Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

জন্মদিনের আলাপনে আজাদ আবুল কালাম

Written by সাক্ষাৎকার- বিপুল শাহ, আহমাদ মোস্তফা কামাল ও হাসান শাহরিয়ার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[২৬ অক্টোবর, বুধবার, ২০১৬। আজাদ আবুল কালামের ৫০তম জন্মবার্ষিকী। এটিকে উপলক্ষ্য করে তার বন্ধুসকল, যারা রাজনীতি-নারী আন্দোলন-সাহিত্য-চিত্রকলা-টিভি মিডিয়া-চলচ্চিত্র-সাংবাদিকতা-থিয়েটারে জড়িয়ে আছে নানাভাবে- উদযাপন করেছে ‘তারুণ্য ও তাড়নার ৫০।। আজাদ আবুল কালাম’ শীর্ষক নাট্য ও মিলনমেলা। ২৬ থেকে ২৮ অক্টোবর তার মঞ্চ-নির্দেশনার নাটক মঞ্চায়ন ও আড্ডা-বৈঠক নিয়ে সাজানো হয়েছিল এই উদযাপন পর্ব। আজাদ আবুল কালামের ৫০ পূর্তিতে ছোট্ট একটি সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা হয়েছিল। সাক্ষাৎকার নিয়েছে- বিপুল শাহ, আহমাদ মোস্তফা কামাল ও হাসান শাহরিয়ার। সাক্ষাৎকারটি অনুলিখন করেছে- প্রাচ্যনাট সদস্য প্রদ্যুৎ কুমার ঘোষ, বিন-ই-আমিন (টুটুল), তানজিম ইমরান মাহমুদ]

পাভেলভাই আপনার আসন্ন পঞ্চাশতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রথমেই শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। শুরুতেই আপনার ছোটবেলা সম্পর্কে জানতে চাই। আমাদের আসলে জানার ইচ্ছা যে, ছোটবেলায় কখন এবং কিভাবে আপনি প্রথম ভেবেছিলেন যে আপনি শিল্পী হবেন কিংবা নাটক করবেন কিংবা লেখালেখি করবেন... মানে এই জগৎটার মধ্যে আসবেন?

এটা আসলে ওইভাবে ভেবেচিন্তে কিছু করা ছিল বলে আমার মনে হয় না। তবে একটা বিষয় আমার মধ্যে ছোটবেলা থেকেই ছিল- জগতের সবকিছুর ব্যাপারে ভীষণ বিস্ময়, এবং এই বিস্ময়টা একেবারে ক্ষুদ্র ব্যাঙাচি থেকে শুরু করে রাস্তার পাশে ক্ষৌরকারের চুল কাটা পর্যন্ত। একটা ঘটনা মনে পড়ছে। আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি তখন স্কুলে যাওয়ার পথে একজন ক্ষৌরকারের কাজ করা দেখছিলাম, সে চুল কাটতে কাটতে যেদিকে ঘোরে, আমিও তার সাথে সাথে সেদিকেই ঘুরি, মানে লোকটা যেরকম করে আমিও ওইরকম করি। তো দেখতে দেখতে একটা পর্যায়ে টের পেলাম যে, আমার একটা কান ধরেছে কেউ একজন- তিনি হচ্ছেন আমার চাচা। আমার চাচা আমাদের বাসায় থাকতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতশাস্ত্রে পড়তেন। তো তিনি কান ধরে ওইভাবে আমাকে বাসায় নিয়ে গেছেন। বাসায় নিয়ে গিয়ে আমার মা’র কাছে দিয়ে বলছেন, এই ছেলে বড় হয়ে নাপিত হবে, ওর পড়াশোনা কিছু হবে না। তো তাতে আমার ওটা থেমে থাকে নাই। কখনো কখনো আমার বাবা অফিসে যাবার সময় বাজার করে দিতেন এবং বলতেন যে, ব্যাগটা নিয়ে দৌড় দিয়ে বাসায় যাবি। আমি দৌড় দেওয়া শুরু করতাম ঠিকই কিন্তু কোথাও না কোথাও আসলে কোনো একটা ঘটনায় বর্তে যেতাম। এবং সেই বর্তানো ব্যাপারটা কিন্তু আমার এখনো আছে। আমি অনেক জায়গায় দেরি করে ফেলি, খুব তুচ্ছ কোনো কারণে দেরি করে ফেলি। মানে যেখানে আমি যাচ্ছি তার আগে কোথাও কিছু একটা মজমা পেয়ে গেলাম আরকি। আমি খুব ইমোশনাল ছিলাম ছোটবেলায়। ইমোশন কী ধরনের ছিল তার একটা উদাহরণ দিই। ওই যে ব্যাঙাচির কথা বললাম না? তো একদিন খেলতে খেলতে একটা ব্যাঙাচি পায়ের তলায় পড়ে মরে গেল। এটা আমাকে খুবই চিন্তিত করলো যে, মরে গেল! ছোটবেলায় ঘরে নেওয়া কিছু শিক্ষা মানুষকে অনেক কিছু দেয়, যেমন নিরীহ প্রাণী হত্যা না করা। গুনাহ হয়। তো মাকে এসে যখন বললাম যে, একটা ব্যাঙাচি মরে গেছে- মা বললেন যে, এটা গর্হিত কাজ। এটা তোমার করা একেবারেই উচিত হয়নি। এটা কিন্তু অনেকদিন আমার মাথার মধ্যে ছিল যে, আমি একটা প্রাণ খুন করে ফেলেছি। আমি নিতান্তই ছোট তখন, টু-থ্রি এরকম কিছুতে পড়ি বোধহয়।
 
আর ওই লেখালিখি অথবা শিল্পী হবার ব্যাপারে কোনো চিন্তা কখনও ছিল না। কিন্তু কোনো কিছুর চরিত্র আমাকে ভীষণভাবে উদ্দীপ্ত করত। মনে হতো, এটা আমি। সিনেমা দেখতে গেলে মনে হতো, ওই দুঃখী চরিত্রটা বোধহয় আমি। অথবা কখনো মনে হতো শাবানার সাথে প্রেম করছে বা শাবানাকে বিয়ে করে ফেলছে যে লোকটা, ওটা আমিই। আবার আমি যখন থ্রি বা ফোরে পড়ি, তখন কিছু বই পড়েছি যা ওই বয়সে কেউ পড়ে না।  যেমন, বেলায়েভ এর ‘উভচর মানুষ’, আমাকে খুবই উদ্বেলিত করেছে। ‘ইকথেনদিয়ার’ আমার এখনো মনে আছে- এই ইকথেনদিয়ার আমার কাছে বিস্ময় হয়ে রয়েছে, এবং আমার কাছে এটা বাস্তব, এটা সম্ভব। একটা প্রাণী এরকম হতে পারে যে আসলে পানিতে স্বচ্ছন্দ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে সে পানিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারে। আমি একবার গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলাম, আমরা তখন একেবারেই ছোট। আমাদের গ্রামের বাড়ি মানে হচ্ছে আমার বাবার মামার বাড়ি। যেহেতু আমার বাবা ঙৎঢ়যধহ ছিলেন, তার মামাই তাকে বড় করেছেন। আমরা তাকেই দাদা জানতাম আর তার মামীকে আমরা দাদি জানতাম। যাহোক, আমাদের বাড়িতে আমি একটা বই পড়ি যা কিনা আমার বয়সীদের পড়ার কথা না, বাচ্চাদের এই বই পড়ার কোনো কারণ নাই, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’। ওটা বাচ্চাদের পড়ার কোনো বই না, হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, যথেষ্ট কঠিন। আমাদের গ্রামের বাড়িতে কদাচিৎ বই পাওয়ার কথা, কেনো ওখানে ওই বইটা ছিল তাও আমি জানি না। আমি কোনো কারণে ওই বইটা দেখে পড়ে ফেলেছিলাম। মা খুব রাগ করেছিল যে, তুই এটা পড়েছিস কেনো। যদিও আমার মা-র প্রচ- আগ্রহ ছিল পড়াশোনায়। আমার মনে হয়েছিল, বইটার মধ্যে কী যেন একটা আছে। তো এইসব ব্যাপারে আমার প্রচ- আগ্রহ ছিল।
 
আমি যে পাড়ায় বড় হয়েছি, মুগদাপাড়া, এটা অসাধারণ পাড়া- সেখানে কিছু ঊর্দু স্পিকিং লোক ছিল। ঢাকাইয়া। আদি ঢাকাইয়া কিন্তু তারা আবার পুরান ঢাকার ঢাকাইয়া না, তারা হচ্ছে এই নিচের দিকের ঢাকার। আবার পাশেই ছিল ম্যাথরপট্টি। এদের বাচন, এদের চালচলন, এদের জীবনবোধ ছিল অন্যরকম। এরাই আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমাদের বাসার চারপাশে ছিল বস্তি এবং বস্তির প্রত্যেকটা লোক, সমবয়সী প্রত্যেকটা ছেলে আমার দৃষ্টিতে ভীষণ ইউনিক ছিল, কারণ আমি ওরকম না। ওরা এত কিছু পারে, আমি পারি না। আমি সাঁতার পারতাম না, ওরা সাঁতার কেটে ফুরুৎ করে ডুব দিয়ে কোথায় উঠে যায়! বস্তিতে একজন লোক ছিল যে পুতুল বানাত, পুতুল বানিয়ে বানিয়ে ওটার মধ্যে রঙ করতো। ওনার হাপানি ছিল। ঐ ফ্যামিলির সাথে আমার ভালো রিলেশন ছিল। ফ্যামিলি মানে ওই বস্তির ভিতরেই। তো ওই বাসায় যাওয়ার পিছনে একটা কারণ ছিল, পুতুলটা বানায় কিভাবে সেটা দেখা। আসলে খুব সহজ, খুব সহজভাবে বানায়। মাটির দলার মতো করে ভেতরে তার ঢুকিয়ে দেয়, তলায় স্ট্যান্ডের মতো কিছু একটা দেয়, তারপর শুকাতে দেয়। মূল কাজটা শুকানোর পর, ওই যে রঙ, রঙটাই হচ্ছে মেইন জিনিস। ওই লোকটা হাঁপাত আর কাজ করতো। এটা ছিল আমার জন্য একটা বিস্ময়! এগুলোর ভেতর থাকতে থাকতে আমার মনে হতো, বোধহয় লেখা যায়।
 
লেখার একটা সুযোগ হলো আমাদের স্কুলের দেয়ালিকায়। আমি যখন ক্লাস নাইনে উঠলাম তখন একটা দেয়ালিকা ছাপা হলো, স্কুলে। তখন বিভিন্নজন লেখা দিচ্ছে, আমিও ওরকম ওই ক্লাসরুমে বসে বসেই আট দশ লাইনের একটা কবিতা লিখলাম, দিলাম, স্যারকে দিলাম। স্যারের হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিল। তো ওনার হাতের লেখা যে নকল করতে পারবে, মানে তাঁর হাতের লেখার কাছাকাছি যে লেখা হবে, ওনার কাছে ওটাই ভালো লেখা- ওটার সাহিত্যমূল্য কোনো ব্যাপার না। কিন্তু উনি নিজে সাহিত্য ভালো জানতেন- মানে স্কুল পর্যায়ে যা দরকার হয় আর কি! যেমন খুব সুন্দরভাবে চর্যাপদ পড়াতে পারতেন। তো ওই দেয়ালিকায় আমার লেখাটা ছাপানো হলো। দেয়ালিকায় কিন্তু অন্য কারও হাত নাই, পুরোটা স্যারের লেখা, অলংকরণও স্যারের। তো একসময় আমার কাছে মনে হতে লাগলো, হায় হায় এটা আমি কেনো এখানে লিখলাম! আমার বন্ধুরা যদি দেখে ফেলে! আমার খুবই মনটন খারাপ হয়ে গেল, মনে হলো এত খারাপ লিখেছি! কিন্তু আমার কিছু ফ্রেন্ড বললো, তুই লেখ, লেখালিখি কর। তখন এলেবেলে অনেক লেখালিখি করতাম, যেটা মনে হতো আর কি! আবার বেশিরভাগ সময় এটা হতো যে, বাসার কেউ যদি দেখে ফেলতো, বলতাম-  ফেলে দে ফেলে দে। কারণ তখন বাসায় যেহেতু আমার চাচা ছিলেন, উনি ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, জাসদ ছাত্রলীগ করতেন, প্রচুর পড়তেন, আর উনি খুব ক্রিটিক ছিলেন। অঙ্ক না পারলেও থাপড়াতেন,  ট্রান্সলেশন না পারলেও থাপড়াতেন, মানে খুব ক্রুয়েল টাইপের ছিলেন। আবার ওনাকে আমরা ভীষণ ভালোও বাসতাম, কারণ ওনার মধ্যে কিছু একটা ছিল যেটার জন্য আমরা তাকে ভালোবাসতাম। তো উনি যদি দেখে ফেলেন তাহলে তো ‘খবর’ আছে। এরকম একটা বিলো স্ট্যান্ডার্ড জিনিস তিনি সহ্যই করতে পারতেন না। উনিও লেখালিখি করতেন, একাডেমিক লেখার বাইরে কোনো লেখা ছিল বলে আমার মনে হয় না, থাকলেও আমি এখন তা বলতে পারব না। এরকম নানান কিছুর মাধ্যমে লেখার প্রতি আমার একধরনের আগ্রহ তৈরি হয়।
 
থিয়েটার করতে আসাটা কিভাবে হলো?

শিল্পবোধ অথবা থিয়েটার করা এটা আসলে একদম কাকতালীয়। দেখতে দেখতে, ঘটনাচক্রে জড়িয়ে পড়া। আমার একটা বড় সমস্যা ছিল, যেহেতু আমার স্ট্যামারিং ছিল, তো পারফরমিং বা ডিবেট করা এগুলো চিন্তাই করতে পারতাম না। আমার বাবা আমাকে ডাকত তোতো বলে, মানে তোতলা এবং আমি বাসায় অপরিচিত লোক এলে অন্যদিক দিয়ে বের হয়ে যেতাম। যেসব আত্মীয়স্বজন ক্রিটিকাল ছিল, নানান প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতো, তারা এলেও বেরিয়ে যেতাম। কারণ আমার ওই স্ট্যামারিং। একটা সংকটের মধ্যে ছিলাম আর কি! তো, ওই যে লিখতাম, সেগুলো কখনও কখনও আম্মাকে দেখাতাম। আগেই বলেছি, পড়ার প্রতি তার প্রচ- আগ্রহ ছিল। আমার মনে পড়ে, তার সংগ্রহের একটা বই থেকে কিছু পৃষ্ঠা হারিয়ে গিয়েছিল, বইটা হলো শংকরের ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’।  তো, অন্য কারও কাছ থেকে বইটা ধার করে এনে সেগুলো হাতে লিখে ওই হারানো পৃষ্ঠাগুলির জায়গায় সেঁটে দিয়েছিলেন আম্মা। বইকে ওইরকম ভালোবাসা, ওরকম যতœ নেবার বিষয় ছিল আম্মার মধ্যে। তো আমি মাঝে-মধ্যে আমার লেখা আম্মাকে দেখাতাম। একবার একটা গল্পের মতো লিখে ফেললাম। বরিশালের স্বরূপকাঠি অঞ্চলে আমার মামা বিয়ে করেছেন, সেখানে গিয়েছিলাম বেড়াতে। ফেরার পথে আমি দেখলাম, নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে একটা কবর, খুব সুন্দর করে বাঁধানো,  এবং সেটা ভেঙে পড়বে যে-কোনো মুহূর্তেই। গল্পটা ওই কবর নিয়ে। আমি তখন আইডিয়াল স্কুলে পড়তাম। ইসলামকে জানা, ইসলাম সম্পর্কে আধ্যাত্মিকতা, অলৌকিকতা এসবের প্রতি আগ্রহ ছিল। এবং কবরটা নিয়ে আমি কাল্পনিক গল্প তৈরি করলাম যে, কবরটা ভেঙে পড়ার আগ মুহূর্তে ওখান থেকে ডেডবডিটা কাপড়টাপড় জড়িয়ে বের হয়ে গেল, তারপর কবরটা ভেঙে পড়ল। ডেডবডিটা যে বেরিয়ে এলো, সেটা কেউ কেউ দেখে ফেললো এবং যারা দেখলো তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হলো দুই ধরনের। কেউ কেউ ভীষণ ভয় পেল, কেউ কেউ ভাবলো এর ভেতর নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে- মানে নিশ্চয়ই কামেল কোনো মানুষ ছিল ওই কবরে। খুবই এলেবেলে টাইপ গল্প, কংক্রিট কিছু না। মানে ওই লোকটাকে পীর টাইপের কিছু একটা বানিয়ে দেবার বাসনা আমার তৈরি হলো।

এটা কোন বয়সে?

আমি সিক্স-সেভেনে পড়ি তখন। তো, গল্পটা আম্মা রিজেক্ট করলো, একদম ফালায়ে দিলো। যা বললো তার মানে দাঁড়ায়, রাবিশ টাইপের আরকি। এই ধরনের লেখার কোনো দরকার নাই। তোর ওইসব লেখার দরকার কী? আর আম্মা এখন যেমন ধার্মিক তখন তেমন ছিল না। তখন এগুলা পছন্দই করতো না। বললো যে, এই বয়সে কাঠমোল্লাগিরি কোথায় শিখছিস তুই! তো লেখার দিকে আগ্রহ ছিল, সবসময়ই ছিল। এই লেখার সূত্রেই কিন্তু থিয়েটারে ঢোকা। মাসুদ আলী খান নামে আমার একটা ফ্রেন্ড ছিল। ও হচ্ছে মাল্টি টেলেন্টেড। ও যা ধরে তাই পারে।  সুন্দর আঁকতে পারে। আর্ট কলেজে যায় নাই, এওয়ার্ড-টেওয়ার্ডও পায় নাই, কোনো কম্পিটিশনে পার্টিসিপেটই করে নাই, কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর আঁকতে পারতো। স্পেশালি পেন্সিল স্কেচতো ছিল অসাধারণ, দুর্দান্ত। গান গাইতে পারতো, গিটার বাজাতে পারতো, আবার মনে করো প্রচলিত একটা গান ওইটার ইংরেজি করে গাইতো। ওই যে ‘চন্দনা গো রাগ করো না’ আছে না? ওইটা তখনই ও বানাইছিল- ‘চন্দনা হায় প্লিজ ডোন্ট ক্রাই, ইফ ইউ ক্রাই সে হোয়াট ক্যান আই ডু’- এরকম আর কি! মাল্টি ট্যালেন্টেড। আর ছাত্রও ছিল ভালো। আমার সাথে পরিচয় হয়েছে ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে। পরে পারিবারিক বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল, আমার বাসায় থাকতো এসে। ও যে এতকিছু পারে, এর মধ্যে ওর মাথায় ঢুকছে নাটক করবে, মঞ্চ নাটক করবে। একদিন বললো চল, আমার সাথে চল। ও-ই করবে, কিন্তু ওর সাথে যাওয়া আর কি! ঢাকা থিয়েটারের রিহার্সেল রুম। তো ওরা রিহার্সেল করে আর করে, কেউ বের হয় না, যার সাথে কথা বলার কথা আর কি, সে বের হচ্ছে না। তাকে এখন আমি চিনি, সেও আমাকে চেনে। ওই ঘটনা হয়তো সে ভুলে গেছে।... বসেই আছি বসেই আছি- আমি একটা পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে গেছি। বললাম, তুই থিয়েটার করবি তুই করগা, তুই কথা ক। ও বলে, না তুই কই যাস, খাড়া। এই আমরা চা খাই, তখন সিগারেট খাওয়া শিখছি। এইট্টি ফোরে, আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করি নাই। অথবা আমি পরীক্ষা দিছি এরকম কিছু একটা হবে। কিন্তু দুই-তিন ঘন্টা পরে ওই লোকটা বের হয়ে রীতিমতো খারাপ ব্যবহারই করলো। মাসুদকে পছন্দ করে নাই। আর আমাকে দেখে... আমি তখন কিম্ভুতকিমাকার টাইপের, চুল-দাড়ি কাটতাম না, অনেক বড় চুল আমার। ইনফ্যাক্ট ওই পাংক জেনারেশন ছিলাম আমি- মালাটালা এইসব পরতাম। আমার একটা ইমপ্রোভাইজ সানগ্রাস ছিল- এইটুকু এইটুকু (খুব ছোট), অনেক বড় চুল- তো ঢাকা থিয়েটারের ঐ লোকের আসলে আমারে পছন্দ হয় নাই। হয়তো ভাবছে, এইটা খারাপ লোক। এইটার লগে যেটা আইছে সেইটা আরোও খারাপ হবে। এবং আমি কিন্তু কয়েকবার বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, ’ও (মাসুদ) কিন্তু অন্যরকম- মানে আমি বোঝাতে চেষ্টা করেছি যে, আমি না, ’ও থিয়েটার করতে আসছে। আরও বললাম- ’ও গাইতে পারে, ইয়ে করতে পারে, গিটার বাজাইতে পারে। কিন্তু খুব বেশি কথা আগাইলো না। এরপরে মাসুদ ফ্রাস্টেটেড হয়ে গেল।
 
একসময় মাসুদ আরণ্যকের বিজ্ঞাপন দেখলো টিএসসিতে। ’ও আরণ্যকে ঢুকলো এবং আমাদের বাসায় এসে চাপাবাজি করা শুরু করলো। যা না তাই বলা শুরু করলো- যেমন ধরেন যে, ওইখানে হয়তো রিহার্সেল করে আমাগো মতো পুলাপাইনে, ’ও হয়তো তাদের শিল্পীসত্তা নিয়া এমন সব আওয়াজ দিতো... তারপর মনে করেন, যে নাটক লেখে, তার নাট্যচিন্তা আর সাহিত্য... মানে সব কিছু বাড়ায়া বাড়ায়া বলা শুরু করলো। একটা পর্যায়ে সে প্রমাণ কইরা ছাড়লো যে, থিয়েটার হইলো বিরাট একটা ব্যাপার। আমি কিন্তু একটু একটু কনভিন্স হয়ে যাচ্ছি। আমি বলছি দোস্ত, আমি তো কথা বলতে পারি না, সমস্যা হয়ে যাবে। ’ও বললো তুই লিখবি, লেখালেখির কতো কাজ ওখানে, জানস তুই? থিয়েটার নিয়ে কতো লেখা যায়, জানস? তো ওর সাথে আমি গেলাম একদিন। এবং যেয়ে আমি ভাবলাম যে, আমি থিয়েটারে লেখালেখি করবো কিংবা থিয়েটারের অন্যান্য কাজ করবো।
 
আরণ্যকে ঢোকার আগে আপনার কোনো অভিজ্ঞতা আছে কিনা... এসব জানতে চায়নি?

আমরা একদিন পথনাটক দেখলাম শহীদ মিনারে। তো পথনাটক খুব সুন্দর। দেখলাম, আমরা যে বইসা আছি পাশ দিয়ে একটা লোক উইঠা গেলো, সে অভিনয় করতেছে। আরে! একটু আগে না বইসা ছিল লোকটা! এই লোকটা অভিনেতা! এইসব মিলায়ে-টিলায়ে মজার আর কি! তখন কিন্তু এরশাদ বিরোধী আন্দোলন একটু একটু করে হইতেছে। মানে জাস্ট শুরু হইতেছে। তখন মাসুদ আরণ্যকে ঢুইকা গেলো। তিনমাস ওয়ার্কশপ হইলো। ওয়ার্কশপ কইরা ওরা ওয়ার্কশপ প্রেজেন্টেশন দেখাইলো। আমি দেখলাম ভালোই, বেশ। তারপর ’ও একদিন আমাকে নিয়ে গেল, আর আমিও ঢুইকা গেলাম। চা-টা এইসব আনতাম আরকি! চা-টা যারা আনে তাদের আবার পূর্ব অভিজ্ঞতা লাগে নাকি? হা হা। আমি অভিনয় দেখতাম। আমাকে একটু এলিয়েন এলিয়েন ভাব করে রাখতো সবাই। আমার সাথে কথা বলা যাবে কি না এসব ভাবতো। আর তখন সবাই ভাবতো আমি নেশা করি, প্রচুর নেশা করি, গাঞ্জা খাই, ট্যাবলেট খাই এরকম ভাবতো আর কি!
 
তখন তো ডাইলের মাত্র আগমন...

ডাইল আরেকটু পরে। ডাইল হয়তো তখন যারা অনেক খবর রাখে, ত্রিশ বছর হইছে যাদের নেশা করতে করতে, তারা তখন জানে ডাইল-টাইল পাওয়া যায়। তো আমি আরণ্যকে ঢুইকা গেলাম। আমি বইয়া বইয়া দেখতাম, আমারতো আর কোন কাম নাই। চা আনার সময় চা আনতাম আর বইয়া বইয়া দেখতাম আর কোনোকিছু সম্পর্কে কোনো মতামত দিতে বললে অ্যাঁ-উঁ এরকম করে দিতাম আর কি! মামুনভাই প্রথম আমার সাথে কথা বলছেন ছয়মাস পরে।

রেগুলার যাওয়ার পরেও?

হ্যাঁ। প্রায়ই বলতেন, আচ্ছা এই ছেলেটা কে যেন? আবার অনেকদিন পরে, আচ্ছা এই ছেলেটা কে? এইভাবে দুইমাস-একমাস পর পর এইটা জিজ্ঞেস করতো। হা হা । আমি মাঝে মাঝে যাইতাম না, ধুত- কিন্তু মাসুদের ঠেলায় আবার যেতে হতো। তো একবার হলো কী আমরা একটা কল শো পেয়েছি- কিন্তু একজন অভিনেতা আমাদের সাথে যেতে পারবেন না। অসুস্থ বা অন্য কোনো কারণে বোধহয়। তখন মামুনভাই বললো ’ও (আমি) করতে পারবে এইটা, ওর সব মুখস্ত। কিন্তু আমি তখন মানে- এক হচ্ছে কথা বলতে হবে, দুই হচ্ছে মনে কইরা কথা বলতে হবে। তো কোনরকমে ঠেইলা ঠুইলা... মানে এদিক দিয়ে ঢুইকা কথা বলে ওখানে গেলাম, ওখানে কথা বলে এখানে আসলাম, তিনবার চারবার হোঁচট খাইলাম। উৎরায়ে গেলাম আর কি!

নাটকের নামটা মনে আছে?

ইবলিশ।
   
ওটাই কি মঞ্চে প্রথম অভিনয়?

প্রথম অভিনয়। কিন্তু তখন আমার দুই বছর হয়ে গেছে বোধহয়। আসলে ’শো-টা ক্যানসেল করা যাচ্ছিল না, কারণ তখনকার যুগে একটা নাটকের দলকে বিশ হাজার টাকা দিতো একটা ’শো করলে। এইটা অনেক বড় টাকা ছিল। তার ফলে কিছুতেই এড়ানোর উপায় ছিল না। কিন্তু মূল অভিনেতা নাই, কী করা যায়? আমারে দাঁড় করায়ে দিলো। এবং ফার্স্ট ’শো এর পরে আমরা খাওয়া-দাওয়া করতেছিলাম, চলে আসবো, তখন শোনা গেল হঠাৎ আন্দোলন চলতেছে। স্টাফ যারা আছে তারা বলতেছে, আমরা কেন দেখবো না? খালি অফিসারাই দেখবে, আমরা দেখবো না? কালকে আমাদের জন্য ’শো করতে হবে। রাজি হয়ে গেল সবাই। সেকেন্ড শো-তে মনে হইলো, না, আগেরবার ধাক্কাধুক্কা যা খাইছি এইবার ওইগুলা যাতে না হয়। মোটামোটি স্মুথ যাতে করতে পারি। সেকেন্ড শো’র পরে দেখলাম যে, আমি স্মুথলি কথা বলতে পারতেছি এবং এক জায়গায় থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ায় কোথাও ভুল হচ্ছে না। আর ওইটার মধ্যে বাইসাইকেল নিয়ে কিছু কা-কারখানাও ছিল। একটা প্রপস আছে, ইন্টার‌্যাকশন আছে, ডায়লগ আছে। আর স্টেজে কিন্তু প্রপস হেন্ডেল করা একটা কঠিন কাজ। অনেকদিন রিহার্সেল করলে... আমি তো অনেকদিন রিহার্সেল করতে পারি নাই। তারপরও দেখলাম যে মোটামুটি ভালোই হইলো। দুইটা সিনে আগে যিনি করতেন সেখানে পাবলিক তালি দিতো এবং আমি করার পরে দেখলাম যে, ওই দুইটা সিনে ওই একই জায়গায় পাবলিক তালিও দিচ্ছে।

কিন্তু আমার অবস্থা তো... শো-টা শেষ হইলে বাঁইচা যাই আর কি! জীবনের তরে বাঁইচা যাই। আর তো এই কাজ করতে হবে না আমাকে। তারপরে শো-টা শেষ হইলে বললাম, বাঁইচা গেছি। অনেকে অনেক কথা বলছে যে, ভালো হইছে, ভালো করছো। আবার কেউ বললো ওর তো অভিনয়ের প্রতি মনোযোগ নাই, মনোযোগ থাকলে আরও ভালো পারতো। কিন্তু ততদিনে আমার একটা বোধ হইতে থাকলো যে এইটা অন্য এক ধরনের কনফিডেন্স দেয়। পারফর্মেন্স এক ধরনের কনফিডেন্স দেয়, যেটা আগে কখনো আমার ভাবনা ছিল না।
 
এটা ছিল আপনার প্রথম ’শো এবং আরণ্যকের সঙ্গে প্রায় দুই বছর থাকার পরে, তাই না? আপনি তো বলছিলেন আপনার তোতলামির সমস্যা ছিল। এই সমস্যা আপনি কাটালেন কিভাবে?

এইটা থিয়েটার করতে গিয়েই।

ওই যে মঞ্চে আপনি দাঁড়ালেন, তখন তো সমস্যা ছিল?

তার আগেই আমার একটু একটু করে ঠিক হয়ে যাচ্ছিল। মাঝখানে একটা হইছিল যে, আমি আরণ্যকে ঢোকার পরে একটা নাটক হইছিল। ওখানে অভিনয় করতে হয়েছিল। অভিনয়টা একটু সহজ ছিল। সেখানে একটা গানের সাথে ডানদিকে হাত দিন, বামদিকে হাত দিন। এই ছিল আমার অভিনয়। আর একটা ছিল আমার দৌড় দেওয়া, শুয়োরের বাচ্চা বলে দৌড় দেওয়া। তো ওইটার মধ্যে ইনভলবমেন্টেরও কিছু নাই, অভিনয় বলতে যা বুঝায় অতকিছুও করার নাই।

আপনি যখন প্রচুর রিহার্সেল দেখছেন এবং দেখছেন যে, উচ্চারণই অভিনয়ের আসল জিনিস...

না, আমার উচ্চারণ মোর অর লেস ভালোই ছিল। মানে আঞ্চলিকতা এইগুলা কিছু না।

কিন্তু আটকে আটকে যেত- নাকি?

এইটা আমার এখনো হয়। আমি উত্তেজিত হলে এখনো শব্দ খুঁজে পাই না। তারপরে অনেক লম্বা ডায়লগ আমি এখনো আমার মতো করে একটা মেকানিজম বের করে নিই। নইলে আমি একটা হোঁচট খাবো। যদিও আমি এখন বাক বেচি, মানে, আমিতো কথা বেইচাও খাই (বিজ্ঞাপনে ভয়েজ দেয়া), কিন্তু তারপরও একটা মেকানিজম বের করতে হয়। খুব সহজে যে আমার কথা বের হয়, তা না। কিন্তু ওইটা একটা বড় কারণ ছিল যে, থিয়েটারে তুমি যে দাঁড়ায়ে গেছ, ঠিকমতো কথা তোমাকে বলতেই হবে এবং তোমার পারফর্মেন্স করতেই হবে। এইটা একধরনের মেন্টাল-ফিজিকাল প্রেসারের মতো কাজ করে। এবং ’শো শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আমার মনে হতো যে, আমি একসাথে তিন-চারটা ফুটবল ম্যাচ খেলে ফেলছি। এতটাই ক্লান্ত মনে হতো। জিতে যাওয়ার উচ্ছ্বাসটা হয়তো থাকতো, কিন্তু শারীরিকভাবে আমার ওই লেভেলে টায়ার্ড লাগতো। সারাক্ষণ ওই সচেতন থাকা, এই যে আমি কথাটা ঠিকমতো বলতে পারলাম কিনা, আবার লাস্ট অডিয়েন্স পর্যন্ত শুনতে পাইলো কিনা। এইগুলা খুব কাজে লাগতো।
 
মানে একসাথে অনেকগুলো ইন্দ্রিয় কাজ করাতে ক্লান্তিটা চলে আসে?

হ্যাঁ। আস্তে আস্তে এইটা ঠিক হয়ে গেল এবং সেইটা আমি টের পাইতাম মাঝে মাঝে। কারো সাথে ইন্টার‌্যাকশনে যে আন-ইজি ব্যাপার ছিল সেইটা কমে যাওয়া শুরু করলো। আমার স্কুল-কলেজের সার্কেলটা অনেক বড়। ওদের সাথে বেশিরভাগ সময় আমি লিসেনার ছিলাম। একসময় দেখলাম, হঠাৎ কথা বলার পরে, আমি অনেক কথা বলে ফেলছি এবং ঠিকঠাকই বলে ফেলছি। ওরাও একসময় জিনিসটা ভুলেই গেল যে আমি...

মানে ঐ কনফিডেন্সের লেভেলটা বাড়তে থাকে।

এইটার কারণ থিয়েটার।
 
একটা বড় সংকট থেকে মুক্তি পেলেন আপনি?

অবশ্যই। অবশ্যই। বিশাল। আমি কারো সাথে কথা বলতে পারবো, এটা ভাবতে পারতাম না।
 
পাভেল ভাই, নিয়মিত অভিনয় করার সুযোগ কবে নাগাদ হলো?

ইনফ্যাক্ট ওই ঘটনার পর থেকেই। আমি ঘোড়াশাল থেকে আসলাম এবং ভেবে নিলাম যে আমাকে আর এই আজাইরা দায়িত্বটা পালন করতে হবে না। এবং এইবারের মতো তো মুক্তি পাইলাম। কিন্তু তখন সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য যেটাই হোক আরেকটা ঘটনা ঘটলো- হঠাৎ করেই আরণ্যকের কিছু অভিনেতা ভিন্নভাবে ভাবা শুরু করলো, এবং তারা অন্য একটা নাট্যদল করার পরিকল্পনা করলো।
 
পরে যারা ‘দেশ নাটক’ করলো?

হ্যাঁ। তখন আরেক নাটকের আরেকটা ক্যারেকটার করার সুযোগ পেলাম, ওই একইভাবে, ‘বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি’, গাজীপুরে। আবার কল ’শো। এবার যে নাটকে আমি ডাইনে হাত বামে হাত করতাম, সেই নাটকের এক ক্যারেক্টার। একটা ক্যারেকটার ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যেটা বকুলভাই (শামসুল আলম বকুল) করতেন। তখন কিন্তু আমাদের মধ্যে মুখ দেখাদেখি প্রায় বন্ধ, ওরা এক জায়গায় বসে আমরা আরেক জায়গায় বসি, অথচ তার কাছ থেকে আমার কস্টিউমও নিয়ে আসতে হয়। সেই দায়িত্বও আমার।
 
আমি যখন বকুলভাইয়ের কাছে গেলাম, বকুলভাই ভাবলো আমি বোধহয় ওই পক্ষে চলে গেছি (তখনও ‘দেশ নাটক’ হয়নি)। আমি তো গেছি কস্টিউম আনার জন্য এবং তার সাথে কথা বলার জন্য যে, ক্যারেক্টারটা কেমন, একটু রিহার্সেল করায়ে দেন। অবস্থা সেটা ছিল না। কস্টিউম চাওয়া পর্যন্ত পারছি, পরেরটা আর পারি নাই। কিন্তু রিহার্সেল করতে গিয়ে ফট করে আমার একদিন মনে হইলো যে বকুলভাই যেভাবে করতেন আমি সেভাবে করবো না। ওইটা আমি মামুনভাইকে বললাম। লোকটার যে চরিত্র, যে ডায়লগ, যে প্রফেশন, সবকিছু মিলিয়ে বকুলভাই যেভাবে করতেন, আমার মনে হলো ক্যারেক্টারটা ওরকম না। মামুনভাই বললেন, তুমি সাবসটিটিউট করবা!  তোমার হাতেতো সময় নাই। কখন করবা? আমি বললাম, এই শো-তেই করতে চাই।  তিনি বললেন, যদি ফেল করে? আমি বললাম, মামুনভাই আমি তো আর অ্যাক্টর না, ফেল করলে কী হবে? আমি একটা বড় চেঞ্জ আনলাম যে, এই ক্যারেক্টারের হাঁপানি আছে। একটা কৃষক, যখন ধান ওঠে তখন ময়মনসিংহ অঞ্চলে যায় ধান কাটতে এবং ওখানেই থাকে। তামাক খায়, গাঁজা খায়। লোকটা একটু এলডার। ওই বর্ণনার মধ্যে বয়সের ব্যাপারটা আছে, শরীর ভেঙে যাওয়ার বিষয়টা আছে। তো আমি বললাম যে, আমরা ধরে নেই ওনার অ্যাজমা আছে।
 
আপনি ছোটবেলায় মান্ডায় দেখেছিলেন, একজন হাঁপানির রোগী, পুতুল বানায়...

শুধু সে-ই না, আমি ততদিনে আরো কিছু হাঁপানি রোগী দেখছি। ওই যে লোকটাকে দেখেছিলাম ছোটবেলায়, আমার মনে হইছে নাটকের ক্যারেকটারটা এই টাইপের দেখতে। শীত না থাকলেও তার শীত লাগে, শীতবস্ত্র পরে। এগুলা বর্ণনার মধ্যেই ছিল। রিহার্সেলে একদিন আমি ট্রাই করলাম, মনে হইলো, হইলো না। শো’র আগে সবাইকে আমি জানালাম, কারণ অপ্রস্তুত হয়ে যেতে পারে, অন স্টেজ তো। রিহার্সেল যখন করলাম, কেউ বলতেছে এইটা ওয়ার্ক করতেছে, কেউ বললো ওয়ার্ক করতেছে না। নাট্যকার ছিলেন আব্দুল্লাহেল মাহমুদ। উনি তো আগে থেকেই ত্যাড়া এবং পাগল দুই রকমই। করোগা করোগা... কী করবা জানা আছে আমার! এইভাবে কথা বলতেন। তো এই যে পরিবর্তনটা আনলাম এইটা রিয়েলি ওয়ার্ক করলো। এর আগে অভিনয়ের ব্যাপারে আমার কোনো রেসপেক্টই ছিল না এবং টেলিভিশনে যে অভিনয় দেখতাম, দেখলে হাসি পাইতো আমার। তো ওই চরিত্রটা করতে করতে মনে হইলো এইটা একটা বিরাট কাজ হইতে পারে। এবং এইটা একটা কঠিন কাজ হইতে পারে। তখন আমার দুই তিনটা গল্প লেখা হইছে, লিটলম্যাগে ছাপা হইছে। আমার মনে হইলো ওইরকম একটা গল্প লেখার চেয়ে অভিনয়টা কোনো অংশে ছোট না। কঠিনও হইতে পারে, যেহেতু শরীর লাগে এইটায়। এইটা কিন্তু ’শো শেষ হইতে হইতেই আমার রিয়ালাইজেশন হইলো, যে, এইটা একটা অন্যরকম কাজ। মনোদৈহিক তো বটেই, এইখানে আসলে প্রতিদিন নতুন কিছু করা যাইতে পারে। এই ফার্স্ট আমার ভালোবাসা তৈরি হইলো। তখন অলরেডি আমি আরণ্যকে তিনবছর পার করছি।

ঐ নাটকটার নাম কি ছিল?

‘নানকার পালা’। আব্দেুল্লাহেল মাহমুদ লিখেছিলেন। এই সব মিলিয়ে-টিলিয়েই আর কি! এর মধ্যে শিল্প সাহিত্যের চেতনা তৈরি হওয়া-টওয়া।...
 
এমনিতে আপনার পারিবারিক অবস্থা কেমন ছিল। মানে স্বচ্ছলতা এসব আরকি...

যে সময়টার কথা বলছি, তখন আমি অলরেডি সব নেশা শিখছি- সব ধরনের নেশা। এর একটা বড় কারণ হচ্ছে, তখন আমাদের ফ্যামিলি বেশ অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে পড়ে গেছিল। আমার বাবা ট্রান্সফার হয়ে গেলেন ঢাকার বাইরে। সেইখানে তার খরচ এবং আমাদের খরচ মিলিয়ে খুবই সমস্যার মধ্যে আমরা পড়ে গেছিলাম। এমনিতে আমাদের টানাটানি ছিল। মানে আমাদের বাবা হচ্ছে... মানে ওনার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল উনি অনেক সামাজিকতা বুঝতেন না। অনেক কিছইু বুঝতেন না উনি। এর কারণ হচ্ছে ওনার বেড়ে ওঠা। আমার বাবা সাড়ে চারবছর বয়সে তার বাবা এবং মা দু’জনকেই হারান। উনি বড় হয়েছেন মামার কাছে। যেটা আমি আগে বললাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে। ওনার কাছে মৃত্যু অবধি আমাদের বরিশাল যতটা প্রিয় তার চেয়ে প্রিয় বেশি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া। অনেক ব্যাপারেই একটু ডিফারেন্ট ছিলেন। উনি নামাজ পড়তেন কিন্তু আরবিতে পড়তেন না, আরবি পড়তেই পারতেন না, বাংলায় সবকিছু পড়তেন সবসময়। এবং চাকরির বাইরে কিভাবে আয় করে, এরকম কোনো ধারণাই তার ছিল না। তিনি বিসিকে চাকরি করতেন। আব্বা তখন কিন্তু আমলা। কিন্তু পার্টটাইম জবও করতেন। অফিস থেকে বের হয়ে আরেকটা ক্লিয়ারিং এন্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্সিতে ব্যবসায়িক চিঠিগুলি টাইপ করে দিতেন। এই কাজ করতেন তিনি সাড়ে-আটটা নয়টা পর্যন্ত। সপ্তাহে চারদিন ওইটা করতেন। ওইভাবে উনি এক্সট্রা আয় করতেন। যখন উনি বরিশালে ট্রান্সফার হয়ে গেলেন, তখন তো ওই পার্টটাইমের বাড়তি টাকাটা আর নাই। তখন আমাদের ভীষণ খারাপ সময় গেছে। এবং আমাদের একটা বিরাট অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। আব্বা একটা একসিডেন্ট করেছিল। ওই সময়টায় আমি কিন্তু সব ধরনের নেশা করছি। আমারে আরণ্যক থেকে বের করে দিয়েছিল।
 
এইটা কি একধরনের হতাশা থেকেই?

এই সংকটটা আমরা নিতে পারছিলাম না। ওই সময়টায় আমার ভাইয়ের আচরণে, বোনের আচরণে একটা ভীষণ প্রভাব পড়েছিল। আমাদের আরও ছোট একটা বাসা নিতে হইছিল। কোনো প্রাইভেসি নাই। বিরাট বড় একটা রুম, ওর মধ্যেই সব খাট। একটা রুম আছে শুধু আমার জন্য, একটু আলাদা করা। মেহমান এলে ওইটাও ছেড়ে দিতে হচ্ছে। বাসাটা একদম মনের মতো না আমাদের। এ ছাড়াও নানান ধরনের সমস্যা। মনে করেন যে, একটা কাপড় ছিল বাইরে যাবার জন্য, খুবই সুন্দর, একটা জুতা ছিল একটু ভালো। ওইটা খুব যতœ করে রাখতাম, পরবো কিনা তা আম্মা ডিসাইড করতো। আমার ভাইয়েরও তাই। ওই সময়টা ভীষণ খারাপ গেছে।
 
আপনি বন্ধুসহ আরণ্যকে ঢুকলেন- এগুলো কি ওই সময়েই?
 
হ্যাঁ ওইসবের মধ্যেই।
 
অন্যরা দেখে ভাবতো আপনি গাঁজা খান...

কিন্তু যখন থিয়েটারে ঢুকেছি তখন আমি খাই না কিছু। মানে, কালেভদ্রে কেউ খাইলে হয়তো আমি একটা টান দিতাম। টান দিয়ে বলতাম যে, না, আর খাবো না। কিংবা মদ কোথাও কেউ খাচ্ছে, তখন আমি নিয়ে একটু খাইলাম। হয়তো বিয়ার খাচ্ছে, একটু খাই।
 
জিনিসটা নষ্ট করা আর কি! হা হা।
 
এই অবস্থাটা কিন্তু চলছে অনেকদিন পর্যন্ত। সবচেয়ে বড় ভয়টা ছিল যে গ্রামে চলে যাইতে হতে পারে আমাদের। আব্বা রিটায়ার্ড করবে, গ্রামে চলে যাইতে হতে পারে আমাদের। আব্বা এইটা শুনতেই পারতো না, চিন্তাই করতে পারতো না- গ্রামে ফিরে যাওয়া। আমাদের যা জায়গা ছিল ওইখানে বাড়ি করার সামর্থ্য আমার বাবার তখন নাই। আমার একদম উরাধুরা জীবন যাপন করার পেছনে এইগুলা অনেক বড় প্রভাব ফেলছে। যেগুলা আসলে করার কথা না সেগুলাও করা, যেমন- সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাত কাটানো থেকে শুরু করে এমনকি প্রস্টিটিউশনে গেলে কেমন লাগতে পারে সেই চিন্তা করা। তারপরে আস্তে আস্তে করে একধরনের... এটা আবার এই থিয়েটারের কারণেই... যখন দায়িত্ব পড়ছে, এইটা করতে হবে ওইটা করতে হবে, তখন আবার একটা শেইপে আসছে। এইভাবে সময়গুলো খুবই টালমাটাল ছিল।

আপনি যেটা বলছিলেন, একটা আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে আপনার পরিবার যাচ্ছিল, কঠিন আর্থিক সমস্যা। এধরনের সংকটে আমাদের সমাজে সাধারণত চিন্তা থাকে যে, একটা টিউশনি করবো কিংবা পাশটাশ করে একটা চাকরি করবো যেন অন্তত একটা সেটেলমেন্ট হয়।

আমিও টিউশনি করেছি।
 
সেইটা তো পরিবারে কন্ট্রিবিউট করার জন্য না?

না, নিজে চলার জন্য করছি।

আমরা জানতে চাইছিলাম যে তখন কি আপনি পড়াশোনা শেষ করে চাকরি-বাকরিতে ঢোকার কথা ভেবেছেন?
   
এইগুলা কিন্তু ভাবি নাই কখনো।
 
পরিবারে একটা সংকট তো  ছিল?

হ্যাঁ ভীষণ ছিল। তখন প্রথম যে কাজটা ছিল, আগে আমারটা আমাকেই জুগাইতে হবে। এবং এরপর কিছু একটা করে কোনো হেল্প করা যায় কিনা ফ্যামিলিকে। সেইটা আমি পারতেছিলাম। ওয়ার্ল্ড ভিশনে একটা প্রজেক্ট ছিল, সেখানে কাজ করতাম, ওরা তেরশো টাকা করে দিতো। এইটা শুধু ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা করতে পারতো। চাকরি ঠিক না। জেনেভা ক্যাম্পে গিয়ে ননবেঙ্গলীদের ইংলিশ, বাংলা আর অংক শেখাবে। চারদিন যেতে হতো। ওই তেরশো টাকার কাজটা যখন পাই তখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, ওইটা বিরাট একটা ব্যাপার ছিল। ওইখান থেকে টাকা আমি বাসায়ও দিতাম কিংবা আমার বোনের কিছু লাগবে, আমার ভাইয়ের কিছু লাগবে, ওইটাও দিতাম।
 
আপনি পড়াশোনা শেষ করে যে চাকরিতে ঢুকলেন না কিংবা এই ধরনের কোনো কাজকর্মতে গেলেন না, একটা ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে ঢুকে গেলেন...

এইটা এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল... আমি বিয়ে করেছি ইউনিভার্সিটি থেকে বের হবার আগে... আমার স্ত্রী ইউনিভার্সিটি শেষ করে নাই আমিও শেষ করি নাই... সবদিক থেকে একেবারে মাইখা ফালাইছি... যত রকম ছিল আরকি! বিয়েটা আসলে করতে হইছে। সে আমাদের একই পাড়ার। তার সাথে আমার সম্পর্ক একটু একটু করে আগাইছে। হঠাৎ করে একদিন শুনলাম ওর ছোট বোনের বিয়ে ঠিক হইছে। তার ছোট বোনের বিয়ে হইছে তারই ফুফাতো ভাইয়ের সাথে। ওই হাজব্যান্ডের মা’রও শরীর খারাপ ছিল তখন, মারা যাবে। কিন্তু ভাইয়ের এই মেয়েটাকে তার পছন্দ ছিল তখন। আমার স্ত্রীর ইমিডিয়েট ছোট। সবাই রাজি কিন্তু এদেরও কথা হলো বড়টাকে ফেলে ছোটটাকে বিয়ে দিবে না। ওদের বাসায়ও জানে যে ওর সাথে এই বদমাইশটার (নিজেকে দেখিয়ে) একটা ইয়ে আছে। আমরা ভেগে যাবো না কী করবো এইটা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সাহায্যের হাত বাড়ালেন আমার বাবা। আব্বাকে বললাম এই ঘটনা, তিনি বললেন, ‘বিয়ে করে ফেল’। এইভাবে ওর সাথে আমার বিয়ে হলো। এর মধ্যে চাকরি-বাকরির কথা মাথায়ই আসে নাই। আমার বাসা থেকে কিন্তু কন্টিনিউয়াস প্রেসার ছিল- বিসিএস দে, এইটা কর, ওইটা কর। কিন্তু আমার একবারের জন্যও এগুলা মনে আসে নাই।
 
নাটক করছেন, এটা পরিবারের সবাই কীভাবে নিতেন?
 
না, তারা খুবই পছন্দ করতেন। আমার বাপ তো হাসাহাসি করতেন, যে ’ও নাটক করে। আমার মা দেখতে আসতো নাটক। কিন্তু সবাই জানতো এইটা কোনো প্রফেশন না। এইটা আমি করে খেতে পারবো না। যার ফলে চাকরির কথা বলতো। আর তখন আমার চিন্তা, আমি যদি চাকরিই করি তাইলে তো এইটা... আসলে তখন আমি অনেক বেশি ডেডিকেটেড, থিয়েটারে। মানে কোনো একবেলা থিয়েটার মিস করা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। তখন এমন হইতো যে দিনেরবেলা হয়তো ট্যাবলেট খেয়ে ফেলছি, তারপর কোথাও একটু জায়গা খুঁজতাম ঘুমানোর জন্য। গ্রুপে যাইতাম, গ্রুপে তো ফ্রেশ থাকতে হবে। অথবা ধরেন, যে-কোনো এক ভাই মুখ-টুক ভালো করে ধুয়াইলো। এই কর, ওই কর, ফ্রেশ হ, রিহার্সেল করতে হবে। রিহার্সেলের মধ্যে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গেলে তো বের করে দিবে।

চাকরির চেষ্টাও করেননি?

একটু আধটু করেছিলাম। আরণ্যক থেকেও শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিল। ‘কারিতাস’ একটা বিজ্ঞাপন দিল চাকরির। পাবলিক রিলেশনস অফিসার নিবে ওরা। তখন হারুন ভাই, এখন বিটিভির ডিজি, উনি আরণ্যক করতেন। উনি আমাকে খবর দিলেন, কালকের মধ্যে সিভি নিয়ে যাও। আমি গেছি, সিভি জমা দিয়ে আসছি। তারপরে পরীক্ষা দিতে গেছি। রিটেন দেওয়ার পরে ভাইভাতে তারা প্রশ্ন করার আগে আমি প্রশ্ন করছি যে, ‘অফিস তো এখানেই?’- ‘এখানে মানে!’-  ‘মালিবাগ, এইটাই তো?’- ‘কেনো এখানে হবে! আমাদের চার-পাঁচ জয়াগায় অফিস আছে। আর প্রথম তো ঢাকার বাইরে থাকতে হবে দুই বছর।’ তারপরে কী প্রশ্ন করতেছে আমি আর বুঝতে পারতেছি না। পাঁচমিনিট বসে থেকে বললাম, ‘তাইলে বোধহয় আমার ইয়ে হবে না, আমি ঢাকার বাইরে যাবো না’। তারা আবার হারুনভাইকে বলে দিছে যে, আপনার ছেলে তো এরকম কথা বলে গেছে। মানে তখন এই টাইপের ছিলাম, কিছু বোধহয় হয়ে যাবে। আর আমার বাপ তো রিটায়ার করছে, চিল্লাইতেছে। আম্মা ফ্রাস্টেটেড হচ্ছে। এরকম নানান ইয়েতে... তখন আমার স্ত্রী আমাদের বাসায় চলে আসছে। এর আগে তো ’ও ওর বাবার বাসায় থাকতো, আমি আমার বাসায় থাকতাম।

ততদিনে আপনাদের মান্ডার ওই জায়গা কেনা হইছে?

মান্ডার জায়গা কেনা অনেক আগে।

ওখানে ঘর তো হয় নাই?

ওখানে তো মানুষ থাকতে পারবে না, পানির মধ্যে। এবং আমার মা’র কেনা তো, মা’র গয়না বেঁচে কেনা। মানে আমাদের দুধওয়ালা আইসা একদিন বললো, ‘এত দামি জিনিস পইরা ঘরের মধ্যে বসে থাকেন ক্যান?’ আমার নানা যেটা দিছে আর কি! সে প্রায়ই বলে, এইটা দিয়ে আপনারে অন্য জিনিস কিনা দিবো। সে আমার মাকে আম্মা ডাকতো। কিন্তু আম্মার চেয়ে বয়সে বড়। ওই যে, থাকে না কিছু মানুষ! ওই লোক কিছুদিন পর কাগজ নিয়ে আসছে। জমির দলিল। পরে আম্মা যখন দেখতে গেছে- দেখে দূরে আঙ্গুল দিয়ে পানি দেখাচ্ছে। বলতেছে- ঐটা আপনের জন্য কিনছি। আম্মাতো দিল বকা... হা হা। হারামজাদা তুই আমার গয়নাগুলি নষ্ট করছোস। সে খুব হাসিখুশি ছিল। বলে, না আম্মা, দেইখেন এইটা একসময় কাজে দিবে। এই দুইমাস পরেই বেচেন, দেইখেন এর চেয়ে বেশি টাকা পাবেন। আম্মা খুবই ফ্রাস্টেটেড। আম্মা বোধহয় নেক্সট টেন ইয়ার্সের মধ্যে কখনো দেখতে যায় নাই। যখন বাড়িঘর হওয়া শুরু করলো, মানুষজন থাকা শুরু করলো, আব্বা যখন রিটায়ার করলেন, কিছু টাকা আছে, তখন কিছু তো করতে হবে, নইলে ব্যাক টু দ্যা প্যাভিলন, তখন ওইটা একটা বড় ক্রাইসিস ছিল। তারা ভাবলো বাড়ি করা ধরবে। বাড়ি করা নিয়েও অনেক ক্রাইসিস ছিল- বাড়ি করতে কয় টাকা লাগে কী লাগে কিছুই জানতো না- ঐসব না হয় নাই বললাম।

এই যে মঞ্চে কাজ করছিলেন আপনি, আরণ্যকে, তারপর টেলিভিশনে নাটক শুরু করলেন কখন?

আমার ওয়াইফ তখন প্রেগনেন্ট। আমি কোনো কাজ করি না। তখন স্কলাস্টিকায় পার্টটাইম জব পাই। ছয় হাজার টাকা বেতন। আমার বাবা তখন রিটায়ার করে ফেলছে। এর আগে অনেকবার আমাকে টেলিভিশনে অভিনয় করার কথা বলছে। আমি করি নাই তখন...

আপনি তো অডিশনেও ফেইল করছেন।

কোথায়?

বিটিভি-তে।

না না, আমি প্যাকেজ নাটকের কথা বলতেছি। তখন প্যাকেজ নাটক শুরু হইছে।

টেলিভিশনে এখন আমরা যেই অভিনেতা আজাদ আবুল কালামকে চিনি- সে অডিশনে কয়বার ফেইল করেছে?

আমি অডিশন দিছিই একবার। অডিশনে ফেইল করার পরে আমাকে জিজ্ঞেস করলো যে, তুমি ফেইল করলা কেনো? আমি বললাম, আমি জানি না। সংলাপ তো ঠিকমতো বলে আসছি। আর ওনারা তখন ভাত খাইতেছিল। ভাত খাচ্ছে আর কথা বলতেছে। তরকারির টেস্ট নিয়া হে হে করতেছে। কেমনে পাশ করুম কন?

প্রথম নাটকের কথা বলছিলেন।

তখন প্যাকেজ নাটকের যুগ। গল্প হিসেবে আমার প্রথমটা খুব ভালো নাটক ছিল। নাটকের নাম ‘বিশ্বাস’। আমি রাজি হইলাম করতে, কিন্তু শর্ত দিলাম যে, নায়িকাকে যে টাকা দেয়া হবে তারচেয়ে বেশি টাকা দিতে হবে। নায়িকা হচ্ছে মিমি। মিমি তখন নায়িকা হয়ে গেছে। আল্টিমেটলি তারচেয়ে বেশিই নিছিলাম বোধহয়। এবং ওই প্রথম অভিনয় করে টাকা পাওয়া এবং টেলিভিশনে অভিনয় করা, সেইটা নিয়ে ভাবতে পারা। তখন খুব দরকার ছিল আমার। টেলিভিশনে অভিনয় এখনো আমি টাকার জন্যই করি।  টেলিভিশন এমন একটা জায়গা, এখানে কেউ টিকে থাকে না। আর আপনি অনেক চিন্তা করে অভিনয় করবেন, এইটার স্কোপও কম। সাংবাদিকতার লেখা আর সাহিত্যের লেখার মধ্য পার্থক্যটা কী? লেখা কিন্তু সেই হাজার ওয়ার্ডই লিখলেন, আজকে লিখলেন কালকে কিন্তু শেষ এইটা। কালকে ছাপা হয়ে গেলো। ফুস! এই হলো সাংবাদিকতার লেখার ভাগ্য। টেলিভিশনেরটাও ওইরকম। আর প্যাকেজ আসার আগে, কেউ যে  টেলিভিশনে অভিনয় করে খাইতে পারবে সেটার নিশ্চয়তা ছিল না। তখন বিটিভির সবচেয়ে বড় স্টার যারা, তারাই পাইতো ৭০০ টাকা। এবং তারা তিনমাসে একটা নাটক করার সুযোগ পাইতো। স্পেশাল কন্সিডারেশনে দুইটা নাটক পাইতে পারে।
 
থাকা না থাকা নিয়ে একটা কথা বলি। মঞ্চ তো খুবই জীবন্ত একটা মাধ্যম। আপনি একসময় ‘সার্কাস সার্কাস’ করতেন বা ‘এ ম্যান ফর অল সিজনস্’ করতেন, এখনও করেন। এখন ততটা মঞ্চস্থ হয় না। আমি ওই সময় আপনাকে দেখেছি। এখন আমি যদি কাউকে বোঝাতে চাই যে আজাদ আবুল কালাম এই নাটকে কী করতে চেয়েছিলেন, আমি কিন্তু বর্ণনা দিয়ে বোঝাতে পারবো না, কারণ ওই মঞ্চটা নাই। এটা খুবই জীবন্ত, চাক্ষুষ। কিন্তু আপনি বলছেন যে মঞ্চেরটা থেকে যায়, টেলিভিশনেরটা থাকে না- এমনটা কেনো বলছেন?  

না না! আমি এটা বলি নাই। শুধু স্ক্রিপ্টের কথা বলছি না আমি। মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে যেটা হয়, এই যে জীবন্ত একটা প্রক্রিয়া, যতক্ষণ চলে, এর যে শক্তি, ওইটা একটা লেভেলে থেকেই যায়। সাংবাদিকতার লেখার ক্ষেত্রে যেটা বললাম, ঠোঙ্গা হয়ে যায় পরে। টেলিভিশনের নাটকের ক্ষেত্রে, তাকাতে সমস্যা হয় পরে। কারণ টেলিভিশনে যে প্রস্তুতি, যে প্রিপারেশন, সবকিছু মিলে যে তাৎক্ষণিক জিনিসটা তৈরি করে দেয়, এটা পরীক্ষার আগের দিনের প্রিপারেশনের মতো, পরীক্ষার পরে ভুলে গেলেও সমস্যা নাই। ফলে টেলিভিশন অ্যাক্টর হইলো ওই পরীক্ষার্থীর মতো। কোনোদিন যদি তাকে এই অভিনয় দেখতে হয়, তার খুব হাসি পাবে। অ্যাসথেটিক্যালি, কোয়ালিটি মিলায়ে-টিলায়ে এরকম একটা ব্যাপার।

টেলিভিশন নিয়ে আমরা বেশিক্ষণ সময় কাটতে চাই না, তারপরও বলি, কেউ কেউ এর মধ্যে থেকেই এমন কিছু বের করে আনেন যে বহুকাল পর্যন্ত দর্শকরা সেগুলো রিকল করে। যেমন হুমায়ুন ফরীদিকে রিকল করে, অনেককেই করে। আমি আপনার একটা নাটক দেখেছিলাম, কতবছর আগে দেখেছি মনেও নাই, ছিয়ানব্বই এর দিকে বোধ হয়, ‘একজন লেখক এবং একটি মৃত্যু’, এই ধরনের একটা নাম ছিল নাটকটার, এখনো আমার মাথার মধ্যে গেঁথে আছে ওটা, চোখে লেগে আছে দৃশ্যগুলো। আপনি বের করে এনেছিলেন ওই ক্যারেকটারটা।

ওটা ছিল একটা ইয়ের মতো... তখন টেলিভিশন অভিনয়ে আমিও যেহেতু নতুন নতুন, আমার ইয়েটা ছিল যে কতটা এফোর্ট দিলে কী করা যেতে পারে। তখন কিন্তু আমি বাচ্চার বাবা, আর আমি একটা আঠারো বছরের ছেলের চরিত্রে অভিনয় করতেছি। তখন তার মনস্তত্ত্ব, সে কী প্রিটেন্ড করতে পারে সেইটা। এটা কিন্তু  ফেইলও করছিল। রেকর্ডিং বন্ধ হয়ে গেছিল একদিন আমার জন্য। কারণ আমি তিন ক্যামেরায় কাজ করে অভ্যস্ত না। প্রডিউসার সেটা বুঝতে পারছে। ওইদিন আবার আমার বাচ্চা হইছে। বাচ্চা হইছে সাড়ে চারটার সময়। সাড়ে ছ’টার সময় আমি ক্যামেরার সামনে। আমি কিন্তু পেছনে কাজ করা লোক, মামুনভাইয়ের অ্যাসিসটেন্ট ছিলাম, বাদল ভাইয়ের অ্যাসিসটেন্ট ছিলাম... এর আগে আমি এক ক্যামেরার সামনে কাজ করে ফেলছি, খুবই পাজল্ড লাগতেছিল আমার, অস্থিরতা। তারপরে বাচ্চাটা কীরকম হইলো দেখতে? খুব বড়সড় হইলো বোধহয়। এইসব মাথার মধ্যে ঘুরতেছে। আমি তখন প্রডিউসারের কাছে মাফ চাইছি। মূল ইয়েটা হচ্ছে আমি কিছুতেই পারতেছি না। বড় বড় সংলাপ ছিল, বারবার আমি খেই হারায় ফেলতেছিলাম...
 
প্রডিউসার কে ছিলেন?

মুস্তাফিজুর রহমান। তারপর প্রায় ১৫ দিন পরে স্টুডিওতে কল করে। এই ১৫ দিনের প্রতিদিনই আমি ভাবতেছি কী করা যেতে পারে, কী করা যেতে পারে।
 
আরণ্যকে থাকতে আপনি একবার নির্দেশনাও দিলেন। এটার জন্য আপনি কতটুকু প্রস্তুত ছিলেন? বা নির্দেশনায় আপনি...

আমি তো সবার অ্যাসিসটেন্ট ছিলাম। একটা ব্যাপার ছিল যে, আমি প্রতিদিনই আছি। খারাপ-ভালো সময় বলে কিছু নাই। আমি সব সময়ই আছি। বিকালে রিহার্সাল রুমে ঢুকলে মনে হইতো যে, এই লোকগুলা তো আছে, বাঁইচা যাবো। ‘মামুনভাই, চাকরি নাই বাকরি নাই!’ ‘আরে হইবো! বাদ দাও! তুমি আমার লগে অ্যাসিস্ট্যান্টগিরি কইরো।’ করছি। মাস শেষে ১৫০০ টাকা দিছে। ১৫০০ টাকা তখন কোনো টাকাই না প্রায়। কিন্তু ওইখানে গেলে যে একটা ভরসা, এতগুলা মানুষের দল, এইটাই ছিল বিষয়। আমি তো সবার অ্যাসিস্ট্যান্ট। হাকিমভাই ডিরেকশন দেবে, অ্যাসিস্টেন্ট। দুলালভাই ডিরেকশন দেবে, অ্যাসিস্ট্যান্ট। হীরাভাই ডিরেকশন দেবে, অ্যাসিস্ট্যান্ট। মামুনভাই বললো- আমিতো ডিরেকশন দিবো সুবচনে (সুবচন নাট্য সংসদ)। এই গাধাগো পিটায়ে ঠিক করা আমার পক্ষে সম্ভব না। তুমি প্রথম দিকে রিহার্সাল করাও, আমি আসতেছি।
 
আমি কিন্তু আরণ্যকে প্রথম নির্দেশনা দেইনি, দিয়েছি ‘বাঙলা থিয়েটারে’। ঘটনা হচ্ছে যে, মামুনভাই একটা নাটক করলো, টেলিভিশনে ওইটা গেলো। নাটক দেখে আমি বললাম যে, মামুনভাই এইটা তো স্টেজের নাটক।
 
‘আদিম’?

‘আদিম’। মামুনভাই বললো- ‘তুমি করবা নাকি?’ হু- এইটা আমি ডিরেকশন দেবো। কথায় কথায় এইটা ডিরেকশন দেয়া। আর আরণ্যকেরটা হচ্ছে, সবার এ্যাসিস্টেন্টগিরি করতে করতে সবাই ভাবলো, ওরে একটা দেই। তখন আমি ‘আগুনমুখা’-র নির্দেশনা দিলাম।

‘আগুনমুখা’ সিলেক্ট করলেন কেনো?

এই নাটকটা আমি পছন্দ করে নিয়েছি তা কিন্তু না। ব্যাপারটা এমন যে, এবার মান্নান হীরা নাটক লিখতেছে, তাইলে ওইটাই করো। আমরা কিন্তু জানিই না হীরাভাই কী নাটক লিখতেছে। লেখাটা পড়ার পরে হঠাৎ করেই আমার জাঁ পল সার্ত্রের নাটকের সাথে কোথাও একটা ইয়ে পাইলাম। তখন হচ্ছে যে অ্যাবসার্ট নাটক পড়া, এইটা পড়া, ওইটা পড়া- পড়াপড়ির দিকে অনেক ধরনের ইয়ে ছিল। আমার মনে হয় যে এইটার ভিতরে একটা সম্ভাবনা আছে। তারপরেই কিন্তু আমি লেখা শেষ হবার পরে প্রতিদিন হীরাভাইয়ের সাথে বসতাম। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আবার রি-রাইট করা। আবার কী করা যায়। সম্ভবত হীরাভাই আমার উপরে বিরক্তও হলেন। কারণ উনি হচ্ছেন লিটারেচার দেখতেছে। আর আমি সারাক্ষণ দেখতেছিলাম স্টেজে। লিটারেচার যেমন ইমপর্টেন্ট, ঠিক একইভাবে আমি দেখতেছিলাম ওই জায়গাটা দেখতে কীরকম লাগবে।  

নাটকটার মঞ্চ পরিকল্পনা করেছিলেন মনসুরভাই। উনি নাগরিকের (নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়) ছিলেন। মনসুরভাইকে বললাম, আপনাকে ৫ হাজার টাকা দিবো, আর আপনি যেদিন যেদিন যাবেন আপনি যে সিগারেট খান আপনাকে এক প্যাকেট করে সিগারেট কিনে দিবো। উনি একটু হাসলেন। দাম্ভিক লোক হিসেবে উনি সমাজে পরিচিত ছিলেন, প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন। উনি দাম্ভিক এবং প্রেমিক মানুষ। আসলে দাম্ভিকও না, কিছুই না। খুবই সাধারণ একজন মানুষ, তার সাথে কাজ করতে গিয়ে বুঝছি। হইছে কী একটু বরিশালের রাগ আছে। ওনার বাড়ি বরিশাল। মনসুরভাই রিহার্সেল দেখবে আগে। রিহার্সেল দেখে বলে যে ‘ওখানে যে বসে সেখানে...’- আমি বলি- ‘টুল হইলেই তো চলে’। ‘হ্যাঁ তা চলে। তো এই যে শোয়, এইখানে?’- ‘লম্বা বেঞ্চির মতো দেন, এই পাশেও দেন, এমনভাবে দেন যেন দেখলে খাট মনে হবে।’- ‘তা তো ঠিকই। তো এই যে পানি খায়?’। আমি বললাম, ‘একটা কলস দিয়েন।’ উনি বললেন ‘না অনেক কিছু লাগবে, ক্রিয়েট করার জন্য অনেক কিছু লাগবে।’ উনি আবার অনেককিছু চিন্তা করেন। তো আমি বললাম, ‘আমার কিন্তু অল্পকিছু লাগবে। অন্ধকার চাই তো, ফ্লোরও কিন্তু কালো চাই।’ তো, উনি একদিন বললেন, ‘পাভেল টাকা পয়সা কতো আছে বলো তো।’ আমি আবার আগেই দলকে বলছি, সেট লাগবে না। যখন বুঝছি যে গ্রুপের বাইরে সেট করে দিতে রাজি হবে না, তখন এড়ানোর জন্য বলছি যে, সেট লাগবে না। মনসুরভাই আমারে সেট করে দিছেন।... তারপরে ঐ অল্প বাজেটেই আমরা সেট তৈরি করি। কিছুই না, কালো কাপড় কুচি কুচি করে সুতা দিয়ে টেনে সার্কেল। আর পান্থপথ থেকে পুরনো একটা দরজা একটা জানালা কিনে নিয়ে আসা হলো এগারো শ’ টাকা দিয়ে। ওইগুলোরে একটু রিপেয়ার করে, বার্ণ করা হলো। একটা দরজা, একটা জানালা। আর পুরাটা হলো কাপড় পেচিয়ে হাফ সার্কেল। আর ফ্লোরে পুলিশের ফেলে দেওয়া তাবুগুলো এনে কালার করে দেওয়া হইলো। ডিপ অ্যাশ, অলমোস্ট ব্ল¬্যাক আরকি। স্টেজের মধ্যে প্রচুর বিয়ারের ক্যান। বিয়ারের ক্যান ফেলে দেওয়ার ফলে যখন ক্যারেক্টারগুলি মুভ করতেছে তখন পায়ে একটা ক্যান বাড়ি খাইতেছে, বাড়ি খেয়ে দুইটা তিনটা ক্যানে লাগতেছে। যখনই কেউ মুভ করতেছে, প্রচুর বিয়ারের ক্যান। এইটা প্রথমে মনসুরভাই পছন্দ করে নাই। পরে বুঝলাম যে চকচক করে যে ওইটা পছন্দ করেন নাই। তারপরে সবগুলারে কালার করছে। কী দিয়ে যেন কালার করলেন, মোটামোটি চকচকা ভাবটা চলে গেল। পুরা স্টেজ জুড়ে বিয়ারের ক্যান। ওরা নিজেরাও কখনো কখনো আওয়াজ পেয়ে থেমে যাচ্ছে। এরকম আরকি। অনেকগুলা এক্সপেরিমেন্টেশন করে টরে করা।

এইটা করেছেন কেন? এই যে বিয়ারের ক্যান রাখা?

ওই নাটকের ক্যারেক্টারগুলো এমন একটা আইসোলেটেড জায়গায় থাকে যে, দুনিয়ার কারো সাথে যোগাযোগ নাই, কোনো সাউন্ড নাই, কিচ্ছু নাই। ওরা আশেপাশের কোনো সাউন্ডও পায় না। এই নৈঃশব্দ্যের মধ্যে ছোট ছোট শব্দগুলোও ওদের ইয়ে করে। আর যেহেতু জিনিসগুলা ফ্লোরে পড়ে আছে, দেখা যায় না। আর একটা হইছে যে একটা গার্বেজের মধ্যে ওরা আছে।

‘শাইলক এ্যান্ড সিকোফ্যান্টস’-এর সেট ডিজাইনেও এই ধরনের জিনিসের প্রাচুর্য দেখেছি। এই চিন্তাগুলো আপনার মাথায় কিভাবে আসলো?

ইট ইজ অ্যাডভার্টাইজমেন্ট। শাইলকের একটা ইয়ে ছিল যে, সেট থেকে শুরু করে পুরাটাই হচ্ছে অ্যাডভার্টাইজমেন্ট। সবাই সবকিছু অ্যাডভার্টাইজ করতে পারে। ইওর হার্ট ইজ স্ট্রং, এটাও আপনি অ্যাডভার্টাইজ করতে পারেন। আপনি দেখতে সুন্দর, এটাও অ্যাডভার্টাইজ করতে পারেন।

পাভেলভাই, একটা কথা বলি। যেহেতু ওই সময়ে আপনি... মামুনভাইয়ের ভেতরেও ব্যাপারটা ছিল যে, থিয়েটার করে খাওয়া যায় কিনা, এরকম একটা চিন্তা থেকে উনি ‘বাঙলা থিয়েটার’টা করলেন। আপনারা তখন মামুনভাইয়ের সাথে ছিলেন। ওনার স্বপ্নের সাথে সাথে আমার মনে হয় যে আপনারাও গেছেন। একটু বলেন যে ওইসময় আসলে কতটুকু মনে করেছিলেন... আপনি যে কাজটা এতো পছন্দ করেন এবং সেটা দিয়েই যদি জীবন চালানো যায়...
 
ওইটা দিয়ে যে আসলে খাওয়া যাবে না, যারা উদ্যোগী ছিলেন অথবা আমরা যারা এইটার সাথে প্রথম থেকে ছিলাম,  আমরাও কিন্তু জানতাম। কিন্তু এইটা কি কখনো দৃষ্টান্ত হিসেবে তৈরি হতে পারে কিনা, এইটাকে বেইজ করে আরও কিছু মানুষ আরও কিছু চিন্তা করতে পারে কিনা যে, এইটাকে কিভাবে প্রফেশনাল বানানো যায়... তখনতো আমরা অলরেডি জেনে গেছি, সারা দুনিয়াতেই ফান্ড ছাড়া কেউ থিয়েটার করতে পারে না। ফান্ড ছাড়া থিয়েটার কোথাও বেঁচে নেই আর।
 
এক অর্থে সাবসিডাইজড।

সাবসিডাইজড। না হলে হবে না। হয় স্টেট তার দায়িত্ব নিবে, যেমন হাসপাতালের দায়িত্ব নেয়, সেরকম থিয়েটারের দায়িত্বও সে নিবে, নইলে এইটা সার্ভাইভ করতে পারবে না। অনেকগুলা লোক এখানে কাজ করে। অনেক কিছু, টেকনোলজি আছে, আর্ট-কালচার- সবকিছু। দায়িত্ব যদি না নেয়, সেইটা কর্পোরেট লেভেলেই হোক আর রাষ্ট্রীয় লেভেলেই হোক, থিয়েটারটা টেকে না। তখন কিন্তু আমরা এগুলা জেনে গেছি। এইটা দেখে যদি কেউ ইন্সপায়ার হয়ে আসে, সেইটা স্টেটও হইতে পারে, কোনো প্রতিষ্ঠানও হইতে পারে। সেটা ভেবে শুরু করা হয়েছিল।
 
তারপর আপনারা কয়েকজন বন্ধু মিলে নিজেরাও আবার চেষ্টা করেছেন। ওই সময়টুকুতে কতোটুকু আশাবাদী ছিলেন যে কাউকে আনা যাবে বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে আনা যাবে?
 
তখন আরেকটা জিনিস ছিল। আমাদের সবার মধ্যে তখন ক্ষুদ্র দলবাজি ঢুকে গেছিল। এই থিয়েটার মানে, এই দল এই কাজ করে। অন্যদলে কারো বন্ধু আছে- ওর অন্যদলে বন্ধু হইলো কেনো! এইটাও একটা বড় বিষয় ছিল। এতটাই হীনমন্যতার মধ্যে পরে গেছিল। তখন রেপাটরি শুধু যে অর্থ যোগাবে তা না- এই গ-িটাকে ভাঙারও একটা বিষয় ছিল। এবং ‘কন্যাদান’ নাটকটা যে আমরা করলাম, ওইটার পেছনে বড় কারণ ছিল এইটা।

দলের নাম ছিল ‘নন্দন’।

এইটা মিমির-ই উদ্যোগ ছিল। তারপরে ওর তখনকার হাজব্যান্ড রাকায়েত ওর সাথে যুক্ত হইলো। কিন্তু মূল উদ্যোগটা মিমি নিচ্ছিল। কিছু একটা করা যেটা ‘দল’ না। নানান দলের ছেলেরা, আমাদের ফ্রেন্ড যারা আছে, তারা সবাই মিলে কিছু করতে পারি কিনা। আর তখন একজন লোককে পাওয়া গেছিল যে ভাবতো যে, থিয়েটারকে প্রফেশনাল বানানো যাবে। একটা নাটক বানানো হলো, এমনিতে ’শো হবে না, কর্পোরেট লেভেলে ’শো হবে।

সেই বোকাচোদাটা কে?

হা হা হা। সেই বোকাচোদাটা বিশিষ্ট মদ্য ব্যবসায়ী। ওনার কেরুর বাংলা যে মদ, যেটা বড় বড় কন্টেনারে করে আসে...

কুষ্টিয়াতে যেটা পাওয়া যায়। দর্শনার বাংলা বলে।

উনি হচ্ছে ওইটার সবচেয়ে বড় ডিলার। তো ওনার টাকাও ছিল, আবার যেকোনো কারণে থিয়েটারের প্রতি ভালোলাগাও ছিল। উনি তো সোলায়মানভাইকেও পয়সাপাতি দিতো। তারপরে আজিজুল সামাদকেও অনেক পয়সাপাতি দিছে।

তো এখন এসে যেটাকে আমরা ‘তারুণ্য ও তাড়নার ৫০’ বলছি বা আমরা এক হতে চাচ্ছি, সেই বয়সের মানুষগুলোই কিন্তু সেখানে ছিল। আফসানা মিমি, গাজী রাকায়েত, আশিস খন্দকার, শিরিন বকুল, তৌকীর আহমেদ, নাসিরুল হক খোকন...

আরও অনেকে ছিল।
 
এক সময় আমরা শুনলাম কিংবা জানতে পারলাম যে আরণ্যকে আপনি একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছেন এবং তার পরবর্তী সময়ে আপনাকে আরণ্যক ছাড়তেও হয়। এটা যতো সংক্ষেপেই হোক, বলেন...

এইটা আসলে দুই ধরনের প্রবলেম ছিল। একটা প্রবলেম ছিল যে, আমি দুর্বিনীত ছিলাম। আসলেই দুর্বিনীত ছিলাম। আমি কোনো কিছুই মানতে পারতাম না। এইটা যে শুধু ওদের প্রবলেম ছিল তা না, এইটা আমারও প্রবলেম ছিল। তখন বুঝতাম না, কিন্তু এখন বুঝতে পারি যে, আই ওয়াজ টু মাচ...। থিয়েটার মানে তো একটা সামাজিকতা। অ্যাংগুয়িশ বলেন, অ্যাংগার বলেন, বিরক্তি বলেন এগুলা এমন একটা লেভেলে যাচ্ছিল- এটার পেছনে আমার জীবনেরও কিছু ঘটনা প্রভাব ফেলছিল। তারপরে আমি আমার বিবাহ বর্হিভূত নানান ধরনের কেলেঙ্কারিতে জড়াইতেছিলাম। এই সবকিছুকে আমি যে খুব ঠা-া মাথায় ব্যবস্থাপনাটা করতে পারছিলাম, তা না। তখন আবার আরণ্যকে যেটা ছিল, আমার যেহেতু ইয়েস নো... একদম সোজা বাংলায় যদি আমি বুঝতাম যে এইটা দুই নাম্বার বা খারাপ কিছু আমি সবসময় ‘না’ বলতাম। ওইটার কারণে কারো কারো ভালোবাসা আমার উপর থেকে সরে গেছে। যার ফলে আমার কোনো প্রটেকশন ছিল না। প্রটেকশন না থাকায় নাটক নিয়ে প্রতিদিন আমার সাথে গেঞ্জাম করছে। এইটা এমন কেনো, অভিনয়টা এরকম করতেছে কেনো, ব্যাক স্টেজ ম্যানেজমেন্ট এরকম কেনো। কালকে ’শো রাতের বেলা জুয়া খেলতেছে কেনো... এরকম ছোট ছোট নানান ধরনের বিষয় নিয়ে ঝামেলা লেগে যাচ্ছিল। আর আমি তো বললাম যে, এই ব্যবস্থাপনা আমি ঠিকমতো করতে পারছিলাম না। এইটা অবধারিত হয়ে গেছিল আসলে। এইটা এইভাবে না হইলে অন্যভাবে হইতো। হয়তো ওরা আমাকে বের করে দিছে, উল্টা হইতে পারতো।
 
আরণ্যক ছাড়ার পর আপনি কিন্তু আরণ্যকেরই কয়েকজনকে নিয়ে নাট্যদল করেছেন তা না; ওখানে অন্যরাও আসলো। কী করে আরেকটা দল করলেন এবং সেটাতে কতো সময় নিয়েছেন? নাকি অনেকদিন বসে ছিলেন?
   
না, এইটা আসলে যখন আমার সাথে ইয়ে হয়ে গেল, আমাকে বেরই করে দিল, তখন সামনে একটা ’শো ছিল। ওখান থেকে আরও দশজন সটকে পড়লো যে, ওরাও করবে না, আমি না থাকলে। তখন আমি মামুনভাইয়ের কাছে গেলাম। গিয়ে বললাম যে, ওদের আটকান। ওদের সাথে আলোচনা করেন যাতে ’শো নষ্ট না হয়। কিন্তু সেইটা করার মতো অবস্থা তখন ছিল না। তখন ওখানে একটা পক্ষই হয়ে দাড়াইছিল যে, দশজন কেনো, সব গেলে যা গা!

তো অন্যরা যে যুক্ত হলো- ঐ দলটার নাম কী ছিল?

ওইটাতো আরও পরে। আমরা ফার্স্ট ’শো করে ফেলছি তখন।

আপনারা তো পথনাটক দিয়ে শুরু করলেন?

হ্যাঁ। শহীদ মিনারে গিয়ে ’শো করলাম।

‘প্রাচ্যনাট’ করলেন কি স্রেফ একটা দল থেকে বের হয়ে গেলেন আরেকটা দল করতে হবে- সেজন্য?

না। নেসেসিটি হয়ে গেছিল, যারা আমার সাথে বের হয়ে আসছে তাদের জন্য। আমার ভাবনাটা ছিল যে, আমি এক বছর আর যাই করি, থিয়েটার করবো না। দেখি একটু কী করতে পারি, কী করা উচিত। আমার ভাবনাটা এরকম ছিল। কিন্তু তখন অবভিয়াস হয়ে গেছিল। ওরাতো তখন ভীষণভাবে কাজ করতে চায়। তখন আমার পক্ষে সরে যাওয়া সম্ভব হয় নাই।

পরে যখন আমরা প্রাচ্যনাটের কাজগুলো দেখলাম; নানা ধরনের কাজ, অনেকভাবে অনেক ধরনের কাজ, এই ধরনের কাজ করবেন, এই চিন্তাটা কি আপনি প্রথম থেকে করেছেন?

‘সার্কাস সার্কাস’ কিন্তু আমার লেখা একটা গল্প ছিল। গল্পটা তিনজন নারীকে নিয়ে। একটজন সন্তান-সম্ভবা, ওই যে বাঘিনী চরিত্রটা। একজন সন্তান উৎপাদন করতে চায়, একটা ছেলের হাত ধরে চলে যেতে চায়। আরেকজন হচ্ছে যার কোনোদিনও সন্তান হবে না। সার্কাসের একটা প্লেয়ার, সার্কাসে যারা খেলা দেখায় দীর্ঘদিন, সেই মেয়েদের বাচ্চা হয় না; একধরনের অটো বন্ধাত্ব হয়ে যায়, ওদের ইউটেরাস-টা স্টিভ হয়ে যায়। কক্সবাজারে ‘সোনার বাংলা সার্কাস’-এ যখন আগুন দেয়া হয় তখন পত্রপত্রিকা দেখে আমার খুব আগ্রহ তৈরি হইছিল এই সার্কাসদল নিয়ে। তখন আমাদের অঞ্চলে, মানে বরিশাল অঞ্চলে লক্ষণ দাসের সার্কাস অনেক নামকরা ছিল। এবং এরকম একটা গল্প প্রচলিত ছিল যে, লক্ষণদাস যেহেতু হিন্দু এবং এন্টারটেইনার হিসেবে অনেক বড়, পাকসেনারা এসে ওনাকে ধাওয়া করতেছিল, উনিও ওই ক্ষেতের মধ্য দিয়ে দৌঁড়াচ্ছিলেন, আর ওনার সার্কাসে যে হাতি ছিল, হাতিটা ওনার পিছনে পিছনে দৌঁড়াচ্ছিল। গ্রামের গল্প যেভাবে তৈরি হয় যে, হাতিটা আসলে ওনাকে গার্ড করে রাখছিল। ওনাকে গুলি করলে যাতে ওনার গায়ে না লাগে। হাতিটা যখন পড়ে যায় তখন ওনার গায়ে গুলি লাগে। ওইটা নিয়ে গল্প লিখছিলাম; মামুনভাইকে গল্পটা বলছি। তখন কিন্তু মামুনভাই-ই বলছিল, এইটা ভালো থিয়েটার হইতে পারে। আমি আরণ্যকে থাকলে হয়তো ওইটা দিয়েই কাজ শুরু করতাম। তারপরে যখন নাটক করা শুরু করলাম, তখন প্রতিদিন একপাতা, দুইপাতা লিখে দিতাম। তখন সবাইকে নিয়ে কাজ করবো। আমাদের তখন ১৭ জন লোক; ১৭ জন লোককে ইনভলব করা আরকি। আমাদের প্রথম ’শো যখন হয়, টিকেট বিক্রি করার কেউ ছিল না, গেটে দাঁড়ানোর কেউ ছিল না, লোক বসানোর কেউ ছিল না। আবৃত্তির সংগঠন আছে একটা, ওদেরকে বলছিলাম যে এই কাজটা করে দাও। ওরা টিকেট বিক্রি থেকে শুরু করে, বাবুল বিশ্বাস ছিল টিকেট বিক্রির দায়িত্বে; আর আবৃত্তির সংগঠনের ওরা ছিল লোক ঢোকানোর দায়িত্বে। আমরা সবাই তখন স্টেজে।

১৭ জনই পার্ফমার?

৩৪/ ৩৫ টা ক্যারেক্টার। একেকজন একেকটা ক্যারেক্টার করতেছে, একাধিক করতেছে।
 
আপনি বলছিলেন যে, সার্কাসের নারীদের বাচ্চা হয় না, আপনি এটা জানলেন কীভাবে?

এইটা জানছি সার্কাসের লোকদের থেকে। ওই ঘটনা শোনার পরে আমি আরিচা গেছিলাম। তখন আমি আরণ্যকেই। আরিচা গিয়ে দেখি সার্কাস চলতেছে। দেখেটেখে জিজ্ঞেস করলাম, ওই সার্কাসের দলটা কোথাকার? ওরা বললো, ওই যে যাদের কক্সবাজারে আগুন দিছে। তখন অনেকক্ষণ ওই লোকের সাথে কথা হইছে। ওই লোকটাই ঘুরে ঘুরে আমাকে দেখাইছে। কিভাবে খায়-টায় সবকিছু দেখাইছে। কথা বলতে বলতে একজন মহিলাকে দেখলাম।  উনি যখন খেলা দেখায় তখন মেকআপ থাকে তো তাই বোঝা যায় না; এখন মেকআপ নাই, আমি বললাম ওনার বয়স কতো? বললো ৩৫ হইছে। আমি বললাম, না, আরও বেশি হবে মনে হয়। বলে, না না, সার্কাসের মেয়েদের এই অবস্থাই, পোলাপান হইবো না, কিচ্ছু হইবো না। জিজ্ঞেস করছিলাম, কেনো? বললো, যে মেয়েরা ছোটবেলা থেকে সার্কাস দেখানো শুরু করে; আমাদের দেশে কোনো ট্রেনিং নাই তো, প্রোপার ট্রেনিং নাই, কিচ্ছু নাই, ওর ভাষায় ’ও বলতেছিল, পেট ছোট হয়ে যায়, পেট টাইট হয়ে যায়। তাই ওদের বাচ্চা হয় না। তো পরে জানতে পারলাম, ইউটেরাস স্টিভ হয়ে যায়। যে ব্যায়ামগুলো করায় ওদের, কঠিন কঠিন কাজ করায়; তলপেটে প্রেসার লাগে। ’ও ওইটা ওইভাবে বলতে পারে নাই, ’ও বলছে পেট ছোট হয়ে যায়।
 
অনেকক্ষণ ধরে আপনার ব্যক্তিজীবন, নাটক ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হল। আপনার বিভিন্ন আন্দোলনগুলো সম্পর্কে বলেন তো। শুধু তো নাট্যকর্মী না, সচেতন নাগরিক হিসেবেও আমরা আপনাকে পাই। বিশেষ করে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সময়, ৮৪-৮৫ এর পরপর...

ওখান থেকেই শুরু হইছে। ইনফ্যাক্ট ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার পর থেকে। এবং পথনাটক কিন্তু ওই সময় আন্দোলনে বিশাল ভূমিকা রাখে। ওই সময়ে শুধু যে নাটক করছি তা না, তখন আসলে এমন ছিল যে, কেউ মিছিল করছে, এরশাদবিরোধী স্লেøাগান দিচ্ছে- ওইটাও ভালো। আবার ’৯০-এর দিকে মেরুকরণ হলো, কে কী জানি না, সবাই হচ্ছে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য। এদের কারো কোনো আলাদা পরিচয় ছিল না। শুধু মিছিলটাই। আবার, কোথাও একটা মুভমেন্ট হচ্ছে, এরশাদকে গালি দিচ্ছে কেউ- এইটাও একটা আনন্দের বিষয় ছিল। আর, আমার এখনো মনে হয়, এরশাদ বাংলাদেশের একটা প্রজন্মের যে কতবড় ক্ষতি করেছে, এইটার কোনো বিচার হয়নি। এই ক্ষতি জিয়াউর রহমানও করতে পারে নাই, কেউ করতে পারে নাই। একটা  জেনারেশন- ১০টা বছর! আপনি চিন্তা করেন আমার লাস্ট পরীক্ষার দিন সকালে আব্বা বললো, ‘ইয়ে, সামরিক শাসন জারি হইছে, তুই রাস্তাঘাটে উল্টাপাল্টা করিস না। তোর তো আবার চুল বড়।’ আমি তখন ফ্যাশন করে চুল বড় রাখি। টেস্টের আগে থেকেই আর চুল কাটি না- স্কুলে তো আর কিছু বলতে পারে নাই। তো আব্বা বললো- ‘তোর চুল বড়, সাবধানে থাকবি, বেয়াদবি করবি না।’ পরীক্ষা দিতে যাবার পথে রিক্সায় এগুলো বলে আব্বা মতিঝিলে নেমে গেলেন। আমি পরীক্ষা দিতে গেলাম। রাস্তাঘাট সব শুনশান। ওইদিন আমরা তিন বন্ধু জীবনে প্রথম ব্লুফিল্ম দেখবো, এই হচ্ছে পরিকল্পনা। এরমধ্যে একজন আবার রেকি করে আসছে। জেলখানা পার হয়ে ডানদিকে দাঁড়ালে, একটা ছেলে, ওর ইঙ্গিত হচ্ছে- সিগারেটের আগেকার প্যাকেটগুলি আরকি, কেটে কেটে কার্ডের মতো বানিয়ে ওইগুলি নিয়ে একটা অঙ্গভঙ্গি করে। ওইটাই হচ্ছে টিকেট। ’ও নাকি কিছু বলে না, খালি অঙ্গভঙ্গি করে, দিনের বেলা। রাতের বেলা নাকি তুমুল পসরা জমে। সবাই আগ্রহ নিয়ে গিয়ে দেখে। তো, পরীক্ষা শেষ হলো। আমরা তিন বন্ধু চলে আসছি মতিঝিলের দিকে। এজিবি কলোনীতে আড্ডা মারবো। আমি বললাম, কোন জায়গায় এগুলা হয় চল- আমার কেনো জানি যন্ত্রণা উঠে গিয়েছিল, ঢাকাইয়া তো! একটা কিছু পাবার আশা করছিলাম! শেষে আমরা তিনজন গেলাম- শোয়েব, পারভেজ, আমি। জেলখানার কাছে আসলাম, একটি মানুষ কোথাও নাই। কিছুদূর সামনে গেলাম। যে বন্ধুটি রেকি করে গিয়েছিল, ’ও জানে কোথায় কী আছে! সে দূরে একটি ছেলেকে দেখালো, টিকেট নিয়ে অঙ্গভঙ্গি করছে। ওকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের চেয়ে ছোট কিন্তু, ’ও বলে- ‘আপনারা তো স্কুলড্রেস পরা, আপনাগো ঢুকতে দিব না।’ ধুর ঢুকতে দিবো না, আমরা বড় হইছি না! তো সে জানালো, ‘আজকে তো ট্রিপল এক্স দেখানো যাবে না।’ কেন? ‘অ্যা কন কী? সব বন্ধ না? সব বন। আপনারা যান, হিন্দী সিনেমা চলতাছে, যান!’ আমাদের একটা গো হলো, দেখতেই হবে আজকে। তো গেলাম, গিয়ে দেখি কাভি কাভি সিনেমা। ভিসিআর এক জায়গায়, টেলিভিশন এক জায়গায়, তারপর যে ছেলেটা টাকা নিলো- ’ও হাঁটতেছে তো হাঁটতেছেই, কোথায় নিয়ে যাবে আল্লাই জানে! কাভি কাভি দেখে বাসায় যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আমরা মতিঝিল এজিবি কলোনিতে ঢুকছি, হঠাৎ শোয়েবের বড়বোন বলতেছে, ‘তোমারে ধরবে একটু পরে, তাড়াতাড়ি বাসায় যাও। আর শোনো, ওভারব্রিজ দিয়ে যেও না, চিপা দিয়ে অন্য দিক দিয়ে চলে যাও। কারণ ওইখানে সবাইকে ধরতেছে, চুল বড় দেখলে কেটে দেয়।’ আসলে তো আর জানি না- কী করে না করে, ওইখান থেকে শুরু করে নব্বই পর্যন্ত তিনবার, ও ধিং ধৎৎবংঃবফ ভৎড়স ঃযব ংঃৎববঃ, ধহফ, ভড়ৎ হড়ঃযরহম. ৫৪ ধারায় তিনবার আমি অ্যারস্ট হইছি। মতিঝিল থানা, রমনা থানা আর হচ্ছে লালবাগ থানা।

মানে একই দিনে?
 
না তিনবার। ’৮২ থেকে ’৮৮ পর্যন্ত। এবং লাস্ট হচ্ছে আজিমপুরে। টিংকুদের বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চা-সিগারেট খাচ্ছি, হঠাৎ কে যেন ধরলো। তাকায়া দেখি পুলিশ। নিয়ে গেল এবং ৫৪ ধারা। ওই দিন তো আর ছাড়ে নাই, পরদিন কোর্টে কী জানি বলে, ‘আপনি দোষী?’ ‘জ্বি দোষী।’ ‘আচ্ছা ছেড়ে দেন।’ ৫০ টাকা না কয় টাকা ফাইন।
 
চুল কাটে নাই?

নাহ। আমার চুল কাটবে কিভাবে? তদ্দিনে আমি এসব জানি তো। যখনই ওরা আমাকে ধরছে- দেখে যে জিন্স, জিন্সের মধ্যে স্লোগান লেখা, পাইছে একটা মাল, তো থানায় যখন ঢুকাইছে, আমি সব চুল শার্টের পিছনে ঢুকায়া রাখছি। মানে, কিছু বোঝার উপায় নাই। কারণ, আমি জানি যে চুল ফেলে দিবে। চুল কাটেনি। একবারও কাটেনি। তারপর লালবাগে তো খালাম্মা গিয়ে ছাড়াল। ছাড়বে না, ছাড়বে না, আল্টিমেটলি কোর্টে যেতে হলো। খালাম্মা তখন গার্লস স্কুলের...

আন্টি মানে টিংকুভাইয়ের মা?

হুম। উনিও বিখ্যাত মানুষ।

ওই সময় যে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল মনে আছে? বাইসাইকেলে দুইজন তোলা যাবে না... পাঁচজনের বেশি জমায়েত করা যাবে না। তার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা যাবে না।

কথা তো বলা যাবেই না। পাঁচজনেরটার সুযোগ সবচেয়ে বেশি নিত মতিঝিল কলোনিতে। তখন ঠোলা নামের উৎপত্তি হয় ওইখানেই। ঠোলা মানে হচ্ছে পুলিশ। ৮২’র পর ঠোলা শব্দটা আসলো। এজিবি কলোনীতে আমরা আড্ডা মারতাম আইডিয়াল স্কুলের কারণে। তখন সব শব্দ উল্টো করে বলার একটা প্রচলন ছিল। তখন একটা হলো- লাঠো, মানে, ঠোলা। সরাসরি ঠোলা বললে তো বুঝে ফেলতো। এবং, চার পাঁচজন আড্ডা মারছি, লাঠো। একেকজন একেকদিকে চলে গেল। পুলিশের গাড়ি চলে গেল সামনে দিয়ে।
একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের যে দায়বদ্ধতার জায়গা তৈরি হয়, এই যে গণজাগরণ করলাম, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক আন্দোলন করলাম, নব্বইয়ের আন্দোলন করলাম, এগুলো আমরা নাগরিক দায়িত্বের কারণে নাটকের বাইরে বা চিত্রশিল্পীর বাইরে আমাদের ভূমিকাগুলো পালন করার চেষ্টা করছি। আমার মনে হয় শিল্পের যে জায়গাটা, অ্যাসথেটিক্স তো আসলে একই। নাটক হোক, চিত্র হোক অ্যাসথেটিক্স তো একই। তো সেই জায়গায় আমার বারবার একটা কথাই মনে হয়, আমরা কিন্তু আসলে শিল্পকে রিচ করার জায়গা- একজন নাট্যশিল্পী, একজন চলচ্চিত্র শিল্পী, একজন সাহিত্যিক, একজন চিত্রশিল্পী, তাদের পারস্পরিক ভাবের লেনদেনের যে জায়গাটা, এইটা কিন্তু আমি খুব পুওর মনে করছি এই মুহূর্তে। একটাকে ছেড়ে কিন্তু আরেকটা হতে পারে না।
 
যেমন আমি কামালের অন্য লেখার সাথে পরিচিত, যখন দেখলাম যে সে থিয়েটার নিয়ে লিখছে, একটা সমালোচনামূলক লেখা, আমি ভাবলাম যে আসলেই কি লেখকরা থিয়েটার দেখে! আবার আমি একদিন হঠাৎ করে একজনকে বললাম যে, আমি আপনার এই লেখাটা পড়েছি। উনি ভাবলেন, ‘থিয়েটারের লোক পড়ে!’ সে-ও কিন্তু কোনো খারাপ জায়গা থেকে বলে নাই। কারণ হচ্ছে জায়গাগুলি এখন এতো ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক, চর্চাগুলি এমন জাগায় যাইতেছে... আপনি শিওর থাকেন- আপনি চোখের ডাক্তার, দুই দিন পরে আবিষ্কার হবে যে বাম চোখ যে ডাক্তার দেখে ডান চোখ সে দেখতে পারে না। ডান চোখের জন্য আলাদা ডাক্তার আছে।
 
এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসার উপায়টা কী?

আমার নিজের মনে হয় যে আমাদের একটা সমস্যা-ই হয়ে গেছে বি ফড়হ’ঃ ঃধষশ. প্রত্যেকটা মোমেন্টে মনে হয় যে, বলে কী হবে!  কিন্তু বলে হয়। যার যেখানে যতটুক ইয়ে তা বলা উচিত। যে এইটা হওয়া উচিত, এইটা হওয়া উচিত না। যেমন আমার দীর্ঘদিন যাবৎ মনে হচ্ছে একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখলাম, স্ক্রিপ্টের মধ্যে আমি এই ডায়গলটা যুক্ত করছি- ‘যে জাতি তার বীরদেরকে সম্মান দিতে জানে না সে জাতি পিছিয়ে যায়। সে নিজেকে সম্মান করতে পারে না।’ আমাদের সোসাইটি পিছিয়ে যাওয়ার অনেক বড় কারণ হচ্ছে অলিখিত, কিন্তু পরিকল্পিত একটা বিভাজন এবং বৈষম্য। এই বৈষম্যটা কিন্তু ইয়ে না, মনে হয় না যে এই বৈষম্যটা কেউ ইচ্ছা করে করে নাই। একদম সুচিন্তিত।

ধরেন, এই যে আমার বাসার অপজিটে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। সেখানের গার্ডও কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু কেউ গাড়ি নিয়ে ঢুকলে তাকে স্যালুট দিতে হচ্ছে। সে স্যালুট দেয় যে ডিএস হইছে, ওমুক হইছে; ঐব্যাটা জানেই না যে দুনিয়াটা কী। আমার কথাটা হচ্ছে নিষেধ করতে হবে এখান থেকে কোনো গাড়ি ঢুকলে বা বেরুলে তাকে স্যালুট দিতে হবে না। কারণ হচ্ছে যে স্যালুট দিচ্ছে ’ও হচ্ছে বড়। এই জিনিস আপনি কতদিনে স্টাব্লিসড করাতে পারবেন?

আমরা কথা বললে অনেক বলতে পারবো। আমার মনে হয় আমরা শেষ করি। আপনাকে শেষ প্রশ্ন করছি- আমরা আপনার বন্ধুরা মিলে আপনার জন্মদিনটা সেলিব্রেট করতে যাচ্ছি- আপনি এটাকে সহজ সরলভাবে না দেখে বিব্রতবোধ করছেন কেনো?

আমি বিব্রত হবো না যদি এই বন্ধুত্বের ব্যাপারটা কন্টিনিউ করে। মানে জন্মদিনই করতে হবে এমন কোনো কথা নাই। আমরা বরং আরেকটা জিনিস করতে পারি কিনা- মাঝে মাঝে আমরা এরকম আড্ডা মারতে পারি কিনা? আমরা প্রায় সমবয়সী এই বন্ধুরা শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি নিয়ে মাঝে মাঝেই আড্ডায় তর্ক-বিতর্ক করতে পারি কিনা। তাহলে আমার মনে হয়- আপনারা যে নাম দিয়েছেন ‘তারুণ্য ও তাড়নার ৫০’- এটা সার্থক হবে। ধন্যবাদ।

বিপুল শাহ: চিত্রশিল্পী
আহমাদ মোস্তফা কামাল [ This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ]: কথাসাহিত্যিক
হাসান শাহরিয়ার: সম্পাদক- থিয়েটারওয়ালা