Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

গত ২০ বছরে আমাদের থিয়েটার : নতুন থিয়েটারের চেষ্টা

Written by সাইফ সুমন.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

হুজুগ এবং আবেগ, মানুষকে, বিশেষ করে এই বঙ্গের মানুষদের খুব বেশি প্রভাবিত করে। এই দু’টো ব্যাপারই যুক্তি এবং বাস্তবতা অনেকাংশেই মানে না। নেশা, তা যে প্রকারেরই হোক, তার ক্ষেত্রেও এই দুই ব্যাপার জড়িত। নেশা কেউ হুজুগে, কেউ আবেগে, কেউবা আবার এমনি এমনি ধরে বা করে। বলতে বা শুনতে খারাপ লাগলেও, বোধকরি এটা সত্যি, ‘থিয়েটার’ একটি নেশা, বিশেষত এই দেশে। সেই নেশাটাকে পেশা হিসেবে দাঁড় করাতে চাই আমরা। এখন কথা হলো, নেশাকে পেশা হিসেবে দাঁড় করানো যায় কি?

কোনো বিষয়কে পেশা হিসেবে দাঁড় করাতে গেলে, তার কিছু উপাদান ও বৈশিষ্ট্য লাগে। সমাজে এর চাহিদা লাগে। গুণ বা দক্ষতাসম্পন্ন জনবল লাগে। গুণ ও দক্ষতাসম্পন্ন জনবল তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠান লাগে। একটি চৌকস টিম লাগে। থিয়েটারকে পেশা হিসেবে দাঁড় করাতে গেলে উল্লেখিত ব্যাপারগুলো তো লাগবেই, সেই সাথে নিজস্ব একটা জায়গা লাগবে- যেটাকে স্টুডিও বলা যায়, সেটা লাগবেই। দেখে বাহ্ বলার মতো, উফ-আহ্ করার মতো প্রযোজনা লাগবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য- থিয়েটারকে পেশাদার করতে এর কিছুই নেই আমাদের। এখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রতি বছর বেশকিছু ছেলে-মেয়ে বের হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, কিন্তু নিজস্ব ক্ষেত্র না থাকায় তারা চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়। তার উপর আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের দেশের গড়ে ওঠা ধর্ম-নিয়ন্ত্রিত বর্তমান সংস্কৃতি, শিল্পকলা-বান্ধব নয়। চলমান রব ‘সংস্কৃতি বান্ধব’ একটা ধারণা মাত্র। সরকার, জনগণ, কেউই প্রগতির পথে নেই। গায়ের জোরে কতটুকুই আর এগুনো যায়! এখন থিয়েটারকে পেশা হিসেবে সবাই চায়। ঐ চাওয়াটুকু পর্যন্তই, এর জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় নি। উদ্যোগটা সরকারকে দিয়ে নেওয়াতে হবে প্রথমে। রেপাটরি হয়েই এসেছে সরকার, বিত্তশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আনুকূল্যে। সরকার, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে আমরা সঠিকভাবে যেতে পেরেছি বলে মনে হয় না। যারা যেতে পারেন তারা যান ঠিকই কিন্তু সেটা ব্যক্তিগত কাজে।

এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে রেপাটরির নামে যে থিয়েটার দলগুলো হয়েছে, সেগুলো বোধকরি সাময়িক উত্তেজনার ফসল। নিজ দলে কাজ করার সুযোগ না পেয়েই অন্য একটি দল করা- মোটা দাগে এটাই ‘রেপাটরি’। এতে চলমান গ্রুপ থিয়েটারগুলো থেকে খুব যে আলাদা কিছু দাঁড় করনো গেলো, সেটা বলা যাবে না। ভিতর-বাহির এক রেখে শুধু নাম ‘রেপাটরি’ ধারণ করা ছাড়া কিছুই হচ্ছে না। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আছে বলেও মনে হয় না এই রেপাটরিগুলোর। অবশ্য কিইবা করার আছে- অন্যের দিকে চেয়ে চেয়ে দিবাস্বপ্ন দেখে শুধু। আমি মনে করি, সরকার শিল্পকলা একাডেমির অধীন একটা ন্যাশনাল থিয়েটার কোম্পানি বা জাতীয় রেপাটরি দল পরিচালনার ব্যবস্থা করে দিতে পারে। শুরু বোধহয় হয়েছে, কিন্তু সেটা অপরিকল্পিতভাবে। সময় কিন্তু কম যায় নি। রেপাটরির একটা নমুনা এতদিনেও দাঁড় করাতে পারি নি আমরা। ‘বাঙলা থিয়েটার’ ১৯৯১ সালে প্রথম শুরু করলো, কিন্তু সেটাও আবেগনির্ভরই ছিল বোধকরি। না হলে সঠিক পথে এগুতে পারে নি কেন? ‘সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি)’ একটা নমুনা হতে পারতো কিন্তু সেটাও ব্যক্তি-সীমাবদ্ধতার জন্য মুখ থুবরে পড়লো। রতন থিয়ামের ‘কোরাস থিয়েটার’ একটা নমুনা হতে পারে আমাদের জন্য। হতে পারে এই জন্যই বলছি, সব ফরমুলা তো সব জায়গায় খাটে না। তবে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

পার্ট-টাইম থিয়েটারচর্চা দিয়ে রেপাটরি হবে না। রেপাটরির টিম তৈরি করার জন্য প্রতিনিয়ত চর্চার ব্যবস্থা থাকতে হবে, যেটা হতে হবে আবাসিক। একটা রেপাটরির মাসে দশ/বারোটা ’শো করার সুযোগ ও সামর্থ থাকতে হবে। এই ‘সুযোগ’  মানে ’শো করা। মাসে দশ/বারোটা ’শো করবে আর বাকি দিনগুলোতে চলবে মহড়া। এই করতে চাইলে তো শিল্পকলাকেন্দ্রিক ভাবনা দিয়ে হবে না। আবার এতো ’শো দেখাার মতো দর্শকশ্রেণিও আমাদের নেই। আমরা থিয়েটারের দর্শকশ্রেণি গড়ে তুলতে পারি নি। পারি নি তার অনেক কারণের অন্যতম- আমাদের চলমান সমাজব্যবস্থা শিল্পকলা-বান্ধব নয়। বৃহৎজনগোষ্ঠী শিল্পকলাবিরোধী। নগরে বসবাসকারীগণও মানসিকভাবে নাগরিক বা শিল্পমনস্ক নন। তাই আপাতদৃষ্টিতে এর কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।

ঢাকায় ১৬ টি রেপাটরি দল হয়েছে এখন পর্যন্ত। যদিও কাজ করে যাচ্ছে ৪/৫ টি। এর কোনোটির মধ্যেই রেপাটরির বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান নেই বা থাকার কথাও না। বলা যায় এখন পর্যন্ত, ‘সিএটি’র মধ্যে রেপাটরির একটা মেজাজ ছিল। দলটির প্রযোজনাগুলোর মধ্যেও সেটার ছাপ পাওয়া যেতো। নিজেদের দর্শক-শ্রেণি তৈরি করতে পেরেছিল, যা কিনা আর কোনো দলই পারে নি। পারে নি কারণ, তারা নাম-সর্বস্ব রেপাটরি গঠন করেছে। তবে দু-একটা দল ছাড়া, সবাই নান্দনিক ও দর্শকনন্দিত প্রযোজনা দিতে পেরেছে। কিন্তু চলমান থাকতে পারে নি। ভিত্তি ছাড়া তো অবকাঠামো দাঁড় করিয়ে রাখা সম্ভব নয়। গ্রুপ থিয়েটারের বাইরে এসে নতুন কিছু করছি- এটাই যদি সান্ত¦না হয়, তাহলে আর কী! আমার জানামতে, ‘থিয়েটাওয়ালা রেপাটরি’ প্রতিটি ’শোতে সব কলা-কুশলীগণকে একটা নির্দিষ্ট সম্মানী দিয়ে থাকে- টিকিট বিক্রি যাই হোক না কেনো। যদিও এটাও টোকেন মানি ছাড়া বেশি কিছু নয়। তারপরও অধিকাংশ রেপাটরি এইটুকুও করে না বা করতে পারে না অথবা করার কথা চিন্তাই করে না। তাহলে কী দাঁড়ালো?
 
গ্রুপ থিয়েটার চর্চা যে সময়ে যে বাস্তবতায় শুরু হয়েছিল, তার কিছুই এখনকার সাথে মেলানো যাবে না। আমরা থিয়েটারচর্চাকারীগণ, নিজেদের জীবন-যাত্রায় বদলে গেছি, কিন্তু বদলাই নি থিয়েটারচর্চার ধরন। স্বাধীনতার পর শুরু হওয়া থিয়েটার একটা শিল্পমাধ্যম হিসেবে যতটা না বিবেচিত হয়েছে, তারচেয়ে বেশি বিবেচিত হয়েছে একটা আন্দোলন হিসেবে। তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্ম এসে গেছে, তাও ঐ এক বলয় থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। রাজনৈতিক বিচার-বিবেচনা বা চেতনার পিঠ চুলকানো আর কতোকাল! বিষয়বৈচিত্র্য নেই, অভিনয় নেই, উপস্থাপনায় নতুনত্ব নেই- তো কী দেখতে আসবে দর্শক! নিধিরাম সর্দার সেজে বসে আছে অধিকাংশ দলগুলো।

একই ভাবধারার গণ্ডির ভেতর পড়ে গেছে আমাদের নাট্যচর্চা। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় যারা অগ্রসর, তাদের বুদ্ধি বৃদ্ধির চেষ্টাই করে যাচ্ছেন সবাই। কিন্তু আমোদপ্রিয় সাধারণ মানুষ, যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের ফাঁকে যে বা যারা একটু স্বস্তি চায়, তাদের জন্য ভাবতে গেলেই জাত যায়। অথচ বিশ্বময় এইসব আমোদপ্রিয় দর্শকের জন্যই মূলত প্রযোজনা করে রেপাটরিগুলো। দর্শক মুখ্য একটা ব্যাপার- রেপাটরির ক্ষেত্রে। দর্শক চায় মুগ্ধ হতে, একটা ভালোলাগা নিয়ে বাসায় ফিরতে। আমারা কী কী সীমাবদ্ধতা নিয়ে নাট্যচর্চা করছি, সেটা দেখার জন্য টিকিট কেটে একজন দর্শক কেনো আসবে? যেটুকু ছিল দর্শক, তাও বঞ্চিত হতে হতে আজ তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর কোনো চেষ্টা নেই- খালি দর্শক নাই, দর্শক নাই রব। দর্শক কী দেখতে আসবে, সেটা কখনোই ভাবি না আমরা। দর্শক দেখতে আসবে এমন প্রযোজনা মঞ্চে আনতে হবে। ঢাকা শহরে ৬২ টি নাটকের দল আছে। ভাবা যায়! কী করে এই দলগুলো! ৬২ টি দলের প্রযোজনার মধ্যে ৫ টির বেশি নাটকের নাম বলা যাবে না, যেগুলো দেখার যোগ্য।
 
‘নাট্যকর্মীরা জায়গা ছেড়ে দেন, শিল্পীদের বসতে দেন।’ নারায়াণগঞ্জে কল শো’তে গিয়ে আমরা বসে আছি হলে। এমন সময় নাচের একটা দল হলে ঢুকলে উপস্থাপক মাইকে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটাই সমাজে এখনো থিয়েটারচর্চাকারীদের প্রকৃত অবস্থান। বোধকরি থিয়েটারের দৈন্য-দশা ঘুচুক, সেটা আমরা চাই নি কখনোই। এখনো শুধু দু’বেলা খাবার আর যাওয়া-আসার খরচ দেবে শুনলেই ২৫-৩০ জনের বহর নিয়ে দেই দৌড় ঢাকার বাইরে, দেশের যেকোনো জায়গায়। নিজেরা নিজেদের অবস্থান পরির্বতনের কোনো চেষ্টাই করি নি আমরা। গ্রুপ থিয়েটার চর্চাকারীগণের মানসিকতা পরিবর্তন আবশ্যক। মন্দের ভালোকে আমরা মেনে নেই সবক্ষেত্রেই। এখানেও তাই। ছা-পোষা ভাবটা আমাদের থিয়েটারের সাথে মনে হয় চিরস্থায়ীভাবে লেগে গেছে।
 
নেশার ঘোর থেকে বের হয়ে যৌক্তিকভাবে কার্যকর পথে হাঁটার সময় এখনো আছে । আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, রেপাটরির ক্ষেত্র এখনো তৈরি হয় নি। সুযোগ এবং সম্ভাবনাও কতটুকু আছে জানি না... দেখা যাক!

ঢাকায় ‘রেপাটরি’ নামে নাট্যচর্চাকারী দলগুলোর একটা কাজের পরিসংখ্যান দিয়ে লেখাটা শেষ করি (বাংলায় বানানটা হবে ‘রেপাটরি’, তারপরও যারা ‘রেপার্টরি’ লেখেন, তাদের বানান তাদের মতোই রইলো)-

বাঙলা থিয়েটার (১৯৯১), প্রযোজনা সংখ্যা ৬। মানুষ, আদিম, লেবেদেফ, চে’র সাইকেল, ডিস্টেন্ট নিয়ার, অমানুষ।। থিয়েটার আর্ট রেপার্টরি (১৯৯২), প্রযোজনা সংখ্যা ২। কীর্তিনাশা, লক্ষ্মীর পালা।। নন্দন (১৯৯৩), প্রযোজনা সংখ্যা ১। কন্যাদান।। সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি) (১৯৯৪), প্রযোজনা সংখ্যা ১৮। কৃষ্ণবিবর, সত্যপীর, বুনোহাঁস, বিক্রমবর্শীয়, রাজা, পীরচান, পুতুলের ইতিকথা, ভেলুয়া সুন্দরী, রেজারেকশন, বুকটুর কুয়া, ব্র্যান্ড, লেডি ফ্রম দ্য সি, ঊরুভঙ্গম, সুনাইবিবির পালা, অ্যাম্পিউটেশান, মেটামরফোসিস, কমিউনিকেটর, মিশন, দ্য লেসন, মেকাব্রে।। জন্মসূত্র (২০০৫), প্রযোজনা সংখ্যা ১। অহরক-ল।। কারিগর (২০০৬), প্রযোজনা সংখ্যা ১। বাইচাল।। থিয়েটারওয়ালা রেপাটরি (২০০৯), প্রযোজনা সংখ্যা ২। শাইলক এ্যান্ড সিকোফ্যান্টস, জবর আজব ভালোবাসা।। নাট্যম রেপার্টরি (২০১০), প্রযোজনা সংখ্যা ৬। দমের মাদার, সাইকেলওয়ালা, প্রলম্বিত প্রহর, মানুষ, চারিদিকে যুদ্ধ, ডিয়ার লায়ার।। দশরূপক (২০১০), প্রযোজনা সংখ্যা ১। বিসর্জন।। শূন্যন (২০১১), প্রযোজনা সংখ্যা ১। লাল জমিন।। আগন্তুক (২০১৩), প্রযোজনা সংখ্যা ২। অন্ধকারে মিথেন, ধলেশ্বরী অপেরা।। বঙ্গলোক (২০১৪), প্রযোজনা সংখ্যা ৩। রূপচাঁন সুন্দরীর পালা, মর্তের অরসিক, শনিতের হাত।। ম্যাড থেটার (২০১৫), প্রযোজনা সংখ্যা ১। নদ্দিউ নতিম।। ধ্রুপদী অ্যাক্টিং স্পেস (২০১৫), প্রযোজনা সংখ্যা ১। নভেরা।। যাত্রিক (২০১৬), প্রযোজনা সংখ্যা ১। এ্যান ইন্সপেক্টর কলস।। নাটবাঙলা (২০১৭), প্রযোজনা সংখ্যা ১। রিজওয়ান।। হৃৎমঞ্চ (২০১৮), প্রযোজনা সংখ্যা ১।। রূধিররঙ্গিনী।

সাইফ সুমন ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): নাট্যকার-নির্দেশক। সহযোগী সম্পাদক, থিয়েটারওয়ালা। সদস্য- অনুস্বর।