Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

৮ম থিয়েটার অলিম্পিকস: অভিজ্ঞতার আলোয়

Written by মোহাম্মদ বারী.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

বিশ্বের সবচেয়ে বড় নাট্য আয়োজন থিয়েটার অলিম্পিকস। যদিও এ আয়োজনের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। মাত্র ২৫ বছর আগে ১৯৯৩ সালে থিয়েটারের সূতিকাগার গ্রীসের ডেলফিতে ‘থিয়েটার অলিম্পিকস’ কমিটি গঠনের মাধ্যমে এ আয়োজনের যাত্রা সূচিত হয়। গ্রীসের নাট্যনির্দেশক থিওডোরোস থিয়েটার অলিম্পিকসের প্রধান উদ্যোক্তা। ১৯৯৪ সালের ১৮ জুন থিয়েটার অলিম্পিকসের প্রথম কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্বের প্রখ্যাত ৮ জন নাট্যনির্দেশককে নিয়ে গঠিত হয় এই কমিটি। এঁরা হলেন- গ্রীসের থিওডোরোসটারজোপোলাস, স্পেনের নুরিয়া এসপার্ট, ব্রাজিলের অটোনাস ফিলহো, ইংল্যান্ডের টনি হ্যারিসন, রাশিয়ার যবি লাইয়ুবিমভ, জার্মানির হেইনার মিলার, জাপানের তাদাসি সুজুকি এবং আমেরিকার রবার্ট উইলসন।

থিয়েটার অলিম্পিকসের মূল উদ্দেশ্য হল বিশ্বের সকল নাট্যকর্মীকে একত্রিত করে চিন্তার আদান-প্রদানের মাধ্যমে পারস্পরিক সৌর্হাদ্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি করা এবংএকইসাথে বহু সংস্কৃতির পরিচিতি ঘটানো। থিয়েটার অলিম্পিকসের প্রথম আয়োজন বসে গ্রীসে ১৯৯৫ সালে। এরপর একে একে ১৯৯৯ সালে জাপানে, ২০০১ সালে রাশিয়ায়, ২০০৬ সালে তুরস্কে, ২০১০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায়, ২০১৪ সালে চীনে এবং ২০১৬ সালে পোল্যান্ডে থিয়েটার অলিম্পিকসের আয়োজন করা হয়। প্রতিটি আয়োজনের একেকটি প্রতিপাদ্য ছিল। যেমন ১ম অলিম্পিকসে ‘ট্র্যাজেডি’, ২য় অয়োজনে ‘ক্রিয়েটিং হোপ’, ৩য় আয়োজনে ‘থিয়েটার ফর দ্য পিপল’, ৪র্থ আয়োজনে ‘বিয়ন্ড বর্ডারস; ৫ম আয়োজনে ‘লাভ এ্যান্ড হিউম্যানিটি’, ৬ষ্ঠ আয়োজনে ‘ড্রিম’ এবং ৭ম আয়োজনে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড হ্যাজ আ প্লেস ফর ট্রুথ’ শিরোনামে অলিম্পিকসের আসরগুলো বসে। এবারের অর্থাৎ ৮ম থিয়েটার অলিম্পিকসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ফ্লাগ অব ফ্রেন্ডশিপ’ অর্থাৎ ‘বন্ধুত্বের পতাকা’।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে ভারতে লালকেল্লায় আড়ম্বরের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ম থিয়েটার অলিম্পিকস আরম্ভ হয়। ৮ এপ্রিল মুম্বাইয়ে শেষ হয় প্রায় দুমাসব্যাপী এ বিশাল নাট্য আায়োজনের। ভারতের ১৭টি শহরজুড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তের ৩৫টি দেশের ৪৬৫টি নাটকের ৬০০ প্রদর্শনী হওয়ার কথা এ আয়োজনে। নাটক প্রদর্শনীর পূর্বে স্থানীয় নাট্যকর্মীগণ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মূকাভিনয়, মুক্তনাটক ইত্যাদির মাধ্যমে উৎসব প্রাঙ্গণ মুখর করে রাখার পরিকল্পনা ছিল। নাটক প্রদর্শনী শেষে নাট্যনির্দেশকদের সাথে নাট্যদর্শকের মুখোমুখি আলাপনের ব্যবস্থাও ছিল। ৮ম থিয়েটার অলিম্পিকসের আয়োজনটি ছিল ভারতের ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি) এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। সব মিলে বলা যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় নাট্য উৎসবটি সফল করতে আয়োজকদের ভালো একটি পরিকল্পনা ছিল। তবে তা বাস্তবায়নের বিষয়ে কিছু আলোচনা-সমালোচনা থাকা স্বাভাবিক।

৮ম থিয়েটার অলিম্পিকসে বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত হয়েছে ৮টি নাটক ও ১ টি নৃত্যনাট্য। এগুলো হলো সুবচন নাট্য সংসদের ‘মহাজনের নাও’ বিবর্তন যশোরের ‘মাতব্রিং’, থিয়েটার আট ইউনিটের ‘মর্ষকাম’, প্রাঙ্গণে মোরের ‘ঈর্ষা’, ফেইম স্কুল অব ডান্স ড্রামা এ্যান্ড মিউজিকের ‘ক্যালিগুলা’, থিয়েটার (নাটক সরণি)-এর ‘বারামখানা’, প্রাচ্যনাটের ‘কিনু কাহারের থেটার’ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের ‘ফ্রেইডা’ এবং নৃত্যাঞ্চলে নৃত্যনাট্য ‘রাইকৃঞ্চ পদাবলী’। নাটক নির্বাচনের দায়িত্বটি ছিল ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, নাটক নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিষয় বৈচিত্র্যের পাশাপাশি নাট্য-উপস্থাপনার বৈচিত্র্যকেও প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তবে উৎসব প্রাঙ্গণে লক্ষ্য করেছি ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা’র প্রাক্তন শিক্ষার্থীগণকে পৃথকভাবে পরিচিতি দিয়ে ব্যানারে প্রচারণা করা হয়েছে। এতে বোঝা যায় এনএসডি’র প্রাক্তন শিক্ষার্থী নির্দেশকগণ একটা আলাদা গুরুত্ব পেয়েছেন অর্থাৎ নাটক নির্বাচনের সময় নিশ্চয়ই তাদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যে ৮ জন নির্দেশকের নাটক নির্বাচিত হয়েছে তাদের মধ্যে ২ জন এনএসডি’র প্রাক্তন শিক্ষার্থী। নাটক নির্বাচনের নীতিমালায় এনএসডি সম্ভবত এটি উল্লেখ করেছিল। থিয়েটার অলিম্পিকসের মতো একটি সর্বজনীন আয়োজনে এটির প্রয়োজন ছিল কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

থিয়েটার আট ইউনিটের ‘মর্ষকাম’ নাটকের টিমের সাথে এ উৎসবে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ‘মর্ষকাম’-এর প্রদর্শনী ছিল দুটি; প্রথম প্রদর্শনীটি হয় ৫ মার্চ  দিল্লীর ঐতিহ্যবাহী মিলনায়তন কামানি হলে আর দ্বিতীয় প্রদর্শনীটি ছিল কলকাতার সল্টলেকে পূর্বাঞ্চল সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পূর্বশ্রী মিলনায়তনে।
 
৮ম থিয়েটার অলিম্পিকসের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দু’চার কথা না বললেই নয়। শুরুতে বাংলাদেশ থেকে দিল্লীর আয়োজকদের সাথে যোগাযোগের বিড়ম্বনা ছিল, বিশেষ করে টেলিফোনিক যোগাযোগে সঠিক তথ্য পেতে বেগ হয়েছে। ই-মেইলের যোগাযোগেও সদুত্তর না পাওয়া বা ফিরতি ই-মেইল না পাওয়া ছিল বিরক্তিকর। বড় আয়োজনের জন্য স্মার্ট যোগাযোগ ছিল প্রত্যাশিত, তা হয় নি। ৩ মার্চ বাসযোগে ঢাকা থেকে রওনা করে কলকাতায় আমরা বিমানে উঠি। ৪ মার্চ রাতে পৌঁছাই দিল্লীতে। বিলাসবহুল হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। ৫ মার্চ কামানি হলে ’শো। কিন্তু বিকেলে এনএসডির নিকটবর্তী কামানি হলে পৌঁছে আমরা হতাশই হলাম। এতবড় আয়োজনের যে জৌঁলুস পরিবেশ প্রত্যাশিত, তা নেই। নাটক শুরুর প্রাক্কালে মিলনায়তনের বাইরে বড় দর্শক সমাগমও দেখা গেল না। নাটক শেষ হলে মিলনায়তনের দর্শক গ্যালারিতে আলো পড়ল। আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হল। প্রায় ৬৫০ আসনের মিলনায়তনে দর্শকের সংখ্যা ৫০/৬০ জন। মন চুপসে গেল। এর পূর্বে এনএসডি’র নাট্য উৎসবে দু’বার যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। পাকিস্তানের রাফি পীর থিয়েটারের বিশাল নাট্য উৎসবে আমরা অংশ নিয়েছিলাম। ভারতের পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল, আগরতলা, আসামের শিলচর, কেরালাসহ দেশ-বিদেশের নানা নাট্য উৎসবে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সে অভিজ্ঞতায় থিয়েটার অলিম্পিকসের জমকালো আসরে মিলনায়তন থাকবে দর্শকে পরিপূর্ণ, এমনটিই ছিল প্রত্যাশা। কিন্তু আমাদের হতবাক করে দিয়ে ৫০/৬০ জন দর্শকের হাততালিতে আমরা ‘ঋদ্ধ’ হলাম। তবে কি বাংলাদেশের মত দিল্লীতে দর্শক আকালে ভুগছে! দু’এক জনের সাথে কথা বলে জানলাম দর্শকের এই সংকট ৮ম থিয়েটার অলিম্পিকসের প্রায় শুরু থেকেই। বাংলাদেশ থেকে যে নাট্যদলগুলো এ আয়োজনে অংশ নিয়েছে সবারই একইরকম অভিজ্ঞতা। রামেন্দু মজুমদার মন্তব্য করেছেন, একই শহরে একইসাথে অনেকগুলো মঞ্চে নাটক মঞ্চায়নের ফলে হয়তো দর্শক সংকট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমার নিজস্ব মতামত ভিন্ন রকম। দর্শক স্বল্পতার মূল কারণ প্রথমত এ ধরনের বড় আয়োজনের জন্য যে প্রচার-প্রপাগন্ডার (ইতিবাচক অর্থে) প্রয়োজন তার অভাব, দ্বিতীয়ত উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিতে সরকারি কাজের যে দায়সারা মনভাবনা, তার প্রভাব। এনএসডি প্রতিবছর যে আন্তর্জাতিক উৎসবটি করে, সে উৎসবে প্রাণের যে স্পন্দন পেয়েছিলাম, থিয়েটার অলিম্পিকসে তা পাই নি। যদিও থিয়েটার অলিম্পিকসের আয়োজনের দায়িত্বটি ভারত সরকার এনএসডি-কেই দিয়েছে।

৫ মার্চ আমাদের প্রদর্শনীর পর রাত ৯ টার দিকে কামানি থেকে ৫ মিনিটের পথ পেরিয়ে এনএসডি’র প্রাঙ্গণে গেলাম। আলো ঝলমল সাজসজ্জাও দেখলাম, কিন্তু মানুষের দেখা পেলাম না।  খাঁ খাঁ করছে উৎসব প্রাঙ্গণ। পরদিন অর্থাৎ ৬ মার্চ ছিল নাট্য নির্দেশকের সাথে মুখোমুখি আলাপন। আলাপনের জন্য নির্ধারিত মঞ্চে ডাকা হলো গত দিনের প্রদর্শিত নাটকগুলোর নির্দেশকদের। নির্ধারিত প্রশ্নকারী ছাড়াও দর্শক সারিতে বসা দর্শকরাও প্রশ্ন করতে পারেন। দর্শক সারিতে কিছু দর্শক (যাদের অধিকাংশই এনএসডি’র ছাত্র বলেই মনে হল) বসে ছিলেন বটে, কিন্তু প্রশ্ন করবেন কী, নাটকই তো কেউ দেখেন নি। সেখান থেকে বের হয়ে এনএসডি’র মূল প্রাঙ্গণে এসে সেই একই অভিজ্ঞতা- খাঁ খাঁ করছে বিরাণ মাঠ। অথচ এর আগে যে দু’বার এনএসডি’র উৎসবে এসেছিলাম সে অভিজ্ঞতা ছিল একেবারে উল্টো। নানা ধরনের মানুষের সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, ভাব বিনিময় হয়েছে। যেকোনো উৎসবের মূল লক্ষ্যই তো থাকে সেটাই। থিয়েটার অলিম্পিকসের মূল উদ্দেশ্যে সে কথাই বলা আছে। সারা বিশ্বের নাট্যকর্মীদের একটি প্লাটফরমে নিয়ে এসে মেলবন্ধন ঘটানো, চিন্তার আদান-প্রদানের মাধ্যমে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বাড়ানো। অথচ আমাদের সাথে দেখা হলো না ভারত ছাড়া ভিনদেশি একজন নাট্যকর্মীরও। পাকিস্তানের লাহোরে রাফি পীর নাট্য উৎসবে গিয়েছিলাম। সেখানে একটা উন্মুক্ত প্যান্ডেল রাখা হয়েছিল। নানা দেশের নাট্য অভিনেতা, ডিজাইনার, নির্দেশকরা সেখানে বসছেন, চা খাচ্ছেন, কফি খাচ্ছেন। চুটিয়ে আড্ডা মারছেন সবাই। নিজ দেশের বাইরের নাট্যকর্মীদের সাথে বন্ধুত্ব হচ্ছে, ছবি তোলা হচ্ছে। একে অপরের ঠিকানা নিয়ে নিচ্ছেন, নাটক দেখার আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। মোটকথা একটা প্রাণের মেলা যেন খোলা আঙ্গিনায়। নানা জাতি, নানা সংস্কৃতির নাট্যকর্মী কিন্তু আলাপচারিতায় কতটা না আপন করে নিচ্ছেন। ‘আমরা সবাই নাটক করি’ এই এক মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে যেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা স্বজন সেখানে এক হয়ে গেছি।
 
৬ মার্চ বিকেলেই আমাদের উঠতে হলো কলকাতাগামী ফ্লাইটে। ৭ মার্চ কলকাতার সল্টলেকে ’শো। থিয়েটার অলিম্পিকসের এই শক্ত সময়সূচিও আমার পছন্দ হয় নি। দিল্লীতে প্রায় প্রতিটি দলকে একটি প্রদর্শনী করতে হয়েছে; কিন্তু সময়সূচির হিসাবে দিল্লীতে অন্য কোনো প্রদর্শনী দেখা বা অন্য দেশের নাট্যকর্মীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ-আলাপচারিতার সুযোগই তেমন ছিল না। অতিরিক্ত একটি মুক্ত দিন দিল্লীতে অবস্থানের সুযোগ দেয়া উচিত ছিল। তাতে হয়তো একটু খরচ বাড়তো, তবে থিয়েটার অলিম্পিকসের মূল উদ্দেশ্য সাধনে সেটা খুব সহায়ক হতো।

কলকাতার সল্টলেকের পূর্বশ্রী মিলনায়তনটি মূলত পশ্চিম বাংলার পূর্বাঞ্চল সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল সেন্টার। কলকাতা শহরের একপ্রান্তে এ মিলনায়তনের অবস্থান। কলকাতায় থিয়েটারের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে আমরা জানি রবীন্দ্র সদন বা একাডেমী মিলনায়তন চত্বর। রবীন্দ্র সদন মিলনায়তনে আমরা এর আগে এনএসডি’র উৎসবে ‘গোলাপজান’ মঞ্চস্থ করেছিলাম। হল ভর্তি দর্শক। নাটক শেষে দর্শকের উচ্ছ্বাস আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু পূর্বশ্রীতে সেটি ঘটল না। প্রায় ৬০০ আসনের হলটির আসন পূর্ণ হলো অর্ধেকের মত। তারপরও দিল্লীর কামানির অভিজ্ঞতায় ভালোতর। অনেক দূর থেকে নাটক দেখতে এলেন কলকাতার বেশ ক’জন নাট্যবন্ধু। নাটক শুরুর আগে কোনো একটি দল বহিরাঙ্গনে মূকাভিনয় প্রদর্শন করল। নাটক শুরুর প্রাক্কালে আমরা সবাই শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম সদ্য প্রয়াত প্রিয় নাট্যজন নৃপেন্দ্র সাহাকে।

কলকাতায় নাটক করতে এসে যা বুঝলাম, থিয়েটার অলিম্পিকসের স্যাটেলাইট প্রদর্শনীগুলো অর্থাৎ দিল্লীর বাইরের প্রদর্শনীগুলোর সংগঠনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে অনেকটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট আদলে। যিনি দায়িত্ব পেয়েছেন, তিনি হয়তো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা নাট্যশিক্ষায়তনের শিক্ষক, যিনি মূল ধারায় নাটক করেন না। তিনি দৈনিক পারিশ্রমিকে কিছু নাট্যকর্মীকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। কলকাতার যে নাট্যকর্মীরা কাজ করছেন, তাদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেল তাদের চরম অসন্তুষ্টির কথা। কলকাতা বিমান বন্দরে নেমে আমাদের প্রায় দু’ঘন্টা অপেক্ষা করতে হলো গাড়ির জন্য। যে নার্টকর্র্মী আমাদের নিতে এসেছিল, সে বলল তার অসহায়ত্বের কথা। আমরা রাত সাড়ে এগোরটার দিকে যখন হোটেলে ফিরছি, তখনো সে ছেলেটি খালি পেটে, সারাদিন খায় নি। বলল, ‘আমাদের বলা হয়েছে দৈনিক ৮ ঘন্টা শ্রম দিব, কিন্তু প্রতিদিন ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত অর্থাৎ ১২-১৪ ঘন্টা কাজ করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত কাজের জন্য কোনো পয়সা নেই। থিয়েটারকে ভালোবাসি তাই কাজ করে যাচ্ছি’। বিমানবন্দরে আমাদের অপেক্ষার কারণ, যে গাড়িটি আমাদের নেয়ার কথা, সেটি অন্য কাজে ব্যস্ত। এরকম অনেক অব্যবস্থাপনা ছিল লক্ষ্য করার মত। মূলধারায় যাঁরা নাটক করছেন, তাঁদের মধ্য থেকে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে এ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বটি দেয়া যেতে পারতো। এর আগে এনএসডি’র উৎসবগুলোতে তা-ই দেখেছি। তার ইতিবচিক ফলাফলও দেখেছি ব্যবস্থাপনায়। কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতাটি খুব সুখকর হলো না। এমনকি অভিজাত হোটেলে থাকার ব্যবস্থাপনাটিও ছিল নাট্যকর্মী হিসেবে আমাদের জন্য অস্বস্তিকর।

যাহোক, কলকাতায় প্রদর্শনীতে আমরা তৃপ্ত। যেহেতু বাংলাভাষী দর্শক, তার প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল নাটক চলাকালেই। নাটক শেষে দর্শকসারি থেকে অনেকে প্রশ্ন করলেন, শুভেচ্ছা জানালেন। সে অভিজ্ঞতাও মধুর। নাটক শেষে নাট্যসমালোচক অংশুমান ভৌমিক অনেকক্ষণ কথা বললেন। তিনি তখনো নাটকে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন। বললেন, এ নাটকে তিনি আলোড়িত হয়েছেন; একটা রিভিউ লিখবেন। বাংলাদেশে সেটা ছাপাতে চান, আমার সহায়তা চাইলেন। আমি সানন্দে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলাম।

৮ম থিয়েটার অলিম্পিকসের প্রাপ্তি ছিল প্রাক-ভ্রমণ উত্তেজনা। প্রায় ৬ মাস আগে নাটকের ভিডিওসহ খুঁটিনাটি তথ্য দিয়ে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর দলের নাট্যকর্মীরা তা উপভোগ করেছে। বিশেষত যারা প্রথমবারের মতো নাটক নিয়ে দেশের বাইরে বা থিয়েটার অলিম্পিকসের মতো বড় আসরে যোগ দিচ্ছে, তারা ছিল দারুণ উত্তেজিত। এ ভ্রমণে তারা আনন্দও পেয়েছে বেশ। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি কিছুটা হতাশ হয়েছি। উৎসবটি ছিল ভীষণভাবে প্রাণহীন-নিরস। বাংলাদেশে, বিশেষত ঢাকার বিভিন্ন নাট্যদলের নাট্যোৎসবগুলোতে যে রঙ ও প্রাণ খেলা করে; তার ছিটেফোঁটারও দেখা পেলাম না। বিশ্বমঞ্চে বড় বড় নাট্যোৎসবগুলোতে যে রূপ ও রসের খবর পাই, তার প্রত্যাশা থিয়েটার অলিম্পিকসের মতো বড় আয়োজনের জন্য স্বাভাবিক। আমার ধারণা দিল্লির বাইরের শহরগুলোতে বরং উৎসবটি জমজমাট হয়েছে, বিশেষত দর্শক বিবেচনায়।

থিয়েটার অলিম্পিকসের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের নাট্যোৎসব প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই। বাংলাদেশে সাধারণত সরকারি ও দলগুলোর নিজস্ব আয়োজনে নাট্যোৎসব হয়ে থাকে। সরকারি নাট্যোৎসব বলতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনগুলোই মূলত চোখে পড়ে। যদিও সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় আজকাল অনেক নাট্যদল বা সংগঠনও নাট্যোৎসব করে থাকে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা সবাই ভোগ করতে চান কেবল আর্থিক বিবেচনায়। কাজের ক্ষেত্রে কোনো দল বা সংগঠন উৎসব করলে তা অনেকটাই সফল হয়। কিন্তু সরকারি আমলাতন্ত্রের ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের আয়োজনের ব্যর্থতার সম্ভাবনা থেকেই যায়। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গত কয়েক বছর ধরে বিষয়ভিত্তিক বেশ কিছু নাট্যোৎসবের আয়োজন করেছে। যেমন ৬৪ জেলার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বা সাহিত্যভিত্তিক নাট্যরচনা ও প্রযোজনায় নাট্যোৎসব ইত্যাদি। এ উৎসবগলোতে প্রথমত নিজ নিজ জেলার নাট্যকার ও নির্দেশকদের নাটক রচনা ও নির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে ঢাকায় লম্বা সময় ধরে একটি উৎসবে তা প্রদর্শিত হয়। ধারণাটি প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু সমস্যা হলো, যে নাটকগুলো নির্মিত হয়, সেগুলো নিয়মিত প্রদর্শিত হয় না। ফলে দীর্ঘ সময় আর শ্রম দিয়ে তৈরি হওয়া নাটকটি একটি প্রদর্শনীর পরই হারিয়ে যায়। এ ধরনের উৎসব থেকে বাছাইকৃত ভালো নাটকগুলোর নিয়মিত প্রদর্শনীর ব্যবস্থা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি নিতে পারে। এতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে ভালো প্রযোজনা বেরিয়ে আসতে পারে। নাটকের জন্য এটি ভালো প্রণোদনা হতে পারে। এর ফলে তৈরি হতে পারে প্রতিভাধর নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতা।

এ ধরনের দুটি নাটক নির্মাণের অভিজ্ঞতা আমার আছে। একটি হচ্ছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’র ব্যবস্থাপনায় সাহিত্যনির্ভর পাণ্ডুলিপি রচনা ও নাটক নির্মাণ, আরেকটি হচ্ছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রবীন্দ্র সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক বা তাঁর সাহিত্য থেকে নাটক রচনা করে নাটক নির্মাণ। এ নাটকগুলো নির্মাণের জন্য সরকারি বাজেট দেয়া হয়েছিল, নাটকও নির্মাণ হয়েছিল প্রচুর। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দু/একটি ছাড়া নাটকগুলো আর মঞ্চস্থ হয় নি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি একটি নাট্য উৎসব করেই প্রকল্পটির সমাপ্তি ঘোষণা করে। তেমনি রবীন্দ্র সার্ধশত জন্মবার্ষিকীর নাটকগুলো একটি উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ার পর, সিংহভাগ নাটকের আর নিয়মিত প্রদর্শনী হয় নি। একই অভিজ্ঞতা আছে সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি) আয়োজিত ইবসেন নাট্য উৎসবের। ফরমায়েস দিয়ে ইবসেনের অনেকগুলো নাটক ঐ উৎসবে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু নাটকগুলোর পরে আর নিয়মিত মঞ্চায়ন হয় নি। এসব অভিজ্ঞতায় লক্ষ্য করেছি কোনো গ্রুপ বা নাট্যদল যখন তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎসবের আয়োজন করে, তা যেমন জমকালো আর প্রাণবন্ত হয়; সরকারি বা ফরমায়েসি নাট্য উৎসব সে তুলনায় অনেকখানি ম্লান। এমনকি বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের আয়োজনে অনেক নাট্য উৎসবই অনেকখানি প্রাণহীন মনে হয়েছে। একটা নাট্য উৎসবের মূল লক্ষ্যই তো থাকে মেলার আমেজ; নাট্য উৎসবে অংশগ্রহণকারী দল বা নাট্যকর্মীদের প্রাণচাঞ্চল্য, উদ্দীপনা তৈরি করা এবং তা দর্শকের মধ্যে সঞ্চার করা। তা যদি ব্যাহত হয় তবে টাকা-পয়সা খরচ করে উৎসব আয়োজনের প্রয়োজনটা কী? কোনো নাট্যদলের দলগত নাট্য উৎসবের সময় দেখেছি কর্মীরা রাত-দিন ক্লান্তিহীন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে উৎসবের আয়োজন করে। ক্লান্তিই যেন তাদের আনন্দ। সারাদিন অভুক্ত থেকে কোনো কর্মী যখন উৎসবের সফল সমাপ্তি টানে, তখন তার চোখে-মুখে যে আনন্দ খেলা করে, তা অসামান্য-অপার্থিব। অর্থ দিয়ে কোনো কর্মীর এই প্রাণের শ্রম কেনা যেমন সম্ভব না; তেমনি প্রতিদানে এই আনন্দ দেয়াও সম্ভব না।

৮ম থিয়েটার অলিম্পিকসের আলোয় বাংলাদেশের নাট্যোৎসব নিয়ে এতসব কথা বলার কারণ হচ্ছে, কোনো সৃজনশীল কাজ হৃদয়ে ধারণ করার বিষয়টি পুনরোচ্চারণ করা। ৮ম থিয়েটার অলিম্পিকসে যোগ দিয়ে আমার এই ধারণা পোক্ত হয়েছে। যে প্রাণের প্রত্যাশা নিয়ে এই উৎসবে যোগ দিয়েছিলাম সে প্রাণের দেখা পাই নি। সবই একরকম ঠিক-ঠাকভাবেই হয়তো হয়েছে, কিন্তু  সবকিছুই  ছিল দায়সারা। বিপুল ত্যাগ, শ্রম, ভালোবাসা, মমতা দিয়ে যে নাটক নির্মাণ করা হয়, তা পূর্ণতা  পায় কেবল দর্শকের হাততালিটুকু পেলে। সেই দর্শকই যদি না পাওয়া গেল, তবে এতসবের  অর্থ কী! উৎসবে যদি প্রাণে প্রাণে মিলন না ঘটলো, তবে সে উৎসব করে কী লাভ! সাজসজ্জায় ভরা এমন সাজানো বাগানে চোখে দেখা সৌন্দর্যের ঝিলিক হয়তো পাওয়া যায়; কিন্তু বনফুলের গন্ধে হৃদয় মাতাল করার ক্ষমতা তার নেই।

মোহাম্মদ বারী: অভিনেতা-নির্দেশক-নাট্যকার। সদস্য- থিয়েটার আর্ট ইউনিট