Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আমাদের প্রাসঙ্গিক নাটক প্রযোজনা প্রসঙ্গে

Written by এম. এ. সবুর.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

মঞ্চে নিয়মিত নাট্যচর্চা এবং নাট্য আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতার সোনালী ফসল। এই ফসল আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধ উত্তর সময়ে চাষবাস শুরু করেছিলাম। নাটকের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক তীব্র স্রোত বইতে শুরু করেছিলো তখন। সেই স্রোত রাজধানী ঢাকা থেকে ছড়িয়ে পড়েছিলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বলা যায় এদেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রথম ঢেউ ছিলো তা। সত্তুর থেকে মধ্য আশি পর্যন্ত সময়ে যে নাটকগুলো আমাদেরকে ভীষণভাবে স্পর্শ করতো তার মধ্যে ইবলিশ, ওরা কদম আলী, সাত পুরুষের ঋণ, নানকার পালা, এখন দুঃসময়, সুবচন নির্বাসনে, কেরামত মঙ্গল, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরলদীনের সারাজীবন, কিত্তনখোলা, সমতট ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। স্মৃতিতে ভাসে ভীষণ ভালোলাগবার সেই দিনগুলোর কথা। মঞ্চে জীবন ঘনিষ্ট নাটক দেখে একটা প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলে আমরা তখন ঘরে ফিরেছি। এখনো মনে হয়- এই তো সেদিনের কথা। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন ধ্বস নামতে শুরু করলো আমাদের নাট্যমঞ্চে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে নাট্যমঞ্চে এক নীরব পরিবর্তন ঘটতে শুরু করলো। আমরা ক্রমান্বয়ে দেখতে পেলাম জীবন বিবর্জিত, অপ্রাসঙ্গিক এবং হাস্যরসে ভরা কিছু নাটক গ্রাস করতে শুরু করেছে আমাদের নাট্য আন্দোলনকে। সম্ভবত তখন থেকেই এক অশুভ মেঘ এসে ঢেকে দিতে শুরু করেছিলো আমাদের নাট্য আন্দোলনের উদ্ভাসিত আকাশকে।

আজ আমরা সমাজ বদলের স্লোগান থেকে অনেক দূরে। নাটকের এই পালা বদলের পথ ধরে শুরু হয়েছে দর্শক বদল, দর্শকের রুচি বদল। আজকে দর্শক নাটক দেখতে এসে খোঁজ করেন- ‘হাসির নাটক’ মঞ্চায়ন হবে কি না? আজকে অধিকাংশ দলের নাটকের পোস্টার এবং বিজ্ঞাপনে ক্যাপশন করে লেখা থাকে- ‘দম ফাটানো হাসির নাটক’। কঠিন জীবন সংগ্রামের ভেতর থেকে নাটক আর উঠে আসছে না আজকে। কাল্পনিক কাহিনী, স্থূল বক্তব্য, আর সুরসুরি দিয়ে হাসানোর এক অদ্ভুত খেলা চলছে আমাদের নাট্যমঞ্চে। ক্রমান্বয়েই মঞ্চ থেকে নিভে যাচ্ছে আলোকের শিল্পীত শিখা। এখন অধিকাংশ নাটকে মঞ্চব্যাপী জ্বলে খা-খা আলো; তীব্র আলোক সর্বত্র। কোত্থাও যেন কোনো অন্ধকার নেই। যেন সমস্ত অন্ধকারকে নিভিয়ে দিয়ে আমরা উদ্ভাসিত করেছি আমাদের নাট্যমঞ্চকে- ‘আলোকে; প্রখর আলোকে’। প্রখর আলোর নিচে আমরা এখন ভাঁড়ামী দেখি, আষাঢ়ে গল্প শুনি নাট্যশিল্পীদের মুখ থেকে। এখন অধিকাংশ নাটকে আলোকের শিল্পীত প্রয়োগ নেই। আলোকতো আমাদের জীবনের মতোই; কখনো প্রখর, কখনো স্নিগ্ধ, কখনো প্রচ্ছন্ন। সকালে-বিকেলে অথবা রাতে আলোর সঙ্গে আছে ছায়া, আলোর কাছেই আছে অন্ধকার; যেমন জীবনের পরতে পরতে আছে সুখ আর দুঃখ, হাসি আর কান্না, আনন্দ আর বেদনা। কিন্তু জীবনের সঙ্গে খাপখাইয়ে আলোকের প্রয়োগ আমরাতো আর দেখছি না অধিকাংশ দলের নাটকে। ভৌতিক সংমিশ্রণ-আলোকে, পোশাকে, মেকআপে, সেটে, কাহিনীতে আর অভিনয়ে। অধিকাংশ দলের নাটকই এখন এই দোষে দুষ্ট। এ যেন এক বিরাট ধ্বংস নামতে শুরু করেছে আমাদের সোনালী জমিনে। ক্রমেই সমাজ বদলের হাতিয়ার শুধুই হাসি আর তামাসার বাতিঘরে পরিণত হচ্ছে। নাটক প্রযোজনার এই সঙ্কটকালে বিষয়গুলো কেন ঘটছে? কীভাবে ঘটছে? এসব নিয়ে কিছু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা একান্ত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ।

উল্লেখ্য, আজকে আমরা যেমন প্রাসঙ্গিক নাটক প্রযোজনা নিয়ে সঙ্কটে নিপতিত, ঠিক তেমনি এই সঙ্কট বারবার সংক্রমিত হয়েছে ভারতে, বিশেষ করে কোলকাতায়। নাটক প্রযোজনার প্রাসঙ্গিকতার সঙ্কটকালে একবার ঋত্বিক ঘটক সম্পাদিত ‘অভিনয় দর্পণ’ পত্রিকার ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত সম্পাদকীয় মন্তব্যে তখনকার কিছু নাটককে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কহীন; মেকী ও কৃত্রিম বলে ঘোষণা করেন এবং ‘গণনাট্য’ নামের পরিবর্তে ‘সৎনাট্য’, ‘নবনাট্য’ প্রভৃতি ব্যবহার তাঁর মতে অন্যায়। তাঁর মতে ন্যাকামীভিত্তিক এবং বিদেশী ধার করা নাটক বেশিদিন চলবে না। কারণ মহাকাল এবং মানুষ এইসব প্রচেষ্টা ক্ষমা করবে না। ঋত্বিক ঘটকের মতে যে তীব্র আদর্শ নিয়ে গণনাট্য আরম্ভ হয়েছিলো তার কিছুই তিনি দেখতে পান না ঐ সব প্রচেষ্টার মধ্যে। আরো উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে অভিনয় দর্পণ পত্রিকাটি নাম পরিবর্তন করে ‘অভিনয়’ নামে আত্মপ্রকাশ করে এবং একই বছর এই পত্রিকাটি প্রাসঙ্গিক নাটক প্রযোজনার উপর একটি আলোচনার আয়োজন করে। এই আলোচনায় বিখ্যাত ‘নবান্ন’ নাটকের নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য বলেন- ‘পশ্চিম বাংলার নাট্যাভিনয়ের দু’টি ধারা, যথা- মৌলিক নাটক এবং অনুবাদ নাটক’। অনুবাদ নাটকের কথা উল্লেখ করে ব্রেশট অনুসারী নাটক প্রযোজনার সমালোচনায় বিজন ভট্টাচার্য বলেন- ‘জার্মানিতে যেখানে সব মানুষ অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন সেখানে যা চলছে তা অধিকাংশ নিরক্ষর মানুষের দেশে চলতে পারে কি না তা ভেবে দেখা দরকার। আমাদের দেশের কৃষক শ্রমিকদের সঙ্গে জার্মানির কৃষক শ্রমিকদের কোনো মিল নেই। তাছাড়া আমরা একটা অসুস্থ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছি। রাজনীতি থেকে তাই দূরে থাকা সম্ভব নয়। আমাদের মাঠের সত্য, শ্রমিক কৃষকের নাড়ির ভিতরকার সত্যকে সংস্কৃতির কর্মীরা যখন গ্রহণ করে আপন আপন প্রবাহে রূপ দেবেন তখনই আমরা সফল হবো। স্যাঁত্রে স্যাঁত্রে করে চেঁচিয়ে গলা শুকিয়ে ফেল্লেও কোনো কিছু হবে না। ব্রেশট এসেছেন ... ব্রেশট যে কোনো সময় চলেও যেতে পারেন। আমাদের নাটকের ক্ষেত্রে সমসাময়িকতা কতখানি এসেছে?’ এ দেশের দুরাবস্থাকে নাট্যকারদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন,- ‘সমাজকে অস্বীকার করা, বৃহত্তর জনসাধারণ থেকে সরে আসা এক ধরনের চরিত্রহীনতা।’

১৯৭০ সালের বিজন ভট্টাচার্যের সাক্ষাৎকার পড়ে মনে হয়- এখন ‘চরিত্রহীনতাই’ আক্রান্ত করেছে আমাদের অধিকাংশ নাট্যদলকে, দলের কর্মীদের এবং নাট্যকারদের। তা না হলে ১৯৭০ সালে বিজন ভট্টাচার্য যেমন উপলব্ধি করেন- ‘আমরা একটি অসুস্থ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছি। রাজনীতি থেকে তাই দূরে থাকা সম্ভব নয়’। আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি দীর্ঘ ২৭ বছরেও কী আমাদের রাজনীতি মুখ দেখেছে সুস্থতার? সমাজ কি মুখ দেখেছে সুস্থতার? অসুস্থ রাজনীতি, অসুস্থ অর্থনীতি, অসুস্থ সমাজ, পশ্চাৎপদ শিক্ষা, মূল্যবোধহীন মানুষ .... চারদিক থেকে প্রতিনিয়ত অক্টোপাসের মতো ঘিরে ধরেছে আমাদের। দিন দিন আমরা নিপতিত হচ্ছি অন্ধকারে, গহীন অন্ধকারে। খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি, বেকারত্ব আর সীমাহীন দারিদ্র্য চারদিক থেকে যখন আমাদের গ্রাস করছে চরমভাবে, তখন আমরা, সমাজ বদলের নাট্যকর্মীরা মহিলা সমিতি অথবা গাইড হাউসে মঞ্চস্থ করছি দম ফাটানো হাসির নাটক।- ‘চরিত্র আমাদের কোথায়’?

ব্যাঙের ছাতার মতো একদিক থেকে যেমন গড়ে উঠছে নাট্যদল, ঠিক তেমনি কচুরিপানার মতো সৃষ্টি হচ্ছে নাট্যকার। আজ ক’জন নাট্যকার এই সামাজিক অবক্ষয়ের কাছে দায়বদ্ধ?- এই দায়বদ্ধতার অভাবেই সৃষ্টি হয় বাস্তব বিবর্জিত দম ফাটানো হাসির নাটক এবং নাটক হারায় প্রাসঙ্গিকতা।

শিল্পের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে লেনিন বলেছেন- ÔNo art is art unless it is politicalÕ আসলেই জীবন থেকে শিল্প উঠে না আসলে সে শিল্প প্রকৃত অর্থে কোনো শিল্প হয় না। আর পৃথিবীর কোনো একজন মানুষের জীবনও রাজনীতির বাইরে নয়। হয় তিনি রাজনীতির নিয়ন্ত্রক অথবা তিনি রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; হয় তিনি শোষক অথবা তিনি শোষিত। সুতরাং আমরা দেখছি কোনোদিন এবং কখনোই মানুষের জীবন রাজনীতির বাইরে নয়। তাই সমসাময়িক রাজনীতিকে অস্বীকার করে নাটক অথবা সাহিত্য যাই রচনা করা হোক না কেন, প্রকৃত অর্থে তার ভিতরে কোনো শিল্প থাকতে পারে না। দ্রব্যমূল্য যখন মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে, ফুটপাত আর বস্তি যখন প্রতিদিন ভরে উঠছে উদ্বাস্তু, উন্মুল মানুষের ভীড়ে, দিন দিন ভূমিহীন আর সর্বহারা মানুষের সংখ্যা যখন বাড়ছে- তখন দম ফাটানো হাসির নাটক প্রকৃত অর্থেই কি কোনো প্রাসঙ্গিক কিছু?

প্রাসঙ্গিকতার এই সঙ্কটকালেই উৎপল দত্ত ১৯৭০ সালে ‘অভিনয়’ পত্রিকায় বলেছিলেন- ‘পশ্চিম ইউরোপ আর নতুন কিছু দিতে পারে না, কারণ, সে দেশের মঞ্চ ধনতান্ত্রিকদের নিয়ন্ত্রণে। আমাদের দেশের মুখোপাধ্যায়কে ছেড়ে মণ্ডল ও মাইতিকে নাটকের হিরো করতে হবে। শ্রমিক, কৃষক ও জনতার জন্য নাটক, বুদ্ধিজীবীদের জন্য পরে ভাবলেও চলবে’। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি বলেছেন- ‘বিচ্ছিন্নতা, অ্যাবসার্ডিটি, একাকিত্ব প্রভৃতি নিয়ে নাটক করা অর্থহীন; অথচ এই সব রোগে এখন বাংলা নাটক ভুগছে। অপরপক্ষে তরুণরা লড়াই করে পুলিশের পেটানি অথবা গুলিতে মরছে। এই ছেলেগুলোইতো নাটকের হিরো হতে পারতো।

১৯৭০ এক কোলকাতার প্রেক্ষাপটে উৎপল দত্তের আলোচনা আজ ১৯৯৯ সালের বাংলাদেশের জন্যেও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। স্বাধীন বাংলাদেশেও বারবার গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, আমরা হয়েছি সামরিক স্বৈরাচারের বন্দুকের তলায় বন্দি। এই বন্দি দশায় বারবার এদেশের ছাত্র সমাজ রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছে, ফিরিয়ে এনেছে গণতন্ত্র। অথচ আমাদের নাটকের বিষয়বস্তুতে তরুণদের রক্তদানের বিষয়বস্তু নেই তেমন একটা। দুঃখজনক হলেও সত্যি- শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে কবি শামসুর রাহমান যখন কবিতা লেখেন- ‘বুক তাঁর বাংলাদেশের হৃদয়’। ঠিক তখনই আমরা, সমাজ বদলের নাট্যকর্মীরা শহীদ নূর হোসেনকে ব্যবহার করি দম ফাটানো হাসির নাটকে। মুক্তিকামী একজন মানুষের বুলেটবিদ্ধ রক্তাক্ত দেহকে সামনে রেখে আমরা তখন নাচি অথবা গান গাই। মুক্তিকামী একজন মানুষের মৃত্যুদৃশ্য দেখে আমাদের অশ্রু আর আসে না। অদ্ভুত শক্তি এই বিচ্যুতির। কে করবে এই অপরাধের বিচার? অবশ্য পথনাটকের এই হাসি খেলার মধ্যেও মান্নান হীরা, আব্দুল্লাহেল মাহমুদ, এস এম সোলায়মান এবং মামুনুর রশীদ সহ বেশ ক’জন নাট্যকার বেশ কিছু সিরিয়াস পথনাটক লিখেছেন এবং আমাদের রাজপথের মানুষেরা সে সব নাটক বেশ ধৈর্যের সঙ্গে দেখেছেন এবং এ সব নাটকের মর্মকথা বোঝার চেষ্টা করেছেন।

বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে প্রাসঙ্গিক নাটক প্রযোজনার ভীষণ এক সঙ্কট যাচ্ছে। এর মাঝেও আমাদের দেশে মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন, সৈয়দ শামসুল হক, আব্দুল্লাহেল মাহমুদ, মান্নান হীরা সহ বেশ ক’জন নাট্যকার দেশের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক নাটক রচনা এবং মঞ্চায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রাসঙ্গিক নাটক প্রযোজনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ আসলেই একটি বিস্তৃত ব্যাপার। তারপরও খুব সরলভাবে দু’টি জিনিসকে সামনে রেখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। প্রথমত- একজন নাট্যকার সমসাময়িক সামাজিক সংগতি এবং অসংগতিগুলোকে কীভাবে উপলব্ধি করেন এবং বিষয়গুলো নিয়ে লিখবার মত দায়িত্ববোধ তাঁর ভেতরে কাজ করে কি না? দ্বিতীয়ত- কোনো নাট্যদল সমসাময়িক বিষয়ের নাটক মঞ্চস্থ করবার গুরুত্ব আদর্শগতভাবে উপলব্ধি করে কি না? যদি নাট্যকার এবং নাট্যদলের আদর্শগত সামঞ্জস্য থাকে তবেই সফল প্রাসঙ্গিক নাটক প্রযোজনা সম্ভব। আমাদের দেশে আরণ্যক, ঢাকা থিয়েটার, থিয়েটার, নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় সহ অনেক দল আছে যারা সমাজ এবং মানুষের কাছে দায়বদ্ধ। কিন্তু সংক্ষিপ্ত আলোচনার স্বার্থে আমরা মাত্র তিনটি নাটক প্রসঙ্গে আলোচনা করবো। আমরা আলোচন করবো কোলকাতার- ‘নবান্ন’, বাংলাদেশের ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ এবং ‘ইবলিশ’ নাটক প্রসঙ্গে।

প্রসঙ্গ : নবান্ন

আমরা জানি ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর সারা বাংলায়, বিশেষ করে কোলকাতায় ভীষণ এক মর্মস্পর্শী চিত্রের সৃষ্টি করেছিলো। সেই মন্বন্তর বিজন ভট্টাচার্যকে স্পর্শ করেছিলো ভীষণভাবে। সে সময় প্রতিদিন অফিস যাবার পথে বিজন ভট্টাচার্য দেখতেন বুভুক্ষু মানুষের সংসারযাত্রা। নারী, পুরুষ, শিশুর সংসার। নিত্যদিনের এই বুভুক্ষু মানুষের মৃতদেহ তাকে স্পর্শ করলো ভীষণভাবে- বিজন ভট্টাচার্য কলম ধরলেন নাটক লিখতে। রচনা করলেন ‘নবান্ন’ নাটক। তিনি ‘নবান্ন’ নাটকের শরীর নির্মাণ করেছেন উদ্বাস্তু উন্মুল মানুষের শেকড় গ্রাম থেকে এবং এর বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন কোলকাতা শহর পর্যন্ত। পুলিশ, সাংবাদিক, মহাজন, আড়তদার কাউকে ছাড়েন নি তিনি। ‘নবান্ন’ নাটকে আমরা দেখি দুর্ভিক্ষে গ্রাম থেকে উঠে আসা ‘কুঞ্জ’ ডাস্টবিনের পঁচা খাবারের জন্য কুকুরের সঙ্গে যুদ্ধ করে। সেই যুদ্ধ আমাদের মানবিকতার শিরা উপশিরাকে স্পর্শ করে। কুঞ্জ তার ক্ষত বিক্ষত হাতখানা তুলে ধরে সামনের দিকে আগায়। ‘রাধিকা’ নিজের পড়নের কাপড় ছিঁড়ে কুঞ্জের হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধে। নেপথ্যে কুকুরের গোঙ্গানী আর মঞ্চে আহত কুঞ্জের রক্তাক্ত হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে রাধিকা ক্ষীণ কণ্ঠে কুঞ্জকে বলে- ‘খুব যন্ত্রণা হচ্ছে, না! জল এনে দিবো, জল? একটু জল খাবে’? ছোট্ট একটি ‘না’ শব্দ উচ্চারণ করে অশ্রুসিক্ত চোখে কুঞ্জ তাকিয়ে থাকে রাধিকর দিকে। রাধিকাও ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কুঞ্জের দিকে। অশ্রুসিক্ত দু’জন মানুষের অভিব্যক্তি স্পর্শ করে অডিটরিয়ামের সকল নাট্যদর্শকের হৃদয় এবং দর্শক একাকার হয় অশ্রুপাতে। বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটক তখন আর বাংলা নাটকের কোনো গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ‘নবান্ন’ হয়ে ওঠে বিশ্বমানের কালোত্তীর্ণ শিল্প। যে শিল্প জীবন এবং সংগ্রামের গভীর তলদেশ থেকে উঠে আসে। এ কারণেই ‘নবান্ন’ হাজার বছর বেঁচে থাকবে এই বাংলায় এবং এই বিশ্বে। এই বিশ্বের কোনো খণ্ড মৃত্তিকায় মানুষ যতদিন অন্নের অভাবে রাস্তায় পড়ে মরবে, মন্বন্তরের কালো মেঘ যখন নেমে আসবে এই বিশ্বের কোনো এক কোণে- ‘নবান্ন’ ততদিন জীবন্ত এবং প্রাসঙ্গিক থাকবে বিশ্বজোড়া মানুষের কাছে।

প্রসঙ্গ : নূরলদীনের সারাজীবন

যুগ যুগ ধরে এই বাংলার মানুষকে সংগ্রাম করতে হয়েছে সামন্ত প্রভূদের বিরুদ্ধে, বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। এই বাংলার মানুষের রাজনৈতিক মুক্তি আর অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক যখন কলম ধরেন তখন ১১৮৯ (বাংলা) সনের নীল বিদ্রোহের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয় তাঁর কাছে। সৈয়দ হক মৃত্যুর গহ্বর থেকে নূরলদীনকে তুলে আনেন আলোকিত মঞ্চে। তিনি লেখেন-

‘যখন শকুন নেমে আসে এই সোনার বাংলায়
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়’।

আজকের অবক্ষয়ের বাংলাদেশে কৃষক যখন ঘুমিয়ে থাকে, নিথুর ঘুমে, সৈয়দ হক তখন জাগাতে চান, তিনি তাঁর স্বপ্ন আঁকেন নাটকের ভাষায়, তিনি লেখেন-

‘অভাগা মানুষ যেন জেগে উঠে আবার এ আশায় যে-
আবার নূরলদীন একদিন আসিবে বাংলায়,
আবার নূরলদীন একদিন কালপূর্ণিমায়
দিবে ডাক- জাগো বাহে কোনঠে সবায়’?

ঘুমিয়ে পড়া বাংলার মানুষের মাঝ থেকে একজন সেনাপতি তিনি খোঁজেন। তাই মৃত নূরলদীনকে তিনি জাগিয়ে তোলেন, আবারো নূরলদীনকে দাঁড় করিয়ে দেন ক্ষত বিক্ষত সমাজের মাঝখানে। আজকের এই অসুস্থ সমাজে মুক্তির একাগ্র চিত্তেই তিনি বারবার খোঁজেন আর একজন নেতা, আর একজন নূরলদীন, যাঁর কণ্ঠে শুনতে চান- ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’? আজকে শোষণে, নিপীড়নে, নির্যাতনে বাংলার মানুষ মেরুদণ্ডের শক্তি হারিয়ে যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। সৈয়দ হক তাঁদের জাগাতে চান। মানুষের মুক্তির একাগ্র স্বপ্ন নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক নীলকরদের বিরুদ্ধে নূরলদীনের যে ঐতিহ্যমণ্ডিত যুদ্ধের স্মৃতি চিহ্ন এঁকেছেন- সেই চিহ্ন চিরকাল বেঁচে থাকবে বিশ্বসাহিত্যো, সংস্কৃতিতে। যতদিন এই বাংলায় এবং এই বিশ্বে মানুষকে যুদ্ধ করতে হবে- শৃঙ্খল মুক্তির যুদ্ধ, অধিকার আদায়ের যুদ্ধ, ততোদিন- ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ প্রাসঙ্গিক থাকবে বিশ্বজোড়া।  

প্রসঙ্গ : ইবলিশ

বিপ্লব ছাড়া মুক্তি নেই। এই স্বপ্ন যখন মামুনুর রশীদকে পোড়ায়, মামুনুর রশীদ ‘ইবলিশ’ নাটকে আঁকেন কীভাবে সমস্ত বাংলাদেশে নইমুদ্দীন, মজনু, আতসী আর রফিকদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ প্রতিনিয়ত ইবলিশ একাব্বর মেম্বর, ফজল শিকদার আর মুন্সীদের সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। পশ্চাৎপদ ফিউডাল গ্রাম বাংলায় মার্কসবাদের দীক্ষিত চোখ দিয়ে নাট্যকার মামুনুর রশীদ আঁকেন সমাজ বিকাশের classical stratification, সামন্ত প্রভূদের প্রেত একাব্বর মেম্বর, ফজল শিকদার আর মুন্সীদের সাথে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় বিভক্ত হয় স্পষ্টত দু’টি দল; ‘শোষক এবং শোষিত’। একপক্ষে মেম্বর, শিকদার আর মুন্সী এবং অন্যপক্ষে কিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতীক নইমুদ্দীন, আতসী, মজনু, রফিক সহ শোষিত গোষ্ঠী। ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ক্রমেই স্পষ্ট শোষক এবং শোষিতের লড়াই। পশ্চাৎপদ গ্রামে আসে বিজলী বাতি, ক্ষয়িঞ্চু পশ্চাৎপদ কৃষি ব্যবস্থার ভেতর থেকে সুতা, রঙ আর তাঁত নিয়ে শুরু হয় শিল্পের বিকাশমান যাত্রা। নিয়ম মাফিক বাধ সাধেন মেম্বর, ফজল সিকদার। ষড়যন্ত্রের চরম পর্যায়ে তাঁতী পাড়ায় আগুন জ্বলে। ছোট গ্রামের পক্ষ-বিপক্ষ খুবই স্পষ্ট। ষড়যন্ত্রকারীদের সহযোগী গরীবুল্লা আর জসিমকে ধরে ফেলা হয়। একাব্বর মেম্বরকে দেয়া হয় আগুনের ছ্যাঁকা। শুরু হয় পক্ষ বিপক্ষের বিচার পালা। কিন্তু সর্বশান্ত নইমুদ্দীন আর আতসী এই বিচারের মাধ্যমে ভুলতে পারে না দারিদ্রের গ্লানি, শোষণের রোষানলে পোড়ানো জীবনের সেই সব দুঃখ, কষ্ট আর বঞ্চনার স্মৃতি। শত্রু মিত্রের এই বিচার পালায় কেবলই অন্তরের ক্রন্দন বাড়ে আতসী নইমুদ্দীনের। এই ক্রন্দন তখন আর ‘ইবলিশ’ নাটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই ক্রন্দন তখন কালোত্তীর্ণ এক শিল্পে পরিণত হয়, এই ক্রন্দন তখন পৃথিবীর সর্বস্তরের সর্বহারা শ্রেণীর ক্রন্দনে রূপান্তরিত হয় এবং ‘নূরলদীন’ অথবা ‘নবান্নের’ মতো ‘ইবলিশ’ ও বেঁচে থাকে হাজার বছর- পৃথিবীর শিল্পে, সাহিত্যে, সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। নাটকের শেষে বিপ্লবী মানুষের প্রতীক রফিক তার সহযোদ্ধা বোন (প্রতিবেশী) আতসীর মৃতদেহকে সামনে রেখে বলে- ‘আতসী, বইন আমার ঐযে তাঁতের আওয়াজ হোন, নতুন তাঁতের আওয়াজ’। তাঁতের খট খট শব্দ ভেসে আসে মঞ্চে। এ শব্দ যেন বিনির্মাণের জন্যে নতুন পদধ্বনি, যে ধ্বনি কখনোই থেমে থাকে না। সমাজ এগিয়ে চলে নিজ গতিতে, সমাজের মধ্যে চলে মানুষের পক্ষ-বিপক্ষের সংঘাত, এবং তার মাঝ থেকেই বিকশিত হয় নতুন সমাজ, এই সমাজ বিকাশের জন্যই সর্বহারা শ্রেণী খোঁজেন তাঁদের সহযোদ্ধাদের। তাঁতের খট খট শব্দের সঙ্গে সংগ্রামের আহ্বান আসে তালবেলেম আর মেরাজুলের কণ্ঠে সমস্ত মঞ্চ- ‘জাগো, জোগো, জাগো,’ রবে মুখরিত হয়ে ওঠে। এ যেন বিপ্লবের আহ্বান ধ্বনি বেজে ওঠে সমস্ত মঞ্চে।

প্রাসঙ্গিক নাটক নিয়ে মামুনুর রশীদ, সৈয়দ শামসুল হক অথবা বিজন ভট্টাচার্যই শুধু কাজ করেন নি। কাজ করেছেন সেলিম আল দীন। তাঁর ‘কিত্তনখোলা’ অথবা ‘কেরামতমঙ্গল’ সহ অনেক নাটকই ‘ইবলিশ’ অথবা ‘নূরলদীনের’ মতোই আমাদের সংগ্রাম আর ঐতিহ্যের গান গায় সর্বক্ষণ। এই প্রসঙ্গে আরো একটি কথা বলতেই হয়- কোলকাতায় গণনাট্য সংস্থা ১৯৪৪ সালে ‘নবান্ন’ নাটক প্রযোজনা করে, বাংলাদেশে ‘ইবলিশ’ এবং ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, যথাক্রমে আরণ্যক এবং নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের প্রযোজনা। ‘কিত্তনখোলা’ আর ‘কেরামতমঙ্গল’ ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনা। গণনাট্য সংস্থা ভারতের  কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শে অনুপ্রাণিত, আর আরণ্যক গণমানুষের কাছে দায়বদ্ধ, ঢাকা থিয়েটার অথবা নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত। সুতরাং এরা গণমানুষের নাটক প্রযোজনা করবেন এবং করছেন এটাইতো স্বাভাবিক। ‘দম ফাটানো হাসির নাটক’ এদের প্রযোজনা হতে পারে না।

প্রাসঙ্গিকতার চরম সঙ্কটে যখন বাংলাদেশের বর্তমান নাট্যচর্চা, তখন ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলিয়ে বলতেই হয়- এই সঙ্কট থেকে উৎরাবার জন্য প্রয়োজন- কমিটমেন্ট, প্রয়োজন সমাজ এবং শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা। হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত বিদগ্ধ এই বাংলায় রয়েছে- বাউল, লালন, হাসন রাজা। রয়েছে- কীর্তন, জারী, সারী, গম্ভিরা, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, কবিগান, পালাগান সহ হাজারো উপকরণ। বাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে রয়েছে কামার, কুমার, তাঁতী, জেলে। রয়েছে লক্ষ কোটি কদম আলী, তেভাগার কৃষক। হাজার বছরের নদীভিত্তিক সভ্যতা আর সংস্কৃতি আমাদের। এই বাংলায় নদীভাঙন, বন্যা, খরা আর জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে কোটি কোটি মানুষ, যেদিক চোখ যায় বিস্তীর্ণ জীবন এবং সংগ্রামে ভরা আমাদের কৃষ্টি আর ঐতিহ্য। প্রসঙ্গেরতো অভাব নেই আমাদের এই হাজার বছরের ঐতিহ্য মণ্ডিত বাংলাদেশে। কেবলমাত্র প্রয়োজন দায়বদ্ধ কিছু মানুষ এবং সংগঠন। নতুনভাবে যারা সংগঠন করছেন তাঁদের প্রয়োজন কমিটমেন্টটা ঠিক করা, নিজেদের কাজগুলো অর্থপূর্ণ করে তুলতে হলে প্রয়োজন দিক নির্দেশনা ঠিক করা। সব শেষে কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষায় বলতে হয়-

    ‘দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন করো- কোন পক্ষে যাবে?
    একদিকে বিত্তবান,
    অন্যদিকে বিত্তহীন ক্ষুধার্ত মানুষ।
    একদিকে পুঁজিবাদ,
    অন্যদিকে সাম্যবাদী শান্তির সমাজ।
    ইতিহাস সাক্ষী দ্যাখো, অনিবার্য এই লড়াই- কোন পক্ষে যাবে’?

প্রাসঙ্গিকতার এই সঙ্কটকালে নাট্যাঙ্গনের বন্ধুদের সবিনয়ে বলতে চাই- এখন সময় এসেছে পথ নির্ধারণ করবার, আর কালক্ষেপন নয়, সাংস্কৃতিককর্মীদেরই আগে জাগতে হয়, তারপর জাগে অন্য সকলে।

সুতরাং বাংলার ইতিহাসে ব্যর্থতার গ্লানি আরো পরবর্তি ২৭ বছর আমরা লেপন করতে পারি না। আসুন, সংস্কৃতিকর্মী বন্ধুরা, এই দেশ এবং দেশের মানুষ, আমাদের যুদ্ধ, ঐতিহ্য, প্রাপ্তি এবং প্রত্যাশা নিয়ে কিছু ভাবি এবং কাজ করি। কাজতো আমরা করছি। প্রতিনিয়ত পকেটের অর্থ ব্যয় করে, মূল্যবান সময় দিয়ে, মেধা দিয়ে এবং শারীরিক শ্রম দিয়ে আমরা যে কাজটুকু করছি; আসুন, সেই কাজটুকুই আমরা অর্থবহ কাজে পরিণত করি। তবেই আমাদের নাটক ফিরে পাবে প্রাসঙ্গিকতা।

এম. এ. সবুর : নাট্যকর্মী, সদস্য, নাগরিক নাট্যাঙ্গন