Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

সেলিম আল দীনের ‘স্বর্ণবোয়াল’: প্রসঙ্গ প্রাচ্য দর্শন

Written by লাবণ্য মণ্ডল.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

বাংলাদেশের একজন নাট্যকার যিনি নাটককে কেবল নাটক হিসেবেই নয়, এক চিরায়ত ও পূর্ণাঙ্গ শিল্পমাধ্যম হিসেবে দেখেছেন; তিনি নাট্যকার সেলিম আল দীন (১৯৪৯-২০০৮)। সেলিম আল দীন নাট্যইতিহাসকে কালো গহ্বর থেকে সর্বসমক্ষে আনতে সচেষ্ট হন। বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারাটির পুনঃপত্তনে প্রয়াসী হন তিনি। তবে প্রাচীনত্বে ফিরে যাওয়া নয়, মূল ধারাটিকে আধুনিককালে সংস্থাপন ও এর মাধ্যমে স্বতন্ত্র নাট্যনির্মাণ তাঁর অভিষ্ট। তিনি বলেন: ‘লোকায়ত সংস্কৃতির মধ্যে ক্ষয়ে ধুয়ে গিয়ে যে সকল শিল্প আঙ্গিক এখনো বিদ্যমান, তার শক্তি সম্পর্কে আমাদের সন্দেহ থাকা উচিত নয়। এটাও একটা অন্বেষণ, ইতিহাসের খোঁজ।’  এই সন্ধানে ব্যাপৃত নাট্যকার সেলিম আল দীন। বর্ণনাত্মক ঢঙে বিশাল প্রেক্ষাপটে নাট্যকথন, সে উপযোগী চরিত্র ও আখ্যান নির্মাণ এবং দেশজ তত্ত্ব-দর্শন এর সমাবেশ ও সমন্বয় সাধিত হয়েছে সেলিম আল দীনের নাটকে।

সেলিম আল দীন দেশজ শিল্পরীতি-সংস্কৃতি-দর্শন আবিষ্কারের অভিপ্রায়ে নাটক রচনায় মনোনিবেশ করেন। যা মহানায়কের গল্প, প্রবলের প্রতাপ বা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পটকে ধারণ না করে, সাধারণ জনপদবাসীর আখ্যান পরিবেশন করে। নাট্যকারের অভিপ্রেত দর্শন ও কৌশল গুণে সেই আখ্যান মহা-আখ্যানের রূপ পায়। যেখানে বাংলা অঞ্চলের সাধারণ নিম্নবিত্ত ও বর্গ তাদের স্ব-স্ব মহিমা নিয়ে সগৌরবে বিরাজিত। সেলিম আল দীনের লক্ষ্য বঙ্গদেশের আখ্যান রচনা, যা আগে লেখা হয় নি; প্রথিত ব্যক্তি ও ইতিহাসের আয়োজনে যে মানুষ ও দেশ লুপ্ত হয়েছিল তিনি তাকে পুনরাবিষ্কার করেন। অখ্যাত অজ্ঞাত মানুষের জীবনময় দর্শন অনুসন্ধান করে ফেরেন- নিরত অভিযাত্রায়রত সেই মূলদেশ-সন্ধানী নাট্যকার। একের পর এক নাটকের আঙ্গিক, বর্ণনা-কৌশল, আখ্যানের জগৎ বদলের মাধ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যান। অতঃপর উৎকর্ষ সাধন ও নীরিক্ষাধর্মী প্রবণতাবশত নাটকের আঙ্গিক ও বিষয়ে বহু বিচিত্রতা পরিলক্ষিত হয়।

প্রাচ্য দর্শনে ধর্ম-দর্শন প্রায় অভিন্নভাবে বিরাজ করে। ভারতবর্ষে আর্যদের আগমনে তাদের সংস্কৃতি-দর্শন এদেশীয় বিশেষত বাঙালির মাঝে যতটা প্রভাব বিস্তার করে; অনার্য বাঙালির সংস্কৃতি-দর্শনকে ততোধিক নিজেদের সাথে মিলিয়ে নিয়েছে তারা। ফলত বাঙালিরা তাদের প্রাকৃত ধর্ম-দর্শন-সংস্কৃতিকে স্বরূপে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এই প্রাকৃত-ধর্ম তাদের চলার পথে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নি, তত্ত্ব-দর্শন-জ্ঞানের পরিধিকে গণ্ডিবদ্ধ করে দেয় নি। নাট্যকার সেলিম আল দীন এই অবারিত জ্ঞানকাণ্ডের সন্ধান করেন তাঁর নাটকে। কাঙ্ক্ষিত শিল্পআঙ্গিক প্রাপ্তি এবং অভিযাত্রার মাধ্যমে স্বভূমি অভিমুখি হন। অতঃপর সেই শিল্পআঙ্গিকে ভর করে এবং স্বভূমির পানে দৃষ্টি রেখে দেশজ তত্ত্ব-দর্শন তথা ‘আত্ম’ সন্ধান করে ফেরেন।

নাট্যকার সেই জীবনের গূঢ়তম প্রদেশ থেকে ছেঁকে আনেন তাদের প্রাকৃত দর্শন-ধর্ম, সাধ-সাধ্য-সাধনা-সিদ্ধির রূপকথা। নাট্যকার পরিণত পর্বে রচনা করেন ‘প্রকৃতি আর প্রাকৃতজনের’ স্বর্ণবর্ণ মৎস্য-শিকারের কাহিনি ‘স্বর্ণবোয়াল’। বংশানুক্রমিকভাবে মৎস্য শিকারের সাথে যুক্ত জনম মাঝি, খলিশা মাঝি ও তিরমন চিরজীবন স্বর্ণবোয়াল শিকারের স্বপ্ন দেখে। তাদের জয়-পরাজয়, সুখ-দুঃখ, জীবন-জীবিকা, প্রেম-পরিণয়, খ্যাতি-অখ্যাতি, পাওয়া-না-পাওয়া সবকিছুর নির্ণায়ক হয় স্বর্ণবোয়াল নামক মাছটি।একপর্যায়ে ঐ নিকারিগোষ্ঠীর কাছে মাছটি সাধনার সর্বোচ্চ বিন্দু বলে প্রতিভাত হয়। অতঃপর চলে সাধ্য-সাধনার দ্বন্দ্ব। সেলিম আল দীন এই দ্বন্দ্বের ভেতর ভারতীয় ‘কর্মযোগ’ ‘সাংখ্য’ প্রভৃতি দর্শনের সমন্বয় লক্ষ্য করেন।

সোনালি বর্ণের অদৃশ্যপূর্ব এক বোয়াল মাছের সন্ধানে এক নিকারিবংশের তিনপুরুষের জীবন বাহিত হয়। প্রথমে জনম মাঝি সেই মাছের দেখা পায় এবং তার পিছনে ধাওয়া করে। যে অজ্ঞাত মাছ তাকে চিরলি নদীতে ডিঙাসহ ডুবিয়ে মারে। জনম মাঝির পুত্র খলিশা মাঝিরও ছেলেবেলা থেকে লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ঐ স্বর্ণবোয়াল। সে জানে গভীর রাতে ঐ মাছের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা অধিক। ঝড়-ঝঞ্ঝার রাতেও তার মৎস্য-শিকার অভিযান অব্যাহত থাকে। যা তার কাল হয়ে দাঁড়ায়, মৃত্যু ঘনিয়ে আসে ওস্তাদ-শিকারী খলিশা মাঝির। অতঃপর তস্যপুত্র তিরমনের পালা শুরু হয়। এই স্বর্ণবোয়াল তিরমনের সমস্ত অপ্রাপ্তি ও প্রাপ্তির কারণ হয়ে যায়। সে জীবনকে পর্যবেক্ষণ করে এই মাছ-শিকারের মধ্য দিয়ে। নাট্যকার মাছ শিকারের অভিনব ঘটনার রূপকে মানবের জীবনভর সাধনা-সংগ্রামের কথাটিই যেন ব্যক্ত করেন। অবশ্য খলিশা মাঝি বা তিরমনের কাছে তা রূপক নয়, বাস্তবিকই সাধনা হয়ে দেখা দেয়। প্রথমে তা জেদ বা প্রতিশ্রুত কার্য থাকলেও একসময় নিষ্কাম কর্মের পর্যায়ে চলে যায়। কেবল কাজের জন্য কাজ বা লড়াইয়ের নিমিত্ত লড়াই করে চলে তিরমন। সর্বপ্রকার পাওয়ার আশার অন্তর্ধান ঘটে।

খলিশা মাঝি জীবিকার তাগিদে মাছ শিকার করে কিন্তু স্বর্ণবোয়াল তার জীবিকার সাথে নয় জীবনের সাথে সম্পর্কিত। এমনকি যশ-খ্যাতির মোহও সেখানে মুখ্য বিষয় নয়, সোনালি মৎস্যের অর্ন্তধানে যে গহ্বর সে দেখেছিল, সেই গভীর শূন্যতা পূরণের আকাঙ্ক্ষা তার অবচেতনে ক্রিয়াশীল থাকে। এই তাগিতে ঝড়-বাদলের রাতেও খলিশা মাঝি বেউলার বিলে যায়। স্বর্ণবোয়াল যেন তাকে ‘আয় আয়’ বলে ডাকে, যা মূলত অন্তরাত্মার ডাক। সিঙড়াসহ আরো অনেক তুখোড় শিকারীর বাস আছে গ্রামে কিন্তু মাছের সেই আহ্বান তারা শুনতে পায় না। কারণ, স্বর্ণবর্ণ এই মাছ তাদের কাছে কেবলই এক অদ্ভুত মাছ। লোভ আর যশের বশবর্তী হয়ে তারা সেই মাছ কামনা করে। কিন্তু স্বর্ণবোয়াল শিকার তো দূরের কথা, তার দর্শন প্রাপ্তির জন্যও চাই একাগ্রতা ও শ্রদ্ধা।

খলিশা মাঝির আজীবনের চাওয়া ওই স্বর্ণবোয়ালকে নিয়ে। অবশ্য শিকারের প্রতি সে সর্বদা সহানুভূতিশীল। দক্ষ মৎস্য-শিকারী খলিশা মাঝি মৃত মাছের চোখে তাকাতে পারে না। এক অপরাধবোধ কাজ করে। নাট্যকারের বর্ণনায়: ‘বেড়জাল-কি উজান ঠেলা বড়শি গাঁথা কোঁচবিদ্ধ মাছ-ধরা পড়ার পরে ক্রেতার চোখে যতই বিস্ময় ও আকর্ষণ চকচক করে উঠুক না কেন- খলিশা মাঝির চোখ হাপর দেওয়া কি মৃত মাছের চোখের মতোই মৃত্যুশ্বাস কষ্টে ভরে যায়।’ খলিশা মাঝির ধর্ম মৎস্য-শিকার এবং সেই ধর্মের চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বর্ণবোয়াল নামক মাছের অধিষ্ঠান। খলিশা মাঝির জীবনাচরণে প্রথাগত ধর্ম-কর্মের নমুনা মেলে না। বরং তার স্ত্রীর অনুযোগ যে, সে চিরকাল কেবল মাছের পিছনে ছুটল নামাজ-রোজা সব বাদ দিয়ে।
 
নিম্নবিত্ত শ্রেণিপেশাকে ধর্ম বলে মানে। বৃত্তি দিয়েই তাদের পরিচয় নির্ণীত হয়। বংশপরম্পরায় চলে আসা পেশা বা বৃত্তি ছেড়ে ভিন্ন পেশা গ্রহণকে বংশের অসম্মান বলে গণ্য করা হয়। তাই তার প্রতি স্বাভাবিকভাবেই ভক্তি, সম্ভ্রম থাকা উচিত। ভারতবর্ষের এই পেশাভিত্তিক জীবনাচরণ সম্পর্কে ভিনদেশী পণ্ডিত আল-বেরুনী বলেন: ‘হিঁদুরা এই চার জাতির (ব্রাহ্মণ, ক্ষয়িত্র, বৈশ্য ও শূদ্র) প্রত্যেক ব্যক্তিকে পেশাগত কারণে বিভিন্ন নাম দিয়ে রেখেছে- যা তাদের পেশারই পরিচয়বাহী। উদাহরণস্বরূপ: ব্রাহ্মণকে তখন পর্যন্তই ব্রাহ্মণ বলে গণ্য করা হয়, যতক্ষণ সে ঘরে বসে নিজের কর্মে লিপ্ত থাকে। ঐ রকমই অন্যান্য জাতির ক্ষেত্রেও প্রযুক্ত হয়।’  চারজাতির বাইরে অন্যান্য জাতি বা বর্ণের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম। জেলে, কামার, ছুতার, প্রভৃতি নিম্ন শ্রেণি-পেশার মানুষেরা স্ব-স্ব পেশাকে সাধনা বলে মানে। এমনকি নিজেরাই পেশা ও পারিপার্শ্বজাত বহু দেব-দেবীর উদ্ভাবন করে নেয়। ‘শিব’,‘ধর্ম-ঠাকুর’, ‘আদিনাথ’, ‘গোরক্ষনাথ’, ‘মনসা’, ‘বাসুলী’, ‘কালী’ সবই নিম্নশ্রেণির জীবন জীবিকার প্রয়োজনেই সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সাপ, কচ্ছপ, মাছ, বিভিন্ন গাছ-পাথর-পাখিতে তারা যে দেবত্ব আরোপ করে, তা তাদের জীবনাচারণেরই ফসল। ‘স্বর্ণবোয়াল’ নাটকে জনশ্রুত মাছটি হয়তো আর এক পুরুষ পর থেকে রীতিমতো আঞ্চলিক দেবতা হয়ে উঠবে।

নাট্যকার সেলিম আল দীনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য- তিনি সাধারণ, সাদামাটা জীবন ছেঁকে গূঢ়তম কথাটি বার করে নিয়ে আসেন। তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যে, ঐ সাধারণ বিষয় একটি অভিক্ষিপ্ত বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। ‘স্বর্ণবোয়াল’ নাটকে এক বৈচিত্র্যহীন মৎসজীবী অঞ্চল বিশেষকরে একটি পরিবারকে ঘিরে যে উপাখ্যান রচিত হয়েছে, তা ঐ অঞ্চল ও মানুষদের এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে এবং তারা রীতিমত মিথিক্যাল চরিত্র হওয়ার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

মৎস্য-শিকার বাংলা অঞ্চলের আদিমতম পেশা। অসংখ্য-অগণিত নদী-উপনদী, হাওড়-বিল বাংলার সমগ্র এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। যেগুলো মাছের চারণভূমি। কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থার পূর্ব পর্যন্ত শিকার-ই ছিল প্রধান ও একমাত্র পেশা। বাঙালির আদি বংশধরদের মধ্যে কিরাত, নিষাদ, কৈবর্ত, মালো প্রভৃতি জাতি উল্লেখযোগ্য; মাছ বা পশু-পাখি শিকার করে যারা জীবিকা নির্বাহ করত। কৃষিকাজ শুরুর পর শিকারের গুরুত্ব কমে গেলেও বংশানুক্রমভাবে কতিপয় জাতি পূর্বপুরুষের পেশায় বহাল থাকে। এছাড়া ভূমিহীনদের জীবিকার উৎস হিসেবে মৎস্য-শিকার বেশ জনপ্রিয় বৃত্তি। তাই মৎস্য-শিকারের আখ্যান বাংলার ইতিহাসের অংশবিশেষ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬), অদ্বৈত মল্লবর্মণ (১৯১৪-১৯৫১) এর উপন্যাসে জেলে জীবন বা মৎস্য-শিকার পেশার নিদর্শন পাওয়া যায় কিন্তু নিম্নবর্গের জীবিকারূপেই সেই বৃত্তির পরিচয় মেলে।

সেলিম আল দীন ‘মাইক্রো-লেভেল’ থেকে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বৃত্তিকে অবলোকন করেন। একটি নিকারি পরিবারের মাছ শিকারকে কেন্দ্র করে নাট্যকাহিনি সম্মুখ পানে এগিয়েছে। ঐ শিকারকে জীবনের সার্থকতার সাথে সমভাবে বিশ্লেষণ করেন, যেখানে মৎস্য-শিকার সাধনার পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বাংলার লোকধর্ম, সাধনা বিষয়ে গবেষক বলেন:

বাংলার এই ধর্ম প্রবর্তিত ধর্ম নয়- লোকায়ত লোকধর্ম। ভৌগলিক প্রভাবে ও ঐতিহাসিক কারণে সমাজ বিবর্তনের ধারায় এর কালিক সৃষ্টি ও পুষ্টি সম্ভব হয়েছে। এ ধর্ম গোষ্ঠীর তথা সামাজিক মানুষের যৌথজীবনের দান- জনমানবের জীবনচেতনা ও জীবিকাপদ্ধতির প্রসূন; গণ মন-মননের রসে সঞ্জীবিত গণ-সংস্কৃতির প্রমূর্ত প্রকাশ। এই ধর্ম ও সংস্কারের এবং আচার ও অনুষ্ঠানের মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রাচীন বাঙালির পরিচয় ও আধুনিক বাঙালির ঐতিহ্য। ইতিহাসের আলোকে স্বরূপে আত্মদর্শন করতে হলে এসবের সন্ধান আবশ্যিক।

স্বর্ণবোয়ালকে তাত্ত্বিক অথবা চলমান জীবনের প্রেক্ষিতে উভয়ভাবে বিচার করা চলে। তত্ত্বগত দিক থেকে দেখলে মানবের ‘ষড়রিপু’ বনাম সাধনার লড়াই গোচরীভূত হয় খলিশা মাঝি ও তিরমনের মাছ-শিকারের লড়াইয়ে। জীবনের পরাকাষ্ঠা অর্জনে যে বাধা, তাকে প্রতীকায়িত করা যায় শিকারকালীন ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ প্রতিকূল পরিবেশ ও আত্মমোহ, মাৎসর্য ও লোভকে। এটা জোর-কল্পনা নয়, বরং নাট্যকার সপ্রণোদিত হয়ে এই প্রত্যয়ের পক্ষে নাটকের বর্ণনা করেছেন। যেমন: স্বর্ণবোয়াল প্রসঙ্গে ‘কিংবা সে স্বর্ণবোয়াল কিন্তু স্বর্ণবোয়াল নয়- পৃথিবীর আদিমতম সত্যের ভিতর মানুষের জয়-পরাজয়ের অতীত এক জলদিগন্ত।’

বাস্তব জীবন-জগতের পরিপ্রেক্ষিতে ‘স্বর্ণবোয়াল’ জীবনের প্রতি অনুগত এক শিল্প-আখ্যান। যেখানে নিকারি খলিশা বা তিরমন নিজ বৃত্তিতে অনুরক্ত, তার সমস্ত আশা-স্বপ্ন মাছ-শিকার বা শ্রেষ্ঠ এক মাছ শিকার। অন্যদিকে প্রেমিক তিরমন প্রণয়ীতে সৃষ্টিকর্তার রহস্য অবলোকন করে। শেষে শিকারি ও প্রেমিক অভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়ে জীবনের অর্থ অনুসন্ধান করে। কিছু না পেয়েও সে নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে পারে না। সে জানে তার নতুন করে প্রাপ্তি বা ক্ষতির সম্ভাবনা ক্ষীণ তবু একটা স্বপ্নের ঘোর আর আত্ম-সন্তোষ নিয়ে তিরমন বেঁচে থাকে। পৃথিবীতে টিকে থাকতে এটুকু তার অপরিহার্য, তাই সে তা অন্তরে লালন করে। তার প্রত্যয়কে নাট্যকার এভাবে বলেন: ‘এক জীবনের সকল গহীনতা এক ব্যর্থ স্বর্ণবোয়াল শিকারের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছে সে। সে আকাশে তাকায়। এই আকাশের চেয়েও আরেক বেশি আকাশকে যেন বা দেখে ফেরে।’

ভারতবর্ষীয় সাংখ্য দর্শন ও সুফীবাদের ছাপ পরিলক্ষিত হয় তিরমন-সাঁঝমালার প্রেম-গাঁথায়। সাঁঝমালার সাথে প্রথম মিলনের পর তিরমনের কর্মে মনোনিবিষ্ট হয়, মৎস্য-শিকারে গিয়ে চরম দুঃসময়ে কল্পনা অথবা বাস্তবে সাঁঝমালার সাথে একাত্ম তথা বিবাহের মাধমে তার সাধনা পূর্ণতা পায়, সে কার্যে সফল হতে না পারলেও এই উপলব্ধি জন্মে যে, সে ব্যর্থ নয়। সাঁঝমালার সংস্পর্শে এসে তিরমনের সিদ্ধিলাভ হয়।

বাস্তব বা তাত্ত্বিক যে দিক দিয়ে বিচার করা হোক না কেনো শেষ পর্যন্ত একটি বিন্দুতে মিলিত হচ্ছে। তা হলো সাধনা। কখনো পরমের সাধনা কখনো জীবন সাধনা বলে প্রতীয়মান হয়। অবশ্য জীবনের মাঝেই তো পরম লুকিয়ে আছে।

অনেক সমালোচক সেলিম আল দীন প্রণীত ‘স্বর্ণবোয়াল’ কে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (১৮৯৯-১৯৬১)-এর ‘দ্য ওল্ড ম্যান এ্যান্ড দ্য সি’ এর সাথে তুলনা করে বিচার করেন। বিষয়, বর্ণনা, পরিণতি বিচারে এ দুয়ের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু অর্ন্তনিহিত দর্শন বুঝতে গেলে আগে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রভেদ জানতে হবে। প্রাচ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য, তা কেবল বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিচার করে না এবং কোনো কিছুকে এককভাবে নেতিবাচক মনে করে না, নেতির ভেতর ইতি বা কল্যাণ খুঁজে নিতে পারে। পাশ্চাত্য জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে আলোচনা করে। অর্থাৎ পাশ্চাত্য দর্শন বিশ্লেষণধর্মী। অন্যদিকে প্রাচ্য দর্শন সংশ্লেষাত্মক বা সমন্বয়ধর্মী। পাশ্চাত্যের বস্তুকেন্দ্রীক চিন্তার স্থলে প্রাচ্য ভাব-বস্তু সমগ্রকে ধারণ করতে সক্ষম। একদিকে যেমন ‘বেদান্ত’ দর্শনের আধিপত্য অপরদিকে ‘চার্বাক’, ‘মায়াবাদ’ ও ‘জৈন’ দর্শনও দাপটের সাথে বিদ্যমান। ‘স্বর্ণবোয়াল’ এ তেমনি বিপরীতধর্মী দর্শন অভিন্ন বিন্দুতে মিলিত হয়। নাট্যকার জীবিকা, প্রেম, তত্ত্ব-দর্শন, নিম্নবিত্ত জনমানুষকে স্ব-স্ব মহিমায় উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। বহুমাত্রিকতা সৃষ্টির সাথে সাথে তার তল স্পর্শ করেছেন। ‘স্বর্ণবোয়াল’ বিষয়ে নাট্যকারের ভাবনা:
 
‘স্বর্ণবোয়াল’ একটু ডিফারেন্ট, তা এই অর্থে যে, ওয়েস্টার্ন জয়-পরাজয়ের কনসেপ্টের যে জায়গাটা, সেখানে এ নাট্যে আমি প্রাচ্যকে প্রতিষ্ঠা করেছি। ফলে আমি মনে রেখেছি যে, মেলভিনের লেখা `The white whale’ তে বিশাল মাছ শিকারের গল্প বা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো মহান লেখক বিশেষ করে তাঁর ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’র মতো লেখা পৃথিবীতে থাকার পরও আমি কেন স্বর্ণবোয়াল লিখেছি। আমার মনে হয় যে, তাদের লেখাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই তাদের থেকে ভিন্নমত পোষণ করেছি। ওয়েস্ট থেকে যে আমি ভিন্নমত পোষণ করতে পারছি মানে, ‘স্বর্ণবোয়াল’ লিখতে গিয়ে দেখলাম যে, আমি ওয়েস্ট থেকে ভিন্ন।

পাশ্চাত্যে জয়-পরাজয়বোধ প্রবল, পরাজয়ের ফলাফল যে শুভত্বে পরিণত হতে পারে, এ তাদের ধারণার বাইরে। তার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নির্মিত হয় বস্তুগত দিক দিয়ে। অন্যদিকে প্রাচ্য পরাজয়ের মাঝেও মহান প্রাপ্তির খোঁজ পায়। অর্থাৎ জয়-পরাজয়ের হিসাব এখানে আপেক্ষিক। প্রাচ্যের ভাববাদী দর্শনের মূল্য এখানে। সবকিছু চলে যাওয়ার পরও টিকে থাকার মতো রসদ সে ঠিকই জোগাড় করে নিতে পারে।

নাটকে স্বর্ণবোয়াল একটা ভাবগত বিগ্রহ হয়ে দাঁড়ায়। বাস্তবে তার কোনো উপযোগিতা নেই। খলিশা মাঝি বা তার পিতা জনম মাঝি জানত না তারা কেনো ঐ মাছ শিকারে প্রাণপণ করছে। স্বর্ণবোয়াল তারা অর্থের বিনিময়ে বিকোবে বা উদরসাৎ করবে তেমন নমুনা বা উচ্চারণ কোথাও পাওয়া যায় না। কারণ, তাদের কাছে সে মাছ অতি সম্ভ্রমের মাছ, সাধনার ধন। তিরমন অপঘাতের বদনাম ঘুচাবার জন্য শিকারে প্রবৃত্ত হলেও পরক্ষণে সেও উদ্দেশ্যশূন্য হয়ে লড়াই করে যায়।

আধুনিক সভ্যতাজাত মূল্যবোধ মানুষকে উপযোগ সৃষ্টিকারী বিষয় বা বস্তুতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে শেখায়। পুঁজিবাদ সেদিকেই ব্যক্তিকে চালিত করে যেখানে নগদ পুঁজির আশা আছে। আধুনিকতা, বাস্তববাদ, পুঁজিবাদ প্রত্যয়গুলো প্রায়-সমার্থক হয়ে গেছে। যেকোনো একটি শব্দের ব্যবহারে অন্যগুলোরও উল্লেখের দরকার পড়ে। এহেন পরিপ্রেক্ষিতে নাট্যকার প্রাচ্যমানবের উপযোগিতাহীন কর্মের যে প্রয়াসকে তাৎপর্য দান করেন, তা ব্যতিক্রমী এক জগতের উপস্থাপন করে। চিরায়ত প্রাচ্যের প্রাকৃত মানুষজনকে আমৃত্যু লড়াই-সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। কখনো জীবিকার তাগিদে, কখনো কর্তৃত্ববাদী শাসকের জাল থেকে মুক্তি পেতে। তবে মুক্তি তাদের কদাচিৎ জোটে। নিম্নবিত্তের এই সংগ্রামশীলতাও ‘স্বর্ণবোয়াল’ নাটকের অন্তর্নিহিত শক্তি জুগিয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতের দর্শন নাটকটিকে প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

‘স্বর্ণবোয়াল’ নাটকে প্রত্যেক চরিত্র স্ব-স্ব বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জল। খলিশা মাঝি, তিরমন, সাঁঝমালা এমনকি হিজুলীকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়। মানবিকতা, প্রেম, ঔদার্য এবং বলিষ্ঠতায় এরা বাংলা সাহিত্যে স্মরণযোগ্য। সুতরাং উপযোগিতাহীন এই লড়াইকে প্রাক-আধুনিক প্রত্যয়-পীড়িত ভাববার অবকাশ নেই।

বাস্তবে স্বর্ণবোয়াল এর অস্তিত্ব আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কিন্তু নাটকের চরিত্র সকল ঐ স্বর্ণমৎস্য দ্বারা যেমন প্রভাবিত, তাতেই যেন অদর্শনীয় স্বর্ণবোয়াল বাস্তবের চেয়ে অধিক সত্য হয়ে ওঠে। নাট্যকারের বর্ণনায় স্বর্ণবোয়াল জীবনের পরম-কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে। জীবন-সাধনার চূড়ান্ত পর্বে অবস্থান করে স্বর্ণবোয়াল। যেহেতু মানুষ চিরজীবন ‘হয়ে ওঠা’র প্রক্রিয়াধীন থাকে বা পূর্ণতার পানে চলে, যথাযথ পূর্ণতা-প্রাপ্তি প্রায়-অসম্ভব, সেহেতু স্বর্ণবোয়াল অধরাই থেকে যায়। সেলিম আল দীন মানবের অপূর্ণতাকে হেয় করে দেখেন না। বরং এসব পর্যায় অতিক্রমণে মানুষের শৌর্যকে স্বাগত জানান। ‘হাত-হদাই’, ‘প্রাচ্য’-তেও সেই ‘হয়ে ওঠা’র প্রক্রিয়াধীন মানুষকে যথাযথ মর্যাদা দেন। ‘স্বর্ণবোয়াল’ এ বস্তুবাদী দৃষ্টিতে আপাত পরাজিত মানুষকে মহিমান্বিত করেন।

তথ্যসূত্র
১. সেলিম আল দীন. ‘শিল্পসাহিত্যে আধুনিকতা ও বাঙালির অন্বেষণ: নাট্যপর্ব’, সাইমন জাকারিয় (সংকলন ও গ্রন্থন), সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র-৯ (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৫), পৃ. ৪৮৬, ২. সেলিম আল দীন, স্বর্ণবোয়াল, সাইমন জাকারিয়া (সংকলন ও গ্রন্থন), সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র-৬ (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৫), পৃ. ৩২৮, ৩. আল বেরুনী, মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস (অনু.) ভারততত্ত্ব (তাহকিক-ই হিন্দ) (ঢাকা: ঐতিহ্য প্রকাশন, ২০০৯), পৃ. ৭০-৭১, ৪. আহমদ শরীফ, ‘বাঙলার ধর্ম’, দর্শনচিন্তা (ঢাকা: উত্তরণ প্রকাশনী, ২০০২), পৃ. ৩১৪, ৫. সেলিম আল দীন, স্বর্ণবোয়াল, সাইমন জাকারিয়া (সংকলন ও গ্রন্থন), সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র-৬ (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৫), পৃ. ৪৩০, ৫. সেলিম আল দীন, সোহেল হাসান গালিব ও নওশাদ জামিল কর্তৃক গৃহীত সাক্ষাৎকার, ‘শিকড়-বিচ্যুত হওয়াতেই আত্মপ্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না আমরা’, সোহেল হাসান গালিব ও নওশাদ জামিল (সংকলন ও গ্রন্থন), সেলিম আল দীন-এর নির্বাচিত সাক্ষাৎকার: কহন-কথা (ঢাকা: শুদ্ধস্বর প্রকাশনী, ২০১০), পৃ. ১২৯

লাবণ্য মণ্ডল ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): লেখক, গবেষক।