Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যরীতি [দ্বিতীয় কিস্তি]

Written by সাইদুর রহমান লিপন.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের উপাদান বৈশিষ্ট্য প্রয়োগের স্বরূপ বৈচিত্র্য বিশ্লেণের জন্য চারটি নাটক নির্বাচন করেছি। এগুলো হচ্ছে প্রাচ্য (প্রযোজনা : ঢাকা থিয়েটার, ঢাকা), সঙক্রান্তি (প্রযোজনা : আরণ্যক নাট্যদল, ঢাকা), আবহমান বাংলা (প্রযোজনা : জিয়নকাঠি, ঢাকা) এবং শুরু করি ভূমির নামে (প্রযোজনা : বোধন থিয়েটার, কুষ্টিয়া)। গত সংখ্যায় প্রাচ্য নাটকে লোকনাট্যের উপাদান বৈশিষ্ট্য প্রয়োগের স্বরূপ বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসংখ্যায় সঙক্রান্তি নাটকের উপর আলোচনা করা হচ্ছে]

সঙক্রান্তি
রচনা ও নির্দেশনা : মামুনুর রশীদ
প্রযোজনা : আরণ্যক নাট্যদল, ঢাকা

নাটক শুধু বিনোদন নয় শ্রেণী সংগ্রামের হাতিয়ার, এই বিশ্বাস নিয়ে আরণ্যক নাট্যদল মুনীর চৌধুরী’র কবর নাটক প্রযোজনার মধ্য দিয়ে ১৯৭২ সাথে তাদের যাত্রা শুরু করে। সূচনালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত তাদের মঞ্চ প্রযোজনার ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়েছে অনেক নাটক যার একটি সঙক্রান্তি।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে লোকনাট্য আঙ্গিক নিয়ে যারা সাংগঠনিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন মামুনুর রশীদ তাদের মধ্যে একজন।১ মূলত দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় সম্বলিত মৌলিক ধারার নাটক রচনাতেই তার খ্যাতি বেশি। তার ওরা কদম আলী, ওরা আছে বলেই, ইবলিশ, এখানে নোঙর, গিনিপিগ প্রভৃতি প্রথম দিকের সকল নাটকে শ্রেণী সংগ্রামের শৈল্পিক প্রকাশ ঘটেছে।২ ঐসকল নাটকে লোকপর্যায়ের বা গ্রামীণ জীবনের সাধারণ মানুষ উঠে আসলেও নাটলিপি রচনা বা পরিবেশনায় লোকনাট্য উপাদানের প্রয়োগ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সেখানে পাশ্চাত্যধারার নাট্যরচনা ও পরিবেশনারীতিকেই মূলত অবলম্বন করা হয়। রাজনৈতিক সচেতন এই নাট্যকারের এ সকল নাটকের সংলাপ ও পরিস্থিতি কখনো প্রচার কিংবা স্লোগানধর্মিতায় পর্যবসিত হয়। তথাপিও ‘তার নাটকের কেন্দ্রীয় বিষয়ই হচ্ছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধচেতনা। মানুষের শ্রেণী সংগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাসকে নাট্যরূপ দেয়াই তার নাটকের কেন্দ্রীয় বিষয়।’৩
 
নাট্যকার-নির্দেশক মামুনুর রশীদের চিন্তা ও প্রয়োগে একধরনের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় তার বর্তমান সময়ের নাট্যচর্চা ও ভাবনার মধ্য দিয়ে। তাঁর জয়জয়ন্তী ও সঙক্রান্তি প্রযোজনা দুটির বিষয় ও আঙ্গিকে লোকনাট্যের উপাদান ব্যবহার করতে দেখা যায়। জয়জয়ন্তী নাটকে একটি কীর্তনীয়া দলের জীবন ও চর্চা উপস্থাপিত হয়। সেক্ষেত্রে পরবর্তী নাটক সংক্রান্তি বাস্তববাদী নাট্যরীতি দ্বারা প্রভাবিত হলেও লোকনাট্য উপাদানের প্রয়োগ আরও বেশি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। উল্লিখিত দুটি নাটকেরই বিষয়বস্তু রাজনৈতিক, যেখানে লোক-সমাজের এই দুটি শ্রেণী; ‘কীর্তনীয়া’ ও ‘সঙ’ শিল্পীদের জীবনচর্চাকে শ্রেণী-সংগ্রামের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়। এখানে মামুনুর রশীদের পূর্ববর্তী সকল নাট্যচর্চা থেকে এই দুটি নাটক প্রযোজনায় একটি পরিবর্তন রয়েছে। অর্থাৎ তাঁর নাটকের বিষয়বস্তু রাজনৈতিক কিন্তু পরিবেশনার মাধ্যম হিসেবে সংযুক্ত করেছেন লোকনাট্যের বিষয় ও উপাদান। তাছাড়া নাটক প্রযোজনার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের বাস্তবধর্মী প্রসেনিয়াম মঞ্চ নির্ভর উপস্থাপনার বিষয়েও তাঁর সাম্প্রতিককালের নাট্যচিন্তায় একধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন-

After more than two decades of theatre practice in Bangladesh it is felt that new audience is necessary and proscenium theatre is not right choice for that. We think of an open-air theatre with a different approach both in content and form.

তার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলে দুটি বিষয় প্রতীয়মান হয়। প্রথমত, বর্তমান নাট্যাঙ্গনে নতুন দর্শকের প্রয়োজন, কারণ দর্শকের অভাব। দ্বিতীয়ত, এই নতুন দর্শক আমন্ত্রণের জন্য প্রসেনিয়াম উপযুক্ত মঞ্চ নয়, কারণ দীর্ঘ দু’শ বছরের পাশ্চাত্য বাস্তববাদ অনুসৃত প্রসেনিয়াম নির্ভর নাট্যচর্চা তার উপযোগিতা হারিয়েছে। প্রতীয়মান এই দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে বলা যায় যে, স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের সিংহভাগ নাট্যচর্চা প্রসেনিয়ামমঞ্চ নির্ভর। ফলে বিষয়বস্তুর দিক থেকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য দেখা গেলেও প্রসেনিয়ামমঞ্চ নির্ভরশীলতার কারণে অধিকাংশ নাটকের উপস্থাপনায় বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যায় না। পাশাপাশি দেশীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সাথে নাটকের বিষয় ও ব্যাখ্যার সংযুক্তির অভাব অধিকাংশ দর্শকের মানবিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়। শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় দর্শক অভাবের পেছনে এ বিষয়সমূহ অন্যতম কারণ বলে অনুমান করা যায়।

এরকম একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে নির্দেশক মামুনুর রশীদ সঙক্রান্তি নাটকের নির্দেশনা সম্পাদন করেন এবং তা ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা লাভে সমর্থ হয়। বাংলাদেশের লোকনাট্য পরিবেশনার একটি জনপ্রিয় নাট্যরীতি ‘সঙ যাত্রা’। স্থান ভেদে কোথাও এর নাম ‘সঙ খেলা’, ‘সঙের গান’ প্রভৃতি। এই সঙ অভিনেতা বা সঙ শিল্পীদের জীবন ও সমাজকর্তাদের সাথে তাদের বিরোধকে বিষয় করে রচিত এবং পরিবেশিত হয়েছে এই নাটক। সঙ্গত কারণে লোকনাট্যরীতি ‘সঙ’-এর আঙ্গিক এবং অভিনয় উপাদানের প্রয়োগ এই নাটকে ঘটে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং সঙক্রান্তি নাটকের সামগ্রিক পরিবেশনায় নাট্যকার ও নির্দেশক-এর আধুনিক মনন ও চিন্তার সাথে এই লোকনাট্যরীতির আঙ্গিক এবং অভিনয় উপাদানের প্রয়োগ কোথায় এবং কতটুকু সংমিশ্রিত হয়েছে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রয়োজন।

নাটলিপি

সংক্রান্তি নাটকের ঘটনা বিন্যাস প্রসঙ্গে নাট্যকার বলেন ‘আমি পাণ্ডুলিপিটি খুব অরগ্যনাইজডভাবে লিখেছি।’৫ নাটলিপি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই নাটকের ঘটনা-বিন্যাস পাশ্চাত্যের বাস্তববাদধর্মী নাট্যরীতি অনুসৃত। এ প্রসঙ্গে অভিনেতা ও নির্দেশক আজাদ আবুল কালাম বলেন- ‘নাটকটিতো ওয়েস্টার্ন ফর্মে লেখা, সুতরাং একটা ক্লাইমেক্স বলি বা ক্যাথারসিস বলি এই ব্যাপারগুলি এই ফর্মে আসবে ... ।’৬

নাটলিপিটি বারটি দৃশ্যে বিভক্ত। কাহিনীর উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক এই নাটলিপির দৃশ্য বিভাজন অনুযায়ী দ্বন্দ্বের ক্রমবিকাশ এবং পরিণতি তুলে ধরা হলো।

নাটকটির ঘটনা-বিন্যাসে যে কৌশল গ্রহণ করা হয়, তাতে প্রথম ও দ্বিতীয় দৃশ্যে প্রায় সকল চরিত্রের পরিচয়, সমাজে তাদের অবস্থান ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রকাশ পায়। এক্ষেত্রে প্রথম দৃশ্যে সঙ শিল্পী গফুরকে আসন্ন চৈত্র সংক্রান্তিতে নতুন সঙ তৈরির প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়-

বেদানা
আপনে এলা মাঠে যাইন। মেলা ইয়ারসেল অইছে।

গফুর
কিছু অয় নাই, মাত্র কয়েকদিন বাকি সঙক্রান্তির, কোনো খবর নাই নায়িকার।

সঙ তৈরির এই প্রস্তুতিমূলক প্রসঙ্গ থেকেই গফুরের পরিবারের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতায় সঙ পরিবেশনার ওপর নির্ভরশীলতা এবং পাশাপাশি অন্যান্য সঙ শিল্পীদের অবস্থান ও তাদের পরিচয় পাওয়া যায়। এছাড়া এই দৃশ্যে আরও দুটি চরিত্রের (তালুকদার ও মোমরেজ খাঁ) পরিচয় ঘটে যারা এই নাটকের দুটি প্রভাবশালী চরিত্র। তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থানই মূলত এই নাটকের দ্বন্দ্বকে ঘনীভূত করে তোলে।

দ্বিতীয় দৃশ্যে এই দ্বন্দ্বের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় মোমরেজ খাঁ চরিত্রের সংলাপের মাধ্যমে।

মোমরেজ খাঁ
আমার মাইয়ার বিয়ায় তোরা একখানা সঙ করবি ঐ তালুকদাররে নিয়া ... নয়া টাকার গরম অইলে মানুষ কি করে, নামডাও দিয়া দেই - নয়া টেকার গরম ...

গফুর
একটু বুঝাইয়া কইন ...

মোমরেজ খাঁ
হঠাৎ টেকা অইলে মানুষ কী করে?

গফুর
কেমনে কমু? আমাগো তো কুনদিন টেকা অয় নাই।

(এরপর মোমরেজ খাঁ কী বিষয় নিয়ে তালুকদারের বিরুদ্ধে সঙ তৈরির করা যায় এই নিয়ে গফুর ও তার দলের সাথে শলাপরামর্শ করতে থাকে, অবশেষে-)

মোমরেজ খাঁ
এলা যা ... পরশুদিন চাই একখান ফাষ্টক্লাস সঙ, মানুষ জানি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি যায় আর তালুকদারও য্যান বোঝে মোমরেজ খাঁর পাওয়ারডা।

মূলত এই দৃশ্যের মাধ্যমে গফুরের সঙ দলের নতুন বায়না লাভ এবং তালুকদার ও মোমরেজ খাঁ-র মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে। অন্যদিকে গফুর ও তার দলের এই দুই পরস্পরবিরোধী শক্তির ক্রীড়ানকে পরিণত হবার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রকাশ পায়।

তৃতীয় দৃশ্যে সঙ পরিবেশনার মহড়া বা প্রস্তুতি পর্ব। নাটকটির যে দ্বন্দ্ব চরম উৎকর্ষতায় পৌঁছায় তার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় এই দৃশ্যের মাধ্যমে। কেননা গফুর ও তার দল সঙ তৈরি করার জন্য মোমরেজ খাঁ-র বায়না গ্রহণ করে কিন্তু সঙ-এর বিষয় নির্বাচনের জন্য বিরুদ্ধ শক্তি তালুকদারের পরামর্শ গ্রহণ করে।

তালুকদার
তোরা কি নদীর গল্প জানস? আমাগো বংশাই নদী। এইডা নিয়া মজার একখানা সঙ অয়।

গফুর
কি রকম ...?

তালুকদার
তোরা দেহি কিছুই জানস না ...

গফুর
এই বংশাই নদী শুকায়ে গেছে না ...?

আজু

তালুকদার
আসলে ১৫ হাত গভীর আছে নদী ...

আকবর
কেমনে ...?

তালুকদার
খাঁ (মোমরেজ) সাব কাটছে না নদী ... কত নাখ টেকা পাইছে?

আকবর
কবে কাটলো?

তালুকদার
তাওতো ৫ বছর অইছে ... নতুন দালান তুললো না ...

আকবর
আমি কিছু কিছু জানি ...

তালুকদার
জানস তো ক’না কিছু ...

আকবর
হ্যাষে যদি মাইরা তকতা বানাইয়া ফালায় ...

তালুকদার
অত্তো সোজা না ... আমি আছি না তগ নগে ... যেখানে সত্য আছে সেখানে তালুকদার আছে ...

চতুর্থ দৃশ্যে রয়েছে একটি সংক্ষিপ্ত প্রাসঙ্গিক ঘটনা। যেখানে গফুরের স্ত্রী বেদানার সন্তান লাভের সম্ভাবনা প্রকাশ পায়।

নদীর মাটি কাটার ঘটনাটিই মূলত এই নাটকের মূল দ্বন্দ্বকে তরান্বিত করে যা দ্বিতীয় দৃশ্য থেকে প্রকাশ পেয়ে পঞ্চম ও ষষ্ঠ দৃশ্যে চরম উৎকর্ষতায় পৌঁছায়। গফুর ও তার দলের তৈরি নতুন সঙ-এর পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে এই দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে। এছাড়াও পঞ্চম ও ষষ্ঠ দৃশ্য দুটি লোকনাট্যরীতি সঙ-এর অভিনয় উপাদান ও আঙ্গিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। টাইটেল বর্ণনা (গানের সুরে দলের কুশীলবদের পরিচয় প্রদান) এবং খবর পাঠ সঙ পরিবেশনারীতির দুটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যার প্রয়োগ দেখা যায় এই দুটি দৃশ্যে।

ষষ্ঠ দৃশ্য : সঙ পরিবেশনা। এই দৃশ্যে প্রেমিকা আজুকে নিয়ে আকবর তার বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তার স্ত্রীকে চাকরাণী হিসেবে পরিচয় দিয়ে টাকার গরম প্রকাশ করে।

আজু
ডাল্লিং ডাল্লিং বুড়িটি কে?

আকবর
আমার বাড়ির চাকরাণী।

স্ত্রী
কি আমি চাকরাণী ... এত বড় সাহস ...

আকবর
চাকরাণীটার আবার একটু মাথায় গোলমাল আছে।

আজু
ওহ! হাটতে হাটতে কি কষ্ট! আমার পায়ে ক্যাঁদা লেগে গেছে, একটু পানি দিয়ে তোমার চাকরাণীকে ধোওয়াইয়া দিতে বলো নাগো ...

আকবর
ওই বেটি দেনা একটু ধোয়াইয়া ...

স্ত্রী
ধোওয়ামু না ঝেটার বারি দিমু ...?

আজু
আমি স্টাউন থিকা আইছি ... আর তোমার বেটি আমারে ঝাটার বারি দিতে চায়?

আকবর
চলো মাইডিয়ার ভিতরে চলো ... অন্দর মহলে ...

(কোমরে হাত দিয়ে নিয়ে যায়, আর স্ত্রী কাঁদতে থাকে।)

স্ত্রী
হায় হায়! আমার কি অইলোগো ...

সফর
কি হইছেগো ভাবী সাব?

স্ত্রী
দেহো গিয়া ঘরে কারে নিয়া আইছে। আমারে কয় কামের বেটি ... আর আইসাই কয় গরম লাগে, গরম লাগে ...

সফর
গরমতো লাগবেই টেকার গরম। নদী চুরি করছে না ... নদীর মাটি কাটার কনটেকদারী নিছিল, মাটিতে কোপ দেয় নাই একটাও, নাক নাক টেকা পাইয়া গেছে ...

(বেরিয়ে আসে আজু আর আকবর)

আকবর
সফর আলী মানুষ ডাক ... বাতাসা বিলাইয়া দে ... আর কদমাগুনি খামু আমি একলা

(কদমা খেতে থাকে। খেতে খেতে স্থির [ফ্রিজ] হয়ে যায়। ক্ষুুব্ধ মোমরেজ খাঁ উঠে দাঁড়ায়)

মোমরেজ খাঁ
বন্ধ কর সঙ ...

গফুর
ক্যা খাঁ সাব সবেতে শুরু ...

মোমরেজ
বন্ধ কর কইলাম ...

গফুর
আমরা সারা রাইত ভইরা সঙটা বানলাম, শ্যাষ করবার দেইন ... আপনিইতো কইছোইন এইডা বানাইতে ...।

বেয়াই
বেয়াই সাব ... মজাইতো লাগতাছে ... দেহি না অরা কি করে ...

মোমরেজ
কি করবো অরা? মুর্খ সুর্খ মানুষ ... ভাবছিলাম একটা ভাল কিছু করবো ... কিন্তু কি বানাইছে এইডা ... চলেন রাইত অইয়া গেছে ম্যায়া বিদায় কইরা দিয়া আহি ... তরা যাবি না, বয় ...

(এরপর মোমরেজ খাঁ বেয়াইকে নিয়ে বাড়ির ভিতর গিয়ে বিয়ের সকল অনুষ্ঠানাদি এবং খাওয়া দাওয়া শেষ করে পুনরায় দলের কাছে ফিরে আসে।)

মোমরেজ খাঁ
ওই আমার টেকা ফেলা ...

গফুর
ক্যা?

মোমরেজ খাঁ
তগো কি সঙ বানাইতে কইছি ... আর কি করছস ? আগে টেকা ফেলা

গফুর
টেকা কইথিকা দিমু ... খাইয়া ফালাইছি ... আমাগো অরফাদটা কী?

মোমরেজ খাঁ
বুঝবি অরফাদ ... টেকা ফেলা।

গফুর
কইথিকা ফালামু কি কন আপনে?

মোমরেজ খাঁ
পারবি নাতো ... ঐ যন্ত্র দে ... অই অগো হারমুনি আর কর্নেট রাইখ্যা দে ... অইগুনি রাইখ্যা যা ...।

গফুর
বুঝলাম না আমাগো কি দোষ?

(এরপর মোমরেজ খাঁর লোকজন সঙ দলের হারমোনিয়াম আর কর্নেট কেড়ে নিয়ে চলে যায়।)

সপ্তম দৃশ্যে দেখা যায় সব কিছু হারিয়ে এবং মোমরেজ খাঁর প্রতিক্রিয়ায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় গফুর ও তার দল।

সফর
এ ছেড়ার মাথায় খালি কর্নেট কর্নেট ...

লালে
নয়া কর্নেট অইলে কিছু কইতাম না ... পুরান, তারপর ধরো দুইডা রিড নষ্ট, আমার ওস্তাদ দিয়া গেছে।

সফর
দিমুনে তোরে একটা কিইনা ... চৈত্র মাসে মেলা গান আছে ...

লালে
না আমারে ওইডাই দেওন নাগবো ... ওইডাই ... নাইলে ... (কাঁদতে থাকে)

আকবর
কান্দস ক্যা?

গফুর
কানবো না ক্যা? আমারি কান্দন আহে, সামনে গাহান করমু কি দিয়া ... হারমুনি নাই ... কর্নেট নাই ... কিনুম যে তারও পয়সা নাই ... সবচেয়ে বড় কথা এই ঘটনা রাষ্ট অইয়া গেলে সর্বনাশ অইবো না ...।

আকবর
ওস্তাদ ... অত ডরের কি আছে? সেরের উপর শোয়া সের আছে না? দরকার অইলে নেতার কাছে যামু ...।

গফুর
হ নেতায় তো থাকে ঢাকায় ... তারে পামু কই ...

আকবর
আহে প্রতি শুক্রবার, ধরি যাইয়া তারে ...

(নেতার কাছে যাবে কি যাবে না এই নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যায়।)

গফুর
আমি যাইতে পারি ... যুদি কুন লাভ অয় ...

আকবর
অবো না কুন লাভ অবো না ... খাঁয় আর তালুকদার অহন এক অইয়া গেছে ... কুনই লাভ নাই ... তার চাইয়া আজ সোমবার ... কাইল মঙ্গল, পরশু বুধ, বিসুদবার গেলেই নেতার কাছে যাই। তারে যমের মতো ডরায় খাঁয়ে।

অষ্টম দৃশ্যে মোমরেজ খাঁ গফুরের বিরুদ্ধে আরও প্রতিশোধ নিতে তার সামান্য চাষের জমির ক্ষতি সাধন করে। এ ছাড়া হঠাৎ করেই এই দৃশ্যে দুই বিরুদ্ধ শক্তি মোমরেজ খাঁ আর তালুকদার উভয়কে একটি সমঝোতায় আসতে দেখা যায়।

তালুকদার
আছেন নাকি খাঁ সাব ... (মোমরেজ খাঁ-এর বাড়িতে এসে।)

গফুর
তালুকদার সাব আপনি না সাহস দিলেন।

তালুকদার
দিছিলাম তো কিন্তু সত্য তোরা কইতে পারস নাই।

গফুর
কি কইন?

তালুকদার
পয়লাটুকু ঠিক না অসত্য ...

গফুর
আর শেষের টুকু?

তালুকদার
কইলামতো অর্ধেক সত্য ... (মোমরেজ খাঁ ভিতর থেকে বের হলে।) চলেন তাড়াতাড়ি ... মিটিং শুরু হইলে আবার বসার জায়গা পাওয়া যাবে না।

নবম, দশম ও একাদশতম দৃশ্যে গফুর ও তার দলের সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত অবস্থা দেখা যায়। গফুরের প্রিয় গাভী ময়নার মৃত্যু এবং বেদানার পেটের সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়া ঘটনা দুটি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।

দ্বাদশতম দৃশ্যে বাউল শিল্পী তরুণ মাস্টারের অনুপ্রেরণা আর উৎসাহে গফুর আবারও নতুন করে বাঁচার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে।

তরুণ
গফুর তুই কি কস? সঙ বানা সঙ ... তুই না গফুর সঙ ...

গফুর
সঙই বানাইতেছি ... খাঁয়ের উঠানের সঙ না ... গফুরের উঠানের সঙ ..জোলাপাড়া, কুলুপাড়া, মুচিপাড়া, কামারপাড়া সব জলে ছারখার।

তরুণ
ঐ বেদানা ... গফুর কি পাগল অইয়া গেল নাকি রে? বিষাদসিন্ধুর সুর গায়... এই সুর কি অর ...?

বেদানা
সুর কি মাইনষে বানাইতে পারে? আপনা আপনি যা হবার হয় ...

তরুণ
তুই কি পাগল হইলি?

বেদানা
তয় আর সময় নাই ... আমিতো ফুরাইয়া গেছি ... হয়তো তারও সুর ফুরাইয়া গেছে ...

গফুর
মাষ্টার তার যন্ত্রটা ইস্কেলে বাইন্ধা ফালা ... আমি গাহান গামু ... একটা গাহান গাইতে না পারলে আমার যে বুক ফাইটা যায় ... আমার হারমুনিডা নিয়া গেলো, কর্নেট নিয়া গেলো, তার যন্ত্রডা  বান ... আমি গান গামু ...।

বেদানা
হ ... গো ... মাষ্টার ভাই ... একটু গাহান গাইতে দেন ... তাইলে উনারা বাইচা যাইবো, সব দুঃখ থিকা বাইচা যাইবো ...

তার যন্ত্রটা বাঁধে, গফুর গাইবার চেষ্টা করে, পারে না, এক সময় ক্রোধে সে ফেটে পড়ে। এরমধ্যে লাল কর্নেট বাজাতে বাজাতে আসে। কর্নেটের সাথে সে এবার রুষ্ট, রূঢ়, কর্কশ সুরে গান গায়। আজু, সফর আলী, আকবর এসে যোগ দেয় গানের সাথে। ওদের কর্কশ সুরগুলো যেন নতুন মাত্রা পায়। নৃত্য ও গানের একট অদ্ভুত আবহ সৃষ্টি হয়। এ যেন শেষবারের মত বাঁচার এক স্বপ্নের মুহূর্ত।

সঙক্রান্তি নাটকে প্রতিটি দৃশ্য অনুযায়ী ঘটনার বিন্যাসের যে ধারা লক্ষ্য করা গেল তা সুস্পষ্টভাবেই পাশ্চাত্য বাস্তববাদী নাট্যরীতির ঘটনা বিন্যাস কৌশল অনুসৃত। অর্থাৎ সঙক্রান্তি নাটকের ঘটনা-বিন্যাসে ‘প্রারম্ভ বা সূচনা, দ্বন্দ্বের ক্রমান্নোতি, দ্বন্দ্বের চরম উৎকর্ষতা, দ্বন্দ্বের অবসান এবং পরিণতি’৭ এই ক্রমানুসার লক্ষ্য করা যায়। নাটকটির পরিবেশনারীতি সম্পর্কে নাট্যকার মামুনুর রশীদ বলেন, ‘স্ক্রীপ্টে সঙ-এর স্টাইলটা আছে বটে তবে আমি বলতে চাচ্ছি স্ক্রীপ্টে শুধুমাত্র আমাদের দেশের সঙ এর প্যাটার্নটাই রয়েছে বা সেটাই ব্যবহার করেছি তা নয়। ওয়েস্টার্ন অনেক বিষয় আমি ব্যবহার করেছি।৮ নাটকটির ঘটনা-বিন্যাসের দিকে তাকালে বেশ চমকপ্রদ একটি চিত্র লক্ষ্য করা যাবে। সর্বমোট বারটি দৃশ্যের মধ্যে শুধুমাত্র প্রথম দৃশ্যের শুরুতে বন্দনা এবং পঞ্চম ও ষষ্ঠ দৃশ্যে টাইটেল বর্ণনা, খবর পাঠ ও সঙ পরিবেশানার প্রয়োগ ব্যতীত গোটা নাটলিপিতে লোকনাট্য সঙ-এর অভিনয় উপাদান অনুপস্থিত। সপ্তম দৃশ্য থেকে দ্বাদশ দৃশ্য পর্যন্ত নাটলিপির ভাষা ও ঘটনা-বিন্যাস সম্পূর্ণ ইউরোপীয় বাস্তববাদ অনুসৃত সংলাপাত্মকরীতিতে উপস্থাপিত হয়। এ প্রসঙ্গে নাট্যকার পরিচালক বলেন, ‘সঙ পারফরমেন্স পর্যন্ত আমি ঐ মাধ্যমটাকে (সঙ পরিবেশনারীতির উপাদান) ব্যবহার করেছি। কিন্তু যখনই সঙ পারফরমেন্স শেষ হয়ে যায় তখন কিন্তু আমি সম্পূর্ণ অন্য মাধ্যম ব্যবহার করেছি। সেটাকে বলা যায় ইউরোপীয়। আমার চিন্তা ছিল এখানে আমি দুটো রীতিই ব্যবহার করবো। আমাদের লোকজরীতিকে ব্যবহার করবো এবং ওয়েস্টার্নরীতিকেও ব্যবহার করবো। শুধু ওয়েস্টার্নরীতিকে নয় আমি ওরিয়েন্টালরীতিকেও ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম।’৯

এই প্রযোজনাটি নাটলিপি বিশ্লেষণে সার্বিকভাবে যে চিত্রটি পরিলক্ষিত হয়, তাতে দেখা যায়,- সঙক্রান্তি মূলত কতিপয় সঙ শিল্পীদের জীবনের আশা-আকাক্সক্ষা পরিণতি নির্দেশিত নাটক যা সমাজের ক্ষমতাশালীদের সাথে দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। অর্থাৎ শিল্পীদের জীবন এই নাটকের মূল উপজীব্য। এ প্রসঙ্গে আজাদ আবুল কালাম বলেন, ... ‘টেকস্টের কথাই বলছি আমি। একটি জনগোষ্ঠীর কথাই উনি বলছেন, সঙদের কথা, অথচ সঙদের সঙকে উনি দেখাতে চাননি। উনি চেয়েছেন তাদের অন্য একটি জীবন দেখাতে, তাদের অন্য রুচির ব্যাপারটা দেখাতে। ...’১০ আর এই জীবন মঞ্চায়নে নির্দেশক পাশ্চাত্য অভিনয়রীতিকেই মুখ্য উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সঙ পরিবেশনারীতির অভিনয় উপাদান-এর প্রয়োগ এই নাটকে নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্যে (যেমন, ষষ্ঠ দৃশ্যে সঙ পরিবেশনা অংশে নদীর মাটি কাটার টাকা চুরির প্রসঙ্গে এবং মোমরেজ খাঁ-র মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে খবর পাঠ) দেখা যায় কিন্তু অন্যান্য উপাদান এই প্রযোজনার শৈল্পিক অলংকার মাত্র। তবে ষষ্ঠ দৃশ্যের সঙ পরিবেশনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে কেননা এই সঙ পরিবেশনার মাধ্যমে নাটকের মূল দ্বন্দ্বটি প্রকাশ পায়।

অভিনয় উপাদান

সঙক্রান্তি নাটকের পরিবেশনায় মুখ্য অভিনয় উপাদান সংলাপাত্মক গদ্য। প্রথম দৃশ্যের বন্দনায় বর্ণনাত্মক গীতাভিনয়, পঞ্চম দৃশ্যে বর্ণনাত্মক গদ্যাভিনয়ে খবর পাঠ এবং ষষ্ঠ দৃশ্যে টাইটেল বর্ণনায় বর্ণনাত্মক গীতাভিনয়ে কুশীলব পরিচিতি ব্যতীত সম্পূর্ণ নাটকটি সংলাপাত্মক গদ্যাভিনয়ে উপস্থাপিত হয়।

সঙক্রান্তি নাটকের অভিনয়রীতি প্রসঙ্গে নাট্যকার-নির্দেশক জনাব মামুনুর রশীদ বলেন-

‘... ওদের (সঙ অভিনেতা) সংলাপ প্রক্ষেপণের মধ্যেও একটা সুর রয়েছে - একটা প্যাটার্ন রয়েছে। এবং এই প্যাটার্ন হচ্ছে গীতল। এখানে (সঙক্রান্তি নাটকে) একটি বড় উপাদান হচ্ছে গীতল সুর, কথার মধ্যেও একটা সুর আছে। Acting এবং সংলাপ প্রক্ষেপণে একধরনের exaggeration বা Melodramatic exaggeration রয়েছে। এটা ভারতের যে তামাসা অথনা নৌটংকী থিয়েটারে যে স্টাইলাইজেশন রয়েছে, এই বিষয়গুলো রয়েছে এখানে। তাছাড়া Commedia dell arte এর যে স্টাইল সেটাও কিন্তু আমি এর মধ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। এছাড়াও আরেকটি বিষয় হচ্ছে একটু সার্কাস্টিক অভিনয়। কতগুলো মুদ্রা, বিষয় আছে যেগুলো একেবারে সার্কাস থেকে নেওয়া, বিশেষ করে ক্লাউনের মুভমেন্ট-এর কথা বলতে পারি।’১১

কিন্তু সঙক্রান্তি নাটকের ‘সার্কাস্টিক’ বা ‘স্টাইলাজেশন’ অভিনয় প্রসঙ্গে  জনাব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন -

‘... অভিনয়ের যে ছকটা আমি পেলাম সেটা আমার কাছে উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নাটকের অভিনয় মনে হয়েছে। আমার কাছে খুবই স্থুূল কাজ বলে মনে হয়েছে, অভিনয়টা ... এই নাটকে গফুর বা জোতদারের চরিত্রে যে অভিনয় করলো ওরা কিন্তু একটা টিপিক্যাল ধারায় একটা চরিত্র ধারণ করে অভিনয় করছিল। এরকম ধারা কিন্তু পাঁচ দশ মিনিট ভালো লাগে তারপর কিন্তু আর ভাল লাগে না। ..’১২

অভিনেতা-নির্দেশক আজাদ আবুল কালাম এ ক্ষেত্রে নাসির উদ্দিন ইউসুফের যুক্তি খণ্ডন করে বলেন-

‘এই নাটকের অভিনেতৃগণ আমাদের প্রচলিত মেথডের বাইরে গিয়ে তাদের জীবনকে তুলে এনেছেন। ফলে আমার কখনো তাদের অভিনয়কে উনবিংশ শতকের বলে মনে হয়নি। মনে হয়েছে এখানকার আধুনিক অভিনেতারা আধুনিকভাবেই অভিনয় করেছেন।’১৩

এই সকল পরস্পরবিরোধী মতামত সত্ত্বেও নির্দেশক মামুনুর রশীদ-এর কথার সূত্র ধরে সঙক্রান্তি-র অভিনয়রীতির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, এই নাটকের সকল চরিত্রের উপস্থাপনায় এক ধরনের exaggeration রয়েছে। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ গফুর চরিত্রটির উপস্থাপনায় দ্রব্যসামগ্রী হিসেবে লাঠির ব্যবহার এবং কুশীলবের পদ সঞ্চালন ভঙ্গি সর্বদাই যেন চার্লস চ্যাপলিন-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। এখানে চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে যে স্টাইলাইজেশন কথা বলা হয়েছে তা নাটকটির সামগ্রিক পরিবেশনায় একটি অসঙ্গতি তৈরি করে। নাটকটির মূল বক্তব্য হচ্ছে শোষক শোষিতের দ্বন্দ্ব যার মধ্য দিয়ে সঙ শিল্পীজীবনের সংকট তুলে ধরা হয়েছে এবং এই সংকট তুলে ধরতে ‘সঙ যাত্রা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এখানে কুশীলবদের (সঙ শিল্পী) অভিনয়ে দুটি পর্যায় রয়েছে - প্রথমত ‘সঙ’ হিসেবে চরিত্রের উপস্থাপন করা, দ্বিতীয়ত- বাস্তবজীবনে সঙ শিল্পীদের (অত্যাচারীতদের) সংকট তুলে ধরা। এক্ষেত্রে ‘সঙ’ উপস্থাপনায় চরিত্রের exaggeration ঘটনার সাথে সঙ্গতি তৈরি করে। কেননা ‘সঙ যাত্রা’য় The performars also work out a few comic acts (like the lazzi in commedia dell arte) in advance. The scenarios are built on type characters and aim at ridiculing various aspects of social life.১৪  ‘সঙ’ পরিবেশনায় এই সকল অংশে স্টাইলেজশন সংগতি তৈরি করলেও কুশীলবদের বাস্তব জীবনের (অত্যাচারী ও অত্যাচারীতদের) চরিত্র উপস্থাপনায় সর্বদা ‘সার্কাস্টিক’ ‘স্টাইলাইজেশন’ ‘ক্লাউন মুভমেন্ট’-এর ব্যবহার ‘সঙ’ এবং ‘বাস্তবজীবন’-এর পার্থক্য লীন হয়ে যায়। অর্থাৎ বাস্তব জীবনের চরিত্র উপস্থাপনের জন্য উল্লেখিত কৌশল ব্যবহারের কারণে ‘সঙ’ পরিবেশনার অংশসমূহ আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়। সঙক্রান্তি নাটকের এই ধরনের সংলাপাত্মক অভিনয় সম্পর্কে অভিনেতা-নির্দেশক জনাব আতাউর রহমান বলেন-

‘ ... সঙক্রান্তি-তে কখনো ন্যাচারেলিস্টিকের ছোঁয়া পাওয়া গেছে, কখনো রিয়েলিজম, কখনো আবার সুরিয়েলিজমের ছোঁয়া পাওয়া গেছে। একটা মিশ্রণ ছিল। মিশ্রণতো হতেই পারে, কিন্তু এই মিশ্রণটা সঙক্রান্তি-র বেলায় ভালো লাগেনি।’১৫

সঙক্রান্তি-র অভিনয়রীতিতে যে অসংগতির কথা বলা হয়েছে তা কেবল অভিনয় উপাদান ব্যবহার ও পরিবেশনার কারণেই এমনটি হয়েছে বলা যায় না। নাটলিপি রচনা কৌশলেও সমস্যাটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ প্রথম দৃশ্য, তৃতীয় দৃশ্য, পঞ্চম ও ষষ্ঠ দৃশ্যে যথাক্রমে সঙ-এর মহড়া এবং পরিবেশনায় এই ধরনের অভিনয়রীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হলেও সপ্তম দৃশ্য থেকে দ্বাদ্বশ দৃশ্যের অভিনয়ের ক্ষেত্রে নির্দেশক নিজেই মন্তব্য করেছেন, এ অংশে তিনি সম্পূর্ণ ‘ভিন্ন মাধ্যম’ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ পরিবেশনায় দেখা গেছে সম্পূর্ণ বাস্তববাদ অনুসৃত প্রসেনিয়ামনির্ভর সংলাপাত্মক অভিনয়। সুতরাং নাটকের পরবর্তী অংশের ‘ভিন্ন মাধ্যম’-এর সাথে পূর্ববর্তী অংশের সমন্বয়ের অভাবই হয়তো সমালোচকগণদের চোখে এই অসংগতির মূল কারণ।

মঞ্চ পরিকল্পনা

সঙক্রান্তি নাটকটি প্রসেনিয়াম মঞ্চে পরিবেশিত হয়। মঞ্চের পিছন অংশের মধ্যভাগে Up centre stage-এ ৪ ফুট X ৬ ফুট  এবং ১-৫ ফুট উঁচু (কিন্তু সামনের দিকে ক্রমান্বয়ে ঢালু) একটি প্লাটফর্ম যার পিছনে ৮ ফুট উঁচু দণ্ডায়মান একটি রঙিন কাকতাড়–য়া হচ্ছে নাটকের মূল সেট ডিজাইন। এছাড়া দৃশ্যের প্রয়োজনে কখনো কখনো একটি বা দুটি চেয়ারের ব্যবহার করা হয়েছে।
 
[সঙক্রান্তি নাটকের মঞ্চ পরিকল্পনার ছবি দিতে হবে]


সঙক্রান্তি নাটকের ডিজাইন বিশেষত সেট এবং কস্টিটিউম সম্পর্কে বিশিষ্ট নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন,

‘... সেট ডিজাইনটা স্টাইলাইজেশন, কস্টিউমটা পুরোপুরি নেচারেলিস্টিক বা রিয়েলিস্টিক এবং অভিনয়টা এগুলোর মিশেল। ফলে সমস্ত ব্যাপারটা কখনো যায় আবার কখনো যায় না। যেমন সেটটার নিচের অংশটা যেমন যায় কিন্তু ভারটিক্যাল অংশটা মনে হচ্ছে যায় না। বোঝা যাচ্ছে খুব চড়া রঙ দেয়া হয়েছে, ইচ্ছকৃতভাবেই ...।১৬

জনাব ইউসুফের এই মন্তব্যের জবাবে নির্দেশক মামুনুর রশীদ বলেন,

‘আমি কিন্তু নাটকে একটা ডিজাইন এডাপ্ট করিনি। যেমন, প্রপস্গুলো সব রিয়েলিস্টিক। চেয়ার, দড়ি, লাঠি ... সব কিন্তু রিয়েলিস্টিক। আবার কস্টিউমও কিন্তু তাই। কো-অর্ডিনেশনের অভাবটা ধরা পড়ে এদের সাথে। ... পেছনে আমি যেটা করতে চেয়েছিলাম, সেটা হচ্ছে ‘রঙ’, একটা কালার ... জীবনের একটা রঙ দেখাতে চেয়েছিলাম। এটা হচ্ছে তাদের স্বপ্ন। তো যদি মনে হয় যে কোঅর্ডিনেশন হচ্ছে না, তাহলে আমি বলবো সেটাই হচ্ছে ইনডিরেক্টলি একটা সাকসেস। জীবনের ঐ রঙটার সাথে তাদের একটা কন্টিনিউয়াস বিরোধ লেগেই আছে ... ।১৭

অন্যান্য বৈশিষ্ট্যসমূহ

আলো

আলোক পরিকল্পনা বিষয়ে নির্দেশক বলেন, ‘আমি চেয়েছি সম্পূর্ণ ফ্লাড লাইটে অভিনয় করাতে অভিনেতা দর্শকের চোখ দেখে অভিনয় করবে। পুরো নাটকে মঞ্চের মতো করে দর্শকের উপরও আলো পড়বে।’

সঙক্রান্তি’র আলোক পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট কিছু এফেক্ট লাইটের ব্যবহার ব্যতীত অধিকাংশ আলোক প্রক্ষেপণে ফ্লাড লাইটের ব্যবহার দেখা যায়। তবে নির্দেশকের উল্লেখিত কথার সাথে আলোক পরিকল্পনার একটি প্রধান বৈসাদৃশ্য হচ্ছে দৃশ্য পরিবর্তনে মঞ্চের আলো নির্বাপণ করা হয়। প্রতিটি দৃশ্য পরিবর্তনের সময় এই রীতি অনুসৃত হতে দেখা যায়।

পোশাক

দু-একজন কুশীলব ভিন্ন সকলের পোশাক পরিকল্পনায় দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ পোশাক ব্যবহার করা হয়েছে। তবে পোশাক পরিধান বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বৈচিত্র রয়েছে। সঙ অভিনেতাদের পোশাক পরিকল্পনায় লোকনাট্যরীতি সঙ-এর পোশাক পরিকল্পনাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করা হয়। আবার এই নাটকের দুই প্রধান চরিত্র এবং সমাজ কর্তা তালুকদার গোড়ালীর ওপরে উচু করে প্যান্ট পরে এবং মোমরেজ খাঁ কৃত্রিম ভুড়ির ব্যবহার করে যখন এক ধরনের টাইপ চরিত্রায়নে অভিনয় করে তখন আখ্যানের সঙ এবং বাস্তবের অত্যাচারী মানুষের মধ্যে পার্থক্যের সীমা অনেকাংশে লীন হয়ে যায়।

রূপসজ্জা

সঙ পরিবেশনায় সঙ অভিনেতা ও ছুকরি ব্যতীত অন্য কোনো চরিত্র প্রসাধনী ব্যবহার করেন না। সঙ অভিনেতাদের রূপসজ্জা ব্যবহারে লোকনাট্য সঙ অনুসৃত রূপসজ্জার ব্যবহার লক্ষ্য কর যায়। তবে এই প্রযোজনায় Commedia dell arte-এর আঙ্গিক বা বৈশিষ্ট্যের ব্যবহার কোথায় এবং কীভাবে করা হয়েছে, এই প্রশ্নের জবাবে নির্দেশক রূপসজ্জার কথা উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য যে, এই ধরনের মেক-আপ লোকনাট্য পরিবেশনা সঙ-এর একটি সাধারণ এবং বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আরণ্যক নাট্যদল প্রযোজিত সঙক্রান্তি নাটকের সার্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় সঙ শিল্পীদের জীবনই এই নাটকের মূল বিষয়। আর এই জীবনের রূপায়নে ‘সঙ যাত্রা’ অভিনয়রীতির নির্দিষ্ট কিছু উপাদান-এর ব্যবহার করা হয়েছে। তথাপি নির্দেশকের কথার সূত্র ধরেই বলা যায় একটা ডিজাইন এডাপ্ট করে নয় আরও একাধিক ডিজাইন, অভিনয়রীতি এবং উপাদানের সংমিশ্রণের ফলে ‘সঙ যাত্রা’র উপাদানসমূহ নাটকে মূল বক্তব্য উপস্থাপনের বাহন হতে পুরোপুরি সফলতা অর্জন করেনি। নাটলিপির ঘটনা-বিন্যাস এবং প্রযোজনার অভিনয়রীতি ও সামগ্রিক ডিজাইনে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন নাট্যরীতির উপাদান ও বৈশিষ্ট্য এই নাটকের মূল বিষয় পরিবেশনের ক্ষেত্রে মুখ্য সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেছে।

সঙক্রান্তি নাটকের এই সার্বিক আলোচনার ভিত্তিতে চারটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১. নাটকটির বিষয়বস্তু রাজনৈতিক; ২. ঘটনা-বিন্যাস ইউরোপীয় দ্বন্দ্বমূলক; ৩. ডিজাইন ও পরিবেশনা বহুমুখী বা একাধিক নাট্য অনুষঙ্গ সমৃদ্ধ এবং ৪. অভিনয় আয়তন প্রসেনিয়াম মঞ্চ। সঙক্রান্তি প্রযোজনায় এই মৌলিক চারটি বিষয়ের মধ্যে ‘সঙ’ অভিনয় উপাদানের অবস্থান গৌণ। এক্ষেত্রে লোকনাট্যরীতি ‘সঙ’-এর পোশাক, রূপসজ্জা, নৃত্য, গীত প্রভৃতি উপাদানে ব্যবহার সঙক্রান্তি নাটকের সঙ শিল্পীদের চর্চা ও দক্ষতার পরিচয় তুলে ধরে মাত্র। শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় ‘সঙ’-এর উপাদান বৈশিষ্ট্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটা এক ধরনের কৌশল। কিন্তু লোকনাট্য ‘সঙ’ পরিবেশনারীতির মৌলিক শক্তি প্রকাশ পায় স্থানীয় ও সমকালীন বিষয়ের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে। হাস্য, কৌতুক আর ব্যঙ্গ হচ্ছে এর একমাত্র রস। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে ‘সঙ’-এর মুখ্য অভিনয় উপাদান সংলাপাত্মক। এক্ষেত্রে ‘সঙ’ পরিবেশনারীতির মৌলিক শক্তির প্রয়োগ হতে পারতো সঙক্রান্তি নাটকের বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যা ও দ্বন্দ্ব প্রকাশের উপায় বা মাধ্যম।
[চলবে]

সূত্র তথ্য :
১. আফসার আহমেদ : বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় লোকনাট্য আঙ্গিক, পৃ : ১২৩, ২. বিশ্বজিৎ ঘোষ : বাংলাদেশের নাটক; বিষয় ও আঙ্গিক, পৃ : ৮৪, ৩. প্রাগুক্ত, পৃ : ৮৪, ৪. Rasid : The Use of Western Theatre element in our Theatre, A Seminer paper on Theatre, Organised by Centre for Asian Theatre, ৫. আলাপনে (মুখোমুখি) সঙক্রান্তি, থিয়েটারওয়ালা চতুর্থ বর্ষ : প্রথম-তৃতীয় (অক্টোবর’০১- জুন’০২) সংখ্যা, ৬. প্রাগুক্ত, পৃ ১৭, ৭. সচিদানন্দ মুখোপাধ্যায় : ভারতীয় নাট্যবেদ ও বাংলা নাটক, পৃ ১১১-১১২, ৮. আলাপনে (মুখোমুখি) সঙক্রান্তি, থিয়েটারওয়ালা প্রাগুক্ত সংখ্যা, ৯.প্রাগুক্ত, ১০. প্রাগুক্ত, পৃ ১৭, ১১.প্রাগুক্ত, ১২. প্রাগুক্ত, পৃ ১৫-১৬, ১৩. প্রাগুক্ত, পৃ ১৬, ১৪. Ahmed : Acinpakhi Infinity; Indigenous Theatre of Bangladesh, p 87, ১৫. আলাপনে (মুখোমুখি) সঙক্রান্তি, থিয়েটারওয়ালা প্রাগুক্ত সংখ্যা, পৃ ১৩, ১৬. প্রাগুক্ত পৃ ২০, ১৭. প্রাগুক্ত পৃ ২০।
[চলবে]

সাইদুর রহমান লিপন : অভিনেতা, নির্দেশক, নাট্যশিক্ষক