতা থেকে, গ্রাম থিয়েটারের অভিজ্ঞতা থেকে একসময় ভাবলাম যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিষয়ের উপর, নাট্যকলার উপর কোনো বিভাগ খোলা যায় কিনা। এটা নিয়ে অনেক সংগ্রাম করেছি। সেগুলো বিপ্লব বালা জানে, শাহরিয়ার তুমিও জান, তুমি তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলে, অনেক সময় উপহাসের পাত্রও হয়েছি। কিন্তু আমার একটা রোখ ছিল। এবং সেই রোখ ধরে রাখতে গিয়ে অনেকের অপ্রিয়ও হতে হয়েছে। যাক, এত বছর পর এসে আমার ভালো লাগে যখন দেখি আমার ছাত্ররা বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছে।

বিপ্লব বালা
বেশিরভাগ কিন্তু মিডিয়াতে কাজ করছে। মঞ্চে আপনার ছাত্রদের অবদান কতটুকু?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, এটা অবশ্য আমাকে পীড়া দেয়। জীবিকার তাগিদে বেশিরভাগই মিডিয়াতে কাজ করছে। তবে বিভিন্ন দলেও কিন্তু আমাদের ছেলে-মেয়েরা আছে। নাগরিকে আছে, ঢাকা থিয়েটারে আছে, নাট্যজনে আছে, আরণ্যকে আছে। অর্থাৎ এখান থেকে পাশ করে নতুন ভাবনা নিয়ে মঞ্চে কাজ না করে তারা অনেকটা প্রচলিত যে থিয়েটার চর্চাটা আমাদের দেশে আছে, সেখানেই যোগ দিচ্ছে।

বিপ্লব বালা
আপনার দল নিয়ে এখন কী ভাবছেন? ঢাকা থিয়েটার, সেই জমজমাট ঢাকা থিয়েটার আর এখনকার ঢাকা থিয়েটার আপনার কাছে কেমন লাগে?

সেলিম আল দীন
জমজমাট কথাটার মানে কী স্পষ্ট নয়। এটা পিটার ব্র“কের হলি থিয়েটারের ধারণা হয়ে গেল না? আসলে আমার ভালো লাগা না লাগা দিয়ে তো কেউ থিয়েটার করবে না। ইতিহাসের ধারায় আমরা দেখতে পাই, সংগঠনভিত্তিক একাত্মতা ২৫ বছরের বেশি টেকে না। এবং যে-কোনো মতবাদ ৫০ বছরের বেশি নয়। তো আমার মনে হয় আমরা যেভাবে শুরু করেছিলাম, একাট্টা হয়ে, একই মন-মানসিকতা নিয়ে, সেটা তো অনেকদিন চললো। এখনো অব্যাহত আছে। অনেকে গেছে, অনেকে আবার এসেছেও।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা এবার শেষ করতে চাই। স্যার একাধিক দিন এত ব্যস্ত সময়েও আপনি আমাদের সময় দিলেন, আমরা ঋদ্ধ হলাম। আপনাকে ধন্যবাদ।

সেলিম আল দীন
তোমাকেও ধন্যবাদ। বিপ্লব বালা আর গালিব তোমাদেরকেও ধন্যবাদ। আর থিয়েটারওয়ালার মাধ্যমে আমি সবাইকে আমার শুভেচ্ছা জানাই।