Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

শওকতভাই-এর কথা

Written by আনু মুহাম্মদ.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

কথাশিল্পী ও শিক্ষক শওকত আলী বা আমাদের শওকতভাই-এর সঙ্গে দেখা হবার অনেক আগেই তাঁর লেখালেখির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। সে পরিচয় ছিল একজন শক্তিশালী লেখকের সৃষ্টির সাথে যোগাযোগের আনন্দ ঘেরা। শওকতভাই-এর লেখা পড়ার সুযোগ হয় প্রথম সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য়। সম্ভবত প্রথম দেখাও হয় সেখানেই।

১৯৭৩ থেকে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র সাথে আমার সম্পর্ক। ‘বিচিত্রা’ তখন দিনে দিনে রাজনীতি অর্থনীতি শিল্প সাহিত্য জগতে একটি প্রবল দাপট নিয়ে হাজির হচ্ছিল। শাহাদৎ চৌধুরীর নেতৃত্বে এই পত্রিকা ক্রমে বহু তরুণ প্রবীণ লেখকের মঞ্চ হয়ে দাঁড়ায়, শুধু লেখালেখি নয় আড্ডাতেও। ‘বিচিত্রা’য় এমনিতে গল্প বা উপন্যাস প্রকাশের কোনো নিয়ম ছিল না। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতাগুলোই তখন ছিল লেখকদের একমাত্র ভরসা। সেখানে গল্প ছাড়াও মাঝেমধ্যে ধারাবাহিক উপন্যাস প্রকাশিত হতো। দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা তখন ছিল অনেক কম, তার ওপর সাহিত্য পাতা আর কতটা জায়গা দিতে পারতো! তাই সৃজনশীল লেখকদের প্রস্তুতির তুলনায় প্রকাশের সুযোগ ছিল খুব সীমিত। কলকাতায় ‘দেশ’ ও ‘আনন্দবাজার’-এর ‘পূজা সংখ্যা’ যেভাবে অনেক নতুন উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশের নিয়মিত একটি ক্ষেত্র ছিল বাংলাদেশে সেরকম কোনো পত্রিকা ছিল না। এক পর্যায়ে, সম্ভবত সত্তর দশকের মাঝামাঝি, ‘বিচিত্রা’ বাংলাদেশে প্রথম ‘ঈদ সংখ্যা’ চালু করে, যেখানে এখানকার লেখকদের গল্প উপন্যাস প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। একসাথে এক মলাটের মধ্যে সীমিত দামে এতগুলো ভালো গল্প ও উপন্যাস পাওয়া পাঠকদের জন্য তখন ছিল একটি বড় প্রাপ্তি।

স্বাধীনতা-উত্তর প্রারম্ভকালের নতুন উদ্দীপনা/স্বপ্ন/প্রত্যাশাকালে সৃজনশীলতার জগতেও শক্তিশালী পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু প্রকাশনা জগতের ক্ষুদ্র সীমা, এ বিষয়ে যথাযথ পরিকল্পনা বা উদ্যোগহীনতার কারণে লেখা প্রকাশের সুযোগ সম্প্রসারিত হচ্ছিল না, অনেকেই নিরুৎসাহিত হচ্ছিলেন। ‘বিচিত্রা ঈদ সংখ্যা’ প্রকাশনা শুরু হবার পর বছর বছর নতুন নতুন উপন্যাস প্রকাশের সহজ রাস্তা তৈরি হয়। পাঠকদের জন্যও অনেক কম পয়সায় একসাথে নতুন অনেক গল্প ও উপন্যাস পড়ার সুযোগ আসে।

এই ঈদ সংখ্যাগুলোতেই শওকতভাই-এর একাধিক উপন্যাস ও গল্প প্রকাশিত হয়। শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, রাজিয়া খান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, রিজিয়া রহমানসহ আরও অনেকের গল্প/উপন্যাস আমি প্রথম বিচিত্রা ঈদ সংখ্যাতেই পড়ি। আরও বহু পাঠকের জন্যই এই একই পরিস্থিতি ছিল। বই কিনে পড়ার মতো অবস্থা তখন আরও কম ছিল।

৮০ দশকে আরও সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। ঈদ সংখ্যার প্রতি পাঠকের আগ্রহ বুঝে একে একে অনেকেই ঈদ সংখ্যা বের করবারও উদ্যোগ গ্রহণ করে। এখন প্রতি বছর ঈদসহ নানা উপলক্ষ্য ধরে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। লেখকদের ‘অপ্রকাশের ভার’ এখন কিছু হয়তো কমেছে।
 
শওকতভাই-এর বই আকারে উপন্যাস প্রথম পড়বার সুযোগ হয় ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’। ভাষা, চরিত্র বিন্যাস, ইতিহাসের কালকে আয়ত্ত করা, বলার ঢঙ সবকিছুতে মোহিত হয়েছিলাম। অনেককে তখন বলেছি বইটি পড়তে। তখনও শওকতভাই-এর সঙ্গে আমার আলাপ হয় নি।
 
পরে জেনেছি, শওকত আলীর জীবন খুব মসৃণ ছিল না। এর মধ্যে জীবনে সবচেয়ে বড় তোলপাড় সৃষ্টির ঘটনা ছিল ভারতভাগ। জন্ম বর্তমান ভারতের অন্তর্ভুক্ত দিনাজপুরে। বাবা ছিলেন ডাক্তার, তবে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। মা ছিলেন শিক্ষক। স্কুলে পড়াকালেই মা মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্যে ভারতভাগও হয়ে যায়। এই ভাগের আগে পরে দুই পারে মানুষের মহাবিপর্যয়ের তিনি সাক্ষী এবং শিকারও বটে।  সে সময় ঐ অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে তাঁদের টিকে থাকা সম্ভব না হওয়ায় শওকত আলীর পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। প্রথমদিকে কিছু সময় সাংবাদিকতা করেছেন পরে শিক্ষকতাতেই স্থিত হয়েছেন। এটাই ছিল তাঁর জন্য সঠিক। সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল, অবিরাম জ্ঞানের জগতে বিচরণ যার আগ্রহ তার জন্য শিক্ষকতাই সঠিক পেশা।

নিজের শৈশব কৈশোরে যে ভূমিতে শেকড় তাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে ত্যাগ করে অন্য জায়গায় স্থায়ী হওয়া অসম্ভব না হলেও খুব কঠিন। আজীবন যন্ত্রণার বিষয়। টানাপোড়েন, উন্মুল হবার যাতনার মধ্যেই থাকতে হয় এই মানুষদের। শওকত আলীরও তাই হয়েছিল। এ বিষয়ে তাঁর উপন্যাস গল্প আছে, কথা আছে।
 
৮০ দশক ছিল শওকতভাই-এর সবচাইতে সক্রিয় সময়। কিংবা বলা যায় এর আগের কয়েক দশক নিজের চিন্তা জগতে, ভাবনায়, বুননে যা কিছু সঞ্চিত হয়েছিল তার সৃজনশীল প্রকাশ সবচাইতে বেশি ঘটেছিল ৮০ দশকে। এই দশকেই তাঁর আরও যেসব উপন্যাস পড়ি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘দক্ষিণায়নের দিন’ (১৯৮৫), ‘কুলায় কালস্রোত’ (১৯৮৬), ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’ (১৯৮৬), ‘ওয়ারিশ’ (১৯৮৯), ‘উত্তরের খেপ’ (১৯৯১)।
 
আর এই ৮০ দশকেই শওকতভাই-এর সঙ্গে দেখা, কথা ও নিয়মিত কাজের সম্পর্ক তৈরি হয়। এই দশকে কয়েক দফায় আমি লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। এই সংগঠনকে লেখক শিল্পীদের একটি স্বাধীন সংগঠন হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টায় ক্রমে এতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী প্রধান লেখকেরা। তার ফলে আমার সুযোগ হয় এই কিংবদন্তী ব্যক্তিবর্গের চিন্তা ও কাজের সাথে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয়ের। তাঁদের সাথে বহু সভা, আলোচনা আর আড্ডা আমার উজ্জ্বল স্মৃতির অংশ। শওকতভাই কথা কম বলতেন কিন্তু যখন বলতেন তখন তাঁর মধ্যে পেতাম এক গভীর ইতিহাস অনুসন্ধানী সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ চিন্তাশীল মানুষের ছবি।

৯০ দশকে আমাদের যোগাযোগ আরও সংহত হয়। বিশেষত ইলিয়াসভাইকে কেন্দ্র করে আমাদের অনেক উদ্যোগে, আলোচনায় শওকতভাই ছিলেন উৎসাহী অংশীদার। এই দশকেই ১৯৯৭ সালের শুরুতে ইলিয়াসভাই-এর মৃত্যু আমাদের সবার জন্য ছিল অনেক বড় আঘাত। এর পর শওকতভাই আরও সামনে এসেছিলেন, অনেক কাজে হাল ধরেছিলেন। ইলিয়াসভাই-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের সাহিত্য পত্রিকা ‘তৃণমূল’, এই পত্রিকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যায় শওকতভাই ‘মীথ, তৃণমূলে যাবার এক পথ’ শিরোনামে যে লেখাটা লিখেছিলেন তা সাহিত্য ও জগত নিয়ে তাঁর সমৃদ্ধ চিন্তাভাবনা বুঝতে অনেক সহায়ক হবে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা সর্ম্পকে শওকতভাই-এর এই বিশ্লেষণে, আরও অন্যান্য আলোচনাতেও, ইলিয়াসের শক্তিমত্তার বিভিন্ন দিক বিশেষত গল্প/উপন্যাসে মিথ ব্যবহারের দক্ষতা নিয়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি আর্কষণ করা হয়েছে।
 
গত এক দশকে শওকতভাই শারীরিকভাবে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। নিঃসঙ্গতাও তাঁকে কাবু করেছিল অনেকখানি। তারপরও তিনি লিখছিলেন, বলছিলেন দায়িত্ব নিয়ে। সর্বশেষ তাঁর উপন্যাস পড়েছি ‘নাঢ়াই’ (২০০৩) এবং ‘মাদারডাঙ্গার কথা’ (২০১১)।

মানুষের জীবন, মনোজগত, তার বিশ্বাস অবিশ্বাস ধরার জন্য শুধু বর্তমান যথেষ্ট নয়, অতীতকেও জানতে হয়; শুধু প্রকাশ্য বিশ্বাস অবিশ্বাস নয়, মনের ভেতরের অপ্রকাশিত জগতের দোলাচলও বুঝতে হয়। বাংলাদেশের গ্রাম এখন আর আগের গ্রাম নেই, গ্রামের মানুষের অনেকেই এখন শহরে, রাজধানী ঢাকায় এমনকি একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এখন কাজের খোঁজে আয়ের খোঁজে কঠিন জীবনযাপন করছে নানা ভিনদেশে। কিন্তু মানুষ যেখানেই যাক না কেনো, তাঁর শেকড় তাকে ছাড়ে না। শেকড়ের কাছে যদি ফিরতে নাও পারে মানুষ, তবুও তার মনোজগতে শেকড়ের নানা ডালপালা চির সতেজ থাকে। এখানেই বাস করে মিথ। শৈশবে কৈশোরে যার মধ্যে দিয়ে মানুষ বড় হয় তাই তাকে সচেতনে কিংবা অবচেতনে প্রভাবিত করে। শওকতভাই মানুষকে তার সমগ্রের ভেতর ধরতে চেয়েছিলেন, সেজন্য তার অজানা জগতও সন্ধানের চেষ্টা করেছেন বারবার।

শওকতভাইকে কখনো উচ্চকিত দেখি নি। তিনি দায়িত্ব নিয়ে ভার দিয়ে কথা বলতেন, বিশ্লেষণ করতেন। তাঁর সৃষ্টিও ছিল তাই।

আনু মুহাম্মদ ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): অর্থনীতিবিদ। অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।