Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

গত ২০ বছরে আমাদের থিয়েটার : খোলা চোখে দেখা নাট্যচর্চা

Written by অভিজিৎ সেনগুপ্ত.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

রুশ সঙ্গীতজ্ঞ ও ভাষাবিদ গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফের হাত ধরেই আধুনিক ইউরোপীয় ধাচের প্রসেনিয়াম থিয়েটারের প্রবর্তন হয় অবিভক্ত বাংলায় ১৭৯৫ সালে। সেই হিসেব অনুযায়ী বাংলা প্রসেনিয়াম থিয়েটারের পথচলা প্রায় দুইশত পঁচিশ বছরের কাছাকাছি। অন্যদিকে বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটারের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭২ সাল থেকে। তারও পথচলা প্রায় ৪৭ বছর। বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটার চর্চার সময়টাকে আমরা যদি দুই ভাগে ভাগ করি তাহলে দাঁড়ায় ১৯৭২ থেকে নব্বই দশকের শেষদিক পর্যন্ত এবং নব্বইয়ের শেষ হতে আজ অবধি। বিগত এই ২০ বছরে বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটারচর্চা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে বিকশিত হয়েছে। এই ২০ বছরের নাট্যচর্চাকে বিশ্লেষণ করলে আমরা তার উত্থান-পতনের রূপরেখাগুলো দেখতে পাবো। খুঁজে নিতে পারবো উত্তরণের পথ। আবিষ্কার করতে পারবো নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে। 

প্রস্তাবনা বা এক

বাংলাদেশের মঞ্চনাটক মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সুকীর্তি। মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে এক বিরাট পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আর এই পরিবর্তনে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত নিয়ে হাজির হয় মঞ্চনাটক। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের মঞ্চনাটক নতুন এক ধারাবাহিকতার জন্ম দেয়। স্বাধীনতার পূর্বে এই অঞ্চলের নাটক শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের নাটক হয়ে গেল রাজনীতি, সমাজ-চিন্তা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে। নাটক হয়ে উঠল প্রতিবাদের ভাষা। নাট্যকর্মীরা নাটককে গ্রহণ করলেন সমাজ-বদলের হাতিয়ার হিসেবে। সমাজ সম্পর্কিত বিষয়কে প্রতিপাদ্য করে রচিত হতে লাগল নাটক। আর্বিভূত হলেন নতুন নতুন নাট্যকার। আগেকার নাটকের সাথে এই নতুন ধরনের নাটকের পার্থক্য হলো বিষয়বস্তুতে। বিষয়বস্তুর কারণেই নাটকে উপস্থিত হতে লাগল সমাজ পরিবর্তনের কথা। স্বাধীনতা লাভের পর বেশিরভাগ নাটক রচিত হয় সমকালীন সমাজ নিয়ে। সমাজের মূল্যবোধ-অবক্ষয়, মানুষের হতাশা-বঞ্চনাকে উপজীব্য করে নাটক লিখতে লাগলেন নাট্যকাররা। অবশ্য কিছু সময় শ্রেণিসংগ্রাম ও সমাজতন্ত্রের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনীতি, ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরূদ্ধে রাজনীতির স্লোগান তুলেছিল বাংলাদেশের নাট্যদলগুলো, তাদের প্রযোজনাগুলোতে। এই সময় নাট্যদলগুলো নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছিল। সেই উদ্দেশ্যগুলো বিভিন্ন নাট্যদল বিভিন্নভাবে ব্যক্ত করে। সকলের চিন্তা কোনো একটি বিশেষ লক্ষ্যে ধাবিত হয় নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে চিন্তাগুলো বিভ্রান্তকরও ছিল। তা সত্বেও মঞ্চায়িত নাটকগুলোর মধ্যদিয়ে নানারকম প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের মঞ্চনাটক তাই নতুন সব প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।

বাংলাদেশের এই নতুন নাট্যচর্চা গোড়া থেকেই ‘গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন’ হিসেবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিতি লাভ করে। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়টা বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের দাঁড় করিয়ে দিল একেবারে জনতার মাঝখানে। ফলে নাট্যকর্মীরা উদ্যোগী হলেন নতুন নাট্যনির্মাণে। স্বাধীনতাপূর্ববর্তী নাট্যচর্চার সাথে এই গ্রুপ থিয়েটার চর্চার মূল পার্থক্যটা যে কী সে ব্যাপারে বিশিষ্ট অভিনেতা ও নির্দেশক আলী যাকের বলেন- ‘গ্রুপ থিয়েটার নামাঙ্কিত যে আন্দোলন, তাঁর কর্মীরা সাধারণত দেখা গেছে রাজনৈতিক চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়েই দলবদ্ধ হয়েছেন শিল্পকলার এই শক্তিশালী মাধ্যমটির সাহায্যে বৃহত্তর জীবনবোধের কথা জনসাধারণকে পৌঁছে দেয়ার জন্য।’ (গ্রুপ থিয়েটারচর্চা ও প্রতিবন্ধকতা- আলী যাকের, থিয়েটার ৭ম বর্ষ: ২য়-৪র্থ যুগ্ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ১৯৭৯,পৃষ্ঠা-১১৬) যদিও সেই রাজনীতিটা কী সে ব্যাপারেই বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় দেখা গেছে নানা অস্পষ্টতা। তবুও স্বাধীনতাপরবর্তী এই গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের কারণেই পূর্ববর্তী সৌখিন নাট্যচর্চার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এটাই হলো সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গত শতকের আশির দশক থেকে বাংলাদেশের নাট্য-আন্দোলন ভীষণভাবে রাজনৈতিক কর্মকা-ের সাথে জড়িয়ে পড়তে থাকে। সমকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনায় নাট্যদলগুলো যেমন তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, তেমনি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি স্বোচ্চার হয়ে ওঠে। নাটককে রাজনীতির পক্ষে ব্যবহার করার স্লোগান এবং সামরিকজান্তার বিরুদ্ধে নাট্যকর্মীদের তৎপর হয়ে ওঠা এই সময়ের নাট্যচর্চাকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এই সময়কার নাট্যচর্চার বিশেষ লক্ষণ হলো এই, নাট্যদলগুলো অনুধাবন করল রাজনীতির সাথে নাটকের কোনো বিরোধ নেই। ফলে কিছু কিছু নাট্যদল সরাসরি ঘোষণা দিল, নাটককে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। অবশ্য নাট্যদলগুলো এই ঘোষণা কতটা সমাজবিজ্ঞান মনস্ক হয়ে বলেছিল সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে নাটককে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করা নাট্যকর্মীর একটি মূল দায়িত্ব, সেটাই তারা সেদিন উপলব্ধি করতে পেরেছিল।

সারাদেশের নাট্যদলগুলো তাদের ঘোষণায় রাজনৈতিক বক্তব্যকে সুস্পষ্ট করে। আবার কেউ কেউ স্পষ্ট করে বলেছিল তাদের লক্ষ্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এই অঞ্চলের নাট্যচর্চার ইতিহাসে এটা ছিল একেবারেই নতুন চিন্তা। নাট্যদলগুলোর বক্তব্য থেকে এটা সুস্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের নাটক একটি রাজনৈতিক পরিম-লে প্রবেশ করেছিল। এই কথা সত্য যে, যারা শ্রমিক শ্রেণির পক্ষে নাটক করার ঘোষণা দেয়, তারা সরাসরি কোনো শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিল না। এমনকি তারা মাকর্সবাদী চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন কিনা সেই বিষয়েও তর্কের অবকাশ থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, শ্রেণিসংগ্রাম সম্পর্কিত স্লোগানগুলোর ব্যবহার ছিল নিছক পোশাকি।

বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে ‘গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন’ এই শিরোনামে নামাঙ্কিত করে শুরু হলেও পরবর্তীকালে এই ‘আন্দোলন’ শব্দটা আস্তে আস্তে বর্ণহীন হয়ে যেতে লাগল। ‘আন্দোলনে’র স্থলে ব্যাপকভাবে ‘চর্চা’ শব্দটি ব্যবহারে সাধারণ নাট্যকর্মী থেকে নেতৃস্থানীয় সবাই খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করল। তবে এর যে ব্যতিক্রম ছিল না তা কিন্তু নয়। শুরুর দিকের যে আবেগ, তাড়না ও দায়বদ্ধতা নাট্যকর্মীদের ছিল, তা এখন কোন পর্যায়ে বলা বড় কঠিন। কারণ, মোটাদাগের সুবিধাবাদের কাছে আজ আমরা সবাই আত্মসর্মপণ করে বসে আছি। তবে তার যে ব্যতিক্রম নেই তা বলছি না। কিন্তু সংখ্যায় তারা খুবই কম। দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত এই সর্বগ্রাসী সুবিধাবাদের কারণেই এ সময়ের নাট্যচর্চা নানা প্রকার সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে গেছে। তবে কেউ কেউ উত্তরণের চেষ্টা যে করছে না তাও কিন্তু নয়।

স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের নাট্যপ্রচেষ্টা বা নাট্য আন্দোলন কখনো স্থির থাকে নি। আর স্থির থাকে নি বলেই বারবার তার ধারা পাল্টেছে এবং নাট্যদলগুলোর বক্তব্যও পাল্টেছে সমানভাবে। কেমন যেন অস্থিরভাবে দিগবিদিক ছোটাছুটি করেছে বাংলাদেশের নাট্যচর্চা। বহু ধরনের স্লোগান তুললেও প্রকৃত অর্থে  নাট্য আন্দোলন কোথাও এসে দাঁড়াতে পারে নি। নানা স্লোগানের আড়ালে নাট্যদলগুলো মূলত নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে নানাভাবে দর্শকদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করেছে মাত্র।  

পথনাটক চর্চা বা দুই

স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে পথনাটক চর্চা। চট্টগ্রামে প্রথম এই ধারার নাটকের চর্চা শুরু হয়। যদিও ১৯৭১ সালে এই ধরনের নাটকের মঞ্চায়ন লক্ষ করা যায়। কিন্তু তৎপরবর্তী সময়ে সেই চর্চা তেমনভাবে বিকশিত হয় নি। ‘গণায়ন নাট্য সম্প্রদায়’ ১৯৭৬ সালে  মিলন চৌধুরী রচিত ও নির্দেশিত ‘যায় দিন ফাগুনো দিন’ নাটক মঞ্চায়নের মধ্যদিয়ে এই নতুন আঙ্গিকের নাট্যধারার সাথে জনগণকে সম্পৃক্ত করে। প্রথাগত আঙ্গিকের বাইরে রচিত এই ধরনের নাট্যরচনা ও নির্মাণ ব্যাপকভাবে সাড়া জাগায় বাংলাদেশের নাট্যান্দোলনে। তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে আরো আরো নাট্যকার নাটক রচনা এবং নাট্যদল নাট্যপ্রযোজনা নিয়ে উপস্থিত হয়। সেলিম আল দীন, মামুনুর রশীদ, এস এম সোলায়মান, মান্নান হীরাসহ অনেকের নামই এখানে উল্লেখ করা যায়।

সত্যিকার অর্থে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় বাংলাদেশের পথনাটক বিরাট ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের পথনাটক অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র স্বৈরাচারবিরোধী দৃষ্টিকোণ থেকেই মঞ্চস্থ হয়েছে। যদিও অনেক সময় সেখানে শৈল্পিক দৃষ্টি বা নান্দনিক বিষয়টি গুরুত্ব পায় নি। তারপরও স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের নাট্যচর্চার কথা বলতে গেলে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না পথনাটককে।    

সকল সম্ভাবনা নিয়ে বিকশিত হওয়া পথনাটক চর্চা গত ২০ বছরে অনেকটাই স্তিমিত। স্বৈরাচারের পতনের পর বাংলাদেশের নাটকের দলগুলো বোধহয় পথনাটক নির্মাণের বিষযবস্তু খুঁজে পায় নি। অথচ শোষণ-বঞ্চনা এখনও সমভাবে বিদ্যমান আমাদের সমাজ বাস্তবতায়। এই চর্চার ভেতর দিয়ে জনগণের আরো কাছে যাওয়ার যে সম্ভাবনাটুকু ছিল সেটা মুখ থুবড়ে পড়ে। এটার মূল কারণ সম্ভবত নাট্যদলগুলোর বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করা। তাছাড়া আগেই উল্লেখ করেছি, নাট্যদলগুলো এই ধরনের নাটক নির্মাণে সৃষ্টিশীলতার পরিচয়ও দিতে পারে নি। তাই গত ২০ বছরে শিল্পের এই শাখাটি অনেকটা ¤্রয়িমাণ। ক্রমেই এ ধরনের নাট্যচর্চাও হ্রাস পেতে থাকে বাংলাদেশে। পথনাটক এক সময় দর্শক সৃষ্টিতেও রেখেছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। স্বাভাবিকভাবেই বিকাশমান এই ধারাকে বিকশিত করা অত্যন্ত জরুরি। তবেই বাংলাদেশের নাট্যচর্চা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আরো কাছে পৌঁছতে পারবে এবং নাট্যচর্চা যুক্ত হবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে।

গত ২০ বছরের মঞ্চনাটক বা তিন

বাংলাদেশের মঞ্চনাটক শুরুতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে, এই কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। নতুন এই ভাবনা দর্শককে আলোড়িত করেছিল নিঃসন্দেহে। প্রথম পর্যায়ে যেসকল নাটক নির্মিত হয়েছিল সেগুলো শিল্পমান, অভিনয়দক্ষতা এবং প্রযোজনাগুণে ছিল সমৃদ্ধ। দ্বিতীয় ধাপে ভালো নাটক নির্মাণ হয় নি সেকথাও কিন্তু ঠিক না। কিন্তু অত্যন্ত সচেতনভাবে বিগত ২০ বছরের নাট্যনির্মাণকে আমরা পাশ কাটিয়ে চলেছি অবিরত। এই পাশ কাটিয়ে চলা অত্যন্ত আত্মঘাতী বলে অনেকেই মনে করেন। কারণ, সেই নির্মাণগুলোকে যদি আমরা অস্বীকার করি তাহলে সঠিক চিত্রটা দর্শকের  সামনে উঠে আসবে না। ফলে এক ধরনের খ-চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে আমাদের মানস পটে। গত ২০ বছরের অনেক ভালো নাট্যনির্মাণ সমৃদ্ধ করেছে আমাদের নাট্যচর্চাকে এবং উদ্বুদ্ধ করেছে নাট্যকর্মীদের। সে নির্মাণগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য তালিকা দেয়া যাক- স্বপ্নবাজ, রক্তকরবী, কালসন্ধ্যা, ট্রয়লাস ও ক্রেসিদা, ঘাসিরাম কতোয়াল, মান্টোর মেয়েরা (নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়); ছয় বেহারার পালকি, মাধবী, মুক্তি, বারামখানা, মুক্তধারা, মায়া নদী (থিয়েটার, নাটক সরণি); সংক্রান্তি, রাঢ়াঙ, প্রাকৃতজন কথা, ময়ূর  সিংহাসন, এবং বিদ্যাসাগর, দি জুবিলী হোটেল (আরণ্যক নাট্যদল); বনপাংশুল, প্রাচ্য, নিমজ্জন, ধাবমান, বিনোদিনী, পঞ্চনারী আখ্যান (ঢাকা থিয়েটার); কথা’৭১, ট্রায়াল অব সূর্যসেন (ঢাকা পদাতিক); তীর্থঙ্কর, রূপবতী, খনা, মহাজনের নাও (সুবচন নাট্য সংসদ); ভাগের মানুষ, শেষ সংলাপ (সময়); এক’শ বস্তা চাল, টার্গেট প্লাটুন, মুল্লুক, হ্যামলেট (বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি); শ্যামা প্রেম, লোকনায়ক, রক্তকরবী, আওরঙ্গজেব, ঈর্ষা, আমি ও রবীন্দ্রনাথ (প্রাঙ্গণেমোর); সক্রেটিসের জবানবন্দী (দৃশ্যপট); ক্রুসিবল, আরজ চরিতামৃত, প্রজাপতি (নাট্যকেন্দ্র); রাজা হিমাদ্রী, জ্বালা (দৃষ্টিপাত নাট্যদল); ক্লিওপেট্রা (ঢাকা নান্দনিক); লোহা, নিত্যপুরাণ, সুরগাঁও (দেশ নাটক); চাঁদ বনিকের পালা, অল মাই সানস (নাগরিক নাট্যাঙ্গন অনসাম্বল); প্রাগৈতিহাসিক, গওহর বাদশা ও বানেছাপরী (নাগরিক নাট্যাঙ্গন); কারিগর (কণ্ঠশীলন); চিলেকোঠার সেপাই, বৌবসন্তী, হাফ আখড়াই (উদীচী); রথের রশি, অতীশ দীপঙ্কর সপর্যা, অগ্নিজল (নাট্যধারা); স্বপ্ন দ্যাখো মানুষ, তৃণপর্ণে শালমঞ্জরী, সময়ের প্রয়োজনে, আমিনা সুন্দরী, না মানুষি জমিন (থিয়েটার আর্ট ইউনিট); সার্কাস সার্কাস, এ ম্যান ফর অল সিজনস্, কইন্যা, গণ্ডার, রাজা এবং অন্যান্য..., বনমানুষ (প্রাচ্যনাট); শিখণ্ডী কথা, শিবানী সুন্দরী (মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়); ম্যাকবেথ (পদাতিক নাট্য সংসদ, টিএসসি); তপস্বী ও তরঙ্গিনী, সোনাই মাধব, মাঝ রাতের মানুষরা, লীলাবতী আখ্যান, মধুমালা (লোক নাট্যদল, সিদ্ধেশ্বরী); চে’র সাইকেল, অমানুষ, দ্য ডিসটেন্ট নিয়ার (বাঙলা থিয়েটার); ডাকঘর, রিকোয়েস্ট কনসার্ট, মানগুলা, বাংলার মাটি বাংলার জল, নারীগণ, রাইফেল (পালাকার); খনা, ট্রায়াল অব মাল্লাম ইলিয়া (বটতলা); শাইলক এ্যান্ড সিকোফ্যান্টস (থিয়েটারওয়ালা রেপাটরি); অহরকণ্ডল (জন্মসূত্র); লাল জমিন (শূন্যন); ত্রিংশ শতাব্দী, হরগজ, (স্বপ্নদল), ব্র্যান্ড, মেটামরফোসিস, পীরচান, দি মিশন, কৃষ্ণবিবর, অ্যাম্পিউটেশন, ম্যাকাব্রে (সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার); কৈবর্ত গাথা, মাতব্রিং, রাজা প্রতাপাদিত্য, ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন (বিবর্তন যশোর); ফণা, নীল ময়ূরের যৌবন, এ নিউ টেস্টামেন্ট অব রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট (শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটার, বরিশাল); খেলাঘর (থিয়েটার ওয়ার্কশপ, চট্টগ্রাম); বৃত্তের বাইরে (এ্যাক্ট ওয়ান); এই ঘর এই বসতি, কমরেডস্ হাত নামান (গণায়ন নাট্য সম্প্রদায়); ইচ্ছা মৃত্যু (ইবসেন সেন্টার); বহে প্রান্তজন, ভূমিকন্যা, ম্যাওসংকেত্তন (অনুশীলন নাট্যদল, রাজশাহী); ঊর্ণাজাল, তবুও মানুষ, অর্ফিয়ুস, দূর রজনীর স্বপন, আমার আমি (নান্দীমুখ, চট্টগ্রাম); ক্যালিগুলা, ট্রিলজী, বাঁধ, নওকর শয়তান মালিক হয়রান, গণ্ডার (ফেইম স্কুল অব ড্রান্স ড্রামা এন্ড মিউজিক); কবি (অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়); সাম্পাননাইয়া, মৃত্যু পাখি (উত্তরাধিকার); দুই বিঘা জমি (প্রতিনিধি নাট্য সম্প্রদায়); মধুমালা, তরঙ্গভঙ্গ (তির্যক নাট্যদল); তাসের দেশ (নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়); দমের মাদার (নাট্যম রেপার্টরি), অন্ধকারে মিথেন, ধলেশ্বরী অপেরা (আগন্তুক); রিজওয়ান (নাটবাঙলা); ঊর্ণাজাল (বাতিঘর); কমলারানীর সাগর দীঘি, থ্রি সিস্টার্স, বেহুলার ভাসান, চাকা, উরুভঙ্গম (থিয়েটার এ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়); বিভাজন, স্ত্রীর পত্র, জ্যোতিসংহিতা (জীবন সংকেত নাট্যগোষ্ঠী); কহে বীরাঙ্গনা, দেবতার গ্রাস, ইঙাল আঁধার পালা, লেইমা (মণিপুরি থিয়েটার); চণ্ডীদাস, হাঁড়ি ফাটিবে (এথিক), মল্কা বানু (সমীকরণ থিয়েটার); কথা পুণ্ড্রবর্ধন (বগুড়া থিয়েটার); লালন নামা (বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠী); নীল সমুদ্রের ঝড় (কক্সবাজার থিয়েটার) ইত্যাদি।

সময়ের প্রয়োজনে কাজের ধারা বদলায়, কিন্তু মূলনীতিকে বিসর্জন দিয়ে সিস্টেমের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আসলে নাটক মজাদার হতেও বাঁধা নেই, গ্রহণীয় হতেও আপত্তি নেই। দেখার বিষয় হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যদিয়ে নাট্যভাবনাকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস আছে কিনা। সমাজ চেতনা গুরুত্ব পাচ্ছে কিনা। Fun  বা মজা ছাড়া ব্রেশটের মতো রাজনীতি সচেতন নাট্যকার নাট্যের কল্পনাই করতে পারতেন না। তবে Thinking is the greatest pleasure এটাও তিনি সবসময় মনে করিয়ে দিতেন এবং মগজ ব্যবহার করে ‘মজা’ পেতেই দর্শকদের উস্কে দিতেন। এটাই নাট্যের দায়িত্ব। ‘বিনোদন’ এবং ‘চেতনাকে’ দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াতে মেলানোই নাট্যশিল্পীর অভীষ্ট হওয়া উচিত।

কতটা বিনোদন এবং কতটুকু জীবনবোধ এর তো ধরা বাঁধা কোনো প্রক্রিয়া নেই। শিল্পীর নিজস্ব বোধ এবং জীবনদর্শনের আলোকে তার রকমফের ঘটে এবং ঘটে বলেই শিল্পে এত বৈচিত্র্য। মজা বা বিনোদন বাতিল করে দিলে জটিল অংকের পাঠের সঙ্গে নাট্যের ফারাক খুঁজে পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে জীবনবোধকে বিসর্জন দিলে নাট্য গিয়ে পৌঁছতে পারে ভাঁটিখানায় বা জুয়ার আড্ডায়।

সময় যেহেতু প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, নাট্যের ভাষাও বদলাতে বাধ্য। এটাই বৈজ্ঞানিক সত্য। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনও দৃষ্টিভঙ্গি বদলের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নেয়। পারিপার্শ্বিকের সাথে সমন্বয়- বৈপরীত্যের পার্শ্বিক পথ ধরেই সচেতন শিল্পীকে হাতিয়ার ব্যবহারে কৌশল বদলে নিতে হবে। নাট্যভাষা তাই প্রথার জালে আটকে থাকতে পারে না। নব নব উদ্ভাবনে তাকে প্রাণচঞ্চল থাকতে হয়, এটাই প্রগতির লক্ষণ।

আজকাল নাটক নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন প্রায় এসে যায়, তা হলো নাটকটি দর্শক ‘খাবে’ কিনা। বিষয়টি অত্যন্ত স্থূল, কারণ এই ‘খাবে’ শব্দটির গূঢ় অর্থ হচ্ছে নাটকটি বক্স অফিস হিট করবে কিনা? দর্শককে খাওয়াতে গিয়ে চটুল বিষয়বস্তুর নাটক নির্বাচন করতে দ্বিধাবোধ করছে না নাট্যদলগুলো। অন্যদিকে অনেকেই আঙ্গিকের উপর নির্ভর করে নির্মাণ করছে নাট্যপ্রযোজনা। বিষয়বস্তু সেখানে হয়ে পড়ছে গৌন। অর্থাৎ অভিনয়ের বিষয়টিকে প্রতিনিয়তই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি আমরা। ভালো বিষয়বস্তু, সুঅভিনীত ও নান্দনিক উপস্থাপনার নাটক দর্শককে জোর করে খাওয়াতে হয় না, দর্শক আপনাআপনিই দেখে। অর্থাৎ একটি ভালো নাটককে বাঁচিয়ে রাখে দর্শক। আমাদের জোর করে খাওয়ানোর প্রক্রিয়া পরিহার করতে হবে।  

নাট্যকার প্রসঙ্গ বা চার

স্বাধীনতাপরবর্তী সময় হতে আজ অবধি সমাজবাস্তবতা ও তার নানা দ্বন্দ্ব নিয়ে নাট্যকারগণ নাটক রচনা করে চলেছেন প্রতিনিয়ত এবং সেসব নাটক সারাদেশের নাট্যদল মঞ্চেও আনছে নিয়মিত। তবে এই কথা দিবালোকের মতো সত্য যে, বাংলাদেশের নাট্যচর্চার অন্যতম দুর্বল দিক হলো নাট্যকারের অপ্রতুলতা। নিয়মিত নাট্যচর্চা হলেও নতুন নতুন নাট্যকার কিন্তু সৃষ্টি হয় নি তেমনভাবে। আর হয় নি বলেই বাংলাদেশের নাট্যদলগুলোকে প্রায় সময়ই হাত বাড়াতে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নাট্যকারদের কাছে। বাংলাদেশের নাট্যচর্চার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যাবে, এখানকার নাট্যদলগুলোর বেশিরভাগ প্রযোজনা পশ্চিমবঙ্গের নাট্যকারদের লেখা নাটক। এটা অপরাধ নয়, তবে সীমাবদ্ধতার বিষয় তো বটেই। নাট্যচর্চার ধারাকে বেগবান করতে পারে নাট্যকাররা। নতুন নতুন নাটক রচনার ভেতর দিয়ে নাট্যচর্চা তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। এটাই হচ্ছে অমোঘ সত্য। এই অপ্রতুলতা পূরণ করার লক্ষ্যে এখানকার নাট্যদলগুলো রূপান্তর ও অনুবাদনাটককে অবলম্বন করে বাঁচার চেষ্টা করেছে। তাই আশির দশকের শুরু থেকে আজ অবধি একটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে এই ধরনের নাট্যনির্মাণ। সকল সীমাবদ্ধতার পরও রচিত হয়েছে কিছু ভালো নাটক। পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যায় যুগে যুগে নাট্যকাররাই নাট্যচর্চাকে বেগবান করেছে এবং নতুন পথের দিশা দিয়েছে।  

জেলাশহরের নাট্যচর্চা বা পাঁচ

অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন বাংলাদেশের নাটক মানে শুধুমাত্র ঢাকার নাটক। এই কথাটার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাংলাদেশের নাটক মানে হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুর, যশোর, সিলেটসহ সকল জেলায় চর্চিত একটি ফলগুধারা। অন্যান্য জেলাশহরগুলোতে কী কী নাটক হচ্ছে তার খবর আমরা কতটুকু রাখি? তাবৎ জেলাশহরের যে বাস্তবতা, সংগ্রাম ও হাহাকার সেটি আমরা জানি কি? জানার প্রয়োজন অনুভব করি কি? জেলাশহরের অনেক নাট্যসংগঠক স্ত্রীর গহনা বিক্রি কিংবা নিজের জমি বিক্রি করে অথবা সুদের উপর টাকা নিয়ে প্রযোজনা নির্মাণ করেন এমন উদাহরণও আছে। খরচটা মূলত একজনের পকেট থেকেই হয়। এভাবে সে দেউলিয়াও হন। অথচ আমরা যারা বাংলাদেশের থিয়েটার নিয়ে সারগর্ব বক্তৃতা দিই বা লিখি, সেখানে এসব মানুষ বা জেলাশহরের নাট্যচর্চার কথা কতটুকুইবা উঠে আসে! দৈনিক সংবাদপত্রগুলো যখন সালতামামি করে, সেখানেও থাকে না এই নাট্যচর্চার কথা। অথচ কত সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে জেলাশহরের একজন নাট্যকর্মী মঞ্চের পাদ-প্রদীপের আলোয় নিজেকে উদ্ভাসিত করেন।      

দর্শক প্রসঙ্গ বা ছয়

এবার দৃষ্টি দেয়া যাক নাটকের মূল নিউক্লিয়াস দর্শকের দিকে। বলাবাহুল্য দর্শক প্রথমত নাটক দেখতে আসেন বিনোদনের জন্য। কিন্তু শুধু বিনোদনে তাদের মন ভরে না। মঞ্চ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তারা কিছু ভাবনাও সাথে করে নিয়ে যেতে চান। গত ২০ বছরে তা কতটুকু দিতে পেরেছি আমরা? উত্তরটা খুব আশাপ্রদ নয়। তাছাড়া আমরা কতজন দর্শকের কাছে যেতে পেরেছি? নির্ভরযোগ্য কোনো সংখ্যা-তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। তবু যদি ধরে নেয়া যায় আমাদের মধ্যবিত্তনির্ভর নগরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা শহরের এক কোটিরও বেশি মানুষের মধ্যে মাত্র পাঁচ/ছয় ’শ দর্শক প্রতিদিন নাটক দেখে থাকেন। সে হিসেবে বছরের প্রতিদিন প্রদর্শনী হলেও এই সংখ্যা দুই থেকে আড়াই লাখের মতো। একবার ভাবুন সারা বছরে ঢাকার এক কোটিরও বেশি নাগরিকের মধ্যে দুই/আড়াই লাখ মানুষ নাটক দেখেন। এ সংখ্যাটি আরো কমে যাবে যদি একই দর্শক দুই-তিনবার করে দেখেন। কত অকিঞ্চিৎকর এই দর্শক সংখ্যা। ইউরোপে এমন অনেক দেশ অছে যেখানে মোট জনসংখ্যার চাইতে তার থিয়েটারের দর্শক সংখ্যা অনেক বেশি। তার মানে সেদেশের প্রতিটি মানুষই নাটক দেখেন এবং একাধিকবার দেখেন।

এসব বিবেচনায় আমাদের নাটক কতটুকু এগিয়েছে তা অবশ্যই ভাববার বিষয়। খোদ রাজধানী ঢাকাতেই যখন এমন অবস্থা তখন ছোট ছোট শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামঞ্চলের অবস্থা কী তা সহজেই অনুমেয়। স্বাধীনতাপরবর্তী দুই দশকে ঢাকার বাইরে সব জেলাশহরেই দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাটক হতো। গত ২০ বছরে ‘নিয়মিত’ হয় বলে মনে হয় না। তাহলে এই দর্শক শূন্যতা কি আমাদের নাট্যজনদের ভাবায় না? এর কারণ খোঁজার চেষ্টা আমরা কখনও কি করেছি নাকি আমরা আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগছি? আমাদের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। কোথায় আমাদের গলদ। তবেই আমরা দর্শককে আবার হলমুখি করতে পারব।
 
কারা নাটক করতে বা দেখতে আসছে সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি। মধ্যবিত্ত যুবকদের মোহমুগ্ধতার ঝোঁক ক্রমে আরো নানাদিকে বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে কেবল নাট্যকর্মী নয়, নাট্যদর্শক হিসেবেও স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণ এখন ক্রমঅবনতিশীল। তবে ঢাকা শহরের চিত্রটা একটু ভিন্ন। এখানে অনেক তরুণকর্মী আসছে নাটক করার জন্য। তার পেছনে একটাই কারণ- মিডিয়া। বিভিন্ন নাট্যদল যখন নতুন কর্মী নেয়, সেই ইন্টারভিউ বোর্ডে উপস্থিত থাকলে এই বক্তব্যের  সত্যতা পাওয়া যাবে। অন্যদিকে জেলাশহরে নাট্যক্রিয়ার সাথে যুক্ত হবার সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। যারা আসছে তাদের বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। এরা কর্তব্যপরায়ণ কিন্তু আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বনির্ভর নয়। সৃজনশীল কাজের সাথে এ ধরনের পরনির্ভরশীলতার সম্পর্ক বিপরীতমুখি।

বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার চর্চার বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। সময়টা খুব একটা কমও না। নিরন্তর চর্চায় শিল্পকলার এই মাধ্যমটি আরো বিকশিত হওয়ার কথা ছিল। কারণ বাংলাদেশের থিয়েটারচর্চার শুরুটা ছিল কমিটমেন্টের উপর ভিত্তি করে ভালো নাটক (ভালো বলতে- বিষযবস্তু, অভিনয়, মানসম্পন্ন প্রযোজনা) আর প্রচুর দর্শক সমাগমের মধ্যদিয়ে। ক্রমে ক্রমে প্রায় দর্শকহীন, নিম্নমানের অভিনয় সমৃদ্ধ নাট্যচর্চায় এসে ঠেকলো কেনো? আজ কোথায় আমাদের কমিটমেন্ট, নিষ্ঠা ও সংকল্প! এই সাতচল্লিশ বছরে অগণিত নাট্যকর্মীর শ্রম, মেধা, সময় বিনিয়োগের ফল যদি হয় দর্শকবিহীন নাট্যচর্চা, তাহলে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। আমরা যারা এখনও এই নিষ্ফলা থিয়েটারচর্চার সাথে যুক্ত আছি, আমাদের করণীয়টা আসলে কী? এই নিভু নিভু থিয়েটারকে উদ্ধারের পথটাইবা কী? থিয়েটারের অনিশ্চিত যাত্রা, অন্তিম যাত্রায় পরিণত হওয়ার আগেই আমাদের পথটা আমাদেরকেই খুঁজে বের করতে হবে।    

বর্তমান বিশ্বায়ন আর আকাশ সংস্কৃতির আধিপত্যের সাথে লড়াই করে আমাদের থিয়েটারকে টিকে থাকতে হবে এটাই হলো মূল সত্য। অথচ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও চেতনার সংকট আর চিন্তার দীনতা আমাদের বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পিছনের দিকে। আমাদের এই দীনতার মূল কারণ হলো, আমরা গন্তব্যহীন পথে যাত্রা করেছি, আমাদের থিয়েটারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুনিশ্চিত নয়। আর সুনিশ্চিত নয় বলেই ক্লাসিক, পৌরাণিক, কমেডি, ট্র্যাজেডি, অনুবাদ, রূপান্তর, মৌলিক, লোকজ ইত্যাদির নামে যখন যা খুশি তাই মঞ্চস্থ করছি। অভিনয়ের নামে যাচ্ছেতাই কিছু একটা করে ফেলছি। অন্যদিকে ‘দর্শক কোথায়’, ‘দর্শক কেনো নাটক দেখতে আসছে না’ বলে বলে হাহাকার করছি।

নাট্যচর্চায় রাষ্ট্রের ভূমিকা বা সাত

সংস্কৃতি বিকাশে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? আমাদের নাট্যপ্রচেষ্টায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নেই বললেই চলে। এদিকে আঙ্গিক ও টেকনিকে নাট্যনির্মাণ আগের থেকে স্ফীত হওয়ায় প্রযোজনা ব্যয় বেড়ে চলেছে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া বাংলাদেশের নাট্য এগিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার ভূমিকা রাখতে পারে। এখন যে পদ্ধতিতে সরকার নাট্যদলগুলোকে অনুদান দিচ্ছে সেভাবে কখনও একটি নাট্যদল বেঁচে থাকতে পারে না। জেলাশহরের একটি নাট্যদল পায় পনের থেকে বিশ হাজার টাকা, রাজধানীর দলগুলো পায় পঞ্চাশ থেকে সত্তর হাজার টাকা। যদি বছরব্যাপী কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে বাৎসরিক অনুদান দেওয়া হতো তাহলে ভালো হতো। কারণ, যারা নিয়মিত কাজ করছে তাদের মূল্যায়নের বিষযটি চলে আসে। তাহলে গাধা আর ঘোড়ার পার্থক্য করা যেত। সেক্ষেত্রে দলগুলোর কার্যক্রমকে মনিটরিং করা প্রয়োজন এবং যারা নিয়মিতভাবে কাজ করে তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। অথচ এই বিষযটি সকলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। এখন নাম সর্বস্ব অনেক সংগঠনগুলো সরকারি অনুদান পায়। একটা সুষ্ঠু ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে অর্থবন্টন হলে সংগঠনগুলো উপকৃত হতো।     

জাতীয় বাজেটের সর্বনিম্ন অবস্থানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিল্পকলা একাডেমি, জাদুঘর, বাংলা একাডেমি, গ্রন্থাগার, লোকশিল্পসহ আরো অনেক বিভাগ। অথচ বাজেটপূর্ব অবস্থায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো কার্যকরী ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। বাজেটের পূর্বে সকল ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সচল থাকে তাদের চাহিদার কথা তুলে ধরতে, অথচ আমাদের কেমন যেন এক ধরনের নীরবতায় পেয়ে বসেছে! তাতে কী ধরে নেব সাংস্কৃতিক সংগঠনের সম্মিলিত মোর্চারা এতেই সন্তুষ্ট? নাকি নেতৃস্থানীয়রা সরকারের বিরাগভাজন হতে চাই না? বাজেটের পূর্বে একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সরকারের সামনে তুলে ধরাইতো আমাদের কাজ। আমরাও তো আমাদের দায়িত্বকে অবহেলা করতে পারি না। চেষ্টা করে দেখলে তো ক্ষতি নেই। তাহলে ভয় কিসের?  

সাম্প্রতিক সময়ে নাট্যকর্মীদের দাবি হচ্ছে নাট্যদলগুলোর জন্য Grant ও Salary প্রথা চালু করার বিষয়টি। কিন্তু নাট্যকর্মীরা বা সংগঠনগুলো একটা বিষযকে তাদের বিবেচনায় আনছেন না, তা হলো বাংলাদেশের কোনো নাট্য বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের কোনো নিবন্ধন নেই। সরকার এই ধরনের প্রক্রিয়ায় গেলে অবশ্যই সংগঠনগুলোর এক ধরনের জবাবদিহিতা থাকা দরকার। আমাদের পার্শ¦বর্তী দেশে এই ধরনের প্রথা চালু আছে এবং তাদের সংগঠনগুলোর এক ধরনের সরকারি নিবন্ধন আছে। তাই প্রথম ধাপে সারাদেশের নাট্যদলগুলোর নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। এটি থাকাটাও জরুরি। একটি প্রক্রিয়ার অধীনে এলে নাট্যদলগুলোর জবাবদিহিতারও একটা প্রক্রিয়া তৈরি হতো। তাহলে আর নামসর্বস্ব নাট্যসংগঠনগুলো সরকারি অনুদান পেত না। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। বাংলাদেশের  সকল জেলা পর্যায়ে এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে উপজেলা পর্যায়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শাখা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি যাত্রা দলের নিবন্ধন প্রদান করছে। তাহলে নাটকের দলগুলোর নিবন্ধনও শিল্পকলার মাধ্যমে করা যেতে পারে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত নাটকের নেতৃস্থানীয়দের। তা না হলে Grant বা Salary প্রক্রিয়া চালু করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থেকেই যাবে।  

সাংগঠনিক প্রক্রিয়া বা আট

শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যক্তিগত গুণের কারণেই এদেশে অধিকাংশ নাট্য-সংগঠন সাফল্যের সাথে টিকে আছে এমনটা কিন্তু নয়। এর পেছনে সাধারণ নাট্যকর্মীদের অবদানও কম নয়। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে নাট্যচর্চার সাফল্যের পেছনে নাট্য-সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের কর্মদক্ষতা ও ব্যক্তিগত কর্মনৈপুণ্য যেমন অবদান রেখে চলছে, তেমনিভাবে অবদান রেখে চলেছে সংগঠনের অঙ্গীকারাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল সাধারণ নাট্যকর্মীদের কর্মদক্ষতা। অবশ্য এক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবদানও কম নয়। অনেকেই মনে করেন দেশে বারবার সামরিক শাসন এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবসহ বহুবিধ বাধাই নাট্যকর্মীদের অঙ্গীকারকে আরো দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে- বাধার দুয়ার খুলতেই নাট্যকর্মীরা হয়েছে আরো বেশি সৃজনশীল।

আশির দশকে বাংলাদেশের নাট্যচর্চার পুরোধা ব্যক্তিরা অনুধাবন করলেন একটি সম্মিলিত মোর্চার। এটা একটা অত্যন্ত যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল। স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে সেদিন নাট্যকর্মীরা রেখেছিল বৈপ্লবিক ভূমিকা। ১৯৮০ সালের  ২৯ নভেম্বর সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হলো ‘বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন’। স্বাধীন বাংলাদেশে নাট্যকর্মীদের তো বটেই, যেকোনো সংস্কৃতিকর্মীদেরও প্রথম সংগঠন। পরবর্তী সময়ে সারাদেশের নাট্যসংগঠনগুলো বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের পতাকা তলে জড়ো হতে থাকল। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৮৭৬ সালের কুখ্যাত ‘অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন’ ২০০১ সালের ৩০ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে বাতিল করা হয়। গত ২০ বছরের আলোকে চিন্তা করলে এটি ফেডারেশনের উল্লেখযোগ্য এক সাফল্য।

নাট্যদলগুলোর অভিভাবক সংগঠন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন সারাদেশে কাজ করছে নাট্যদলগুলোর সাথে। আজ যখন পেশাদারী থিয়েটারের কথা উঠছে তখন তারা কী ভাবছে সেটা জানা অত্যন্ত জরুরি। সরকারের বাজেট নির্ধারণে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন কী চাইছে সেটা জানাও আমাদের দরকার। সারাদেশে নাটকের উন্নয়নে কী কী কার্যকরী পদক্ষেপ ফেডারেশন গ্রহণ করেছে সেই উত্তরগুলো সামনে চলে আসলে বাংলাদেশের নাটকের ভবিষ্যৎ কী হবে তা আমরা পরিষ্কার দেখতে পাব। আমরা সংস্কৃতিতে বাজেট বরাদ্দের কথা প্রতিনিয়ত বলে থাকি। কিন্তু আমরা কি সরকারের কাছে বাজেটপূর্ববর্তী সময়ে তার একটা রূপরেখা কখনো উপস্থাপন করেছি? না, সে রকম কোনো ইতিহাস আমাদের জানা নেই। তাহলে অভিভাবক সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এই ব্যাপারে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং স্বারকলিপি প্রদানের মাধ্যমে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে বেগবান করতে হলে জেলাশহরের নাট্যচর্চাকে বেগবান করতে হবে। সেক্ষেত্রে অভিভাবক সংগঠনকে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে তা দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করতে হবে।

নাট্য উৎসব আর গতানুগতিক কাজের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে বেগবান করা যাবে না। বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনকে নিউক্লিয়াসের ভূমিকা পালন করতে হবে।  

উন্নয়নধর্মী থিয়েটার বা নয়

গত ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে অন্য একটি নাট্যধারা বাংলাদেশে বেশ সরব। এই ধারাটির মূল চর্চাকারী হলো এনজিও গোষ্ঠীসমূহ। তারা এ’কে বিশেষ নামেও নামাঙ্কিত করেছেন। মূলত গত শতকের নব্বই দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশে এনজিওদের মাধ্যমে নতুন এই ধারাটির চর্চা শুরু হয়। তারা এর নাম দিয়েছেন ‘উন্নয়নধর্মী নাটক’। পৃথিবীব্যাপী Development Theatre বা উন্নয়ননাট্যের যে ইতিহাস আমরা দেখতে পাই তার একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। আর সেই উন্নয়নধর্মী নাট্যের প্রবক্তা হিসেবে আমরা পাই ইঙ্গুজি, ফ্রেইরে এবং অগাস্তু বোয়ালের মতো নাট্যব্যক্তিদের। জনগণের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন তাঁরা তাঁদের নাটকে দেখাতে চেয়েছেন। তাঁরা এমন নাট্য তৈরি করতে চেয়েছেন যেখানে নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ খুঁজে পাবে নিজেদের নাট্যসড়ক। নাট্যকলার শক্তিকে ব্যবহার করে তারা যেন বিপ্লবের মহড়া দিতে পারে। অর্থাৎ এর রয়েছে এক বিদ্রোহী রূপ।

অথচ বাংলাদেশের উন্নয়ন নাট্যের হালহকিকত দেখে মনে হবে- উন্নয়ননাট্য হলো এমন এক পণ্য যা ব্যবসার উৎকৃষ্ট উপকরণ। পৃথিবীব্যাপী উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঞযবধঃৎব এর প্রবক্তরা চেয়েছেন জনগণকে সচেতন করতে, আর বাংলাদেশের উন্নয়নবাদীরা চান জনগণকে অচেতন করে দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে। বাংলাদেশে উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঞযবধঃৎব তার তথাকথিত পরিভাষা ‘উন্নয়নধর্মী’ নাট্য থেকে সরে গিয়ে আজ ‘ডাবল মুনাফা’ থিয়েটারে পরিণত হয়েছে। এনজিওগুলোর কর্মকা-কে দাতব্য শিল্পালয় বলে মনে হবে। কিন্তু বাস্তবিকভাবে নানা প্রকার মানবিক উন্নয়নের মুখোশ ধারণ করে এদেশে সাম্রাজ্য ও পুঁজিবাদী এবং সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। কোনো জাতির অগ্রগতিকে ব্যহত করতে হলে তার সংস্কৃতির অগ্রগতির সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করতে হয়। তাই সংস্কৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে করায়ত্ব করতে না পারলে শোষণের ষোলকলা পূর্ণ হয় না। আর তাই সাম্রাজ্যবাদ বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক এনজিওগুলোর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানোর ক্ষেত্রকে নিজেদের অনুকূলে রাখার কাজটাই করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের ‘উন্নয়নধর্মী’ নাট্যকলার প্রধান উদ্দেশ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। প্রকল্পের স্বার্থ রক্ষা করাই মূল লক্ষ্য। শিল্পের সৌন্দর্য বা নন্দনতত্ত্ব সেখানে অনুপস্থিত। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পর তার কোনো মূল্য থাকে না এবং এই কিম্ভুত নাট্যকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয় নর্দমায়। এইসব নাটকে জীবন সমস্যার কোনো স্বরূপ নেই, সমস্যার গভীরে প্রবেশের ন্যূনতম ইচ্ছে নেই, শোষণের প্রকৃষ্ট রূপ নেই, নেই কোনো দর্শনগত ভাবনা ও চিন্তা। এগুলো মূলত নাট্যপ্রেসক্রিপশন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যতাত্ত্বিক ও নাট্যব্যক্তিত্ব ড. সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেন- ‘এটা এনজিও কর্মীদের নাটক, যারা উন্নয়ন প্রভুর অমৃতবচন প্রচারের জন্য ধর্মাচারী দেবদূত রূপে আর্বিভূত হয়েছেন।’ (সৈয়দ জামিল আহমেদ- উন্নয়ননাট্য , তত্ত্ব ও প্রয়োগ, পৃ. ১৩)

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা দশ

গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে নাট্যকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। এটি অত্যন্ত সুখপ্রদ একটি বিষয়। নাট্যকর্মীদের দীর্ঘদিনের লালিত এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন আন্দোলিত করে সবাইকে। বিশ্ববিদ্যালয় এবং মঞ্জুরী কমিশনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নাট্যকলায় প্রাতিষ্ঠনিক শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে নিঃসন্দেহে।     

১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে নাট্যতত্ত্ব পড়ানোর মধ্যদিয়ে নাটকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু হয় এই জনপদে। পরবর্তী সময়ে ১৯ সেপ্টেম্বর  ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র চারুকলা বিভাগ চালু করা হয় এবং এই বিভাগে নাট্যকলা সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসেবে পড়ানো শুরু হয়। চারুকলা ছাড়াও বাংলা ও ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা নাট্যকলাকে সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসেবে পড়তে শুরু করে। তারও পরে ১৯৮৬ সালে চারুকলা বিভাগের অধীনে নাট্যকলায় এমএ (প্রিলিমিনারি) কোর্স শুরু হয় এবং ১৯৯১-১৯৯২ সালে নাট্যকলায় অনার্স চালু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ আত্মপ্রকাশ করে।   

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলায় অনার্স কোর্স চালু হয় ১৯৮৬ সালে আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৯ সালে নাট্যকলা সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসেবে পড়ানো শুরু হয়। তারপর ১৯৯৪ সালে শেষোক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলায় এমএ  (প্রিলিমিনারি) এবং ১৯৯৬ সালে নাট্যকলায় অনার্স কোর্স চালু করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলায় অনার্স কোর্স চালু করা হয় ২০০০ সালে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলায় অনার্স কোর্স চালু হয় ২০০৯ সালে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলায় অনার্স কোর্স চালু হয় ২০১৪ সালে, এছাড়া বেসরকারি কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েও নাট্যকলা বিষয় পড়ানো হচ্ছে।

গত ২০ বছরে এই প্রাপ্তিটা উল্লেখ করার মতো। তবে যারা এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করছেন তারা মূল ধারার থিয়েটারের সাথে কতটুকু যুক্ত হচ্ছেন সেই প্রশ্নটি বারবার বিভিন্ন আলোচনায় উঠে আসছে। একটি নাটদল হলো একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্থীর জন্য ল্যাবরেটরি। তার পুঁথিগত জানাকে সে প্রয়োগ করার সুযোগ পাবে একটি নাট্যদলে কাজ করলে। লক্ষ করা গেছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্থী এবং স্বশিক্ষায় শিক্ষিত নাট্যকর্মীর মধ্যে সৌহার্দ্যও তেমন মধুর না। দুইজনের রসায়ণ যদি মিলিত হয় তাহলে সংগঠন উপকৃত হবে। বাংলা নাটকের অনেক দিকপাল নাট্যনিদের্শক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও ইতিহাসে জায়গা করে নিতে পেরেছেন। বাংলাদেশের নাট্যচর্চার শুরুটা কিন্তু স্বশিক্ষায় শিক্ষিত নাট্যকর্মীদের হাত ধরে ফলবতি হয়েছে। এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। যারা নাট্যকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করতে আসেন তাদের মূলধারার থিয়েটারের সাথে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন।    

নাট্যচর্চায় পেশাদারিত্ব বা এগার

ইদানিং অনেকে জোর গলায় সেমিনার ও বক্তৃতায় বলছেন- বাংলাদেশের নাটকে পেশাদারিত্ব আসলে এটি আরো বেগবান হবে। তাঁরা আসলে কোন যুক্তির উপর ভিত্তি করে কথাগুলো বলছেন তা পরিষ্কার নয়। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সমাজ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে পেশাদারিত্বের বিকাশ ঘটে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও ট্রেডিং বাণিজ্য এবং সামন্তমুখি। সমাজ ব্যবস্থাও আধা-সামন্ততান্ত্রিক। যেখানে শিল্পের (কারখানা) বিকাশ এখনও হয় নি। পাশাপাশি এখানকার ধনিক শ্রেণি দেশের সম্পদ পাচার করে এবং জনগণের টাকা আত্মসাৎ করে অথচ শিল্পের বিকাশ ঘটায় না। সেই রকম একটি পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে থিয়েটারে পেশাদারিত্বের চিন্তা করা কি দিবা স্বপ্ন নয়? আসলে শুরুতে ‘নাট্যান্দোলন’, পরবর্তী সময়ে ‘নাট্যচর্চা’ এবং বর্তমান সময়ে ‘পেশাদারিত্ব’ এইসব কোনো ইঙ্গিত বহন করে কিনা বলা মুশকিল।  

উপসংহার বা বারো

বাংলাদেশের বর্তমান নাট্যচর্চা একটা বলয়ের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। মধ্যবিত্তের গ-ি ভেদ করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে এখনও সম্পৃক্ত হতে পারে নি। আর পারে নি বলেই নানা প্রকার হতাশা এবং না পাওয়ার বেদনায় ভুগতে থাকে নাট্যকর্মীরা। ফলে নাট্যদলগুলোও লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে একদিক থেকে অন্যদিকে। তাদের করণীয় যে কী সেটাই তারা উপলব্ধি করতে পারছে না। তথাপিও বাংলাদেশের নাট্যচর্চা বেঁচে থাকবে সংগ্রামী নাট্যকর্মীদের পদচারণায়। প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে শাণিত হবে ইস্পাত ফলার মতো। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, সুবিধাবাদের মোহ কখনো আচ্ছন্ন করতে পারবে না সেসব মৃত্যুঞ্জয়ী নাট্যকর্মীদের। তাদের পল্লবিত পদযাত্রায় মুখরিত হবে বাংলাদেশের নাট্যচর্চা। তৈরি হবে নতুন নাট্যসড়ক। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের যে ধারা শুরু হয়েছিল বিষয়বৈচিত্র্যে, তা আজ হয়ে উঠেছে বেগবান ঋদ্ধ ও বিশ্বমনস্ক। বর্তমানে বাংলাদেশের নাটক দেশের গ-ি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অর্জন করে চলেছে।

সমাজের প্রান্তিক ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে নাটককে নিয়ে যাওয়ার কথাই বারবার উঠে এসেছে আমাদের নাট্যচর্চায়। নাটককে পেশাদারি ভিত্তিতে চালানোর প্রয়াসও হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাস্তবে কি আমরা নাটককে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে পেরেছি? নির্মম সত্যটি হলো- না পারি নি। নাটকের যা কিছু অগ্রগতি যা কিছু গুণগত পরিবর্তন তা নগর ও মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক। এক কথায় বলতে গেলে আমাদের থিয়েটার মধ্যবিত্তের থিয়েটার এবং এখনো তা জনগণের থিয়েটারে পরিণত হয় নি। সে লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।

তারপরও স্বপ্নহীন হতে চাই না। যুক্ত থাকতে চাই থিয়েটারশিল্পে। শতফুলে বিকশিত হবে এই নাট্যচর্চা। এই হোক আজকের অঙ্গীকার।

অভিজিৎ সেনগুপ্ত ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): সম্পাদক, ফ্রন্টলাইন থিয়েটার। সদস্য- নান্দীমুখ, চট্টগ্রাম।