Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

হাবিব তানভীরও চলে গেলেন

Written by মলয় ভৌমিক.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

হাবিব তানভীরও আমাদের ছেড়ে গেলেন। নাট্যাঙ্গনের জন্য সময়টা ভালো যাচ্ছে না। শুধু নাট্যাঙ্গন কেন; মানুষ, এই পৃথিবীর তাবৎ মানুষ, সদা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-অনিশ্চয়তা নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের জন্যও সত্যি সত্যি ভালো যাচ্ছে না সময়টা। ভালো যাচ্ছে না এ কারণে যে, মানুষের পাশে থেকে লড়াই করার মানুষেরা সব চলে যাচ্ছেন একে একে। স্থান হয়তো শূন্য থাকবে না, কিন্তু শূন্যটা আবার সেভাবে যে পূরণ হবে তার নিশ্চয়তাই বা কোথায়? আজকের পৃথিবীতে ভোগ-লোভের পেছনে যেভাবে ঘোড়দৌড় শুরু হয়েছে তাতে শুভবোধসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা কমতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-নাট্যাঙ্গনেও এখন সেই ঘোড়দৌড় চলছে। শুধু সম্মুখপানে ধাবিত হওয়া, কে পেছনে পড়লো, পেছন থেকে কে একেবারে উধাও হয়ে গেল, সেদিকে তাকাবার অবকাশ কোথায়? হ্যারল্ড পিন্টার গেলেন, সেলিম আল-দীন চলে গেলেন, গেলেন আবদুল্লাহ আল মামুন, গত মাসে গেছেন আগুস্তো বোয়াল আর তাঁর পেছন পেছন হাবিব তানভীর। পনরো-বিশ বছর আগে হলেও হয়তো বলা যেত, এই মানুষগুলো চলে গেলেন বটে, কিন্তু মানুষের কল্যাণে এঁরা যে সমৃদ্ধ ভাণ্ডার রেখে গেলেন তা কখনো ফুরিয়ে যাবে না। না, আজ এমন কথা জোর দিয়ে বলার উপায় থাকছে না। বলা হলেও তা নেহায়েতই মেকি, বলার জন্য বলা- বিশ্বাস ও কার্যকারিতার দিক থেকে নয়। মানুষ এভাবে দ্রুত বদলে যেতে থাকলে যাঁরা চলে যাচ্ছেন তাদের কর্মকাণ্ড সেই মানুষের ওপর কতটা প্রভাব বিস্তার করবে তা তো এ কারণেই বলা শক্ত। তবু আশা একেবারে ছেড়ে দেয়া যাচ্ছে না। আশা নিয়েই তো বাঁচা। সেই আশা থেকেই বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, হাবিব তানভীরেরা বেঁচে থাকবেন।

হাবিব তানভীরের নাম প্রথম জানতে পারি আশির দশকের মাঝামাঝি। তখন উপমহাদেশের নাট্যাঙ্গনের আর এক দিকপাল উৎপল দত্তের ব্যাপারে আমাদের কৌতুহল ও শ্রদ্ধা ছিল প্রশ্নাতীত। তাঁর ‘অঙ্গার’ প্রযোজনার নতুনত্ব ও বিশালত্ব, ‘ফেরারী ফৌজ’-এর বিষয়বস্তু, কোলকাতা রবীন্দ্রসদন মঞ্চে ‘টিনের তলোয়ার’-এর সরাসরি মঞ্চায়ন জানা-দেখার অভিজ্ঞতা ততদিনে হয়ে গেছে। তাঁর লেখা ‘জপেন দা জপেন যা’ বইটি তখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছিল। এরকম একটি সময়ে ভারত থেকে ঘুরে এলেন নাট্যকার মামুনুর রশীদ। আমরা তখন আগুস্তো বোয়ালের ‘থিয়েটার অব দ্য অপ্রেসড’ চিন্তায় প্রাণিত হয়ে চলনবিল এলাকায় মুক্তনাটকের কাজ করছি। মামুন ভাই এ যাত্রায় উৎপল দত্তের সাথে তাঁর সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন। নানা প্রসঙ্গের মধ্যে একটা বেশ রসালো অথচ তাৎপর্যময় গল্প জানা গেল তাঁর কাছ থেকে। দিল্লিতে উৎপল দত্তের সাথে পাশাপাশি আসনে বসে নাটক দেখছিলেন মামুনুর রশীদ। মঞ্চে হাবীব তানভীরের ‘আগ্রা বাজার’ নাটকের অভিনয় চলছে। এক পর্যায়ে মামুন ভাই পাশের আসনে তাকিয়ে দেখলেন উৎপল দত্ত ঘুমাচ্ছেন। ‘দাদা কি ঘুমুচ্ছেন নাকি?’ - প্রশ্ন করলেন মামুনুর রশীদ। দ্রুত ঘুমভাঙ্গা চোখে উৎপল দত্ত জবাব দিলেন: না না, এরা ঘুমোতে দিল কই - যেভাবে ডিরিম ডিরিম বাজনা বাজাচ্ছে - তাতে ঘুমোনো যায়! ‘আগ্রা বাজার’ নাটকে নাকাড়া বা ডমড়ুর ব্যবহার আছে বারবার। এগুলোর শব্দও প্রচণ্ড। কিন্তু উৎপল দত্তের ভাবখানা এমন ছিল যে তিনি প্রেক্ষাগৃহে ঘুমাতেই গিয়েছিলেন। এই কৌতুককর জবাবের মধ্যে ‘আগ্রা বাজার’ নাটকের ব্যাপারে তাঁর নির্লিপ্ততা ছিল কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও হাবিব তানভীরের প্রতি যে তাঁর এক ধরনের মধুর প্রশ্রয় ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

তো এভাবেই হাবিব তানভীরের নামের সাথে প্রথম পরিচয়। এরপর নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের আমন্ত্রণে ১৯৯০ সালে হাবিব তানভীর ঢাকায় এলেন তাঁর নয়া থিয়েটার নিয়ে। সঙ্গে করে আনলেন দুটি প্রযোজনা- ‘চরণ দাস চোর’ আর ‘আগ্রা বাজার’। ‘চরণ দাস চোর’ ঢাকার দর্শকের মন চুরি করলো আর ‘আগ্র বাজার’ তাতিয়ে দিয়ে গেল রাজধানীর নাট্যবাজার। বছর সাতেক পরে হাবিব তানভীর আবার ঢাকায় আসেন তাঁর দল নিয়ে (এরপর আর এসেছিলেন কি? ঠিক মনে পড়ছে না)। এবার অনেকটা তাঁর কাছাকাছি-মুখোমুখি হবার সুযোগ ঘটে। সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির যে মঞ্চটি এখন ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে সেই মঞ্চে আমরা দেখি মনকাড়া এক প্রযোজনা ‘গাঁওকা নাম শ্বশুরাল মেরা নাম দামাদ’। ভারতের বিহার অঞ্চলের লোকগাথা ভিত্তিক এই নাটকের গল্পটি সাদামাটা, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বক্তব্যটি অনেক গভীর। নারীর প্রতি আমাদের পুরুষশাসিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী এই লোকগাথার আপাত কৌতুককর গল্পের মাধ্যমে দর্শকের সামনে উলঙ্গভাবে মেলে ধরেন হাবিব তানভীর। বিহার অঞ্চলের লোকগাথা হলেও নাটকের গল্পটি কিন্তু আমাদের সকলেরই চেনা। গ্রামের এক মাতবর গোছের লোক একটার পর একটা বিয়ে করতে থাকে। সংখ্যাটা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছায় যে চেনাজানা গণ্ডির মধ্যে যে গ্রামেই লোকটি যায় দেখা যায় সেই গ্রামেই তার শ্বশুরবাড়ি রয়েছে। সুতরাং গ্রামের নাম আর আলাদা করে নেবার প্রয়োজন পড়ে না; সব গ্রামই তার কাছে শ্বশুরবাড়ি (শ্বশুরাল) হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সে যেহেতু সব গ্রামেরই জামাই, সেহেতু তার আসল নামটারও আর দরকার হয় না। কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে ‘আমার নাম জামাই (মেরা নাম দামাদ)’ বললেই চলে।

শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে নাটক প্রদর্শনীর দিন সকালে হাবিব তানভীর বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের সাথে মতবিনিময় করেন। লম্বা-ফর্সা, ছিপছিপে গড়নের শান্ত প্রকৃতির এই মানুষটির নাট্যচিন্তা বিষয়ে একটা ধারনা পাই আমরা। সমাজের নানা অসংগতিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে খুঁজে খুঁজে লোককাহিনী সংগ্রহ এবং লোকআঙ্গিকে আধুনিক প্রসেনিয়াম মঞ্চে তা উপস্থাপনের মধ্যেই হাবিব তানভীরের কৃতিত্বের সবটা নিহিত নয়। নাট্যদল ও নাট্যনির্মাণে তাঁর চিন্তাটাই একেবারে অন্যরকম। আমরা নাট্যদল ও নাট্যনির্মাণে সাধারণভাবে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা বা নাট্যকলার ডিগ্রিকে যেভাবে গুরুত্ব দিই, তিনি কিন্তু তাঁর ভাবনায় এসবকে তেমন আমলেই নেন না। স্তানিস্লাভস্কির মত অভিনয়কলা-ব্যাকরণের গুরুদের দেয়া তত্ত্বের আনুষ্ঠানিক চর্চা তাঁর চিন্তায় অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। তাঁর নাটকের পাত্রমিত্র হয়ে মঞ্চে উঠে আসেন গ্রামের সেইসব ‘চাষাভুসো’- যাঁদের কোন প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। মঞ্চের সিরিয়াস কোনো নাট্যে কোন শিল্পী বেশি সফল- প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সমাজ সচেতন শিল্পী, নাকি তথাকাথিত অশিক্ষিত ও স্বতঃস্ফূর্ত শিল্পী? প্রশ্নটার মিমাংসা নিয়ে তর্ক চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে, এমন কি যুক্তির পাল্লা শিক্ষিত সমাজসচেতন শিল্পীর পক্ষে ভারিও হতে পারে, তবে শিল্প জিনিসটা যে শতভাগ চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যাপার নয়, তা কিন্তু হাবিব তানভীর তাঁর নান্দনিক প্রযোজনাগুলোর মাধ্যমে আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেন। এবং হাবিব তানভীরের নাট্যচিন্তার প্রকৃত চেহারাটা এখানেই ধরা পড়ে।

আসলে আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যাপারটা তো এই সেদিন থেকে আমরা গ্রহণ করতে শুরু করেছি। পৃথিবীব্যাপী পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে, নাট্য, পালা, নৃত্য-গীত-বাদ্য, মৃৎশিল্প, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, কারুশিল্পের অসাধারণ সব কৃতিত্বের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সংযোগ নেই বললেই চলে। বলা যায় হাবিব তানভীর মঞ্চে সেই অভিজ্ঞতাটাকেই কাজে লাগাতে চেয়েছেন। আশির দশকে এদেশে যখন মুক্তনাটকের চর্চা বিশেষ একটা মাত্রা অর্জন করেছিল, তখন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে আমরা এমন অনেক প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রীর সন্ধান পেয়েছিলাম, যাদের কোনো ধরণের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাই ছিল না।

কয়েক বছর আগে নাট্যকার মামুনুর রশীদ সাঁওতাল জাতির জীবন-সংগ্রাম নিয়ে তাঁর ‘রাঢ়াঙ’ নাট্য নির্মাণ করেন। এতে অভিনয় করেন শিক্ষিত বাঙালিরা এবং তা দর্শক নন্দিত হয়। এরপর ২০০৭ সালে মামুনুর রশীদই যখন আবার সাঁওতালী নাটক ‘তৃণ’-এ ‘অশিক্ষিত’ সাঁওতালদের জাতীয় নাট্যশালা মঞ্চে তুলে আনেন, তখন সেটিও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। এই নিবন্ধকারের অভিজ্ঞতা আরো বিচিত্র। ইলামিত্রের নাচোল বিদ্রোহের ওপর রচিত ‘ভূমিকন্যা’ নাটকের ২৪ জন শিল্পীর মধ্যে নিবন্ধকার ১২ জন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বাঙালি শিল্পীকে কাজে লাগান। বাকি ১২ জন অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন উত্তরবঙ্গের ‘অশিক্ষিত’ সাঁওতাল। গত বছর ২ এপ্রিল জাতীয নাট্যশালার পরীক্ষণ-থিয়েটারেও নাটকটির মঞ্চায়ন হয়। দর্শকরা বাঙালি সাঁওতালের পার্থক্য যেমন ধরতে পারেননি, তেমনই ধরতে পারেননি ‘শিক্ষিত’ ও ‘অশিক্ষিত’-এর পার্থক্য। অবশ্য এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে শিল্পে প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব খাটো হয় না কখনোই। আবার স্বতঃস্ফূর্ততাও বাতিল হয়ে যায় না- হাবিব তানভীরেরা তাঁদের চিন্তা-চেতনায় এভাবেই সামগ্রিক ব্যাপারটাকে সমৃদ্ধ করে তোলেন।

মলয় ভৌমিক : নাট্যকার; শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়