Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

৮ম থিয়েটার অলিম্পিকস: অভিজ্ঞতা ও ‘আমাদের’ আন্তর্জাতিক মঞ্চায়নের অভিপ্রিয়তা

Written by ইউসুফ হাসান অর্ক.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

গত তিন দশকে বাংলাদেশের নাট্যচর্চার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও খানিকটা এই বিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুবাদেই হয়তোবা অগ্রজ হাসান শাহরিয়ার আজকের এ রকম একটি লেখা লিখবার অনুরোধ আমাকে করেছেন। আমি আবার অনুরোধের সেই ‘ঢেঁকি’টি গিলেছিও। আরো বলে নিতে চাই, লেখাটি বলতে গেলে এক ধরনের আত্মসমালোচনা, কেননা যে বিষয়টি আজকের আলোচনায় অবতারণা হবে, সেই বিষয়ে নিজের দায় এড়ানোটাও পক্ষপাতদুষ্ট হবে। স্পষ্ট করে বললে, আমরা যারা এখনো বাংলাদেশে নাট্যচর্চার সাথে কোনো-না-কোনোভাবে জড়িত তাদের ভাবনা ও উদ্যোগ নিয়ে পুনর্বিবেচনা নিয়েই আজকের আলোচনার অবতারণা।

ইদানিং আমাদের আড্ডায় প্রায়শই কিছু বিষয় নিয়ে আমরা কথাবার্তা বলি যেখানে বিচ্ছিন্নভাবে কতোগুলো বিষয় ঘুরে ফিরে আসে। বিষয়গুলো অনেকটা এই ধরনের-

“আমাদের দেশে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে আঙ্গিক বা নাট্যরীতি নিয়ে বেশ কিছু ‘নিরীক্ষাধর্মী’ কাজ হয়েছে বা হচ্ছে, কিন্তু আমরা কতটুকু এগিয়েছি”

‘পশ্চিমবঙ্গের থিয়েটার তো এখনো ড্রইংরুমেই পড়ে আছে, তবে ওদের স্পিচ ভালো’

‘আমরা অমুক প্রোডাকশনটা নিয়ে কলকাতা ঘুরে এলাম’; ‘বাহ’!

‘অমুক দল তো কলকাতাতে শততম প্রদর্শনী করলো’; ‘বাহ’!

‘এবার এনএসডি তে কারা গেল’; ‘এবার তো বেশ কয়েকটা’; ‘বাহ’

এ রকম শত আলোচনার ভিড়ে একটি সত্য অনুভূত হয় অগোচরে। তা হলো, যেন পশ্চিমবঙ্গে বা ভারতে কোনো নাটকের মঞ্চায়ন না হলে সেটা ভালো নাটক নয়, যেন নাটক নিয়ে আমাদের যত নিরীক্ষা সেসব পশ্চিমবঙ্গ তথা অন্য দেশের স্বীকৃতি পেলেই পরীক্ষিত ভালো নাটক। আমাদের এই মানসিকতা কতোটা যৌক্তিক বা আধুনিক তা বিবেচনা করবার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ অর্থে, নাটক ছাড়া অন্য যে-কোনো ক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো উৎসব বা প্রতিযোগিতায় কোনো দল বা সংগঠন অংশগ্রহণ করলে তা দেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ্যতম বা যোগ্যতর সেটা বলবার অপেক্ষা রাখে না। যেমন, অলিম্পিক বা বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণ, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র কিংবা চিত্রশিল্পের নানা আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে নানা প্রতিষ্ঠান বা নির্বাচক কোনো একটি বোর্ড এই সমস্ত প্রতিনিধিত্বকারী দল বা সংগঠনকে নির্বাচন করে থাকেন। তাই দু’একটি ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ ছাড়া মোটামুটি এ ব্যাপারে তেমন কোনো আলোচনার অবকাশ থাকে নি। নাটকের ক্ষেত্রেও এরকম অনেক দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গেছে বৈকি, অনেক গেছে। সেখানে আলোচনার অবকাশ নেই এ রকম ভালো ভালো নাট্যপ্রযোজনা এদেশ থেকে অনেক দেশে প্রদর্শিতও হয়েছে। গত শতকের আশির দশক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রথম সারির দলগুলো বহু ভালো প্রযোজনা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ কাঁপিয়ে দেশে ফিরেছে। তারই ধারাবাহিকতায় পশ্চিমবঙ্গের নাট্যজনদের সাথে আমাদের যোগাযোগের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এর সাথে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত কিছু নাট্য ও শিল্প-সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা, যেমন ‘বহুরূপী’, ‘স্যাস’ ইত্যাদির মাধ্যমে ওখানকার নাট্যচর্চার সাথে আমাদের এক ধরনের যোগাযোগের বিনিময়ও ঘটতে থাকে। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের বেশ কয়েকটি বিশ^বিদ্যালয় থেকে আমাদের দেশের নাট্যশিক্ষার্থীগণ ‘প্রশিক্ষিত’ বা ‘শিক্ষিত’ হয়ে ফিরে এসে এদেশে ‘কেউ কেউ’ নাট্যচর্চার সাথে যুক্তও হতে থাকেন। এখানে প্রাসঙ্গিক একটি কথা থেকে যায়; যারা ফিরে এলেন তাঁরা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ‘আর কী নিয়ে এলেন?’- যথাসময়ে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলা যাবে।

এবার লেখার শুরুতে উল্লেখিত উক্তিগুলোর কর্তাগণদের পূর্বাপর ও উক্তিগুলোর যৌক্তিকতা বিবেচনা করে দেখা যাক। আসলে কর্তাগণ বলতে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির উল্লেখ এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তবে, কথাগুলো যে বলা হয় এবং যারা বলেন তারা যদি এই লেখাটির বদৌলতে উক্তিগুলো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে পুনর্বিবেচনা করেন, তবেই আমাদের নাটকের কিছু উপকার হবে বলে মনে করি। অগ্রজরা অবশ্যই স্বীকার করেন যে, গত শতকের নব্বই দশক থেকেই বাংলাদেশের নাটকে কিছু নিরীক্ষাধর্মী কাজ হয়েছে। সেলিম আল দীন, সৈয়দ জামিল আহমেদ, নাসির উদ্দিন ইউসুফ, মামুনুর রশীদ, তারিক আনাম খানসহ অগ্রজদের অনেকের পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই এখন পর্যন্ত সেই নিরীক্ষার ধারাবাহিকতায় বিচিত্র নাট্যপ্রযোজনা বাংলাদেশের মঞ্চে উপহার দিয়ে যাচ্ছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, খালেদ খান থেকে শুরু করে তৌকীর আহমেদ, আজাদ আবুল কালাম, আশীষ খন্দকার, কামালউদ্দিন কবির, ইউসুফ হাসান অর্ক (বক্ষমান প্রবন্ধের লেখক), সাইমন জাকারিয়া, সাইদুর রহমান লিপন, শুভাশিস সিনহা, সুদীপ চক্রবর্তী, রেজা আরিফ, বাকার বকুল প্রমুখ নাট্যকার-নির্দেশকগণ বাংলাদেশের মঞ্চে নানাভাবে নানামুখী কাজের দ্বারা এই অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করবার প্রয়াস পেয়েছেন। অগ্রজদের হাত ধরে যাদের পথচলা শুরু হয়েছিল তারা এখন স্ব স্ব ভঙ্গিমায় নিজেদের শিল্প সৃজন করে চলেছেন। তবুও ‘কেউ কেউ’ বলছেন, ‘আমরা কতোদূর এগোতে পেরেছি?’

মাঝে মাঝে মনে হয় ‘এগোনো’ মানে কী?  এই ধারণাটি কি ইউএন (ইউনাইটেড নেশন) প্রদত্ত ‘ডেভেলপমেন্ট’-এর ধারণার মতো কোনো সূচক দিয়ে মেপে বের করা উচিত? আর ‘‘কতোটা পথ এগোলে তবে ‘এগোনো’ বলা যাবে?” আসলে এগিয়ে যাওয়ার মাপকাঠি কী সেটাই বিবেচনার বিষয়। গত শতকের আশির দশকে আমাদের অগ্রজেরা পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষত কলকাতা শহরে শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, রুদ্র প্রসাদ সেন গুপ্ত, বিভাস চক্রবর্তী প্রমূখ খ্যাতিমান নাট্যজনদের সান্নিধ্যে গিয়ে তাঁদের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। মনের মধ্যে টের পাই, সেই প্রশংসাকেই হয়তো আমাদের অগ্রজেরা ‘এগিয়ে’ থাকা বলে বিবেচনা করছেন। কিন্তু ভুললে চলবে না, ভারতের ‘নবনাট্য আন্দোলন’ আর আমাদের ‘গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন’-এর প্রেক্ষাপটে সাদৃশ্য থাকলেও প্রেক্ষিত পরিবর্তন হয়েছে। প্রযুক্তির প্রতাপে আমরা সারা বিশ্বের নানা ধরনের তত্ত্ব ও থিয়েটার চর্চার সাথে পরিচিত হয়ে পরখ করতে শিখেছি, থিয়েটার নামক শিল্পটির সম্ভাবনা ও স্বকীয়তার নানা দিগন্ত। তাই এখন ‘এগোনো’ বলতে গেলে আরো অনেকগুলো বিষয় বিবেচনা করেই বলতে হয়।
 
সেই নতুন প্রেক্ষিতের আলোকে নানা নিরীক্ষা শুরু হয়েছিল এদেশে, যার অনেক প্রযোজনা দর্শকপ্রিয়তার দিক দিয়ে সফল হয়েছে, অনেকগুলো হয় নি। আবার দর্শকপ্রিয়তা ব্যাপারটি আমাদের দেশে অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে যা বলাই বাহুল্য। কাজেই ‘সফল’ কিংবা ‘বিফল’, প্রচলিত নাট্যগঠন বা রীতির বাইরে গিয়ে বিশ^বীক্ষণের একটি দৃষ্টিকোণ থেকে নাট্যনির্মাণের প্রয়াস নিঃসন্দেহে ‘পিছিয়ে’ পড়া নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নিরীক্ষাধর্মী নাট্যপ্রযোজনার প্রতাপের কারণেই বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জাতীয় নাট্যশালাতে একটি ‘পরীক্ষণ থিয়েটার হল’ সংযোজিত হয়েছে যা পৃথিবীর অনেক দেশেই নেই।  তবে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, ‘নিরীক্ষা’ নাম দিয়ে এমন কিছু নাট্যপ্রয়োজনাও হয়েছে যা নিরীক্ষা তো দূরের কথা ‘নাট্য’ বা ‘থিয়েটার’ হয়ে উঠেছে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। এ রকম অ-নাটক সব যুগে সবখানেই ছিল। কিন্তু সেরকম কয়েকটি প্রয়োজনার দৃষ্টান্তের উপর ভিত্তি করে ঢালাওভাবে নিন্দুকের সুর ধরে কি বলা যাবে যে, ‘আমরা কতোদূর এগিয়েছি!’?

আবার একথাও ঠিক, সাধারণ অর্থে আমাদের থিয়েটারে বাচিক অভিনয় বিষয়ে একটি দুর্বলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে, যা পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় এক অর্থে ‘পিছিয়ে পড়া’ বলতে দ্বিধা নেই। কিন্তু আধুনিককালের থিয়েটার পাণ্ডুলিপি সর্বস্ব নয়, বচন সর্বস্ব নয়, তা পিটার ব্রুক নিজেও উল্লেখ করেছেন। পিটার ব্রুকই-বা বলতে হবে কেনো, আমাদের দেশজ নাট্যের মধ্যে ‘পদ্মার নাচন’, ‘নটপালা’ কিংবা ‘রাসলীলা’ থেকে শুরু করে পৃথিবীর বহু দেশের নাট্যে আমরা বচন অতিক্রান্ত শরীর সর্বস্ব থিয়েটার দেখতে পাচ্ছি, যেখানে বাচিক অভিনয়ের জন্য থিয়েটারের শক্তি উদ্যাপিত হতে বাকি থাকে না। কাজেই বাচিক অভিনয়ে আমাদের দুর্বলতাকে প্রধান বিবেচ্য বিষয় ধরেও আমাদের থিয়েটার এগোয় নি তা বলাটা সমীচীন হবে না।
 
পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে আজকাল কলকাতাতে যে ধরনের নাট্যচর্চা হচ্ছে সেগুলো সম্পর্কে কলকাতা থেকে ফিরে অথবা কলকাতা থেকে ঢাকায় আগত কিছু প্রযোজনা দেখে ঢাকার দর্শক বলছেন, ‘সেইতো ওদের মতোই,.. ড্রইং রুমেই আছে... তবে স্পিচ ভালো’ ইত্যাদি। এ কথা বলবার অপেক্ষা রাখে না, এই পশ্চিমবঙ্গেই শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, শিশির ভাদুড়ী, রুদ্র প্রসাদ সেন গুপ্ত-এর মতো কিংবদন্তি অভিনেতা-নির্দেশক-নাট্যকারদের পদচারণা ছিল। তাঁদের দিকনির্দেশনায় কলকাতার থিয়েটার সারা বাংলার থিয়েটার চর্চার মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জিয়া হায়দার, সেলিম আল দীন, মামুনুর রশীদ, আতাউর রহমান, আলী যাকের, নাসির উদ্দিন ইউসুফ, আবদুল্লাহ আল-মামুন, এস এম সোলায়মান প্রমূখ নাট্যজনেরা কিংবদন্তি হয়ে আমাদের নাট্যচর্চার দিকনির্দেশনা দেন। তবে এ কথা ভুললেও চলবে না, পশ্চিমবঙ্গের কিংবদন্তিরা বিষয়বৈচিত্র্য ও অভিনয়ের দিক দিয়ে যতোখানি নাট্য আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছিলেন, নাট্য আঙ্গিক বা প্রযোজনারীতির নিরীক্ষার দিক দিয়ে তাঁরা তেমনটি নন। ইউরোপীয় ধারার নাট্যময়তাকে অতিক্রম করে যেতে তাঁরা চান নি কিংবা পারেন নি। পক্ষান্তরে, ভারতের থিয়েটার অব রুট্স আন্দোলনের হাবিব তানভীর, রতন থিয়াম, ভি ভি করন্থ প্রমূখের কাছ থেকে আমরা নানা ধরনের থিয়েটার পেয়েছি যাঁরা পশ্চিমবঙ্গের নন। অন্যদিকে ভারতের ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি) থেকে আমরা বেশ কয়েকজন প্রশিক্ষিত নাট্যাভিনেতা ও নির্দেশক পেয়েছি গত শতকের আশির দশকের শেষ থেকেই যাঁরা উপরোক্ত নাট্যনির্দেশকদের পাশাপাশি পৃথিবীর নানা থিয়েটার সম্পর্কে কম-বেশি ওয়াকিবহাল। আবার এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না যে, ততদিনে এনএসডিয়ানদের পাশাপাশি এদেশেও নাটক বিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়ে গেছে। এদেশের আরো কিছু নাট্যজন যাঁদের অনেকে আবার ভারত-ভিন্ন অন্যান্য দেশ থেকেও তাঁদের প্রশিক্ষণ বা গবেষণা সমাপণ করে ফিরে ততদিনে নাট্যচর্চা করছেন। এনএসডিয়ানদের মধ্যে সকলেই সৈয়দ জামিল আহমেদ বা তারিক আনাম খান প্রমূখের মতো উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আমাদের নাট্যাঙ্গনকে আলোকিত না করলেও তাঁদের অনেকের বক্ষে এনএসডি তথা ভারতের থিয়েটার সম্পর্কে অন্ধ এক ধরনের প্রিয়তা যে আছে তা আমরা টের পাই। সেই প্রিয়তা ভারতপ্রিয়তা হয়ে কখনো কখনো আড্ডার টেবিলে আমাদের থিয়েটারকে খুব সূক্ষ্মভাবে অস্বীকার করে বৈকি। আবার আমাদের মধ্যেও কেউ কেউ আছেন যারা আত্মপ্রসাদে ভুগে অযৌক্তিকভাবে ভারত বা পশ্চিমবঙ্গের থিয়েটারের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করেন।

এর কোনোটিকেই সঠিক বলা যাবে না।
 
এ কথা বলা যায়, থিয়েটারের মডেল বিচারের ক্ষেত্রে এখন তুলনায় চলে আসে সারা বিশ্ব। সেই প্রেক্ষিতে হয়তো পশ্চিমবঙ্গের কোনো কোনো ‘বচন সর্বস্ব’ নাট্যপ্রযোজনাকে আমাদের কেউ কেউ মনে করছেন ‘পিছিয়ে’ আছে। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, কলকাতা ও কলকাতার বাইরে পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গাতেই বেশ কিছু নিরীক্ষাধর্মী কাজ হচ্ছে যার খবর হয়তোবা আমাদের কারো কারো কাছে কোনো-না-কোনো কারণে অজানা। সেসব হয়তো একাডেমি অব ফাইন আর্টস কিংবা রবীন্দ্র সদন হয়ে বাংলাদেশের ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছায় নি। বহরমপুরের রঙ্গাশ্রম প্রযোজিত ‘সন্তাপ’, কল্যানী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের ‘নূরুলদীনের সারাজীবন’, শিলিগুঁড়ি ঋত্বিকের ‘শিকড়ের খোঁজে মরিচঝাঁপি’, থিয়েটার ওয়ার্কশপের ‘বিয়ে গাওনি কাঁদনচাপা’ ইত্যাদি আরো অনেক নিরীক্ষাধর্মী নাটক আছে যেগুলোর খবর আমরা বিভিন্ন কারণে হয়তো রাখতে পারি নি। কলকাতার অদূরে ডানকুনির একটি দল ‘থিয়েটার শাইন’-এর ‘নাথিং টু সে’ এমনি আরো একটি প্রযোজনা। এ রকম আরো বেশ কিছু প্রযোজনা দেখবার নানা অভিজ্ঞতা আমাদের কারো কারো হয়। মনে রাখতে হবে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেখানকার দলগুলোকে ‘গ্র্যান্ট’ দেন ভালো নাটক করার জন্য। কোনো শিল্পের সংহত অবস্থা না থাকলে রাষ্ট্রীয় এ ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়াটা দুষ্কর। কাজেই, কথা বলবার সময় সেগুলোকে বাদ দিয়ে কেবল কলকাতার তথাকথিত কিছু দলের প্রযোজনা নিয়ে ঢালাওভাবে ঋণাত্মক মন্তব্যও দায়িত্বহীনতার পরিচয় বৈকি।

গত কয়েকবছর ধরে ঢাকার নাট্যাঙ্গনে আরো একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের কিছু দলের সাথে আমাদের নাট্যজনদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের প্রেক্ষিতে একধরনের বিনিময় সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। কোনটি ভালো প্রযোজনা সেটি বিবেচ্য নয় বরং ঐ দলটি আমাকে ভারতে নিয়েছে তাই ঐ দলটিকে আমার এদেশে নিমন্ত্রণ করতে হবে। সেটা একধরনের শিষ্টতা বটে। কিন্তু নাট্যপ্রযোজনার শিল্প সৌকর্য বিবেচনা না করে কেবল সম্পর্কের শিষ্টতা বিচার করলে নাট্যশিল্পের কী লাভ হবে, আমরা ভাবছি কি? আমরা কেউ কেউ ব্যক্তিগত যোগাযোগের শক্তিতে পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে আমাদের অনেক প্রদর্শনী করছি এবং আত্মপ্রসাদে ভুগছি এই মনে করে যে, দেশের বাইরে আমার দলের পদচারণা বেশ সরব। অর্থনৈতিক সঙ্গতি থাকলে যে কেউ যতো খুশি বিদেশে যেতে পারে, তাতে সভ্যতার কী এলো গেলো? মানবিক আবেগ অনুভূতি প্রকাশের একটি মাধ্যম যদি হয় থিয়েটার, তবে সেই থিয়েটারটার নানা অভিনব ভঙ্গিমা প্রদর্শন-প্রত্যক্ষণের উদ্দেশ্যেই সাংস্কৃতিক বিনিময়সূচক উৎসবগুলো হওয়া প্রয়োজন। তা না করে কোনো-না-কোনোভাবে ভারতে প্রদর্শনী করে গর্বিত হওয়ার প্রবণতায় আমরা অনেকে ডুবে আছি। এমন একটা জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছি যে, কলকাতার স্বীকৃতি না পেলে যেন আমাদের যথার্থ মূল্যায়ন হচ্ছে না।
 
ভারত সফর করতে গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ দলই সীমান্ত পর্যন্ত যাওয়া ও সীমান্ত থেকে ফিরে আসার খরচ নিজেরা করে থাকেন। এতে যে খরচ হয়, তার চেয়ে কম খরচে নিজের দেশেই সংশ্লিষ্ট প্রযোজনার একাধিক প্রদর্শনী হতে পারে একাধিক জেলাতে। তাতে করে আমাদের দেশের জেলা পর্যায়ের মানুষগুলোও বুঝতে পারে আমাদের শিল্পভঙ্গী কেমনভাবে বিবর্তিত হচ্ছে। আমরা নিজের দেশের মানুষকে দেখাতে চাই না, দেখাতে চাই অপর দেশের ‘বোদ্ধাদের’। এতে করে মূলত বিদেশি দর্শককে আমাদের দর্শকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি না-কি? একে চিন্তার দৈন্য বা ঔপনিবেশিক দাসসুলভ মানসিকতা বলাটাই সমীচীন। নিজের থিয়েটার নিয়ে প্রত্যয় থাকলে নিজের দেশেই ভালো নাটকের নানা স্থানে প্রদর্শন হওয়া বাঞ্ছনীয়, তাতে অন্তত আমরা অনুধাবন করতে পারি যে, জাতি হিসেবে আমরা কতটুকু শিল্পপ্রেমী হলাম। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের উদ্যোগ প্রত্যাশা করতে পারি।
 
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান বহু বছর ধরে এ দেশের থিয়েটার চর্চায় নানামাত্রিক ভূমিকা রেখে আসছে এ কথা স্বীকার করতেই হবে। দেশব্যাপী এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা প্রায় তিনশ-এর মতো। সদস্যসংখ্যা বিচার করলেই বোঝা যায়, এই সংগঠনটি সত্যিকার অর্থেই একটি বৃহৎ কলেবরে বাংলাদেশের নাট্যচর্চার অভিভাবকত্ব করছে। পাশাপাশি রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট (আইটিআই) নামক আরেকটি সংগঠন। গত প্রায় এক যুগ ধরে এই সংগঠন দুটির কর্মকাণ্ডের মধ্যে যা যা রয়েছে তা এক নজরে দেখলে প্রথমেই লক্ষ্য করি, নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎসবের আয়োজন, যেখানে ভারতীয় কিছু দলসহ দেশের বেশ কিছু দলের অংশগ্রহণে নাটক প্রদর্শিত হয় বছরে অন্তত কয়েকবার। পাশাপাশি নানা কর্মশালা, সেমিনার সিম্পোজিয়াম ইত্যাদি নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে আয়োজিত হচ্ছে এই সংগঠন দুটির তদারকিতে। ঠিকই তো আছে। কিন্তু সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোতে যে নাটকগুলো প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হচ্ছে সেই নির্বাচন প্রক্রিয়ায়। আগেই উল্লেখ করেছি যে, এই নির্বাচনের মাপকাঠি হিসেবে আসলে নাটকের শিল্পমূল্য বিচারের চেয়ে ব্যক্তিগত বা দলীয় যোগাযোগের শক্তিমত্তা বিচার্য হচ্ছে। এই যোগাযোগের অভীষ্ট কী? আমরা হয়তো গভীরভাবে ভাবছি না যে এই ভুল প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের কারণে আমরা অনেক ভালো নাটককে বিপুল দর্শকের সামনে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হচ্ছি। এতে করে ব্যক্তির বা সংশ্লিষ্ট দলের উদ্দেশ্য সফল হলেও শিল্পচর্চার মৌল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। হাতে গোনা কয়েকটি দল ভারত থেকে নিয়ে এসে ‘আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব’ নামকরণ করলে অনুষ্ঠানটা হয়তো হয়, কিন্তু মূল উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। রবীন্দ্রনাথের ‘তোতাকাহিনী’-র মতো খাঁচাটা বেশ বড়ো হয়ে চকচক করে কিন্তু পাখিটা মরে যায়। তবে এই গৎ বাঁধা নাট্যোৎসবের বাইরেও দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন প্রয়াস যে হয় নি তা নয়। সেগুলো ফেডারেশানের মানুষগুলোই হয়তো করেছেন অন্য ব্যানারে। ২০১৫ সালের ‘আন্তর্জাতিক মৃত্তিকালগ্ন নাট্যোৎসব’ তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য যা সাধুবাদের দাবি রাখে।

ফেডারেশানের অন্যান্য কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই, পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত থেকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে আমাদের সেমিনার সিম্পোজিয়ামের মূল প্রবন্ধকার বা কর্মশালা প্রশিক্ষক করা হচ্ছে। সেটাও ভালো কথা, সেটারও দরকার আছে। কিন্তু একইভাবে আমাদের গবেষকগণ কিন্তু ভারতে গিয়ে খুব বেশি মূল প্রবন্ধ পাঠ করছেন না বা প্রশিক্ষকও হচ্ছেন না। তাহলে? আমাদের অভিভাবক নাট্য সংগঠনগুলোও কি তবে ভারত তথা বিদেশপ্রিয়তায় আক্রান্ত? উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই লেখার উদ্দেশ্য কখনই ভারতবৈরিতা নয়। বরং ভারতপ্রিয়তার আতিশয্যে আমরা যেন নিজেদের প্রত্যয় ও শক্তিমত্তার প্রতি অশ্রদ্ধা না করি, তাই হলো এই লেখার অন্যতম একটি উদ্দেশ্য। ভারত কেনো, পৃথিবীর যে-কোনো দেশের ভালো বিষয় আমরা গ্রহণ করবো এটাই আধুনিকতা। কিন্তু, তাই বলে নিজেদের কানাকড়ি কিছুই নাই কেবল বাইরের দিকে তাকিয়ে স্বীকৃতি খুঁজতে হবে, এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে।

কয়েকদিন আগে একটা ‘থিয়েটার আড্ডা’ হয়ে গেল; দুর্ভাগ্যবশত আমি সেখানে উপস্থিত থাকতে পারি নি। সেই আড্ডায় মুখ্য আলোচক ছিলেন ভারতীয় একজন এবং বাংলাদেশের একজন নাট্যজন, যিনি আবার ভারত থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন নাট্যজন বিদ্রুপের সুরে জানালেন, সেই আড্ডার আলোচনা ঘুরে ফিরে নাকি ‘এনএসডি ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণের সহজ উপায় কী’- তাই নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল। হতেই পারে, কথাটা শুনে বিশ্বাসও হলো এই কারণে যে, ‘এনএসডি তথা ভারতই হলো ভারতবর্ষে নাটকচর্চার তীর্থস্থান’- এই ধরনের মানসিকতা আমরা মনে মনে অনেকেই ধারণ করি। সেজন্যই বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি করার মতো অবস্থায় আমরা পৌঁছেছি। সত্যি কথা বলতে আমি আজকের লেখাটিই তখন লিখছিলাম ফলে সেই মুহূর্তে আড্ডাটা মিস করেছিলাম। দুই দেশের দুইজন নাট্যজনকে নিয়ে আড্ডাতে বিষয়বস্তু হতে পারতো দুই ভূ-খণ্ডের শিল্প প্রতিভঙ্গির সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য, হতে পারতো থিয়েটার নামক শিল্পটির বৈশ্বিক বা সর্বজনীন ভাষা কী হতে পারে ইত্যাদি। কিন্তু ঘুরে ফিরে যদি আমরা উপরোক্ত জায়গাতেই পৌঁছাই তাহলে মেনে নিতেই হয়, আমরা একটি বদ্ধমূল ধারণা থেকে এখনো থিয়েটার চর্চা করছি। এই বদ্ধমূল ধারণা করবার বিষয়টিও অনাধুনিক ও মানসিক দৈন্য।

তাহলে সমস্যার গোঁড়াটা কোথায়? কেনো তবে আড্ডার টেবিলে বা সেমিনারে সিম্পোজিয়ামে ‘কতোদূর এগিয়েছি’, ‘ভারতে নাটকের প্রদর্শনী কীভাবে করা যায়’ ইত্যাদি কথাগুলো ঘুরে ফিরে আসছে? তবে কি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গোপন কোনো মাপকাঠি আমাদের চেতনায় ক্রিয়াশীল? সেই গোপন মাপকাঠিতে পশ্চিমবঙ্গে আমাদের নাটকের প্রদর্শনী হলো কি-না, কিংবাা এনএসডি ফেস্টিভ্যালে এই নাটকটা অংশগ্রহণ করলো কি-না তা দিয়ে আমরা বিচার করছি ‘এগোনো’ আর ‘পেছানো’? আমরা অনেকে সচেতনভাবে এটা স্বীকার না করলেও নিজেদের মনের মধ্যে আমরা জানি যে, গোপন মাপকাঠিটা অনেকটা এই রকমই। পশ্চিমবঙ্গের অগ্রজ কিংবদন্তি বা তাঁদের অনুসারীদের স্বীকৃতি পাওয়া কিংবা এনএসডি নামক একটি প্রতিষ্ঠানের আনুকূল্য পাওয়ার অভিপ্রায়টা অনেক গোপনে আমাদের মানসিকতার দাসত্ব প্রমাণ করে।

এবার ভারতে অনুষ্ঠিত ৮ম থিয়েটার অলিম্পিকসে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে বলি।

এ বছর ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্য জুড়ে এই অলিম্পিকস অনুষ্ঠিত হয় যেখানে বাংলাদেশ থেকে ৯টি নাট্যমূলক পরিবেশনা (৮টি নাটক ও ১টি নৃত্যনাট্য) অংশগ্রহণ করে। বিবর্তন যশোরের ‘মাতব্রিং’ নাটকের নির্দেশক হিসেবে এই লেখার রচয়িতাকেও সেখানে যেতে হয়েছিল। ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা এই উৎসবটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল। নাট্যকেন্দ্র-এর ‘আরজ চরিতামৃত’ নাটকের অভিনেতা হিসেবে এনএসডি ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণের পূর্ব-অভিজ্ঞতা নিয়ে ভারত গিয়েছিলাম এবার। উড়িষ্যা রাজ্যের ভূবনেশ^র এবং দিল্লিতে দুটি প্রদর্শনী করার অভিজ্ঞতা হলো এবার। ভুবনেশ্বরের রবীন্দ্র মণ্ডপ ও দিল্লির কামানি এই দুটি মঞ্চেই এনএসডি নিযুক্ত স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় কিছু কর্মকর্তা ছিলেন দলগুলোর এবং প্রদর্শনীর ব্যবস্থাপনার জন্য। বারবার চিঠিতে, মেইলে নিজেদের মঞ্চোপকরণের লিস্ট পাঠানোর পরও যখন এনএসডি থেকে উত্তর আসছিল না, তখন আমরা খানিকটা বিচলিতই ছিলাম সেগুলো নিয়ে। মঞ্চে গিয়ে দেখা গেল সেগুলো তখনও তৈরি হচ্ছে, যদিও কর্মকর্তারা এই নিয়ে মোটেই বিচলিত ছিলেন না। যেন তাঁরা যখন আমাদের সেগুলো দেবেন তখন পেলেই চলবে আমাদের। দুটি মঞ্চের ক্ষেত্রেই এমনটি হলো। ভাবটা এমন যেন তারাই পেশাদার, তাদের জানা আছে কখন সেগুলো পেতে হবে। কেউ কেউ বললেনও, ‘সময় মতো পেয়ে যাবেন’। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেলও। কিন্তু যখন পাওয়া গেলো তা আমাদের ‘সময় মতো’ পাওয়া হলো কিনা তা তো তারা জানতে চাইলেন না। আলোর ক্ষেত্রেও তাই। ভূবনেশ^রে দর্শকের ব্যাপারে জানতে চাইলে জানা গেলো, সেখানে টিকেটধারী দর্শক নয়, কার্ডধারী কিছু সামাজিক পদস্থ ব্যক্তিরা আসবেন। এই নিয়েও এনএসডির কোনো মাথা ব্যাথা নেই। দিল্লিতে টিকেট বিক্রয় হবে অনলাইনে কিন্তু শহর ঘুরে দেখা গেল স্থানীয় অনেকে জানেনই না যে এতো বড়ো একটা ইভেন্ট এখানে হচ্ছে। আমাদের দল থেকে কিছু কমপ্লিমেন্টারি টিকেট চাওয়াতে নতুন করে চিঠি লিখতে হলো, মনে হলো যেন টিকেটের খুব চাহিদা। ভূবনেশ^রের প্রদর্শনীতে উপচেপড়া দর্শক পেয়েছিলাম (কার্ডধারী দর্শক বলেই কিনা কে জানে!)। এমনকি আমাদের প্রদর্শনী শুরু করতে একটু দেরিও হয়েছিল। কিন্তু দিল্লিতে? যেখানে প্রচুর বাঙালির বসবাস সেখানে ১৩০-১৫০ জন মাত্র দর্শক পেলাম। মন্তব্য শুনে মনে হলো নাটক হয়তো দর্শকের ভালোও লাগলো। কিন্তু মনটা ভরলো না। কেমন যেন উত্তাপহীন। তবে কি দিল্লি আমাদেরকে ‘আন্ডারডগ’ হিসেবে মূল্যায়ন করলো। যে এনএসডি থেকে স্বর্ণপদক পেয়ে সৈয়দ জামিল আহমেদ, তারিক আনাম খান প্রচুর সুনাম আর্জন করেছেন সেই এনএসডি! করতেও পারে, এনএসডি ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণকে পূণ্য মনে করে, যে-কোনোভাবে যোগাযোগের কৌশলকে আশ্রয় করে এই এনএসডি ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশ থেকে এমন নাটকও কিছুকাল যাবৎ অংশগ্রহণ করছে যা আমাদের দেশেই লোকে দেখে প্রশংসা করে না। এনএসডি-তে অধ্যয়নরতা একজন শিক্ষার্থী আমাদেরই একজন নাট্যজনকে জানালেনও আন্তরিকভাবে-অনানুষ্ঠানিকভাবে: সেই রকম নাটক দেখার অভিজ্ঞতা হয়তো বাংলাদেশের বা বাংলা ভাষাভাষী নাটক সম্পর্কে তাঁদের বিরূপ করে থাকতে পারে। না-কি ওদের ব্যাপার-স্যাপারই এইরকম! সব মিলিয়ে মনে হলো ভারতের এনএসডি একটি সুসংহত নাট্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘থিয়েটার চর্চা’ বিষয়টাকে একটি ‘সুনির্দিষ্ট কাঠামোর’ মধ্যে নিয়ে গেছে এবং অনুভব করলাম, প্রতিষ্ঠানটি এই বিষয়ে এমন একটি প্রত্যয় ধারণ করে যে, সেই ‘সুনির্দিষ্ট কাঠামো’র বাইরে যেন কিছু থাকা উচিত নয়, থাকতে পারে না। এবারের ফেস্টিভ্যালে তাঁদের যোগাযোগের দীর্ঘসূত্রিতা ও নির্বিকারত্ব, মঞ্চে পৌঁছানোর পর তাঁদের কর্মকর্তাবৃন্দের দায়িত্বহীনতা, প্রচারের ক্ষেত্রে দর্শকবৃন্দের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণের পরিবর্তে ব্রোশিওর, ফোল্ডার কিংবা সাজসজ্জার-হোডিং ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত থাকা ইত্যাদি দেখে মনে হলো প্রাণহীন এক নগরীতে উৎসব নামে এক পরিহাস হচ্ছে। এই পরিহাসে অংশগ্রহণের জন্য আমাদের এতো উতলা হওয়ার কী আছে? এই উতলাপনা আমাদের হীনমন্যতা হিসেবে মনের মধ্যে কাঁটা হয়ে বিঁধে, মনে হয় শত বৎসরের ঔপনিবেশিক দাসত্ব আমাদের প্রত্যয়কে কি একেবারেই ভেঙেচুরে নিঃশেষ করে দিয়ে গেল! এই আন্তর্জাতিক হওয়ার অভিপ্রিয়তাকে পরশ্রীকাতরতা হিসেবেও শনাক্ত করি মনের ভিতর।

তবে কি আমরা আমাদের নাটক নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাবো না? কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নানা থিয়েটারকে আমাদের ভূখ-ে আমন্ত্রণ করবো না? অবশ্যই করবো। তা না হলে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও বৈচিত্র্যের শক্তি অনুধাবন করবো কীভাবে। কিন্তু সেখানেই আমাদের আরো চিন্তাশীল ও দূরদর্শী হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। সেটা কী রকম? কিছু প্রস্তাব আসতে পারে আমাদের নানা অঙ্গনের মানুষের কাছ থেকে। শুধু নাট্যজন নয়, সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক নেতৃবর্গের কাছ থেকেও দিকনির্দেশনা আসতে পারে আমাদের জাতীয় মানস নির্মাণের ব্যাপারে। থিয়েটার এখানে একটি আইকন হিসেবে জাতীয় মানসেরই প্রতিফলন ঘটাবে এটা আশা করাটাই যৌক্তিক। ব্যক্তিগতভাবে এই লেখার কলেবরে দু’একটি প্রস্তাব করতে পারি উদাহরণ হিসেবে। এই প্রস্তাবগুলো কেবলই অভিমত, কোনো তত্ত্ব বা প্রকল্প নয়।

আমরা আমাদের দেশের নতুন নতুন প্রযোজনা নিয়ে নাট্যোৎসব করতে পারি যা একাধারে নাট্য প্রতিযোগিতার আদলে হওয়া উচিত। সেখানে শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা থেকে শুরু করে আরো কিছু স্বীকৃতি থাকা উচিত যা সংশ্লিষ্ট দল ও শিল্পীদের প্রেরণা জোগাবে ভালো নাটক করতে। এই স্বীকৃতি প্রদানের জন্য দরকার একটি জুরি বোর্ড যা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা তৈরি, তবে অবশ্যই গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান-আই.টি.আই এর তথাকথিত নেতৃবর্গ বা উক্ত উৎসবে অংশগ্রহণকারী কোনো দলের সদস্য ব্যতিরেকে। আবার দর্শক জরিপের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতেও তা হতে পারে। এই ধরনের উৎসব থেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত নাটকগুলোর সারা দেশে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসতে পারে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ব্যবস্থাপনায় থাকতে পারে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান। মনে রাখতে হবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের মতো এমন একটি সংগঠন নেই। এই ফেডারেশান আমাদের একটি শক্তি বৈকি।

পাশাপাশি নীতিমালা থাকা উচিত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো নাটকের পরিভ্রমণ বিষয়ে। একটি নাটকের অন্তত ১০টি প্রদর্শনী দেশে অনুষ্ঠিত হবার আগে বাইরের দেশে এর প্রদর্শনী হওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্তের জন্য নীতিমালা থাকতে পারে। একইভাবে কোনো নাটককে দেশে আমন্ত্রণ করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দলের আমন্ত্রণকে বিবেচনা করার জন্যও গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় তথা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত বিশেষজ্ঞের দ্বারা নির্মিত একটি বোর্ড থাকতে পারে। এই বোর্ড আমন্ত্রিত দলের নাটকের গুণাগুণ বিষয়ক অনুমোদন দেবার পরই সেই নাটকগুলো এই দেশে প্রদর্শিত হতে পারে। তাতে অন্তত কিছু ভালো প্রযোজনা এই দেশে প্রদর্শিত হবে, যা থেকে আমরা কিছু শিখতে পারবো। এনএসডি যদি প্রস্তাব আকারে আবেদনপত্র থেকে দল বাছাই করতে পারে তাহলে আমারা কেনো পারবো না এই ধরনের একটি বাছাই প্রক্রিয়ায় যেতে? তাতে আরেকটি কাজ হবে। অপসংস্কৃতি তথা অপ্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও জাতি খানিকটা মুক্ত থাকবে।

আর ঔপনিবেশিক মানসিকতার কথা যদি বলি, তা তো একদিনে ঠিক হবে না। এর জন্য দরকার প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষায় মূল্যবোধের প্রতি আমাদের সকলের নজর দেওয়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে ভূমিকা অবশ্যই রাখতে পারে। কিন্তু পারিবারিক পর্যায়ের যে শিক্ষা সেখানে আমাদের নিজেদের উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যক্তি থেকে পারিবারিক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, হাছনরাজা আর বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা যদি চর্চা করা না যায় তবে আমাদের বাঙালি মানস নির্মিত হবে না। যে মানস পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে বিশ্বকে দেখে উদার মায়াময়তায়। পরিবার ঠিক না হলে একটি সমাজ ঠিক হবে না। আর সমাজ ঠিক না হলে রাষ্ট্র কীভাবে ঠিক হবে। কেবল রাষ্ট্রের উপর দায় চাপিয়ে আমরা বসে থাকলে সেদিন আর বেশি দূরে নয় যখন সমস্ত পৃথিবী আমাদেরকে কোনো একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের প্রদেশ-ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করবে। ঢাকের গর্জন, ভাটিয়ালির সুরময়তা আর বিপ্লবের গৌরব হারিয়ে যাবে ইতিহাসের অতল গহ্বরে।

ইউসুফ হাসান অর্ক: অভিনেতা-নির্দেশক-গবেষক। অধ্যাপক, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।