Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

৮ম থিয়েটার অলিম্পিকস: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির থিয়েটার

Written by সোনিয়া হাসান.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

‘থিয়েটার অলিম্পিকস’, থিয়েটারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজন। ১৯৯৫ সালে গ্রিসে শুরু হওয়া এ আয়োজনে অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা থিয়েটার দলগুলোর জন্য তীর্থস্থান দর্শনের আকাঙ্ক্ষার মতো। ৮ম বারের মতো এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। বাংলাদেশ থেকে মনোনীত হলো ৯ টি নাটক (১ টি নৃত্যনাট্যসহ)। যখন জানতে পারলাম আমার দল সুবচনের নাটক ‘মহাজনের নাও’ ৮ম থিয়েটার অলিম্পিকসে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হয়েছে, মনে হলো যেন বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পেলাম, মনে হলো ২০ বছরের থিয়েটার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন, সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। উত্তেজনায় আনন্দে চোখ ভিজে উঠল। সে আনন্দ বর্ণনাতীত, ভাষাহীন, আবেগময়।

১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত এই দীর্ঘ ও উৎসবমুখর থিয়েটার আয়োজনে বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশের ৪৬৫টি নাটকের প্রদর্শনী হয়েছে, যেখানে অংশগ্রহণ করেছে প্রায় ২৫ হাজার নাট্যকর্মী। দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতাসহ ভারতের ১৭ টি শহরে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি) এবং ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের যৌথ আয়োজনে।

আয়োজকদের সাথে অনেক যোগাযোগ আর জটিলতা পার করে সম্পন্ন হলো আমাদের ভারত যাবার আয়োজন। যাত্রা শুরুর আগে নানা পর্যায়ে বারবারই মনে হয়েছে বাংলাদেশের দলগুলোর সাথে যোগাযোগের জন্য নিযুক্ত ব্যক্তিকে আরও বেশি দক্ষ এবং সংযোগ রক্ষাকারীর ভূমিকায় আরও উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন ছিল। জানি না, অন্যদেশের দলগুলোরও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে কিনা। আশা করব তারা আমাদের মতো ভুক্তভোগী হবে না।

থিয়েটারকে ঘিরে আমাদের এই যে সীমাহীন ত্যাগ, পরিশ্রম আর মনোসংযোগ, এর বিনিময়ে আমাদের প্রাপ্তি বলতে কেবল দর্শকের ভালোবাসা, সেখানে প্রত্যাশা কেবল একজন দর্শক আমার অভিনয় দেখুক, মঞ্চে নাটক দেখুক। এই চাওয়া নিয়ে আমরা প্রতিদিন থিয়েটার করি, যুক্ত হই থিয়েটারের জাতীয় বা আন্তর্জাতিক আসরে। ৮ম থিয়েটার অলিম্পিকসে যোগ দিতে বাংলাদেশ থেকে আমরাই প্রথম প্রতিনিধিদল হিসেবে যাত্রা শুরু করলাম ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। কলকাতা হয়ে উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বর। ২৬ ফেব্রুয়ারি ভুবনেশ্বরের রবীন্দ্র মণ্ডপে হবে ‘মহাজনের নাও’ নাটকের ১ম প্রদর্শনী আর ২৮ ফেব্রুয়ারি দিল্লির এনএসডির অভিমঞ্চে ২য় প্রদর্শনী।

ঢাকা থেকে ট্রেনে কলকাতা, কলকাতায় এক রাত্রি যাপনের পর দুপুরে আবার ট্রেন ভুবনেশ্বর অভিমুখী, ভোরে উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বরে পৌঁছানো গেল। এই দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রাপথ, থিয়েটার অলিম্পিকসে অভিনয় করতে যাচ্ছি এই উত্তেজনায় হয়ে উঠল এক আনন্দঘন যাত্রা, এ যাত্রা আমাদের একটুও ক্লান্ত করল না। আনন্দ আরও বহুগুণে বেড়ে গেল ভুবনেশ্বরে আমাদের থাকার জায়গাটিতে ঢুকতেই। এই প্রথমবার নাটক করতে গিয়ে কোনো অভিজাত হোটেলে থাকার অভিজ্ঞতা হলো আমাদের। পরদিন সন্ধ্যায় রবীন্দ্রমণ্ডপে ‘মহাজনের নাও’-এর প্রদর্শনী। নাটকের নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী লন্ডন থেকে উড়ে এসে আমাদের সাথে যুক্ত হলেন। প্রদর্শনীর আগে মহড়া করালেন, সন্ধ্যায় নির্ধারিত সময়ে আকাঙ্ক্ষিত প্রদর্শনীটি শুরু হলো। যে যার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে প্রদর্শনীটি ভালো করার চেষ্টা করলাম।

তবে মনের মধ্যে খচখচানি একটা ভাব রয়ে গেল। প্রত্যাশা মতো দর্শক পেলাম না।

একই ব্যাপার ঘটল ২৮ তারিখ দিল্লিতেও। এত বড় বৈশ্বিক আয়োজন কিন্তু দর্শকখরা! প্রত্যাশা মতো দর্শক পাওয়া গেল না এনএসডির অভিমঞ্চেও। সেই সাথে প্রদর্শনী শেষের আনুষ্ঠানিকতাতেও ছিল আয়োজকদের দায়সারা গোছের ভাব। যদিও দর্শক যারা ছিলেন, তারা মুগ্ধতা প্রকাশ করে গেছেন বেশিরভাগই। উড়িষ্যা ও দিল্লি, দু’জায়াগাতেই ছিল ভাষাগত অসামঞ্জস্যতা। বাংলা ভাষাভাষী দর্শক একেবারেই কম থাকায় ভালো নাটক দেখার প্রতিক্রিয়া সেভাবে পাওয়া যায় নি। ‘মহাজনের নাও’ নাটকটি নিয়ে লন্ডন, সাউথ কোরিয়া এবং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে অংশগ্রহণ করবার পর সর্বশেষ থিয়েটার অলিম্পিকসে অংশগ্রহণ করে মনে হয়েছে, আমাদের দেশেই নাটকটির বেশি বেশি প্রদর্শনী করা উচিত, যেখানে নাটক বুঝতে ভাষাগত কোনো সমস্যা নেই।

এবারের থিয়েটার অলিম্পিকসে বাংলাদেশ থেকে ৮ টি নাটক (নৃত্যনাট্যটি বাদে) অংশ নিয়েছে। আমার মনে হয় থিয়েটার অলিম্পিকসে নির্বাচিত এই ৮ টি নাটক নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় অথবা শিল্পকলার আয়োজনে আমাদের দেশের বিভিন্ন শহরে উৎসব করা যায়। আশা করা যায়, নাটকগুলো দেখে আমাদের দেশের দর্শক মুগ্ধ হবে। আমরাও আগামীতে থিয়েটারে নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে হাজির হতে পারব দর্শকের উৎসাহে আর মুগ্ধতায়। সেই সাথে আমার মনে হয় থিয়েটার কেনো শুধুই বিনোদন বা সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে থাকবে, কেনো একটি সমৃদ্ধ শিল্প হয়ে উঠছে না, কেনো একজন থিয়েটারকর্মী থিয়েটার দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে না! এ ব্যাপারটাতেও দৃষ্টি দেয়া উচিত। ২০ বছর নিয়মিত মঞ্চে অভিনয় করে চলেছি। প্রতিনিয়ত পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোকে উপেক্ষা করে চলেছি মহড়া আর প্রদর্শনীর জন্য। বেশি বেশি থিয়েটার করব ভেবে সম্মানজনক চাকুরি থেকে ইস্তফা দিয়েছি। মঞ্চে আরও বেশি কাজ করব, আরও ভালো কাজ করব, সেই ইচ্ছা থেকে পরিবারকেন্দ্রীক একটি রেপাটরি থিয়েটার গড়েছি, ‘ম্যাড থেটার’। যার প্রথম প্রযোজনা ‘নদ্দিউ নতিম’। নাটকটি ২০১৭ সালে লন্ডনের সিজন অফ বাংলা ড্রামা ফেস্টিভালে বাংলাদেশের একমাত্র নাটক হিসেবে অংশগ্রহণ করেছে। এত কিছুর পরও আমি কোথাও বলতে পারছি না আমার প্রফেশন থিয়েটার, আমি একজন প্রফেশনাল থিয়েটার এক্টিভিস্ট।

থিয়েটারে কাজ করে এটাই আমার একমাত্র হতাশা। এই হতাশা ঘোচার কি কোনোই উপায় নেই!

সোনিয়া হাসান ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): অভিনেত্রী-ডিজাইনার-আবৃত্তিশিল্পী। সদস্য- সুবচন নাট্য সংসদ। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য- ম্যাড থেটার।