Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আগুস্তো বোয়াল ও আশির দশকের সেই ধাক্কা

Written by মলয় ভৌমিক.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

আশির দশকে আমাদের নাট্যাঙ্গনে ব্রাজিলের আগুস্তো বোয়াল’র নাট্যধারা স্বল্পস্থায়ী, তবে তাৎপর্যপূর্ণ একটা ধাক্কা দিয়েছিল। বোয়াল’র ভাবনার ক্ষীণধারাটি এখন শুকিয়ে গেলেও কিছু কিছু গভীর খাদ এদেশের নাট্যের মূলধারার সাথে মিলেমিশে আছে। আজ যখন দিনবদলের ইশতেহার আসছে, নিজেকে বদলে দেওয়ার শপথ উচ্চারিত হচ্ছে, গণতন্ত্রকে নতুন আঙ্গিকে নির্মাণের প্রশ্ন উঠছে, তখন আগুস্তো বোয়াল’র সেই গতানুগতিক অবস্থাকে ভাঙচুর করে নিজের মতো করে পরিবর্তন ঘটানোর পরীক্ষিত পদ্ধতির কথা নতুন করে মনে পড়ছে। সংস্কৃতিদূষণের এই চরম দুঃসময়ে পরিবর্তনের সংস্কৃতির জন্য আশির দশকের সেই ধাক্কাটা যদি আবার ফিরে আসে, যদি জোরদার হয় - হয়তো নতুন পথের দিশা আবারো খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।

আশির দশকের সেসব কর্মকাণ্ডের কথা আজ আরও বেশি করে মনে পড়ছে এ কারণে যে, ৭৮ বছর বয়সে এ মাসেই (২ মে ২০০৯) চলে গেলেন আগুস্তো বোয়াল। তিনি চলে গেলেও বিশ্বের মানুষের কাছে রেখে গেলেন তাঁর ‘নিপীড়িতের থিয়েটার’ ভাবনা। অবশ্য এই ভাবনার তিনিই একমাত্র প্রবর্তক নন। তবে তাঁর নাট্যধারার যেমন রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, তেমনই এই ধারা বোয়াল’র নিজ দেশ ব্রাজিলসহ পৃথিবীর অনেক দেশে পরীক্ষিত হয়েছে। বোয়াল’র নাট্যপদ্ধতি একইসাথে কার্যকর শিক্ষাপদ্ধতিও বটে। তাঁর নাট্যক্রিয়ায় দর্শক অতিমাত্রায় সক্রিয় এবং সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে দর্শকই নাট্যের নিয়ন্তা। অংশগ্রহণমূলক এই পদ্ধতির মাধ্যমে অসচেতন দর্শকেরা স্থানীয় বা জাতীয় সমস্যাগুলো উপলব্ধি করতে পারে এবং সমাধানের পথ খুঁজতে পারে। এক অর্থে এই পদ্ধতিকে ‘গণতান্ত্রিক নাট্যপদ্ধতি’ও বলা যায়। অনেকেই হয়তো জানেন না, শোভন সংস্কৃতি এবং শিক্ষা ও সচেতনতার আকালের এই দেশেও আগুস্তো বোয়াল’র পদ্ধতি পরীক্ষিত হয়েছে এবং কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। আর তা হয়েছে হুবহু বোয়ালকে অনুকরণ করে নয়, দেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নয়াউদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে যুুক্ত করে।

১৯৮৪ সালের কথা। নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ আরণ্যক নাট্যদলের কয়েকজন কর্মীসহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অনুশীলন নাট্যদল'এ একটা কর্মশালা করার জন্য এলেন। তাঁর হাতে ছিল আগুস্তো বোয়াল’র ‘থিয়েটার অব দ্য অপ্রেসড’ বইটি। দেশ তখন নতুন করে সামরিক শাসনের কবলে পড়েছে। আমরা থিয়েটারকর্মীরা প্রসেনিয়াম ভেঙ্গে রাস্তায় নেমে এসেছি - নাটক নিয়ে চলছে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ‘থিয়েটার অব দ্য অপ্রেসড’ বা ‘নিপীড়িতের থিয়েটার’কে তখন মনে হলো সময়ের গ্রন্থ। আমরা যেন এর জন্যই অপেক্ষায় ছিলাম। কর্মশালা হয়ে গেল। ঢাকার আরণ্যক-এর কর্মীদের মানিকগঞ্জসহ আরও দু’একটি স্থানে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল, তার সাথে এবার যুক্ত হলো অনুশীলন নাট্যদলের নিবেদিতপ্রাণ টগবগে তরুণেরা। শুরু হলো নতুন করে ভাবনা - নতুন এক নাট্যঅভিযাত্রা। যে অভিযাত্রায় আরও সামিল ছিলেন আব্দুল্লাহেল মাহমুদ, রেজা রুস্তম, মান্নান হীরা, আজিজুল হাকিম, শাহআলম দুলাল, ইশরাত নিশাত, ইস্রাফিল শাহীন, শামসুল আলম বকুল, তপন দাশ, স্বদেশ বন্ধু সরকার, রেজাউল করিম, সেলিনা শেলী, সীমা রায়, মাসুম রেজা, দীপু মাহমুদ, কামাল আহমেদসহ শতাধীক নাট্যকর্মী। বিপুল উৎসাহে সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন এসব কর্মী। তাঁরা গড়ে তোলেন নতুন নতুন দল। এভাবে কর্মী সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে।

প্রধানত এলাকার মানুষের আগ্রহের প্রেক্ষিতেই দুই-তিনজনের একেকটি নাট্যকর্মীদল গ্রামে গিয়ে কাজ করতেন। বাড়ির উঠোন বা স্থানীয় স্কুলঘরে সন্ধ্যার পর শুরু হতো কাজ, চলতো গভীর রাত পর্যন্ত। ছাত্র, তরুণ বেকার, কৃষক, দোকানী, ভূমিহীন মজুর থেকে শুরু করে সকল স্তরের মানুষ গভীর আগ্রহে যুক্ত হতো নাট্যপ্রক্রিয়ার সাথে। মূলত স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং তার ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হতো নাট্যকাহিনী। কখনো আধুনিক কখনো লোকআঙ্গিকের ব্যবহারে সর্বোচ্চ তিন দিনে নির্মিত হতো নাটক। শেষ দিন সন্ধ্যার পর বড় উঠোন বা বিদ্যালয়প্রাঙ্গনে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে অভিনিত হতো নাটক। নিজেদের সমস্যার কথা থাকায় এবং নিজেদের মানুষ নাটকের পাত্রমিত্র হওয়ায় দর্শকের অংশগ্রহণ ও উৎসাহ হতো অবিশ্বাস্য। নাটক শেষে কাহিনীর সাথে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করতো তারা এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন করে নাট্যনির্মিত হতো এবং পরদিন তা আবার তাদের সামনেই মঞ্চস্থ হতো।

মানুষের বিপুল সাড়া পাওয়ায় ’৮৫ সালে প্রসেনিয়াম-ঘেঁষা গ্রুপ থিয়েটার আরণ্যক- অনুশীলনের নিয়ন্ত্রণ থেকে প্রক্রিয়াটিকে আমরা পৃথক করে ফেলি। নবআঙ্গিকে নির্মিত এই নাট্যঅভিযাত্রার নামকরণ করা হয় ‘মুক্তনাটক’। গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ মুক্তনাটক দল’। এলাকায় এলাকায় গড়ে ওঠে শাখা দল। দলের গঠনতন্ত্রও তৈরী করে ফেলা হয়। বহুল ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক সরকারের সেই সংজ্ঞার আদলে মুক্তনাটককে আমরা সংজ্ঞায়িত করি এভাবে - ‘জনগণের মধ্য থেকে জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা মুক্তনাটক’। পরবর্তীতে এটিকে মুক্তনাটক দলের শ্লোগান হিসেবেও গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে নাট্যের এই প্রক্রিয়াটি সত্যি সত্যিই প্রসেনিয়াম, পাণ্ডুলিপি বা নির্দিষ্ট কোন আঙ্গিকের নিয়ন্ত্রণ থেকে ছিল সম্পূর্ণ মুক্ত। যে এলাকার মানুষ যেভাবে চাইতো সেভাবেই রূপ পেত এই নাট্য।

সারা দেশ, বিশেষ করে অভাবী উত্তরাঞ্চল হয়ে ওঠে মুক্তনাটকের প্রধান কর্মক্ষেত্র। করতকান্দি, নওগাঁবাজার, চাটমোহর, উল্লাপাড়ার কানসোনাসহ চলনবিল ও সংলগ্ন বিশাল এলাকা, উত্তরে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, সৈয়দপুর, পাটগ্রাম, রাজশাহীর বাগমারা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশপাশের এলাকায় চলতে থাকে ব্যাপক কার্যক্রম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অনুশীলন নাট্যদলের মুক্তনাটক ইউনিটের কর্মীদের নিরন্তর পরিশ্রমের ফলে এসব এলাকায় গড়ে ওঠে অসংখ্য দল। এভাবে উত্তরাঞ্চল মুক্তনাটকের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠায় ’৮৬ সালে বাংলাদেশ মুক্তনাটক দলের প্রথম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিন দিনের এই সম্মেলনে সারা দেশের প্রতিনিধিদের সাথে অনেক নাট্যদল তাদের সফল প্রযোজনাগুলো নিয়েও হাজির হয়। সম্মেলনে শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের অনেক গুণী ব্যক্তি নিজেদের আগ্রহেই অংশ নিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন বদরুদ্দীন উমর, হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, শান্তনু কায়সার, প্রয়াত সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন প্রমুখ। আর নাট্যাঙ্গনের মানুষেরা তো ছিলেনই। সম্মেলনের নানা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বক্তার মুখে যে কথাগুলো উঠে এসেছিল তার সারতসার ছিল ‘জীবনের জন্য শিল্প’।

ব্যাপক এই কর্মযজ্ঞ কিন্তু নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন শেষ হতে না হতেই মুখথুবড়ে পড়লো। কেন মুখথুবড়ে পড়েছিল মুক্তনাটক আন্দোলন, তার প্রধান কারণগুলোর উল্লেখ করা আজকের প্রেক্ষাপটে জরুরি। সেসময়ে গ্রামাঞ্চলে যেসব স্থানীয় সমস্যা নিয়ে নাট্যনির্মাণ করা হতো তার বেশিরভাগ বিষয়বস্তুই হয়ে উঠতো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের দুর্নীতি। রিলিফবঞ্চিত স্থানীয় লোকজনই এসব বিষয়কে নাটকের সাথে যুক্ত করতেন। নাট্যে কোথাও কোথাও প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতো সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি। উপজেলা পর্যায়ে নাটক হলে সেখানে নাটকের বিষয়বস্তু হতো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। ফলে চেয়ারম্যান-মেম্বার, মৌলবাদী শক্তি এবং স্বৈরসরকারের পুলিশবাহিনী- এই ত্রিমুখী শক্তির বাধার মুখে পড়তে হয় স্থানীয় মুক্তনাটককর্মীদের। নাট্যকর্মীরা নিগৃহীতও হন অনেক স্থানে। এ অবস্থায় এলাকার প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগী ভূমিকা বা পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি হয়ে পড়লেও, প্রায় সব ক্ষেত্রেই তারা ছিলেন নির্লিপ্ত। কোথাও আবার নানা স্বার্থের সাথে যুক্ত থাকায় প্রগতিশীল শক্তি ওই চেয়ারম্যান-মেম্বারদেরই পক্ষও নিয়েছে। ফলে এক পর্যায়ে নাট্যকর্মীরা পিছিয়ে আসতে বাধ্য হন। এ তথ্য জানান দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ব্রাজিলে আগুস্তো বোয়াল’র কাজে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল সে দেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। কিন্তু এদেশে আশির দশকের অবস্থা যেমন ছিল, এখনকার অবস্থাও তেমনই। বরং বলা যায় প্রগতির পক্ষের বলে দাবিদার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপারে আগের চেয়ে আরও বেশি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

আশির দশকের সেই জোয়ারে দ্রুতই ভাটা নেমে এসেছিল আরও একটি কারণে। মুক্তনাটকের কাহিনী নির্মাণের ক্ষেত্রে সেসময়ে ক্রমেই অতি সরলীকরণের ঘটনা ঘটছিল। দেশ ও সমাজের সমস্ত অব্যবস্থার জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বার বা ক্ষুদে ধর্মীয় ফতোয়াবাজরাই দায়ী- মানুষের কাছে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল এমন একটা ব্যাখ্যা। জনগণের প্রতিপক্ষ এসব স্থানীয় মানুষ যে সামগ্রিক একটা গণবিরোধী আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে যুক্ত, এ উপলব্ধি সাধারণ অসচেতন নাট্যকর্মী-দর্শকদের মধ্যে কাজ করেনি। এবং এটাই ছিল স্বাভাবিক। এমন সরলীকরণ ঘটার পেছনেও কারণ ছিল। সচেতন শিক্ষিত নেতৃস্থানীয় মুক্তনাটক কর্মীরা ‘তোমাদের জিনিস তোমাদের দিয়ে গেলাম’ বলে ততদিন কেউ মিডিয়ার টানে, কেউ বা অঙ্গীকারের অভাবে (কিছু ব্যতিক্রম বাদে) দূরে চলে গিয়েছিলেন। অথচ এই অত্যন্ত দুরূহ ও জটিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল চিন্তা-চেতনায় সমাজের অগ্রসর ওই অংশেরই।

সমাজের সেই অগ্রসর অংশ, যাঁরা একসময়ে মানুষের জন্য দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ নাগরিকনাট্য বা নাগরিকসংস্কৃতি নির্মাণে সময় দিচ্ছেন। অথচ দেশ চলে যাচ্ছে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদসহ সমস্ত পশ্চাৎমুখী চিন্তার ধারকদের কবলে। এ অবস্থা থেকে দেশকে বাঁচানোর কাজটি তো সাংস্কৃতিক এবং যা কখনোই নাগরিকসংস্কৃতি দ্বারা মোকাবিলা সম্ভব নয়। আবার কাজটি সাংস্কৃতিক কিন্তু দায়িত্বটা প্রধানত রাজনৈতিক।

আমাদের সমাজের অগ্রসর রাজনীতিক ও সংস্কৃতিসেবীরা আশির দশকের আগুস্তো বোয়াল’র ভাবনার সেই ধাক্কাটার কথা কি আর একবার ভাবতে পারেন না? আজকের প্রেক্ষাপটে তাদের জন্য এই ভাবনাটা জরুরি এ কারণে যে, প্রধানত তাঁদের মুখ ফিরিয়ে নেবার কারণেই সেদিনের সেই ধাক্কাটা থমকে গিয়েছিল। আর একবার সেই ধাক্কাটা তাঁরা দেবার চেষ্টা করবেন কি?

মলয় ভৌমিক : নাট্যকার, শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়