Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

মহাভারতের কুরুক্ষেত্র ও মুসলিম পুরাণের কারবালা : তুলনামূলক সমীক্ষণ

Written by আনন জামান.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

বাংলা সাহিত্যে তুলনামূলক সাহিত্যতত্ত্বের প্রচল থাকলেও তুলনামূলক নাট্যতত্ত্ব সাম্প্রতিককালের শিল্পতত্ত্ব। আচার্য সেলিম আল দীন, অধ্যাপক ড. আফসার আহমদ, গবেষক খায়েরুজ্জাহান মিতু প্রমুখ তুলনামূলক নাট্যতত্ত্বের তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনা করেন। তবে তুলনামূলক নাট্যতত্ত্বের প্রথম সূত্রলেখা বা ইঙ্গিত দেখা যায় বঙ্কিম   চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ গ্রন্থে। উনবিংশ শতাব্দীর উল্লেখিত গ্রন্থে কালিদাসের শকুন্তলা ও শেক্সপীয়রের মিরান্ডা চরিত্রে যে ভেদ ও ঐক্য আবিষ্কার করেছেন তা পাঠকের নান্দনিক উৎকর্ষতার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছাতে সহায়ক। তুলনামূলক নাট্যতত্ত্বের সেলিম আল দীন-কৃত সংজ্ঞায় দেখা যায়- “দেশকাল ভূগোলবর্তী মানবের সাংস্কৃতিক নৃ-তাত্ত্বিক অবস্থানের বিচিত্রতার পরিচয়ে উদ্ভাসিত নাটকের পাঠ দেহ থেকে এর প্রয়োগরীতির নানা কৌশল ও শিল্প পরিণতির নানা ঐক্য ও ভেদকে নান্দনিক শৃঙ্খলায় আবিষ্কারপূর্বক বিশ্বমানবের চেতনাকে অনুধাবনের জন্যই ‘তুলনামূলক নাট্যতত্ত্ব’- এই বিশেষ নামের নাট্যজ্ঞান শাখার উদ্ভব”।১ বক্ষমান প্রবন্ধে তুলনামূলক নাট্যতত্ত্বের ধারায় মহাভারতের কুরুক্ষেত্র ও মুসলিম পুরাণের কারবালার যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিষয় ও সংশ্লিষ্ট নানা মাত্রিক শিল্পরীতির নান্দনিক তুলনা ও সাদৃশ্য শিরোনামভিত্তিক আলোচনা করা হলো।         

এক. যুদ্ধ সংঘটনের সূচনা বিচার,
দুই. চরিত্রের পরিণতি ও অনুঘটনার ঐক্য,
তিন. যুদ্ধ কৌশলের ভেদ ও সাদৃশ্য,
চার. সংশ্লিষ্ট শিল্প ও উপস্থাপনার রীতি ও
পাচঁ. তুলনা, প্রতি-তুলনা ও নান্দনিক উৎকর্য বিচার

এক
যুদ্ধ সংঘটনের সূচনা বিচার

মহাভারত একটি বিশাল যুগের জনমানুষের জীবন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অতি উজ্জ্বল বর্ণে চিত্রিত কথকতা। কারবালা পুরাণের মতো এর ঘটনাপ্রবাহ একমুখী নয়, বিস্তারিত। পঞ্চপাণ্ডবের কীর্তি কথা, কৃষ্ণের মাহাত্ম্য, কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে দুর্যোধনের শত ভ্রাতার বিনাশ, পরিশেষে পঞ্চপাণ্ডবের উত্থান ও প্রতিষ্ঠা মহাভারতের প্রতিপাদ্য।২ বংশীয় প্রতাপ ও আধিপত্য, রাজ্যবিস্তার, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এর মূল বিষয় হলেও- এতে বহু শ্লোকে মূল ঘটনা বহির্ভূত অনেক কাহিনী ও তত্ত্বকথা স্থান পেয়েছে। কারবালার পুরাণের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু নবীজীর দৌহিত্র হাসান হোসেনের হত্যাকাণ্ড ও তদসংশ্লিষ্ট অনুঘটনার সংঘটন।

মহাভারত রচনার এই শ্রুতি আছে- শূদ্রদের বেদ চর্চার অধিকার না থাকায় কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদ ব্যাস৩ তাদের পঠন-পাঠন ও ধর্ম সাধনের জন্য মহাভারত লিপিবদ্ধ করেন। এরকম প্রসিদ্ধি আছে মহাভারত রচনার জন্য লেখক নির্ধারণকালে ব্রহ্মা তাকে গণেশের সাহায্য গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। গণেশ বিরামহীনভাবে লেখার শর্ত দিয়ে রাজী হলে দ্বৈপায়নও পরিশর্ত প্রদান করেন যে, গণেশ না বুঝে তার শ্লোক লিপিবদ্ধ করতে পারবেন না। মহাভারত রচনাকালে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন নতুন প্লট সৃজনের সময় আহৃত করার জন্য মাঝে মধ্যে দুর্বোধ্য শ্লোক বলতেন- যা বুঝে লিখতে গণেশকে কালক্ষেপণ করতে হতো। এসময় পরবর্তী শ্লোক রচনা করতেন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদ ব্যাস। মুসলিম মিথে কারবালার ঘটনার প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া যায় গ্রীক নিয়তিবাদের মতো করে। একদা শিষ্যমণ্ডলী বেষ্টিত মোহাম্মদের বিষণ্ন মুখমণ্ডল দেখে প্রধান সাহাবী তার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। নবীজী উত্তর করলেন, তোমাদের মধ্যে কাহারো সন্তান প্রাণাধিক প্রিয় হাসান হোসেনের পরম শত্রু হইবে। হাসানকে বিষপাণ করাইয়া মারিবে এবং হোসেনকে অস্ত্রাঘাতে নিধন করিবে।৪ গ্রীস মিথের মত কারবালার ঘটনা সংঘটনের নেপথ্যে এরকম নিয়তিবাদ সক্রিয় ছিল- প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। এমনকি হোসেন তার ধৃত ও  নিহত হবার স্থান দাস্ত কারবালা পূর্বজ্ঞাত হয়ে- পরিদর্শন করে আসে। মহাভারতের কুরুক্ষেত্র এবং কারবালার ধর্মযুদ্ধ দুটিরই নেপথ্য কারণ- বংশীয় আধিপত্য রক্ষা, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, রাজ্যবিস্তার, ক্ষমতালিপ্সা, নারী, সিংহাসন ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব। ক্ষেত্রজ রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুর একজন শতপুত্র ও অন্যজন পঞ্চপুত্র নিয়ে স্বরাজ্য শাসন করছিলেন। তদুপরি পাণ্ডুর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে পঞ্চভ্রাতা তাদের ধর্মনিষ্ঠা অশ্বমেধযজ্ঞ সাধনের মাধ্যমে প্রাচুর্য ও রাজ্যব্যাপী খ্যাতি লাভ করে। ধৃতরাষ্ট্র পুত্র ঈর্ষান্বিত দুর্যোধনাদিরা চক্রান্তের জাল বুনে পাণ্ডবদের নানামাত্রায় বিপদগ্রস্ত করে তোলে। কারবালার যুদ্ধ সংঘটনের নেপথ্য মূল কারণ ছিল কুরাইশ ও ঊমাইয়া বংশের বংশীয় আধিপত্য ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিমিত্ত।৫ মোয়াবিয়া পুত্র এজিদ শাসক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দামেস্ক নগরীতে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও সুসজ্জিত সেনাপূর্ণ নগরে পরিণত করেন। তথাপি হাসান হোসেনের ধর্মনিষ্ঠা, দীনহীন, রাজ্য ধর্মপালন জনসাধারণকে বেশি আর্কষণ করে। রাজ্য বিস্তার ও আরব জাহানের কর্তৃত্বের সাথে কারবালার যুদ্ধ সংঘটনের একটি পূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়ায় জয়নব। জয়নবকে বিয়ে করার জন্য এজিদ নানাবিধ কৌশলের আশ্রয় করলেও জয়নব অনুরক্ত হয় হাসানের প্রতি। মহাভারতের কৌরব পাণ্ডব যুদ্ধেও একটি শক্তিশালী অন্যতম কারণ দ্রুপদ কন্যা দ্রৌপদী। ধৃতরাষ্ট্রপুত্র দুর্যোধনাদির কূটকৌশলে পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির পরাজিত হলে শেষ পণ হিসেবে দ্রৌপদীকে রাজসভায় চরম অপমান করা হয়। দুঃশাসন দ্রৌপদীর চুলের মুঠি ধরে রাজসভায় নিয়ে আসে এবং তার বস্ত্র হরণের প্রচেষ্টা চালায়। এ সময় ভীমের প্রতিজ্ঞা পরবর্তীকালে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে বেগবান করে একটি ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল।

দুই
চরিত্রের পরিণতি ও অনুঘটনার ঐক্য

মহাভারতের জন্মান্ধ ক্ষত্রিয় রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও কারবালার দামেস্ক রাজা মোয়াবিয়ার চারিত্রিক চলনে সূক্ষ্ণ সাম্য লক্ষণীয়। পিতা ধৃতরাষ্ট্র পুত্র দুর্যোধনাদির প্রতি বাৎসল্যবোধে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ সংঘটনে পরোক্ষভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। পাণ্ডব পুত্রদের প্রতি তার সহানভূতি থাকলেও দ্বিতীয়বার দ্যুত ক্রীড়ায় ধৃতরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ছিল। যার ফলত পাণ্ডব ভ্রাতাদের বারো বৎসর বনবাস ও এক বছর অজ্ঞাতবাস থাকতে হয়। মুসলিম মিথে দামেস্কপতি মোয়াবিয়ার প্রাথমিকভাবে নিয়তি ভাঙ্গার প্রবল চেষ্টা থাকলেও পরবর্তীকালে পুত্রের প্রতি অপত্যস্নেহ কারবালার যুদ্ধ সংঘটনে নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ করে। তবে তা কোনোভাবে ধৃতরাষ্ট্রের মত প্রকট নয়। ধৃতরাষ্ট্র পুত্রের ক্ষেত্রে যুদ্ধ বিজয়ী পাণ্ডবদের স্থানে সৌজন্য সাক্ষাতকালে ভীমের লৌহমূর্তিকে৬ ক্রোধবশত আলিঙ্গন করে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলে ।

ধৃতরাষ্ট্রের রাজপরিষদ বিদুর আর মোয়াবিয়ার প্রধানমন্ত্রী হামানের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও মিথে তার ভূমিকা একইরকম ঐক্যরেখায় চিত্রিত। বিদুর দুর্যোধনাদির রাজপরিষদের আওতাভুক্ত হয়েও সর্বদা পাণ্ডবদের হিত সাধন করেছেন, অপরদিকে মোয়াবিয়ার প্রধানমন্ত্রী হামান হাসান হোসেনের কোনো উপকার করতে না পারলেও মঙ্গল কামনা করেছেন। দুটি মিথেই রাজচক্রান্তের কাছে রাজ্যের দুই প্রধান পুরুষকে কোণঠাসা অবস্থায় আবদ্ধ দেখা যায় ।

পুরাণের দুটি চরিত্র দুর্যোধন ও এজিদের যুদ্ধ কৌশল,সমরনীতি, সাহস, নিষ্ঠুরতা, রাজ্যলোভ আকাশ বিস্তারী। দুটি ভিন্ন পেক্ষাপট, ভিন্ন ভূখণ্ড হওয়া সত্ত্বেও ভয়ংকর নৃশংস দুটি যুদ্ধ ঘটনের প্রধান দুই নেতার শেষ পরিণতিতে নান্দনিক ঐক্য রয়েছে। কারবালা যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ইমাম আবু হানিফা যখন এজিদকে মহাপরাক্রমে বধ নিমিত্ত তাড়া করছে তখন এজিদ প্রাণ ভয়ে অশ্ব ত্যাগ করে দামেস্কপুরীর বৃক্ষলতাপূর্ণ দুর্গম অংশে একটি অন্ধকার কূপে প্রবেশ করেন।৭ মুসলিম পুরাণবিদগণের ধারণা রাজপ্রাসাদ আঙ্গিনায় ভূ-অভ্যন্তরে কোনো গুপ্তপুরী ছিল। কেননা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এজিদ পরিবার ও আত্মজনদের উপস্থিতি দেখা যায় নি। বোধকরি তারা ঐ গুপ্তপুরীতে আশ্রয় নিয়েছিল। এজিদ ইমাম হাসানের হাতে বধ্য নয় তাই অন্ধকার কূপে নিমজ্জনের মধ্য দিয়ে তার চরিত্র পরিণতি লাভ করেছে ।

এজিদের পলায়নচিত্রের সাথে কুরুক্ষেত্রের পরাজিত বলশালী দুর্যোধনের পলায়নচিত্রের প্রতিতুলনা করা যেতে পারে। কুরুক্ষেত্রে কৌরবসেনাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে দুর্যোধন অশ্ব ত্যাগ করে দেহে রক্তক্ষত আর চিহ্ন নিয়ে শুধুমাত্র গদা হস্তে দ্বৈপায়ন হ্রদের দিকে প্রস্থান করে। গদাটি যেন তার জেদ, বল আর তেজোদীপ্ততার  চিহ্নচিত্র। দুর্যোধন দ্বৈপায়ন হ্রদের জলে প্রবেশ করে উপরিস্থিত সমস্ত জল যাদু বলে স্তম্ভিত করে দিলেন । এজিদের কূপে দুর্যোধনের হ্রদে নিমজ্জনের মধ্যে ঐক্য থাকলেও দুটি ঘটনা স্বকীয়তায় বৈচিত্র্যপূর্ণ।

ফোরাত পারে কারবালার প্রান্তরে হোসেনের কোলে এজিদ সৈন্য কর্তৃক তিরবিদ্ধ পিপাসার্ত শিশুপুত্র মহাভারতের অর্জুনপুত্র বালক অভিমন্যু বধের সমান্তরাল নিষ্ঠুর চিত্রকল্প হয়ে উঠে। হোসেনের আরেক পুত্র ওহাবকেও এজিদ সেনারা একত্রিত হয়ে চতুর্মুখি আক্রমণে শরাঘাতে হত্যা করে। হোসেন পিপাসায় মৃত প্রায় শিশুপুত্র নিয়ে ফোরাতের জল চাইতেই এজিদ সেনা হোসেনের বুক লক্ষ্য করে বাণ ক্ষেপন করে। নিক্ষিপ্ত বাণে শিশুপুত্র বিদীর্ণ হয়ে যায়।

কুরুপ্রান্তরে ত্রয়োদশ দিনের যুদ্ধে পাণ্ডব সেনাদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিনষ্টির জন্য যখন যুধিষ্ঠিরকে হত্যার দায়িত্ব অর্পিত হলো দ্রোনাচার্যের উপর, তখন সংশপ্তক৮ সেনাগণ অর্জুনকে যুদ্ধে ব্যস্ত রাখলো- যাতে যুধিষ্ঠির বধ বাধামুক্ত হয়। দ্রোণাচার্য যুধিষ্ঠির বধ নিমিত্ত চক্রবুহ্য রচনা করে মহাপরাক্রমে যুদ্ধ করতে লাগলেন। আপাত অর্জুনবিহীন পাণ্ডব পক্ষ চক্রব্যুহ৯ ভেদ করতে অভিমন্যুকে পাঠালেন। বালক অভিমন্যু চক্রব্যুহ ভেদ করার কৌশল জানলেও তা থেকে বের হবার কৌশল জানতেন না। ফলত অভিমন্যু চক্রের ভেতর দ্রোণ, দুর্যোধন, দুঃশাসন, কর্ণ, শকুনি, জয়দ্রথ কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন। অভিমন্যুর মৃত্যুতে শোকার্ত অর্জুনের ‘হা পুত্র’ চিৎকার কুরুপ্রান্তর কাঁপায়। অনুরূপ চিত্রকল্প পাঠকদের স্মৃতি ও মনে কারবালার প্রান্তরে হোসেনের আর্তনাদের সমান ছবি হয়ে উঠে। পুত্র স্নেহের চিরন্তন ও শাশ্বত অনুভূতি জাতি-ধর্ম-কাল-ভূখণ্ড ভেদেও এক- হিন্দু ও মুসলিম দুটি পুরাণেই তার ব্যত্যয় হয় নি।

মহাভারতের কুরুক্ষেত্রে শরবিদ্ধ ভীষ্ম আর কারবালার পুরাণে শরবিদ্ধ দুলদুলের অভেদ চিত্রছবি পাঠকের মনে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, প্রেক্ষাপট, ভূগোলবর্তী হ্ওয়া সত্ত্বেও নান্দনিক ঐক্যছবি তৈরি করে। কারবালার প্রান্তরে হোসেনের তীরবিদ্ধ অশ্ব দুলদুল প্রভুর শিরহীন দেহ নিয়ে ছুটে চলে হোসেন শিবিরে। এজিদ পক্ষের সৈন্য আবদুল্লাহ্ জেয়াদ, সীমার, অলিদ প্রমুখ চারপাশ থেকে শর নিক্ষেপ করছে- শ্রাবণ বৃষ্টির মতো অজস্র তীর দুলদুলের বুকে, পীঠে, গ্রীবার সমগ্র শরীরে বিদ্ধ হয়। শরবিদ্ধ চিত্রকল্পের সাথে ঐক্য থাকলেও শরবিদ্ধ ভীষ্মে সূর্যের উত্তরায়ণ অবস্থানে ইচ্ছামৃত্যু চরিত্রটিকে ভিন্নমাত্রা দান করেছে। ভীষ্ম স্বয়ং যুধিষ্ঠিরাদিকে তার হত্যার কৌশল বলেছিল। নিরস্ত্র, ভূ-পতিত, ধর্ম ও ধ্বজবিহীন, পলায়মান, ভীত, শরণাপন্ন স্ত্রী, স্ত্রী নামধারী পুরুষ, বিকলেন্দ্রিয়, এক পুত্রের পিতা, অমঙ্গলসূচক ধ্বজধারী এবং নিচ জাতির সঙ্গে ভীষ্ম যুদ্ধ করেন না, তাই অর্জুন দ্রুপদ-পুত্র মহারথ শিখণ্ডীকে সামনে রেখে ভীষ্মকে হত্যা করলেন। শিখণ্ডীর পশ্চাদে অর্জুন, ক্রমান্বয়ে ভীম, নকুল, সহদেব, ঘটোৎকচ, সাত্যকি, যুধিষ্ঠির, ধৃষ্টদ্যুম্ন ভীষ্মের শরীরে এত তির নিক্ষেপ করেছিল যে দুই অঙ্গলি পরিমানও অবিদ্ধ ছিল না। ভীষ্ম শরাবৃত দেহ ভূমি থেকে শূন্যে সূর্যের উত্তরায়ণের অপেক্ষায় থাকলো যুদ্ধ শেষ হওয়া অব্দি। শরবিদ্ধ দুলদুলের পরিণতি মুসলিম মীথে নাই- তাকে অসংখ্য তির আর শরীর ভরা রক্তচিত্র নিয়ে হোসেন শিবিরে ফিরতে দেখা যায়।

কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদ ব্যাস ব্রহ্মা কর্তৃক আদিষ্ট লেখক- যিনি আদি থেকে তার সময়কাল পর্যন্ত ধর্ম সংশ্লিষ্ট ঘটনার লিপিকার। আর অন্য পুরাণটি মুসলিম মীথ লিপিকারদের হাতে সংরক্ষিত হয়ে আসছে। তদুপরি দুটি পুরাণে চরিত্র, ঘটনা ও অনুঘটনার সাম্য থাকলেও ঘটনার পরিণাম ভিন্ন, ঘটনা গ্রন্থনের কৌশল ভিন্ন।

তিন
যুদ্ধ কৌশলের ভেদ ও সাদৃশ্য

কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদ ব্যাস-কৃত মহাভারত ও কারবালার মুসলিম পুরাণের মূল প্রেক্ষাপট ও বিষয় কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার সংশ্লিষ্ট ধর্মযুদ্ধ। মহাভারতে বর্ণিল, আরম্ভরপূর্ণ, আয়োজন সমৃদ্ধ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, কলাকৌশল, রীতি, আচার-অনুষ্ঠানাদি ও নানাবিধ যুদ্ধাস্ত্রের বর্ণনা রয়েছে। কৃষ্ণ, দ্রোণাচার্য, ভীষ্ম প্রমুখ প্রধান চরিত্রসমূহ যুদ্ধবিদ্যাকে উৎসাহিত করেছে মহাভারতের সর্বত্র। হিন্দু পুরাণ মতে ক্ষেত্রজ জাতির জন্মই হয়েছে যুদ্ধনিমিত্ত। বলশালী ক্ষেত্রজ পুরুষ যুদ্ধ না করে মৃত্যুগামী হলে স্বর্গে পৌঁছাবে না। কুরুক্ষেত্রে যুধিষ্ঠির, অর্জুন ভ্রাতাদি যখন তাদের গুরু, পিতৃব্য দ্রোণাচার্য ও ভীষ্মের সাথে যুদ্ধ করতে বিমুখ তখন কৃষ্ণই তাদেরকে প্রবল যুদ্ধে অংশগ্রহণে প্ররোচিত করেছে। বক্ষমান আলোচনায় দুটি পুরাণের যুদ্ধকৌশল স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করে প্রতিতুলনার প্রয়াস করা হলো।

মহাভারতের যুদ্ধকৌশল ও অস্ত্রাদি অর্জুন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধপূর্ব সময়ে এক গহীন বনে মহাদেবের মৃন্ময় মূর্তির অর্চনা নিমিত্ত বৃষ ধ্বজ, ব্রহ্মশির-নাম পশুপাত অস্ত্র, যমদণ্ড, বরুন পাশ, কুবের অন্তর্ধান, গাণ্ডীব ধনুক-নাম অস্ত্র লাভ করে। এই সকল দিব্যাস্ত্রের প্রয়োগ ও প্রত্যাহার বিধির কৌশল দেবতাদিরা তাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন।

পাণ্ডবযুদ্ধ সজ্জায় সাত অক্ষৌহিনী সেনার উল্লেখ আছে- দ্রুপদ, বিরাট, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, সাত্যকি, চেকিতান ও ভীমসেন। অক্ষৌহিনী সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠবীর ও প্রাণ দিতে প্রস্তুত। প্রভাতে অধিবাস বা অস্ত্রপূজা অথবা নিরাজন ও কৌতুকমঙ্গল বা রক্ষাসূত্র অথবা রাখি বন্ধনের মাধ্যমে যুদ্ধ আরম্ভ হয়।

মহাভারতে যুদ্ধ শুরুর আয়োজন আরম্ভরপূর্ণ। পাণ্ডবদের প্রতি শিবিরে প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্র, মধু, ঘৃত, সর্জরস (ধূনা), জল, ঘাস, তুষ ও অঙ্গার সঞ্চিত ছিল শতশত নিয়োগকৃত শিল্পী বৈদ্য ও চিকিৎসার বিপুল উপকরণ। সৈন্যগণের চঞ্চল কলরব, হস্তি ও অশ্বের রব, রথচক্রের ঘর্ঘর ও শঙ্খ দুন্দুভির সর্বব্যাপ্ত ধ্বনি। বর্মে ও অস্ত্রে সজ্জিত সেনাদের মধ্যভাগে জ্যৈষ্ঠ পাণ্ডব ভ্রাতা যুধিষ্ঠির। সাথে ছিল শকট, বিপণি, বেশ্যাদের বস্ত্র গৃহ, কোষ, যন্ত্রায়ুধ ও চিকিৎসকগণ। দূরদর্শী যুধিষ্ঠির হিরন্ময় নদীর পাড়ে স্নিগ্ধ স্থানে পরিখা খনন করে শিবির স্থাপন করলেন। কৌরবদের যুদ্ধ বর্ণনায় দেখা যায় সমাগত রাজারা পড়েছে উষ্ণীষ অন্তরীয়, উত্তরীয় ভূষণ। কৌরব পক্ষের সেনা বিভাজনের পাঁচটি ধরন উল্লেখ আছে- এক. রথী: রথারোহী পরাক্রান্ত খ্যাতনামা যোদ্ধা। দুই. মহারথ: রথযুথপতি বা বহু রথীর অধিনায়ক। তিন. অতিরথ: যিনি অমিত যোদ্ধার সাথে যুদ্ধ করেন অথবা যিনি মহারথগণের অধিপতি। চার. অশ্বারোহী: অশ্ব চালনায় পারদর্শী ও অশ্বে আরোহন করে যুদ্ধ করেন। পাঁচ. গজারোহী: গজারোহী সৈন্য গজ বা হাতিতে চড়ে যুদ্ধকৌশলে বিশেষভাবে দক্ষ।

এছাড়া সংশপ্তক এবং পদাতিক সৈন্যদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে জয় অথবা প্রাণ দেবার জন্য নির্বাচিত সেনারা সংশপ্তক অভিধায় ভূষিত হয়েছে। দুর্যোধনের যুদ্ধ সাজ বিন্যাসে দেখা যায় প্রত্যেক রথে চার অশ্ব যোজিত, দুই অশ্বরক ও দুই পৃষ্ঠরক নিযুক্ত। প্রত্যেক হাতিতে দুই অঙ্কুশধারী, দুই ধনুর্ধারী এবং একজন শক্তি ও পতাকাধারী।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধরীতি অনুযায়ী শরণাগত, স্তুতি পাঠক সূত, ভারবাহক, অস্ত্র যোগানধারী, ভেরী, দুন্দুভি প্রভৃতি বাদ্য বাদককে বধ করা যাবে না। কৌরব ও পাণ্ডব যোদ্ধাদের যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধ কৌশলের মধ্যে সর্বদিক মুখব্যুহ, সূচী-মুখব্যুহ, আলব্যুহ, বজ্রব্যুহ, গাড়ুরব্যুহ, অর্ধচন্দ্রব্যুহ, সুদর্শনচক্র, মকরব্যুহ, ত্ব্যাষ্ট অস্ত্র, নারাচ, চক্রব্যুহ, কৌমোদকি গদা, দিব্যশক্তি চক্র, ধনুরবান, ছত্র, বজ্রবান, খড়গ, গাণ্ডীব, ব্রহ্মাস্ত্র, আগ্নেয়-বরুণ-বায়ব্য অস্ত্র ঐন্দ্রাস্ত্র ভার্গবাস্ত্র, ক্ষুরপ্রবাণ, আঞ্জলিক বাণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অমঙ্গলসূচক যুদ্ধ চিহ্ন হলো ভূমিকম্প, উল্কাপাত, মেঘহীন বজ্রপাত, আকাশ থেকে হাড় বা অস্থি বর্ষণ, শেয়ালের চিৎকার প্রভৃতি।

কুরুক্ষেত্রের সমস্ত যুদ্ধের কার্যকারণও দেবতাদের তৈরিকৃত নিয়তি। চরিত্রগুলো পথরেখা পূর্ণ করেছে মাত্র। কারবালার পুরাণেও নিয়তিবাদ ক্রিয়াশীল ছিল। কারবালার প্রান্তরে ফোরাত পারে হোসেন নিহত হবে- এরকম ঘটনা ধর্মকথা অনুযায়ী ঈশ্বর নির্ধারিত। কারবালার যুদ্ধে অস্ত্রের দাপটের চেয়ে বুদ্ধির কৌশল বেশি ক্রিয়াশীল ছিল। ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার কারবালাযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হলেও যুদ্ধ সংঘটনের অন্যতম নেপথ্যকারণ- জয়নব। মহাভারতেও দ্রৌপদীর অসম্মান ও বস্ত্রহরণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে তরান্বিত করেছিল।

মহাভারতের যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে যুদ্ধ প্রান্তরে- দুর্যোধন সশরীরে সার্বক্ষণিক কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের তত্ত্বাবধান করেছেন। কারবালার যুদ্ধে এজিদ সিংহাসনে উপস্থিত থেকে মন্ত্রণা দিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে তার ছলনা ও কূটনীতির প্রয়োগ বেশি ছিল। মারওয়ান নিয়োগকৃত মায়মুনার প্ররোচনায় জায়েদা হাসানকে হীরকচূর্ণ প্রয়োগ করে হত্যা করে। এজিদের সার্বিক যুদ্ধ কৌশল ছিল চতুরতা ও শঠতায় পূর্ণ। হাসান মৃত্যুপরবর্তী সময় হোসেন যখন তার পরিবার আত্মজনদের নিয়ে কুফা অভিমুখে যাত্রা করল সে সময় এজিদ কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ্ জেয়াদকে লোভের ফাঁদে ক্রয় করেছিল। আব্দুল্লাহ্ জেয়াদ এজিদের পরামর্শে এক ভয়ংকর কূটচাল- স্বপ্নে মহানবী (সাঃ) কর্তৃক হোসেনকে কুফার মসনদে সমাসীনে আদিষ্ট হয়েছেন প্রচার করলো।

দামেস্ক দূত প্রেরিত হবার পরের প্রভাতেই জেয়াদ তার মিথ্যা স্বপ্নের বিবরণ রাজসভায় এবং মদীনায় কাসেদ প্রেরণ করে জানিয়েছিলেন। এই হীন কূটকৌশলের কারণে হোসেনের অভিযাত্রা কুফা অভিমুখে হয় এবং দাস্ত কারবালায় পথ হারিয়ে ফেলে। শুধু তাই নয়, নিষ্ঠুর কূটনীতিক এজিদ কারবালার মরুপ্রান্তরে ফোরাত নদীর জল সৈন্য দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। যাতে পিপাসায় হোসেন সেনা ক্লান্ত হয়ে যায়। বোধকরি এজিদের এই নির্দয়তার কারণেই ফোরাত পারে হোসেনের পরাজয় হয়েছিল। হোসেন শিবির এতটাই পানিশূন্য ছিল যে, কান্নার জন্য চোখে জলও ছিল না। এরূপ বর্ণনা মীর মোশাররফ হোসেনকৃত বিষাদ সিন্ধুতে দেখা যায়।

এজিদের আরও একটি হীন কূটচালের উল্লেখ করা যেতে পারে। জয়নাল আবেদীন দ্বারা জুম্মাবারে খোৎবায়১০ হোসেনের নামের পরিবর্তে এজিদ নাম পাঠের চক্রান্ত। রাজ্যের রীতি অনুযায়ী খোৎবায় তদীয় মহারাজার নাম পঠিত হয়। তাই এজিদের নামে খোৎবা পাঠ মানে তাকে মদিনার শাসক হিসেবে মেনে নেওয়া।

এছাড়া এজিদ ও ইমাম আবু হানিফার দলের একটি সহজিয়া যুদ্ধ কৌশল ছিল, নিজ দলের সৈন্যদের ছদ্মবেশে প্রতিপক্ষের দলে অনুপ্রবেশ এবং সুযোগমত সংবাদ, অস্ত্র নিয়ে ব্যবহার করা। মহাভারত ও কারবালা উভয় পুরাণেই যুদ্ধ ক্ষেত্রে বাস্তবতার সাথে সাথে অলৌকিক, অপার্থিব বিষয়ও ক্রিয়াশীল ছিল। মহাভারতে সামগ্রিক যুদ্ধ, হত্যাকা- দেবতাদের মন্ত্রণায় হয়েছে। কৌবর পাণ্ডবগণ উপলক্ষ্য মাত্র। মহাভারতে কৃষ্ণের প্রকৃত অপার্থিব রূপ দর্শন ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভায় সকল রাজ পরিষদের সম্মুখে সংগঠিত হয়। সহাস্য কৃষ্ণের ললাটে, বুকে, মুখে অন্যান্য অঙ্গ উপাঙ্গে ব্রহ্মা, রুদ্র, অগ্নি, ইন্দ্রাদি, যক্ষ, রক্ষ, গন্ধর্ব, হলধর, বলরাম প্রমুখের মুখচ্ছবি এবং সহস্র চরণ, সহস্র বাহু, সহস্র নয়ন সমৃদ্ধরূপ দেখা যায়।

কারবালার পুরাণে এজিদের রাজপ্রাসাদে হোসেনর কাটা মুণ্ডু ক্রমশ শূন্যে উত্থিত হয়ে কারবালার প্রান্তরে তার অবশিষ্ট দেহের সাথে সংযোজিত হয়। অসংখ্য পুণ্যাত্মা অলৌকিক দোআঁশায় হোসেনের শেষকৃত্য সমাপন করে।

চার
সংশ্লিষ্ট শিল্প ও উপস্থাপনার রীতি

মহাভারত ও কারবালার পুরাণ কেন্দ্র করে নানাবিধ শিল্পরীতি রচিত ও পরিবেশিত হয়েছে। ধর্মীয় অনুভব ও কৃত্যাদি পালনই এ সকল শিল্প ও উপস্থাপনের সাধারণ কারণ। মহাভারত ও কারবালার যুদ্ধ সংক্রান্ত অধিকাংশ উপস্থাপনাই আসরের সামগ্রী। গায়েন দোহার সহযোগে দর্শকদের সামনে নৃত্যগীতবাদ্য সহযোগে সম্যক অভিনয়ে পরিবেশিত হয়। কারবালার মীথ সংক্রান্ত উপস্থাপনায় শোভাযাত্রা একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কারবালার জারি পরিবেশনকারী দল মহরম মাসের প্রথম অংশে তলোয়ার, লাঠি, বল্লম, খড়গ, তাজিয়া, নিশান সহযোগে বিভিন্ন পথে, বাড়ির উঠানে, হাটে-বাজারে তলোয়ারবাজি লাঠি খেলা ও জারি গান করে থাকেন। এই অভিযাত্রাকে তারা ধর্মীয় কৃত্যের অংশ মনে করেন। মহাভারত উপস্থাপনায় ভ্রাম্যমাণ দলের কথা মূল মহাভারতে লিপিবদ্ধ আছে। জটামণ্ডল আবৃত স্বর্ণকৌপীনধারী নৃত্যগীতকুশল কলহপ্রিয় দেবর্ষি নারদ কচ্ছপী বীণা বাজিয়ে তীর্থে তীর্থে মহাভারত পরিবেশন করতেন।১১ শৌনক সম্প্রদায় বাড়ি বাড়ি গমন নিমিত্ত বীণা বাজিয়ে মহাভারত গাইতেন।১২

মহাভারত পরিবেশনায় উল্লেখযোগ্য উপস্থাপনারীতি : ক. পাঠকাব্য, খ. ঢপযাত্রা, গ. পাঁচালি, ঘ. কীর্তন। আর কারবালার পুরাণ পরিবেশনার উল্লেখযোগ্য উপস্থাপনারীতি : ক. পুঁথি পাঠ, খ. ইমাম যাত্রা, গ. কারবালার জারি বা কাসেদের জারি।

মহাভারত প্রধানত পাঠকাব্য। মহাভারতে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব উল্লেখ করেছেন, ‘যিনি পর্বে পর্বে এই গ্রন্থ পাঠ করে শোনান, তিনি পাপ মুক্ত হয়ে ব্রহ্মলাভ করেন। ...সূর্যদয়ে যেমন তমোরাশি বিনষ্ট হয়, মহাভারত পাঠ ও শ্রবণে সেইরূপ কায়িক, বাচিক ও মানসিক সমস্ত পাপ দূর হয়’।১৩ অর্থাৎ মহাভারত পাঠকারী কথক ও শ্রবণকারী শ্রোতা একই ধর্মবোধে অনুপ্রাণিত। আদি ও মধ্যযুগে রাজদরবারে কথক ঠাকুর মহাভারত পাঠ করতেন। পারিষদগণ ভক্তি সহযোগে শ্রবণ করতেন। পাল বংশের সর্বশেষ রাজা ‘মদন পালের পাটমহিষী চিত্রমতিকা’ ‘বটেশ্বর স্বামী’ নামে একজন কথকের কাছ থেকে নিয়মিত মহাভারত শ্রবণপূর্বক তাকে একটি গ্রাম দান স্বরূপ দিয়েছিলেন।১৪

সাধারণত বিভিন্ন পূজায় শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে মহাভারত পাঠ ধর্মীয় আচার, তাই বলা যায় মহাভারত ধর্মশাস্ত্র হিসেবে পাঠ্য এবং সাধারণত এর পরিবেশনারীতি হচ্ছে কথকতা। কারবালার পুঁথি পাঠের সাথে মহাভারত পাঠের মিল দুইভাবে। প্রথমত : দুটি পুরাণের পাঠ ও শ্রবণ পূণ্য নিমিত্ত। দ্বিতীয়ত : পরিবেশনার ধরনগত ঐক্য। কারবালার বিষয় নিয়ে রচিত কাব্যমালা পুঁথি পাঠের আসরে সুরে সুরে উপস্থাপিত হয়। দুটি পরিবেশনাই পাঠ সংশ্লিষ্ট। মহাভারতও পুঁথি পাঠের মত সুরে সুরে করতাল বাদন সহযোগে আসরে পরিবেশনার প্রামাণ্য পাওয়া যায়।

‘ঢপযাত্রা’ মধ্যযুগের শিল্পরীতি। সুবিশাল আখ্যানকাব্য মহাভারতের বিভিন্ন অংশ পালা অথবা যাত্রার আদলে পাণ্ডুলিপি রচনা করে মঞ্চে অভিনীত হয়। সাম্প্রতিক কালে সুনামগঞ্জ জেলার ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ’ ‘দাতা কর্ণ’ পালা ঢপযাত্রার আঙ্গিকে পরিবেশিত হয়। কারবালার পুরাণ নিয়ে যাত্রার আদলে পাণ্ডুলিপি রচনা করে ইমামযাত্রা পরিবেশিত হয়।১৫ ইমামযাত্রা মূলত চরিত্রাভিনয়কেন্দ্রিক এবং তাতে গীত থাকলেও প্রধান প্রকাশভঙ্গী সংলাপাত্মক।১৬

কারবালার বিষয় নিয়ে একই ধরনের পরিবেশনা অঞ্চলভেদে ‘ঘাটুযাত্রা’ নামে পরিচিত। মহাভারত ও কারবালার পুরাণ সংশ্লিষ্ট এ দুটি শিল্পরীতি সকল সময় ধর্ম দ্বারা আচ্ছন্ন নয়। সাধারণ মানুষ শিল্প বোধে তাড়িত হয়েই ‘ঢপযাত্রা’ ও ‘ইমামযাত্রা’-র আয়োজন করে থাকে। দুটি ভিন্ন ভাষার পুরাণ থেকে একই ধরনের উপস্থাপনারীতি শিল্পে জাতিগত নান্দনিক ঐক্যের প্রমাণ করে।

মহাভারতস্থিত ‘দাতা কর্ণ’-র সংলাপ অংশ-

কর্ণ
বলুন ব্রাহ্মণ কী মাংস দিয়ে পারনা করবেন, সেই মাংসই এনে দেবো।

শ্রীকৃষ্ণ
মহারাজা কর্ণ, অনেক স্থান ভ্রমণ করেও আমার ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারলাম না। তাই তোমার ভুবনে আসতে বাধ্য হয়েছি। যে মাংস প্রয়োজন তা তোমার কাছে আছে কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে।

কর্ণ
কোনো সন্দেহ নেই ব্রাহ্মণ।

শ্রীকৃষ্ণ
তবুও আমার মনে হয়, যদি সত্যি কর।

কর্ণ
সত্য করতে হবে তাই না? অতিথি ব্রাহ্মণ, হীন সূতপুত্র হলেও মনটা আমার এত ছোট নয়। দিন দিন ব্রাহ্মণ, আপনার হাতের কমণ্ডলের জল আর তুলসীদল নিয়ে সত্য সত্য ত্রিসত্য করলাম কখনও আপনাকে বিমুখ করে ফিরিয়ে দিবো না।

শ্রীকৃষ্ণ
তবে শুন মহারাজা কর্ণ। আমার যে মাংস প্রয়োজন তা এখন বলে দিচ্ছি।

গান ও সংলাপ:
“জীবজন্তুর মাংস আমার নাহি প্রয়োজন
নর মাংস খাইতে আমার মনে আকিঞ্চন।”১৭

কারবালার মীথ কেন্দ্রিক ‘ইমামযাত্রা’ বা ‘ঘাটুযাত্রা’-র সংলাপ অংশ-

এজিদ
পিতা আমার অপরাধ মার্জনা করবেন। আমি নিজেও বলতে পারছি না কেন আমার এই পরিণতি। তবে কী যেন না পাওয়ার ব্যাথায় আজ আমি দুঃখে জর্জরিত। আর বেশি আপনার কাছে বলতে পারছি না।

মাবিয়া
তোমার কথা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি না পুত্র। কী না পাওয়ার ব্যাথায় আজ তুমি এমন করছো? মনে রেখো তুমি দামেস্কের রাজপতি সম্রাট মাবিয়ার একমাত্র পুত্র, এই অতুল ঐশ্বর্য, ধন-সম্পদ, অসংখ্য সৈন্য-সামন্ত সবই তোমার মাথায় শোভা পাবে। এরপর তোমার কিসের অভাব কী না পাওয়ার যন্ত্রণা?

এজিদ
তা বলতে আমার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে পিতা। তা আমি কিছুতেই আপনার কাছে প্রকাশ করতে পারছি না।১৮

কারবালার কেন্দ্রিক উপস্থাপনা ‘ইমামযাত্রা’ কড়া অঙ্গসাজ, বাস্তবানুগ পোশাক ও অভিনয় উপকরণে গীত-বাদ্য-সংলাপ সহযোগে মঞ্চে অভিনীত হয়। ‘ঢপযাত্রা’ ও ’ইমামযাত্রা’-য় নারী চরিত্রগুলোতে পুরুষেরা অভিনয় করে থাকে।

মধ্যযুগের বাংলা নাট্যের গবেষক ড. সেলিম আল দীন মহাভারতের পাঁচালি আঙ্গিকে পরিবেশনার কথা উল্লেখ করেন। শ্রী সুবোধচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত কাশী দাসী মহাভারতের শল্যপর্বে মহাভারতকে পাঁচালী লিখন বলে উল্লেখ করেছে-

 “কাশী রাম দাস কহে পাঁচালী লিখন
এতদূরে শল্য পর্ব করি সমাপন।”১৯

পাঁচালী ধারায় মহাভারতের নানা উপাখ্যানের রূপান্তর দেখা যায় উনিশ শতকে। দশরথি মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনী পাঁচালী রীতিতে পরিবেশন করেন। এ ধরনের পাঁচালীর মধ্যে আছে ‘রুক্মিনী হরণ’, ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ’ ইত্যাদি। মহাভারতস্থিত স্বর্গারোহনপর্বে মহাভারত কীর্তন আঙ্গিকে পরিবেশনের ইঙ্গিত আছে। মহাভারতের মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে সৌতি নৈমিষারণ্যের দ্বিজগণকে বলেন, তিনি মহাভারতকথা  কীর্তন করেছেন।
 
কারবালার প্রান্তরে ফোরাতপারে যুদ্ধে পানি নিমিত্ত আকাশ বিস্তারী হাহাকার, সীমারের নৃশংসতা, এজিদের কূটনীতি ইত্যাদি প্রসঙ্গ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মহরম মাসে ভাবাতুর করে তোলে। কারবালার যুদ্ধে দৌহিত্র হাসান হোসেন ও অন্যান্য চরিত্রের অন্তর্গত বেদনা নিয়ে এক ধরনের আহাজারিমূলক সুরে সাধারণত নৃত্য সহযোগে জারিগান পরিবেশিত হয়। জারি শব্দটির অর্থ বিলাপ বা ক্রন্দন। সাধারণত ভূমি সমতল বৃত্তাকার মঞ্চে সাদা অথবা লাল ধুতি বা পাজামার সাথে সাদা অথবা লাল ফতুয়া পরিধান করে একজন গায়েন, সহযোগী গায়েন, একদল নৃত্যকার দোহার, নৃত্যগীতের মাধ্যমে জারি পরিবেশন করেন। দোহার নৃত্যকগণ বৃত্তাকারে বিভিন্ন মুদ্রার তাল লয়ে নৃত্য পরিবেশন করেন ও গানে দুআ ধরেন। গায়েন দুজনের অবস্থান থাকে কখনো বৃত্তের বাইরে, কখনো বৃত্তের ভেতরে। মহাভারত ও কারবালার পুরাণ সংশ্লিষ্ট শিল্পরীতির উপস্থাপনা সাধারণত ধর্মীয় আচার বা পুণ্যনিমিত্ত। যুদ্ধকে উৎসাহিত করা সত্ত্বেও মহাভারত পাঠ বা উপস্থাপনায় উন্মত্ততা নেই। তদুপরি মহরম মাসে শোকাতুর শোভাযাত্রায় অভিযাত্রীরা নানাবিধ ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজেরাই নিজেদের ক্ষত বিক্ষত করে।

পাঁচ
তুলনা, প্রতি তুলনা ও নান্দনিক উৎকর্য বিচার

মহাভারতের কুরক্ষেত্র ও মুসলিম পুরাণের কারবালার যুদ্ধে সংঘটনের নেপথ্য কার্যকারণ হিসেবে নিয়াতিবাদ ক্রিয়াশীল ছিল। নিয়তিবাদ অভিধাটি গ্রীসের নাটক ও মীথ থেকে আহৃত। গ্রীসের পুরাণ ও নাটকে চরিত্র, ঘটনার পরিণাম অনেক ক্ষেত্রেই নিয়তি কর্তৃক নির্ধারিত। মহাভারতের নিবাতকবচপর্বাধ্যায়ে অর্জুন দেবরাজ ইন্দ্রকে গুরুদক্ষিণা স্বরূপ নিবাতকবচকে হত্যা করলে মাতলি বলেন ইন্দ্রই অর্জুনের দেহে নিবাতকবচকে হত্যা করেছেন। এটা পূর্বনির্ধারিত ঈশ্বরবিধি। অর্জুনের জন্মলগ্নে দেবতাদি কর্তৃক দৈববাণী হয়েছিল যে, এ ক্ষেত্রজ পুত্র পৃথিবী জয় করবে। এর যশ স্বর্গ স্পর্শ করবে। মহাভারতের ভগবদযান পর্বাধ্যায় কৃষ্ণ কর্ণ সংবাদ অংশে কর্ণের সংলাপে মহাভারতে নিয়তিবাদ সুস্পষ্ট হয়। কর্ণ কৃষ্ণকে বলেন, “মহাবাহু সব জেনেও কেন আমাকে ভোলাতে চাচ্ছো। এ পৃথিবীর ধ্বংস আসন্ন দুর্যোধন দুঃশাসন শকুনী আর আমি তার নিমিত্ত স্বরূপ। অন্যত্র যা অবশ্যম্ভাবী তা নিবারণ করা যাবে না।”২০

কারবালার পুরাণেও নিয়তিবাদের প্রামাণ্য পাওয়া যায়। মহানবী প্রথম থেকে জানতেন মোয়াবিয়া পুত্র এজিদই হাসান, হোসেনের হন্তারক হবে। একথা শ্রবণ করে মোয়াবিয়া নানা কৌশলে ধৈর্যে, সচেতনভাবে চেষ্টা চালিয়েও অমোঘ নিয়তির বাইরে যেতে পারেনি। কারবালার মীথে বর্ণিত আছে মহানবী ঈশ্বরের কাছে নীত হয়ে একটি সবুজ বর্ণ আরেকটি লোহিত বর্ণ ঘর দেখে জিজ্ঞাসা করলে জিবরাঈল উত্তর দিলেন, “সবুজবর্ণ গৃহ আপনার জ্যেষ্ঠ দৌহিত্র হাসানের জন্য লোহিতবর্ণ গৃহ কনিষ্ঠ দৌহিত্র হোসেনের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। বিষপান নিমিত্ত একজনের মুখমণ্ডল হবে সবুজ আর মস্তক ছেদন নিমিত্ত আরেকজনের মুখমণ্ডল হবে লোহিত বর্ণ।২১ অর্থাৎ দাস্ত কারবালায় যে নৃশংস ঘটনা তা ঈশ্বরলিপি অনুযায়ী সংগঠিত হয়েছে।

মহাভারতে দ্রোণাচার্য, ভীষ্ম, কৃষ্ণ, ভীম, প্রমুখ শ্রেষ্ঠজনেরা যুদ্ধবাজিকে প্ররোচিত করেছে। পক্ষান্তরে কারবালায় পানির জন্য হাহাকার অমানবিক হত্যাকাণ্ড যুদ্ধকে নেতিবাচক বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব শূদ্রদের পঠন ও অনুশীলন নিমিত্ত দয়াবশত যে পঞ্চমবেদ অর্থাৎ মহাভারত রচনা করেছেন প্রকৃত পক্ষে তাতে নানাভাবে শূদ্রদের হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে।

একলব্য ধনুর্বিদ্যা শিখতে চাইলে দ্রোণাচার্য নিচ জাতি বলে তাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করলেন না। দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় শর্তানুযায়ী কর্ণ ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শিতা দেখালেও শুধুমাত্র শূদ্র বলে দ্রৌপদী তাকে গ্রহণ করলেন না। পঞ্চপুত্রসহ নিষাদ জননীকে জতুগৃহে পুড়িয়ে মারা স্বত্ত্বেও পাণ্ডবদের সম্পর্কে একটু উচ্চবাচ্যও করলেন না পঞ্চমবেদ রচয়িতা। শান্তি পর্বে ভীষ্মের সংলাপে দৃষ্ট হয়- ভগবান-প্রজাপতি-ব্রাহ্মণাদি তিন বর্ণের দাসত্বের জন্য শূদ্রের সৃষ্টি করেছেন। শূদ্রদের অধিকার উদ্ধারের জন্য রূপায়িত মহাভারতে এরকম শূদ্র নির্যাতনের বহু উদাহরণ আছে।২২ মহাভারতের পরিণতি হয়েছে শুভ কার্যকারণের মধ্য দিয়ে- পাণ্ডবদের বিজয় নিমিত্ত। কারবালার পুরাণে হাসান হোসেনের নির্মম হত্যাকাণ্ড বর্ণিত হয়েছে- যা বর্ণনার প্রতিটি অক্ষরই যেন শোকের কালি।

টীকা ও তথ্যসূত্র:
১. সেলিম আল দীন, খায়েরুজ্জাহান মিতু। তুলনামূলক নাট্যতত্ব, থিয়েটার স্টাডিজ, জুন ২০০৫, সংখ্যা-১২, আষাঢ় ১৪১২।
২. বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ন ইতিবৃত্ত, ড. অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ন বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, ১০, বঙ্কিম চাটার্জী স্ট্রীট, কলিকাতা-৭০০০৭৩ পৃ- ৪৪।
৩. কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদ ব্যাস এর রাজশেখর বসুকৃত সারানুবাদিত মহাভারত থেকে প্রাপ্ত সূত্র: কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের জন্ম মহর্ষি পরাশরের ঔরসে ও অবিবাহিতা মৎসগান্ধার গর্ভে- দ্বাপর যুগে। কৃষ্ণ বর্ণের ছিলেন বলে এবং দ্বীপে ভূমিষ্ঠ হওয়ায় তার নাম কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন আর সর্বপ্রথম বেদের সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেন বলে অপর নাম বেদ ব্যাস। এজন্য তার মহাভারত পঞ্চম বেদ নামে কথিত।
৪. মীর মোশারফ হোসেন। বিষাদ-সিন্ধু, অবসর প্রকাশনী ৪৬/১ হেমন্দ্রদাস রোড, সূত্রাপুর, ঢাকা-১১০০, উপক্রমনিকা অংশ।
৫. এস. এম ইলিয়াছ। ঐতিহাসিক কারবালা, মেসার্স মজুমদার প্রিন্টিং প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স। বিসিক শিল্প নগরী, বাবুর হাট, চাঁদপুর। পৃষ্ঠা-১৯
৬. দুর্যোধন ভীমের লৌহমূর্তি নির্মাণ করে তাতে বিভিন্ন প্রকার অস্ত্র ক্ষেপণের অনুশীলন করতেন। কুরুক্ষেত্রে দুর্যোধনাদিরা শত ভ্রাতা নিহত হলে পিতা ধৃতরাষ্ট পাণ্ডব ভ্রাতাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য মিলিত হলেন। পাণ্ডবগণ প্রণাম করলে ধৃতরাষ্ট্র অপ্রীত মনে যুধিষ্ঠিরকে আলিঙ্গন করলেন এবং ভীমকে খুঁজতে লাগলেন। অন্ধরাজের দুষ্ট অভিসন্ধি বুঝে কৃষ্ণ তার হাত দিয়ে ভীমকে সরিয়ে দিলেন এবং ভীমের লৌহমূর্তি ধৃতরাষ্ট্রের সম্মুখে রাখলেন। অযুত হস্তীর ন্যায় বলবান ধৃতরাষ্ট্র সেই লৌহমূর্তি আলিঙ্গন করে ভেঙে ফেললেন। বক্ষে চাপ লাগিবার কারণে তার মুখ থেকে রক্তপাত হল, তিনি ভূমিতে পড়ে গেলেন, তখন কৃষ্ণ ধরে তুললেন। ধৃতরাষ্ট্র হা ভীম হা ভীম বলে আহাজারী করতে লাগলেন। কৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিলেন ভীম নয়, দুর্যোধন নির্মিত ভীমের লৌহমূর্তি আর তার ক্রোধ চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে।
৭. মীর মোশারফ হোসেন। আসর প্রকাশনা সংস্থা ৪৬/১ হেমন্দ্রদাস রোড, সূত্রাপুর, ঢাকা-১১০০, পৃ- ২৫৮
৮. সংশপ্তক: অজুর্নের হাতে যখন কৌরব সৈন্য সমূলে বিনাশ হচ্ছে তখন অযুত রথারোহী যোদ্ধার সহিত ত্রিগর্তরাজ সুশর্মা ও তার পাঁচ ভ্রাতা সত্য রথ, সত্য বর্মা, সত্যব্রত, সত্যেষ্ঠু, সত্যকর্মা, তিনি অযুত রথের সহিত মালব ও তুণ্ডিকেবগণ অযুত রথের সহিত মাবেল্লক ললিথ ও মদ্রকগণ এবং নানা রথী শপথ গ্রহণ উদযোগী হলেন। তারা পৃথক পৃথক অগ্নিতে হোম করে কুশ নির্মিত কৌপীন ও বিচিত্র কবচ পরিধান করিলেন এবং ঘৃতাক্তদেহে মৌর্বী মেঘলা ধারণ করে ব্রাহ্মণগণকে সুবর্ণ ধেনু ও বস্ত্র দান করলেন। তারপর অগ্নি প্রজ্বলিত করে উচ্চস্বরে ধনঞ্জয়কে বধের প্রতিজ্ঞা করলেন। এই প্রকার শপথ ও মরণপণ করে যারা যুদ্ধে যায় তারাই সংশপ্তক।
৯. চক্রব্যুহ: দ্রোণাচার্য পাণ্ডবদের যে কোন মহারথকে হত্যা করবে এই শপথে চক্রব্যুহ নির্মাণ করে তেজস্বী রাজপুত্রগণ নিয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন। দ্রোণের চক্রব্যুহ কেউ ভেদ করতে পারছে না। চক্রভেদ জানে অর্জুন- সংশপ্তক সৈন্যরা তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে সর্বদা ব্যস্ত রেখেছে। অভিমন্যুর উপর দায়িত্ব পড়লো চক্রব্যুহ ভেদ করার। কিন্তু অভিমন্যু ভেদ জানে, বাহির হতে জানে না। ভীম ও অন্যরা তাকে উদ্ধার করবে বলে তার অনুগমন করলেন। দ্রোণের সম্মুখেই অভিমন্যু চক্রব্যুহ ভেদ করলেন। অভিমন্যু ব্যুহপ্রবেশের যে পথ করেছিলেন জয়দ্রথ তা রুদ্ধ করে দিলেন। চক্রব্যুহ এক ধরনের যুদ্ধকৌশল। মহাভারতে দ্রোণাচার্যের চক্রব্যুহ নির্মাণ উপরিস্থিত বর্ণনা থেকে কৌশলটি সর্ম্পকে ধারণা পাওয়া যায়।
১০. খোৎবা: প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় কোরআন শরীফ থেকে নির্বাচিত অংশ সুর করে পড়ার নাম খোৎবা। ইসলাম ধর্মের প্রাথমিক পর্বে খোৎবা পাঠকালে তদীয় রাজার নাম পাঠ করা হতো।
১১. রাজশেখর বসু অনূদিত। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসকৃত মহাভারত, নবযুগ প্রকাশনী, বাংলা বাজার, ঢাকা-১১০০, পৃ-৫৯৭
১২. গবেষক ড. আফসার আহমদ থেকে প্রাপ্ত কথ্য।
১৩.  রাজশেখর বসু অনুদিত। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত মহাভারত, নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা-১১০০, পৃ-৫৯৭
১৪. ড. সেলিম আল দীন। মধ্যযুগের বাংলানাট্য, বাংলা একাডেমি,ঢাকা। পৃ-৬৩
১৫. সাইমন জাকারিয়া। বাংলাদেশের লোক নাটক: বিষয় ও আঙ্গিক বৈচিত্র্য, বাংলা একাডেমি, ঢাকা। পৃষ্ঠা-১৭৭
১৬. প্রাগুক্ত - পৃ-৩৫৫
১৭. প্রাগুক্ত - পৃ-১৮০-১৮১
১৮. প্রাগুক্ত - পৃ-৩৫৮-৩৫৯
১৯. ড. সেলিম আল দীন। মধ্যযুগের বাংলানাট্য, বাংলা একাডেমি,ঢাকা। পৃ-৯৫
২০. রাজশেখর বসু অনুদিত। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসকৃত মহাভারত, নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা-১১০০
২১. মীর মোশারফ হোসেন। বিষাদ-সিন্দু, আসর প্রকাশন ৪৬/১ হেমন্দ্রদাস রোড, সূত্রাপুর, ঢাকা-১১০০, পৃ-৬১
২২. রণজিৎকর। সনাতনধর্ম: মত ও মতান্তর, সূচীপত্র, ৩৮/২ক বাংলাবাজার, ঢাকা। পৃ-৫৬

আনন জামান : নাট্যকার