Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

জগলুলনামা- গতির সীমা

Written by আজাদ আবুল কালাম.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

একটি বাই-সাইকেল ছুটছে- বাসা থেকে স্কুলে, স্কুল থেকে বাসা, বাসা থেকে মেহেদী সংগীত নিকেতন অথবা নজরুল একাডেমী অথবা পথে প্রান্তরে, নাটকের ঘরে ঘরে। শিশু-কিশোর জগলুল ছুটছে।

১৯৭৫    
২৯ জানুয়ারি মধ্যবিত্ত সরকারি কর্মচারি বাবা মাহাবুবুল আলম এবং মমতাময়ী মা রতনা আলমের ঘরে প্রথম সন্তান এলো- জগলুল- আলো করে। কাঁঠালবাগানের ঢালে- কাঠের দোতলা ঘর আনন্দে মেতে ওঠে। নাদুস নুদুস- দূরন্ত সব হাত পা অনেক বেশি বেশি চলে- যার ভেতর সংগীত ছিল পরবর্তী জীবনের ব্যস্ততার- তাড়াহুড়োর-

১৯৮০    
কথাটি ফুটেছে, হাত-পা-জোড়া শক্ত হয়েছে- মা’র সামনে তবলা বায়া আর হারমোনিয়ামের সবক- ‘খর বায়ু বয় মেঘে .. চারিদিক ছায় মেঘে ..’ মা-ই সংগীতের প্রথম শিক্ষক। জগলুল গান পাগল হয়ে যায়-

১৯৮২    
ছেলে যে গানে গানে তালে তালে ভেসে বেড়ায়। লাগাম চাই- স্কুল এবং
বাই-সাইকেল। মা বাবার চোখে পড়ে ছেলের হাত-পা তো কেমন ছোট ছোট- তাৎক্ষণিক অষুধ বাই-সাইকেল। বাই-সাইকেল যাচ্ছে বি.জি প্রেস স্কুলে, মাথার ভেতর চলছে কাহারবা হারমোনিয়ামের রিডে রিডে সারগাম-

১৯৮৮    
মা-অন্ত ছেলে- মা ছেলেকে দেখে। ছেলের শুধু স্কুল, গান শেখা এতে তো হচ্ছে না- সে তো আরো কিছু চায়- বড় বড় চোখে শুধু বিস্ময় আর জানা-দেখার বিপুল আকাক্সক্ষা। মা’র হাত ধরে আরেক মাঠে পদার্পন- বিবর্তন নাট্যদল। প্রথম প্রথম মহলা করে কোনাতে চুপচাপ মা দেখে ছেলের কাণ্ডকারখানা- কয়েকদিনের মধ্যে একাই সে মহড়ায় যায়, নাটকের কর্মী হয়ে যায়-  

১৯৮৯    
বিবর্তনের কাজে যুক্ত হতে হতেই তার অস্থিরতা আর পিপাসা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল এক থিয়েটার ঘর থেকে আরেক ঘরে- চলে এল বালক ঢাকা পদাতিকে। আমাদের কালের এক খ্যাপা এস এম সোলায়মানের সংস্পর্শের মগ্ধতায় পেয়ে বসলো। খ্যাপা নেই এখানে বালকও নেই। আবার বাড়ি বদল। দুই অর্থেই- কাঁঠালবাগন থেকে কারওয়ান বাজার- কারওয়ান বাজার থেকে কাঁঠালবাগান।

১৯৯১    
এস এম সোলায়মান এখন আছেন অন্যদল নাট্যসম্প্রদায়ে- দে ছুট- এবং চোখে পড়ার মতো কিশোরটির অভিনয় বুদ্ধি নাটকে। প্রায় ওয়ান ম্যান শো। তারপর সোলায়মান নেই কিন্তু অন্যদল তো আছে- কাজে নামো- মুদ্রারাক্ষস-এ চাণক্য চরিত্রে উজ্জ্বল অভিনয়- সংগীত, কোরিওগ্রাফি সবকিছুতে সরব উপস্থিতি। কিন্তু সোলায়মান তো নেই- আবার দে ছুট- আবার বাসা বদল-

আর্তনাদ- পরবর্তীতে থিযেটার সেন্টারে ’ও হঠাৎ আবিষ্কার করে- ওর বয়েসীরাও থিয়েটার করে। সম-বয়সীদের সাথে থিয়েটার আর শৈশবের নতুন নতুন বন্ধুরা সদা হাস্যোজ্জ্বল জগলুলকে লুফে নেয় বন্ধুত্বের নিবিড় আহ্বানে। এবং বেশ লম্বা সময় ১৯৯৭ পর্যন্ত। ইতোমধ্যে যুবক বড় হয়ে গেছে- গান- থিয়েটারের বাইরে আরো এক শখ ঢাকার লীগের ফুটবল দেখা- জয় আবাহনী, জয় মোহামেডান।

১৯৯৩    
বিজি প্রেস স্কুল থেকে এসএসসি উত্তীর্ণ-

১৯৯৫    
মিরপুর কলেজ থেকে এইচএসসি- এবং এতদিনে জগলুল তার বয়সের যে কারো থেকে অগ্রগামী- অভিনয় দক্ষতায়- সংগীত চিন্তায় কী সংগীত প্রয়োগে- গান রচনা, সুর সংযোগ- কী বাজানোতে। সামর্থ্য হয়নি তখনো, তারপরও বন্ধুর ধার-করা কী বোর্ড নিয়ে এখানে ওখানে ছোটা স্টুডিওতে যাওয়া- দেড়গুণ বয়সের ‘শিশুদের’ সাথে গলায় গলায় ভাব করে ফেলা- অথচ তখন থিয়েটার সেন্টারের বন্ধুরা যেনো ছোটই রয়ে গেছে।

ইতোমধ্যে বাঙলা থিয়েটারের নাটক আদিম-এ সরাসরি সংগীত নির্দেশক হিসেবে কাজ করে ফেলেছে। ঐ বয়সে সে-কী উদ্ভাবন- শুধু সুর না- যন্ত্র উদ্ভাবন পর্যন্ত- কারো কারো কানে আজো বাজে আদিম-এর থিম অর্কেস্ট্রা। বিজ্ঞাপনের জিংগেল, বিজ্ঞাপন, রেডিও নাটকের প্রথমে আবহসংগীত পরে অভিনয়, নির্দেশনা এমনকি রেকর্ডিং-এর দায়িত্ব পর্যন্ত অবলিলায় পালন করা- সব যেনো করে ফেলতে হবে। তাড়াহুড়ো- গতি- ছুটন্ত ঘোড়া।  বাই-সাইকেলে হয় না- মটর-বাইক মনে ধরে না- ঐ তো গাড়ি ছুটে যায় কল্পনায়- আকাঙ্ক্ষায়। ইতোমধ্যে বাড়ি বদল- স্থায়ী নিবাস- মিরপুরের ইব্রাহিমপুরে।

১৯৯৭    
থিয়েটার সেন্টারের সেই কিশোররা বড় হয়ে বাড়ি ছাড়ে- জগলুল আসে ঢাকা থিয়েটারে। ঢাকা থিয়েটারের তখন যৈবতি কন্যার মন-এর কাল। উহু টেকে না মন। বন্ধুরা তখন প্রাচ্যনাটে- আসে আড্ডা হয়। উহু এখানে নয় অন্য কোথা- ‘থিয়েটার’-এ।

১৯৯৭    
বছরের শেষে থিয়েটারে আসে। আবদুল্লাহ আল মামুন, ফেরদৌসী মজুমদারের দারুণ ভক্ত জগলুল- এই বুঝি থিতু হবার পালা। একের পর এক নাটকে অভিনয়। নানান কায়দার অভিনয়। আনন্দ করতে যেমন পছন্দ, আনন্দ দিতে তেমন পারঙ্গম। অভিনয় ছাড়া নাট্য রচনা- ছয় বেহারার পালকী। প্রথমে রচনার কথা শোনা গেল, তারপর দেখা গেল নির্দেশকও জগলুল। থিয়েটার নাট্যদল হয়ে গেল জগলুলের নাটকের ঘর শেষ দিন পর্যন্ত।

১৯৯৮    
জগলুল নিজের দায়িত্ব নিজেই নিয়ে নিয়েছে- নানান ধরনের কাজের পাশাপাশি খণ্ডকালীন শিক্ষকতাও শুরু করলো স্কলাস্টিকায়। শিক্ষকতা এবং পাশাপাশি স্কলাস্টিকা প্রযোজিত সব নাটকে প্রতাপের সাথে সংগীতের প্রয়োগ পরীক্ষা-

২০০০    
মাঝে পড়াশোনার একটু ছেদ পড়েছিল। প্রায় সবার অগোচরে তেজগাঁ কলেজ থেকে স্নাতকটা শেষ করা গেল।

এসেছে গাড়ি। হুররে- নিজের হাতে স্টিয়ারিং ঢাকার এ-প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে- রাতভর আড্ডা আর সব পছন্দের খাওয়া শেষে বুড়িগঙ্গার তীরে সোনালী সকাল- এসেছে প্রেম- বাহবা- বাহবা-

২০০১    
জুলাই ৩০ নাট্য সহযোদ্ধা মেহেলীর সাথে বিয়ের মাধ্যমে যেনো প্রেমের সার্থকতা। বৌ আর কী বোর্ড না-না যন্ত্রসহ জগলুলের স্বপ্নের গাড়ি গতিরোধ মানে না- মিটারের কাটা ১০০ থেকে ১২০ হয়। আস্তে আস্তে-

২০০৩    
ব্যস্ততার শেষ নেই। দুই হাত এক মাথায় কম নয় সব শেষ করা। একের পর এক কথা ভঙ্গ করা- আবার ফিক করে হেসে দিয়ে অন্যকে নিজের যাদুতে পরাজিত করা- আবার কমিটমেন্ট। টিভি নাটকে সংগীত প্রয়োগ এবং অভিনয়ের জোয়ার লেগে যায়। যেনো দুকূল ছাপিয়ে উচ্ছ্বাস। উচ্ছ্বাস শেষে হঠাৎ থমকে দাঁড়ানো- মা- মাগো- এমন কী বয়স হোল এমন কী ব্যধি- এমন কী অভিমান চলে যেতে হবে- ২১ নভেম্বর ২০০৩ মাতৃবিয়োগ-অকস্মাৎ- ভাই-বোন সব ছোট ছোট- প্রায় যুবক পিতা- শুধু আহাজারী থাকে।

২০০৫    
ছুটছে জগলুল- তার সাথে ছুটছে জগলুলের নাম চারিধারে- কখনো মঞ্চে, কখনো টেলিভিশনে, কখনো লেখায়- কখনো নির্মাণে- কী বোর্ডের ওপর ছুটছে জগলুলের আঙ্গুল- ভীষণ দক্ষ ভীষণ তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনে ভরপুর। ১৯ নভেম্বর ২০০৫ সময় থেমে আছে, চারিদিকে কিছুক্ষণের জন্য নৈঃশব্দ- শরীরে ধরা পড়েছে মরণ ব্যধি ক্যানসার। এবার দে ছুট দে দৌড় কর ঝাপাঝাপি। এবার আর একা নয় স্ত্রী মেহেলী পরিবার বন্ধু স্বজন- দূরের কাছের- সবার মিলিত দৌড়। বাঁচাতে হবে। দেশে হবে না? বিদেশ যাবে। টাকা নেই? টাকা আসবে- সব হোল- এবং সবাই কেমন আশাবাদী হয়ে ওঠে। যাদের ভেতর কিঞ্চিৎ সংশয় তারাও বলে মিরাকল মিরাকল। গাড়ি বদল হয়- আরো গতির- আরো উন্নত।

২০০৭    
ঢিলে তালে কাজ চলছে- জগলুল প্রস্তুত হচ্ছে আরেক রেসের। চেহারায় ফিরে আসছে আগের দ্যুতি। দ্যুতি চমকায় হঠাৎ থেমে যায়। বাবা নেই- বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো নেই- ১ আগস্ট ২০০৭। পিতা কি দিয়ে বাড়তি আয়ূষ্কাল পুত্রকে? আয়ূ তো বিনিময়যোগ্য নয়- নয় দান করার মতো ধন। একে একে আলো নিভতে থাকে। চারধারে শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যেতে থাকে অন্ধকার- কিন্তু স্বপ্ন যে তার আকাশ সমান- শরীর সেখানে কতটাই আর মূল্য পায়। করোটি ভরা গতি- কাজ চলতে থাকে। কখনো শুয়ে- কখনো বসে- রাত জেগে দিন জেগে- কম্পিউটারে- ল্যাপটপে-

২০০৮    
বন্ধুরা চারপাশে কমতে থাকে। বন্ধুদের কাছে বারতা চলে গেছে- জগলুল দিন গুনছে। এ বারতা জগলুল কিন্তু কাউকে পাঠায় নি। জগলুল মৃত্যুর দিকে চেয়ে থাকে নি- ওতো চেয়ে ছিল গতিশীল সেই স্বপ্নের দিকে। স্বপ্নের মৃত্যু নেই।

বিজ্ঞান বলে ইলেক্ট্রনও তো প্রচণ্ড গতিতে ঘুরতে ঘুরতে নিঃশ্বেস হয়ে নিউক্লিয়াসে আশ্রয় নেয় কখনো। জগলুল নিউক্লিয়াসে আশ্রয় নেয়। গতি থেমে যায়, ১১ মে ২০০৮ সকাল ১০:৩০ এ।

গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে গাড়ি চলে না।
    
[বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান আয়োজিত জগলুল আলম স্মরণ অনুষ্ঠানের জন্য লিখিত প্রবন্ধটি পুনর্মূদ্রণ করা হলো]

আজাদ আবুল কালাম: নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতা। সদস্য- প্রাচ্যনাট