Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

ঢাকার থিয়েটারে উপেক্ষিত: বাইরের প্রাজ্ঞ নাট্যজনও

Written by বিপ্লব বালা.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

‘সাহিত্যে হয়তো সাহিত্য আছে, কিন্তু যে মানুষ তা সৃষ্টি করে সে সত্যিই প্রায়ই মানুষ নয়’ (জীবনানন্দের চিঠি)
‘তার আগে বলো তুমি কোন্ দলে’-শঙ্খ ঘোষ

শিল্প-সাহিত্যের নানা মাধ্যমে উপেক্ষিতজন হলেন সমালোচক-বিশ্লেষকগণ। বাংলা নাগরিক সংস্কৃতিতেই যেন বিতর্ক-বাহাস-বিবেচনা সন্দেহের চোখে দেখা হয়: যারা নিজেরা কিছু পারে না করতে তারাই কেবল পরের দোষ ধরে বেড়ায়। স্বয়ং জীবনানন্দ অক্ষম সমালোচকদের সাফ সাফ জানিয়ে দেন- ‘বরং নিজেই তুমি লেখ নাকো একটি কবিতা’- বলে। সেতো অক্ষমদের বেলা অথচ তিনিই যোগ্য সমালোচকদের যেচে বলে বেড়াতেন- যেন তাঁরা লেখেন, বিশ্লেষণ করেন কবিতা। আর সেটাই তো স্বাভাবিক।

নাটকের বেলা খোঁজ পড়ে- সমালোচক কি পক্ষের না বিপক্ষ দলের। বন্ধুজনদেরই দিয়ে লেখানো  হয় তো পিঠ চাপড়ানো নাট্য-প্রশস্তি। তার ব্যত্যয় হলেই তিনি শত্রুপক্ষের লোক। তার ওপর এক সময় ছিল নাটকের রাজনৈতিক বিচার-বিবেচনা। তাতে পরিচিত বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে ব্যাখ্যা করানো হতো বা হয় নাট্যবস্তুর রাজনীতি- নির্দিষ্ট একেক তত্ত্ববিশ্বাস কাঠামোয়। তাতে প্রায়শ নাট্যনন্দন উপেক্ষিত হয়- কেবল বিষয়ের শ্রেণী-রাজনীতির একেক ছক বিবেচ্য হয়ে ওঠে।

প্রচলিত এহেন পরিপ্রেক্ষিতে শান্তনু কায়সারের নাট্য-বিবেচনা প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তিনি তো কলেজ শিক্ষকতা, সাহিত্য সমালোচনা, নাট্য রচনা-নির্দেশনার পাশাপাশি আমৃত্যু ছিলেন একনিষ্ঠ দর্শক এক-খুঁজে ফিরেছেন নাট্যের রাজনৈতিক নন্দন- তার রূপায়ণ-প্রক্রিয়ার পারস্পরিক বিনিময়, মিথষ্ক্রিয়া। তিনি জানতেন বটে এর সমূহ বিপত্তি: রাজনৈতিক দলীয়তার অনিবার্য ঘেরাটোপ। বাংলা নাট্যসমালোচনার ঐতিহ্য বন্ধন, অভ্যস্ত জাড্য। গণনাট্য সংঘের প্রবর্তনায় যার বীজতলা গঠিত, চর্চিত। বামপন্থি নন্দন বিবেচনার এক প্রবল ধারা তাতে সূচিত হয়। সেই থেকে দুদিকে ধাবমান ষাঁড়ের দ্বিমুখী শিং বাগ মানানোর, যাকে বলে কসরৎ চলে- নাট্যের বিষয়ের রাজনীতি ও তার রীতি-প্রকরণ-পদ্ধতির নন্দনশৈলী সামাজিক বাস্তবতায় কেমন কী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া-অভিঘাত সৃষ্টি করলো তারই সুলুকসন্ধান।

শান্তনু কায়সার সারাজীবন নাট্যনন্দনের এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদার, গভীর সৃজনমুক্তি খুঁজে ফিরেছেন। তাতে রাজনীতির কোনো প্রথাগত, সরল ঘেরাটোপ যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। দায়বদ্ধ নৈতিক এক রুচির সমগ্রতা যাতে গড়ে ওঠে। অভ্যস্ত কোনো বামপন্থার খপ্পরে না পড়ে। এই বিবেচনা প্রচলিত বাস্তবতায় বিরলতর। কুমিল্লা শহরে বসে তিনি তা একাগ্র নিষ্ঠায় সম্পন্ন করেছেন। তার জন্য দেশ-বিদেশের প্রাসঙ্গিক তত্ত্ব-তল্লাশ করেছেন, অনুবাদ করেছেন। নাটক অনুবাদ করে নির্দেশনা-মঞ্চায়ন করেছেন। মীর মোশাররফ ও নজরুলকে বিবেচনা করেছেন অন্যতর প্রাসঙ্গিকতায়। লেখক শিবিরের সম্মেলনে মুক্তনাটকের সীমাবদ্ধতা-ব্যর্থতার কার্যকারণ বিবেচনা করেছেন মুক্তবুদ্ধির স্বতঃস্ফূর্ততায়। সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এর তথ্যবিভ্রাট, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এ নাট্যকার-কৃত নায়ক চরিত্রের নবাবী-অহং যে ভুল রণকৌশলে ঠেলে দেয়- তার প্রবল সমালোচনা করেন; মান্নান হীরার ‘এবং বিদ্যাসাগর’ নাটকের মারাত্মক তথ্য-বিপত্তি তীব্রভাবে উল্লেখ করেন। মামুনুর রশীদের বহু প্রশংসিত ‘রাঢ়াঙ’ নাটকে হাস্যরস যে এক জনগোষ্ঠীর বীরত্বব্যাঞ্জক ট্র্যাজিক পরিণতি সাধনে বাদ সাধে- তাও স্পষ্টভাষে ব্যক্ত করেন। অথচ তিনিই তো ছিলেন ‘আরণ্যক’-এর রাজনৈতিক থিয়েটারের অনুরাগী ব্যাখ্যাতা, বিশ্লেষক। যদিও তাঁরাও উপর্যুক্ত নাটকে তার সমালোচনায় বিব্রত, বিরক্ত হয়।- যেন তিনি রেনিগেট, শত্রুপক্ষে যোগদানকারী।

নিঃসঙ্গ এক পদাতিকের মতো আমৃত্যু ঋজু এক শিরদাঁড়া নিয়ে তিনি একক অভিযানের নন্দন-ব্রত সম্পন্ন করেছেন। আর তাই কি পেয়েছেন মৃত্যু-পরবর্তী ‘কন্সপ্রেসি অব সাইলেন্স’-এর সচেতন উপেক্ষা। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কী শিল্পকলা একাডেমী- কারো পক্ষ থেকে প্রথাগত সৌজন্য-শোক প্রকাশও ঘটেনি। একমাত্র ‘লেখক শিবির’ তার একদা-সভাপতির প্রয়াণে যথারীতি স্মরণ-সভা করে। এর বাইরে কোনো আয়োজন করতে নানাজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে ব্যর্থ হই অনেকে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগ অন্তত একটি ব্যানার টাঙ্গিয়ে শোকজ্ঞাপন করে।

বর্তমানকার দেশের সাংস্কৃতিক পতিত-দশার প্রতীক মনে হয় এহেন ঘটনাঘটন। বাজারের কঠিন, নির্মোহ এক বিনিময় প্রথার নৈর্ব্যক্তিকতায় আমুণ্ডুগ্রস্ত আমরা; সূক্ষ্ম নিক্তিতে পরিমাপ করা হয় প্রতিটি ক্রিয়ার বাজার-দর। এতে ন্যায়নীতি, মনুষ্যত্বের বালাই নেই কোনো। এযাবৎ-এর তাবৎ ঐতিহ্য-ধারণাপাত নিশ্চিহ্ন। এখন তো এক বিশ্ব এক দেশ এক নগর-রাজধানীর হাতেই তাবৎ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। সেই কেন্দ্রের বাইরে অস্তিত্ব নেই ভিন্ন কোনো রীতিনীতির। রাজনীতির সংস্কৃতিও ক্ষমতা-কর্পোরেটের সিন্ডিকেটভুক্ত। তার তাবৎ নিয়ন্ত্রণ কতক গডফাদারের- যাদের হাতে বাজার বিজ্ঞাপন মিডিয়া করায়ত্ত। তার কোনো দলীয় পরিচয়ও নেই- আছে কেবল ক্ষমতার দুর্মদ কেন্দ্রীভবন। সেখানে সবার আর সবকিছুর চুলচেরা ডিজিটাল পরিমাপ হয়। রাষ্ট্রীয় তাবৎ পদক-সম্মাননা-পদোন্নতি-নিয়োগ একই যন্ত্রে বিবেচ্য। বাজারের এক যন্তর-মন্তর কারখানায় তার উচ্চ-নিচ মার্কা পড়ে। ঢাকার বাইরের কারো কারো ডাকও তাতে পড়ে- বাজার-দরের নিত্যনব তারকায়ন-উৎপাদনের অনিবার্য গরজে। সেই হা-মুখের খাই মেটানো যার অমোঘ নিয়তি।

শান্তনু কায়সারে মতো ঊনিশ শতকীয় বিদ্যাসাগর-অক্ষয়কুমার দত্ত ঘরানার ঘোর যুক্তি-বিজ্ঞান সাধনের একক বীরত্ব বাজার-হিসেবের বাইরে রয়ে যাবে। ক্ষমতা-কাঠামোর সঙ্গে লেনা-দেনার দেনদরবারে অচল মুদ্রাবৎ  প্রাচীন কোনো ধ্রুপদী রীতি আর মান্য নয়।

এই হোক শান্তনু কায়সারের অনমনীয় শিরদাঁড়ার পরিচয়- ইতিহাসের ট্র্যাজিক উল্লাসে।

ড. বিপ্লব বালা: নাট্যশিক্ষক, প্রশিক্ষক ও সমালোচক