Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ও আমার ‘যমুনা’

Written by সেলিনা শেলী .

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

‘যমুনা’ কি ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর সত্যি জীবন?

আমার সরল উত্তর- ‘না’। ‘যমুনা’ প্রিয়ভাষিণীর জীবন কাহিনি নয়, ‘যমুনা’ প্রিয়ভাষিণীর জীবন সংগ্রাম দ্বারা অনুপ্রাণিত একখানা রচনা ও প্রযোজনা। তবে ‘যমুনা’ দর্শনে প্রিয়ভাষিণী আপনার সামনে মূর্ত হয়ে উঠবে- তাঁর অন্তরলোকের আনন্দ-বেদনা-জিজ্ঞাসা আপনাকে আলোড়িত করবে, আপনি প্রিয়ভাষিণীর বহিরাঙ্গন ও অন্দরমহল থেকে কোনোভাবেই বেরিয়ে আসতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে দর্শকমনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, নাটকে যা কিছু ঘটছে তার সবই প্রিয়ভাষিণীর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহ কিনা।

অক্সফোর্ডে ২০১২ সালে ‘যমুনা’ নির্মাণকালে এই অনুভূতি থেকে আমি প্রিয়ভাষিণীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম- উনি কি আমাকে এই সত্য প্রকাশে অনুমতি দেবেন যে, ‘যমুনা’ তাঁর জীবন সংগ্রাম দ্বারা অনুপ্রাণিত? উনি অনুমতি দিয়েছিলেন।  উনি এখনকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভ্যস্ত ছিলেন না- ওঁনার কোনো ই-মেইল নম্বর ছিল না। সুদূর ইংল্যান্ড থেকে তাঁর আর আমার মাঝে যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন উভয়েরই প্রিয়বন্ধু নিশাত জাহান রানা। আমি স্ক্রিপ্ট পাঠালাম রানাকে আপাকে দেবার জন্য, পড়বার জন্য, পড়ে অনুমতি দেবার জন্য। কয়েকদিন বাদে আপার লিখিত অনুমতিপত্র চলে এলো- আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম- যার-পর-নাই আনন্দিত হলাম। বিদেশে যতবার যেখানে সুযোগ পেয়েছি, বলেছি, আমার নাটকের শিল্পী যমুনা বাস্তবে ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী এখনও নিরন্তর শিল্প সৃষ্টিতে মগ্ন আছেন আর আছেন রাজপথে- সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবিচল হয়ে।

এখন বলি ‘যমুনা’ রচনায় আমি কী নিয়েছি প্রিয়ভাষিণী থেকে। আমি নিয়েছি তাঁর অন্তর্গত শক্তি আর সৌন্দর্য, ইংরেজিতে যাকে বলা যেতে পারে inner-strength and beauty; আর নিয়েছি জীবনের প্রতি তাঁর অদম্য ভালোবাসা।

আমার শেষ কৈশোর বা নব তারুণ্যে সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের নেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকার আমি পড়েছিলাম। সেই আমার প্রথম পরিচয় ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর সাথে- ভালোবাসাও বটে। সেই সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারি একাত্তরের গ্লানি আর ট্রমা থেকে বের হতে তাঁর দশ বছর সময় লেগেছিল। আহা দশটা বছর! প্রতিটা ক্ষণ প্রতিটা মুহূর্ত নিজের সাথে যুদ্ধ- নিভৃতে নীরবে শামুকবাস। আমার প্রায়শ মনে হতো দশ বছর বাদে উনি যেদিন নিজেকে নিজের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে পেরেছিলেন, সেদিন বুঝি মুক্ত কণ্ঠে ঝলমলিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন- আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের পর ...। পরে তাঁর সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় হয়েছিল তাঁর ধানমণ্ডির ৪ নম্বর রাস্তার বাড়িতে। বিকেল বা সন্ধ্যা বা রাতে যে কথপোকথন গল্প-গুজবে আমি থেকেছি, তাতে আমার গভীরতম উপলব্ধি হয়েছে- তিনি রবীন্দ্রনাথে বাঁচতেন। প্রকৃতি তাঁর প্রাণ বা তিনিই প্রকৃতি। বৃষ্টি জ্যোৎস্না বা মাতাল হাওয়ায় ভিজে একসার হওয়া- রাত-বিরেতে উদ্দেশ্যহীন বেরিয়ে পড়া- গলা ছেড়ে গান গেয়ে ঝুপড়ি দোকানে বসে চা খাওয়া- এমন কত শত গল্প যে তাঁর ঝুড়িতে। এ যেন তাঁকেই সাজে।

মৃত্যুর আগে, প্রিয় প্রাঙ্গণে তাঁর সর্বশেষ প্রদর্শনীতে যে কবিতায়োজন করেছিল বন্ধুরা- সেখানে একদিন ছিল তাঁর প্রিয় বন্ধুদের কণ্ঠে বিশেষ বিশেষ কবিতা শুনবার অনুরোধ। নিশাত জাহান রানা আর জয়ন্ত রায়ের কণ্ঠে অনুরোধের একটি কবিতা বিশেষ কারণে সেদিন শুনতে না পেয়ে গোপন অভিমান ব্যক্ত করেছিলেন। আমার সৌভাগ্য, সেদিনই অক্সফোর্ড থেকে এসে সে অনুষ্ঠানে তাঁর পাশে বসতে পেরেছিলাম একটুক্ষণ।

নানা ধরনের নানা বয়সের নানা ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষকে সমাদরে গ্রহণ করবার তাঁর ছিল অসাধারণ ক্ষমতা। এ আমার একান্ত পর্যবেক্ষণ। তাঁর বাড়ির দুয়ার ছিল সবার তরে খোলা। ধানম-িতে তিনি যে বাড়িতে থাকতেন, যার উঠোনময় গায়ে গায়ে জড়িয়ে ছিল নানান শিল্প কর্ম, উঠোন গিয়ে মিশেছে খোলা বারান্দায়, যেখানে বসে বসে তিনি সীমাহীন আকাশের বিশালত্বে নিজেকে লীন করেছেন, আমি জানতাম সেই বাড়িটা তাঁর নিজের। কিন্তু পরে জানতে পারি ওটা তাঁর ভাড়াবাড়ি। তারপর বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারি, তাঁর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করার কথা, প্রতিদিন বেঁচে থাকার যুদ্ধের কথা। বছর দু’এক আগে ‘ভাড়া কম, বড় জায়গা’ এই বিবেচনায় পিঙ্ক সিটিতে চলে গেলেন তাঁর প্রিয় ধানমণ্ডি ছেড়ে। তখনও আমার মতো অনেকেই জানতো- ধানম-ির বাড়িটা হয় তাঁর নিজের, নয় সরকার তাঁকে অনুদান দিয়েছে।
    
‘যমুনা’ নাটক মঞ্চায়নে বাংলাদেশে মঞ্চ তৈরিতে আমরা তাঁর শিল্পকর্মগুলো ব্যবহার করেছিলাম। নাটকের নির্দেশক মোহাম্মাদ আলী হায়দার দলবলসহ তাঁর বাড়ি গিয়ে বিশাল ভা-ার থেকে পছন্দমতো যা যা চেয়েছিলেন, তার কোনোটাতেই তিনি আপত্তি করেন নি। তাঁর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

অক্সফোর্ডে যখন প্রথম ‘যমুনা’র কাজ শুরু করি- তখন শুরুতেই তাঁকে নিয়ে বানানো নিশাত জাহান রানার ডকুমেন্টারিখানা আমরা দেখেছিলাম বারকয়েক। পোস্টার করা হয়েছিল তাঁর শিল্পকর্মের একখানা ছবি দিয়ে। ছবিটি ছিল তাঁর অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পুত্র তুর্য’র তোলা। প্রিয়ভাষিণীর কাজের যে কয়েকটি মানসম্মত প্রফেশনাল আলোকচিত্র রয়েছে, সেগুলো মূলত তুর্য’র তোলা। ভাস্কর্যের ছবি তোলা মোটেও সহজ নয়। আর প্রিয়ভাষিণীর শিল্পকর্মগুলোর যে বৈশিষ্ট্য, আলো-ছায়ার যে সমাবেশ, সেগুলোর ছবি তোলা ছিল আরও কঠিন। তুর্য’র সেই দক্ষতা ছিল। কিন্তু তুর্য প্রবাসী হওয়ার পর অনেক কাজেরই আর ছবি রাখা হচ্ছিল না। এই নিয়ে ফেরদৌসী আপা কখনও কখনও একটু মন খারাপ করতেন বৈকি। তুর্য’র কাছে আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা, ছবিটি ‘যমুনা’র পোস্টারে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন বলে।

‘যমুনা’ নাটকের ঘটনাসমূহের সাথে প্রিয়ভাষিণীর জীবনের বাস্তব ঘটনাসমূহের কোনো মিল নেই। মিল রয়েছে জীবনদর্শনে। আমি নিমগ্নচিত্তে যা উপলব্ধি করেছি তা আর কিছুই নয়- প্রিয়ভাষিণীর ভেতরের দুর্বার প্রাণশক্তি, ভস্ম থেকে জেগে ওঠা ফিনিক্স পাখির মতো। তাইতো আমার যমুনা মিলিটারি ক্যাম্পে দীর্ঘ পাঁচমাস যাবৎ ধর্ষণ, শারীরিক অত্যাচার আর নির্ঘাত মৃত্যুর পরওয়ানা থেকে বেঁচে গিয়ে শিল্পকে আলিঙ্গন করে বাঁচে, মুক্ত কণ্ঠে বলে- as I have risen from ashes so I tried to restore the things that have been broken and thrown away; that is why I said arts and life are inextricable for me. একইভাবে প্রিয়ভাষিণী তাঁর ‘বীরাঙ্গনা’ অবয়বের পাশে এক বিশালাকার ‘ভাস্কর প্রিয়ভাষিণী’ গড়ে দিলেন তিনি নিজেই। তাই ‘যমুনা’ দর্শনে প্রিয়ভাষিণী দর্শন অবিসংবাদিত।

সেলিনা শেলী ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): মঞ্চনাট্যকর্মী