Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

‘দৃশ্যপট’ থেকে দৃশ্যান্তরে সাকি

Written by আলী মাহমুদ.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

সাকি আমাদের ছেড়ে অনন্তকালের জন্য পাড়ি জমিয়েছে কোন এক অজানালোকে। আর তো ফিরে আসবে না সে। কী দিয়ে পূরণ করবো আমরা তার অভাব! জানি না। বড় বেশি অসময়ে আমাদের সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলো। ’ও চলে যাওয়াতেই বোধকরি একটা বিষয় ‘দৃশ্যপট’-এর সকলের কাছে পরিষ্কার হলো যে, সে-ই ছিলো দলের প্রতিটি সদস্যের সবচাইতে কাছের বন্ধু। প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে সবাই যেন পাথর হয়ে গেছে। এক অদ্ভুত শূন্যতা এসে ঘিরে ধরেছে সবাইকে।
 
সাকি তুই কি আমাদের বোন ছিলি, না বন্ধু ছিলি? বুঝতে পারি না। শুধু বুঝতে পারি তুই আমাদের সবার হৃদয়ে বেশ খানিকটা জায়গা দখল করে চুপচাপ বসেছিলি। আমাদের ভালোবাসা পরখ করার জন্যই কি ফাঁকি দিয়ে চলে গেলি? বড় বেশি কঠিন পরীক্ষা হয়ে গেলো আমাদের জন্য!

দৃশ্যপট-এর অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও অপরিহার্য নাট্যকর্মী ছিলো সাকি-এ-ফেরদৌস। ১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার- সাভারের আয়োজনে প্রায় দেড়মাসব্যাপী আমার একটা নাট্যকর্মশালায় সাকির সাথে প্রথম দেখা হয়েছিলো। কর্মশালার ১ম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত আমি লক্ষ্য করেছি নাটকের প্রতি তার নিষ্ঠা আর একাগ্রতা। কী গভীর আনন্দ আর উৎসাহে সে কাজ করে গেছে সবার সাথে। নাটকের প্রতি তার আগ্রহের সীমা ছিলো না। অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সাকি নাট্যকর্মশালাটি শেষ করেছিলো আর আদায় করে নিয়েছিলো ‘বেস্ট পার্টিসিপেন্ট’-এর পুরস্কারটি।

নাটকের বা দলের কোনো কাজে আমরা ওর কাছ থেকে কখনও ‘না’ শুনিনি। দলের প্রয়োজনে সেই জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাস থেকে প্রতিদিন ঢাকায় এসে মহড়ার কাজ চালিয়ে গেছে। ‘নাগমণ্ডল’ নাটকে জুড়ির দলে বসে রিহার্সেল করতে করতেই অন্যান্য চরিত্রগুলোও লক্ষ্য করতো গভীর মনোযোগ দিয়ে। সে কারণেই দলের এক সংকটের মুহূর্তে কুরুডব্বা নামের একটি দুরূহ চরিত্র খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করে অভিনয় করেছিলো সাফল্যের সঙ্গে।

ছাত্রী হিসেবেও খুবই ভালো ছিলো সাকি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে মাষ্টার্স পরীক্ষা দেবার কথা ছিলো আর ক’দিন পরেই। ১ম শ্রেণী পাওয়ার কথা মাথায় রেখেই পড়াশোনা করছিলো সে, দলের যাতে ক্ষতি না হয় সে জন্য সবসময়ই ’ও খুব সচেতন ছিলো। দৃশ্যপটের ৪র্থ প্রযোজনা ‘সক্রেটিসের জবানবন্দী’ নাটকের শুরুতেই সাকি দলকে জানিয়েছিলো তার পড়াশোনার চাপের কথা। আর তাই নিজ থেকেই দলকে বলেছিলো এ নাটকে নেপথ্যে কাজ করার আগ্রহের কথা। ‘সক্রেটিসের জবানবন্দী’ নাটকে আবহসংগীত নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিয়ে একটি দিনের জন্যও গাফিলতি করেনি সাকি। যেখানে ঢাকার মঞ্চে এমনিতেই নারীকর্মীর অভাব সেখানে মঞ্চে আর মঞ্চের বাইরে বসে সমান একাগ্রতায় কাজ করেছে শুধুই নাটকের প্রতি ভালোবাসার টানে। আমরা অবাক হয়ে দেখেছি আর শিখেছি কিভাবে ভালোবাসতে হয় আর সময় দিতে হয় নাটককে, থিয়েটারকে।

শেখার আগ্রহ ছিলো তার প্রচণ্ড। কিন্তু বরাবরই খুবই নার্ভাস প্রকৃতির ছিলো সাকি। প্রতিটা শো’র আগে আমিই তাকে মিউজিকের সবকিছু ঠিক ঠাক করে দিতাম। কখনও কোনো কারণে একটু দেরি হলেই হৈ চৈ করে কান্না জুড়ে দিত। এ জন্য সবাই তাকে ক্ষ্যাপাতো। সম্ভবত প্রচ- দায়িত্ববোধ থেকেই নার্ভাস হয়ে পড়তো সে। আবার প্রতিটা শো’র পরেই দেখা যেতো সাকি নির্ভুল। খুবই ভালো করেছে সে।

সাকির বিয়ে হয়েছিলো মাত্র বছর খানেক আগে শিশিরের সঙ্গে। বুয়েটের শিক্ষক (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অনুজপ্রতিম)। আমার এ জীবনে যে দু’একজন সত্যিকারের অমায়িক ও ভদ্র মানুষ আমি দেখেছি শিশির তাদের একজন। দৃশ্যপট আর সাকির মাঝখানে সে এক মুহূর্তের জন্যও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বরং যতদূর জানি সাকিকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছে নাটক করতে। শিশির তোমার কাছে দৃশ্যপট ঋণী হয়ে থাকলো।

অনেক প্রতিভাবান মানুষই খুব অল্প বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে, যাঁরা এই সমাজ-সংসারের জন্য কিছুটা হলেও অবদান রাখতে পারতো। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুরতা কেন বুঝি না। হয়তো প্রচণ্ড সম্ভাবনাময় ছিলো বলেই প্রকৃতির যুক্তিহীন সিদ্ধান্তে সাকিকেও চলে যেতে হলো পার্থিব সব ভালোবাসাকে উপেক্ষা করে। বঞ্চিত হলাম আমরা।

দৃশ্যপট যতদিন থাকবে, যতদিন দলের মহড়া চলবে, ’শো হবে, তুই থাকবি আমাদের সাথে। হাজার স্মৃতির ভাঁজে ভাঁজে তুই ফিরে ফিরে আসবি আমাদের কাছে। আমরা এখনও বিশ্বাস করি না আমাদের সাকি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। ‘দৃশ্যপট’ থেকে দৃশ্যান্তরে চলে গেছে সাকি। নাট্যসুধা বিলাতে সাকি আর ফিরে আসবে না আমাদের কাছে, বিশ্বাস করতে খুবই কষ্ট হয়- খুবই কষ্ট।

আলী মাহমুদ- অভিনেতা, নির্দেশক। সদস্য, দৃশ্যপট, ঢাকা