Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

রূপকথার প্রত্যাবর্তন: যাদুর বোকা-বাক্সেও

Written by বিপ্লব বালা.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[আসাদুজ্জামান নূর-এর ৭০ তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের সবার উষ্ণ শুভেচ্ছা-সম্পাদক]

‘ব্যক্তির বিকাশ’ বলে একটা কথা আছে। আমাদের এই দেশ-সমাজ-রাষ্ট্রে সেটা তো তেমন ঘটে না। অথচ তাই দিয়েই নাকি পরিমাপ করা যায়-কতখানি ব্যক্তির বিকাশের অনুকূল কি প্রতিকূল সে দেশ-সমাজ-রাষ্ট্র। তবু তারমধ্যেও ব্যক্তির বিকাশ দেখা যায়। আলাদা করে চোখে পড়ে তখন তাকে। দশের ভিড়ে তখন তিনি যেন হয়ে ওঠেন একাদশ। সমাজের নানা পেশার মানুষের মধ্যেই এই ঘটনা ঘটে চলে। তাঁকে তখন সকলে বিশেষ বলে, প্রতিভাবান বলে চিনে নেয়। সাধারণের মধ্যে অসাধারণ হয়ে ওঠেন তিনি। পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, আরে তাঁকে তো আলাদা করে চোখে পড়েনি কখনো তেমন! তিনি কীকরে আর-সকলের মধ্যে থেকেও হয়ে ওঠেন এহেন ক্রমব্যক্তিমান। যাকে আগে আলাদা তেমন লাগেনি তো! কীকরে তবে ব্যক্তির এমতো ‘হওয়ার’, ‘হয়ে ওঠার’ যাদু সংঘটিত হয়? সেবুঝি এক বিস্ময়- ব্যক্তির সত্তাবিকাশের- ‘যে সত্তার স্বপ্ন দেখে/ মানবসভ্যতা চিরকাল।’

আসাদুজ্জামান নূর ওপার বাংলা থেকে এদেশে আসেন। বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবার ছিল তাদের। ভাবতে ইচ্ছে করে, পারিবারিকভাবে আচার-আচরণ-বাচনে পশ্চিমবঙ্গীয় এক পরিশীলন তাদেরকে আর-সবার থেকে আলাদা করতো কি? সবার সঙ্গে মিশতে অসুবিধা হতো কতটা কেমন? নীলফামারী তো ছোট এক মহকুমা শহর তখন- প্রায় গ্রাম। যেখান থেকে এসেছিলেন, ছিল না কি তার অধিক নগর প্রতিবেশ? কোন বয়সে আসেন নূরভাই? মনে পড়ে কি কিছু ওখানকার?

আমি কল্পনা করতে চাইছি, এক কিশোর বালকের- যেকিনা বাবা-মায়ের হাত ধরে এলো যেন এক নতুন অচেনা দেশে। যেখানকার সবকিছু তার চোখে অন্যরকম লাগে। অন্য সবার সঙ্গে সহজ হতে বাধে পদে পদে। এথেকে সূচিত হয় বুঝি এক বিকাশযাত্রার, পদে পদে এই বাধা-বিপত্তির পাহাড় ঠেলে ঠেলে।

আমাদের সঙ্গে পড়তো একজন যারা ওপার বাংলা থেকে এসেছিলো। ওদের কথা-আচরণ কেমন ভিন্ন লাগতো। রুচির এক পরিশীলন ছিল তাদের সবকিছুতে। তাতে করে আমরা গ্রাম্যতায় একটু যেন থমকে যেতাম। একটু হীনম্মন্যতার বোধই বুঝি হতো।

পশ্চিমবঙ্গীয় শিক্ষা-রুচি-বাচনের এই পরিশীলন আমাদের নাগরিক মানসগঠনে কতটা কেমন মিথষ্ক্রিয়া করেছিলো তার কোনো সুলুকসন্ধান হয়নি। একজন হাসান ইমাম কী রাজ্জাক; কামরুল হাসান, কলিম শরাফী, আনিসুজ্জামান, জিল্লুুর রহমান সিদ্দিকী; হাসান আজিজুল হক, হায়াৎ মামুদ, বা আবুল হায়াত কী আসাদুজ্জামান নূরের বাচন তো আদর্শপ্রতিম বলা চলে দেশে-সমাজে। তার অভিভব কি গঠন করে চলেনি আমাদের নাগরিক বাচনের কোনো বিশিষ্ট রূপায়ণ? আর তাদের মধ্যেও কি ঘটেনি অন্যতর ‘বাঙাল-প্রণোদনা’! এই দুই কোনো এক সমে কি মিলেছে? যদিও কানে স্পষ্টতর হয়, বাংলাদেশের নাগরিক বাচনের পরিশীলন প্রতিজনেরই যেন ভিন্নতর। ব্যক্তিগত এক বাচন প্রতিজনকে চর্চিত, গঠিত করে নিতে হয়েছে তো। পারিবারিক কথনের এক ঐতিহ্যধারা তেমন ছিল না- আঞ্চলিক কথ্য বাচন ভিন্ন। তাতে করে নাগরিক বাচন যেন ঠিক মুখের ভাষা হয়ে ওঠে না। বানানো এক বুলি বিশেষই থেকে যায়। চর্চিত ভাষণ-বক্তৃতা বা অভিনয় মনে হয়। আচ্ছা,কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গীয় বাচনে বিচিত্র বাঙাল-কথন কতটা কেমন ক্রিয়া করেছে?

তার ফলে তাদের বাচনে নবীন কোনো আদল কোথাও গঠিত হয়ে উঠেছে না কি?

আমি নূর ভাইকে প্রথম দেখি আশির দশকের প্রথমদিকে ‘নাগরিক’-এ। বকশিবাজারে তাঁর বাসায় যেতাম মেডিকেল হল থেকে। কলকাতা-ফেরত আমি নাটকের মানুষদের সাথে যোগাযোগ করছি তখন। আলী যাকেরের সঙ্গে কলকাতায় পরিচয়সূত্রে ‘নাগরিক’-এ যাচ্ছি। তখন ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’ চলছে দারুণ। অভিনয় দেখে নির্দেশক নূর ভাইকে জানাচ্ছি আমার পর্যবেক্ষণ। কলকাতার নাট্যাভ্যাসে বলছি, মহড়াকালেও কেমন কী লাগছে না লাগছে। এখানে বোধহয় এভাবে বলার রেওয়াজ ছিল না। কেউই তেমন সহজে এটা নিতে পারতো না দেখেছি বরং বিব্রত হতো। তাতে বলাও বন্ধ হয়েছে অচিরে। নূর ভাইয়ের সাথে দেখা হলেই নাটক বা শিল্প-সংস্কৃতি-সমাজ নিয়ে গুরুতর কোনো কথা হতো হয়ত আমারি স্বভাবদোষে। উনিও বুঝি মুচকি হেসে গম্ভীর চালে সমান তালে বলে যেতেন কথা। আমার কণ্ঠশীলন-সর্বস্বকালে দেখা হলে প্রায়শঃ বলতেন, ‘আপনার মতো যদি সব বাদ দিয়ে করতে পারতাম!’

নূর ভাইয়ের ব্যবহারের ভব্যতা তো কিংবদন্তীতুল্য।

শুনেছি ‘নাগরিক’-এ প্রম্ট করতেন তিনি রিহার্সেলে। তাতে সব ‘পার্ট’ই মুখস্ত ছিল তাঁর। এক অভিনেতার অনুপস্থিতিতেই মঞ্চাবতরণ নাকি তাঁর। ঘটনাটি লাগসই। এরকম এক দৈবাৎ শুরু থেকে অভিনেতা হিসেবে কোন উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন তিনি!

বাংলাদেশে নাগরিক অভিনয়ের বড় এক দুর্বলতা ছিল বা আছে। দৈনন্দিনে সাধারণ এক বাচনে আমরা তো অভ্যস্ত নই। তাতে করে অভিনয়ে ঠিক সড়গড় হতে চায় না কথ্য-স্বর-সুরের স্বাভাবিক স্ফূর্তি। সহজ অনায়াস ঠিক লাগে না তাই কথা বলাবলি। তার ওপর নাগরিক অভ্যস্ত, চর্চিত জড়তায় প্রকাশের সহজতা ব্যাহত হয়। আড়ষ্ট আরোপিত লাগে তার ফলে অভিনয়। ‘নাগরিক’-এ আবুল হায়াতের অভিনয়েই প্রথম দেখি আশ্চর্য এক স্বতঃস্ফূর্তি। ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’য় যা দেখে মুগ্ধ হতো দর্শক। তাঁর পশ্চিমবঙ্গীয় বাচন-ঐতিহ্য থেকেই নিশ্চয় তা হয়েছিল। আমার ধারণা, নূর ভাই অভিনয়ের এই ধারার প্রতিভাবান নট। তাঁর ব্যক্তিসত্তার প্রকাশ-বিকাশও তাতেই যেন এমন অনায়াস সহজাত হয়ে উঠেছিল।

‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’ নাটকে নূর ভাইয়ের অভিনয় ক্ষিপ্র বাচন ও অঙ্গাঙ্গী শারীরবিভঙ্গে চমকে দেয়। নাগরিক এক জঙ্গি স্মার্টনেস চরিত্র হয়ে ওঠে সে অভিনয়ে। ‘মানুষ সমান মানুষ’ নাট্যের অধিক জটিল চরিত্রও স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনীত হয়- ভিন্ন অভিনয় রীতিতেও। আবার ‘গ্যালিলিও’ নাট্যে তাঁর অভিনীত পোপ মহোদয়ের ক্ষমতারোহণ দীর্ঘ ধীর লয়ে পোশাক পরিধানের অভিনব মুদ্রায় লক্ষ্যভেদী তুঙ্গ নাট্য-মুহূর্ত রচনা করে। সে যেন অভিনয়ের এক ভাস্কর্য-প্রতিম রূপায়ণ। নাটকের দীর্ঘদেহী প্রধান চরিত্রের মঞ্চজোড়া অভিনয়ের পাশে খর্বদেহধারী নট হয়ে ওঠেন দীর্ঘতর, ক্ষমতাধর প্রভূবিশেষ। অভিনয়েরই এক বিক্রম তাতে প্রত্যক্ষ করি। ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ নাট্যে আবার বীর নায়ক নূরলের পরিপূরক হয়ে ওঠে স্থিতধী আব্বাস- অভিনেতার স্বভাব-সাযুজ্যে বুঝি বা। ‘গডোর প্রতীক্ষায়’ নাটকের বিষয় মাহাত্ম্য ও তার জটিল চরিত্রের সমর্থপ্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠে নূর ভাইয়ের অভিনয়।

সেসব এক সৃজন অভিজ্ঞতা বটে। চরিত্রানুগ আত্মবিলোপের বদলে অভিনেতার ব্যক্তিসত্তার বহুরূপ প্রকাশ ঘটে একেক চরিত্রের অভিনয়ে। আত্মসত্তার প্রকাশে কলা-শিল্পের মর্যাদা পায় সে অভিনয়।

মঞ্চাভিনয়ে নূর ভাইয়ের এহেন পারঙ্গমতা ভিন্ন এক বিস্তার পায় না কি টেলিভিশনে বিবিধ-বিচিত্র চরিত্র রূপায়ণেও? জনমনোরঞ্জন তো নয় কোনো সহজ গান। তারজন্য লাগে তো অন্যতর যাদু-দক্ষতা। নূর ভাই তার সর্বোচ্চ প্রয়োগই যেন করতে পারেন টিভিতে। আর এতে করেই দেশজোড়া জনগণমনে নায়কের এহেন স্থায়ী আসন তাঁর। মঞ্চে তাঁর অভিনয়কীর্তি বা বামপন্থী রাজনীতির দীর্ঘলগ্নতায়ও বুঝি নয়; কিংবা বিজ্ঞাপন-বাণিজ্যে তাঁর বিপুল আধিপত্য বা হাল আমলের রাজনীতি-মন্ত্রীত্বে বিশিষ্ট চারিত্র্যের কার্যকারণেও যেন নয়- টিভি অভিনয়ে তাঁর বিচিত্র চরিত্র রূপায়ণের সর্বোচ্চ নন্দন বিকাশের কারণেই ঘটে জনমনে তাঁর এহেন অবস্থান। অভিনেতার এমন সামাজিক নায়কায়ন যেন প্রচলিত বীরগাথা প্রতিম হয়ে উঠেছে। দ্বিধা ত্রিধা বিভক্ত দেশ-সমাজে তাঁর এই অর্জন-আরোহণ বিস্ময়কর। অভিনয়ের কী শিল্পের এই বুঝি অনির্বচনীয় পরাক্রম। শিল্প-বাণিজ্য-রাজনীতির ত্র্যহস্পর্শও একটি সমে এসে মিলেছে কী যাদুতে! এহেন অধরার নাগাল মেলাকেই বলছি ব্যক্তির সমূহ এক বিকাশ। জীবনের বাস্তবে রূপকথার নায়কায়নও তবে সম্ভবে! এ বড় বিস্ময়। হৃদয়বত্তা ও ধীমত্তার এহেন মিশ্রণ সহজে ঘটে না। মানবস্বভাবেরই সে এক নন্দন বিকাশ।

জীবনের ৭০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে তোমার ৩১ অক্টোবর ২০১৬-এ। ওহে নটবর, নটনায়ক তোমারে সেলাম।  

ড. বিপ্লব বালা: নাট্যশিক্ষক, প্রশিক্ষক ও সমালোচক