Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

মিনিমালিস্ট থিয়েটার: নাট্যে-পাওয়াদের নতুন পথ

Written by সাজেদুল আউয়াল.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্টটি প্রথমে দানা বাঁধে যুক্তরাষ্ট্রে। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। বাংলাদেশে প্রবলভাবে গ্রুপ থিয়েটার চর্চা শুরু হয় স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই। যদিও পূর্ব পাকিস্তানপর্বেই কয়েকটি নাট্যদল গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্ট থেকে নাট্যচর্চা চালিয়ে গেছে। এ-প্রসঙ্গে ‘ড্রামা সার্কেল’ (১৯৫৬), নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় (১৯৬৮)-এর নাম উল্লেখ করা যায়। ১৯৭২ সাল থেকে নতুনভাবে শুরু হওয়া গ্রুপ থিয়েটার চর্চা ১৯৯০-এর মধ্যেই নানাদিক থেকে বিকশিত হয়ে গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্টের চূড়া স্পর্শ করে। কনসেপ্ট একটি হাইপোথেটিক্যাল বিষয়। একে ধারণা, ভাবনা, প্রকল্প ইত্যাদি হিসেবে ভাবা যায়। এর প্রয়োগ হচ্ছে চর্চা বা আন্দোলন যা সম্পূর্ণভাবে প্রাকটিক্যাল-ইম্পেরিক্যাল একটি বিষয়। বলা বাহুল্য যে, গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্ট থেকেই বাংলাদেশে নাট্যচর্চা-আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে।

প্রত্যেক আন্দোলনই একটি পর্যায়ে এসে তুঙ্গ স্পর্শ করে এবং একসময় অবসন্ন-অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তারপর তার নিজের মধ্যেই একপর্যায়ে একটি পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করে। আমার বিবেচনায় মিনিমালিস্ট থিয়েটার হচ্ছে সেই প্রয়োজনীয়তার একটি প্রত্যক্ষ প্রকাশ যা আজ গ্রুপ থিয়েটারের কর্মীরা শুধু অনুভবই নয়, চর্চাও করছে। পৃথিবীর বহুদেশে এধরনের নাট্যচর্চার নজির পাওয়া যায়- রেস্তোরাঁয় মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে নাটক হয়; কম্যুনিটি থিয়েটার গঠন করে এই অ্যাপ্রোচে নাটক হতেও দেখা যায়; আবার ছোট্ট ট্যুরিং কোম্পানী নিয়েও দেশে-দেশে এই অ্যাপ্রোচসমৃৃদ্ধ নাট্য-প্রযোজনা মঞ্চায়িত হয়; গ্রোটস্কি-বাদল সরকারের নাট্যেও মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচের অবস্থিতি দুর্নিরীক্ষ্য নয়।

গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্ট প্রতি দশকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে সংঘাতের ভিতর দিয়েই বিবর্তিত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু নাট্যদলে ভাঙন দেখা দিয়েছে; কিছু দলের কর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে; কিছু দল তাদের নাট্যচর্চা চালিয়ে গেছে। গ্রুপ থিয়েটার চর্চার ক্ষেত্রে এক ধরনের অবসাদও এসেছে- কনসেপ্টটি তার নিজের মধ্যেই নানা দ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছে।
 
এরকম একটি অবস্থায় ১৯৯০ সালের শুরুতেই গ্রুপ থিয়েটারের অভ্যন্তর থেকেই রেপাটরি থিয়েটার-এর কনসেপ্ট বেরিয়ে আসে। এই কনসেপ্টের চর্চাকারীরা আধা-প্রফেশনাল হওয়ার মানসিকতা থেকেই তাদের কার্যক্রম শুরু করে। এক বা একাধিক গ্রুপ থিয়েটারের কিছু সদস্য একত্র হয়ে অল্প সময়ে, অল্প খরচে একটি প্রযোজনা মঞ্চে নামানো শুরু করে। এই নতুন উদ্যোগে ‘মিনিমালিজম’ একটি শিল্প-দর্শন হিসেবে কাজ করে।
 
মিনিমালিজম শিল্পাঙ্গিকের ক্ষেত্রে নতুন কোনো অ্যাপ্রোচ নয়। মিনিমালিজম শিল্পের একটি বৈশিষ্ট্যগত প্রকাশভঙ্গি বা স্টাইল যা সতর্ক ও সচেতনভাবে সকল শিল্পাঙ্গিকের উপাদানগুলোকে সংক্ষিপ্ত ও ছাঁটাই করে। পাশ্চাত্যের শিল্পচর্চায় দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময়ে-পরে এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। আমরা মিনিমালিস্ট মিউজিক-আর্কিটেকচার-ডিজাইন-চিত্রকলা-নাটক-উপন্যাস-চলচ্চিত্র ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত। এই শিল্পদর্শন শিল্পের নানা শাখায় প্রভাব ফেলেছে, নানা আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি হয়েছে। বিশেষ করে ভিজ্যুয়াল আর্টের ক্ষেত্রে, যেখানে শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে একান্ত প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোকে বিবেচনায় রেখে বাকি উপাদানগুলোকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। ‘বাদ দেওয়া’ হচ্ছে মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মিনিমালিস্ট থিয়েটারের ধারণার সূত্রসমূহ আমরা পেয়েছি মিনিমালিজম শীর্ষক শিল্পদর্শন থেকেই। মিনিমালিস্ট থিয়েটার, রেপাটরি থিয়েটার, স্টুডিও থিয়েটার, ইন্টিমেট থিয়েটার- সবই একটা বাধ্যবাধকতা, প্রয়োজনীয়তা ও নবভাবনার জায়গা থেকেই নিজের অবস্থান তৈরি করে নেয়।

ধারণা করি, একধরনের কম্পালশন থেকে গ্রুপ থিয়েটারের ভিতর থেকেই মিনিমালিস্ট থিয়েটারের চর্চা এদেশে শুরু হয়েছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই ঢাকা ও ঢাকার বাইরের গ্রুপ থিয়েটারগুলো এ-পথ বেছে নিয়েছে। বস্তুত গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্টটির সীমাবদ্ধতাই জন্ম দিয়েছে নতুন এ-পথের। যুক্তরাষ্ট্রেও ব্রডওয়ে থেকেই প্রথমে অফ্-ব্রডওয়ের আবির্ভাব ঘটে। একসময় অফ্-ব্রডওয়ে অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়লে নাট্যজনেরা বাধ্য হয়ে অফ্-অফ্ ব্রডওয়ের জন্ম দেয়; তারা মিনিমাম নাট্য-উপাদান দিয়ে স্বল্পব্যয়ে নাটক করা শুরু করে।
 
বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের দিকে এই অ্যাপ্রোচ থেকে রেপাটরি থিয়েটার চর্চা শুরু হয়। মামুনুর রশীদ, সৈয়দ দুলাল, এস.এম. সোলায়মান প্রমুখ এই ধারার নাট্যচর্চার সূচনা করেন। মামুনুর রশীদ ‘বাঙলা থিয়েটার’ শীর্ষক একটি রেপাটরি থিয়েটার গঠন করে ‘মানুষ’ নামের একটি প্রযোজনা মঞ্চস্থ করেন।  ১৯৯১ সালে বরিশালের ‘শব্দাবলী স্টুডিও থিয়েটার’ নিজেদের স্টুডিওতে সৈয়দ দুলাল নির্দেশিত মনোজ মিত্রের ‘মেষ ও রাক্ষস’ মঞ্চস্থ করে। এস. এম. সোলায়মান ‘থিয়েটার আর্ট রেপার্টরি’ গঠন করে নামালেন ‘কীর্তিনাশা’। তারা গ্রুপ থিয়েটারে ব্যবহৃত ব্যয়বহুল সেট-কস্ট্যুম-প্রপস্-মেকআপ-আলো ইত্যাদি পরিহার করে অল্প চরিত্রের নাটক মঞ্চে আনেন। বেশি ভাড়ার মিলনায়তনের পরিবর্তে কম ভাড়ার মিলনায়তন বা বড় কামড়ায় নাটক করা শুরু করেন; নিজেদের মধ্যে আয় বন্টন করার রেওয়াজ চালু করেন, যা গ্রুপ থিয়েটারে তার নিজের কনসেপ্টের কারণেই অনুপস্থিত। সেখানে সবার মিলিত শ্রমে যা আয় হয় তা জমা পড়ে দলের তহবিলে।
 
রেপাটরি থিয়েটার কনসেপ্ট নাটককার, নাট্যনির্দেশক, অভিনয়শিল্পী, মঞ্চ-পরিকল্পকসহ থিয়েটারে-পাওয়া, শিল্পে খাওয়া গ্রুপ থিয়েটার সদস্যদের জন্য নতুন এক সুযোগ তৈরি করে- যা ব্যবহার করে তারা দর্শকবৃন্দের সামনে তাদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে যায়। গ্রুপ থিয়েটার থেকে একটি প্রযোজনা মঞ্চে নামাতে যে সময়-খরচ লাগে তার থেকে অনেক কম সময়-খরচে রেপাটরি থিয়েটার থেকে মঞ্চে নাট্যযজ্ঞের উপস্থাপন সম্ভব হয়।

কিন্তু এই উদ্যোগ নানা কারণে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে নি। মঞ্চায়নের জন্য অল্প টাকায় মিলনায়তন না পাওয়া প্রধান একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার ও এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে রেপাটরি থিয়েটার চর্চা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন গ্রুপ থিয়েটারের সদস্যরা মিলে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে নাটক মঞ্চায়ন করছেন। সবচেয়ে বড় কথা একই ভাড়ায় স্টুডিও থিয়েটারে পরপর দুটি মঞ্চায়ন করা সম্ভব হচ্ছে বিধায় প্রযোজনা খরচ ওঠে লাভও হচ্ছে। এই রেপাটরি থিয়েটারকে ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’ অভিধায় অভিহিত করা যায়।
 
উল্লেখ্য যে, ‘শব্দাবলী স্টুডিও থিয়েটার’-ই প্রথম মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য নিজস্ব উদ্যোগে স্টুডিও গঠন করে। এই স্টুডিও থেকে এখনও একই অ্যাপ্রোচনির্ভর নাটক মঞ্চস্থ হতে দেখা যায়। সম্প্রতি ইউজিন ও’নিলের ‘ডিজায়ার আন্ডার দ্য এলমস্’ মঞ্চে নামানো হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায় এ-পর্যন্ত দলটি ২৬টি প্রযোজনা মঞ্চস্থ করেছে মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে। ২০১৬ সালে ২৫ বছর পালন উপলক্ষে দলটির স্লোগান ছিল ‘পেশাদারিত্বের খোঁজে পঁচিশ বছর’। এই শ্লোগান থেকেই অনুমেয় যে, দলটি মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচে কেনো নিজস্ব স্টুডিও নাটক করতে আগ্রহী। বরিশালে অবস্থিত অন্যান্য নাট্যদলের কর্মীদের নিয়েও দলটি নাটক মঞ্চস্থ করে থাকে। সেই সূত্রে বলা যায় ‘শব্দাবলী স্টুডিও থিয়েটার’ কখনো কখনো রেপাটরি থিয়েটারের চরিত্রও অর্জন করে। উদ্দেশ্য একটাই, নাটকের ক্ষেত্রে কোনোভাবে কিছুটা পেশাদারিত্ব আনা, যা মিনিমালিস্ট থিয়েটারের অন্যতম একটি চারিত্রলক্ষণ।  

দুই.
হাল আমলে ‘শব্দাবলী স্টুডিও থিয়েটার’ থেকে ‘ফণা’, ‘সাহেব চান্দের ঈদভোজন’; ‘নাট্যম রেপার্টরি’ থেকে ‘দমের মাদার’; ‘আগন্তুক রেপার্টরি’ থেকে ‘অন্ধকারে মিথেন’ ও ‘ধলেশ্বরী অপেরা’; ‘প্রাচ্যনাট’ থেকে ‘ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি’ ও ‘বনমানুষ’ মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে স্টুডিও থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছে। ‘নাট্যকেন্দ্র’ চরিত্রের দিক থেকে গ্রুপ থিয়েটারভুক্ত হলেও মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে ‘গাধার হাট’ ও ‘বন্দুক যুদ্ধ’ নামক স্বল্পদৈর্ঘ্যরে দুটি প্রযোজনা স্টুডিও থিয়েটারে নামিয়েছে। সবগুলো প্রযোজনাই একই বুকিং-এ দুবার করে মঞ্চস্থ হয়েছে। মামুনুর রশীদ দীর্ঘ বিরতি দিয়ে হলেও সম্প্রতি ‘বাঙলা থিয়েটার’ থেকে ‘দ্য ডিস্টেন্ট নিয়ার’ ও ‘অমানুষ’ বলে মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচে দুটি প্রযোজনা নামিয়েছেন। বলাবাহুল্য যে দুটি প্রযোজনাই রেপাটরি থিয়েটারের দর্শনের আলোকেই মঞ্চে নেমেছে।

‘পালাকার’ ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ভাড়া করা নিজস্ব স্টুডিও থিয়েটারকে ভিত্তি করে নিয়মিতভাবে মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকেই দলটি ২০১১ পর্যন্ত স্বল্পদৈর্ঘ্যরে নাটক মঞ্চায়ন করেছে। প্রতি শুক্র ও শনিবার টিকিট বিক্রির মাধ্যমে পরপর অনেকগুলো মঞ্চায়ন করেছে। ভাড়া করা জায়গা ছাড়ার পর ২০১২-২০১৩ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটারে ‘মৃত্তিকা কুমারী’ ও ‘কালবেলা’ নাটকের এক বুকিংয়ে দুটি করে মঞ্চায়ন করেছে। দলটি রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’, সেলিম আল দীনের ‘বাসন’, উডি অ্যালেনের ‘ডেথ নকস্’, ব্রেখটের ‘রাইফেল’, ফ্রানজ জ. ক্রোয়েটজের ‘রিকোয়েস্ট কনসার্ট’ প্রভৃতি স্বল্পদৈর্ঘ্যরে নাটক মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকেই করেছে।

দলটির ভাষ্যানুযায়ী তারা ‘স্টুডিও থিয়েটারভিত্তিক নাট্যচর্চায় সরব’। স্টুডিও থিয়েটারভিত্তিক নাট্যচর্চাই বস্তুত মিনিমালিস্ট থিয়েটার-এর জনয়িতা। এরা এক বুকিং-এ পরপর দুটি শো’র আয়োজন করে থাকে যা মিনিমালিস্ট থিয়েটার-এর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। দলটি যদি পেশাদারি মনোবৃত্তি নিয়ে নাটক করে যেতে চায় তাহলে দুটি শো থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ‘স্টুডিও থিয়েটারভিত্তিক নাট্যচর্চায় সরব’ থাকতে সক্ষম হওয়ার কথা।
 
চরিত্রের দিক থেকে গ্রুপ থিয়েটারভুক্ত ‘মণিপুরি থিয়েটার’ও মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে বেশ কয়েকটি প্রযোজনা যেমন ‘কহে বীরাঙ্গনা’, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, ‘ইঙাল আধার পালা’, ‘লেইমা’, ‘দেবতার গ্রাস’ প্রভৃতি শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটারে একই বুকিং-এ একাধিকবার মঞ্চস্থ করেছে। ‘থিয়েটার’ (নাটক সরণি)-এর ‘মুক্তি’, ‘শূন্যন’-এর ‘লাল জমিন’, রেপাটরি থিয়েটার ‘কিসসা কাহিনী’ সেলিম আল দীন রচিত ‘পুত্র’ মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে মঞ্চস্থ করেছে। সুদীপ চক্রবর্তী মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে কিছু নাট্যপ্রযোজনা মঞ্চে এনেছেন। তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ‘থিয়েটার এ্যান্ড পারফরমেন্স বিভাগ’ থেকে শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’, ‘মিড সামার নাইটস্ ড্রিম’ ও ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’-এর অংশবিশেষ মঞ্চস্থ করেছেন; ‘পদাতিক নাট্য সংসদ’ থেকে রুবাইয়াৎ আহমেদ রচিত ‘গণযাত্রা’। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নাটক ও নাট্যবিষয়ক বিভাগসমূহসহ আরো অনেক নাট্যদলও একই অ্যাপ্রোচ থেকে নাটক মঞ্চায়ন করেছে-করছে। নাটক মঞ্চায়নের এ-প্রবণতা-ধারাকে আমরা স্বল্পদৈর্ঘ্যরে বিকল্প নাট্যধারাও বলতে পারি।
 
‘স্বল্পদৈর্ঘ্য’ শব্দটির প্রয়োগ প্রথম ঘটে ১৯৮৩ সালে মোরশেদুল ইসলাম নির্মিত ‘আগামী’ চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে। দৈর্ঘ্যে কম বলে নয়- ৩৫ মি. মি.-এর পরিবর্তে ১৬ মি. মি.-এ চলচ্চিত্র নির্মাণ, ব্যয়-স্বল্পতা, স্বল্পায়োজন, বিকল্প প্রজেকশন ব্যবস্থা, দর্শকপ্রিয়তা- সবমিলিয়ে এ-পথে চলচ্চিত্র নির্মাণপ্রবণতা একটি আন্দোলনেরই জন্ম দেয়। একই ঘটনা থিয়েটারের ক্ষেত্রেও বর্তমানে ঘটতে দেখছি। থিয়েটারের ক্ষেত্রেও স্বল্পদৈর্ঘ্যরে বিষয়টি ক্রিয়াশীল। মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে স্বল্পায়জনে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে নাটক তো হচ্ছেই, এমনকি এখন বৃহৎ আয়োজনের নাট্যপ্রযোজনাও ৭০-৮০ মিনিটের মধ্যে মঞ্চস্থ হচ্ছে। কিন্তু আমাদের শুরুর প্রস্তাবনা অনুযায়ী সে-সব প্রযোজনা মিনিমালিস্ট থিয়েটারভুক্ত নয়; বিকল্পধারাভুক্ত নাটকও নয়।

মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে নাট্য প্রযোজনা মঞ্চে নামানোর নানাবিধ কারণ বিদ্যমান। বাংলাদেশের সমাজ-বাস্তবতা দশকে দশকে বিবর্তিত হচ্ছে। বিশ^বাস্তবতাও পরিবর্তিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশ^ায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতির বাস্তবতা, আকাশসংস্কৃতির প্রকোপ- সব সামলে নাট্যমঞ্চায়ন নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে পথ খুঁজছে। মিনিমালিস্ট থিয়েটার একটি পথের সন্ধান হয়তো দিতে পারে। মিনিমালিস্ট থিয়েটারকে নতুন একটি নাট্যকৌশল বলা যেতে পারে; বিকল্প নাট্যধারা তো বটেই। বাংলাদেশে থিয়েটারচর্চার ক্ষেত্রে একেবারেই নতুন একটি কনসেপ্ট-নাট্যভাবনা হচ্ছে মিনিমালিস্ট থিয়েটারচর্চা। এর বিস্তৃতি ঘটবে, আবার একসময় এর ভিতর থেকেই নতুন পথের সন্ধান করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হবে।
 
বক্ষ্যমাণ রচনায় মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে তৈরি দুটি প্রযোজনা নিয়ে আলোচনার বিস্তৃতি ঘটাতে চাই। কিছুকাল আগে ‘থিয়েটারওয়ালা রেপাটরি’ বলে একটি দল গঠিত হয় এবং সেখান থেকে ‘শাইলক এ্যান্ড সিকোফ্যান্টস’ নামক একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যরে নাটক মঞ্চস্থ হয়। আজাদ আবুল কালাম নির্দেশিত এই মঞ্চায়ন-কর্মে অংশ গ্রহণ করে পাঁচ/ছয়টি গ্রুপ থিয়েটারের সদস্য। তারা নিজেরা নাটক রচনা-অভিনয়-নির্দেশনা-সেট ডিজাইন-আলোক পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ-আবহসংগীত-কস্ট্যুম তৈরি-ভিডিও নির্মাণ ও প্রজেকশন-টিকিট বিক্রি-মিলনায়তন ব্যবস্থাপনা- সবকিছুই করেছেন। শাহযাদ ফিরদাউস রচিত উপন্যাস থেকে নাটকটি রচনা করেছেন হাসান শাহরিয়ার। তিনি নিজে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন। তাকে আমরা ‘থিয়েটারওয়ালা’ বলে একটি নাটক ও নাট্যবিষয়ক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেই জানি। কিন্তু তিনি যে একজন দক্ষ অভিনয়শিল্পীও তার প্রমাণ তার অভিনয়কর্মে প্রতিফলিত হয়েছে। এখানেই ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’-এর অন্যতম শক্তির দিকটি নিহিত। এই থিয়েটার দর্শকবৃন্দের সামনে থিয়েটারকর্মীদের নিজেদের সুপ্ত প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ করে দেয়। তবে একথাও ঠিক যে,  মিনিমালিস্ট থিয়েটার একজন নাট্যকর্মীর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের একমাত্র ক্ষেত্র নয়, তার বহুমুখী প্রতিভার কিছু স্ফুরণ এক্ষেত্রে সম্ভবপর করে তোলা যায় মাত্র।

দ্বিতীয় যে প্রযোজনা নিয়ে আলোচনা করতে চাই, সেটি মঞ্চে এনেছে ‘থিয়েটার আর্ট ইউনিট’। এটি রেপাটরি থিয়েটার নয়- ‘গ্রুপ থিয়েটার’। কিন্তু দলটির প্রযোজনার ধরন মিনিমালিস্ট থিয়েটারধর্মী। দলটি নিয়মিতভাবে গ্রুপ থিয়েটার চর্চার পাশাপাশি মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে ‘মগজ সমাচার’ শীর্ষক একটি প্রযোজনা শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটারে নামিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতা থেকে এই নাটক লিখেছেন হাসান শাহরিয়ার, আর নির্দেশনা দিযেছেন ‘থিয়েটার আর্ট ইউনিট’ দলের সদস্য সাইফ সুমন। দলটির সদস্যদের দ্বারাই প্রযোজনা সংক্রান্ত সমস্ত কাজ সাঙ্গ করা হয়েছে।

উল্লিখিত দুই প্রযোজনাই মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে মঞ্চে নামানো হয়েছে। দুটি প্রযোজনাই একই সন্ধ্যায় একই ভাড়ায় দু’বার করে মঞ্চায়িত হয়েছে। বলা চলে যে, গ্রুপ থিয়েটার হোক আর রেপাটরি থিয়েটার হোক- যদি তা মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে নির্মিত-প্রদর্শিত হয় তবে তা মিনিমালিস্ট থিয়েটার পর্যায়ভুক্ত হতে পারে। দুটি প্রযোজনারই প্রদর্শন সময় এক ঘণ্টার মতোন। তাই একই বুকিং-এ বা ভাড়ায় দু’বার এদের মঞ্চায়ন সম্ভব হয়। মাঝে শুধু দশ-পনেরো মিনিটের বিরতি। এই সুযোগে দ্বিতীয়বার মঞ্চায়নের প্রস্তুতি নেয়ার পালা। এভাবে মিনিমালিস্ট থিয়েটার অর্থনৈতিকভাবেও স্বচ্ছল হয়ে ওঠে। ধরা যাক, একটি দলকে শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটারের এক সন্ধ্যার ভাড়া বাবদ ২৩০০/- টাকা দিতে হয়। এবং দলটি দুটি মঞ্চায়ন থেকে ১০,০০০/- টাকার মতোন অর্থ টিকিট বিক্রি বাবদ আয় করে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, ‘থিয়েটারওয়ালা রেপাটরি’ এই আয় তাদের সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করে নেয়। পক্ষান্তরে, ‘থিয়েটার আর্ট ইউনিট’ এই আয় তাদের দলের তহবিলে জমা করে। দুটি দলের মধ্যে এই পার্থক্য থাকলেও, চরিত্রের দিক থেকে দুটি দলেরই মঞ্চায়ন প্রকৃতি একই- দুটি দলই ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’-এর চর্চাই করে। তবে এটাও বলা দরকার যে, স্টুডিও থিয়েটারে নাটক মঞ্চায়ন করলে বা দৈর্ঘ্যরে দিক থেকে হ্রস্ব হলেই তা মিনিমালিস্ট থিয়েটার হবে, কথাটা সতত সত্য নয়।

‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’ প্রকৃত প্রস্তাবে এমন একটি থিয়েটার যা একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ থিয়েটারের সদস্যগণের দ্বারা গঠিত হতে পারে; আবার অনেকগুলো গ্রুপের সদস্যগণ বা কোনো গ্রুপের সদস্য নয় এমন নাট্যজনদের দ্বারাও গঠিত হতে পারে। কথা হচ্ছে সবার মধ্যে নাট্যসৃষ্টির অদম্য শিল্পক্ষুধা থাকতে হয়, যা আলোচিত দুটি দলের সদস্যদের মধ্যে দেখা গেছে। ‘রেপাটরি থিয়েটার’-এর প্রচলিত সংজ্ঞা ও কার্যপ্রণালী অনুযায়ী দুটি দলই নাটকের মঞ্চায়ন স্বল্পতম সময়ের জন্য করেছে, গ্রুপ থিয়েটারের দীর্ঘতম সময় ধরে মঞ্চায়নের নিয়মের বিপরীতে। কিন্তু বাংলাদেশে চর্চিত এই থিয়েটার-উদ্যোগকে ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’ চর্চারই একটি নজির বলে সনাক্ত করতে চাই। বস্তুত সব সংজ্ঞা ও কার্যপ্রণালীই সময় ও সমাজবাস্তবতার কারণে পরিবর্তিত একটি রূপ ধারণ করতে পারে।
 
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেনো আমরা ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’ চর্চা করছি বা এই থিয়েটার চর্চার প্রয়োজনই-বা কেনো ও কোথায়? এর প্রয়োজন এ জন্য যে, বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটারগুলো এখন আর দলে থাকা সকল নাটককার, নাট্যনির্দেশক, অভিনয়শিল্পীসহ অন্যান্য শাখার প্রতিভাবান সদস্যদের একইসঙ্গে ব্যবহার করতে পারছে না। কী তাদের চলমান প্রযোজনায়, কী তাদের আগামী প্রযোজনায়। তাছাড়া গ্রুপ থিয়েটারগুলোও প্রধানত মিলনায়তনগুলোতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়ার কারণে তাদের প্রযোজনা বহুল পরিমাণে মঞ্চায়ন করার সুযোগ পাচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে ক্ষুধিত-পিপাসার্ত নাট্যজনদের একটি পথ হতে পারে ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’ চর্চা। এই থিয়েটার গ্রুপ থিয়েটারের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়- বরং এর একটি সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে এ সত্যও কবুল করা দরকার যে, প্রতিষ্ঠিত গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্টের বিরুদ্ধে ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’ তার ক্ষমতা-ঔদার্য নিয়ে দাঁড়াতে সক্ষম- যে গ্রুপ থিয়েটারসমূহ সততই হেজেমনিনির্ভর। শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই এ কথা প্রমাণিত নয়, পাশের দেশ পশ্চিমবাংলার নাট্য-ইতিহাসেও তার প্রমাণ বিদ্যমান। নতুনভাবে চর্চিত ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’ কনসেপ্টটি বাংলাদেশে অবস্থিত গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্টটিকে পুনঃসংজ্ঞায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাই জানান দেয়। এখন নাটক ও নাট্যপাগলদের সামনে দুটি পথই খোলা। তাদের আত্ম-বিমোক্ষণের জন্য তারা যেকোনো একটিকে বেছে নিতে পারেন। আবার একইসঙ্গে দুটিকে সঙ্গী করেও পথ চলতে পারেন। ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’ কনসেপ্টটি তাদের সামনে এরকম একটি পথ খুলে দিয়েছে।

মিনিমালিস্ট কনসেপ্ট থেকে নির্মিত নাটক শুধু বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার বা এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হয় নি, মূল মিলনায়তনেও হয়েছে। এখন নতুন স্পেস খুঁজে বের করা প্রয়োজন। আমরা শিল্পকলার মূল মঞ্চে ইংল্যান্ডের ‘ন্যাশনাল গ্লোভ থিয়েটার’ কর্তৃক মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে পরিবেশিত শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’ দেখেছি। পূর্ণদৈর্ঘ্যরে নাটকও যে এই অ্যাপ্রোচ থেকে নির্মিত হতে পারে ‘হ্যামলেট’ তার প্রমাণ। তাছাড়া, স্যামুয়েল বেকেটের সব নাটকই তো একই অ্যাপ্রোচ থেকে লিখিত ও প্রযোজিত। সেলিম আল দীনও একই ভাবনা তাড়িত হয়ে ‘একটি মারমা রূপকথা’ লিখেছিলেন। এসব তথ্য আমলে নিলে বলতেই হবে যে, অ্যাপ্রোচটি নতুন নয়- না দেশে না বিদেশে। আবার এ-প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে যে, এই অ্যাপ্রোচ থেকে যেমন নাটক রচনা করা যায়, তেমনি এই অ্যাপ্রোচ অবলম্বন করে লেখা হয় নি এমন নাটকও এই অ্যাপ্রোচ থেকে মঞ্চে নামানো যায়। এই অ্যাপ্রোচকে নাট্য উপস্থাপনের একটি কৌশল বলা যায়, যদিও বাংলাদেশে এর প্রয়োজন উপলব্ধির পিছনে সমাজ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক-অথনৈতিক কারণ বিদ্যমান।
 
লক্ষণীয় যে, শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরেও এই অ্যাপ্রোচ থেকে বহু বছর ধরে নাটক মঞ্চস্থ হয়ে আসছে। এ-প্রসঙ্গে ‘শব্দাবলী স্টুডিও থিয়েটার’-এর কথা বলা যায় যারা বিগত ২৬ বছর ধরে মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে নাটক মঞ্চস্থ করছে। আবার ‘গ্রাম থিয়েটার’, ‘মুক্ত নাটক দল’ বা বিভিন্ন এনজিও পরিবেশিত ‘গণনাটক’-ও এই অ্যাপ্রোচ থেকে হয়েছে-হচ্ছে। তাছাড়া, আবহমান কাল ধরে আমাদের লোকায়ত সংস্কৃতির অংশ হিসেবে নানা ধরনের লোকনাট্য-পালা-কিচ্ছা ইত্যাদি মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকেই হয়ে আসছে। একটি বালিশ কখনো ঘোড়া, কখনো বিছানা, কখনো নৌকা হিসেবে ব্যবহার করে পালাকার অনায়াসেই তা দর্শকবৃন্দের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলছে! পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নাট্যপ্রয়াসও মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে সম্পন্ন হয়ে থাকে।

তিন.
‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, এর জন্য যে নাটকটি বেছে নেওয়া হবে তা হতে হবে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে। এক ঘন্টা থেকে সোয়া এক ঘন্টার নাটক হলে ভালো হয়। প্লট-স্ট্রাকচার যদি লিনিয়ার ও ইউনিসেলুলার হয় তবে সবচেয়ে উত্তম। নাটককার যদি সাব-প্লট ব্যবহার না করেন এবং একটি মাত্র থিম নিয়ে কাজ করেন তবে সেটা হবে এ ধরনের থিয়েটারের জন্য আদর্শ নাটক। তাহলে দর্শকের পক্ষে নাটকের বেসিক প্রেমিজটি ও আন্ডারকারেন্টটি ধরতে সুবিধা হবে।

থিমটি হতে পারে নাটককারের একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান। হতে পারে সেটা ফিক্শনাল, সংক্ষিপ্ত। তাহলেই নাটকটি হয়ে ওঠবে নাটককারের ব্যক্তিগত অ্যাক্সপ্রেশন, ব্যক্তিগত স্টেটমেন্ট। বাস্তবতা থেকে থিম উৎপন্ন হলেও তা বাস্তববাদের প্রবল বন্ধন ভেঙ্গে বেরিয়ে গেলে তা নাটকে অ্যাবস্ট্রাক্ট মুহূর্ত-বক্তব্য তৈরিতে সহায়ক হবে; সেল্ফ-রেফারেন্সিয়াল মনোজগতের কথা ব্যক্ত করবে। কাহিনি-কাঠামোতে মেটাফোরিক উপাদানও প্রয়োজনবোধে যুক্ত করা যেতে পারে। থিম এবং প্লট-স্ট্রাকচার যেন দর্শকদের ক্ষেত্রে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে সেদিকে নাটককারদের নজর রাখতে হবে।

গ্রুপ থিয়েটারের ক্ষেত্রে নির্দেশকের যে ধারণা বিদ্যমান তা এই থিয়েটারের ক্ষেত্রে ততোটা প্রযোজ্য নয়। এই থিয়েটারের স্লোগানই হতে পারে ‘ডেথ অব ডিরেক্টর অ্যান্ড রাইজ অব আর্টিস্টস্’। কারণ গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্টে, কোনো কোনো দলকে বাদ দিলে, সর্বক্ষেত্রেই ডিরেক্টর কী-রোল বা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনিই পুরো থিয়েট্রিক্যাল অ্যাকটিভিটিজসমূহ নিয়ন্ত্রণ করেন। নাটক-অভিনয়শিল্পী-কারিগরিজন নির্বাচন থেকে শুরু করে আয়-ব্যয় নির্বাহ পর্যন্ত। কিন্তু ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’-এ প্রত্যেক সদস্যই সমান কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা-দায়িত্ব পালন করতে পারেন, পুরো নাট্যযজ্ঞটির শুরু থেকে শেষ তক্।

এই ধারার নাট্যের সেট হতে পারে সম্পূর্ণত ‘না হলেই নয়’ এরকম উপাদান নির্ভর। হতে পারে স্টার্ক রিয়ালিজম বা অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যাক্সপ্রেশনিজমের আদলে। তবে যে উপাদানেই সজ্জিত হোক, তা যেন হয় সিমপ্লিস্টিক, সাজেস্টিভ এবং মিনিমাল অবজেক্ট-অরিয়েন্টেড। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও অনাড়ম্ভর দৃশ্যসজ্জার পক্ষে ছিলেন যা অনেকটা মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ-ধারণার পর্যায়েই পড়ে। যাই হোক, মিনিমালিস্ট থিয়েটারের অ্যাকটিং প্যাটার্ন হতে পারে সুপ্রা-রিয়ালিস্টিক, খুব বেশি মাত্রায় থিয়েট্রিক্যাল না হয়ে। কস্ট্যুম-মেকআপও আড়ম্বরহীন হলেই ভালো হয়, যাতে তা দর্শককে খুব বেশি সেসবের দিকেই বুঁদ হয়ে যেতে বাধ্য না করে। আলোক সম্পাতের ধরনও ‘স্মল ইজ বিউটিফুল’ এই ধারণার বশবর্তী হতে পারে। সবকিছুর ব্যবহারই এমন হওয়া দরকার, যাতে দর্শকের মন নাট্যে ব্যবহৃত উপাদানগুলোর চাইতে নাট্যযজ্ঞের অভিযাত্রার প্রতিই নিবিষ্ট থাকে।

এই ধাঁচের নাট্যের আবহসংগীত ইম্প্রেশনিস্টিক ও অ্যাক্সপ্রেশনিস্টিক- উভয় ধারাতেই নিষ্পন্ন  হতে পারে। এটা নির্ভর করে নাট্যমুহূর্তের ধরনের ওপর। দর্শকমনে অভিঘাত তৈরি করাই হবে আবহসংগীতের মূল কাজ। তবে নীরবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করা দরকার। কারণ নীরবতার সেই শক্তি আছে যা দিয়ে ইমোশন, অ্যাংজাইটি, সেক্সচ্যুয়াল ডিজায়ার ইত্যাদি কার্যকরভাবে মঞ্চে উপস্থাপন করা যায়। শত সংলাপেও তা কখনো কখনো সম্ভব  না-ও হতে পারে। বস্তুত সেই নাট্য-নির্দেশকই শ্রেষ্ঠ যিনি জানেন নাট্যযজ্ঞের কোথায়-কখন নীরবতা তৈরি করতে হবে। মঞ্চে নীরবতা তৈরি করতে নীরবতার শুরু ও শেষে শব্দ দিতে হয়। মঞ্চের নীরবতা শূন্যতার জন্ম দেয়। দর্শকের মনে তখন একটা শূন্য সাইকোলজিক্যাল স্পেস তৈরি হয়। দর্শক তখন নাট্যে না বলা কথা-বিষয় সম্পর্কে ভাবতে পারেন। ভাবনার এই স্পেস তৈরি করে দেয় নীরবতা। এই পথে দর্শক নাট্যযজ্ঞের একটি অংশে পরিণত হন। নীরবতা এভাবেই স্টোরি লাইন-অ্যাপে নিজে থেকে একটা ট্রাজেকটরি তৈরি করে দেয়।

বলা হয়েছে বটে যে, ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’-এর ফ্যাংশনাল পার্টটি সিমপ্লিফাইড স্ট্রাকচারের ওপর ভর করে দাঁড়াবে। তবে তার মানে এই নয় যে, এই স্ট্রাকচারের শিল্পমূল্য না থাকলেও চলবে। বরং একটি সিম্ফনী বা অর্কেস্ট্রার যে কাঠামো থাকে, শিল্পসূষমা থাকে, এই থিয়েটারের শরীরেও তা থাকতে হবে। নইলে দর্শক-মনে কোনো অভিঘাত তৈরি করতে সক্ষম হবে না।

এ কথাও মনে করা ঠিক হবে না যে, এই থিয়েটারের মূল মন্ত্র হচ্ছে ‘অল্প দিয়ে অধিক’ সৃষ্টি করা। যা-ই  মঞ্চে নামানো হোক না কেনো তার নান্দনিক সৌকর্য ও পারফেক্শন থাকতেই হবে। সকল উপাদানের ঐকত্রিক তানে মঞ্চমাঝে এমন একটা ক্রিটিক্যাল আবহের জন্ম দিতে হবে যেখানে দর্শক শুধু একজন অনলুকার নন, একজন টিকেট কেটে মিলনায়তনে প্রবেশ করা নির্লিপ্ত সত্তার অধিকারী মানুষ নন, বরং উপস্থাপিত নাট্যযজ্ঞের ক্রিটিক হয়ে উঠবেন। এ জন্য এই নাট্যযজ্ঞের সেই ক্ষমতা থাকতে হবে যাতে উপস্থাপনাটি দর্শক সত্তাকে এক ঘণ্টা বা সোয়া ঘন্টার জন্য কব্জা করে ফেলতে পারে।
 
এই ধারার থিয়েটারের একটা বিশেষ দিক হতে পারে মিনিমাম থিয়েট্রিক্যাল অ্যাপারেটাস দিয়ে ম্যাক্সিমাম অ্যাফেক্ট তৈরি করা। অল্প প্রোডাকশন ব্যয়, অল্প আয় হচ্ছে এই থিয়েটারের ইকোনোমিক স্ট্র্যাটেজি। যদিও সিম্পলিসিটি হচ্ছে এই থিয়েটারের বেসিক প্রিন্সিপাল, তাই বলে কোনো নাট্যিক উপাদানকেই হালকা চালে ব্যবহার করলে চলবে না। ‘মিনিমালিস্ট থিয়েটার’-কে হতে হবে সবদিক দিয়েই এলিগ্যান্ট একটি উপস্থাপনা, নইলে ক্ষধার্ত-অতৃপ্ত-দলছুট নাট্যযোদ্ধাদের পক্ষে নতুন এই নাট্যযুদ্ধ জয় করা সম্ভব হয়ে ওঠবে না।

যুদ্ধ জারি আছে - সিপাহি অ্যাড্ভান্স।

পুনশ্চ-এক : উপরিল্লিখিত রচনাটি ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন’-এ সেমিনার পেপার হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল। রচনাটির বিষয়বস্তু যে বাংলাদেশের চলমান নাট্যবাস্তবতায় প্রাসঙ্গিক তা  ৫ মে ২০১৭ সালে শিল্পকলা একাডেমির ১নং মহড়া কক্ষে মামুনুর রশীদ কর্তৃক কার্ল মার্কস-এর ১৯৯তম জন্মদিন উপলক্ষে ‘বাঙলা থিয়েটার’ থেকে ‘কার্ল মার্কস ইন সোহো’ নামক এক চরিত্র ও এক দৃশ্যের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যরে নাটকের পাণ্ডুলিপির পাঠাভিনয় থেকে প্রমাণিত। হাওয়ার্ড জিন রচিত নাটকটির ভাষান্তর করেছেন জাভেদ হুসেন। বাংলাদেশে এই প্রথম একটি নাটকের পাণ্ডুলিপির পাঠাভিনয় দর্শনীর বিনিময়ে দর্শক দেখতে-শুনতে পেলেন। বলা প্রয়োজন যে, নাটকটি মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ থেকে করা অথবা বলা যায় সেই অ্যাপ্রোচেরই যেন এটি একটি অ্যাক্সটেনশন! এর সেট মিনিমাল অবজেক্ট-অরিয়েন্টেড- একটি টেবিল ও একটি চেয়ার। সাধারণ প্যান্ট-শার্ট পরা কার্ল মার্কসরূপী মামুনুর রশীদ। মেকআপ বলতে কিছু নেই। একটি মাত্র স্পট লাইট অভিনয়শিল্পীর ওপর পরা।
 
মিনিমালিস্ট থিয়েটার যে অর্থনৈতিকভাবেও স্বচ্ছল হয়ে ওঠতে পারে তার উদাহরণ এই পাঠাভিনয়। মাত্র পাঁচশত টাকা মহড়াকক্ষের ভাড়া। একটি মঞ্চায়নে একশোজন দর্শক আর পঞ্চাশ টাকা টিকিটের মূল্য হলে পাঁচ হাজার টাকা টিকিট বিক্রি বাবদ্ আয়। পরপর দুটি মঞ্চায়ন করলে দশ হাজার টাকা আয়। এখানেই মিনিমালিস্ট থিয়েটারের শক্তির দিকটি নিহিত। নাটকটির বিষয় আমাদের বর্তমান সমাজকাঠামো ও বিশ্বব্যবস্থায় প্রচ-ভাবে প্রাসঙ্গিক। পুঁজিবাদ যে ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র পরিসরে শোষণ-অসাম্য-অনন্বয়-পারক্য তৈরি করে তা এ-নাটকে বুদ্ধিদীপ্ত ও কৌতুকপূর্ণ সংলাপের ভিতর দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ নাটকে কার্ল মার্কস বলছেন যে, শিল্প তথা অস্ত্র-ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্যই পুঁজিপতিরা বিশ^জুড়ে যুদ্ধ বাঁধিয়ে রাখে। কথাটি কি আজকের সময়ের জন্যও প্রাসঙ্গিক নয়?
 
মিনিমালিস্ট থিয়েটার সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে দর্শকের চেতনার স্তরের উন্নতি ঘটাতে পারে। বস্তুত একটা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন তখনই হয় যখন জনগণের চেতনার স্তর ঐ পরিবর্তনকে ধারণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। এই প্রস্তুতির কাজে নাট্যে-পাওয়াগণ মিনিমালিস্ট থিয়েটারচর্চার মাধ্যমে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। আমি নিশ্চিত ভবিষ্যতেও এ-ধারা অব্যাহত থাকবে। মঞ্চ-সিপাহিরা কখনো থেমে থাকে না।
 
পুনশ্চ-দুই : রাজশাহীর ‘অনুশীলন নাট্যদল’ শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে নিজস্ব নাট্য-নির্মাণ রীতির অনুসন্ধান প্রচেষ্টা চালাচ্ছে গত দুই দশক ধরে। এই রীতিতে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের আঙ্গিকগুলোকে আধুনিক নাট্যরীতির সাথে সমন্বিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এর সাথে জোর দেওয়া হচ্ছে, যেকোনো স্থানে মঞ্চায়নযোগ্য (এমটি স্পেস), সহজ বহনযোগ্য (পোর্টেবল) ও স্বল্প ব্যয়ে নির্মাণ (লিস্ট কস্ট)- এই তিন বৈশিষ্ট্যের ওপর। আর এ বৈশিষ্ট্যগুলো নেওয়া হয়েছে আমাদের বাংলা নাট্যরীতির বিপুল ভাণ্ডার থেকেই। গত এক দশকে দলে এই রীতিতে নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি প্রযোজনা যেমন ‘ভূমিকন্যা’ (প্রথম মঞ্চায়ন ২৪ মে ২০০৭), ‘উত্তরখনা’ (প্রথম মঞ্চায়ন  ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১২), ‘দণ্ড’ (প্রথম মঞ্চায়ন ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩), ‘এন্তারনেট’ (প্রথম মঞ্চায়ন ০৪  অক্টোবর ২০১৬) ও ‘ম্যাওসংকেত্তন’ (প্রথম মঞ্চায়ন ২৭ ডিসেম্বর ২০১৭)। এগুলোকে রচনা-বৈশিষ্ট্য ও মঞ্চায়ন-প্রবণতার দিক থেকে বিবেচনা করে মিনিমালিস্ট থিয়েটারভুক্ত করা যায় বৈকি।  

বি.দ্র.: লেখাটি নাট্যপত্রিকা ‘আনর্ত’র প্রথম সংখ্যায় ছাপানো হয়েছে। লেখক ও সম্পাদকের অনুমতি নিয়ে এটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো- সম্পাদক

সাজেদুল আউয়াল (dr.sajedulawwal@yahoo.com): চলচ্চিত্রকার, নাটককার ও চলচ্চিত্রবিদ্যার শিক্ষক।