Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

গত ২০ বছরে আমাদের থিয়েটার : পাখির চোখে দেখা

Written by এম. এ. সবুর.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

গত ২০ বছরে আমাদের মঞ্চনাটককে একটা অ্যাবস্ট্রাকট আর্টের ক্যানভাসের সাথে তুলনা করা যায়। অ্যাবস্ট্রাকট আর্ট বা বিমূর্ত শিল্পটা তবে কী? এটি এমন একটি রহস্যময় শিল্প, যার কিছু বুঝি এবং কিছু বুঝি না, যার ভেতরে রঙের খেলা প্রচুর, রেখার খেলা, আলোর খেলা প্রচুর, কিছু কিছু স্ট্রাকচার স্পষ্ট অথবা অস্পষ্ট। তবে এই শিল্প মানুষকে খুব আকৃষ্ট করে বা কাছে টানে অবিরত। আসলে বাস্তবিক অর্থে অ্যাবস্ট্রাকট আর্টকে মনে হয় মূর্ত-বিমূর্তের মিশেলে এমন একটি চিত্রকলা যাকে ডিফাইন করা যায় অথবা যায় না। অথচ এর আগের সময়টায় অর্থাৎ ১৯৭২ থেকে নব্বই দশকের শেষ দিক পর্যন্ত আমাদের নাটককে অনেকটাই স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ চিত্রকলা বলা যায়। এই সময়ে যেমন দুর্ভিক্ষ বোঝা যেতো স্পষ্ট, তেমনি কাশফুলও বোঝা যেতো স্পষ্ট।

কিন্তু চলমান ২০ বছরের নাটক বোঝার দিক দিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট, এর কিছু বুঝি আবার কিছু বুঝি না। যদিও বর্তমানের নাটকে আলোর ঝলকানি বেশি, রঙের ঝলকানি বেশি এবং ঢঙের ঝলকানিও বেশি। এখানে নিরীক্ষণ বেশি, চিন্তার সন্নিবেশ বেশি, প্রয়োগশৈলীর বৈচিত্র্য বেশি, তবে ভেতরকার নির্যাসটুকু মূর্ত-বিমূর্তের মিশেল। একে বলা যাবে না স্পষ্টত দুর্ভিক্ষের জলরঙ অথবা বলা যাবে না স্পষ্টত নগরায়নের তেলরঙ। এই সময়কার অ্যাবস্ট্রাকট আর্টে কিছু তীর্যকরেখা চলতে চলতে কিছু নাট্যদলের জন্ম দিয়েছে, কিছু নাট্যকর্মের জন্ম দিয়েছে, কিছু নাট্যধারা বা নিরীক্ষণের পথ খুলে দিয়েছে। এর সবগুলোর সাথে ভ্রমণ করা আমার সম্ভব হয় নি। তবুও পাখির চোখ দিয়ে নতুন দল ও পুরনো দলের কিছু কিছু সৃষ্টি নিয়ে সামান্য আলোকপাত করতে চাই।

গত ২০/২২ বছরে সৃষ্টি হয়েছে ‘প্রাচ্যনাট’, ‘প্রাঙ্গণেমোর’, ‘স্বপ্নদল’, ‘বটতলা’, ‘মণিপুরি থিয়েটার’সহ আরও অনেক নাট্যদলের। প্রাচ্যনাট দল হিসেবে প্রযোজনাশৈলী নিয়ে বেশ গবেষণা করে থাকে। এই দলের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাকটিং অ্যান্ড ডিজাইন’, যেখান থেকে ৬ মাস পর পর নাট্যশিক্ষা নিয়ে থিয়েটার অঙ্গনে প্রবেশ করছে অনেক নাট্যকর্মী। প্রাচ্যনাট প্রযোজনা ‘সার্কাস সার্কাস’, ‘মান্দার’, ‘এ ম্যান ফর অল সিজনস্’, ‘কিনু কাহারের থেটার’, ‘কইন্যা’, ‘রাজা এবং অন্যান্য...’ দর্শকপ্রিয় নাটক। এর মধ্যে ‘কইন্যা’ আমার কাছে একটি ভিন্নমাত্রিক নাটক বলে মনে হয়েছে, যেখানে নিরীক্ষণের বিষয়টি স্পষ্ট এবং ভালো লাগবার মতো।

‘প্রাঙ্গণেমোর’ রবীন্দ্রনাট্যের একটি দ্যূতিময় অবয়ব এঁকেছে- যেখানে রবীন্দ্রনাথের নাট্য, জীবন, রাজনীতি এবং দর্শন খুব স্পষ্টভাবেই ফুটে ওঠে। ‘রক্তকরবী’, ‘শ্যামাপ্রেম’, ‘স্বদেশী’ আর ‘আমি ও রবীন্দ্রনাথ’ নাটকে প্রাঙ্গণেমোরের তীর্যকরেখাগুলোয় রবীন্দ্রনাথের জীবন ও নাট্যকলা ছন্দ তুলে বিরাজমান। ‘আমি ও রবীন্দ্রনাথ’ নাটকে নূনা আফরোজ তাঁর কলম, নির্দেশনা আর অভিনয়ে বিস্ময়করভাবে মূর্ত করে তোলেন রবীন্দ্রনাথের জীবনের নানা জানা-অজানা ভুবন। গত দুই দশকে নূনা আফরোজের অভিনয়ের দ্যূতি ছড়ায় প্রাঙ্গণেমোরে’র প্রায় প্রতিটি প্রযোজনায়। নাট্যদলটি জন্মের পর থেকে তাদের সবগুলো প্রযোজনার মধ্য দিয়ে বেশ শক্তিশালী এবং স্বতন্ত্র একটি  নাট্যদলের অবস্থান তৈরি করেছে বাংলাদেশের থিয়েটারে। শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, এই দল মাইকেল মধুসূদনের জীবনীকেও মঞ্চে এনেছে, সৈয়দ শামসুল হকের নাটক মঞ্চে এনেছে। অর্থাৎ প্রযোজনাশৈলী দিয়ে ভিন্নমাত্রিকভাবে রাঙিয়েছে আমাদের থিয়েটারকে।

এই সময়কালে জন্ম নেয়া ‘স্বপ্নদল’ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দলের ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ নাটকটি থিয়েটার পাড়ায় বেশ দাপটের সাথে মঞ্চস্থ হচ্ছে। দলটি নিয়মিত ভালো প্রযোজনা নির্মাণে উৎসাহী। দলের এই কর্মপ্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। জন্মের পর থেকে ‘বটতলা’ও তাদের প্রযোজনা দিয়ে দর্শককে মুগ্ধ করে চলেছে। ‘খনা’, ‘ক্রাচের কর্নেল’ এর মতো নাটক নিয়ে কেবল বটতলা না, পুরো নাট্যাঙ্গনই গর্ব করতে পারে।  

শ্রীমঙ্গলের ‘মণিপুরি থিয়েটার’ গত ২০ বছরে এক আলোর ঝলক, নাচের ঝলক, রঙ্গের ঝলক। বেশ আকর্ষণীয় একটি নাট্যধারার অবয়ব তুলে ধরেছে অ্যাবস্ট্রাকট আর্টের ক্যানভাসে। যেখানে সবকিছু স্বতন্ত্র। ভাষা, কসটিউম, প্রযোজনাশৈলী, নৃত্যের ধারা, প্লট নির্বাচন ইত্যাদি সবকিছু মিলেমিশে আধুনিক এক লোকনাট্যের অবয়ব খুব স্পষ্ট হয় নাট্যাঙ্গনে। মণিপুরি থিয়েটারের প্রযোজনায় কোনো গিমিক নেই। এখানে নিটল গল্প, পরিশীলিত নাট্যশৈলী, বিষয়বস্তুর স্বাতন্ত্র্য ভীষণভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। এরা রাধাকৃষ্ণ থেকে প্রযোজনা উপহার দিয়েছে, মঞ্চে এনেছে ‘কহে বীরাঙ্গনা’র মতো মনোড্রামা। এখন মণিপুরি থিয়েটারের নাটক দেখতে অনেক দর্শক অপেক্ষায় থাকেন। একটি প্রান্তিক অঞ্চলের নাট্যদল হিসেবে মণিপুরি থিয়েটারের এটা এক বিশাল অর্জন।
 
এই সময়কালে রেপাটরি থিয়েটারের চর্চা বেশ চোখে পড়ার মতো। গত ১০ বছরের মধ্যে বেশ কয়েকটি রেপাটরি দল আত্মপ্রকাশ করেছে। এদের মধ্যে ‘জন্মসূত্র’, ‘শূন্যন’, ‘থিয়েটারওয়ালা রেপাটরি’-এর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। জন্মসূত্র দলের প্রযোজনা অহরকণ্ডল। একেবারেই ব্যতিক্রমর্ধমী গল্প, ভিন্নধর্মী প্রযোজনাশৈলী, এবং মাত্র তিনজন অভিনেতার অভিনয় দর্শককে থমকে দিয়েছে ক্ষণকাল। নাটকটির অভিনেতা দীলিপ চক্রবর্তী আমাদের কাঁদিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। যথেষ্ট অভিনয়শক্তি দেখা গেছে দীলিপের অহরকণ্ডল বা ‘দেশ নাটক’-এর নিত্যপুরাণ নাটকে একলব্য চরিত্রে। জন্মসূত্র নাট্যদলের কাছে হঠাৎ করেই দর্শকের প্রচুর চাহিদা তৈরি হয়েছিল। যদিও এই দলটি দ্বিতীয় কোনো প্রযোজনা উপহার দিতে পারে নি।

‘থিয়েটারওয়ালা রেপাটরি’ প্রযোজনা ‘শাইলক এ্যান্ড সিকোফ্যান্টস’। এই নাটক যতটুকু না প্রযোজনার জন্য, তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর মেসেজ এবং প্রাসঙ্গিকতার জন্য। ষোল শতকের ভেনিস সওদাগর শাইলককে দেখি সাম্রাজ্যবাদীর চূড়ান্তরূপে। পুঁজি এবং আরো পুঁজির তত্ত্বের সা¤্রাজ্যবাদশক্তি শাইলক হাজির হয়েছে বাংলাদেশে এবং ভর করছে সেকান্দর নামের এক গ-মূর্খের আত্মার উপর। আজ সেকান্দরের আহার-নিদ্রা-বিশ্রাম-কাম-প্রেম সবকিছু নির্ধারণ করে দেয় শাইলকের এজেন্ট। এমন কী পুঁজির বিনিময়ে সেকান্দরের স্ত্রী সুরাইয়ার গর্ভে শাইলকের সন্তান উৎপাদন করবার মতো লোমহর্ষক প্রস্তাব দর্শককে চমকে দেয়। কোন পৃথিবীতে তবে আমরা বসবাস করছি! একবারের জন্যও ভাবায় দর্শককে। বিশ্ব আজ কোথায় যাচ্ছে! শাহ্যাদ ফিরদাউসের ‘শাইলকের বাণিজ্য বিস্তার’ উপন্যাস অবলম্বনে এমন একটি যুগোপযোগী নাটক আমাদের উপহার দেয়ার জন্য নাট্যকার হাসান শাহরিয়ার ও নির্দেশক আজাদ আবুল কালামকে ধন্যবাদ। ১৬ শতক থেকে ২১ শতক, সময়ের চাকায় পুঁজিবাদ আরো বেশি ভয়ংকর হয়েছে এবং এর ছোবল থেকে কেউ রেহাই পায় নি, পাচ্ছে না এবং কেউ রেহাই পাবেও না। বিশ্বপুঁজির এমনি একটি  গ্রাসের মধ্য দিয়ে এগুচ্ছে সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী এবং মানুষ। ‘শাইলক এ্যান্ড সিকোফ্যান্টস’ নাটক হিসেবে চিন্তায় আঘাত করবার মতো। এর অভিনয়শৈলীও চমৎকার।

‘শূন্যন’ মঞ্চে এনেছে মান্নান হীরা’র ‘লাল জমিন’। সুদীপ চক্রবর্তীর নির্দেশনায় নাটকটিতে একক অভিনয় করেছেন মোমেনা চৌধুরী। নাটকটি দেশে-বিদেশে ইতোমধ্যে দুই শতাধিক প্রদর্শনী করেছে। বাংলাদেশের যেকোনো রেপাটরি থিয়েটারের জন্য এই সাফল্য অনন্য।

বিগত দুই দশকে পুরনো নাট্যদলগুলো কি খুব একটা গতিশীল থেকেছে? বিচার করবেন দর্শক। ‘আরণ্যক নাট্যদল’ গত ২০ বছরে মঞ্চে এনেছে মামুনুর রশীদের রচনা ও নির্দেশনায় ‘সংক্রান্তি’ এবং ‘রাঢ়াঙ’। এ ছাড়া মান্নান হীরা’র ময়ূরসিংহাসন আরণ্যকের আরো একটি উল্লেখযোগ্য মঞ্চসফল প্রযোজনা। নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন শাহআলম দুলাল। এই সময়কালে ‘বাঙলা থিয়েটার’ প্রযোজনা করেছে মামুনুর রশীদের রচনায় ও ফয়েজ জহিরের নির্দেশনায় ‘চে’র সাইকেল’। ‘ঢাকা থিয়েটার’ প্রযোজনা করেছে সেলিম আল দীনের রচনায় ও নাসির উদ্দিন ইউসুফের নির্দেশনায় ‘বনপাংশুল’, ‘প্রাচ্য’, ‘নিমজ্জন’ আর সেলিম আল দীনের ‘ধাবমান’ মঞ্চে এসেছে শিমূল ইউসুফের নির্দেশনায়। এই সময়কালে ঢাকা থিয়েটার আরো উপহার দিয়েছে মঞ্চকুসুম শিমূল ইউসুফের একক অভিনয়ে নাটক ‘বিনোদনী’। অন্যান্য পুরনো দলগুলোর প্রযোজনাও হাতে গোনা, যেগুলো আবার তাদের পূর্বের মান ধরে রাখতে পেরেছে বলে মনে হয় না।

বিগত দুই দশকে আমাদের নাটকে বিষাদের সুরও কম বাজে নি। এই সময়কালে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন এস এম সোলায়মান, আবদুল্লাহ আল-মামুন, সেলিম আল দীন, সৈয়দ শামসুল হক, সাঈদ আহমদ, মমতাজউদদীন আহমদ। চলে গেছেন বরেণ্য অভিনেত্রী নাজমা আনোয়ার। এসব ক্ষতি বড়ই অপূরণীয়। তবে যাঁরা চলে গেছেন তাঁদের পদচিহ্ন রেখে গেছেন আমাদের জন্য। যদি আমরা এসব অনুসরণ করি, তবে আমাদের পথ চলা সমৃদ্ধ হবে। নাট্যকারদের চলে যাওয়া সামগ্রিকভাবে দেশে পাণ্ডুলিপির সংকট সৃষ্টি করেছে। নতুন প্রজন্মের মধ্য থেকে যদি নাট্যকার সৃষ্টি না হয় তবে এদেশের নাটককে বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে। গত ২০ বছরে বাংলাদেশে এই জায়গায় একটি বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। এই শূন্যতা পূরনের জন্য নাটককে গিমিক বা যাদু বানানোর এক্সপেরিমেন্ট লক্ষ করা যাচ্ছে। পা-ুলিপির দুর্বলতা এড়ানোর জন্য নির্দেশনাকৌশলে রঙ লাগানো হচ্ছে বেশি। কোনো কোনো নির্দেশক দম্ভ নিয়ে এমন কথাও বলেন যে, নাটকে পা-ুলিপির প্রয়োজন নেই, নির্দেশানার কারিশমায় দর্শক মাত করে দেবেন। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে, বর্তমান সময়ে সার্কাস দেখবার জন্য টিকিট কেটে হল পর্যন্ত যাওয়ার দরকার নেই। এখন বহু সিনেমা হল মানুষের হাতের মুঠোর মধ্যে, মেগাপিকজেলের মধ্যে। সুতরাং সময়কে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন এবং নাটককে যাদু বানাতে যাওয়া অথবা যাদুকে নাটক বানাতে যাওয়া কতটুকু স্থিতিশীল পরীক্ষণ সে-বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।

এভাবে নিরীক্ষণে, নবনাট্য নির্মাণে, উৎসবে এবং বেদনায় কেটেছে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের গত ২০ বছর। ২০ বছরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রত্যাশা করি স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো কিছু গল্পের নাট্যনির্মাণ হবে আগামী দিনগুলোতে। অস্পষ্ট বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে, দর্শক সুন্দর সুন্দর নাটক দেখে তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরবে। একটি নাট্যজাগরণ ঘটবে আবার। মঞ্চ থাকবে উজ্জ্বল, আলোকিত, বর্ণাঢ্য এবং জীবনঘনিষ্ট। এই প্রত্যাশায় তাকিয়ে থাকি নাট্যাঙ্গনের অ্যাবস্ট্রাকট আর্টের ক্যানভাসের দিকে।

এম. এ. সবুর ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): নাট্যকার, লেখক।