Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

থিয়েটার গেইমস্ : অভিনয় প্রশিক্ষণে নতুন ভাবনা [প্রথম কিস্তি]

Written by ক্লাইভ বার্কার .

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

অনুবাদ: অসিত কুমার

প্রথম অধ্যায়
অভিনেতার কাজ

অভিনেতার কাজকে মূলত পাঁচটি ক্ষেত্রে ভাগ করা হয়ে থাকে :

১.    তিনি সত্যিকার শারীরিক দক্ষতা প্রদর্শন করেন। এর সাথে যুক্ত থাকে কন্ঠস্বরের কেরামতি। অর্থাৎ শরীরযন্ত্রের কাছে তার দাবী স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। নিজের শরীরের কাছে অভিনেতার দাবী শরীরের গড়পড়তা দৈনন্দিন ব্যবহার-সীমাকে ছাড়িয়ে যায়।
২.    তিনি অনুকরণ ক্ষমতার প্রয়োগ দেখান। অর্থাৎ, এমনসব শরীর-ভঙ্গি এবং ক্রিয়া তাকে করে দেখাতে হয় যা আদৌ তার নিজের নয়।
৩.    তিনি কল্পনাশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এমন স্থান-কাল-চরিত্র পরিস্থিতিতে বিচরণ করেন যা তার নিজের নয়।
৪.    তার নিজের স্বভাবের মধ্যে পড়ে না এমন আচরণ তাকে করে দেখাতে হয়।
৫.    উল্লেখিত এরকম সব ক্রিয়াকলাপরত অবস্থায় তিনি অন্য মানুষ অর্থাৎ অন্যান্য অভিনয় শিল্পী এবং দর্শক সাধারণের সাথে সংযোগ স্থাপন করেন।

তাহ'লে দেখা যাচ্ছে অভিনেতার কাজ নির্ভর করে - ১. শারীরিক স্বাস্থ্য-সবলতা এবং নমনীয়তা  ২. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ৩. কল্পনাশক্তির ব্যাপ্তি ৪. কল্পনার উপলক্ষ্যসমূহকে তাৎক্ষণিকভাবে শরীরে প্রকাশ করার ক্ষমতা এবং ৫. স্বতঃস্ফূর্তভাবে অন্যের সাথে বিনিময়ের ক্ষমতা-র উপর।

এইসব ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির অনুশীলনের পন্থা নির্ভর করে প্রযোজনাধীন নাটকের চাহিদা, নাট্য পরিস্থিতি এবং প্রযোজনা আঙ্গিকের উপর। অভিনেতার প্রস্তুতির বৃহত্তর অংশ সম্পর্কয্ক্তু থাকে নাটকের বিষয়বস্তুর সাথে। ফলে তাকে পাণ্ডুলিপির বিশদ পাঠের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট চরিত্র, পরিস্থিতি এবং আচরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে নাটক, প্রযোজনা ও চরিত্র সম্পর্কে তার বোধগম্যতা বৃদ্ধি করে নিতে হয়। তবে এর মধ্যে আমার বর্তমান ভাবনার ক্ষেত্রটি হচ্ছে অভিনেতা নাটকে তার করণীয় সম্পর্কে  যা বোঝেন, কীভাবে তিনি সেটার  রূপায়ন ঘটান; কীভাবে তিনি নাটক সম্পর্কে তার মনোভাব ও ভাবনাকে শারীরিক ক্রিয়ায় রূপান্তর করেন; কীভাবে অন্য অভিনেতা এমনকি দর্শক প্রতিক্রিয়ার সাথে নিজ ক্রিয়াকলাপের তারতম্য ও সমন্বয় ঘটান।

অভিনেতার কাছে তার ক্রিয়াকলাপের কোনোটিই অকল্পনীয় নয়। সব কিছুই দৈনন্দিন জীবনে ঘটে চলেছে। যে প্রক্রিয়ায় তিনি তার কাজ এগিয়ে নেন তা সব মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অভিনেতার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রমটা হচ্ছে এখানেই যে, উপস্থাপনের লক্ষ্যে তিনি সচেতনভাবেই এইসব ক্রিয়াকলাপ নির্বাচন করেন এবং নিয়মিতভাবেই দর্শকের সামনে এর পুনরাবৃত্তি ঘটান। যেখানে দৈনন্দিন জীবনে এই সব ক্রিয়াকলাপ অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ বা উদ্দীপনাজাত এবং জীবনের আর্থ সামাজিক প্রয়োজনের শৃঙ্খলাধীন, সেখানে অভিনেতা নিজেকে প্রকাশ করেন সীমিত নাট্যপরিসরে ক্রিয়াকল্পের মধ্য দিয়ে এবং সে অর্থে তিনি একটি কৃত্রিম পরিস্থিতির অধীনে বিচরণ করেন। থিয়েটার বাস্তবতার কৃত্রিম পরিবেশ অভিনেতার উপর কিছু চাপ সৃষ্টি করে। তার কাজ দর্শকের অবিরাম নিরীক্ষার অধীন। ব্যর্থতার শঙ্কা তার নিত্যসঙ্গী। কল্পনাশক্তির প্রয়োগে তিনি প্রতিনিয়ত এমনসব জটিল সামাজিক ও ব্যক্তিক পরিস্থিতিতে বিচরণ করেন যার কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই হয়তো তার নেই। প্রায়শ জনসম্মুখে তাকে এমন শারীরিক দক্ষতা প্রদর্শন করতে হয় বা তার ভাণ করতে হয় যার জন্য তিনি কখনো শিক্ষানবিশি করেননি। ভাবা আর করার মধ্যে কোনো ফাঁক না রেখে নিমেষেই মানব আচরণের নানাবিধ ভঙ্গি যুক্তিগ্রাহ্য করে উপস্থাপন করতে হয় তাকে যা কিনা বাস্তবে ঘটে বাইরের প্রভাবে। তাকে এই সব ক্রিয়াকলাপের আপাত স্বতঃস্ফূর্ত পুনরাবৃত্তি করে যেতে হয়, নিয়মহীন নিয়মিত বিরতিতে, এবং প্রায়শই ভিন্ন ভিন্ন স্থানে। আমার কৌতুহল সেই প্রক্রিয়া নিয়ে যার মাধ্যমে অভিনেতা তার এসব ক্রিয়াকলাপ পরিচালনা করেন এবং তার এই চর্চায় উদ্ভূত প্রতিবন্ধকতাসমূহ মোকাবেলা করেন।

প্রতিন্ধকতার চিহ্নিত ক্ষেত্রসমূহ :

১.    নিজ শরীরের স্বভাব বিরুদ্ধ ভঙ্গি ও ক্রিয়ার ভার বহনে শরীরের অবাধ্যতা;
২.    মনের গতিবিধিকে শরীরে রূপান্তর করার দুরূহ প্রক্রিয়ায় কাজের সীমাবদ্ধতা;
৩.    পরিণতির কথা জেনেও আপাতস্বতঃস্ফূর্ত আচরণভঙ্গি ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে সংযুক্ত থাকার কঠিনতা।

এইসব সমস্যা সব অভিনেতার কাজের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে এবং প্রত্যেক অভিনেতাই এর প্রতিবিধানে নিজ নিজ পন্থা খুঁজে বের করেন। প্রথম সমস্যাটি মোকাবেলা করা হয় প্রশিক্ষণকালে অভিনেতাকে প্রাথমিক কৗশল ধরিয়ে দেবার লক্ষ্যে পরিচালিত অঙ্গ ও কণ্ঠসঞ্চালন বিষয়ক পাঠ দানের মাধ্যমে। এই কাজের নেতৃত্ব দেন বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষকগণ। তবে অভিনেতা সমস্যায় পড়েন শিক্ষকের কাছ থেকে ফিরে যখন নিজে নিজে অনুশীলন চালিয়ে যাবার চেষ্টা করেন। কিছু কিছু অভিনেতা ঠিকই শরীর চর্চা চালিয়ে যান। অনেক অভিনেতা কেবল কণ্ঠশীলন বজায় রাখেন। এই দুইয়ের কোনোটাই করেন না এমন অভিনেতার সংখ্যাই বেশি। এটা অবশ্য খুব স্বাভাবিক ও বোধগম্য মানবিক ত্র“টি যে তাৎক্ষণিক উপযোগিতা বা আনন্দযোগ না থাকলে কোনোকিছু করতেই আমাদের মন সরে না।

প্রায়শই অভিনেতার জীবন দীর্ঘ কর্মহীনতা আক্রান্ত। তাছাড়া কৌশলগত ব্যয়ামাদির একাকী অনুশীলন বড় ক্লান্তিকর এবং সেগুলো উপভোগ্য নয় বললেই চলে। তবে এই অবস্থাটা যে স্তানিস্লাভস্কিকে কতটা বিদ্ধ করেছে তা তার কথায় স্পষ্ট:

কেউ কি আমায় বুঝিয়ে দেবে অর্কেষ্ট্রার দশ নম্বর বেহালা বাদকটি কেন প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা রেওয়াজ করে? নৃত্যশিল্পী কেন দিনের পর দিন তার দেহের প্রতিটি মাংশপেশীকে নিয়ে কাজ করে? কেনই বা চিত্রকর বা স্থপতি বা লেখক নিজ নিজ শৈলীর নিয়মিত অনুশীলন করেন এবং যেদিন করেন না সেদিনটিকে অপচিত জ্ঞান করেন? আর কেনই বা নাট্যশিল্পী কোনো কিছু না করে দিব্যি কফি হাউসে দিন পার করে সন্ধ্যায় এ্যাপোলোর আশীর্বাদ প্রত্যাশা করেন? অসহ্য! এটা কি কোনো শিল্প হতে পারে যার সেবকেরা অপেশাদারের মত কথা বলে? এমন কোনো শিল্প নেই যা নিপুণতা দাবী করে না।

কিন্তু তিনি যে পরিবেশ পরিস্থিতিতে কাজ করে গেছেন তা ছিল আমাদের থেকে আলাদা। অভিনেতা যখন কাজ করেন তখন দীর্ঘক্ষণ একটানা কাজ করেন। নির্মাণ পর্যায়ে নাটক মহড়ার জন্য সময়টা বরাবরই কম পাওয়া যায়। তখন কৌশলগত অনুশীলনের জন্য সময় ও শক্তি দুই-ই কম অবশিষ্ট থাকে। মহড়ার বাইরে প্রশিক্ষণের সুযোগ অভিনেতার জন্য নেই বললেই চলে। নৃত্য ও অঙ্গসঞ্চালনের ক্লাশ করার সুযোগ বাইরে রয়েছে। কিন্তু তার জন্য যে খরচ সেটা খুব বেশি না হলেও অভিনেতার সাধ্যের মধ্যে পড়ে না। নিয়মিত অনুশীলনের অভ্যাস ধরে রাখা খুবই কষ্টকর যদি না সেখানে কোনো তাৎক্ষণিক উদ্দীপনা থাকে।

আমি জানি যে, শরীর ও কন্ঠ নিয়ে অভিনেতাকে প্রতিদিন নিদেনপক্ষে একঘন্টা কাজ করতে হয়। কিন্তু তার জন্য আমার প্রশ্রয় রইলো। সরাসরি কোনো ধাক্কা না এলে আমি নিজেও কাজের মাধ্যমে নিজেকে সচল রাখা কঠিন বলে মনে করি। তাছাড়াও, অভিনেতার কাজের পুরোটাই তো শরীর সর্বস্ব নয়। গড়পড়তা টেলি সিরিয়াল বা নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক বিন্দু ঘাম না ঝরিয়ে অভিনেতা স্কেটিং করে যেতে পারেন, সেটা আলাদা কথা। নাট্য বিদ্যালয়গুলো অভিনেতাকে শারীরিক ক্রিয়ায় অভ্যস্ত করে তোলে। কিন্তু এই অভ্যাস হারিয়ে ফেলা খুব সহজ। আমরা গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে থাকি যতক্ষণ না এমন একটা সমস্যায় পড়ি যা আমাদের শারীরিক অবস্থা বা প্রবৃত্তি দিয়ে মোকাবেলা করা যায় না। এবং তখনই কেবল আমরা কাজ করতে শুরু করি। অনেক সময় এরকম সমস্যাকে এড়িয়ে চলা যায় সমস্যার জায়গাটিকে শরীরের সাধ্যের সীমায় না আসা পর্যন্ত সংকোচন করে করে। কারণ, মহড়ায় নেমে গেলে আর তাকে মোকাবেলা করার সময় থাকে না। অথবা এর সমাধান আসে অতি কঠিন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে বার বার চর্চা করে করে। অভিনেতার কাজে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রতিবন্ধকতা বিরামহীনভাবে চলতে থাকে। এবং কোনো না কোনোভাবে এগুলোর সমাধান হয়ে যায় বলে অভিনেতা এসব আদৌ গায়ে মাখে না। অভিনেতার অভিধানের কিছু পরিচিত কথায় এর সূত্র পাওয়া যায়। ‘বাদ দেয়া’ এবং ‘উড়িয়ে দেয়া’ এদের মধ্যে দু’টি। ভাবখানা এমন যে এড়িয়ে গেলে সমস্যা উধাও হয়ে যাবে (আশ্চর্যজনকভাবে সত্যি যে, উধাও হয়ে যায়ও)। ‘চেষ্টা করে দেখ’ বা ‘বাদ দাও’ বা ‘ওটা নিয়ে না ভেবে চালিয়ে যাও’ বলে মহড়ায় অভিনেতাকে উৎসাহিত করা হয়। অভিনেতাদের বলা হয় ‘অতিরিক্ত চেষ্টা করছো’ বা ‘জোর করে আনার চেষ্ট করছো’ বা ‘আপনা থেকেই এসে যাবে’ এসব কথা।

অনুশীলনরত অভিনেতাকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, একটা শারীরিক বিষয় ক্রিয়াশীল। দৃশ্যত মনে হয় যে সংলাপের লাইনগুলোকে অনবরত পড়তে পড়তে পা ঠুকে ঠুকে হাতে তাল দিয়ে দিয়ে অভিনেতা যেন তার শরীরের ভিতর ডুবিয়ে নিচ্ছে। কখনো দেখা যায় অভিনেতা ছন্দে ছন্দে তার চলাচলের ছকের মধ্য দিয়ে বার বার হাঁটছে। মাঝে মাঝেই দেখা যাবে অভিনেতা কুঁজ অবস্থা থেকে সোজা টান টান হয়ে উঠছে যেন কোনো কিছু ঢোক গিললো। কখনো কখনো তাকে বলতে শোনা যায়, ‘জিনিসটা বসিয়ে/ডাবিয়ে/গেঁথে নিচ্ছি’। কখনো ভাবগতিকে মনে হবে যেন সে দৌঁড়ের জন্য প্রস্তুত কৌশলে কুঁজ হয়ে আগের অংশ থেকে পাঠ বলতে বলতে হঠাৎ এক দমকে শরীর টান টান করে ঝপ করে এসে পড়ে নতুন সংলাপ ও নতুন ক্রিয়ার জায়গায়। কখনো কখনো এই রকম একটা প্রক্রিয়া শেষ করে এসে সে বলে, ‘পেয়ে গেছি, এখন পারবো’। কখনো সে বলবে, ‘নাহ, আসছে না’ অথবা ‘ভেতরে নিতে পারছি না’ বা ‘এখন আর হবে না; (বাড়ি গিয়ে) এটার উপর কাজ করতে হবে’। এভাবে চলতে চলতে ধাপে ধাপে অভিনেতা তার ক্রিয়ারূপ অন্বেষণ ও নির্মাণ করে।

আসলে ব্যাপারটা কি ঘটছে তার সবচেয়ে জোড়ালো সূত্র পাওয়া যায় মহড়ায় অহরহ শোনা যায় এমন কিছু কথার টুকরো থেকে - ‘জিনিসটা গায়ে মিশছে না’ বা ‘ঠিক ধরতে পারছি না’ কখনোবা ‘মনে হয় গায়ে বাঁধছে’- ব্যাপারটা এমন যেন তাকে শারীরিক অনুভূতিতে  রূপান্তরিত করে তবেই বহন বা ধারণ করতে হবে। আবার এত কষ্টের মধ্য দিয়ে ধরা দেয়া জিনিসটা যদি চলে যায় তখন অভিনেতা বলে, ‘হারিয়ে ফেললাম’। বেশ কিছু নির্দেশক যাদের সঙ্গে আমি কাজ করেছি এমনকি আমি নিজেও অভিনেতাদের এই ধরনের কথায় তেতে উঠেছি। এর চরম জবাবটা হত এরকম - ‘তুমি এখানে অনুভব করতে আসনি, ক্রিয়া করতে এসেছ এবং সেটাই কর’। বিতর্কের জায়গাটা হচ্ছে এখানেই যে, অভিনেতা তার ক্রিয়ায় সচেষ্ট হবার আগে বিচ্ছিন্নভাবে নিজের মত করে তার পাঠটাকে শারীরিক বা ইন্দ্রিয় উপলব্ধিতে পেতে চাইবে, নাকি সেই ইন্দ্রিয় অনুভূতি কাজ করতে করতে আপনা থেকেই উঠে আসবে।

উভয় ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়াটির মূলে রয়েছে মানসিক ক্রিয়াকে শারীরিক ক্রিয়ায় রূপান্তরের সমস্যা। তার সাথে আছে এই সকল ক্রিয়াজাত শরীরিক অনুভূতি সম্পর্কে সচেতনতা। এই সচেতনতার মাধ্যমেই অভিনেতা তার ক্রিয়াকে মনে সংরক্ষণ করে যাতে করে পরবর্তীতে সেটা সে পুনঃসৃষ্টি করতে পারে। থিয়েটারে আরো যে বিষয়টি সবার জানা তা হলো চিন্তাকে ক্রিয়ায় রূপান্তরের চেষ্টায় যখন সমস্যা দেখা দেয় তখন যত বেশি চেষ্টা করা হয়, পরিস্থিতি তত বেশি খারাপ হবে। এর সাধারণ পরিণতি বিষাদ। অতি সচেতন প্রচেষ্টা সমস্যাকে বাড়িয়ে হতাশার জন্ম দেয়।

মহড়ার পরবর্তী পর্যায়গুলোতে, যখন নিজ নিজ জায়গা নিয়ে মনোসংযোগের টানাপোড়েনে একাধিক চরিত্রের মাঝে মিথস্ক্রিয়া ব্যাহত হয়, নির্দেশক অনেক সময় উৎসাহ দিতে গিয়ে বলেন, ‘চালিয়ে যাও’, ‘বাদ দাও’ অথবা ‘ছেড়ে দাও’ - যেন শারীরিক এবং মানসিক মনোসংযোগের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা দলীয় মিথস্ক্রিয়ার অন্তরায় হচ্ছে। এটাতো স্বাভাবিক যে, একজন অভিনেতাকে যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের সংলাপ নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে, ততক্ষণ তার চরিত্রের ক্রিয়া স্থবির হয়ে থাকছে। কারণ, সে অপরাপর অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করতে পারছে না। ‘ভুলে যাও’ বা ‘বাদ দাও’ জাতীয় কথাগুলো প্রকারান্তরে একটি অবচেতন স্তরের দিকনির্দেশ করে যেখানে সমস্যাক্রান্ত ক্রিয়াটিকে নিরাপদে ফেলে রাখা যায় এবং এই জায়গাটি অভিনেতার অজ্ঞাতে সমস্যার শ্রশ্রুষা করে। এই জায়গাটিই আমি ক্ষতিয়ে দেখতে চাই। সকল ক্রিয়াকে অবচেতনে প্রেরণের তত্ত্বটি স্তানিস্লাভস্কির অভিনয় শিক্ষার মূল বিষয়। তিনি আমাদের পরামর্শ দেন অবচেতন মনের উপর আস্থা রাখতে:

একগুঁয়েপনা দিয়ে আপনার পাঠের সমস্যা দূর করার চেষ্টা করবেন না। কিছুক্ষণের জন্য ওটা ছেড়ে দিন। শরীর ও মনকে পূর্ণ বিশ্রাম দিন, শান্ত হউন এবং সমস্যার জায়গা থেকে মনকে অন্যদিকে সরিয়ে নিন।

মাগারশ্যাক স্তানিস্লাভস্কির তরজমা করতে গিয়ে বিষয়টিকে গোলমেলে করে ফেলেছেন:

অভিনেতার সচেতন ক্রিয়াকে আরো বেশি করে অবচেতনের কাছে পাঠানোর আরো একটি পদ্ধতি হচ্ছে তার বড় বড় সমস্যাগুলোতে মনোসংযোগ করা যাতে করে ছোট সমস্যাগুলো আপনা থেকেই অবচেতনে চলে যায়।

উপদেশটা এতদূর সদর্থক যে অভিনেতা সহজাতভাবেই মহড়ায় এই কাজটি করে থাকে। এটি একটি সর্বজনবিদিত অতি সাধারণ মানবিক বৈশিষ্ট্য যে আমরা যখন স্মৃতি হাতড়ে কোনো কিছু মনে করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই তখন অন্যকিছু ভাবি এবং এতে অনেক সময় মনে না পড়া বিষয়টি হঠাৎ মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে ওঠে। দুটো কারণে এই বিষয়টিকে আমি হাতে নিয়েছি। প্রথমত- অভিনেতাকে আজ এমন অনেক নাটকে কাজ করতে হয় যেখানে অনুপস্থিত সেই মনস্তাত্ত্বিক চলরেখা বা চূড়ান্ত লক্ষ্য বা চলমান আদর্শ যে বৃহত্তর জাযগাগুলোতো স্তানিস্লাভস্কি অভিনেতাদের মনোসংযোগ করতে বলেছেন। দ্বিতীয়ত- ধারণাটি যতই কার্যকর হোক না কেন, এতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে সচেতন স্তরে কিছু ক্রিয়া রেখে দেবার কথা যা কিনা অবচেতনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ও শারীরিক ক্রিয়াকে ব্যাহত করবে বলেই আমার বিশ্বাস। কীভাবে এটা ঘটে তা বোঝার জন্য আমাদের আরো ভালো করে জানা দরকার কীভাবে মনের সচেতন ও অবচেতন অংশ দুটি কাজ করে।


দ্বিতীয় অধ্যায়
মন

অভিনেতার জন্য মহড়ার সময়টা এমন যখন তিনি নিজের পাঠ ও নাট্য পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেক উপাদান আত্মস্থ করেন এবং নির্দেশকের ভাবনাটা মাথায় নেন। পাণ্ডুলিপির লাইনগুলো শিখে দৃশ্যের নির্দেশিত কোরিওগ্রাফিতে তার যথাযথ ওঠাবসা ও অবস্থান অনুশীলন করে মনে রাখতে হয়। প্রায়ই এই লাইন ও মুভমেন্টগুলোতে তাকে অতি সুক্ষ্ণভাবে গতি ও ছন্দের দিকে মন দিতে হয়। একে বলা হয় ‘টাইমিং’। প্রাথমিকভাবে এইসব কাঁচামাল ধারণ করতে হয় একই সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে এবং তার স্বাভাবিক ব্যক্তিগত আচরণ বহির্ভূত বিষয় হিসেবে। একে অবশ্যই সচেতনভাবে অনুধাবন করতে হয়, ভেতরে নিতে হয় এবং শারীরিক ক্রিয়ায় রূপান্তর করতে হয় যা কিনা পরবর্তিতে অবচেতনভাবেই পুনরাবৃত্তি করা যায়। আর এসবের কোনোটি যদি সহজেই এসে যায় তা একমাত্র দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতার কারণে।

মহড়ায় এও সুষ্পষ্ট হয় যে, অভিনেতা যতক্ষণ না তার উপাদানসমূহ সম্পূর্ণরূপে ধারণ করে ততক্ষণ সে সেটা করতে পারে না। মহড়ায় অভিনেতাকে অহরহ বলতে শোনা যায়,‘দুঃখিত, আমি এটা করতে পারছি না কারণ, আমাকে এখনো শব্দগুলো নিয়ে ভাবতে হচ্ছে’। কখনো, কঠিন পাণ্ডুলিপির ক্ষেত্রে, নাট্যক্রিয়া ব্যাহত হয় যখন অভিনেতা ‘আগে থেকেই কোনো একটা জায়গা নিয়ে ভাবতে থাকে’। ‘কঠিন জায়গাটা আসছে’ ভেবে আগে থেকেই সে সচেতন হয়ে ওঠে। এতে করে ক্রিয়াপ্রবাহ সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়। আরেকটা ব্যাপার ঘন ঘন ঘটে। আগে ‘সহজ ও নিরাপদ’ বলে মনে করেছে এমন একটা জায়গা হঠাৎ কঠিন হয়ে দেখা দেয়। এটা যে শেষ কথা তা নয়। দীর্ঘ মহড়াকালে, অভিনেতা যখন নির্বিঘ্নে ক্রিয়ারত, অনেক অভিনেতার ব্যাপারে শোনা যায় যে, একই সাথে তাদের দুটো মানসিক ক্রিয়া সচল থাকে। সংলাপের মাঝে দর্শক গুণে নেয় এমন অভিনেতার কথা আমি জানি। এমন অভিনেতার কথাও  আমি শুনেছি যে দৃশ্য শেষ করে এসে বলছে, ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু ভাবছিলাম’ এবং তার যা করার কথা তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু একটা সে করে এসেছে। এটা তো স্বাভাবিক যে মনোসংযোগ ব্যাহত হওয়াটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তার ক্রিয়া উপাদানসমূহকে এমন মাত্রায় ধারণ করা সম্ভব যে সেটা একটা যান্ত্রিক নিপুণতার পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এতে করে বড়জোড় উপস্থাপনার তীব্রতা বা সংবেদনশীলতা হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু এইটিই হচ্ছে মহড়ায় অভিনেতার কাজের মূল বিষয়- বাহ্যিক উপাদানসমূহকে এমন মাত্রায় আত্মস্থ করা যে সচেতনভাবে না ভেবেই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সেটার পুনরাবৃত্তি করা যায়। আর এটাই হচ্ছে স্তানিস্লাভস্কির অভিনয় পদ্ধতির মূল কথা - সচেতন ক্রিয়াকে অবচেতন ক্রিয়ায় রূপান্তর।

আমি চাইবো যতটা সম্ভব সহজ ও সরাসরি রাস্তায় মনের আপাত ভিন্ন দুটি প্রক্রিয়াকে খতিয়ে দেখতে, যে প্রক্রিয়া দুটো কখনো পরস্পরের পরিপূরক, কখনো পরস্পর সম্পর্কহীন, কখনোবা পরস্পর সম্পূর্ণরূপে দ্বন্দ্বরত। শারীরিকভাবেই আমি দুই ধরনের চিন্তা প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন। আমি আমার মস্তিষ্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি অংশের অস্তিত্ব অনুভব করি। প্রত্যেক অংশের রয়েছে নিজস্ব কাজ ও কার্য পদ্ধতি। মস্তিষ্কের সম্মুখ ভাগকে আমি ব্যবহার করি দৃশ্যায়ন,  চিন্তামগ্নতা, নিজের চিন্তা ও ধ্যান-ধারণাসমূহকে সুনির্দিষ্টরূপে চিহ্নিত করা, বিমূর্তায়ন এবং নিজের ক্রিয়াকলাপের সচেতন নিয়ন্ত্রণ ও দিকনির্দেশনার প্রয়োজনে। পেছনের অংশ মনে হয় যেন মূলত আপন মনেই থাকে। তার বিষয়ে আমি তখনই কেবল সচেতন হয়ে উঠি যখন  ‘কাজ রেখে চিন্তা করি’ অথবা যখন নিজের স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলা কথাগুলো নিজের কানে শুনতে পাই। পেছনের অংশও মনে হয় আমার শারীরিক ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়াসমূহকে সহজাতভাবেই নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেটা সে করে যা ঘটছে তা সম্পর্কে আমার প্রত্যক্ষ সচেতনতা ছাড়াই। এখন যখন আমি বসে এই বইটা টাইপ করছি, আমি কি লিখছি সে সম্পর্কে আমি সচেতনভাবে জ্ঞাত নই যতক্ষণ না শব্দটা কাগজের উপর দৃশ্যমান হয়। কেবল যখন আমি কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হই এবং এরপর কি লিখবো তা জানি না, আমি টাইপ রাইটার থেকে হাত নামিয়ে রাখি, চিন্তামগ্ন হই এবং টাইপ করার আগে বাক্যটা মনে মনে গঠন করে নিই। এমনতর অবস্থায়, মস্তিষ্কের সম্মুখভাগে ভাবনাগুলোকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিই। কিন্তু সাধারণত, ধারণাগুলো অবচেতনভাবে আসতে থাকে মস্তিস্কের পেছনের ভাগ থেকে। আমি যদি এই প্রক্রিয়াটির গতি ধীর করে দিই, তাহলে আমি দেখি, আগের শব্দটি লিখবার আগেই পরের শব্দটি কি হবে সে সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে পারি। এক ধরনের তদারকি চলতে থাকে কারণ আমি যখন টাইপে কোনো ভুল করি, তখন সহজাতভাবেই থেমে যাই এবং কাগজের উপর তাকিয়ে থেমে যাবার কারণটা বুঝতে চেষ্টা করি।

এটা দিয়েই বুঝি যে, আমার জাগ্রত সময়ের বেশির ভাগটাই আমি ব্যবহার করি নিজের ক্রিয়াকলাপকে মস্তিষ্কের পেছনের ভাগ থেকে অবচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কাজে। এইমাত্র আমি সিগারেট থেকে ছাই ঝেড়ে ফেললাম কোনোরকম সচেতন ইচ্ছা ছাড়াই। কাজটা শেষ করে ছাইদানিটা চোখে না পড়ার আগে আমার হুশ ছিল না আমি কি করলাম। রাস্তা পার হতে গেলে আমাকে নিশ্চয় সচেতনভাবে যানবাহন চলাচলের নিয়ম-নীতি নিয়ে ভাবতে হয় না। সহজাতভাবেই আমি যানবাহন লক্ষ্য করি। প্রকৃতই মনে হয় মস্তিষ্কের পেছনের অংশ বাহ্যিক পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় ক্রিয়া নির্দেশ করে যখন আমি নিজে অন্য চিন্তায় মগ্ন। এমনতো সদাই ঘটে যে আমি গন্তব্যে পৌঁছে গেছি কিন্তু কীভাবে গেছি তা একদমই খেয়াল করিনি। কখনো কখনো এমন হয় আমি গাড়ি চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো জায়গা অতিক্রম করে গেছি কিন্তু খেয়ালই করিনি। আমার সচেতন মন অন্য কোনো চিন্তায় মগ্ন বা গন্তব্যে পৌঁছে কি করবো তা ভাবছে অথবা কেবলই দিবাস্বপ্ন দেখছে, অলস চিন্তা মনে চক্কর খাচ্ছে ঠিক তখন আমি প্রায় অবচেতনভাবে ব্যাস্ত সড়ক দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। গাড়ি চালানোর কাজটা নিয়ে ভাবছিলাম না। এটাও মনে হয় একটা সর্বজনগ্রাহ্য অভিজ্ঞতা যে, হাতে যখন প্রচুর সময়, গন্তব্যে পৌঁছার কোনো তাড়া নেই, গায়ে হাওয়া লাগিয়ে চলছি, মনও স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে - এমন অবস্থায় মনে হবে ‘চট্ করে এসে গেলাম’; অথচ তাড়া থাকলে ছুট লাগিয়েও মনে হয় অনেক বেশি সময় লেগে গেল। কোনো না কোনোভাবে, যদি সচেতন না হয়ে মস্তিষ্কের পেছনের অংশকে কাজে লাগানো যায় তাহলে শরীর যেন আরো বেশি সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। সচেতনভাবে শরীরকে কাজ করাতে গেলে বরং শরীরক্রিয়াকে ঝামেলায়ই ফেলা হয়।

অন্যান্য ক্ষেত্রেও আমি এই নিয়মের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি। আমি যখন প্রথম টাইপ করতে এবং গাড়ি চালাতে শিখি, শরীরকে প্রয়োজনীয় অঙ্গ সঞ্চালনে অভ্যস্ত করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। শুরুতে আমি শ্লথ ও আড়ষ্ট ছিলাম এবং নিজের ভুলে নিজে নিরাশ হয়ে পড়তাম। কী করতে হবে তা আমি বুঝতাম। কিন্তু কোনো না কোনো কারণে শরীর আমার সচেতন নির্দেশনাগুলো ধরতে বড় দেরি করতো। আজ যখন এই দুটো কাজই আমি করতে শিখেছি, এগুলো এখন আমি অবচেতনভাবেই করি। মস্তিষ্কের পেছনের অংশ যেন প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ছাড়া সহজাতভাবেই কিছু নির্দিষ্ট ক্রিয়া সম্পাদনে সংবদ্ধ (programmed)

আমি জানি এই সকল ক্রিয়াকলাপের কোনো কোনোটির জন্য অঙ্গ সঞ্চালনে সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামা একটি অত্যন্ত জটিল ক্রিয়া। অথচ এই কাজটি আমি করি একেবারে না ভেবেই, যদিনা আমার মনে হয় সিঁড়িটা পিচ্ছিল বা খারাপ এবং সেক্ষেত্রেই কেবল আমি ‘সচেতন’ হয়ে পা ফেলি। কী কারণে জানি না, এরকম হলে আমি খুব আড়ষ্ট বোধ করি। সেনা প্রশিক্ষকগণ, নবাগতদের বাধার প্রাচীরে নিয়ে গিয়ে সবসময় বলবেন, ‘কী করবে বা কীভাবে করবে তা না ভেবে বরং করে ফেল’। যারা ভাবতে বসে তাদের বেশিরভাগই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়।

কখনো কখনো লক্ষ্য করেছি আমার মনের দুই অংশের মধ্যে যেন ঠিক বনিবনা হচ্ছে না। সচেতনভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়ে দেখেছি, নিজের ভিতরে কী একটা প্রক্রিয়া সচল রয়েছে যা আমার নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে। যতই শান্ত থাকার চেষ্টা করি, গভীর কোনো উদ্বেগ বা উত্তেজনা নাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়, বুক ধড়ফড় করে, শ্বাসের গতি বেড়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে প্রথাগত পরামর্শ হচ্ছে ‘চিন্তা মাত করো, আরাম করো’। এমন অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে যখন অতিরিক্ত ভয় শরীরক্রিয়াকে এতটাই অসাড় করে দেয় যে দৌঁড় দেয়া বা চিৎকার করাও অসম্ভব হয়ে উঠে।

কখনো কখনো মস্তিষ্কের সম্মুখভাগের মধ্যস্থতা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। মনে হয়, পেছনের অংশ শরীর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে। একটা অস্বস্তি বোধ হয়, মন ভার হয়। মনে হয় ঝামেলায় পড়েছি। কিন্তু এর ঠিক কারণটা বুঝি না। জিজ্ঞেস করলে বোঝাতে পারি না কেন অমন লাগে। কখনো এর ব্যাখ্যা দুরূহ। আবার কখনো এমন হয়, যদি একটু বসি, ভাবি বা কথা বলি, তাহলে যেন খারাপ লাগার কারণটা বিশ্লেষণ করতে পারি। মনের অন্তরালে কোথাও একটা কারণ সম্পর্কে সহসা সজাগ হয়ে উঠি। কথা বলার সময় বাক্য তৈরি হতে হতে সেই কারণটা উদ্ঘাটিত হতে থাকে। কখনো কখনো খারাপ লাগার কারণটা খুঁজে পেয়ে চমকে উঠি। এটা সর্বজনীন অভিজ্ঞতা যে সমস্যায় পড়লে আমরা কারো সাথে সেটা নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করি। মনের ভার লাঘবে কথোপকথনের গুরুত্বের উপর ভিত্তি করে মনোবৈজ্ঞানিক ধারার সৃষ্টি হয়েছে। মনোবিজ্ঞানীর আরাম কেদারার ব্যবহারে প্রমাণীত হয় যে, মনকে সচল করে তুলতে হলে শরীরকে কর্মভার মুক্ত করা প্রয়োজন। যেটা হয় সেটা এরকম যে, শরীরকে এলিয়ে দিলে সে মাধ্যাকর্ষ বলের বিপরীতে ক্রিয়া করার দায় মুক্ত হয়ে আরাম বোধ করে। শরীরক্রিয়া পরিচালনা করার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে মনও হাল্কা বোধ করে এবং তার ভিতরের তথ্য ও চিন্তা মেলে ধরে।

এর ঠিক পরিপূরক পন্থাটি হচ্ছে দুর্ভাবনার বিষয় থেকে বেরিয়ে আসার ‘স-চেতন’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। আমরা বলি ‘একটু থিতু হয়ে নিই বা সামলে নিই বা দম নিতে দাও’। এর অর্থ হচ্ছে যে, আমরা সচেতনভাবে উদ্বেগ বা দুর্ভাবনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিই অর্থাৎ সম্মুখ মস্কিষ্কের সচেতন বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রিয়া থামিয়ে দিয়ে ‘মানিয়ে নেবা’র চেষ্টা করি। ক্রোধ, হতাশা বা বিরক্তির কারণ নিয়ে ভাবতে বসলে পরিস্থিতি বরং আরো ঘোলাটে হয়ে যায়। আমরা এমন পরামর্শ পাই যে এর একমাত্র সমাধান ‘ভুলে যাওয়া’। ‘ক্ষমা করা যায়, ক্ষত যায় না’ (one can forgive but not forget) কথাটি সম্ভবত এমন কোনো প্রক্রিয়ার কথাই বলে যাতে মনের ক্রিয়াশীল সচেতন অংশ আঘাত বা অপমানের ঘটনাটি আমলে নেয় না। কিন্তু ঘটনার স্মৃতি মনের কোনো অন্তরালে গেঁথে থাকে। এটা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি যে, এই সব প্রক্রিয়ায় আমি শারীরিকভাবে একটি আবেগঘন অবস্থা টের পাই, তার কারণ জানবার আগেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারণ নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে চলতে থাকি। যদিও বুঝি সেটা আমার ক্রিয়াকলাপে এবং অন্যের সাথে আচরণে প্রভাব ফেলছে।

জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আমি বুঝে উঠতে পারি না কীভাবে বা কেন আমি যেভাবে চলছি, সেভাবে চলছি। পেছন-মস্তিষ্কের কী যেন একটা সম্পর্ক আছে কম্পিউটারের সাথে। সে তথ্য সঞ্চয় করে। মানুষকে বলতে শুনি There is something at the back of my mind/ I always had that at the back of my mind. যে ক্রিয়াকে আমি পেছন-মস্তিষ্কের সাথে মিলাই সেই ক্রিয়া চলমান। প্রায়শ তা বিশৃঙ্খল এবং মূলত সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় থাকে যতক্ষণ না তার লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। অর্থাৎ পেছন-মস্তিষ্কের চলমান ফিতার একটা প্রিন্ট সচেতন সম্মুখ-মস্তিষ্কের কাছে পাঠাতে না বলা পর্যন্ত সে লক্ষ্যহীন অবস্থায় থাকে। একথাও বলা অবশ্যই জরুরি যে, আমাদের পেছন-মস্তিষ্কের ক্রিয়া অব্যাহতভাবে আমাদের শরীরক্রিয়া বা তার অভীষ্টের মাঝে প্রকাশিত হতে থাকে।

আমার লেখার ধরনটা হচ্ছে দিনের পর দিন সবকিছু মনে মনে ভাজতে থাকা। এর সাথে চলে শারীরিক অস্থিরতা। ছুটতে থাকি, পাক খাই। এই বসি, এই দাঁড়াই। বার বার কফি খাই। অনর্থক টয়লেটে যাই। কোনো এক পর্যায়ে গিয়ে টাইপরাইটারে বসি। যা আসে বরাবর লিখতে থাকি। তারপর, কি লিখলাম তার উপর যখন চোখ পড়ে, তখন সচেতন হয়ে উঠি এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে থাকি। একই রকম ব্যাপার লক্ষ্য করি নাট্য মহড়ায়, তা সে অভিনেতা হিসেবেই হোক আর নির্দেশকের জায়গা থেকেই হোক। প্রস্তুতির প্রাথমিক পর্যায়ে চরিত্রাবলী, নাট্যকার, নাটকের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তর তথ্য মনের ভিতর জমা করতে করতে ধাঁধায় পড়ে যাই। রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকি, না হয় অস্থিরতা নিয়ে ঘরে বসে থাকি। ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে অনেক বছর ধরেই ভেবেছি আমি বোধ হয় কাজ এড়িয়ে চলছি। কাজ বলতে বুঝতাম পদ্ধতিগতভাবে গভীর অভিনিবেশের সাথে পাণ্ডুলিপির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পাঠ-বিশ্লেষণ। আর সেটা না করে সময় অপচয় করছি ভেবে আত্মসমালোচনা করতাম। তা সত্ত্বেও মহড়ায় গিয়ে কোনো না কোনোভাবে উৎরে যেতাম বলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতাম। ভাবতাম আরো একটু ‘কাজ’ করলে আরো ভালো করা যেত। এটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে যে, আসলে আমি কাজের মধ্যেই ছিলাম এবং খুবই কঠোর পরিশ্রম করছিলাম অসংবদ্ধ চিন্তাভাবনা ও তথ্যাদিকে একটা সুসংবদ্ধ অবস্থায় নিয়ে এসে স্থির ও মগ্ন হবার চেষ্টায়।

যে সময়টা আরাম আয়েশ করে পার করেছি বলে মনে করেছি তার মাসখানেক বাদে এক বন্ধুর সাথে গল্প করতে গিয়ে আমি বিস্মিত হয়েছি। অবাক হয়ে দেখলাম, অষ্টাদশ শতকের থিয়েটার নিয়ে আমি ব্যাপক আলোচনা করে ফেলেছি যা এক মাস আগেও আমার মধ্যে ছিল না। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে পেলাম যে আমি সেই সময়টায় অনেক পড়াশুনা করে ফেলেছি। কিন্তু বিষয়গুলোকে থিয়েটারের সাথে মিলিয়ে দেখিনি। অথচ সংযোগটা ঘটে গেছে, অবচেতনে। এখন আমি বুঝতে পারছি স্তানিস্লাভস্কির সেই অভিনেতাটিকে, যে কিনা হেঁটে বেড়াতে বেড়াতে অবচেতনের কাছে নিজের সমস্যার সমাধান চাইতো। আমার মনে হয়, যে অভিনেতারা ‘ক্যাফেতে সময় ব্যয় করতো’ তাদের প্রতি স্তানিস্লাভস্কি আরো একটু সদয় হলে পারতেন। হয়তো, আয়েশ না করে তারা সত্যি কাজই করছিল।

মানসিক ক্রিয়া এবং তার পরিণামে শারীরিক ক্রিয়া যে অবচেতনেই চলতে থাকে এই উপলব্ধি মনকে অনেক উদ্বেগ থেকে রেহাই দেয়। এটা বোঝার আগ পর্যন্ত বিবেকের পীড়নে কষ্ট পেয়েছি। উৎকন্ঠা নিয়ে কেবল ভাবতাম আমার ‘কাজ’ করা উচিত। অবচেতন ক্রিয়া আর সচেতন ক্রিয়ার এই অসঙ্গতি নিদারুণ মর্মপীড়ার কারণ হত। অপরাপর অভিনয় শিল্পী ও নির্দেশকগণের সাথে কথা বলে জেনেছি তারাও একইভাবে আক্রান্ত হন। কেউ কেউ এর কারণ হিসেবে নিজের চারিত্রিক ত্রুটিকে চিহ্নিত করতেন। সব সত্ত্বেও, এর অবস্থান অভিনেতার প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দুতে। অবচেতন মনো-দৈহিক ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অভিনেতার কাজের পথ অনুসন্ধানে সদা সচেষ্ট স্তানিস্লাভস্কি। ইতোপূর্বে ‘মহড়ার কাজ’ বিষয়ে আমি যা বলেছি তা সেই কাজগুলোকে ‘সচেতন সম্মুখ-মস্তিষ্ক’ থেকে ‘অবচেতন পেছন-মস্তিষ্ক’-তে চালিত করার পথনির্দেশ সম্পর্কিত। প্রত্যেক নির্দেশক সেইসব ‘ইন্টেলেক্চ্যুয়াল’ অভিনেতাকে ভয় করেন যারা আগেভাগেই সব তৈরি করে ফেলেন এবং নিজের করণীয় সম্পর্কে অতিসচেতন এবং সেই জায়গা থেকেই অভিনয় ক্রিয়া চালিয়ে যান। আসলে ‘ইন্টেলেক্চুয়াল’ শব্দটি থিয়েটারে একটি জঘন্য শব্দ। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, আমরা যেন সোনা ধোয়া জল ফেলতে গিয়ে সোনার টুকরোটা ফেলে না দিই।

পেছন-মস্তিষ্কের অবচেতন ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয় যতক্ষণ না আমরা জানি তার ভিতরে কী ঘটছে। অবচেতন মনকে নিজের মত কাজ করতে দিলে সে আরো বেশি নিপুণভাবে কাজ করে এটা বোঝা এক জিনিস, আর তার উপর অন্ধবিশ্বাসে নিশ্চিন্ত থাকা আরেক জিনিস। ফের ‘কম্পিউটার’ উপমা দিয়ে বলি যে, মস্তিষ্কের পেছনের অংশ চাহিদামত বিচিত্র পরিস্থিতিতে কাজ করতে সংবদ্ধ (প্রোগ্রাম্ড)। আমি মানুষটা যেমন, তেমনটা হয়ে উঠবার প্রধান কারণ, নানা সময়ে নানান পরিস্থিতিতে সেভাবেই সাড়া দেয়া ঠিক মনে করেছি যেভাবে সাড়া না দিলে ফলপ্রসু হয় না বলেই আমি বিশ্বাস করেছি। রেগে গেলে আমি নিশ্চয় জানলা দিয়ে বোতল ছুঁড়ে মারি না। কেউ যখন আমার সাথে ঝগড়া বাধায় আমি নিরবে সরে আসি। একটা সময় ছিল যখন নিরবে সরে না এসে নিজের জায়গায় অটল থেকে লড়াই করতাম। কিন্তু দেখেছি তাতে কোনো লাভ হয় না। ফলে নিজেকে বদলে ফেলেছি। নিজেকে এবং নিজের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছি। যে প্রোগ্রাম থেকে আমার পেছন-মস্তিষ্ক আমার ক্রিয়া নির্দেশ করে, সেই প্রোগ্রামটা তৈরি হয়েছে সারা জীবন ধরে। এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সে অব্যাহতভাবে উপযোজন ও পরিশোধনরত ছিল এবং এর বেশিরভাগই এত আগে ঘটেছে যে সেসব কথা আমার মনেই নেই। যাই হোক না কেন, এই প্রোগ্রামটি এত জটিল যে এর ভিতর নির্মিত নিয়ন্ত্রণ ও যাচাইয়ের পরস্পরবদ্ধ ব্যবস্থার কারণে তাকে সহজে বোঝা যায় না। প্রতিদিনকার জীবনে আমরা এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেই যেগুলোর যৌক্তিকতা নিরূপন করা ক্লান্তিকর। হ্যাঁ, সিদ্ধান্ত কার্যকর না হলেই কেবল আমরা তা পুনর্বিবেচনা করি, সেও আংশিক মাত্র। এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত মানুষের সামাজিক শিক্ষা ও উন্নয়ন। আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করি; সেই অভিজ্ঞতা থেকে যা শিখলাম তার সাধারণীকরণ করি; সচেতনভাবে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি; ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য এই প্রক্রিয়াকে পুনর্বিন্যাস করি। এই প্রোগ্রামটি পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যর্থ হলে, আমরা মর্মাহত হই।

এসব সংকটই পৃথিবীর বেশিরভাগ নাট্যের শাঁস গঠন করে এবং অনেক নাটককে দ্বন্দ্বের শিখরে নিয়ে যায়। প্রোগ্রাম বলতে যে পূর্বলেখ ক্রিয়া সমষ্টিকে বোঝানো হয়েছে তা বাইরের মানব বা বস্তু জগতের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় অথবা একটি বিপরীতমুখী বা পরস্পরবিরোধী প্রোগ্রামের সম্মুখীন হয়। এই রকম পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে প্রতিনিয়ত খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টাই হচ্ছে কমেডি। ট্র্যাজিডি বা প্রহসন হয় যদি পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে চলবার মত প্রোগ্রাম অন্বেষণে ব্যর্থ, নয়তো বিকল্প একটি প্রকল্পের অন্বেষণে একনিষ্ঠ যা তাকে এক অপরিহার্য বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যায়। ‘ড্রামা’ বলতে আমরা যা বুঝি তা সেই পূর্বলেখর সাথে খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। বিষয়টা আসলে কাজের উপলক্ষ বা উদ্দেশ্যের চাইতে বরং মানবিক অস্তিত্ববোধ ও অভিজ্ঞতার সাথেই বেশি সংশ্লিষ্ট।

যে পথে এই সংকটসমূহের অভিজ্ঞতা হয় তা অবশ্যই ব্যক্তি ও সংকটের ধরন সাপেক্ষ। নিজের অজ্ঞাতেই কোনো অসুখী পরিস্থিতিতে উপনীত হলে আমরা বলি, ‘আমি বুঝি না এরকম গাধা আমি কি করে হলাম; নিজের গালে নিজেই চড় মারতে ইচ্ছে হচ্ছে’। ওই প্রোগ্রামটা যখন আমাদের হেয় করে তখন আমরা বলি, ‘ভুল হয়ে গেল’ বা ‘এভাবে ভাবিনি’। ‘আর কখনো এমন ভুল করবো না’ বলে আমরা সংকল্প করি। কোনো না কোনোরকম সচেতন বুদ্ধিবৃত্তির যে প্রয়োজন আছে তা পরিষ্কার হয়ে যায় যখন তাৎক্ষণিক পদপেক্ষ গ্রহণ করার বদলে আমরা বলি, ‘এটা নিয়ে ভাবতে হবে’। প্রোগ্রামটাকে পরিবর্তন করতে হলে সচেতন সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। পরিবর্তন করার জন্য সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সব সময়ই সম্ভব। কিন্তু আমরা সচরাচর তা করি না যতক্ষণ না একটা সংকট তৈরি হয় এবং আমরা চলমান প্রোগ্রামের অপর্যাপ্ততা টের পাই বা সেটা আমাদের কোনো ঝামেলায় ফেলতে যাচ্ছে তা অনুমান করি। পরিবর্তন করতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে প্রোগ্রামটা স্বয়ং কী। জটিল পরিস্থিতিতে আমরা অনেক সময় বলি, ‘নিজের মনকেই আমি বুঝতে পারছি না’ বা ‘দাঁড়াও একটু ভেবে নেই’।

প্রোগ্রামের পরস্পর বিরোধিতা বোঝা যায় যখন আমরা বলি, ‘কি করবো বুঝতে পারছি না; উভয়সংকটে পড়ে গেলাম’। সমস্যাগুলোর উৎপত্তি হয় যখন আমরা ছোটখাট পরিবর্তন সাধন করি এবং যখন প্রোগ্রামের ভিত্তিতেই গড়বড় থাকে। অনেকই আছেন, যাদের দলে আমিও পড়ি, যারা বিদঘুটে ভাষায় লেখা বই পড়তে পড়তে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় কাতরায়। থিয়েটারেও একই ব্যাপর ঘটে যখন দর্শকের একাংশ ধোয়াটে বা অতি আধুনিক নিরীক্ষাধর্মী নাট্য আঙ্গিক বা কাঠামোর মুখোমুখি হন: ‘মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না; দুর্বোধ্য’।

এরকম পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা সাধারণত প্রোগ্রামটাকে পুনর্বিন্যাস করার ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চাই। কেবলমাত্র সংকট মোকাবেলায় বাধ্য হলে তবেই আমরা প্রোগ্রামের ভিত্তি পুনর্বিবেচনা করি। এর জন্য সব সময়ই দরকার উদ্ভূত সমস্যা এবং তাকে মোকাবেলা করার উপায়সমূহকে বোঝা।

কী মহড়ায়, কী প্রদর্শনীতে অভিনেতা প্রতিনিয়তই এই প্রক্রিয়াসমূহের মধ্য দিয়ে যান। যদিও স্বভাবতই তিনি সেসব নিয়ে প্রশ্ন না করতে বা না ভাবতেই পছন্দ করেন। সেটা করলে নিজের কাজকে তার ব্যাহত করাই হয়। তিনি বিশ্বাস করেন যে তার অভিজ্ঞতা এবং কৌশলই ‘সহজাতভাবে’ তার সচেতন মানসিক ক্রিয়াকে অবচেতন ক্রিয়াকল্পে রূপান্তরিত করে নেবে। সেটা যে আবার না-ও ঘটতে পারে সেই ভয়েও তারা কাতর থাকেন কারণ অভিনেতারা হচ্ছেন আজন্ম উদ্বিগ্ন মানুষ।

অনেক সুদ ও সুউচ্চ কৌশলসমৃদ্ধ অভিনয় শিল্পী এই বিশ্বাসে অবিচল যে, অভিনয় হচ্ছে একটি সহজাত অন্তর্জ্ঞান প্রক্রিয়া যাকে বর্ণনা বা ব্যাকরণবদ্ধ করা যায় না। অতিরিক্ত ভাবনা চিন্তার মধ্যে না গিয়েই তারা কাজ করে চলেন। অথবা, সব নির্দেশকই যে কথা কখনো না কখনো বলে থকেন, 'বোঝাবার দরকার নেই, করে দেখাও’। অর্থাৎ ‘অভিনয় ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তার অন্তরালের প্রক্রিয়াটা দেখাও’। মহড়াকালে উদ্ভূত ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা নিয়ে বিস্তর মতানৈক্যের অবকাশ রয়েছে। একজনের কথা বললে বলতে হয় জ্যাঁ ভিলা-র কথা। তিনি বিশ্বাস করতেন অভিনেতা যা করতে যাচ্ছেন তাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অনেক আলোচনার দরকার আছে। অর্থাৎ প্রোগ্রামের খণ্ডগুলোকে সংযুক্ত করে সেগুলোকে ক্রিয়ারূপ দেবার আগে সেগুলো সম্পর্কে পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে নেয়া দরকার। সচল মহড়া পরিস্থিতিতে অভিনেতার প্রোগ্রামটা তৈরি করে নেবার পক্ষে জোয়ান লিট্লওড ঐ আলোচনাকে কাজে লাগাতেন নাটকটার বৃহত্তর দিকগুলোকে বুঝে নেবার ক্ষেত্রে। এই প্রক্রিয়ায় ভদ্রমহিলা অভিনেতার বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনের অনেকটাই নিজের কাঁধে নিয়ে নেন। অনেক অভিনয় শিল্পী এই আলোচনার বিষয়টি নিয়ে অসন্তুষ্ট। তারা সরাসরি ক্রিয়ায় অবতীর্ণ হতে পছন্দ করেন। প্রায়শই তারা চিন্তা-ভাবনা-বিশ্লেষণের বিষয়কে ‘হোমওয়ার্ক’-এর আওতায় পাঠ মুখস্ত করার সাথে মিলিয়ে নেন। খুব অল্প ক’জনকে বাদ দিলে বেশিরভাগ অভিনেতা এবং নির্দেশকের ক্ষেত্রেই মিলটা হচ্ছে এখানে যে তারা মহড়াকালে আলোচনা অপছন্দ করেন। তাদের মতে সচেতন ভাবনা-চিন্তার কোনো জায়গা নেই মহড়ায় এবং সেটা মহড়ার অন্তরায়।

কিন্তু এখানেই আমরা হোঁচটটা খাই। অভিনেতা যদি সমস্যায় পড়ে এবং সমস্যাগুলো যদি নিজের কাজ সম্পর্কে তার ভ্রান্তিজাত হয় অর্থাৎ তার পুরো প্রোগ্রামটাই যদি হয় ভুল, তাহলে কীভাবে আমরা তাকে উদ্ধার করবো? আজকের থিয়েটার অভিনেতার কাছে এমন কৌশল দাবী করে যা ইবসেন, কাউয়ার্ড এবং স্যাম সেফার্ড প্রমুখ বহুবিচিত্র ধারার নাট্যকারদের সাথে খুব দ্রুত খাপ খাইয়ে নেবার মত যথেষ্ট নমনীয়। দেখা যায় অভিনেতারা অনেক সময় অতীতে কার্যকর হয়েছে এমন কৌশল আকড়ে ধরে থাকেন যা চলমান নাটকের সাথে যায় না। এ কথা বলতেই হবে অভিনেতারা নিজের কাজে ‘আত্মাহুতি’ দেন। নির্দেশকগণ নানা সময়ে এমন অভিনেতার পাল্লায় পড়েন যিনি ঠিক যেন নির্দেশনাটা নিতে পারছেন না। নির্দেশক কী চান তা বার বার বলে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু অভিনেতা ঘুরেফিরে তার নিজের জায়গাতেই থেকে যাচ্ছেন। অথবা এমন কিছু করছেন যা চাহিদার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন কিছু একটা। অভিনেতা প্রায়শ অবনত মস্তকে ক্ষমা চাচ্ছেন ‘কোনো কারণে’ হয়ে উঠছে না বলে এবং বিমর্ষ ও বিধ্বস্ত হচ্ছেন। তিনি জানেন কী চাওয়া হচ্ছে কিন্তু তা দিতে পারছেন না।

কিছু কিছু শিক্ষানবিশ অভিনেতার মধ্যে একটা ব্যাপার দেখা যায়। তারা অভিনয় বা প্রোগ্রাম সম্পর্কে একটা পূর্বধারণায় আবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ তাদের কাছে অভিনয় হচ্ছে একটা ছকে বাধা কিছু অঙ্গ ও কণ্ঠভঙ্গি। তারা যাই করতে যায় তার সবকিছুই কতগুলো বিরক্তিকর ম্যানারিজম্ যার সঙ্গে পরিস্থিতি বা চরিত্র বা নাট্যক্রিয়ার কোনো সামঞ্জস্য নেই। এর প্রকাশ ঘটে কতগুলো নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গি বা ছকে বাঁধা চাল চলন বা উচ্চকিত স্বরভঙ্গি অথবা কণ্ঠপ্রক্ষেপণের মেকি পরিশীলনের মধ্য দিয়ে। কেবল ছাড়তে বললেই এসব তারা ছাড়তে পারে না। বাল্যকালে বাচিকের প্রশিক্ষণ নেয়নি এমন তরুণদের ক্ষেত্রে এটা বেশি হয়। মহড়ায় তাদের কৃত্রিম কণ্ঠস্বর রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সমুদয় মুদ্রাদোষ এতটাই তাদের মনের প্রোগ্রামের মধ্যে মিশ্রিত হয়ে গেছে যে তারা যাই করতে যায় তাতেই সেই পরিচিত অঙ্গ ও স্বরভঙ্গি চলে আসে। তার জন্য যেটা স্বাভাবিক ও সঠিক কর্মপন্থা সেটাকে ব্যাহত না করে সে কি করছে তা সম্পর্কে তাকে সজাগ করে তুলবার পথ খুঁজে বের করতে হবে। তার ভুল সম্পর্কে তাকে চিন্তায় বুদ্ধিতে সচেতন করে তুললে তাকে বরং ব্যাহতই করা হবে এবং বিপর্যস্ত করে তোলা হবে। সমস্যা থেকে তাকে বের করে আনতে হলে একটি সক্রিয় শারীরিক পথ বের করতে হবে।

এই অধ্যায় আমার নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিজাত প্রকল্প বা প্রস্তাবনার সূচনা করে। এটা বৈজ্ঞানিক নয়; দুটো কারণে। প্রথমত- মস্তিষ্কের কর্ম প্রক্রিয়া ও তার সাথে শরীরের যোগাযোগ সম্পর্কিত বিজ্ঞান এখনো ততোটা বিকাশ লাভ করেনি। দ্বিতীয়ত- এক্ষেত্রে ব্যবহৃত পরিভাষা অভিনেতার সহায়ক নয়। এও পরিষ্কার যে, একজন বিশেষ মানুষ যেভাবে ক্রিয়াশীল, একই রকম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পন্ন আরেকজন মানুষ কখনোই পুরোপুরি ঠিক সেভাবে ক্রিয়াশীল হয় না। মন ও শরীরের ক্রিয়াকে বুঝে পরিণামে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে অভিনেতাকে নিয়ে যেতে হবে তারই নিজস্ব সক্রিয় শারীরিক অভিজ্ঞতা ও সংবেদনের দিকে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষাকে সে ক্রিয়ার সাথে মিলাতে পারে না। তাকে সেই পরিভাষা নিয়ে ‘চিন্তাশীল’ হতে বাধ্য করার অর্থ তাকে নিষ্ক্রিয় করা। তা সত্ত্বেও আমি যা বলেছি তার সপক্ষে কিছু বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদির দিকে যাবার একটা তাগিদ বোধ করছি।

স্নায়ুতন্ত্র

স্নায়ুতন্ত্রকে দুইভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। পুরাতন মস্তিষ্ক ও নতুন মস্তিষ্ক। ‘নতুন মস্তিষ্ক’  মস্তিষ্কের শ্বেত পদার্থবিশিষ্ট বহিরাবরণ (করটেক্স) এবং তার সহকাঠামো নিয়ে গঠিত। এর সাথে শরীরের মাংশপেশীর কোনো যোগাযোগ নেই। পেশী আন্দোলিত হয় পুরাতন মস্তিষ্ক অর্থাৎ সেরিবেলাম, বাল্ব এবং স্পাইনাল কর্ডের মধ্যস্থতায়। অর্থাৎ শ্বেত বহিরাবরণ এবং তার আনুষঙ্গিক বস্তু বাদ দিলে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মূল জিনিসগুলোই থেকে যায়। পুরাতন মস্তিষ্ক মূলত ইচ্ছা নিরপেক্ষ ক্রিয়া এবং করটেক্সে বার্তা আনা নেয়ার কাজ করে। বিবর্তনের ধারায় পুরাতন মস্তিষ্কের আদি কাঠামো বা অবস্থা থেকে সৃষ্ট বলে এবং আমরা যাকে উচ্চতর ক্রিয়া বলি তা সম্পন্ন করে বলে করটেক্সকে বলা হয় ‘নতুন মস্তিষ্ক’।

স্নায়ুতন্ত্রের কাজগুলোকে মোটা দাগে তিনটি ভাগে ফেলা যায়- সচেতন ক্রিয়া, প্রতিবর্তী ও স্বয়ংক্রিয় ক্রিয়া এবং বোধহীন ক্রিয়া। বোঝা যায় যে, এই ক্রিয়াসমূহ নতুন মস্তিষ্ক, পুরাতন  মস্তিষ্ক এবং চিন্তাহীন শরীর বর্ধন পদ্ধতির সাথে সম্পর্কযুক্ত।

লক্ষ্যণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে (ক) নতুন মস্তিষ্ক-র অবস্থান মস্তকের নিচের দিকে অবস্থিত পুরাতন মস্তিষ্কের উপরিতলে [এটাই আমাকে মস্তিষ্কের ক্রিয়াকে সামনে বা পেছনে বলে চিহ্নিত করতে উৎসাহিত করে], (খ) নতুন বা সম্মুখ মস্তিষ্কের সাথে পেশীর কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই। সচেতন চিন্তাকে ক্রিয়ারূপ দিতে হলে পুরাতন বা পেছন মস্তিষ্কের মাধ্যমেই দিতে হয়।

এমনিতে কেউ যদি তার বাহু সঞ্চালন করতে চায় তো সে তা অনায়াসেই করে ফেলে। যদিও সঞ্চালনের এই সিদ্ধান্ত এবং তার বাস্তবায়নের মধ্যে অনেক ব্যবধান বা দূরত্ব থাকে। সচেতন সত্তা অভিপ্রায় করে। তাকে কার্যকর করার দায় পড়ে একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার উপর যে প্রক্রিয়া অবশ্যই একটি অবচেতন প্রক্রিয়া। কারণ, দিনের একেকটি কাজের জন্য সচেতনভাবে শরীরের একেকটি পেশী পরম্পরাকে সুশৃঙ্খলভাবে সঞ্চালিত করার জন্য যথেষ্ট সময় কারো হাতেই থাকতে পারে না। এর জন্য যে পরিমান মনোসংযোগ ও তাকত প্রয়োজন তা অসম মূল্যবান। তাই এটা স্পষ্ট যে, অনেক কাজই ছেড়ে দিতে হয় মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে স্বয়ংক্রিয় কোনো পদ্ধতির উপর।

তৃতীয় অধ্যায়
চিন্তা ও ক্রিয়া

সচেতন ভাবনা-চিন্তার অনুপ্রবেশে যখন শরীর ও মনের স্বাভাবিক অবচেতন সমন্বয় ব্যাহত হয় তখন অভিনেতার যেসব সমস্যা হয় তা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে বর্ণনা করেছি। আমি ইঙ্গিতে এইসব সমস্যার কার্যকর সমাধানে একটি কর্মপদ্ধতির কথা বলেছি যাতে অভিনেতাকে সমস্যা সম্পর্কে সচেতন করে চোরা গর্তে না ফেলা হয়। কারণ, এতে করে অতিসচেতন হয়ে সে সমস্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে। অভিজ্ঞ অভিনয় শিল্পীর ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিই আমরা বেছে নিই না কেন মনে রাখতে হবে এতে যেন তার স্বাভাবিক কর্মদক্ষতা বাধাপ্রাপ্ত না হয়। নবীন অভিনেতার ক্ষেত্রে পদ্ধতি হওয়া উচিত এমন যাতে করে সে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে কাজ করার স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত পন্থা খুঁজে পায়। আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার করা দরকার যে, নতুন নতুন নাট্য আঙ্গিকের সাথে সাথে অভিনয় শিল্পীর উপর প্রত্যাশাও পরিবর্তনশীল; সেক্ষেত্রে অভিজ্ঞ অভিনয় শিল্পীও অনেক সময় নতুন করে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। সমস্যা যাই হোক, তার নিরসন আবর্তিত হওয়া উচিত পেছন মস্তিষ্কের অবচেতন ইচ্ছা নিরপেক্ষ বা প্রতিবর্তী ক্রিয়াসমূহকে কেন্দ্র করে। সেটাই এখন আমরা পরীক্ষা করে দেখবো, পরবর্তী অধ্যায়ে অভিনেতার প্রশিক্ষণের বিষয়ে যাবার আগে।

মন ও শরীর

পেছন-মস্তিষ্কের কেবল একটাই কাজ যেটা আগের অধ্যায়ে খোলাসা করা হয়নি। সে পেশী সঞ্চালন ও অঙ্গ সমন্বয়ের বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে। অবচেতন মনের প্রোগ্রামটি এবং শরীরের পেশী ক্রিয়ার মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে যার মধ্য দিয়ে সে তার অভিপ্রায় বা লক্ষ্য নির্দেশ করে এবং তার অভিমুখী হয়। মন ও শরীর প্রক্রিয়ার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। শরীর ক্রিয়ার মাধ্যমে মানসিক পীড়া বা ভারসাম্যহীনতা উপশমের বেশ কয়েকটি মনো-দৈহিক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত আছে। এটাতো স্বীকৃত যে শরীরের ব্যবহার মনকে প্রভাবিত করে এবং মানসিক অবস্থা শরীরে প্রতিফলিত হয়। মানসিক অবসাদ বিপর্যস্ত দেহভঙ্গিতে ফুটে উঠে। অবসন্ন শরীর মনকে হতোদ্যম করে। শরীর ও মন দুই-ই কখনো কখনো আপনা থেকেই নিজেদের পরিচালিত করে, জাকিয়ে বসে এবং তাদের এইরূপ চলন থেকে বেরিয়ে আসা দুরূহ। শরীর ক্রিয়ায় অনীহা এবং মনের সিদ্ধান্তহীনতা হাত ধরাধরি করে চলে। মূল একটা কারণ থাকলেও কে কার জন্য দায়ী সেটা কোনো প্রশ্ন নয়; সমস্যা হলো এই যে, একটা দুষ্টচক্রের আবর্তন শুরু হয়ে যায় এবং উপায়ান্তর খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এর ব্যুহ ভেঙে বের হওয়া দুষ্কর। সবাই জানি যে অসুস্থতা থেকে আরোগ্যলাভ রোগীর সেরে ওঠার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। ‘আমি প্রতিদিন একটু একটু করে সেরে উঠছি’ -রোগ নিরাময়ে এমিলি কোয়ি’র এই প্রণোদনা অনেকটা সাফল্য অর্জন করেছিল নিশ্চিত।

আমার ক্ষেত্রে শরীরের ওজনের মত একটা তুচ্ছ ব্যাপার আমার কাজ ব্যাহত করে। কোনোভাবে আমি বুঝেছি আমার ওজন ১১ স্টোন ৪ পাউন্ড ছাড়িয়ে গেলে আমার পক্ষে কাজ করা মুষ্কিল। এই ওজনে শুধু যে আমার শরীর স্থুুল ও মন্থর হয়ে পড়ে তা নয়; আমার মনও ঠিক ঠাক কাজ করে না। মনো-দৈহিক চিকিৎসা পদ্ধতির গুরুত্ব নিহিত সমস্যাটিকে মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক সম্পর্কের ধরন বা পরিবেশ প্রতিবেশ সংকটের জায়গা থেকে না দেখে অতি সহজ শারীরিক দিক থেকে দেখার মধ্যে। হ্যাঁ, পূর্ণ আরোগ্যের জন্য হয়তো অন্য বিষয়গুলোর মধ্যেও অদলবদলের প্রয়োজন পড়বে। যদিও অভিনেতাদের নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে আমরা কোনোরকম শারীরিক অসুখ নিয়ে ভাবছি না। আমরা কেবল ভাবছি কাজের ক্ষেত্রে অভিনেতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে যেসব সমস্যা তা নিয়ে। কিন্তু অভিনয় যেহেতু সর্বোপরি বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রিয়ার চেয়েও অনেক বেশি করে একটি শারীরিক ক্রিয়া, আমরা শুরু করি সেখান থেকে যেখানে অভিনেতা তার শরীর ব্যবহার করতে গিয়ে সংকটে পড়ে এবং শরীরের ব্যবহারের সাথে সাথে নতুন মনো-দৈহিক সংবেদন লাভ করে।

এটাও পরিষ্কার করা দরকার যে, সচেতন হওয়া ও জ্ঞাত হওয়া এবং অবচেতন ও অচেতন-এর মাঝে পার্থক্যটা বুঝতে হবে। সঙ্গমরত অবস্থায় আমি তো খুব তীক্ষ্ণভাবে জ্ঞাত আমি কী করছি সেই বিষয়ে; কিন্তু থেমে গিয়ে যদি ওটা নিয়ে ভাবতে বসি তাহলে কিন্তু কাজটা আর করা হলো না। সঙ্গীর সাথে আমি শারীরিক, মানসিক ও আবেগিক স্তরে আদান-প্রদানের একটা সুক্ষ্ণ প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত থাকি। আমার মাঝে কী চলছে বা ঘটছে এবং আমি কাজটা কী করছি তা হয়তো অবচেতনে থাকে। কিন্তু এই অবচেতন থেকে অচেতন-এর দূরত্ব অনেক। তিনটি কমলা হাতে নিয়ে বাজিকরি করার সময় শারীরিক ও মানসিক মনোসংযোগের পুরোটাই কাজে লাগাতে হয়। কিন্তু এই অবিরাম ছোড়া-ধরার কেরামতি করার সময় সেটা নিয়ে ভাবনার সময় বা সুযোগ কোথায়? যেটা করছি সেটা ভাবা আর যেটা করছি সেটা নিয়ে ভাবা - এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যটাই হচ্ছে সচেতন ও অবচেতন-এর পার্থক্য। ‘সচেতন’ সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে কেবল ক্রিয়ার আগে বা পরে; ক্রিয়ারত অবস্থায় নয়।

জ্যাঁ-পল সার্ত্রে কার্যত ‘সচেতন সম্মুখ মস্তিষ্ক’-র চেয়ে ‘অবচেতন পেছন-মস্তিষ্ক’-র প্রাধিকার দেন। তিনি যে দাবীটা করেন তা হলো, প্রতিটি সচেতন মুহূর্ত কোনো না কোনো অর্থে একেকটি আত্ম-চেতন মুহূর্ত। এ বিষয়ে তার ব্যাখ্যা এরকম:

আমার হাতের এই বাক্সের সিগারেটগুলো যদি গণনা করি, তাহলে এই সিগারেটগুচ্ছ সম্পর্কে একটি বস্তুনিষ্ঠ ধারণা আবিস্কার করার অনুভূতি হয়- এখানে বারটি সিগারেট আছে। আমার কাছে মনে হয় এই বৈশিষ্ট্যটি পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। এটা সম্ভব যে, আমি যে গণনা করছি সেটা আমি জানি না। আমি নিজে কখনো গণনা করি বলে জানি না। এর প্রমাণ এই যে, শিশুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটা যোগ করে ফেলে, কীভাবে করলো তার ব্যাখ্যা না জানলেও। এটা প্রমাণিত হয় পিয়াজে’র পরীক্ষার মাধ্যমে যা এ্যালাইন’র তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে- কারোর জানার মানে হচ্ছে সে কী জানে তা জানা। যদিও, যে মুহূর্তে প্রকাশ পেল এখানে এক ডজন সিগারেট আছে তখন আমার গণন ক্রিয়া সম্পর্কে একরকম সচেতনতা হল। আমি কী করছি জিজ্ঞাসা করা হলে আমি চট্ করে বলবো আমি ‘গণনা করছি’। এই উত্তরের মাঝে কেবল নিজের চিন্তা শক্তি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক সচেতনতাই  অন্তর্ভুক্ত  থাকে  না;  বরং  সাম্প্রতিককালে চিন্তাপ্রক্ষেপহীনভাবে অতিবাহিত মুহূর্তসমূহের সচেতনতাও যুক্ত থাকে। তাই দেখা যাচ্ছে ‘প্রতিফলন’ ‘প্রতিফলিত সচেতনতার’ চেয়ে প্রাধান্য পায় না; প্রথমটির কাছে দ্বিতীয়টি প্রকাশিত হয় না। বিপরীতভাবে, অপ্রতিফলিত সচেতনতাই প্রতিফলনকে সম্ভব করে তোলে...

পরিভাষার সামান্য পার্থক্য থাকলেও এখানে সার্ত্রে ঠিক সেই প্রক্রিয়ার কথাই বলছেন যা নিয়ে আমি কাজ করছি। অত্যন্ত মজার বিষয় হচ্ছে এই যে, তিনি অ-চিন্তাশীল পেছন-মস্তিষ্কের ক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করছেন লক্ষ্য নির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সংক্রান্ত ক্রিয়াকে। এটা সম্ভব হয় পুরাতন পেছন-মস্তিষ্ক এবং শরীরের পেশীসমূহের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্কের কারণে।

চিন্তা থেকে যেমন চিন্তা-প্রকাশক ভাষাকে আলাদা করা যায় না; ঠিক তেমনি ক্রিয়া থেকে উদ্দেশ্যকে আলাদা করা যায় না। প্রায়ই যেটা ঘটে, আমাদের কথা যেমন আমাদের চিন্তাকে প্রকাশ করে, ঠিক তেমনি আমাদের ক্রিয়া আমাদের উদ্দেশ্যকে প্রকাশ করে। অর্থাৎ ক্রিয়াদি উদ্দেশ্যকে আলাদা করে, তাকে ছকবদ্ধ করে এবং তাকে যাপন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার সুযোগ করে দেয়।

ইচ্ছাশক্তি যখন জাগ্রত হয় তখন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং শুধু বাকি থাকে তার ঘোষণা।

সুদক্ষ অভিনেতা শিল্পীগণ কেন বলতেই থাকেন যে অভিনয় একটি সহজাত বা সজ্ঞানজাত অন্তর্জ্ঞান প্রক্রিয়া, এই প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণে অনেক দূর সহায়তা দেবে উপরের কথাগুলো। ‘ওটা নিয়ে চিন্তা করো না, করে দেখাও; চরিত্রটা নিয়ে তোমার চিন্তা-ভাবনা-পরিকল্পনা কোনো কিছু না ব্যাখ্যা করে সবকিছু তোমার ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করো’ নির্দেশকের এইসব আর্তনিনাদের একটা দার্শনিক যাথার্থতাও এর মধ্যে মেলে।

শরীর/ চিন্তন

আমার অনুমানের জায়গা থেকে যদি আমরা শুরু করি অর্থাৎ সম্মুখ মস্তিষ্কের চিন্তাশীল, সচেতন হস্তক্ষেপ উপেক্ষা করার বিষয়টা মেনে নিয়ে যদি অগ্রসর হই, আমাদের অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে সমন্বিত শরীর/চিন্তন প্রক্রিয়াদির দিকে, যে সকল প্রক্রিয়া শরীরের পেশী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বোঝা যায় এবং যেগুলো সংশোধনের মাধ্যমে উন্নত করা যায়, তাহলে আমাদের চেষ্টা হবে সেই ইন্দ্রিয়কে প্রশিক্ষিত করা যার মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়াদি অনুধাবন করা যায়।

এই প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্নের উদয় হয়:

১.    যারা কাজের সঠিকতর পথটি অবলম্বন করে তারা কি দিয়ে অন্য পথসমূহ থেকে তার পথটি আলাদা করে নিয়ে সেই পথে চলতে থাকে?
২.    শ্রেয়তর পথে অন্যদের চলতে দেখেও কেন কেউ কেউ পরিত্যাজ্য পথ ছাড়ে না?

এটা কি কোনো সহজাত বিষয় বা এক ধরনের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়? সত্যিই বোধহয় এটা একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় - সেই গতি-নন্দন-বোধ (Kinaesthetic sense)! এই সেই অনুভূতি যার মাধ্যমে পেশী  সঞ্চালন, ওজন, অবস্থান এসবের উপলব্ধি হয়।

গতি-নন্দন-চেতনা বা শরীর/চিন্তন হলো সেই প্রক্রিয়া যার দ্বারা আমরা অবচেতনভাবে ভূতলে (space) শরীরের চলন নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ করি তা সে বাইরের উদ্দীপনাতেই হোক বা মনের ভিতর উদিত ইচ্ছার কারণেই হোক। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জীবনের বেশিরভাগটা ধরে শারীরিক উপলক্ষসমূহ কার্যকর হয়; এর দ্বারাই আমরা অভ্যাসগত শারীরিক দক্ষতাসমূহের অনুশীলন করি স্বাভাবিকভাবে এবং অ-আত্মসচেতনভাবে; এর মাধ্যমেই আমরা অনবরত প্রতিবেশ থেকে তথ্য আত্মীকরণ করি ও তার প্রতিক্রিয়া করি কোনো রকম না ভেবে-চিন্তেই; এর মাধ্যমেই দেহ কর্তৃক মস্তিষ্কে প্রেরিত তথ্য হৃদয়ঙ্গম করি ও সাড়া দিই। এই প্রক্রিয়াতেই উল্লিখিত ক্ষেত্রসমূহে নিজেদের ক্রিয়া ও পরিণতি সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত হই। আমরা তখনই কেবল এই প্রক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করে একটি সচেতন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করি অর্থাৎ ‘সম্মুখ মস্তিষ্ক’-র সাথে সংযুক্ত করি যখন সে আমাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়, অথবা সে পেরে উঠবে না বলে ভয় করি, অথবা যখন আমরা আচার আচরণের রীতি পরিবর্তন করতে চাই বা নতুন দক্ষতা অর্জন করতে চাই বা যখন তার কাজে কোনো গোলযোগ বাধে। এই রকম একটা গন্ডগোল হয় যখন অসুস্থতা, মদ্যপানে বেহাল অবস্থা বা শারীরিক অবসাদ বাগড়া দেয় গতিনন্দনবোধের স্বাভাবিক কার্যক্রমে, যার কাজই হচ্ছে অন্য মানুষ বা বস্তুর সাপেক্ষে ভূতলে শরীরের অবস্থান নির্ধারণ করা। সেক্ষেত্রে আমরা কোথায় আছি সেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি, হোচট খাই, হুমড়ি খেয়ে পড়ি, দূরত্বভেদজ্ঞান লুপ্ত হই। এরকম যখন হয় তখন ‘পেছন মস্তিষ্ক’-র অবস্থান-নির্দেশক সংবেদন (righting reflex) বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অথবা সেটা চোখ ও সম্মুখ মস্তিষ্কের প্রত্যক্ষ সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিচালিত দৃষ্টিভিত্তিক অবস্থান-নির্দেশ-ব্যবস্থার অধীন হয়ে পড়ে। তখন আমরা ভীষণ রকম সচেতনভাবে চাক্ষুস বস্তুনিচয়ের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করতে শুরু করি। অর্থাৎ নিজেদের স্থির কেন্দ্রের সাপেক্ষে বস্তুর অবস্থান সম্পর্কে আমাদের সহজাত ধারণার বাইরে গিয়ে আমরা বস্তুসমূহকে কেন্দ্র ধরে ভূতলে চলাচল করি।

এটা পরিষ্কার যে, গতিনন্দনচেতনা একজনের থেকে অন্যজনের মধ্যে বেশি সূক্ষ্মভাবে থাকে; কিন্তু কম হোক বেশি হোক, এটা সবার মধ্যেই আছে। এটা তর্কাতীত নয় যে অভিনেতাদের অত্যন্ত সূক্ষ্ম গতিনন্দনচেতনা থাকতে হয়; তারা শরীর খেলাতে পছন্দ করে, শারীরিক উদ্দীপনায় তারা অনেক সহজে এবং কল্পনার মিশ্রণ ঘটিয়ে সাড়া দিতে জানে, তারা তাদের কাজটাকে নিয়ে অতিরিক্ত ‘আঁতলামি’ পছন্দ করে না বললেই চলে। একদিকে অভিনেতার প্রতিভা;  অন্যদিকে একজন মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং সূক্ষ্ম গতিনন্দনচেতনা অর্থাৎ জটিল কাল্পনিক উপলক্ষকে ধারণায় আনার ক্ষমতা ও তাকে ক্রিয়ায় রূপ দেবার সামর্থ। এই দুটোকে প্রায় সমান বিবেচনা করা যায় বললে চলে। বাকি থাকে যা, তা আসে অভিজ্ঞতায় এবং শৃঙ্খলা অর্জনের মাধ্যমে।

ম্যগনাস দাবী করেন গতিনন্দনচেতনা বা শরীর/চিন্তন আপনা আপনি কাজ করে যদি না তাকে ব্যাহত করা হয়। কিন্তু সে প্রতিনিয়তই সম্মুখ মস্কিষ্কের দ্বারা আক্রান্ত হয়। সচেতন চিন্তা নিয়মিত আমাদের শরীর/চিন্তা প্রক্রিয়াকে ঝামেলায় ফেলে; সে আবার সঠিক জায়গায় ফিরে আসে যখন সচেতন চিন্তা ও নির্দেশনা অপসৃত হয়।

ফেলডেনক্রাইস বলেন,

শরীর ও মনের স্বাভাবিক সমন্বয় ভীষণভাবে ব্যাহত হয় এবং শরীরের প্রতি মনের দিকনির্দেশনাসমূহ বাধাগ্রস্ত হয়- এরূপ দুর্ভাগ্যজনক অবস্থায় মানুষ একটা ইন্টেলেক্চ্যুয়াল অবস্থায় থাকে। তাদের সকল শরীরক্রিয়া সচেতন প্রণোদনায় ব্যাহত হয়। সঠিক সচেতন নিয়ন্ত্রণ কখনো কখনো সীমিত অর্থে অনুপুঙ্খতা আনে; কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তি কখনোই প্রাণশক্তির বিকল্প হতে পারে না। জীবনের অর্থহীনতাবোধ, ক্লান্তি এবং নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবার ইচ্ছার উৎপত্তি হয় সচেতন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের ফলে। প্রতিবর্তী ইন্দ্রিয় ক্রিয়াই অভিনয়ের জন্য অধিক কার্যকর। স্ব-নিয়ন্ত্রণক্ষম ইন্দ্রিয় সমন্বয়ের উপরই ছেড়ে দেয়া উচিত সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ কার্যসাধন পদ্ধতির ভার। অন্ততপক্ষে, এখন পর্যন্ত স্নায়ুতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের যতটুকু জ্ঞান তার ভিত্তিতে বলা যায় যে এর সুসমন্বিত ও পরিপক্ক নমুনাকে অনুসরণ করলে সচেতন নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির অবমাননা হয় না।

আমরা যদি মেনে নিই যে পেছন-মস্তিষ্কের ‘অবচেতন শরীর/চিন্তন প্রক্রিয়া’ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই স্ব-নির্ণায়ক তাহলে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে তিনটি বিষয়ের দিকে। প্রথমত - সচেতন নিয়ন্ত্রণকে এড়িয়ে আমরা কীভাবে অবচেতন প্রক্রিয়াদিকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে দিতে পারি? দ্বিতীয়ত - এই স্বাভাবিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী জিনিসটি কী? তৃতীয়ত - কীভাবে অভিনেতাকে তার শরীর/চিন্তন ক্রিয়া পদ্ধতি বুঝাবো যাতে করে সে সচেতনতার প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে? অবশ্য... তার আগে..., আমরা শরীর/চিন্তন প্রক্রিয়ার কয়েকটি বাহ্যরূপ পরীক্ষা করে দেখবো।
[চলবে]

অসিত কুমার: অনুবাদক, সংগঠক, সদস্য- ঐকিক থিয়েটার, নারায়ণগঞ্জ।