Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

কবিতার মৌলবীর সঙ্গে কয়েকটি সন্ধ্যার গুঞ্জন

Written by আলফ্রেড খোকন.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

তাঁর সঙ্গে প্রথম সরাসরি কথা হয় বাংলা একাডেমিতে। সেটা ১৯৯৬ সাল। তারপর দীর্ঘ বিরতি। মাঝে মাঝে দেখা হতো লেখায়, পত্রিকার পাতায়। ২০০২ বা ৩ সালের আসন্ন শীতে তিনি একদিন আমাকে ফোন করলেন, সেল ফোনে- কবি তোমার কী খবর? লেখা ছাড়া আর কী করছো? মানে ভাত-টাত খাও কিভাবে? সে সময় কবিতা ও ফিচার আমার একমাত্র জীবিকা। অবশ্য তা দিয়ে ঘরভাড়া ও ভাত খাওয়া সম্ভবপর ছিল না। বাড়িভাড়া একমাস বাকি পড়ল। এক বন্ধুর কাছ থেকে ধার নিয়ে বাড়িভাড়া পরিশোধ করি। আর কবিতা ও ফিচার লেখার বিল দিয়ে, কোনো কোনো সময় পত্রিকা অফিস থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে ভাত-ভর্তা খাই।

রফিকভাই শুনে বললেন সন্ধ্যায় ‘সাকুরা’য় আসো, সাক্ষাতে কথা হবে। নগরীর কোনো পানশালায় তখন আমি ভয়ে ভয়ে ঢোকার অভ্যাস রপ্ত করছি। এর আগে সাকুরাতে আমার যাওয়া হয়নি। আমি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ হাজির হই। দেখি দু’জন মুখোমুখি বসার একটি টেবিলে তিনি বসে আছেন ভাবলেশহীন। আমি এসে তাঁর সামনে দাঁড়াতেই তিনি দাঁড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন। করমর্দন ও কোলাকুলি শেষে বসতে বললেন সামনের চেয়ারে। হাতের ইশারায় বারটেন্ডারকে কাছে আসতে ইঙ্গিত করলেন। তাকে বললেন, এই তরুণ কবিকে চিনে রাখ। ও আমার খুব প্রিয়, ভাল লেখে। বারট্রেন্ডার আমাকে সম্ভাষণ জানালেন। তারপর রফিকভাই বললেন, কী খাব হুইস্কি না অন্য কিছু। আমি বললাম আপনি যা খাচ্ছেন তাই। এইভাবে তাঁর সঙ্গে শুরু আমার একটি ‘মন ভাল নেই’ সন্ধ্যার।

সেদিন তিনি নব্বই দশকের কয়েকজন কবির কথাও বললেন, যাদের লেখা তিনি পেলেই পড়েন। তার মধ্যে টোকন, মাহবুব, কামু, মারজুক ও জাফরের নাম সগৌরবে উল্লেখ করলেন, বললেন, তোমাদের এই পাঁচজন খুব ভাল কবি। শত প্রতিকূলতায়ও লেখা থামাবে না। এইভাবে অগ্রজ কবির প্রেরণায় একটি সন্ধ্যার নিমগ্নতা। তবে রফিক আজাদের সঙ্গে প্রথমদিনের সন্ধ্যায় কতিপয় তরুণ আমরা ছাড়া আরও এসেছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ। আবুল হাসান যেন আসেন আর যান। আবুল হাসান প্রসঙ্গেই তিনি গোঁফ মুছে আফসোস করলেন- এত অল্প বয়সে চলে গেল! তবে আড্ডার সবচেয় প্রধান অংশ জুড়েই ছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে কিভাবে কয়েকটা মাতাল দিন যাপন করেছেন এই নগরে তারও বিবরণ দিলেন অবলীলায়। প্রথম সন্ধ্যায় বারের আলো উজ্জ্বল হয়ে আসতেই রফিকভাই বললেন, এবার যেতে হবে। ওরা আর আমাদের পছন্দ করছে না। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, আমাদের দেশের বারগুলোতে ঢোকার মুহূর্তে আলো-আঁধারির পরিবেশ, কিন্তু রাত বাড়তেই, পরিবেশনের সময় পেরিয়ে যাবার কিছু পূর্ব থেকেই আলো উজ্জ্বল হতে থাকে। আর এই ঔজ্জ্বল্যের মানে- উঠে যেতে হবে। যাইহোক, এইভাবে প্রথম সন্ধ্যা মুছে যাবার পর, প্রায় কয়েক মাস প্রতি সন্ধ্যায়ই রফিকভাইয়ের প্রতীক্ষা শুরু হলো বেকার তরুণ কবির জন্য, আর আমার প্রতীক্ষা হতে থাকল পরিবাগের সড়ক ধরে কখন সন্ধ্যা নামবে। কয়েকমাস প্রায় প্রতিটি সন্ধ্যা আমাদের যেন যৌথ সন্ধ্যা হয়ে উঠল। একজন কবি ও মুক্তিযোদ্ধা, অন্যজন কেবলি কবি এবং তরুণ; তাঁর ফেলে আসা দিন ও সতীর্থদের গল্প শুনে শুনে আমিও বেড়ে উঠছিলাম কালের যাত্রায়, অন্য এক মহিমায়।

দিন নিয়ে বছর যায়। আসে ২০০৪ সাল। তৎকালীন একুশে টেলিভিশন ডেকে আমাকে একটা কাজের কথা বলে। আমি চাকরিতে যোগ দেই। ঘরভাড়া তিনমাস বাকি পড়ে যাওয়ায় চাকরিতে যোগ না-দেয়া ছাড়া আমার অন্য উপায় ছিল না। চাকরিতে যোগদানের ফলে রফিকভাইয়ের সঙ্গে নিয়মিত সন্ধ্যার অবসান হলো। পানশালায় আমার অনিয়মিত সন্ধ্যার সর্বশেষ গাঢ় সান্নিধ্যে তিনি আমাকে উপহার দেন ‘মৌলবীর মন ভাল নেই’ কবিতার বই। বইয়ে অটোগ্রাফের তারিখ ছিল ১৪/০৩/০৭। তারিখ দেখে মনে পড়ল সেই সব সন্ধ্যার গুঞ্জন।

সেদিন সীমিত আলোয় প্রথম পড়েছিলাম শিরোনামের কবিতাটি। আর তখন থেকেই মনে হতে শুরু হয়েছে এই মৌলবী হয়তো কবিতার মৌলবী নিজেই। তার যে মন ভাল ছিল না সেটা ওই কবিতাটি না-পড়লে অত সহজে অনুমান করা যেত না। আবার একই অঙ্গে দু’রকমের ইশারায় ভরে গেছে কবিতা জমিন!

ভালোবাসি মৌলবীকে- লোক ভাল আমার মৌলবী,
মৌলবী মানুষ ভাল- নমনীয়, মৃদু ও মধুর;

মৌলবী বিমর্ষ কেন, আজ তার মন ভাল নেই?
বর্ষায় পেয়েছে তাকে?- মৌলবী কী বৃষ্টি ভালোবাসে?
এ আষাঢ়ে কারু কথা মনে পড়ে গেছে নাকি তার!
মৌলবী মানুষ নয়?- মৌলবীর মন থাকতে নেই?
- মৌলবীরও মন আছে- প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা আছে,
যে কোনো যুবার মত তারও চাই প্রিয় কোনো নারী;
বিরহে কাতর হবে আশ্চর্য কী রয়েছে তাতে-
সপ্রাণ মানুষ সে যে- পরিচ্ছন্ন সুস্থ ও স্বাভাবিক।

মৌলবী ফিরিশতা নয়, দেশকালে থিতু সে নিশ্চয়-
ছয়টি ঋতুর সঙ্গে এই বঙ্গে সে-ও তো বেড়েছে;
প্রশ্নবিদ্ধ হবে কেন মৌলবীর বিরহ-যাপন?

(‘মৌলবীর মন ভাল নেই’)

যুদ্ধ, মারী ও মড়কের কথা, মানুষের হাতে বিপন্ন ধরিত্রী ও মানবতার প্রসঙ্গে তিনি প্রায়শই ভারাক্রান্ত থাকতেন। এইসব বেদনা তাকে প্রতিদিন পেয়ে থাকত কিনা, সে বেদনা ঘোচাতে তিনি পানশালায় আসতেন কিনা- তা জিজ্ঞেস করে জানার বিষয় নয়। এই কবিতার বইয়ে আরেকটি কবিতার নাম ‘সেলাই-করা ঘুমগুলো আমার’। এ কবিতায় সেলাই করা খণ্ড খণ্ড ঘুমের চিত্রকল্পে আমার মনে পড়ে সন্ধ্যার সাকুরা, দোপাট জানালার পাশে মুখোমুখি দুটো চেয়ার, মাঝখানে সংক্ষেপিত টেবিল। পূর্ব দিকের চেয়ারে বসে জানালার পাশের দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখের উপর হাত দিয়ে বাচ্চাদের মতো আলো আড়াল করে কিছুক্ষণের তন্দ্রাচ্ছন্ন রফিক আজাদকে। আর তখন মনে হতো সারাদিনের জমে থাকা খণ্ড খণ্ড ঘুমগুলো যেন সেলাই করে এই তো ছোট একটি ঘুমের মালা পড়ে নিলেন কিছুক্ষণের জন্য।

পেশাগত কাজের প্রশ্নে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকা থেকে ফেরার পর সাকুরাতে রফিকভাইয়ের সঙ্গে ফোনে মিলিয়ে দিলাম প্রবাসী কবি শহীদ কাদরীকে। দীর্ঘদিনের যোগাযোগহীনতায় বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন দুজনই। শহীদভাই বলেছিলেন, দেশে ফিরে তুমি একবার রফিকের সঙ্গে ফোনে মিলিয়ে দিও। রফিক অনেক বড় কবি। বড় মনের মানুষ! কতদিন ওর সঙ্গে দেখা নাই, কথা নাই। হাউ মাউ করে ১০ মিনিট ধরে কাঁদলেন রফিকভাই। সেই কান্নার ভিতরে শিশুর সরলতা ছিল, ছলনা ছিল না। কান্না যে এত মধুর হয়, তা সেদিন কিছুটা হলেও বুঝতে পারলাম।

মানুষ বসে থাকে/ মানুষ চলে যায়- রফিক আজাদের কবিতার চরণ। রফিক আজাদ দিনের পর দিন একটি জায়গায় বসে থাকতেন, তার পর চলে যেতেন। কিন্তু একদিন তিনি এমনভাবে চলে গেলেন, আর আসবেন না কোনোদিন। যেভাবে আসলে ছুঁয়ে দেখা যায়, মুখোমুখি বসে থাকা যায়, চোখের ভিতরে চোখ মেলে দেখা যায়- সেভাবে আর তাঁকে দেখা হবে না। এখন তাঁকে দেখতে হবে কবিতার ভিতর দিয়ে। আর স্মৃতির পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে তাঁকে দেখতে হলে।
 
১৬ এপ্রিল ২০১৬, ঢাকা

আলফ্রেড খোকন- কবি