Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

গত ২০ বছরে আমাদের থিয়েটার : থিয়েটারওয়ালা'র কুড়ি

Written by আজাদ আবুল কালাম.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

কুড়িতে বুড়ি, নাকি মাত্রই যৌবনপ্রাপ্তি?

ধরে নিই দ্বিতীয়টি বা দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা এবং প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি। প্রথম অধ্যায়ের মাল-মশলার বিন্যাস বিস্তারেও নানান বাঁক আছে- মগজ থেকে কাগজে, কাগজ থেকে অন্তর্জাল বা পর্দায়।

প্রথম সংখ্যার প্রকাশকালে প্রথম সাক্ষাতে সম্পাদক হাসান শাহরিয়ারের সাথে আলাপকালে মুখ ফসকে তখনকার নাট্যবিষয়ক বাংলা ভাষার নিয়মিত একটি পত্রিকা প্রসঙ্গে ‘এরকম পত্রিকা শত বছর ছাপা হলেও বাংলানাটকের কিছু যাবে আসবে না- কোনো শ্রী বৃদ্ধি হবে না।’- এমন কিছু বলে তাকে সতর্ক করতে চেয়েছিলাম যাতে পূর্বক্তটির কাতারে আরেকটি নিছক সংযোজন না হয়। বলাই বাহুল্য, এই কথায় একধরনের উন্নাসিকতার জলছাপ স্পষ্ট।

বাংলা ভাষায় নাট্যবিষয়ক পত্রপত্রিকা দুই বাংলা মিলিয়ে শ’এর অধিক হবে। দু’একটির নাম আবার ‘দুই বাংলার নাটক’ টাইপের বৃহৎ কলেবরে। প্রকাশের মুখ দেখেছে হয়তো দু’একবার। দু’একটি পত্রিকা স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য ছাড়া বেশিরভাগই একটা নির্দিষ্ট সূচিপত্র আশ্রয়ী। যেমন- সম্পাদকীয়, দু’টো-তিনটে অগভীর বিশ্লেষণে শব্দবিন্যাসে নাট্যসমালোচনা, নাটকের ইতিহাসকেন্দ্রিক বাংলা, গ্রীক, সংস্কৃত, ইংরেজি কোনো নাটকের আঙ্গিক-গল্প-প্রেক্ষাপট ইত্যাদি নিয়ে হাফ একাডেমিক লেখা, একটি বা দু’টি অনুবাদ বা মৌলিক নাটক ছাপানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং ঘুরেফিরে কয়েকজনই লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত। এর বাইরে দু’এক ছত্র সাক্ষাৎকার বা ব্যক্তি বন্দনায় ৫/৭ ফর্মা ভরাটকরণ প্রকল্প সম্পন্ন/সম্পাদন। এই নিয়মিত, অনিয়মিত প্রকাশনাগুলো আদতে একক ব্যক্তির চেষ্টার ফসল। তার রুচি, তার চাহিদা, তার পছন্দ-অপছন্দের প্রকাশ এবং তার সামর্থের মাপকাঠিও বটে। এই সামর্থ পকেটের পয়সার বা পয়সার ব্যবস্থা করার সামর্থ এবং রুচি-মাথার দৌড় জ্ঞাপক এবং এদেশের মধ্যবিত্তের গ্রুপ থিয়েটার বা আধুনিক নাটকই মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাট্যকলা বিভাগের নিয়মিত জার্নাল বা পত্রিকা আছে যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হয় না, সহজে মেলে না।

বিশ্বনাটক বলতে যে বৈশ্বিক বিস্তার তার সাথে পাঠক-নাট্যকর্মীদের তথ্যের সংযোগ ঘটানোর প্রয়াস প্রকাশনাগুলোতে ন্যূনতম পর্যায়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এমনকি বাংলাদেশের সীমানার ভিতর যে নাট্যবৈচিত্র্য, লোকজ নাট্যের যত নানাবিধ কৃত্য, নৃত্য, গীত, উপাসনালয়ে হাজার বছরের যে নাট্যক্রিয়া, ধর্মভেদে, অঞ্চলভেদে পুরাণ এবং লোকায়ত ধর্মচারীদের, নৃ-গোষ্ঠীর নাট্য পাঁচালী এসবের বিশদ পরিসরে সংকলনে সন্নিবেশিত করার অক্ষমতাও স্পষ্ট। এই অক্ষমতাকে কখনো কখনো শিক্ষানবিস ছাত্রের এসাইনমেন্ট টাইপের লেখা ছাপিয়ে আরো স্পষ্ট করে দেয়া হয়।

আর নাটকে যারা দর্শক এবং নাট্যকর্মী, এমনকি পাঠক, তাদের জানার আগ্রহকে ভোঁতা করে দেয়ার জন্য এই আধো আধো অস্পষ্ট বোল টাইপের লেখাই যথেষ্ট। বিশ্বনাটকের প্রসঙ্গে বলা যায়- বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের পাঠ্যসূচিতে, বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্য এবং নাট্যকলার সূচিক্রমে যে গুটিকয় দেশের নাটক নিয়ে পড়ানো হয়- তারই একটা ছায়া এসে পড়ে সংকলনগুলোতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট সময়ে বন্দি- পাঁচ বছর। এই সময়ে দুনিয়ার তাবৎ শিক্ষা আয়ত্বকরণ সম্ভব নয়। আর নাটক বা নাট্যচিন্তা, নাট্যচর্চা আজ, কাল, আগামীর অনির্দিষ্ট গন্তব্যগামী এবং অসীম। সেই অসীমের যাত্রী নাট্যকর্মী-পাঠক-দর্শক, যারা দেখতে চায় দুনিয়ার কোথায় কী নাটক বা নাট্যকৃত্যের কী হচ্ছে। কৈ আফ্রিকা, কৈ আরব দেশ, কৈ এশিয়া, কৈ লাতিন আমেরিকা, কৈ পূব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ? সম্ভব নয়, কারণ একজন ব্যক্তির পক্ষে সম্পাদনার দুরূহ কাজের পাশাপাশি এতসব মাল-মশল্লার যোগাড়যন্ত্র করা সম্ভব নয়।

এ কোনো বদনামনামা নয়। নাটক করতে এসেছিলাম কৈশোরে। তখনও নাট্যশিক্ষার বিদ্যায়তন শুধু মহড়া কক্ষের আদান-প্রদান-বয়ান আর প্রসঙ্গক্রমে নাট্যশিক্ষা। নাট্যবিদ্যালয়ে বা বড় বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয় নি। তাই ক্রমানুবর্তী থেকে নাট্যশিক্ষা অর্জন সম্ভব হয় নি। তবে যা পেতাম কথায়-কাজে-প্রয়োগে অথবা ছাপার অক্ষরে পুস্তক বা পত্রিকা , তা থেকে আস্বাদনের চেষ্টাই সম্বল। সেই কম্বলে ঘুমাতে সুখ ছিল না। অপ্রাপ্তির শীত ফাঁক ফোকরে ঢুকে যেতো প্রায়শই।

হাসান শাহরিয়ারও একজন। তাই তার থিয়েটারওয়ালা বের হয়েছে যখন শুনি তখন নানান শঙ্কা হয়েছিল। সে প্রথমেই জেনে-বুঝে সময়ের পরিপ্রেক্ষিত ও বাস্তবতাকে মাথায় নিয়ে নিজের স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের মানসে সেই ১৯৯৮ সালে প্রথম সংখ্যাটি সাহস করে বের করে ফেললেন। প্রথম সংখ্যাটি গতানুগতিকতার বাইরে একটি ‘আলাপন’ বা ‘আড্ডা’ নামে বৃহৎ অনুলিখন ছাপলো। নাট্যবোদ্ধা মামুনুর রশীদকে কেন্দ্র করে আরও তিনজন অভিনেতা-নির্দেশক নিয়ে আড্ডা। সেই আড্ডায় সংকট, সম্ভাবনা, থিয়েটার ভাবনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পারস্পরিক যোগাযোগ- এসব অত্যন্ত বৈঠকী ঢং-এ হালকা মেজাজে প্রাণোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। প্রবন্ধের উৎকট বিশ্লেষণের বাহারী শব্দের জঞ্জাল নয়, নয় শুধুই রেফারেন্স বা কোটেশন অথচ কথায় কথায় দর্শক-নাট্যকর্মী-পাঠকরা জেনে যায় এক বাস্তবতার এপিঠ ও ওপিঠ। ক্ষুব্ধ, যুদ্ধ, নানান সন্ত্রাসের মোকাবিলা- ব্যক্তি মামুনুর রশীদের বেড়ে ওঠা, শিল্পী হয়ে ওঠা, নাট্যরচনা, চারপাশের বিশ্বের রাজনৈতিক দৃষ্টিবিক্ষণ জানাও সম্ভব হলো। এই ‘আলাপন’ বা ‘আড্ডা’ পরবর্তী সময়ে থিয়েটারওয়ালাকে এনে দিয়েছে অন্য এক মাত্রা। কে নেই, কী নেই এই আলাপনে বা আড্ডায়? কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির থেকে শুরু করে এই অকিঞ্চিৎ নিমপাতা আজাদ আবুল কালাম পর্যন্ত।

এই সাক্ষাৎকারভিত্তিক আড্ডা, আলাপন আরও কত বিস্তৃত হতে পারে তা নিয়ে সম্পাদকের সাথে অনেকবার ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলাপ হয়েছে। হঠাৎই মনে হলো নিজের সংগ্রহে আছে ক্রিস্টোফার সিলভেস্টারের সম্পাদনায় ‘দ্য পেঙ্গুইন বুক অব ইন্টারভিউজ’। তখন থিয়েটারওয়ালা’র ভালোমন্দের সাথে সহোদরব্রত সম্পন্ন। কত কত সাক্ষাৎকার বা আড্ডা বা আলাপন ঐ বইয়ে- কার্ল মার্কস যেমন আছেন, তেমনি আছেন ইবসেন, আছেন সিগমন্ড ফ্রয়েড, এডলফ হিটলার, স্ট্যালিন, পিকাসো, বেকেট, হিচকক, জন লেনন, আর্থার মিলার। যাঁরা কথা বলেছেন এঁদের সাথে, তাঁরাও যুগের জ্ঞানতাপস। এই বইটি থিয়েটারওয়ালা’র কাজে লেগেছিল কিনা জানি না। সম্পাদক নিজে একজন অভিনেতা এবং নাট্যকার। তাই ঘুরেফিরে সে যেন নাটক বা অভিনয় নয়, ব্যক্তি ঐ শিল্পীর অন্তরাত্মাকে ধরতে চেয়েছেন প্রাত্যহিকতার দর্পণে।

আলাপন, আড্ডা বা সাক্ষাৎকারই বর্তমান লেখার শরীর। তার মানে এই নয় যে, অন্য কোনোকিছুই উল্লেখযোগ্য নয়। থিয়েটারওয়ালা’য় উল্লেখ করার মতো নবীন-প্রবীণের অনেক ধীমান বিশ্লেষণ প্রকাশ পেয়েছে এবং সেখানে নবীনদের প্রতি সম্পাদকের পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট দৃশ্যমান।

সেই সুবাদে আমাদের সময়ের নাট্যভক্ত, নাট্যকার, গবেষণাব্রতীদের অনেক ভালো লেখা আমাদের নজরে এসেছে এবং নিজের সময়ের থিয়েটারের মানুষদের জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার বিন্যাস গুটিকয় ব্যতিক্রম ছাড়া নিজেদেরকে প্রশান্তি দিয়েছে।

তারপরও থিয়েটারওয়ালা’র প্রধান বৈশিষ্ট্য অথবা স্বাতন্ত্র্য হিসেবে আমি চিহ্নিত করছি আড্ডা, আলাপন-সকল। যদিও এই দীর্ঘ আড্ডা বা আলাপনচিন্তা হাসান শাহরিয়ারের পূর্বেও দৃষ্টান্ত হয়েছে।

সম্পাদক, বিনা পয়সার সহযোগী সম্পাদক সুমন নিকলী ও সাইফ সুমন মিলেই ‘থিয়েটারওয়ালা’। তবে পরামর্শ দানকারীর সংখ্যা নিযুত। একক প্রচেষ্টাই হয়তো উত্তম, বাঙালির একত্রেযাত্রা কন্টকশোভিত এবং দৃশ্যমান সীমা অন-অতিক্রান্ত। তবে যদি সংঘবদ্ধভাবে আরো কিছু রুচিবান নবীন-প্রবীণ জ্ঞানীর একটি কনসোর্টিয়াম হতো তাহলে কি থিয়েটারওয়ালা’র সমৃদ্ধি বা ক্ষেত্র বিচরণ প্রসারিত হতো? এই একার বদলে সংঘবদ্ধ হবার চিন্তা এসেছে অনেকগুলো উদাহরণ মাথায় আসায়। যেমন, দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি) থেকে প্রকাশিত বছরে দু’টো প্রকাশনা `Theatre India’ বা ত্রৈমাসিক হিন্দি ও ইংরেজিতে `Rang Manch’ সংবাদনির্ভর প্রকাশনা। যদিও দু’টো প্রকাশনার পেছনের পৃষ্ঠপোষক এনএসডি’র মতো বড় প্রতিষ্ঠান, তারপরও বিষয় নির্বাচনে তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি বা বিস্তৃতি তা অবাক করার মতো।

`The Drama Review’ (TDR) আরেক উদাহরণ। পুরনো একটি সংখ্যা ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম।`Performance Study’-র দিনপঞ্জী যেন। কে নেই সেখানে, কী নেই সেখানে? সম্পাদনা করেন রিচার্ড শেখনার। কখনো কখনো তার সহযোদ্ধারা- অগাস্তো বোয়াল, ইউজিন বারবা, মারিলার আর সেনফোর্ড আরো কত কতজন- ইংলিশ, স্পানিশ, পর্তুগিজ, ইন্ডিয়ান, চাইনিজ কত কত সময়ের শ্রেষ্ঠ নাট্যজন। প্রতি এক বছর দুই বছর পরপর রিচার্ড শেখনার ছাড়া বাকিরা পাল্টাপাল্টি বিষয়বস্তুর প্রকরণভেদে সংস্কৃতি-ভূগোলভেদে। এই বিরাট লোকবল নিয়েও কিন্তু তারা মাত্র দু’টো সংখ্যা বের করেন বছরে। বিষয় হিসেবে পারফরমেন্স বলতে যা বোঝায় তার সমগ্রকে ধারণ করার চেষ্টা থাকে। এমনকি সামাজিক নানান পরিবর্তন নতুন চিন্তা-চেতনা উদ্ভাবনে যে প্রতিক্রিয়া শিল্পে কী প্রভাব ফেলে তার গবেষণাধর্মী অভিসন্দর্ভ যেন, যদিও মূলত নাটকেরই কাগজ TDR এবং তাঁরা বলে একাডেমিক প্রকাশনা, কিন্তু বিশ্বনাট্যাঙ্গনে যতটা না একাডেমির লোকেরা এর পাঠক তার চেয়ে বেশি নাটকে সংযুক্ত কলাকুশলীরা। এই TDR-এর পেছনেও আছে পৃষ্ঠপোষক নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়। আছে লন্ডন থেকে প্রকাশিত `The Stage’. থিয়েটারওয়ালা’র কুড়ি বছর ফিরে দেখার সাথে এইসব কথাবার্তার প্রাসঙ্গিকতা হয়তোবা মামুলি, তবুও একেবারেই ধান ভানতে গিয়ে শীবের গীত গাওয়া কি? সেটাও বোধকরি গোপন মিথ্যার ঢাল। থিয়েটারওয়ালা দিন দিন সমৃদ্ধ হয়েছে আর আমরা যারা এত প্রত্যক্ষ ফুল-ফল কুড়ানির দল তাদের স্বপ্ন কখনো সাধ্যাতীত ডানা মেলেছে- এই আর কী।

এই লেখাটি শেষ করার এই মুহূর্তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রহমান রাজু মুঠোফোনে বার্তায় লেখা চেয়েছে তার পত্রিকা ‘আনর্ত’র জন্য, যার প্রথম ঢাউস সংখ্যাটি আমার সংগ্রহে আছে। রাজু’র দলটি বেশ বড়সড়, অনেক নবীন মাথার যোগফল।

কুড়িতে বুড়ি নয় বরং কুঁড়ি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি? ধুধু চরের শেষ সীমান্তে একা লড়াই করে যাওয়া হাসান শাহরিয়ার এবং তার নিকট বন্ধুরা মিলে নতুন করে কুঁড়ি থেকে ফোটার আকাঙ্ক্ষা করতে পারি কিনা। এখন তো আর ছাপাখানায় যেতে হচ্ছে না। কাগজ কালি মেশিনের খরচটা বেঁচে গেছে।

যেভাবেই হোক, নিয়মিত থাকাটা অনেক বড় কথা।

আজাদ আবুল কালাম ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): অভিনেতা-নির্দেশক-নাট্যকার। সদস্য- প্রাচ্যনাট।