Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

গত ২০ বছরে আমাদের থিয়েটার : প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চা; অর্জন ও কিছু প্রশ্ন

Written by সাইদুর রহমান লিপন.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

বাংলাদেশের নাটক ও থিয়েটারের জ্ঞান-তাত্ত্বিক চর্চা, বিকাশ ও বিস্তারের মহান ব্রত নিয়ে যে দু-একটি পত্রিকা মুদ্রণ, প্রকাশ ও প্রচারের দায়িত্বে রয়েছে অবিরাম, ‘থিয়েটারওয়ালা’ এদের অন্যতম। ‘থিয়েটারওয়ালা’ তার বর্তমান সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে অর্জন করছে দুই দশকের নিরবচ্ছিন্ন হার-না-মানা অভিজ্ঞতা। ‘থিয়েটারওয়ালা’কে অভিবাদন আর এই লেখাটি তার গর্বিত ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিবেদন করছি।- লেখক 

সংস্কৃতি ও লোকনাট্য

সমাজ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ক্লিফোর্ড গিয়ার্জ মনে করেন- Culture is simply the ensemble of stories we tell ourselves about ourselves. কিন্তু, কীভাবে ও কেনো ‘আমরা’ আমাদের গল্প/কথা বলি? এ প্রসঙ্গে সমাজবিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ শ্রদ্ধেয় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন- ‘আমাদের সংস্কৃতি হচ্ছে আমাদের মেরুদণ্ড, আমাদের দাঁড়াবার জায়গা। সংস্কৃতি সভ্যতার চাইতেও বড়। সভ্যতার পতন হয়, কিন্তু সংস্কৃতির পতন হলে মনে করতে হবে সেই জনগোষ্ঠী ধবংস হয়ে যাচ্ছে। সংস্কৃতির ওই মেরুদণ্ডকে, ওই পরিচয়কে, সৃষ্টিশীলতাকে সর্বোপরি সামাজিকতাকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। সেজন্য থিয়েটার আন্দোলন চাই। সেজন্য গান চাই, নতুন বিতর্ক চাই। [...] এ লড়াইটা কেবল দায়িত্বহীন আনন্দ সৃষ্টির জন্য নয়। এ লড়াই স্থানীয় লড়াই এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক লড়াইও বটে।’ তার মানে হচ্ছে ’সংস্কৃতি’ ব্যক্তিকে সমষ্টির সাথে দায়বদ্ধ করে, যুক্ত করে, সমষ্টির আচার, আচরণ, চর্যা, পরিচর্যায় সম্পৃক্ত করে, উদ্বুদ্ধ করে সমষ্টির সৃজনশীলতায়। ব্যাপ্তির হিসেবে ‘সংস্কৃতি’ যদি হয় সামগ্রিকতা, তবে ‘লোক-সংস্কৃতি’ হচ্ছে এই সামগ্রিকতার একটি অংশ। আবার লোক-সংস্কৃতির আঙ্গিনায় ‘লোকনাট্য’ হচ্ছে এমন একটি অনুষঙ্গ, যা সর্বদাই সংশ্লিষ্ট ‘জন’ বা ‘গোষ্ঠি’কে শৈল্পিক-মানবিক মূলবোধ, মত ও মনন প্রকাশের সৃজনশীলতায় উদ্বুদ্ধ করে। এরাই হচ্ছেন সংস্কৃতি-সংলগ্ন সেই সকল সৃজনশীল জনগোষ্ঠী যারা গীতে-কাব্যে-সুরে প্রতিবাদ করে, প্রতিরোধ করে, মৌলিক মানবিক মূল্যবোধের (ধর্মীয়, নৈতিক অথবা প্রথাগত সামাজিক) প্রাসঙ্গিকতা নির্ণয় করে। ফলে নাট্যকলা একটি জনগোষ্ঠীকে বিশেষ ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আচার, আচরণের ‘কাঠামোবদ্ধ উপস্থাপন’ এবং সমষ্টিগত সৃজন ও পরিবেশন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করে, আর এর মাধ্যমে কেবল বিনোদন আর ধর্ম পালন নয়, বরং এই নাট্যকলা সমালোচনা করে আবার প্রশংসাও করে, পুরস্কারের কথা বলে আবার শাস্তি বিধানও করে। এভাবেই লোকনাট্য এক নিরন্তর পরিবর্তনশীলতায় সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিকে নবায়ন করে।

প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও মূল্যবোধের লোকনাট্য

‘রামায়ণ’

সমসাময়িক জীবন-দর্শন ও মানবিক চাহিদার সাথে সমন্বিত করে যে সকল প্রাচীন শাস্ত্র, পুরাণ বা মহাকাব্য নাটলিপিতে (performance text) রূপান্তরিত হয়েছে ‘রামায়ণ’ তাদের অন্যতম। প্রারম্ভিক অবস্থায় ‘কথানাট্যে’র ধারায় এর উদ্ভব হলেও পরবর্তী সময়ে মিশ্র, নাটগীত ও সংলাপাত্মক ধারায় হয়েছে বিকশিত। রামায়ণ বৈদিক ধারার সাহিত্য হলেও অসংখ্য জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় এবং মানবিক চাহিদার খোরাক জোগাতে এবং স্থানীয় জনগণের সাংস্কৃতিক-দর্শন বিনির্মাণ ও বিকাশে এই কাব্যের জোরালো ভূমিকা আজও বর্তমান। বলা হয়ে থাকে যে, ‘রামায়ণ’ শতসহস্র বৎসরের বিরামহীন পরিবেশনায় বাংলার পল্লীগৃহে বিস্তার লাভ করে পরিপুষ্ট করেছে সাধারণের সামাজিক মূল্যবোধ ও মানস-সংস্কৃতি। প্রজাধর্ম রক্ষার্থে রাজা রামের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুখ-আনন্দ বিসর্জনের নির্লিপ্ত-নির্মম দৃষ্টান্ত যেভাবে আসরে আসরে ব্যাখ্যা করা হয়, তা তো বর্তমানের বৈষম্য আর শোষণমূলক সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং ভোগবাদী ক্ষমতাচর্চার বিপরীতে কেবল সমকালীনই নয়, বরং রাজা রামকে নিজেদের সামাজিক-আদর্শিক অবস্থান থেকে রূপায়ণের সূত্রে ‘রামায়ণ’ হয়ে ওঠে নিম্নবর্গ মানুষের নৈতিক ও আদর্শিক প্রতিবাদের সাঙ্গিতিক বা সুরেলা পরিভাষা।

‘শ্রীচৈতন্যদেবের রাধা-কৃষ্ণ আখ্যান’

বৈষ্ণবীয় ‘ভক্তিবাদ’ থেকে বিকশিত ‘কীর্তন’ (নামকীর্তন, লীলাকীর্তন, ঢপ কীর্তন, পদাবলী কীর্তন প্রভৃতি), ‘কৃষ্ণলীলা’, ‘কৃষ্ণযাত্রা’, ‘ঢপযাত্রা’, ‘অস্টকগান’, ‘ঘাটুগান’ প্রভৃতি কৃষ্ণবিষয়ক আখ্যান, যা বর্ণনাত্মক এবং নাটগীত ধারায় সমগ্র বাংলায় রাধা-কৃষ্ণের অদ্বৈত ভাব-দর্শন বিনির্মাণ, প্রচার ও প্রদর্শনে রয়েছে সক্রিয়। শ্রীচৈতন্যদেবের বৈষ্ণবীয় ‘ভক্তিবাদ’-এর প্রচার কেবল শত শত বছরের ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠিন অনুশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই ছিল তা নয় বরং বিপরীতক্রমে মুসলিম সূফী-ধর্মপ্রচারকের বিপুল বিজয় রথের চাকাকেও অনেকাংশে শ্লথ করে দিয়েছিল। ‘শ্রীচৈতন্য ও তাঁর অনুসারীগণ বৈষ্ণবীয় ভাবধারার মাধ্যমে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জাতীয় অখণ্ডতার এক অসাধারণ প্রেরণা সঞ্চারিত করেছিলেন। একই সাথে তাঁরা প্রমোদানুষ্ঠানকে ধর্মীয় প্রার্থনার সমান মর্যাদা ও গুরুত্বে অধিষ্ঠিত করে পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।’ ভক্তিবাদীদের উপাসনালয়ে তাই কেবল একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের নয় বরং ধর্মমত-পথ নির্বেশেষে সকলের ছিল সমানাধিকার, ফলশ্রুতিতে বাংলার প্রান্তিক সাধারণের মাঝে ‘চরম’ ভাবধারার বিরুদ্ধে রোপিত সম্প্রীতি-সহাবস্থানের বীজ ক্রমান্বয়ে এক বিশাল মহীরূহ হয়ে ওঠার সঞ্জীবনী শক্তি খুঁজে পেল। বৈষ্ণববাদের ‘কৃষ্ণ’ তাই কেবল মহাভারতের দেবতা না, বরং এই ‘কৃষ্ণ’- কালু, কানাই, কানা, কালা, শ্যামকালা কত রকম ভাব-নাম ধারণ করে হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে সকল লোককবির গীত, গদ্য, কাব্য, গাথা-কবিতার নায়ক/প্রেমিকরূপে পরমপুরুষ বা পরমভাবের প্রতীক হয়ে বাংলার লৌকিক, আধ্যাত্মিক ভাব বা সহজিয়া দর্শনের প্রচার ও প্রদর্শনের এক অপরিহার্য চরিত্র হয়ে উঠতে পেরেছিল।

‘মনসামঙ্গল’

সাপেকাটা লক্ষিন্দরকে নিয়ে উল্টো স্রোতে শুধুমাত্র ভেলায় করে দেবালয়ের উদ্দেশে ভেসে যাওযার অসম্ভব কাহিনিটি যখন গায়েনের ব্যাখ্যায় সংকট-সমস্যায় বিধ্বস্ত এক জীবনের বিপরীতে মানুষের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো জীবন-সংগ্রামে বা উল্টা-স্রোতে লড়াকু থাকার সমান্তরাল যুক্তিতে বিশ্লেষিত হয়, তখন ‘মনসামঙ্গল’ কেবলই একটি পৌরাণিক কাহিনির ফানুস মাত্র নয়, নিত্যকালের জীবন-ঘনিষ্ট আখ্যানও বটে। অপরদিকে, মনসামঙ্গলকাব্যের প্রবল শক্তির বিপরীতে নারীর প্রতিবাদী চরিত্রের উপস্থিতি মধ্যযুগতো বটেই আধুনিক যুগের কাব্যের ক্ষেত্রেও একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। সর্পদংশনে পুত্র লক্ষিন্দরের অকাল মৃত্যুতে রক্ষণশীল বনিক চান্দ সওদাগরের প্রবল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ‘গৃহনারী’/‘কুলবধু’- বেহুলার একাকী ঘর ছেড়ে বের হয়ে মৃত স্বামীকে জীবিত করে পুনরায় গৃহে প্রত্যাবর্তনের যে সাহসী গল্প রচিত হয়, সে তো যুগে যুগে নারীর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের গল্পকেই প্রতিনিধিত্ব করে।

‘পীর-পাঁচালী ও জঙ্গনামা’

মধ্যযুগে মুসলিমদের আগমন পরবর্তী শিল্প-সাহিত্যে মুসলিম বীর, পীর, দরবেশ ও ব্যক্তিত্বদের কাহিনী নিয়ে রচিত অসংখ্য বর্ণনাধর্মী আখ্যান বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। এই সকল আখ্যান ‘কথানাট্যের’ ধারায় বিকশিত হলেও পরবর্তী সময়ে বর্ণনাত্মক, মিশ্র, সংলাপাত্মকসহ নানান রীতি-পদ্ধতিতে ‘গাজী পীর’, ‘মাদার পীর’, ‘সত্য পীর’, ‘খোয়াজ খিজির’ প্রভৃতি পীর-বিষয়ক আখ্যান দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করে এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পীর-পাঁচালীর ধারায় পরিচিতি লাভ করে। বিশেষ আধ্যাত্মিক সুফী, পীর বা সাধকগণ এই শ্রেণির পাঁচালীতে ভক্তকুলের বালা-মুসিবদ, মুশকিল আসানে, অন্যায় অবিচারের প্রতিবাদ, প্রতিরোধে ‘নায়ক’ হিসেবে আবির্ভূত হন। এমন কথাও বলা হয়ে থাকে যে, ‘পীরপাঁচালী’ মূলত অসম্প্রদায়িক মনের সৃষ্টি। পীরের ‘সেবা’ ‘হাজোত-মানোত’ প্রভৃতি কৃত্যে হিন্দু-মুসলিম সকলেরই সমান অধিকার। এ-শ্রেণীর পাঁচালীতে হিন্দু-মুসলিম পুরাণের একটি সমন্বিত রূপ আবিষ্কারের প্রয়াস’ লক্ষ্য করেছেন অনেকে।
 
অপরদিকে ‘বৈঠকী’ রীতির পরিবেশনার আরেকটি জনপ্রিয় ধারা- ‘জঙ্গনামা’ নামে বাংলায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। ‘জঙ্গনামা’ অনুষ্ঠানটিও কথানাট্য রীতির সংস্পর্শে এসে গ্রহণ-বর্জন এবং আত্তীকরণের মধ্য দিয়ে ‘জারি’ (শোকসংগীত, গাথা জাতীয় রচনা বলেও অভিহিত করেছেন কেউ কেউ) নামে সমগ্র বাংলায় জনপ্রিয়তা লাভ করে। মূলত, মুসলিম কবিগণ সমাজের অসহায়তা, অবিশ্বাস, হিংসা ও বিশ্বাস-ঘাতকতাকে কারবালা-যুদ্ধের পটভূমিতে নতুন অর্থে আলোকিত করেন। শুধু তাই নয়, ‘জারিগান’ যেন সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনে পরাজিত জন-মনের প্রতিরোধ-প্রতিবাদেরও সংগীত হয়ে ওঠে। সম্ভবত একারণেই জারিগান একক সংগীত নয়, দ্বৈত সংগীত নয়, এ হচ্ছে গোষ্ঠীবদ্ধ যৌথ সংগীত যা কখনো কখনো দু’দলের পারস্পরিক-বিরোধের গীতি-আখ্যানও বটে। জারিগানের আসরের বিষাদময় সুরের আহাজারি আর উদ্দাম নৃত্যের মাতম যেন শোষকের বিরূদ্ধে শোষিতজনদের চিত্তকে ইমাম হাসান-হোসেনের তেজস্বিতা ও নির্ভীকতার দ্বারা বারবার উদ্বুদ্ধ করে। মেরী ফ্রান্সিস ডানহাম বাংলায় জারিগানের গভীর প্রভাব ও ব্যাপকতায় এভাবেই বিস্মিত হয়েছেন- [...] Jarigan performances entertained and educated rural audiences in the tens of thousands.

কৌতুক, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও হাস্যরসের নাট্য

বাংলার নাট্যকলায় ‘গম্ভীরা’, ‘আলকাপ’, ‘সঙ’, ‘বিচারগান’ প্রভৃতি বিশেষ কিছু পরিবেশনারীতি রয়েছে যা প্রচলিত সমাজ কাঠামোর অবিচার, অসঙ্গতি, বৈষম্যকে বিবেচনায় এনে সমষ্টিগত শিল্প-সৃজনশীলতায় বা পরিবেশনামূলক শিল্প-কাঠামোয় হাস্য, ব্যাঙ্গ, বিদ্রপ আর কৌতুকের সুর-ছন্দ, কাব্য-আখ্যানে পুনরায় ঐ সমাজেই প্রদর্শন করে- সমালোচনা করতে, চিন্তা করতে বা আবার করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে, সর্বপরি আমন্ত্রণ জানায় পরিশুদ্ধ হতে।

সুতরাং, লোকনাট্য কেবল ধর্মের দায় বা প্রয়োজন মেটায় তা নয়, বরং ধর্ম-অতিরিক্ত আরও বেশি কিছু করে, যা স্পষ্টতই গোষ্ঠীবদ্ধ একদল মানুষের কথা বলে, যারা সম্মিলিত সৃজন-প্রক্রিয়ায় নিজেদেরকে আবদ্ধ করে, নিজেদের সম্পর্কে নিজেদের গল্প-কথা নিজেদের মতো করে বলে- প্রতিবাদ করে, প্রতিরোধ করে, আবার ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের মানদ-ও নির্ণয় করে। আর এভাবেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের বিচারে লোক-নাট্যকলা গোষ্ঠীবদ্ধ সাধারণের জীবনচর্যার একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। লোকনাট্যের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের এই সার্বিকতার বিপরীতে শহরায়তনিক প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চার সার্বিকতা ও  অর্জনসমূহের দিকে তাকানো যেতে পারে।

প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চা

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের ‘গ্রুপ থিয়েটার’ বস্তুত ৪০-এর দশকের কলকাতার ‘আদর্শ’ভিত্তিক ‘অ-পেশাদার’ গ্রুপ থিয়েটারচর্চার সাংগঠনিক কাঠামোটিকে গ্রহণ করে এবং এই চর্চায় প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভরতার আতুরঘর হিসেবে গ্রহণ করে বৃটিশ কায়দায় প্রতিষ্ঠিত, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত নগরকেন্দ্রের ‘প্রসেনিয়াম’ নাট্যমঞ্চকে। বস্তুত ‘আদর্শ’ভিত্তিক ‘অ-পেশাদার’ গ্রুপ থিয়েটারচর্চার সাংগঠনিক কাঠামোকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের শহরায়তনিক নাট্যচর্চায় বিকশিত হয় বাস্তববাদী নাট্যসহ অন্যান্য নাট্য আঙ্গিক, রীতি ও পদ্ধতি, যেমন- বাস্তববাদ-উত্তর নাট্যরীতি, সংস্কৃত নাট্যরীতি, লোকনাট্যরীতি, পাশ্চাত্য ও লোকজ মিশ্রনাট্য, গীতিনাট্য প্রভৃতি। এক্ষেত্রে প্রসেনিয়াম মঞ্চগৃহই হচ্ছে একমাত্র আশ্রয়স্থল, যার অভিনয় আয়তনকে নানা মাত্রায় ব্যবহার করে বিকশিত হয় বৈচিত্র্যের সকল নাট্যচর্চা।
    
প্রসেনিয়াম নাট্যগৃহকে আশ্রয় করে কার্যত আশির দশকের শুরু থেকে লোকজ বিষয় ও আঙ্গিকের প্রয়োগ এবং প্রদর্শনের মাধ্যমে ভূমি-সংস্কৃতি-সংলগ্ন নতুন নাট্যভাষা নির্মাণের প্রচলন শুরু হয়। এই উদ্যোগ স্পষ্টতই বাস্তববাদী নাট্যরীতির বিপরীতে ভিন্ন নাট্য-চিন্তা ও নাট্যভাষার সূচনা করে। বলা যায়, এই সময় থেকেই বাংলাদেশে প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্য চর্চার ধারাটি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়, যার পরিণত প্রয়োগ ঘটে নব্বইয়ের দশক জুড়ে এবং তৎপরবর্তী ২০/২২ বছরে এটি একটি স্বতন্ত্র ধারায় প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে বলে অনেকেরই রয়েছে দৃঢ় অভিমত। জাতীয় নাট্যশালা প্রতিষ্ঠার দাবী উত্থাপিত হওয়া এবং এ সূত্রে নাট্যচর্চায় বাংলার সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং চেতনার প্রতিফলন ঘটানোর আকাক্সক্ষাও তীব্র হয় এই সময়ে। আর এক্ষেত্রে নাট্যকলা-একাডেমিক একদল তরুণ নাট্যকর্মীদের সাথে অপর একদল তরুণ গ্রুপ থিয়েটার কর্মীর দেশজ-সংস্কৃতি অনুগামী নাট্য-নির্মাণ ভাবনা ও তাঁদের নানাবিধ উদ্যোগ, আকাক্সক্ষা প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চাকে নগরায়তনিক সাংস্কৃতিক পরিম-লে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই নতুন নাট্যভাষা নগরায়তনিক সামগ্রিক নাট্যচর্চায় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তথা অনিবার্য কিছু পরিবর্তনের সূচনা করে।

পরিবর্তন, অর্জন ও কিছু প্রশ্ন

শহরায়তনিক নাট্যচর্চার ধারাবাহিকতায় আশির দশক থেকে শুরু হওয়া প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চা যে সকল ক্ষেত্রে পরিবর্তনের অনুঘটক হয়ে উঠেছিল বলে মনে হয়, এসবের মধ্যে ক. লোকনাট্য চর্চা ও প্রয়োগের তাত্ত্বিক নির্মাণ, খ. নাট্য রচনা (‘সু-বিন্যস্ত ত্রিভুজ নাট্য কাঠামোর’ বিপরীতে আখ্যানের বর্ণনাত্মক প্লট কাঠামো), গ. প্রয়োগ ও পরিবেশনায় লোক-উপাদানের চর্চা, এবং ঘ. অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

ক. লোকনাট্যচর্চায় তাত্ত্বিক নির্মিতি

পাশ্চাত্য নাট্যচিন্তা বা দর্শনের সমান্তরালে দেশজ নাট্যকলা ও চিন্তার প্রতি অনুবর্তী থেকে নাটক রচনা, প্রয়োগ ও পরিবেশন বিষয়ে উচ্চারিত হয় বেশকিছু তত্ত্বকথা বা তাত্ত্বিক নির্মিতি। ‘জাতীয় নাট্য আঙ্গিক’, ‘শেকড় সন্ধানী নাট্য’, ‘ঐতিহ্যবাহী নাট্য’, ‘দেশজ নাট্য’, ‘বাঙলা নাট্য আঙ্গিক’, ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী নাট্য’, ‘পাঁচালী নাট্য’ ‘বর্ণনাত্মকরীতির নাট্য’ প্রভৃতি নানাবিধ বিশেষণ, বয়ান ও বিশ্লেষণের যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনায় প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চাকে একটি মজবুত ও গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়। এই সকল তত্ত্ব কথার মাধ্যমে কেউ কেউ আবার সংস্কৃতি অনুগামী শেকড়ের সন্ধানে এমন নাট্য-আঙ্গিক নির্মাণের কথা বলেছেন, যা নিদেনপক্ষে বহুল চর্চিত দ্বন্দ্বভিত্তিক বাস্তববাদী নাট্যরীতিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, অথবা ‘দ্বৈতাদ্বৈতের’ সম্ভাবনায় ‘অভিনেতা’র ধারণাকে বহুমুখি দৈহিক ও মনো-দৈহিক সক্ষমতায় সমৃদ্ধ করতে পারে, অথবা বাহুল্য দৃশ্যমায়ার বিপরীতে ভাবে-রসে-কল্পনায় চিত্তের খোরাক মেটাতে পারে। তাত্ত্বিক বয়ান ও বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, লোকনাট্য হচ্ছে একটি সামাজিক ও সমষ্টির অংশগ্রহণমূলক অনুষঙ্গ, যেখানে গায়েন, কুশীলবগণ অত্যন্ত নমনীয় একটি পরিবেশনা-কাঠামোর অধীনে প্রদত্ত আখ্যান প্রদর্শনের স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। সহজে ব্যপারটা এরকম যে, লোক-আখ্যানের পালা/পর্বসমূহ আসর থেকে আসরে পরম্পরার ধারাবাহিকতায় গায়েন/কুশীলবের সৃজনী-অনুশাসনে নির্মিত, নব-নির্মিতি, বিনির্মিত এবং প্রদর্শিত হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বাধীনতা প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চায় কী মাত্রায় বা কতটুকু ভোগ করা সম্ভব, যেখানে সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি অদ্যাবধি ‘টেক্সট’-এর অনুশাসনে নিয়ন্ত্রিত, এবং যে প্রক্রিয়া নির্দেশকের ‘একক’ নির্মাণদক্ষতা ও সক্ষমতার অধীন হয়ে থাকছে? অথবা যে নমনীয় নির্মাণ প্রক্রিয়ায় লোকনাট্যের কুশীলবগণ বহুমাত্রিক দক্ষতায় পূর্ণতা লাভ করে, সেখানে প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যের নির্মাণ প্রক্রিয়ায় কুশীলবগণ কী কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বহুমাত্রিক অভিনয় দক্ষতা বা সক্ষমতায় সমৃদ্ধ হতে পারছে? সে বিষয়ে প্রশ্নের অবকাশ আছে বৈকি। তথাপিও এই সকল তাত্ত্বিক বয়ানের ভিত্তিতেই শেষাবধি শহর নাট্যের প্রচলিত ধারায় প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চার সংযুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছে।

খ. নাট্যরচনায় ‘সু-বিন্যস্ত ত্রিভুজ নাট্যকাঠামোর’ বিপরীতে আখ্যানের বর্ণনাত্মক বিন্যাস কাঠামো

আখ্যান বা ঘটনার বর্ণনাত্মক বিন্যাসে মৌলিক নাট্যের রচনা প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্য চর্চার ধারায় একটি বিশেষ অর্জন একথা বলতেই হবে। এই রীতির নাট্য-রচনার ক্ষেত্রে একদিকে যেমন আখ্যান, উপাখ্যান, পুরাণ, মহাকাব্যের চরিত্র, ঘটনা অথবা আখ্যান-বস্তুকে সমকালীন যুক্তি, চিন্তা ও দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে, যেমন- প্রাচ্য, হায় বাংলা হায় বেহুলা, কৈবর্ত বিদ্রোহ, ন-নৈরামণি, হিড়িম্বা, ডালিমকুমার, নিশিমন বিসর্জন ইত্যাদি, তেমনি সমকালীন বা ঐতিহাসিক নানান ঘটনাকেও বর্ণনাত্মক বিন্যাসে নাট্যের প্লট করা হয়েছে, যেমন- বনপাংশুল, নিমজ্জন, ‘হরগজ, ‘চাকা’, মাতব্রিং, গহনযাত্রা, অমানিষা, রুধিররঙ্গিনী, অহম তমসা, শ্রাবণ ট্রাজেডি, নীলাখ্যান, মুল্লুক, ঊর্ণাজাল, ‘শুরু করি ভূমির নামে’ ইত্যাদি। দু’একটি ভিন্নতা ব্যতীত এই ধারার প্রায় সকল নাটলিপি রচনার মুখ্য উপাদান ‘গদ্য’ বা গদ্যের শৈলীবদ্ধ বিন্যাসেই ঘটনাসমূহ কাঠামোবদ্ধ হয় এবং দ্বন্দ্বভিত্তিক ত্রিভুজ নাট্যকাঠামোকে অস্বীকার করে বর্ণনাত্মক নাট্য কাঠামোকে গ্রহণ করা হয়। ফলে চরিত্রের গঠন ও বিকাশে দ্বন্দ্বের সমান্তরালে ভাব-রস প্রাধান্য লাভ করে, অথবা ঘটনার ক্রমবিন্যাসে দৃশ্যকল্প, চিত্রকল্প, উপমা, প্রতীক, সংকেত প্রভৃতি বর্ণনাত্মক উপাদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে রচনা-শৈলীতে ‘গদ্য’ রীতি ব্যবহৃত হওয়ায় কার্যত তা একটি অ-নমনীয় এবং স্থির কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়। ফলে কুশীলবদের শেষাবধি একটি ‘টেক্সট’ বা আবদ্ধ নাট্য-কাঠামোর অনুশাসনকেই মেনে নিতে হয়। যা সম্পূর্ণতই লোকনাট্যের মৌল-প্রবণতার বিপরীত। তাছাড়া, লোকনাট্য আখ্যানের চরিত্র বা ঘটনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে গায়েন/কুশীলব যে সৃজনী-দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রদর্শনে স্বাধীনতা ভোগ করেন, তা প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চায় বলতে গেলে সম্পূর্ণতই অনুপস্থিত। তথাপিও মৌলিক নাট্যরচনার এই ধারাটি বহুল প্রচলিত বাস্তববাদী নাট্যচর্চার বিপরীতে ভিন্ন আঙ্গিকের ও বৈচিত্র্যের শিল্প-স্বাদ প্রদান করেছে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

 গ. প্রয়োগ ও পরিবেশনায় লোকনাট্যের চর্চা

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, শহরায়তনিক প্রেক্ষিতে লোকনাট্যচর্চার সূচনা আশির দশক থেকে শুরু হলেও এর পরিণত বিকাশ ঘটে নব্বইয়ের দশকে। এই অভিযাত্রায় সংযুক্ত হওয়া কিছু সংখ্যক নাট্যদল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নাট্যনির্দেশক ও গবেষকের সৃজনী প্রয়াসে নির্মিত কিছু সফল প্রযোজনা অতিদ্রুতই প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চার প্রয়োগ ও পরিবেশন ভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক এবং গ্রুপ থিয়েটার পরিমণ্ডলে বিকল্প নাট্যরীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। কার্যত লোকনাট্যের নির্মাণ ও পরিবেশন প্রক্রিয়া থেকে আহরিত নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি ও কৌশল আত্তীকরণ এবং প্রয়োগসূত্রেই এর প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত হয়। ফলে প্রয়োগ ও পরিবেশনায় এমন কিছু রীতি ও কৌশলের চর্চা করা হয়, যা স্পষ্টতই প্রচলিত প্রসেনিয়ামকেন্দ্রিক চর্চার বিপরীতে ভিন্ন নাট্যভাষা ও বৈশিষ্ট্যকে অন্তর্গত করে, যেমন- প্রসেনিয়ামের আলো-অন্ধকারে বিভাজিত দর্শক ও অভিনেতার পরোক্ষ ও নিস্ক্রিয় সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জ করে নাট্য-আয়তনের একই তলে এবং একই আলোয় দর্শক অভিনেতার প্রত্যক্ষ সংযোগ-সম্পর্কে নাট্যক্রিয়া পরিবেশন করা; দ্বন্দ্বভিত্তিক নাট্য-কাঠামোর বিপরীতে ভাব, রস ও যুক্তির সমন্বয়ে আখ্যানের বর্ণনাত্মক উপস্থাপন করা; পরিবেশন প্রক্রিয়ায় সমন্বিত যন্ত্রসঙ্গীত বা কনসার্ট, বন্দনা, এবং আখ্যান অন্ত বা ফলশ্রুতি অনুসরণ করা; চরিত্র অনুগামী সংলাপাত্মক অভিনয়ের বিপরীতে নৃত্য, গীত, বর্ণনা, সংলাপ ও বাদ্যের আশ্রয়ে অভিনেতার একাধিক বা বহুমাত্রিক বা ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ অভিনয়ের ধারণাকে নিশ্চিত করা; মঞ্চসজ্জা ও আলোর মায়ায় দৃশ্যকল্প নির্মাণের বিকল্প হিসেবে শূন্য আয়তনে শরীরী-সাঙ্গীতিক ভাষায় দৃশ্যকল্প, রূপকল্প নির্মাণ করা প্রভৃতি। লোকনাট্য থেকে এসকল রীতি, পদ্ধতি ও কৌশল আত্তীকরণ কার্যত এমন এক নাট্যভাষা বিনির্মাণের কথা বলে যা একই সাথে ভূমি-সংস্কৃতি সংলগ্ন এবং সমকালীন।

ঘ. অবকাঠামোগত উন্নয়ন

স্বাধীনতা পরবর্তী শহরায়তনিক প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চার বিকাশে ঢাকাস্থ মহিলা সমিতি মিলনায়তনটি (সংস্কারপূর্ব মঞ্চ) ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল এ কথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। কেবল প্রসেনিয়াম মঞ্চকেন্দ্রিক বাস্তববাদী নাটকের মঞ্চায়ন নয়, অন্যান্য রীতি, আঙ্গিকের নাটক প্রদর্শনের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং কার্যকর একটি নাট্যমঞ্চ হয়ে উঠেছিল এই মিলনায়তনটি। প্রথম দিকে ‘বিষাদ সিন্ধু’, ‘চাকা’ এবং পরবর্তী সময়ে গত ২০ বছরে ‘বনপাংশুল’, ‘প্রাচ্য’, ‘আরজ চরিতামৃত’, ‘ন-নৈরামণি’সহ আরও বেশকিছু লোক ও নিরীক্ষাধর্মী প্রযোজনায় এই মিলনায়তনের দর্শক আসনের সমতল ও মঞ্চের অপরাপর গঠন-কাঠামোর বহুমাত্রিক ও কৌশলপূর্ণ ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি বেশকিছু মিউজিক্যাল থিয়েটারের জনপ্রিয় প্রদর্শনী (এস এম সোলায়মান নির্দেশিত নাটকসমূহ) একদিকে যেমন প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চার ধারণাকে সুসংহত করে, অপরদিকে লোকজ আঙ্গিক বা নিরীক্ষাধর্মী নাট্য-উপযোগী মঞ্চ নির্মাণের দাবিকেও ক্রমান্বয়ে জোরালো ও যৌক্তিক করে তোলে। বস্তুত, এইসকল নাট্যপ্রযোজনা নব্বইয়ের দশক থেকে ক্রমান্বয়ে জোরালো হয়ে ওঠা জাতীয় নাট্যশালা নির্মাণ দাবির সাথে বাংলার সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং চেতনার প্রতিফলন ঘটানোর আকাক্সক্ষাকে আরও তীব্র করে তোলে। বলা যায়, এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে শতাব্দির শুরুতে নির্মিত হয় জাতীয় নাট্যশালা, পরীক্ষণ থিয়েটার হল এবং স্টুডিও থিয়েটার হল, যা প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চার অবকাঠামোগত এবং আধুনিক কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে। অবকাঠামোগত এই সকল উন্নয়নের সমান্তরালে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও লোকজ আঙ্গিক, উপাদানের চর্চা-উপযোগী নাট্যায়তন নির্মিত হয়। ফলে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও চর্চাসূত্রে প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্য ক্রমান্বয়ে একটি স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রীতি হিসেবে প্রয়োগ ও পরিবেশনের ‘বিষয়’ হয়ে উঠতে সক্ষম হয়।
     
প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যের তাত্ত্বিক নির্মিতি, রচনারীতি, প্রয়োগ ও প্রদর্শন শহরায়তনের সামগ্রিক নাট্যচিন্তা ও চর্চায় বেশকিছু পরিবর্তনকে তরান্বিত করেছিল তাতে সন্দেহ নাই। যদিও এর বিস্তার অদ্যাবধি নির্দিষ্ট কয়েকটি দল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত চর্চাতেই আবদ্ধ। তথাপিও নির্দিষ্ট কিছু দল ও নাট্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরবচ্ছিন্ন চর্চার কারণে প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্য চর্চা বর্তমানে বৈশিষ্ট্য ম-িত একটি স্বকীয় ধারা হিসেবে বিকশিত হতে পেরেছে। এইক্ষেত্রে যে সকল বৈশিষ্ট্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেগুলোকে তিনটি প্রবণতায় চিহ্নিত করা যেতে পারে, যেমন- এক. পাশ্চাত্য ও লোকজ-মিশ্র নাট্যচর্চা। এই ধরনের প্রযোজনায় আখ্যানবস্তু ও নাট্য-নির্মাণে লোক-উপাদান- বর্ণনা ও সংলাপ, কাব্য, গীত, নৃত্যের ব্যবহার করা হলেও, আখ্যানের প্লট বা বিন্যাসে পাশ্চাত্যের দ্বন্দ্বভিত্তিক নাট্যের সাথে মেলবন্ধনের চেষ্টা করা হয়ে থাকে। রচনারীতিতে গদ্য ও কাব্যের সংলাপাত্মক উপাদান মুখ্য হলেও গদ্য, কাব্য, গীতযুক্ত বর্ণনাত্মক উপাদানও এক্ষেত্রে আখ্যানের অগ্রগতি ও বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুই. নাট্যকার/নির্দেশক/ডিজইনারের অভিজ্ঞতা, সৃজনীকল্পনা ও ধারণাপ্রসূত লোকনাট্যচর্চা। এই ধরনের নাট্য-প্রযোজনায় লোকনাট্য বিষয়ে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতার বিপরীতে ব্যাক্তির লোক-কল্পনা, ধারণা ও সৃজনী দক্ষতার ওপর নির্ভর করাতেই সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়। লোকনাট্য উপাদানের প্রয়োগ এক্ষেত্রে বাহ্যিক অলংকার মাত্র। অর্থাৎ নাট্য-নির্মাণে আখ্যান-বর্ণনা, নৃত্য, দেহ-বিন্যাস অথবা গীত-প্রয়োগের বিষয়টি কার্যত এক বা একাধিক নির্দেশক, ডিজাইনারের লোকধর্মী সৃজনী দক্ষতার ওপর নির্ভশীল হয়ে পড়ে। ফলে, এই ধরনের নাট্য প্রকারান্তরে একপ্রকার ইনভেন্টেড ফোক বা উদ্ভাবিত লোকনাট্যচর্চায় রূপান্তরিত হয়। তদুপরি এর বর্ণনাত্মক গঠন-কাঠামোতেও দ্বন্দ্বভিত্তিক নাট্যের সমন্বয়-ভাবনা সক্রিয় থাকে। এবং তিন. লোকনাট্যের উপাদান, রীতি, পদ্ধতির সাথে প্রত্যক্ষ যোগ-সংযোগ, প্রয়োগ ও প্রদর্শন-নির্ভর নাট্যচর্চা। অর্থাৎ পরিবেশিত নাট্যের বিষয় ও আঙ্গিকে লোকজ নাট্য-উপাদান, রীতি, পদ্ধতির প্রত্যক্ষ যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
 
তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যের চর্চা, প্রয়োগ, প্রদর্শন ও বিস্তারের গতি-বৈচিত্র্য যেন অনেকটাই নিস্তেজ ও সীমিত গণ্ডিবদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে মনে হয়। এই ক্ষেত্রে বর্ণনাত্মক নাট্য রচনায় নাট্যকারের সীমিত উপস্থিতি; নৃত্য, গীত, বাদ্য, বর্ণনা ও চরিত্রাভিনয়ে বহুমাত্রিক অভিনেতা তৈরি না হওয়া বা গ্রুপ থিয়েটার চর্চায় যুক্ত না হওয়ার প্রবণতা; দলগত (অর্থনৈতিক বা সাংগঠনিক) সক্ষমতার অভাব; এবং এই ধরনের প্রযোজনা নির্মাণে কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা প্রভৃতি নানাবিধ কারণেই সম্ভবত গ্রুপ থিয়েটার পর্যায়ে প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চার বিস্তার গণ্ডিবদ্ধ হয়ে থাকছে। অধিকন্তু প্রাতিষ্ঠানিক অথবা গ্রুপ থিয়েটার উভয় ক্ষেত্রে বর্ণনাত্মক উপাদানের প্রয়োগ ও প্রদর্শন বিষয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রয়েছে একঘেঁয়ে ও নিষ্প্রাণ উপস্থাপনার অভিযোগ। তাছাড়া আখ্যানবস্তুর সমকালীনতা, দর্শক ও অভিনেতার সম্পর্ক, সামাজিক গুরুত্ব, পরিবেশন প্রক্রিয়া প্রভৃতি বিষয়ে রয়েছে অমীমাংসিত বেশকিছু প্রশ্ন। সম্ভবত লোকনাট্য বিষয়ক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং নির্মিত তত্ত্বের সাথে প্রায়োগিক যোগসূত্রের জটিল সমীকরণই এই সকল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যেমন-

এক. শহরায়তনিক সাংস্কৃতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যে রচিত/সংগৃহীত/অনূদিত বর্ণনাত্মক নাট্য-আখ্যান কি কেবলই ‘ঐতিহ্যের’ সুরক্ষায় শিল্প বিনির্মাণের উপায় বা মাধ্যম হিসেবে চর্চিত হতে থাকবে? দুই. লোকনাট্যের নিরাভরণ ও সাদামাটা নাট্য-আয়তন যেখানে সামষ্টিক সৃজনশীলতায় বহুমাত্রিক দক্ষ ও পেশাদার কুশীলব তৈরির পরম্পরায় ক্রিয়াশীল থাকে, সেখানে প্রেক্ষাগৃহ নির্ভর নাট্য-আয়তনে বহুমাত্রিক অভিনেতা তৈরির কার্যকর পদ্ধতিগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে কি? তিন. লোকনাট্যের বর্ণনাত্মক অভিনয় যেখানে আখ্যানের ভাব ও রস নিষ্পত্তিতে; চরিত্রের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশে অথবা আখ্যানবস্তুর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও বিনির্মাণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, সেখানে আমাদের আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ কী ধরনের বর্ণনাত্মক অভিনয় বা বর্ণনা ধারণে সক্ষম অথবা দর্শক কোন ধরনের বর্ণনা গ্রহণে প্রস্তুত, তা নির্ণয়ে সক্ষম হয়েছে কি? চার. কেবল অংক ও দৃশ্য বিভাজনে দ্বন্দ্বভিত্তিক সুসংগঠিত নাট্যকাঠামোই কি একমাত্র উপায় যে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে ব্যাক্তি ও সমাজের জটিল ও বহুমাত্রিক সম্পর্ককে ধারণ করতে পারে, লোকনাট্যের সহজ, নমনীয় ও চক্রাকার চলন-ছন্দের নাট্য-কাঠামো কি এই জটিল সম্পর্ককে ধারণ করতে সক্ষম নয়?
 
উচ্চারিত প্রশ্নসমূহ নাট্যচর্চার সামগ্রিক পরিমণ্ডলে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কেননা, উত্থাপিত এইসকল প্রশ্নই পারে প্রেক্ষাগৃহ-নির্ভর লোকনাট্যচর্চায় সাম্প্রতিককালের স্থবিরতার মূলের অনুসন্ধান করতে; পুনঃমূল্যায়ণ করতে পারে বিরাজমান চর্চার সামগ্রিক পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াকে; দিতে পারে নতুন পথের দিশা যা একাধারে সামষ্টিক ও সমকালীন।    

ড. সাইদুর রহমান (লিপন) ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): শিক্ষক, নির্দেশক ও গবেষক